Home মেরিগোল্ড সেনোরিটা মেরিগোল্ড সেনোরিটা পর্ব ৩

মেরিগোল্ড সেনোরিটা পর্ব ৩

মেরিগোল্ড সেনোরিটা পর্ব ৩
ফারহানা নিঝুম

বাদশাহ ভিলার ঐশ্বর্যমন্ডিত প্রাচীরের অন্তরালে লুকিয়ে আছে গভীর এক পারিবারিক জটিল উপাখ্যান।যার কেন্দ্রে ছিলেন বাদশাহ ভিলার বড় কর্তা, রাজিব বাদশাহ । যৌবন উচ্ছৃঙ্খল আবেগের বশে দুটো বিয়ে করেছিলেন। প্রথম স্ত্রী থাকা সত্ত্বেও দ্বিতীয় বিয়ে করে বসে ছিলেন। অথচ সেই কথাখানা জানতেন না জেসমিন বাদশাহ। তিনি তখন নিজের ক্যারিয়ার এবং সংসার দুটোই একসাথে সামলে উঠতেন।
রাজিব বাদশাহর মা হেনা বাদশাহ যার কথায় এই পুরো বাদশাহ পরিবার মানতে বাধ্য। বড় বউ জেসমিন বাদশাহ কে একটু বেশি স্নেহ করতেন। নিজে পছন্দ করে মেয়েটিকে ছেলের বউ রূপে নিয়ে এসেছেন।
দু বছর পর জেসমিন বাদশাহ একজন পুত্র সন্তান জন্ম দিয়েছেন। যার নাম রাখা হয় জুনেদ শয্য বাদশাহ। তার ঠিক তিন বছর পর আরেকটা মেয়ের জন্ম দেন যার নাম মেহরিমা বাদশাহ। পরিবারের সকলেই জানতেন জুনেদ শয্য বাদশাহ হচ্ছে বাদশাহ পরিবারের বড় সন্তান।

তারপর বাড়ির আরেক ছেলের বিয়ে হলো। তার ঘরেও সন্তানের জন্ম হয়। জুনেদ শয্য বাদশাহর যখন সতেরো বছর বয়স সে সবে কলেজের স্টুডেন্ট। তখন বাড়ির লোকজনের
সামনে উন্মোচিত হয় এক বাড়ির বড় ছেলে রাজিব বাদশাহর ভয়ংকর এক গোপন বিস্ফোরসম সত্য। হঠাৎ তার দ্বিতীয় স্ত্রী এবং দ্বিতীয় স্ত্রীর সন্তান আব্রাহাম বাদশাহকে নিয়ে বাদশাহ ভিলায় হাজির হলেন।
হেনা বাদশাহ সেদিন জেসমিন বাদশাহর সম্মুখে মুখ দেখানোর মতো অবস্থায় রইলেন না। জেসমিন বাদশাহ ছিলেন প্রচন্ড কঠোর এক নারী। সেদিন নিজের স্বামীর দ্বিতীয় স্ত্রীকে সানন্দে গ্রহণ করে নিয়েছেন। গ্রহণ করেছেন তার ছেলেকে। সেই ছেলে আব্রাহাম যে দুই বছরের বড় জুনেদ শয্য বাদশাহর থেকে। জেসমিন বাদশাহ সকলকে বলেছেন তাকে যেনো যোগ্য সম্মান দেওয়া হয় এই বাড়িতে। কখনো যেনো এটা বলা না হয় সে জেসমিন বাদশাহর জায়গা কেড়ে নিয়ে বা এমন কিছু বলে তাকে যাতে কটাক্ষ করা না হয়।
তবে এক ছাদের নিচে সতিন নিয়ে সংসার করবেন না বলে নিজের ছেলে জুনেদ শয্য বাদশাহ কে নিয়ে বাদশাহ ভিলা ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন কোরিয়ার সিউল শহরে। সেখানেই নিজের ক্যারিয়ার তৈরি করেছেন। নিজের বিজনেস শুরু করেছেন। একা হাতে ছেলেকে মানুষ করেছেন।

