Home মেরিগোল্ড সেনোরিটা মেরিগোল্ড সেনোরিটা পর্ব ৫

মেরিগোল্ড সেনোরিটা পর্ব ৫

মেরিগোল্ড সেনোরিটা পর্ব ৫
ফারহানা নিঝুম

সূর্য যখন দিগন্তের আড়ালে লুকিয়ে পড়েছে। আকাশ পৃষ্ঠে ছড়িয়ে আছে কমলা , গোলাপী আর বেগুনী রঙের ছটা।
শহরের বুক জুড়ে তখন একে একে জ্বলে উঠেছে আলোর মালা। যেন তারা ধীর গতিতে মাটিতে নেমে আসছে। এই সৌন্দর্যের বিপরীতে জুঁইয়ের অন্তলোক ঠিক ততটাই বিষন্ন বিপর্যস্ত।
পিহুর সাথে মাত্র ফোনে কথা বলল জুঁই। বিপন্নতায় ডুবে আছে হৃদয়। হৃদয়েরের প্রতিটি কোণায় কোণায় যেন ভোঁতা যন্ত্র’না অনুরণন। অশ্রুসজল নয়নদ্বয় অন্তর্দাহের সাক্ষী।

“জুঁই? কাঁদছো তুমি?”
ভরাট কন্ঠস্বরটা শ্রবণেন্দ্রিয়তে প্রবেশ করতেই শীর্ণ দেহটি সন্ত্রস্ত হরিণীর ন্যায় সঙ্কুচিত হলো। চট করে চোখের পানি মুছে ফেলল মেয়েটা।‌ সে এই মানুষটির সামনে প্রকাশ করতে চায়না ঠিক কতটা ভঙ্গুর!
আব্রাহাম ধীর পায়ে এগিয়ে এসে ঠিক পাশে দাঁড়ালো জুঁইয়ের। প্রশস্ত কপাল জুড়ে তার চিন্তার সূক্ষ্ম রেখা। অযাচিত এক কারণে সে চিন্তিত, তার মধ্যে এই কন্যার অশ্রুসিক্ত চোখ দুটো দেখে এক অদৃশ্য ব্যথা সঞ্চার করল বক্ষপিঞ্জরে। এই রমণীর তার বিবাহিত স্ত্রী। যেদিন কবুল বলেছে সেদিন থেকে তার সুখ দুঃখের ভার তার কাঁধে এসেই পড়েছে।
জুঁই স্বভাব সুলভ শান্ত কন্ঠে রিনরিনে গলায় বলল,
“না, কাঁদবো কেন?”
তার এই কৃত্রিম নির্লিপ্ততায় আব্রাহামের দৃষ্টি সঙ্কুচিত হয়ে এলো। বক্ষের উপর দু’হাত ভাঁজ করে, সে নিবিড় দৃষ্টিতে অবলোকন করল জুঁইয়ের সুশ্রী মুখাবয়ব।
“জুঁই, তুমি কি জানো, তুমি ভীষণ বোকা?”
প্রশ্নবিদ্ধ বিস্ময়ে তার নয়ন প্রসারিত হলো। বোকা? এই ব্যক্তি কি অকপটে তাকে বোকা আখ্যা দিল? ক্রোধে তার নয়নদ্বয় কিঞ্চিৎ কুঞ্চিত হলো।

