মোহশৃঙ্খল পর্ব ২২
মাহা আয়মাত
বাড়ির মেইন ডোরে একের পর এক কলিংবেল বেজে চলছে। সেই শব্দে আরভিদের ঘুম ভেঙে যায়। আরভিদ চোখ-মুখ কুচকে রেগে বসে ওঠে। সোফায় ঘুমানোর অভ্যাস না থাকায় সারারাত ঠিকমতো ঘুমোতে পারেনি। তাও ভোরের দিকে কিছুটা গভীর ঘুম হয় কিন্তু এখন কলিংবেলের শব্দে সেই ঘুম ভেঙে গেছে। প্রচণ্ড বিরক্তিতে আরভিদ একজন মেইডকে ডাকে।
মেইড আসতেই আরভিদ রাগী গলায় বলে,
— কি হয়েছে? কানে তুলা দিয়ে বসে আছো নাকি? এত কলিংবেল বাজছে, দরজা খুলছ না কেন?
মেইড ভয়ে দ্রুত বলে,
— সরি স্যার, এক্ষুনি খুলছি।
বলেই মেইড দ্রুত মেইন ডোর খোলে। ডোর খুলতেই ফারাবি হুড়মুড় করে ভিতরে ঢুকে। তার পেছনেই তাফসিরও ঢুকে। ফারাবি লিভিং রুম পার হয়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে যাচ্ছিলো তখন তাফসির লিভিং রুমে বসে থাকা আরভিদকে দেখে থেমে যায়।
তাফসির দ্রুত ফারাবিকে বলে,
— স্যার, এই যে মন্ত্রী স্যার এখানে!
ফারাবি ঘুরে তাকিয়ে আরভিদকে দেখে। ফারাবী তিন সিঁড়ি ওঠে গিয়েছিলো তাই দ্রুত নিচে নেমে আসে। তারপর ফারাবী আর তাফসির দুজনেই আরভিদের সামনে এসে দাঁড়াতেই ফারাবি উত্তেজিত গলায় বলে,
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
— স্যার, সর্বনাশ হয়ে গেছে!
আরভিদ বিরক্তির মাঝেই ভ্রু কুচকে জিজ্ঞেস করে,
— কি হয়েছে?
— স্যার, শিক্ষামন্ত্রীর মেয়ে তৃণা আপনার জন্য হারপিক খেয়ে ফেলেছে!
আরভিদ বিরক্তি নিয়ে বলে,
— ভালো করেছে! ওর চেহারাটা দেখতে এমনিতেও কমোডের মতো!
ফারাবি হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে থাকে আরভিদের দিকে। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা তাফসির কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে হঠাৎ জোরে হাসতে শুরু করে। তা দেখে আরভিদ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে,
— হাসলে আমাদের বাড়ির সব হারপিক তোমাকে খাইয়ে দেব!
তাফসির সাথে সাথে হাসা বন্ধ করে দেয়। আরভিদ উঠে দাঁড়ায়। পা বাড়িয়ে একটুখানি এগোতেই ফারাবি বলল,
— স্যার, আপনি কি তৃণা ম্যামকে দেখতে যাবেন না?
আরভিদ রাগে ফুঁসে ওঠে, দাঁতে দাঁত চেপে বলে,
— ঐ নাপিতের বাচ্চা, তৃণা তোর ম্যাম হলো কবে থেকে? তোর ম্যাম একমাত্র আমার বউ!
ফারাবি আতঙ্কে দ্রুত বলে,
— সরি সরি স্যার! ভুল হয়ে গেছে!
আরভিদ আরও রেগে বলে,
— তুই জীবনে কখনো সঠিক কিছু বলেছিস নাপিতের বাচ্চা?
বলেই আরভিদ সিঁড়ি বেয়ে উপরে চলে যায়।
তাফসির আরভিদকে চলে যেতে দেখে বলে,
— আজকে মন্ত্রী স্যার এত ক্ষেপে আছেন কেন?
ফারাবি শান্ত গলায় বলে,
— রাতে ম্যাম করতে দেননি।
তাফসির অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে,
— কিন্তু স্যার, আপনি জানলেন কীভাবে?
— যখন দেখবে কোনো বিবাহিত পুরুষ সকাল সকাল অকারণে কারোর উপর রাগ ঝাড়ছে, তখন বুঝে নেবে রাতে তাকে তার বউ করতে দেয়নি। আর সেটারই রাগ ঝাড়ছে অন্য কারোর উপর।
তাফসির মাথা নেড়ে বলে,
— বুঝলাম স্যার, এখন চলবেন?
— কোথায়?
— স্যার কাজে!