দীর্ঘ বারোটা বছর একা একাই কাটিয়েছেন তিনি।
সাত বছরের মাথায় রাজিব বাদশাহর দ্বিতীয় স্ত্রী সুনন্দা বাদশাহ মা’রা যান। তার মা’রা যাওয়ার পরেই হেনা বাদশাহ আরো বেশি অসুস্থ হয়ে পড়েন। উঠতে বসতে শুধু বড় বউ জেসমিন বাদশাহর জন্য হাপিত্যেশ করেন।
শ্বাশুড়ির প্রতি গভীর ভালোবাসা ছিলো জেসমিন বাদশাহর। তাকে ফোন করে বাড়ির প্রতিটি মানুষ জোরাজুরি শুরু করলেন। কিন্তু জেসমিন বাদশাহ কি করবেন বুঝে উঠতে পারছেন না। ততদিনে জুনেদ শয্য বাদশাহ পরিবারের লোকজনের থেকে অনেকটা দূরে সরে গেছে। তাদের কাউকেই পছন্দ করেনা।
শেষমেশ বাধ্য হয়েই ছেলেকে মানিয়েছেন তিনি। অতঃপর পুরো বাদশাহ পরিবার দেশ ছেড়ে সিউলে পাড়ি জমিয়েছেন।
এখন জেসমিন বাদশাহ পুরো পরিবারকে একা হাতে সামলে চলেছেন।‌ সতিনের ছেলে আব্রাহাম তাকে মায়ের মতো শ্রদ্ধা করে চলে। উনার পছন্দেই জুঁই কে বিয়ের জন্য রাজী হয়েছে সে। তিন বছর হতে চলল জেসমিন বাদশাহ আবারো বাদশাহ পরিবারের সাথে রয়েছে।

“রিমঝিম তাড়াতাড়ি আয়।”
“আসছি।”
এতক্ষন যাবত আদর্শ শ্রোতাদের মতো রিমঝিমের কথাগুলো শ্রবণ করছিল জুঁই।‌ ভেতর থেকে জেসমিন বাদশাহ রিমঝিমকে ডাকতেই মেয়েটা দৌড়ে চলে গেল।
সত্যি আশ্চর্য ব্যাপার, আব্রাহাম যে জেসমিন বাদশাহর ছেলে নয় তা বোঝাই যায় না! কি সুন্দর সকলের সামনে মামুনি,মামুনি বলে মুখে ফেনা তুলে ফেলে। আচ্ছা সকলকেই তো দেখল জুঁই কিন্তু জুনেদ শয্যকে তো দেখে নি। সে কি এ বাড়িতে থাকেনা?”
ভাবতে ভাবতে বাড়ির বাইরে এলো জুঁই। এ বাড়িতে আসার পর থেকে তাকে কোনোরূপ কাজ করতে দেওয়া হয়নি। কাজের জন্য তিনজন লোক রয়েছে। তারাই সবটা করছে।
মাত্র একদিন হলো সে এসেছে।

