Home মোহশৃঙ্খল মোহশৃঙ্খল পর্ব ২১

মোহশৃঙ্খল পর্ব ২১

মোহশৃঙ্খল পর্ব ২১
মাহা আয়মাত

বিকেল ঘনিয়ে এসেছে। সামির আর ফারিদ কিছুক্ষণ আগেই চলে গেছে। হানিন আর মিষ্টিও এখন বের হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
মিষ্টি অর্তিহাকে জড়িয়ে ধরে বলে,
— চলে যাচ্ছি দোস্ত। ভালো থাকিস!
অর্তিহা মন খারাপ করে বলে,
— আজকের দিনটা থেকে যেতি?
— ৩ দিন হয়েছে এসেছি। আজকে না গেলে আমার মা বাবা লাঠি নিয়ে দৌড়াবে।
অর্তিহা এবার হানিনের দিকে তাকায়।
— তুই অন্তত থেকে যা?
হানিন ঠোঁটের কোণে অদ্ভুত হাসি নিয়ে বলে,

— আজকে যেতে দিতে চাচ্ছিস না কিন্তু একসময় আসবে যেদিন আমাকে তাড়াতে ব্যস্ত হয়ে পড়বি!
অর্তিহা আর মিষ্টি দুজনেই অবাক হয় হানিনের কথায়। মিষ্টি সন্দিহান দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে,
— পাগল হয়ে গেলি নাকি? কিসব বলছিস!
হানিন জোরে হেসে বলে,
— আমি তখনের কথা বলছি যখন আমি ওর কাছে ঘনঘন আসবো, তখন তাড়াতে ব্যস্ত হয়ে যাবে!
মিষ্টি হেসে মাথা নাড়ে,
— তুইও না!
অর্তিহা মৃদু হেসে বলে,
— আমিও জীবনেও তাড়াবো না! তুই আসবি! তুই আসলে উল্টো খুশি হবো আমি!
হানিন ভ্রু তুলে রহস্যময় হেসে বলে,
— আসবো তো আমি ঠিকই! আর তখন দেখবোও মুখে হাসি থাকে কিনা!
মিষ্টি বাম হাতে থাকা ঘড়িটা দেখে তাড়াহুড়ো করে বলে,
— আচ্ছা যাই অর্তি, দেরী হয়ে যাচ্ছে।
অর্তিহা মাথা নেড়ে বলে,

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

— আচ্ছা, সাবধানে যাস।
— ঠিক আছে। চল হানিন।
হানিন মিষ্টির দিকে তাকিয়ে হেসে বলে,
— তুই যা, আমি আসছি! আমার একটু অর্তির সাথে কথা আছে!
— আচ্ছা আয়, তুই নিচে ওয়েট করছি।
মিষ্টি রুম থেকে বের হয়ে চলে যায়। হানিন অর্তিহার সামনে এগিয়ে আসে। সে অর্তিহার গালে হাত রেখে নরম স্বরে বলে,
— অর্তি, নিজেকে শক্ত কর! এতো দুর্বল হলে চলবে না!
হানিন অর্তিহার গাল হাত সরিয়ে নেয়। অর্তিহার গলায় থাকা পেন্ডেন্টের দিকে তাকিয়ে হালকা, অদ্ভুত এক হাসি দেয়।
— জীবন এখনোও কৃতকর্মের শাস্তি দেয়নি!
অর্তিহা হতভম্ব হয়ে থমকে যায়। তার চোখে পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে, সে কিছুই বুঝতে পারেনি। সে হানিনের দিকে তাকিয়ে থাকে। হানিনের মুখে খুব শান্ত একটা হাসি।
— যাচ্ছি।