“আমি বোকা?”
আব্রাহাম কাঁধ নাচিয়ে সম্মতি হ্যাঁ বলল। চোখ দুটো আরো বড় হলো জুঁইয়ের। লোকটা আবার হ্যাঁ বলছে? রাগের মাত্রা থরথর করে বাড়ছে কন্যার। কিছুটা অনমনীয় ভঙিতে বলল,
“কেন? আপনার কেন মনে হলো আমি বোকা?”
আব্রাহাম ঠোঁটের কোণে এক কুটিল হাসি ফুটিয়ে বলল,
“এই যে তোমার আমার বিয়ে হলো। তোমার স্বামী এখানে দাঁড়িয়ে আছে তাকে এভাবে একা পাচ্ছো। কই চুমু টুমু খাবে তা না করে চোখের জল ফেলছো? তাহলে তুমি বোকা নয়তো আর কি?”
লজ্জায় জুঁইয়ের ওষ্ঠো যুগল সামন্য বিচলিত হলো । বিষম খেলো মেয়েটা। বিস্ফারিত কন্ঠ ফুঁড়ে বেরিয়ে এলো,
“আপনি তো ভারী নির্লজ্জ দেখা যাচ্ছে! কয়দিন আগেও আমাকে চিনতেন না। সব ঠিক থাকলে আপনি আমার বোনের স্বামী হতেন। এই আপনি এখন কি-না এসব বলছেন?”
আব্রাহাম মৃদু কৌতুকে ভর করে সামান্য ঝুঁকে এলো তার দিকে। জুঁই তৎক্ষণাৎ পিঠ বাঁকিয়ে সরে গেল, যেন সামান্য দূরত্বই তার একমাত্র রক্ষা-কবচ। বিস্ফারিত নয়নদ্বয় প্রায় কোটর হতে উন্মুক্ত হওয়ার উপক্রম। নিম্নস্বরে আব্রাহাম বলল,

“এখন তো আর তোমার বোন আমার পত্নী নয়, জুঁই ফুল। তুমি-ই আমার স্ত্রী। আর মনে রেখো আমাদের এখনো বাসর রজনী বাকি। আগামীকাল রিসেপশন, আর রাত্রিতে আমাদের মিলনোৎসব। প্রস্তুত থাকবে, বোকা জুঁই।”
জুঁই পারল না তাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিতে। অত্যাশ্চর্যে স্তম্বিত হয়ে ওভাবেই রইল। লোকটার ছন্দে ছন্দে বলা কথায় বাকরুদ্ধ সে।
জুঁইকে এমন বিস্ময়াভিভূত দেখে পেট ফেটে হাসি আসছিল আব্রাহামের। মূলত সে মেয়েটার মন খারাপ দূর করতে চাইছিল। সে সফল। এখন পুরো রজনী কন্যা তাকে এবং তার কথা নিয়ে ভাববে।

খুব একটা বড়ও নয় আবার ছোট্ট নয় কক্ষটি। ল্যাম্পশেডের স্নিগ্ধ সুধাময় আলোকচ্ছটায় আবৃত কক্ষটি যেন অপার্থিব স্বপ্নলোকের আবরণ ধারণ করেছে। এ যেন রূপকথার কোনো স্বর্গীয় প্রাসাদ। সেখানে সৌন্দর্য নিজেই নতজানু। চারি পাশটা ম্যাজেন্টা এবং অফ হোয়াইটের মিলিত রঙে সজ্জিত হয়েছে পর্দাগুলো। বিছানার সাজসজ্জা থেকে শুরু করে সবকিছুতেই ম্যাজেন্টা কালারের উপস্থিতি রয়েছে। যেখানে সাধারণত তরুণীদের পিংক কালার পছন্দ। এ যেন এক পুতুলের রাজ্য। বিছানায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে মাশা অ্যান্ড দ্য বেয়ারের পছন্দের মাশা পুতুল গুলো।
তথাপি, এই সূক্ষ্ম নান্দনিকতার সমস্ত আয়োজন সবই ম্লান হয়ে পড়ে উপস্থিত রমণীর অপরূপ লাবণ্যের সম্মুখে। তার দেহভঙ্গিমার মাধুর্য এবং রূপের অলৌকিক সৌন্দর্য। যে কেউ মুগ্ধ হবে ওই সৌন্দর্যে। পরণে ছোট্ট মাশার পছন্দের ম্যাজেন্টা কালারের ফ্রক। ভেতরে ফুলহাতা টপ । সেইম কালারের মাথায় হুড দেওয়া। চুলগুলো ছেড়ে দেওয়া তার। কয়েক গাচ্ছি চুল বেরিয়ে এসেছে সামনের দিকে।