সাঁঝ নেমেছে সিউলে শহরের আকাশে অদ্ভুত এক মায়াময় কোমলতায় মোড়ানো নগরী যেন ধীরে ধীরে নিজের অন্তর উন্মোচন করছে। পশ্চিম আকাশে রক্তিম আভা মিলিয়ে যেতে যেতে ছড়িয়ে পড়েছে হালকা বেগুনি আর সোনালি আলোর মিশেল, যা নগরীর প্রাচীন স্থাপত্যে এক স্বপ্নিল আবরণ এঁকে দিয়েছে। বিশাল টাওয়ার-এর শীর্ষে তখন আলো জ্বলার প্রস্তুতি মুহূর্তের মধ্যে ঝলমলে আলোকমালায় ভেসে উঠবে সে, যেন নক্ষত্রেরা নেমে এসেছে পৃথিবীর বুকে। এমন সময় বাড়ির আশেপাশে ঘুরে ঘুরে সৌন্দর্য দেখতে ব্যস্ত জুঁই। দূরে ডুপ্লেক্স বাড়িটার দিকে নজর গেল। বাড়ির নাম লেখা “ফেইরি ল্যান্ড” নামটা ইউনিক। কালো রঙে মুড়িয়ে রাখা ওই বাড়ি।‌ নিশ্চয় বাড়ির মালিক কালো রঙ ভীষণ পছন্দ করে নয়তো এত চমৎকার করে সাজাবে বুঝি? তবে সবচেয়ে চোখে পড়ার মতো ছিল মাঝখানে স্থাপিত ঝর্ণার মতো ভাস্কর্যটি। সাদা পাথরে খোদাই করা সেই মূর্তির গা বেয়ে নিরবচ্ছিন্নভাবে ঝরে পড়ছে স্বচ্ছ পানি টুপটাপ শব্দে চারপাশে ছড়িয়ে দিচ্ছে এক অদ্ভুত প্রশান্তি। সূর্যের আলো পড়ে পানির ফোঁটাগুলো রঙিন হয়ে উঠছে, যেন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রংধনু খেলা করছে বাতাসে।
চারদিকে ছড়িয়ে থাকা গার্ডেনটা যেন এই পুরো প্রাসাদের প্রাণ।
জুঁই যখন ব্যস্ত সৌন্দর্য দেখতে আচম্বিতে একটি মেয়েকে দেখতে পেলো কাঁধে ব্যাগ চাপিয়ে যত্নে ছাঁটা সবুজ ঘাসের উপর পা ফেলে সামনের ওই বাড়িটার দিকে পা টিপে টিপে এগুচ্ছে। হকচালো জুঁই। কে ওই মেয়েটা? আর এভাবে ওদিকে কেন যাচ্ছে?

ভেতরের উৎকন্ঠা দাপিয়ে রাখতে না পেরে জুঁইও মেয়েটার পিছু নিলো। পিছন থেকে দেখাই যাচ্ছেনা তাকে। হাঁটতে হাঁটতে একসময় পৌঁছে গেল বড় বাড়িটার সামনে। মেয়েটা চুপিচুপি দরজায় পাসওয়ার্ড দিয়ে ঢুকে পড়ল। জুঁইয়ের কপাল জুড়ে দেখা দিলো উদ্বেগের চিহ্ন।
মেইন ডোর প্রথম থেকেই খুলে দেওয়া আছে। ভেতরে ভেতরে ভীষণ অস্বস্তি বোধ করছে মেয়েটা। তবুও কুন্ঠিত পায়ে ভেতরে কদম ফেলে এগুতেই এগুলো মিনমিনে গলায় ডাকল,
“ভাইয়া? ভাইয়া?”
দু’বার ডাকা সত্বেও কোনো রূপ সাড়াশব্দ পেলো না ঝুমঝুম। জুঁই কপাল কুঁচকে তাকিয়ে দেখছে মেয়েটার কান্ড। বুকের ভেতর ধকধক করছে তার! এত বড় বাড়ি ফাঁকা হয়ে আছে কেন? আর এই মেয়েটা বিনা অনুমতিতে ভেতরের ঢুকে পড়ল কেনো?
ড্রয়িং রুমে পা রাখতেই চারিদিকটা অন্ধকারে ডুবে আছে দেখতে পেলো, অকস্মাৎ কিছু একটা পড়তেই আতংকে শরীর জমে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে ঝুমঝুমের।
এরই মধ্যে স্মাইলি স্টিকার দেওয়া ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে উঁকি দিলো ছোট্ট একটি প্রাণী। প্রাণীটির নাম হচ্ছে কাঠবিড়ালী, আদর করে যাকে রমণী ডাকে “পিউনিও বেবি।”
কম্পিত চিত্তে আরো একবার ডেকে উঠল,

