মেরিগোল্ড সেনোরিটা পর্ব ৪
ফারহানা নিঝুম
“আউট।”
এক প্রকার তাচ্ছিল্য মিশ্রিত কঠোর ধাক্কায় শয্য ঝুমঝুমকে বাড়ির দোরগোড়া থেকে বের করে দিলো। দৃশ্যটি দেখে হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইল জুঁই। চোখে মুখে স্পষ্ট বিস্ময়।
বেরিয়ে আসতে আসতে মাথা চুলকাতে চুলকাতে ঝুমঝুমের চলনে কি যে এক অগোছালো সরলতা। ওই সোনালী চোখ দুটো কেমন ছলছল করছে তার। ভেতরের অপমান গুলো নৈঃশব্দ্যে গলে পড়ছে টুপটুপ করে।
জুঁইয়ের ভীষণ মায়া হলো তাকে দেখে। অকারণে তার বুকটা কেঁপে উঠল।
মৃদু স্বরে বলল জুঁই,
“তুমি মন খারাপ করো না।”
জুঁইয়ের এই কোমল কথায় নাক টানল কাদার ভঙ্গিতে ঝুমঝুম। জুঁই অপলক চেয়ে দেখল সামনের রমণীকে। কি সুন্দর দেখতে মেয়েটা।
মুখটা খুবই সুন্দর আর শান্ত এক ধরনের নরম, সহজ সৌন্দর্য আছে যা দেখলেই ভালো লাগে। এলোমেলো করে বাঁধা ঘন কালো চুল ,তার উপর হুড পরা। সেই হুডের ফাঁক দিয়ে কয়েকটা লক বের হয়ে এসেছে, এতে তাকে আরও স্বাভাবিক আর আকর্ষণীয় লাগছে।
তার চোখ দুটো বড় আর গভীর। দেখলেই মনে হয় সে অনেক কিছু ভাবছে, হয়তো কিছু না বলা কথা জমে আছে সেখানে। চোখে একধরনের কোমলতা আছে।
নাকটা একদম সোজা আর সুন্দরভাবে গড়া। ঠোঁট দুটো হালকা লাল, খুব বেশি হাসছে না, আবার পুরোপুরি গম্ভীরও না মাঝামাঝি এক শান্ত ভাব আছে।
গালের উপর ছোট একটা তিল আছে, আর উপরের ঠোঁটের ঠিক লাভ অংশে গাঢ় আরেকটা তিল আছে। ত্বকটা পরিষ্কার আর উজ্জ্বল, খুব স্বাভাবিকভাবে সুন্দর লাগে।
গলায় ছোট্ট একটা নেকলেস পরা। মেয়েটা কাঁপা কাঁপা স্বরে জিজ্ঞাসা করল,
“তুমি কে?”
ঝুমঝুমের কথায় জুঁই মুচকি হেসে বলল,
“আমি জুঁই।”
জুঁই নাম কর্ণ কুহুতে স্পর্শ করতেই বিস্ময়ে চক্ষু জোড়া অস্বাভাবিক ভাবে বড় হয়ে এলো ঝুমঝুমের। বিস্ময়াভিভূত কন্ঠে বলল,
“আব্রাহাম ভাইয়ার ওয়াইফ? ও মাই গড আমাকে চিনলে না? আমি ঝুমঝুম বাদশাহ। তোমার ননদ।”
জুঁই কিছুটা হতচকিত হয়ে গেল। হ্যাঁ রিমঝিম বলেছিল তো বাড়ির আরো দু’জন আছে যাদের সাথে তার দেখা হয়নি।
“তুমিই আরেক সদস্য? কিন্তু তুমি ছিলে কোথায়?আর উনি কেন তোমাকে বের করে দিলো এভাবে?কে ওই পুরুষ?”