রুম জুড়ে রঙের ছড়াছড়ি। ক্লান্তি চোখ দুটো রক্তিম কৃষ্ণচূড়ার ন্যায় হয়ে আছে। পেইন্টিংয়ের তুলি,রঙ চারিদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। ক্লান্ত ঝুমঝুম নিদ্রাহীন রাত পার করছে আজ। সামনের ক্যানভাসে নিখুঁত ভঙ্গিতে এঁকে চলেছে কিছু একটা। পোর্ট্রেটটি সেই মানুষটিকে দিতে চায় যার মন জয় করতে উদগ্রীব হয়ে আছে রমণীর চঞ্চল অন্তরমহল। ছোটবেলা থেকেই পেইন্টিংয়ের প্রতি ভীষণ ভাবে আকৃষ্ট এই কন্যা। Art University তে পড়াশোনা চলেছে তরুণীর। সঙ্গে বিকেলের দিকে একটা স্টুডিওতে কার্টুন শোতে ভয়েস দিতে চলে যায়। ভয়েস আর্টিস্ট সে। আর রজনীতে বৃষ্টির সময় জানালার কাছে বসে উপন্যাসের বই নিয়ে বসে।

রুমের এককোণে ওইযে পছন্দের বুকসেলফটা রয়েছে। ওখানে নতুন পুরোনো,দেশি বিদেশি সবরকম উপন্যাসের বই রয়েছে। সবগুলো যত্ন করে রাখে কন্যা।
পরিবারের এত প্রতিপত্তি থাকা সত্বেও নিজের মতো করে নিজের ক্যারিয়ার তৈরি করতে ব্যস্ত এই কন্যা। সেও হতে চায় জুনেদ শয্য বাদশাহর মতো একজন সফল মানুষ।
চঞ্চল কাঠবিড়ালী পিউনিও এদিক সেদিক ঘুরঘুর করে আবার ফিরে এসে কাঁধের উপর বসে পড়েছে। ঝুমঝুম এসবে অভ্যস্ত। সে একটুও বিরক্ত হচ্ছে না।
“পিউনিও বেবি বলতো এই পোট্রেটা কেমন হয়েছে? পছন্দ হবে তো ওই উগ্র বেপরোয়া পুরুষের?”
কাঠবিড়ালীটা কাঁধে চুপটি করে বসে এদিক সেদিক তাকাচ্ছে।
এমন সময় হনহন পদেক্ষপ ফেলে ভেতরে এলো রিমঝিম। এলোমেলো,রঙের ছড়াছড়ি দেখে চমকে উঠে। সংশয় মিশ্রিত কন্ঠে বলল,

“এসব কি করছিস মাশা? এসব রঙ তুলি ছড়িয়ে রেখেছিস কেন?”
ঝুমঝুম আবেগে আপ্লুত হয়ে বলল,
“এই দেখ আপ্পি পোট্রেট? কেমন হয়েছে বল?”
রিমঝিম ক্যানভাসের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। চক্ষুদ্বয় বিস্ময়ে অভিভূত। সত্যি দারুন এই পোট্রেট একমাত্র মাশার দ্বারাই সম্ভব! রিমঝিম চওড়া বলল,
“কি সুন্দর হয়েছে এটা দেখতে! তুই তো টিম আলফা কে একদম নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তুলেছিস!”
এই সামন্য প্রশংসা বাক্য টুকু ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসির রেখা প্রস্ফুটিত করল ঝুমঝুমের। বিগলিত হয় হৃদয়।
“এবার তুই দেখিস আপ্পি।এই পোট্রেট যখন আমি শয্য ভাইয়ের হাতে দেব তখন ইউ ইউ উনি আমাকে বোন হিসেবে কাছে টেনে নেবেন। তাই না পিউনিও বেবি?”
কাঠবিড়ালীটা দৌড়ে এলো তার কাঁধের উপর। টুপ করে ঢুকে গেল টপের ভেতর দিয়ে। ওষ্ঠোদ্বয় আনন্দে প্রসারিত হয় কন্যার।‌ ব্যস্ত হয়ে পড়ে সে কাঠবিড়ালী পিউনিও কে নিয়ে।
ওদিক ক্রমশ চিন্তায় চিন্তায় অস্থির হচ্ছে রিমঝিম। সে ঝুমঝুমের মতো এত সাধারণ চিন্তা করতে পারেনা। অন্তত কে-পপ জুনেদ শয্য বাদশাহর বেলায় তো না-ই! ওই মানুষটা যে সহজ নয়। বড্ড জটিল। কাউকে আপন করে নিতে পারেনা সে। কাউকে না।