“ফু আম্মু?ফু আম্মু?”
পিছন হতে অদ্ভুত শব্দে আবারো মেইন ডোরের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করল ঝুমঝুম। সহসা দরজার থেকে কিছুটা আড়াল হয়ে গেল জুঁই। ওমনি আত্মা সুদ্ধ কেঁপে উঠলো কন্যার। পিছিয়ে গেল এক পা। একটা কুকুর। জুঁইয়ের দমবন্ধ হয়ে আসছে রীতিমতো। সে মুখ চেপে চুপচাপ
কালো রঙের কুকুরটিকে দেখতেই ঝুমঝুমের হৃদপিণ্ড যেন অস্বাভাবিক এক আতঙ্কে কেঁপে উঠল। বুকের ভেতরটা থরথর করে কাঁপছে, শ্বাস যেন নিজের নিয়ন্ত্রণে নেই। প্রাণীটি একটি পালিত কুকুর, তার গলায় ঝুলানো চামড়ার বেল্টে স্পষ্ট করে লেখা নামটি চোখে পড়ল, “থমাস”।
থমাস মাত্রই দুই পা এগোতেই ঝুমঝুমের মুখ থেকে তীক্ষ্ণ চিৎকার বেরিয়ে এল,
“আহহহ হেল্প! হেল্প!”

এলোমেলো, ভয়ে ভারসাম্য হারানো পায়ে সে ছুটে গেল ড্রয়িং রুম পেরিয়ে। সিঁড়িটি যেন এক বিশাল সাপের মতো ঘুরে উপরের দিকে উঠে গেছে সেই সিঁড়ির দিকেই প্রাণপণে দৌড়াতে লাগল মেয়েটি। আর তার পেছনে অবিরাম ছুটে আসছে থমাস, তার ভারী পায়ের শব্দে যেন পুরো বাড়িটাই কেঁপে উঠছে।
“হেল্প মি! ফু আম্মু কোথায় তুমি? ফু আম্মু, ভাইয়া..
চিৎকার আর কান্না মিলিয়ে ঝুমঝুম দিশেহারা হয়ে ছুটছিল। আতঙ্কে তার চারপাশের সবকিছুই যেন অস্পষ্ট হয়ে উঠছে, কেবল একটাই অনুভূতি পালাতে হবে।
ঠিক তখনই হঠাৎ সামনে এসে দাঁড়াল এক পুরুষ দৃঢ়, প্রাচীরের মতো শক্ত, যেন অচেনা এক দুর্গের অবয়ব। তার সাথে প্রচণ্ড ধাক্কায় ঝুমঝুম থেমে গেল, বুকের ভেতর শব্দ করে উঠল আঘাতের প্রতিধ্বনি।
“প্লিজ, প্লিজ হেল্প, হেল্প..

কাঁপা কণ্ঠে অস্ফুটে বলে উঠল ঝুমঝুম। অস্বাভাবিক ভাবে শরীর কাঁপছে তার।
সামনের সেই সুদর্শন পুরুষটির মুখের দিকে তাকানোর সাহসও পেল না ঝুমঝুম। চোখ নামিয়ে নিল, ভয়ে শরীর জমে যাচ্ছে তার। পিছনে থমাস তখনও একনাগাড়ে ঘেউ ঘেউ করে যাচ্ছে, ঘরের নিস্তব্ধতা ভেঙে।
তখনই হঠাৎ সেই পুরুষের কণ্ঠস্বর গম্ভীর অথচ নিয়ন্ত্রিতভাবে ধ্বনিত হলো,
“স্টপ স্ক্রিমিং, থমাস!”
চিরচেনা সেই আদেশস্বর যেন ছুঁয়ে গেল থমাসকে। মুহূর্তেই থমাস থেমে গেল কিন্তু জায়গা ছেড়ে নড়ল না একটুও।
থমাস এখন শান্ত, তবে একেবারে স্থির চোখদুটো যেন এখনও সতর্ক পাহারায় জ্বলজ্বল করছে। ঝুমঝুম একটু দূরে সরে দাঁড়িয়েছে, কিন্তু ভেতরের কাঁপন এখনো থামেনি। নিঃশ্বাস নিতে গিয়েও যেন বুকটা আটকে আসছে বারবার।