ঝুমঝুম স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে বলল,
“আসলে আমি আমার এক ফ্রেন্ডের বাড়িতে ছিলাম কাল।আর উনি? উনি হচ্ছে জুনেদ শয্য বাদশাহ। ফু আম্মুর ছেলে। ফু আম্মু মানে জেসমিন বাদশাহ। আমি ছোট বেলায় ফুল আম্মু বলতাম। এখন আরো শট করে ফু আম্মু ডাকি।”
ঝুমঝুমের কথায় জুঁই ভীষণ পছন্দ করল। মেয়েটার কথা বলার ভঙ্গিতে অদ্ভুত এক সরলতা আর প্রাণবন্ততা মেয়েটা কি সুন্দর কথা বলে। ঝুমঝুম পরক্ষনেই মন খারাপ করে গম্ভীর গলায় বলল,
‘ওই লোকটা আমাকে পছন্দ করেনা। আসলে কাউকেই পছন্দ করেনা ওই বদমেজাজি লোকটা। তাই তো এখানে একা একা থাকে। আমি চেষ্টা করি একটু ভাব করতে কিন্তু লাভ নেই।”
ঝুমঝুমের কথায় আরেক দফা বিস্মিত হলো জুঁই। তাহলে ওই গুরুগম্ভীর ,রুক্ষ লোকটাই জুনেদ শয্য বাদশাহ?
“এই মাশা, তুই এখানে কি করছিস? ভাবি তুমি এখানে?আর আমি পুরো বাড়ি খুঁজে চলেছি তোমায়।”
জুঁই আর ঝুমঝুমের কথায় ফাঁকে আরো একটা গলা ভেসে এলো আর সেটা হচ্ছে রিমঝিম। রিমঝিম কে দেখে চওড়া হাসলো ঝুমঝুম।
“সরি সরি আমি আসলে একটু…
কথার পিঠে তাকে থামিয়ে দিলো রিমঝিম। সরু চোখে একপল সামনের বন্ধ দরজার দিকে চেয়ে সন্দিগ্ধ কন্ঠে বলল,
“তুই আজকেও শয্য ভাইয়ার বাড়িতে ঢুকেছিলি? নিশ্চয়ই বকা খেয়েছিস?”
ঝুমঝুম দাঁত বের করে হেসে দিলো। মানে হ্যাঁ সে আজকেও ঢুকেছিল।
রিমঝিম রাগে গজগজ করতে করতে বলল,
“দয়া করে এগুলো ছাড় আর ভেতরে যা। মামুনি অনেক্ষণ ধরে তোকে ডাকছে। তুই যে বান্ধবীর বাসায় গিয়ে বসে আছিস সেটা নিয়ে আজ বকা খাবি দেখিস।”
তপ্ত নিঃশ্বাস ছাড়ল ঝুমঝুম। রিমঝিম ইতিমধ্যেই এগিয়ে যাচ্ছে সামনে। জুঁই ঝুমঝুমের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল,
“আচ্ছা ঝুমঝুম, এই “মাশা” আবার কে?”
খিলখিলিয়ে হেসে উঠলো ঝুমঝুম। শিশু সুলভ উচ্ছ্বাসে বলে,
“আমি। আসলে আমার ডাক নাম হচ্ছে মাশা। ওইযে মাশা এন্ড দ্য বেয়ার কার্টুন আছে না? ওইটাতে যে পিচ্চি মাশা আছে? আমি ওর বিশাল বড় ফ্যান। ছোট থেকেই ভালো লাগে, আমাকে কেউ ঝুমঝুম বলে ডাকলে সাড়া দেই না। ইচ্ছে করেই দেই না। কিন্তু মাশা বলে ডাকলেই এক দৌড়ে চলে যাই, তাই সবাই আমাকে মাশা বলে ডাকে। এরপর থেকেই ডাক নাম মাশা হয়ে গেছে।”
ঝুমঝুমের নামের ইতিহাস শুনে ফিক করে হেসে উঠলো জুঁই। আসলে দারুণ তো! চোখে একরাশ উচ্ছাস নিয়ে বলল,
“সত্যি দারুন তো। মাশা ডাকটা কিন্তু তোমার সাথে সত্যি যায়।”