বলেই হানিন রুম থেকে বেরিয়ে যায়। আর পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা অর্তিহা এখনোও তার কথার অর্থ বুঝতে পারছে না। হানিন নিচে লিভিং রুমের কাছে আসতেই দেখে—আফির কারদার, নাজনীন কারদার, তাহিয়া কারদার আর আভীর কারদার– সবাই বসে কথা বলছেন। হানিনকে দেখেই তাহিয়া কারদার বলেন,
— চলে যাচ্ছো?
— হ্যা।
তাহিয়া কারদার হাসি দিয়ে বলেন,
— আবার এসো।
হানিন লিভিং রুমে উপস্থিত থাকা সকলের দিকে একবার তাকিয়ে হেসে বলে,
— ইনশাআল্লাহ।
আভীর কারদার হানিনকে প্রশ্ন করেন,
— বাসা কোথায় তোমার?
হানিন দৃঢ় গলায় উত্তর দেয়,
— নেই।
নাজনীন কারদার অবাক হয়ে বলেন,

— মানে?
হানিন নাজনীন কারদারের দিকে তাকিয়ে আগের মতোই উত্তর দেয়,
— আমি হোস্টেলে থাকি!
আভীর কারদার আবার জিজ্ঞেস করেন,
— বাবা কি করে?
— জানি না!
হানিনের কথা শুনে আভীর কারদারের ভ্রু কুচকে যায়। কপালে ভাজ ফেলে প্রশ্ন করেন,
— মানে?
— তার জগতে সে কি করছে, জানি না!
আফির কারদার প্রশ্ন করেন,
— মৃত?
হানিন আফির কারদারের চোখে চোখ রেখে বলে,
— আমাদের জন্য মৃতই!
নাজনীন কারদার প্রশ্ন করেন,

— তোমার পরিবারে কে কে আছে?
হানিন আগের মতোই দৃঢ় গলায় উত্তর দেয়,
— পরিবার নেই! আমি এতিম!
তাহিয়া কারদার উঠে এসে হানিনের মাথায় হাত বুলিয়ে স্নেহময় স্বরে বলেন,
— তুমি এতিম না! আজকে থেকে এটাই তোমার পরিবার! যখন ইচ্ছে আমাদের কাছে চলে আসবা!
হানিন বিপরীতে কিছু বলতে যাবে, ঠিক তখনি মিষ্টি সেখানে এসে বলে,
— চল না হানিন! এতোক্ষণ ধরে অপেক্ষা করছি তোর জন্য বাইরে!
হানিন মাথা নেড়ে বলে,
— হুম। আসি আন্টি।
মিষ্টিও হেসে বলে,
— আন্টি আসি!
তাহিয়া কারদার হাসি দিয়ে বলেন,

— ঠিক আছে, সাবধানে যেও দুজন।
হানিন আর মিষ্টি চলে যায়। তাহিয়া কারদার আবার আগের জায়গায় গিয়ে বসেন। তাহিয়া কারদার সোফায় বসতেই নাজনীন কারদার ভ্রু কুঁচকে বলেন,
— মেয়েটা তো বড় অদ্ভুত! কি অদ্ভুতভাবে প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছিলো!
আভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে শক্ত গলায় বলে,
— পরিবার নেই তাই বড়দের সাথে কিভাবে কথা বলতে হয় সেই শিক্ষাটাও পায়নি!
তাহিয়া কারদার মৃদুস্বরে বলেন,
— অদ্ভুত কোথায়? আমার তো মেয়েটাকে দেখে বরং মায়াই লাগছিলো।
আভীর বিরক্ত দৃষ্টিতে তাকায় তাহিয়া কারদারের দিকে।
— তোমার এমন রাস্তা-ঘাটে যাকে দেখো, তাকেই দেখে মায়া হয় কেন?
তাহিয়া কারদারের মুখটা মুহূর্তেই ফ্যাকাশে হয়ে যায়। চোখ দুটো নিচের দিকে নামিয়ে নেন। তা দেখে আফির কারদার বলেন,
— ছাড়ো বাহিরের মেয়ের কথা! আমরা আমাদের কথায় ফিরি!
ছাদ থেকে সিঁড়ি বেয়ে নেমে আদ্রিক যখন আরভিদের রুমের সামনে এসে পৌঁছায়, ঠিক তখনি কোথা থেকে যেন মেহজা এসে তার সামনে ছুরি ধরে। আদ্রিক দুই কদম পিছিয়ে বাঁকা হাসি দিয়ে বলে,