শাওয়ার সুইচ অন করে দিতেই ধারা ধারায় জল ধারা নেমে এলো। টুপটাপ শব্দে।
বলিষ্ট, পেশিবহুল দেহটি যখন শাওয়ারের নিচে স্থির হলো মূহুর্তে সে ভিজে গেল সর্বাঙ্গ। ঘাড়ের মাঝখানে খোদাই করা বাটারফ্লাই ট্যাটুটি জলের স্পর্শে।আরো গভীর,আরো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
দীর্ঘ সময় নিয়ে শাওয়ার শেষে অবশেষে বেরিয়ে এলো জুনেদ শয্য বাদশাহ। ফ্রেশ হয়ে গায়ে চাপালো একটা কালো রঙের ব্যাগি প্যান্ট আর ওভারসাইজ টিশার্ট পরে বেরিয়ে আসে। দরজার কাছাকাছি আসতেই মুখমণ্ডলের উপর এসে একটা কুশন পড়ল।
বিরক্তির সূক্ষ্ম রেখা ফুটে উঠল তার মুখ। কুঁচকে নিলো সে। সদ্য সমাপ্ত শো-এর ক্লান্তি তখনো শরীরে রয়েছে। বিশ্রামের পূর্বে এই অপ্রত্যাশিত উপহাস তাকে আরো ক্ষুব্ধ করে তুলল। ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে আসতে পারল না আর এই বেয়াদব গুলো তাকে টিজ করা শুরু করেছে। তপ্ত, নিগূঢ় এক নিঃশ্বাস বক্ষ চিরে বেরিয়ে এলো।
“কি হচ্ছে এসব?”

তার গম্ভীর, অনমনীয় কন্ঠস্বর শুনে হাসিতে ফেটে পড়ল উপস্থিত ছেলেগুলো। হাসির বিস্ফোরণে পুনরায় তপ্ত নিঃশ্বাস ছাড়ল শয্য। তাদের মধ্যে সোনালী কেশধারী যুবকটি বলল,
“ব্রো তোকে কি জন্মের সময় মধু খাওয়ানো হয়নি?
হিউন জে এর কথায় ক্ষিপ্ত হলো শয্য। ক্রোধের উষ্মা প্রকাশ পাচ্ছে। এমন সময় পিছন থেকে ঝড়ের বেগে জিয়ান দৌড়ে এসে কাঁধে ওঠে গেল শয্যের।
শয্যের বলিষ্ঠ দেহটি ভারসাম্য হারাতে লাগল।
জিয়ানের বলিষ্ঠ দেহের ভার সামলাতে গিয়ে হিমশিম খেলো শয্য। এই দুটোতে একত্রিত হলে শিশু সুলভ উচ্ছ্বাসে উদ্ভাসিত হয়। ফ্যান ফলোয়াররা তাইতো এই দুটোর জুটি খুব বেশি পছন্দ করে। অদ্ভুত ভাবেই প্রিয়।
শয্যকে তারা “খরগোশ” বলে ডাকতেই পছন্দ করে। আর জিয়ানকে? দু’জনের এই বন্ধুত্ব খুব বেশি পছন্দ ফ্যানদের।