ঝুমঝুম হাতের কব্জিতে থাকা ঘড়িটায় দৃষ্টি বুলিয়ে চিন্তিত ভঙ্গিতে বলল,
“চলো ভেতরে যাই।নয়তো ফু আম্মু বকা দেবে।”
জুঁই সম্মতিতে মাথা দোলায়। দুজনেই পা বাড়ায় সামনের দিকে।
একজোড়া চোখ যে আড়ালে থাইগ্লাসের ওপাশে মোহনিয়া চাহনিতে তার দিকেই চেয়ে আছে সে খেয়াল নেই মাশা আন্ড দ্য বেয়ারের বিশাল বড় ফ্যান ঝুমঝুমের।
সেই প্রখর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি তাকে অবলোকন করে পিয়াচিং করা ডান ভ্রু নাচিয়ে হিমশীতল কন্ঠে বলে,
“আই লাইক ইট বাট আই ডোন্ট লাইক ইট।”
জুঁই যখন ঝুমঝুমের সাথে হেঁটে ভেতরে যাচ্ছিল ওমনি পিছন থেকে কেউ একজন ওড়নার শেষাংশ টেনে ধরে তার। হকচকিয়ে গেল কন্যার হৃদয়। থমকে গেল হৃদস্পন্দন। যেই পিছন ফিরল ওমনি নজরে এলো কালো, সাদা বেশভুষায় দাঁড়ানো সুদর্শন পুরুষ।
তাকে দেখা মাত্রই নাক মুখ বিকৃত করে চাইল কন্যা।
ওমন বোচা নাক কুঁচকাতে দেখে না হেসে থাকতে পারলো না আব্রাহাম।
এমন সময় ঝুমঝুমের একনাগাড়ে ডাক পড়ছে। ঝুমঝুম আর এক মূহুর্ত বিলম্ব না করে ছুটে চলল অন্দরে।
এমনিতেই তারা বাদশাহর কাছে সে আজ নির্ঘাত বকুনি খাবে বান্ধবীর বাড়িতে থাকার জন্য।
জুঁইকে ফেলেই ভেতরে চলে গেল কন্যা।
ওদিকে পিছনে দাঁড়ানো আব্রাহামেথ এহেন উদ্ভট কান্ডে নাসারন্ধ্রের উপরিভাগ ফুলে উঠছে ক্ষণে ক্ষণে। ভ্রুদ্বয় আড়াআড়িভাবে কুঁচকে অসন্তোষ কন্ঠে বলে,
“এই, আপনি সবসময় আমার ওড়না টানাটানি করছেন কেন?”
ওই লাজুক রমণীর রাগান্বিত মুখশ্রী দেখে আব্রাহাম চোখ পাকিয়ে বলল,
“স্বামী হই। স্বামীর সাথে এ কেমন বেয়াদবি?”
‘স্বামী’ কথাটায় হৃদয় জুড়ে শিহরণ খেলে গেল কন্যার। বিস্ময়াবিভূত নয়নে তাকালো লোকটার দিকে।
আব্রাহাম ওড়না ছেড়ে হাত ঘড়িটায় দৃষ্টি বুলিয়ে ব্যস্ত কন্ঠে বলল,
“পাঁচ মিনিট দিচ্ছি তৈরি হয়ে এসো। আমরা বেরুবো।”
জুঁই অস্বস্তিতে গাট হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বেরুবে মানে? কোথায় যাবে তারা?
আব্রাহাম জুঁইকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ভ্রু নাচিয়ে শুধোয়,
“কি?”
জুঁই রিনরিনে গলায় বলল,
“আমরা কোথায় যাবো?”
আব্রাহাম কাঁধ নাচিয়ে আওড়াল,
“জাহান্নামে। চলুন দেরি হয়ে যাচ্ছে।”
এহেন প্রত্যুত্তরে ক্ষিপ্ত হলো রমণী। রাগে ফোঁসতে ফোঁসতে হনহন পদক্ষেপে ভেতরের উদ্দেশ্যে কদম ফেলে।
“ALPHA! ALPHA! ALPHA!”