— হোয়াট দা ফাচ!
মেহজা ছুরি তাক করেই রাগী চোখে বলে,
— সাহস কি করে হয় আমার রুমে আড়ি পাতার?
আদ্রিক মনে করার ভান করে জিজ্ঞেস করে,
— কখন আড়িপাত লাম?
মেহজা আরও ক্ষেপে উঠে বলে,
— একদম নাটক করবেন না! নয়ত এই ছুরিটা একদম পেটে ঢুকিয়ে দিবো!
আদ্রিক হেসে বলে,
— পাগল নাকি? আমি কেন তোমার রুমে আড়ি পাতবো?
মেহজা ব্যাঙ্গ করে বলে,
— তাই? তাহলে আপনি জানলেন কিভাবে আমার সাইহান ভাইয়ের সাথে যোগাযোগ ছিলো?
আদ্রিক ঠোঁটে স্বভাবগত হাসি টেনে বলল,
— এই কারণে বলছো আমি আড়ি পেতেছি? শুনো, আমি মানুষকে দেখলেই তাদের মাইন্ড রিড করতে পারি! আমি দেখলে বুঝতে পারি কার মধ্যে আমার জন্য কেমন চিন্তা ভাবনা আছে! আর তোমার সাথে যে সাইহানের ভালো পিরিত আছে সেটাও দেখেই বুঝেছি!
মেহজা মুখ বাঁকিয়ে বলে,
— হুহ্! আসছে! উনি মিথ্যা বলবো আমি বিশ্বাস করবো! এইবার বেঁচে গেছেন কিন্তু নেক্সট টাইম আমার কথা আড়িপেতে শুনলে কেটে টুকরো টুকরো করে ফেলবো!
আদ্রিক পকেটে হাত ঢুকিয়ে মেহজার দিকে ঝুঁকে চোখ ছোট ছোট করে তাকিয়ে হেসে বলে,

— কসাই নাকি?
মেহজা দাঁতে দাঁত চেপে বলে,
— আপনাকে মারতে যদি কসাই হতে হয় তাহলে কসাইই হবো!
আদ্রিক না বোঝার ভান করে জিজ্ঞেস করে,
— কেন? আমি কি করেছি যে এতো ক্ষোভ?
মেহজা আদ্রিকের চোখে তাকিয়ে দৃঢ় কন্ঠে বলে,
— আমি আপনার সম্পর্কে সব জানি! আপনি কতটা খারাপ!
আদ্রিক বিস্ময়ের ভান করে বলে,
— সত্যি?
তারপর ঠোঁটে নিজের অভ্যাসগত হাসি টেনে বলে,
— কাউকে বলো না কিন্তু!
মেহজা রেগে বলে,
— আপনি অর্তির সাথে যা করেছেন….
মেহজার কথা কেটে দিয়ে আদ্রিক বাকা হেসে বলে,
— কিছু করিনি, রাতে ঘুমিয়ে গেছিলাম!
— লজ্জা করে না?
— সেটা তো অর্তি করবে!
মেহজার চোখে ঘৃণা ফুটে উঠে, জল চলে এলো।

— একটা মানুষ সত্যিই এতো খারাপ হয়? কিভাবে পারলেন ঐ নির্দোষ ছেলেটাকে মেরে ফেলতে?
আদ্রিক নির্লিপ্ত গলায় উত্তর দেয়,,
— আমার অর্তির দিকে হাত বাড়িয়ে ছিলো, তাই আমি ঠেলেঠুলে উপরে পাঠিয়ে দিয়েছি! এটা তেমন কঠিন না!
মেহজা হতবাক কন্ঠে বলে,
— আপনার মধ্যে একটুও অনুতাপ নেই?
আদ্রিক হেসে বলে,
— তোমার কসম, এক পিপড়া সমানও না!
মেহজা ক্ষোভে বলে,
— আপনার কি মনে হয় অর্তি আপনাকে ভালোবাসবে? জীবনেও না! আপনি অর্তির ভালোবাসার মানুষের প্রাণ নিয়েছেন! সেটা এই জনমে সে ভুলতে পারবে না!
আদ্রিক শান্ত গলায় বলে,
— ভালোবাসা আমি চাইও না! অর্তি আমার হয়ে থাকলেই হবে!
মেহজার গলার স্বর এবার নরম হয়ে আসে,