“শয্য ব্রো তোর বাড়িতে যাবো আমরা।”
বাড়ি যাওয়ার কথা শুনতেই শয্য ভ্রু নাচিয়ে বলে ওঠে,
“এইজন্যই এতক্ষন ধরে তোরা ড্রামা করছিলি?”
শয্যের কথায় পাল্টা উত্তরে মেহবুব বলে ওঠে,
“ব্রো ব্রো অনেকদিন ধরে আন্টির সাথে দেখা হয়না। প্লিজ না করিস না। এইসব ফ্যান ফলোয়ার, সাইনিং সবকিছু নিয়ে হাঁপিয়ে উঠেছি। চলনা যাই।”
শয্য হেসে উঠল। এটাই তো তাদের জীবন। শতশত মানুষের আইডল সে।আর তাদের টিম হচ্ছে অনেকের প্রাণ।
শয্য জিয়ানকে পিঠে করে নিয়ে গিয়ে সোফায় ছুড়ে ফেলে দিলো। ঠোঁটের কোণে, স্নিগ্ধ, দৃঢ় হাসি প্রস্ফুটিত হয় ।

“ওকে ফাইন। যাচ্ছি আমরা। বাট মেহবুব তুই কিন্তু কোনো রকম কাহিনী করবি না বলে দিচ্ছি।”
মেহবুব সামান্য থমকে গেল! শয্যের সূক্ষ্ম ইঙ্গিত টুকু ঠিকই আঁচ করতে পেরেছে সে। কৃষ্ণবর্ণের চুলগুলোতে ব্যাকব্রাশ করে বলল,
“শুন শয্য, আমি টিম আলফার ক্যাপ্টেন। ডোন্ট ডিসঅ্যাপয়েন্ট মি লাইক দিস।”
টিম আলফার নেতৃত্ব তার কাঁধে, অথচ এই দলটিকে সামলানো মানে একদল অস্থির প্রাণকে নিয়ন্ত্রণে রাখা। হিউন জে, জুনেদ শয্য বাদশাহ, জিয়ান সবাই যেন একেকটি অনিয়ন্ত্রিত শক্তির প্রতিচ্ছবি। তবুও এই বিশৃঙ্খলার মধ্যেই এক অদ্ভুত স্নিগ্ধতা লুকিয়ে আছে।
শয্য ডোন্ট কেয়ার ভাব নিয়ে বলল,

“সো হোয়্যাট? লিডার হিসেবে অবশ্যই তোকে সম্মান করি ব্রো!”
জিয়ান হেসে হুটোপুটি খেয়ে কাঁধে ডলে পড়ল শয্যের। হাসতে হাসতে সে রীতিমতো শেষ হয়ে যাচ্ছে। হিউন জে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে আছে মেহবুবের দিকে। অতঃপর গগন ফাটিয়ে হা হা করে হেসে উঠল।
শয্য এক কোণে দাঁড়িয়ে ফোন বের করল। পাসওয়ার্ড খুলে নির্দিষ্ট ফোল্ডারে প্রবেশ করতেই তার দৃষ্টি স্থির হয়ে গেল।
এক স্নিগ্ধ, কোমল মুখাবয়ব নীরব দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা এক রমণী। তার চোখের অভিব্যক্তি অদ্ভুতভাবে জীবন্ত, উজ্জ্বল অথচ গভীর। শয্যের ঠোঁটে ফুটে উঠল এক ধীর, নিশ্চিত হাসি। সময়ের ব্যবধান যতই বাড়ুক, সে জানে গন্তব্য ধীরে ধীরে তার দিকেই এগিয়ে আসছে। সে যত দ্রুত তৈরি করছে ঠিক ততটাই কাছে চলে আসছে রমণী।
ওল্ফ কাটিং চুলগুলো পিছন থেকে টেনে অদ্ভুত রহস্যময় হাস্যচ্ছটা ঠোঁটের কোণে ছড়িয়ে বসে রইল শয্য।