দর্শকদের চেয়ার আপে মাতিয়ে তুলেছে স্টেজ।
সিউলের আকাশটা সেদিন যেন অন্যরকম এক রঙে রাঙানো আজ। শহরের ব্যস্ততা ছাপিয়ে চারপাশে শুধু একটাই নাম “টিম আলফা”। দূর-দূরান্ত থেকে আসা মানুষের ঢল নেমেছে কনসার্ট ভেন্যুর সামনে। কেউ এসেছে জাপান থেকে, কেউ এসেছে ইউরোপ থেকে, আবার কেউ শুধু কোরিয়ার অন্য প্রান্ত পেরিয়ে। সবার চোখে একটাই অপেক্ষা তাদের পছন্দের টিমের পারফরমেন্স। তাদের টিমের পারফরম্যান্স। ফ্যানদের চিৎকার করছে ক্ষণে ক্ষণে।
বিশাল স্টেডিয়ামের ভেতরে ঢুকতেই মনে হচ্ছিল যেন এক উৎসবের নগরী। চারপাশে নীল-সাদা লাইটের ঢেউ, হাতে হাতে গ্লোস্টিক, আর হাজারো কণ্ঠের উত্তেজিত গুঞ্জন।
স্টেজের পর্দা নামানো, কিন্তু ভেতরে প্রস্তুতি চলছে পুরোদমে। সাউন্ড চেকের মৃদু কম্পন স্টেডিয়ামের দেয়াল কাঁপিয়ে দিচ্ছে। ঠিক সেই মুহূর্তে ব্যাকস্টেজে দাঁড়িয়ে ছিল টিম আলফার সদস্যরা সবার মাঝখানে এক শান্ত অথচ তীক্ষ্ণ উপস্থিতি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে জুনেদ শয্য বাদশাহ। তার ঠিক সামনেই রয়েছে, মেহবুব, জিয়ান, হিউন জে।
তাদের চোখে অদ্ভুত এক স্থিরতা। বাইরে যতই হৈচৈ হোক, ভেতরে তারা নিজের জগতে ডুবে থাকা এক পারফেকশনিস্ট। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সে শেষবার নিজের স্টেজ লুক দেখে নিল একে একে। পাশেই টিম আলফার অন্য সদস্যরা নিজেদের মধ্যে শেষ মুহূর্তের সমন্বয় করছে কে কোন কিউতে ঢুকবে, কোন বিটে লাইট পাল্টাবে।
স্টেডিয়ামের ভেতর হঠাৎ আলো নিভে গেল।
এক সেকেন্ডের নীরবতা ভেঙে উচ্চ স্বরে শুরু হলো গর্জন।
“টিম আলফা! টিম আলফা! টিম আলফা!”
হাজারো গলার সেই ডাক যেন আকাশ ফাটিয়ে দিচ্ছিল। পর্দা ধীরে ধীরে উঠতে শুরু করল। প্রথমেই ভেসে উঠল বিশাল স্ক্রিনে নীল আ’গুনের মতো ভিজ্যুয়াল এফেক্ট, তারপর একে একে স্টেজে প্রবেশ করল সদস্যরা।
জুনেদ শয্য বাদশাহ স্টেজে পা রাখতেই পুরো স্টেডিয়াম যেন বিস্ফোরিত হলো আনন্দে।
প্রথম বিট পড়তেই সে নাচ শুরু করল নিখুঁত, শক্তিশালী, ভেতরে একধরনের আবেগ লুকানো। লাইট তার চারপাশে ঘুরছে, সে কোনো আলোর কেন্দ্রবিন্দু। ফ্যানদের চোখে তখন বিস্ময়, ভালোবাসা আর উন্মা’দনা মিশে এক হয়ে গেছে।
স্টেডিয়ামের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত মানুষের হাত নড়ছে, কণ্ঠ এক হয়ে যাচ্ছে। কেউ কাঁদছে, কেউ হাসছে, কেউ শুধু চিৎকার করে যাচ্ছে কারণ তারা জানে, এই মুহূর্তটা আর ফিরে আসবে না।