— “আপনি অর্তির জন্য এতোকিছু করলেন, অথচ মেয়েটার উপর একটু মায়া করলেন না! মেয়েটার মুখের হাসি কেড়ে নিয়েছেন আপনি! ওকে ভয় দেখিয়ে রাখা—এটাই আপনার চাওয়া?”
— তুমি বুঝবে না, ছোট মানুষ!
— আর আমার থেকে ছোট মানুষ অর্তি! তাকে তো ঠিকই ভয় দেখিয়ে বুঝিয়ে ফেলেছেন!
আদ্রিক হাসি দিয়ে বলে,
— এটা হচ্ছে স্বামীর আদর!
মেহজা ঘৃণাভরা চোখে বলে,
— ঘৃণা হয় আপনাকে দেখলে! একটা মানুষ কিভাবে এতো ভালো মানুষির মুখোশ পড়ে থাকতে পারে!
আদ্রিক আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গিতে বলে,
— সবাই পারে না! বাট আদ্রিক কারদার পারে!
— এতো কষ্ট অর্তিকে কেন দিচ্ছেন আপনি? আপনার কি একটুও কষ্ট হয় না অর্তির কষ্ট দেখলে?
আদ্রিক বাঁকা হেসে বলে,

— আমি কোথায় অর্তিকে কষ্ট দিলাম? আমি তো অর্তিকে অনেক আদর করি! সেই আদরেই তো তোমাকে মামী বানিয়ে দিচ্ছি!
মেহজা নিচুস্বরে বলে,
— ফালতু একটা!
বলেই ঘুরে করিডোর ধরে হাঁটা দিল। মিশানের রুমের দরজার সামনে এসে আবার ঘুরে পেছনে তাকায়। আদ্রিকও তার দিকে তাকিয়ে আছে। মেহজা তাকে একটা ভেংচি মেরে মিশানের রুমে ঢুকে পড়ে।
আদ্রিক হেসে মুখ ঘুরিয়ে বিড়বিড় করে বলে,
— ব্রেইনলেস ফেলো!
অর্তিহা বেডে আধশোয়া হয়ে বসে এখনো হানিনের শেষ কথাটা নিয়ে ভাবছে। সে কিছুতেই বুঝতে পারছে না হানিনের কথার মানে। কেনই বা বললো?অর্তিহার ভাবনার মাঝেই আদ্রিক রুমে প্রবেশ করে। কিন্তু অর্তিহার সেদিকে মনোযোগ নেই।
আদ্রিক টেবিলের উপর নিজের ফোন রেখে, অর্তিহাকে একা বসে কিছু নিয়ে ভাবতে দেখে ডাক দেয়,

— অর্তি?
অর্তিহা উত্তর দেয় না। সে ভাবনার মধ্যে ডুবে আছে।আদ্রিক এবার কাছে এসে অর্তিহার হাত ছুঁয়ে আবার ডাক দেয়,
— অর্তি?
অর্তিহা ভাবনার জগত থেকে বেড়িয়ে এসে হুড়মুড়িয়ে বলে,
— হুম হুম? কিছু হয়েছে?
— হুম হয়েছে তো!
— কি?
— সেটা তো তুই বলবি! কি নিয়ে ভাবছিস? কিছু হয়েছে?
অর্তিহা মাথা নেড়ে বলে,
— কই? কিছু হয়নি তো!
বলেই অর্তিহা উঠে বসে। আদ্রিক আর কিছু জিজ্ঞেস করে না। পা ফেলে বেড থেকে নামতে গেলে আদ্রিক প্রশ্ন করে,
— কোথায় যাচ্ছিস?
— চেঞ্জ করতে! সকাল থেকে এটা পড়ে রেখেছি! আর ভালো লাগছে না!
বলেই অর্তিহা ওয়াশরুমের দিকে চলে যায়। অর্তিহাকে ওয়াশরুমের দরজাটা বন্ধ করতে দেখে, আদ্রিক টেবিল থেকে ফোন তুলে পকেট থেকে এয়ারপডস টা বের করে কানে লাগিয়ে মোবাইলে কিছু একটা করে। স্ক্রিনে ভেসে ওঠে কিছুক্ষণ আগের অর্তিহা ও হানিনের কথোপকথনের ভিডিও। আদ্রিক ভিডিও চালু করে। চোখ সরু করে হানিনের দিকে তাকিয়ে থাকে। ভিডিও চলতে থাকে। কানে আসে হানিনের কণ্ঠস্বর,