প্রভাতের প্রারম্ভেই সুশোভিত সজ্জায় নিজেকে প্রস্তুত করে নিচে নেমে এলো ঝুমঝুম। টেবিলে ব্রেকফাস্ট দেওয়া হয়েছে।‌ সার্ভেন্টের অভাব নেই এই বাড়িতে। জেসমিন বাদশাহর নির্দেশে খাবার গুলো টেবিলে সাজিয়ে দেওয়া হচ্ছে। জেসমিন বাদশাহকে দেখা মাত্রই ঝুমঝুম দৌড়ে গেল তার কাছে। পিছন থেকে বাহু জড়িয়ে আবেগময় কন্ঠে বলল,
“ফু আম্মু, শয্য ভাইয়ার শো তো শেষ। সে কখন আসবে?”
জেসমিন বাদশাহ কিছুক্ষণের মধ্যেই অফিসে চলে যাবেন। ছেলেটা কাল রাতেই ফিরেছে ফেইরি ল্যান্ডে। কন্যার উচ্ছ্বাস লক্ষ্য করে মৃদু হাসলেন তিনি।
“ও তো রাতেই ফিরেছে। আমি একটু আগে ডেকে এসেছি। উঠছেই না ছেলেটা। আমাকে আবার অফিসে যেতে হবে।”

চিন্তিত কন্ঠে কথাগুলো বলল জেসমিন বাদশাহ। তার কথা শ্রবণেন্দ্রিয়তে প্রবেশ করতেই চক্ষুদ্বয় নক্ষত্রের ন্যায় উজ্জ্বল হয়ে উঠল ঝুমঝুমের। অন্তরে হঠাৎই উথলে ওঠে এক গোপন উল্লাস। তার মানে শয্য চলে এসেছে,তাকে পোর্ট্রেটটি দিয়ে সারপ্রাইজ করে দিলে কেমন হয়? বিস্ময় কন্যার হৃদয়ে আন্দোলন তুলছে।
আবেগে আপ্লুত হয়ে উঠল কন্যা। এমন সময় জেসমিন বাদশাহ উদ্বেগ্নি হয়ে বললেন,
“যা তো মাশা,তোর মা কে বল মামুনি ডাকছি।”
ঝুমঝুম ডানে বামে মাথা নেড়ে সম্মতি জানিয়ে ত্রস্ত পায়ে ছুটে গেল ছাদে।
সূর্য্যি মামা আজকে রাগ করেছেন তাই তো মেঘপুঞ্জের আড়ালে লুকিয়ে রেখেছেন আপন তেজস্ক্রিয় রশ্মি। মাঝে মাঝে উঁকি দিচ্ছে পরক্ষণেই আবার লুকিয়ে পড়ছেন। আবহাওয়া আজকে শীতল। ছাদে ভেজা কাপড় গুলো মেলে দিচ্ছেন একজন সার্ভেন্ট। তদারকি করে চলেছেন তারা বাদশাহ। বিড়বিড় করে আচ্ছা করে বকছেন সূর্য কে। আজকের দিনে যদি উনি জানতেন রোদ উঠবে না তাহলে কখনোই এতগুলো জামা কাপড় ধুতে দিতেন না। এখন এগুলো কখন শুকাবেন তিনি?
নূপুরের ছনছন শব্দ তুলে ছাদে উঠে এলো ঝুমঝুম। উৎকণ্ঠিত হয়ে বলে,