পারফরমেন্স এগোতে এগোতে পরিবেশ আরও তীব্র হয়ে উঠল। ড্রাম বিটের সাথে সাথে স্টেজের লাইটিং বদলাচ্ছে, ধোঁয়ার ভেতর দিয়ে প্রতিটি মুভমেন্ট নিখুঁতভাবে চালিয়ে যাচ্ছে।
গানের মাঝামাঝি এসে যখন সলো পারফরমেন্স শুরু হলো, তখন পুরো স্টেডিয়াম নিস্তব্ধ। সবাই শুধু তাকিয়ে আছে।
শয্যের দিকে তখন একা স্টেজের মাঝখানে দাঁড়িয়ে।
Oh I cannot explain
Every time it’s the same
Oh I feel that it’s real
Take my heart
I’ve been lonely to long
Oh I can’t be so strong
Take the chance for romance
Take my heart
I need you so
There’s no time I’ll ever go
Cary Cary lady
Goin through a motion
Love is where you find it
Listen to your heart
Cherry Cherry lady
শেষ বিট পড়তেই হঠাৎ লাইট ফেটে গেল সোনালি আলোয়।
স্টেডিয়াম আবার ফেটে পড়ল চিৎকারে।
এতক্ষন যাবত ল্যাপটপে লুকিয়ে লুকিয়ে সম্পূর্ণ পারফরম্যান্স দেখল ঝুমঝুম। ইশ্ মৃদু বিষ্ময়, গর্বে অন্তর পরিপূর্ণ হয়ে উঠছে। এটা তার ভাই ভাবতেই হৃদয় আনন্দে পুলকিত হয়ে উঠছে। অথচ তার বিপরীত প্রান্তে তীব্র হাহাকার তাকে ক্রমশ গ্রাস করে নিচ্ছে। যে মানুষটি কে সে ভাই বলতে চায়,সেই মানুষটি তাকে বোনের স্বীকৃতি দেয়নি।
ঝুমঝুম কম চেষ্টা করেনি তার বোন হয়ে উঠার। সেই আসার পর থেকে এই তিনটে বছর নানারকম ভাবে বিরক্ত করেছে ।এটেনশন পাওয়ার চেষ্টা করেছে শয্যের। বোন হয়ে উঠতে চেয়েছে। কিন্তু পারেনি।
বুকের ভেতর মোচড় দিয়ে ওঠে রমণীর। হৃদয়ে প্রশ্ন জাগল শয্য কেন আব্রাহামের মতো তাকে ভালোবাসে না? কাছে টানে না?
“মাশা,নিচে আয় দেখ ভাবি আর আব্রাহাম ভাইয়ের রিসেপশন পার্টি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। আয় আয়।”
রিসেপশনের কথা কর্ণ কুহুতে স্পর্শ করা মাত্রাই মেরুদন্ডের ব্যথা উপেক্ষা করে আলস্য ভঙ্গিতে বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ল ঝুমঝুম। ল্যাপটপটা ওভাবে ফেলেই ধীর গতিতে নিচে গেল।
ড্রয়িং রুমে এক ক্ষুদ্র সমাবেশের আয়োজন বসেছে। উপস্থিত আছেন রাজিব বাদশাহ, শাওন বাদশাহ, আব্রাহাম, জেসমিন বাদশাহ এবং তারা বাদশাহ। কনিষ্ঠ সদস্যদের মধ্যে করিডোরের একপাশে রিমঝিমের সঙ্গে দাঁড়িয়ে সবকিছু পর্যবেক্ষণ করছে জুঁই। তাদের সন্নিকটে এসে দাঁড়াল ঝুমঝুম।
অম্লান হাস্যে উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলে উঠল সে,
“ফাইনালি, একটা অনুষ্ঠান তো হতে চলেছে!”