— অর্তি, নিজেকে শক্ত কর! এতো দুর্বল হলে চলবে না!
হানিনের এই কথার পর মোবাইলে স্ক্রিনে সরাসরি হানিনের তাকানো ভেসে ওঠে। মনে হচ্ছে, হানিন সরাসরি আদ্রিকের দিকে তাকিয়ে আছে। মনে হচ্ছে,
হানিনের মুখে অদ্ভুত হাসিটাও আদ্রিকের উদ্দেশ্যেই। হানিনের শেষ কথাটা,
— জীবন এখনোও কৃতকর্মের শাস্তি দেয়নি!
এই কথাটা যেন ভিডিওটি যে দেখছে, তাকেই বলা হয়েছে। হানিনের চাহনি এবং শেষ কথায় আদ্রিকের চোখের প্রশ্ন ভাবটা সরে যায়। ঠোঁটে কোনা বেকে হাসি ফোটে। আদ্রিক বুঝতে পারে, অর্তিহার গলার পেন্ডেন্টে যে ক্যামেরা আছে, সেটা হানিন বুঝে গেছে। এবং হানিন কথাটা আদ্রিকের উদ্দেশ্যেই বলেছে।আদ্রিক মোবাইল স্ক্রিন বন্ধ করে হেডফোন খুলে হাসে। হাসির কারণ হানিন মেয়েটা সত্যিই চালাক। কারণ অর্তিহার পেন্ডেন্টে যে ক্যামেরা আছে, সেটা অর্তিহা এতোদিন ধরে পরে রাখার পরও জানে না।

আদ্রিক ক্যামেরা যুক্ত পেন্ডেন্ট টা অর্তিহাকে নজরে রাখার জন্য দিয়েছে। যাতে সে দূর থেকেও অর্তিহার উপর নজর রাখতে পারে। অর্তিহা যাতে দ্বিতীয়বার তাকে ধোঁকা দিতে না পারে। সাথে অর্তিহার সেফটির জন্যও। যদিও অর্তিহা বাহিরে গেলে আদ্রিকের লোক সবসময় তাকে দূর থেকে নজরে রাখে। কিন্তু এখন প্রশ্ন হচ্ছে হানিন কে? যে নিজে থেকে সামনে আসতে চাচ্ছে? সে কি নতুন শত্রু নাকি কোনো পুরাতন শত্রুরই নতুন গুটি?
কৌশালী এইমাত্র শাওয়ার নিয়ে বের হয়েছে। দুপুরে গোসল করতে পারেনি, কারণ সবাই মিলে আড্ডায় ব্যস্ত ছিল। তাই বিকেল পাঁচটার দিকে গোসল সেরে আসে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে টাওয়াল দিয়ে চুল মুছছিল ঠিক তখনই দরজায় টুকটুক করে নক শোনা যায়। কৌশালী চুল মুছা থামিয়ে দরজার দিকে এগিয়ে গিয়ে খুলতেই সামনে আরভিদকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে।
কৌশালী আরভিদকে দেখে খুশি হয়ে বলে,