“আম্মু ,মামুনি তোমাকে ডাকছে। বলছে এখুনি নিচে যাওয়ার জন্য।”
ঝুমঝুমের কথায় কপাল কুঞ্চন করে তাকালেন তারা বাদশাহ। ঝুমঝুমের মা’কে মাত্রারিক্ত ভয় পায় সে। তিনি কখনোই ভালোবেসে কাছে টেনে নেয়নি তাকে। কিন্তু রিমঝিমের বেলায় অন্যরকম। মাঝেমধ্যে রিমঝিমের সঙ্গে রাতে ঘুমোতে অবধি যাবে অথচ ঝুমঝুম মাথায় একটুখানি হাত রেখে স্নেহ করেন না।
ঝুমঝুম স্ফীত স্বরে বলল।
“আমি ওনাকে বলে দিচ্ছি। তুমি যাও।”
তারা বাদশাহ বিনা প্রত্যুত্তরে চুপচাপ ছাদ থেকে নেমে গেলেন। ঝুমঝুম ওই অন্তর্ভেদি দৃষ্টি হতে বাঁচতে পেরে স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়ল।
গুটি গুটি পায়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এলো জুঁই। ভেতরে ভেতরে কুন্ঠায় কুন্ঠিত বোধ করছে রমণী।‌ উপস্থিত সকলকে সালাম দিলো মেয়েটা। রাজিব বাদশাহ মনে মনে ভীষণ সন্তুষ্ট বড় ছেলের বউ হিসেবে এত নম্র ভদ্র একটি মেয়েকে পেয়ে।

জেসমিন বাদশাহ কফির কাপ হাতে নিয়ে এগিয়ে গেলেন জুঁইয়ের দিকে। কাল সন্ধ্যায় ওদের রিসেপশন পার্টি, তারপরেই দুটো বাচ্চার সংসার জীবন শুরু হবে। ভেতরে ভেতরে ভীষণ স্বস্তি পাচ্ছেন এই ভেবে মামুনি হিসেবে এক ছেলের সংসার গুছিয়ে দিতে পেরেছেন তিনি। এখন উগ্র বেপরোয়া জুনেদ শয্য বাদশাহর জন্য একটা টুকটুকে পরী দরকার যার হাতে ওই বেপরোয়া ছেলেটার দায়িত্ব তুলে দিতে পারেন তিনি।
“জুঁই মা, এদিকে এসো।”
জুঁই ধীর পদক্ষেপে কিচেনের বনেটের কাছে গিয়ে দাঁড়ালো।
“জ্বি ,মামুনি।”
জেসমিন বাদশাহ মেয়েটার চিবুক ছুঁয়ে স্নিগ্ধ হাস্যে বললেন,
“যা তো মা,কফিটা আব্রাহামকে দিয়ে আয়।”
‘আব্রহামের কথা কর্ণ কুহুতে ধেয়ে আসতেই পায়ের তলায় শিরশির করে উঠল। হৃদয় স্পন্দন ত্বরান্বিত হলো। দুষ্টু লোকটা কাল এমন কিছু বলেছে যার দরুন নীশিথে আঁধারে মস্তিষ্ক জুড়ে ওই বাক্যগুলো ঘুরপাক খেয়েছে কন্যার।

মেরিগোল্ড সেনোরিটা পর্ব ৪

“আ.. আমি?”
“হ্যাঁ তুই। যা দিয়ে আয়,আর বল অফিসে কি যাবেনা নাকি? আমাকেও তো বেরুতে হবে।”
জুঁই না করতে পারল না। মৃদু পায়ে কাপটা নিয়ে এগিয়ে গেল সিঁড়ির দিকে। করিডোরে পিলারের আড়ালে দাঁড়ানো আব্রাহাম পুরো দৃশ্যটা অবলোকন করছিল। দৃশ্যটি দেখা মাত্রই দুষ্টু হাসির রেখা প্রস্ফুটিত হয় ওষ্ঠো পুটে। নিচে নামার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে এসেছিল সে। যেইনা দেখল জুঁই উপরে যাচ্ছে ওমনি বড়বড় কদম ফেলে ছুটে গেল নিজের কক্ষে। লাজুক জুঁইকে আরেকবার লজ্জার আবরণে আবৃত না করতে পারলে আজকের দিনটি তার কাছে অপূর্ণই থেকে যাবে।

মেরিগোল্ড সেনোরিটা পর্ব ৬