ঝুমঝুমের উক্তিতে রিমঝিম কিছুটা সংশয়মিশ্রিত স্বরে বলল,
“হবে কি না জানি না। শয্য ভাইকে নিয়ে আলোচনা চলছে।”
রিমঝিম ও ঝুমঝুম প্রায় সমবয়সী। রিমঝিম বয়সে এক বছরের বড় হলেও, তাদের মাঝে গড়ে উঠেছে এক অদ্ভুত সখ্যতা।
“কাম ডাউন, রিমঝিম আপ্পি। ফু আম্মু ঠিকই রাজি করিয়ে নেবে, দেখিস।”
জুঁই নীরব, স্থির। ঠিক তখনই আব্রাহামের দৃষ্টি উপরের দিকে উঠল। মুহূর্তেই দু’জনের চক্ষু মিলিত হলো। কাজলকালো ডাগর নয়ন যুগল বিস্ময়ে স্থির হয়ে রইল তার দিকেই।
আব্রাহামের অধরে ফুটে উঠল এক কুটিল হাসি। তার মস্তিষ্কে যেন কোনো দুষ্টু কৌতুকের স্ফুলিঙ্গ জ্ব’লে উঠেছে। হঠাৎ ঠোঁটের ওপর দুই আঙুল স্থাপন করে, চোখ টিপে ইঙ্গিত করল জুঁইয়ের দিকে।
মুহূর্তেই মেয়েটি স্তম্ভিত! যেন সারা শরীরে বিদ্যুতের শিহরণ বয়ে গেল। হিমশীতল শিলাখণ্ডের মতো জমে গেল তার সমগ্র সত্তা। অন্তরে এক অজানা আবেগের প্রলয়ংকারী ঝড় বয়ে যেতে লাগল। হৃদয় জুড়ে এক অদ্ভুত শিহরণ ছড়িয়ে পড়ল। লজ্জায় দৃষ্টি নত করল রমণী, আঙুলে আঙুল জড়িয়ে নিল। মনে মনে উচ্চারিত হলো,
“কী নির্লজ্জ পুরুষ!”
এদিকে রাজিব বাদশাহ জেসমিন বাদশাহর দিকে তাকিয়ে গম্ভীর স্বরে বললেন,
“তোমার ছেলেকে বোঝাও, জেসমিন। দিন দিন সে বেপরোয়া হয়ে উঠছে।”
জেসমিন বাদশাহও সমান গাম্ভীর্যে জবাব দিলেন,
“আমার ছেলে উগ্র হয়ে ওঠার পেছনে যথেষ্ট কারণ রয়েছে। আই হোপ দ্যাট ডাজ়ন্ট নিড টু বি সেড এগেইন।”
স্ত্রীর সূক্ষ্ম বিদ্রূপ অনুধাবন করতে বিন্দুমাত্র দেরি হলো না রাজিব বাদশাহর। অতীতের সেই ভয়াবহ ভুলের মূল্য আজও দিতে হচ্ছে তাকে। একই ছাদের নিচে, একই ঘরে বসবাস করলেও, স্বামী-স্ত্রীর পবিত্র বন্ধন বহু আগেই ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে বারো বছর পূর্বেই। নিজের হাতেই তিনি ভেঙে ফেলেছিলেন সংসারের ভিত।
তাই তো আজ তারই রক্ত, তারই ছেলে জুনেদ শয্য বাদশাহ তাকে ‘বাবা’ বলে সম্বোধন করে না।
পরিস্থিতির নীরব সংঘাত অনুভব করে আব্রাহাম বলল,
“অলরাইট। আই উইল টক টু জুনেদ। আই হোপ হি ওন্ট রিফিউজ।’
আব্রাহামের কথায় আশ্বস্ত হলেন রাজিব বাদশাহ। অবশ্য জেসমিন বাদশাহ বললেই বেরোলো উগ্র ছেলেটা মানতে বাধ্য হবে। কিন্তু জেসমিন বাদশাহ এটা করবেন না।উনি চাননা ছেলে তার প্রতিটা কথা মানতে বাধ্য হোক।
আব্রাহাম কথাটা বলেই জায়গা ছাড়ল। ধীর গতিতে সিঁড়ি ডিঙিয়ে উপরে চলে এলো। ঝুমঝুম আর রিমঝিম গিয়ে জাপটে ধরল তাকে। রিমঝিম উচ্ছ্বাসের সাথে বলল,
“থ্যাংক ইয়্যু ভাইয়া। তুমি শয্য ভাইয়াকে রাজি করাবে বললে। নয়তো আমার মনে হয়েছিল তোমার আর ভাবির রিসেপশন পার্টি হবেই হবে।”
মেরিগোল্ড সেনোরিটা পর্ব ৩
আব্রাহাম বোনেদের কথায় স্বল্প হাসি উপহার দিলো।
ঝুমঝুম অন্যকিছু ভাবছে। এবার সে নিজের ট্যালেন্ট কাজে লাগিয়ে কে-পপ আইডলকে খুশি করতে দারুন কিছু করবে। অ্যাটলিস্ট লোকটা তাকে বোন হিসেবে গ্রহণ করুন এটুকুই চায়।