কুকুরটা থেমে যাওয়ার পর সে ধীরে ধীরে স্বস্তির এক দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলল। কিন্তু সেই স্বস্তিও স্থায়ী হলো না। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই নিজের অবস্থানটা যখন পুরোপুরি উপলব্ধি করল, তখনই যেন লজ্জা আর ভয়ের মিশ্রণে ঝুমঝুম একধাপ পিছিয়ে গেল। নিজেকে গুটিয়ে নিল তৎক্ষণাৎ। উফ্ আচ্ছা জ্বালা হলো তো,যত চায় ভুল না করতে ততই ভুল হয়ে যায় তার দ্বারা।
চোখ তুলতেই ধরা পড়ল সেই পুরুষটির দৃষ্টি।
হ্যাজেল রঙের চোখ অদ্ভুত এক গভীরতা, যেন সেখানে কোনো অজানা রহস্য লুকিয়ে আছে। ধারালো সেই চাহনি ঝুমঝুমের ভেতরটা পর্যন্ত ছুঁয়ে গেল, অজান্তেই গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল তার। নাকের নিখুঁত গঠন, ঠোঁটের গাঢ় গোলাপি আভা সবকিছুই যেন অস্বাভাবিকভাবে পরিপাটি, নিখুঁত। ফর্সা হওয়ার দরুন ঠোঁট দুটো এমন দেখায় সর্বদা।এলোমেলো কিন্তু স্টাইলিশ ওল্ফ কাট চুল। ছেলেদের যে চুল লম্বা রাখলে সুন্দর দেখায় তা এই পুরুষকে না দেখলে জানতোই না ঝুমঝুম। ঘন চুলগুলোর মাঝখানে বেল্ট দিয়ে বেঁধে রেখেছে লোকটা।
ঝুমঝুম হঠাৎ বুঝতে পারল লোকটা তার চেয়ে অনেক লম্বা। ছয় ফুট তো হবেই, সেখানে ঝুমঝুম পাঁচ এক ইঞ্চি মাত্র। দেহের গঠনও শক্তপোক্ত, পেশিবহুল দুই হাত ট্রাউজারের পকেটে গুঁজে রাখা। ডান হাতে আঙ্গুল থেকে শুরু করে আশেপাশে অনেকগুলো ছোট‌ছোট ট্যাটু রয়েছে। তার পুরো উপস্থিতিটাই যেন এক ধরনের নিঃশব্দ আধিপত্য ঘোষণা করছে। ঝুমঝুম ড্যাবড্যাব করে চেয়ে আছে, মস্তিষ্ক তখন তড়াগ করে তাকে জানান দিল “এটা তোর ভাই বেয়াদব, ওভাবে কি দেখছিস?”

এতক্ষণে দৃষ্টি একটু নিচে নামতেই ঝুমঝুম থমকে গেল।
লোকটা উদোম গায়ে দাঁড়িয়ে আছে।
পাথরের মতো শক্ত বুক, স্পষ্ট ছয়টা প্যাক, যাকে বলে সিক্স প্যাক। মুহূর্তেই অদ্ভুত এক অস্বস্তি ছড়িয়ে পড়ল তার ভেতরে। সে দ্রুত চোখ সরিয়ে নিল, গোপনে শুকনো ঢোক গিলল। ছিহ্ ছিহ্ এতক্ষন ধরে এভাবে তাকিয়ে ছিলো?তাও আবার নিজের কাজিন ব্রাদারের দিকে?
ঠিক তখনই গমগমে, ভারী কণ্ঠে লোকটা আবার প্রশ্ন করল
“এখানে কী করছিস তুই,মাশা?”
কণ্ঠস্বরটা সরাসরি বুকের ভেতর কোথাও ধাক্কা দিল। সঙ্গে সঙ্গে কাঠবিড়ালী পিউনিও বেবি ঢুকে পড়ল ব্যাগের ভেতর। লুকিয়ে নিয়েছে নিজেকে। বাঁচতে চায় কাঠখোট্টা বেপরোয়া পুরুষের থেকে।
ঝুমঝুমের ভেতরটা কেঁপে উঠল, কথা খুঁজে পাচ্ছিল না সে। আমতা আমতা করে, ভাঙা ভাঙা স্বরে বলল,
“আমি,,আমাকে তো এখানেই পাঠানো হয়েছে! আসলে আমি আমি..
ঝুমঝুমের কণ্ঠে স্পষ্ট বিভ্রান্তি প্রকাশ পাচ্ছে। তাকে কেউই পাঠায় নি,সে তো নিজেই নাচতে নাচতে চলে এসেছে।