— তুমি?
আরভিদ চোখমুখ শক্ত করে গম্ভীর কণ্ঠে জবাব দেয়,
— কাজ ছিলো!
কৌশালী দরজা খুলে পাশে সরে দাঁড়িয়ে বলে,
— ভেতরে আসো! ভেতরে কাজ কথা সবই করা যাবে!
আরভিদ ভেতরে না এসে বলে,
— প্রয়োজন নেই। দুমিনিটের কাজ বাহিরেরই শেষ হয়ে যাবে। এই নাও!
কৌশালী অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে,
— কি এটা?
আরভিদ স্বাভাবিক গলায় বলে,
— ফ্লাইটের টিকিট!
কৌশালী হতভম্ব হয়ে বলে,
— মানে? কিসের ফ্লাইটের টিকিট?
আরভিদ ঠান্ডা গলায় বলে,

— রাত ১ টার ফ্লাইটের টিকিট কাটা হয়েছে, ৮ ঘন্টা সময় আছে সবকিছু প্যাকিং করে সোজা বাড়ি চলে যাবে!
কৌশলী বিস্ময়ে বলে,
— কিন্তু কি করেছি আমি?
আরভিদ রাগে গর্জে ওঠে,
— আমার বাড়িতে থেকে আমার বউকে অপমান করতে চাওয়ার সাহস কোথায় পেয়েছো তুমি? তুমি ভাবছো তোমাকে আমি ছাড় দিবো? যেখানে আমি আমার ড্যাডকে পর্যন্ত ছাড় দেয়নি সেখানে তুমি কোথাকার কোন বাল!
কৌশালীর চোখে জল এসে পড়ে আরভিদের রাগ আর কথা শুনে। ভয়ও পায় প্রচন্ড,
— আরভিদ….
আরভিদ কঠোর গলায় বলে,

— তোমার কোনো প্রয়োজন নেই আমার বাড়িতে থেকে আমার বউয়ের সাথে গলা উঁচু করে কথা বলার!
কৌশালী কাঁপা কণ্ঠে বলে,
— তুমি কিন্তু আমাকে অপমান করছো!
— হ্যা করছি। তুমি এটাই ডিজার্ভ করো! আমার বউয়ের বিপরীতে দাড়ালে আমি তাকে টিকতে দিবো না সে যেই হোক!
কৌশালী কিছুটা দৃঢ় কন্ঠে বলে,
— আমি সত্যি টাই বলেছি তোমার বউকে!
আরভিদ তর্জনী আঙুল তুলে চোখ রাঙিয়ে বলে,
— সত্যি ভেবে চিন্তে বলবে! আমার বউয়ের ক্ষেত্রে সত্যি মিথ্যা, দোষী নির্দোষী কিছু দেখি না আমি! একদম উপড়ে ফেলবো! স্রোতের বিপরীতে টিকা মুশকিল কিন্তু আমার বউয়ের বিপরীতে গেলে জানে মরবা!
কৌশালী চোখে জল নিয়ে ক্ষোভে বলে,

মোহশৃঙ্খল পর্ব ২০

— আজকের এই অপমান টা আমি কখনো ভুলবো না!
আরভিদ রাগি চোখে তাকিয়ে বলে,
— না ভুলার জন্যই করেছি!
কৌশালী অবাক হয়ে বলে,
— এটা কিভাবে কথা বলছো তুমি আমার সাথে? এতো পরিবর্তন হয়ে গেছো?
— আমি সারাজীবন ই এমন ছিলাম! আমার স্ফট কর্ণার শুধু আমার বউয়ের জন্য!
এই কথা বলেই সে কৌশালীর হাতে টিকিটটি দিয়ে করিডোর দিয়ে হেঁটে চলে যায়। আরভিদ দৃষ্টির আড়ালে যেতেই কৌশালীর হাত কাঁপতে থাকে রাগে। টিকিটটা শক্ত করে চেপে ধরে সে দ্রুত রুমে ঢুকে দরজায় জোরে ধাক্কা দিয়ে তা বন্ধ করে দেয়।

মোহশৃঙ্খল পর্ব ২১ (২)