পিঠে ঝুলছে পছন্দের মাশা দ্য বেয়ারের কিউট একটা ব্যাগ। পরণে সাদা রঙের ফুলহাতা টপ,তার উপরেই মাশার মতো ম্যাজেন্টা কালারের ফ্রক। আর মাথায় একটা হুড পরা। পিটপিট করে একদম মাশার মতো তাকাচ্ছে। ওই চোখ দুটো জোড়ে সরলতা।
ঝুমঝুম কৃষ্ণবর্ণের পল্লবদ্বয় ঝাপটিয়ে তাকাচ্ছে।
লোকটার চোখ আরও গভীর হলো। সেই দুর্বোধ্য দৃষ্টি ঝুমঝুমকে যেন আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলছে, শ্বাস নেওয়াও কঠিন হয়ে উঠছে তার। আবারো চোখ নামিয়ে ফেলল ঝুমঝুম।
জুনেদ শয্য বাদশাহ আগের মতোই শান্ত অথচ দৃঢ় স্বরে বলল
“ওর নাম থমাস। সে ফেইরি ল্যান্ডে অপরিচিত মানুষের আগমন পছন্দ করে না । এটা জানিস না? বাই দ্য ওয়ে তোকে কে পারমিশন দিয়েছে আমার বাড়িতে আমার পারমিশন ছাড়া ঢুকতে? পাসওয়ার্ড জানলি কি করে ,মাশা?”
‘মাশা’ ডাকটা‌ শুনে হৃদয় ছলকে ওঠে কন্যার। সচরাচর এই পুরুষ তাকে এই নামে সম্বোধন করে না। ঝুমঝুম পাসওয়ার্ড অনেক কষ্টে যোগাড় করেছিল। এখন কি হবে? ঝুমঝুম আড়চোখে একবার কুকুরটার দিকে তাকাল।

থমাস এখনো দাঁড়িয়ে আছে একেবারে নীরব, কিন্তু চোখের ভেতর সতর্কতা নিভে যায়নি। এই বুঝি ঝাঁপিয়ে পড়বে মেয়েটার উপর। শাণিত দৃষ্টিতে চেয়ে থাকা লোকটার দিকে চেয়ে অস্ফুট স্বরে শুধোয়,
“মানে?”
গায়ের রোমকূপ দাঁড়িয়ে গেল ঝুমঝুমের। তার কিছুই চোখ এড়ালো না সামনের মানবের। সে কি যন্ত্রমানব নাকি? কেমন নির্লিপ্ততা নিয়ে দেখছে তাকে।
শয্য নিরেট স্বরে আওয়াজ তুলল,
“মানে এটাই, থমাসের তোকে পছন্দ হয়নি। তাই এখনো রেগে আছে।”
ঝুমঝুমের কপালে ঘাম জমেছে, মিনমিনে গলায় বলল,
“ফু আম্মু…
কথা শেষ হওয়ার পূর্বেই ঘোষণা দিলো মানব।
“পাশের বাড়িতে ওরা। ওখানে যা। আর হ্যাঁ অনুমতিবিহীন এইখানে আসা তোর জন্য নি’ষিদ্ধ। এটা তোর লাস্ট ওয়ার্নিং। নয়তো থমাস পরের বার কিন্তু ছাড়বে না।”
ঝুমঝুম হতভম্ব , লোকটা তুই-তুমি গুলিয়ে ফেলে। এইতো কাল পর্যন্ত কখনো তুমি তো কখনো তুই সম্বোধন করেছে।

তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে বলে ওঠে,
“আপনি আমাকে ভয় দেখাচ্ছেন, ভাইয়া?”
শয্য কাঁধ নাচিয়ে ‘হয়তো ‘ এটাই প্রকাশ করল। ঝুমঝুম ফোঁস করে নিঃশ্বাস ছেড়ে বলল,
“আমি কিন্তু আপনার সিস্টার? বাংলায় যাকে বলে বোন। আর হ্যাঁ আপনার ভয় দেখানোটা খুব বাজে চেষ্টা ছিলো।”
“থমাস!”
শয্যের ডাক শুনতেই আবারো ঘেউ ঘেউ করে উঠল থমাস। আঁতকে ওঠে হাতের ফোনটা নিচে পড়ে গেল ঝুমঝুমের। মেয়েটা দেয়ালের সাথে চেপে গেল তৎক্ষণাৎ। চোখ খিঁচে ভয়ার্ত কন্ঠে বলে ওঠে,
“প্লিজ থামান ওটাকে! প্লিজ প্লিজ! ভাইয়া।”
শয্য বাদশাহ বাঁকা হাসলো। ঢিলা ঢালা ট্রাউজারের পকেটে তখনো হাত ঢুকিয়ে রেখেছে শয্য। কথার মধ্যে এক অদ্ভুত দৃঢ়তা প্রকাশ পাচ্ছে তার।
“কি যেনো বলছিলে? বাজে চেষ্টা? ফুলিশ লেডি! আর একবার ভাইয়া ডাকলে চড়িয়ে দাঁত ফেলে দেব তোর।”
ঝুমঝুম কাঁপছে থরথর করে, নিষ্ঠুর পুরুষ তাকে কিভাবে ভয় দেখাচ্ছে!
শয্য থমাসের কাছাকাছি গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসলো। মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেই শান্ত হলো অবলা পশু।
ঝুমঝুম ধাতস্থ হওয়ার সময়টুকু অবধি পেলো না। কর্ণ কুহুতে ধেয়ে এলো গমগমে কন্ঠস্বর,
” আউট।”

কন্ঠনালি হতে বড় একখান ঢোক নেমে গেল পাকস্থলীতে। লম্বা নিঃশ্বাস নিঃশ্বাস টানছে ঝুমঝুম, সে হাত বাড়ালো কুকুরের সামনে থেকে নিজের ফোনটা নিতে ওমনি আবার থমাস চেঁচিয়ে উঠল। ঝুমঝুম ছিটকে দু হাত পিছিয়ে গেল।
“ওটাকে কিছু বলুন মিস্টার বাদশাহ।”
শয্যের কি “মিস্টার বাদশাহ” ডাকটা পছন্দ হয়েছে? অভিব্যক্তি বোঝা গেল না তার। শয্য থমাসকে থামতে ইশারা করল। থেমে গেল অবলা পশুটা। তবে এখানেই থেমে নেই শয্য। উঠে দাড়াতেই থমাস লেজ নাড়িয়ে গুটি গুটি পায়ে প্রস্থান করল। শয্য সোজা হয়ে ঝুমঝুমের মুখোমুখি দাঁড়ালো। শেষের বাক্যটি অদ্ভুত হাস্কিটুনে আওড়ে,

“By the way, I think it’s better for you to stay away from me.”
ঝুমঝুম বুঝল না এই সতর্কবার্তা তাকেই কেন দেওয়া হচ্ছে?যদি দূরে থাকতেই হয় তবে লোকটা জেসমিন বাদশাহর ছেলে হলো? লোকটা অদ্ভুত! রাগে নাসারন্ধ্রের উপরি ভাগ রক্তিম হয়ে আসছে ঝুমঝুমের। হৃদয় বিদীর্ণ এই কথাগুলো খুব সহজেই বলে দেয় এই পুরুষ। মনে মনে ডেকে উঠল,

মেরিগোল্ড সেনোরিটা পর্ব ২

“খরগোশ একটা।”
তৎক্ষণাৎ শ্রবণেন্দ্রিয়তে প্রবেশ করলো আরো একটি চিরচেনা কন্ঠস্বর।
“কি হচ্ছে এখানে?”

মেরিগোল্ড সেনোরিটা পর্ব ৪