— এসেছি এত কষ্ট করে, নাস্তা করে যাই। আর এমনিতেও স্যারের অনুমতি ছাড়া চলে গেলে, স্যার চাকরি নট করে দেবেন।
— ঠিক আছে স্যার।
তারপর দুজনেই সোফায় গিয়ে বসে।
আরভিদ নিজের রুমের সামনে এসে দরজার হ্যান্ডেল ঘোরাতেই দরজাটা খুলে যায়। ভেতরে ঢুকেই দেখে, রুমের সবকিছু ঠিক গত রাতের মতোই আছে। ফুল দিয়ে সাজানো চারপাশ, টেবিলে রাখা খাবার, এমনকি ভাঙা বেডটাও ঠিক সেভাবেই পড়ে আছে। শুধু রুমটা ফাঁকা, মেহজা নেই রুমে। আরভিদ এগিয়ে গিয়ে কাভার্ড খুলে সাদা পায়জামা-পাঞ্জাবি আর ধূসর রঙের শাল বের করে। তারপর সেগুলো বেডের উপর রেখে ওয়াশরুমে ঢুকে ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে এসে সাদা পাঞ্জাবি-পায়জামা পরে অপেক্ষা করতে থাকে মেহজার জন্য।
প্রায় ১০-১৫ মিনিট কেটে গেল, তবুও মেহজার দেখা নেই। দীর্ঘশ্বাস ফেলে আরভিদ বেড থেকে শালটা তুলে গায়ে জড়িয়ে রুম থেকে বের হয়ে নিচে নামে ব্রেকফাস্ট করতে। আরভিদ ডাইনিং রুমে ঢুকতেই দেখে, সকলেই বসে আছে। মেহজাও আছে। মেহজা কড়া চোখে এমনভাবে তাকিয়ে আছে মনে হয় আরভিদকে পেলে জানে মেরে ফেলবে। আরভিদ বুঝতে পারে মেহজার রাগ এখনো কমেনি।
আরভিদকে দেখে ফারাবি হেসে বলে,
— আসেন আসেন স্যার, বসেন।
মেহজার থেকে চোখ সরিয়ে আরভিদের চোখ যায় ফারাবি আর তাফসিরের ওপর। আরভিদ মিশানের ডান পাশের চেয়ারটায় বসতে বসতে বলে,
— তোমরা দুইজন যাওনি?
ফারাবি হেসে খেতে খেতে বলে,
— চলে যেতাম, কিন্তু তাহিয়া ম্যাম জোর করলেন আপনাদের সাথে ব্রেকফাস্ট করতে। আর আমরা তো তার কথা অমান্য করতে পারি না।
আরভিদ কিছু বলে না। তাহিয়া কারদার হালকা হাসেন। আভীর কারদার বিরক্তি নিয়ে তাকিয়ে থাকেন ফারাবীর দিকে। কারণ ফারাবি মিথ্যে কথা বলছে। কিছুক্ষণ আগে আভীর আর তাহিয়া কারদার যখন ব্রেকফাস্ট করতে নামছিলেন, তখনি দেখেন ফারাবি আর তাফসির লিভিং রুমে বসে আছে। দুজনেই তাদের দেখে সালাম দেয়। আর তখনি তাহিয়া কারদার ব্রেকফাস্ট করার কথা বলেন। আর ফারাবিও সাথে সাথে রাজি হয়ে যায়, যেন ব্রেকফাস্টের জন্যই বসে ছিল। সবাই খেতে শুরু করে।
খাওয়ার মাঝেই আদ্রিক আরভিদকে জিজ্ঞেস করে,
— বেড কখন আনবি?
সঙ্গে সঙ্গে সবাই তাকায় আরভিদ আর আদ্রিকের দিকে। আভীর কারদার ভ্রু কুঁচকে বলেন,
— কিসের বেড?
আদ্রিক স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলে,
— আরভিদের বেড ভেঙে গেছে গতকাল রাতে!
মিশান অবাক হয়ে বলে,
— কখন ভেঙেছে? কাল তো জিজু আপির জন্য ক্যান্ডেল লাইট ডিনার এরেঞ্জ করেছিল!
মিশানের কথা শুনে টেবিলের পরিবেশ মুহূর্তে থমকে যায়। বড়রা অস্বস্তিতে চোখ নামিয়ে ফেলেন।আরভিদের গলায় খাবার আটকে যায়। মেহজা মাথা নিচু করে রাগে ফুঁসফুঁস করতে থাকে। মেহজা আরভিদ আর আদ্রিক দুজনের ওপর রেগে আছে।
আরভিদ টেবিলের দিকে তাকিয়ে লজ্জায়, নার্ভাস কন্ঠে বলে,
— আসলে কালকে রাতে…
আদ্রিক দ্রুত আরভিদকে থামিয়ে বলে,
— রিল্যাক্স আরভিদ! মেরিড কাপলের বেড ভাঙার রিজন আমরা জানতে চাই না!
আরভিদ দাঁতে দাঁত চেপে খুন করে ফেলবে এমন করে তাকায় আদ্রিকের দিকে। আদ্রিকের ঠোঁটে এক চিলতে দুষ্ট হাসি। অর্তিহা এতক্ষণ ধরে চুপচাপ বসে সব শুনছে। সে বুঝতে পেরেছে আদ্রিক ইচ্ছে করেই আরভিদকে বিরক্ত করছে। অর্তিহা আদ্রিকের দিকে তাকায়। আদ্রিকের ঠোঁটে হালকা হাসি। অর্তিহা কিছুতেই বুঝতে পারছে না, আদ্রিকের কি একটুও লজ্জা করছে না এসব বলতে? অথচ অর্তিহার এসব কথা শুনেই লজ্জা পাচ্ছে। আদ্রিকের কি লজ্জা বলে কিছু নেই?
মিশান আবার কৌতূহলী হয়ে বলে,
— কিন্তু কখন ভেঙেছে? ১০টার দিকে তো আপিলাকে আমিই রুমে দিয়ে এসেছি!
আদ্রিক বলে,
— ১২টা না ১টা, তখন ভেঙেছে। তাই না?
শেষের কথাটা আরভিদের দিকে তাকিয়ে বলে। আরভিদ অস্বস্তিতে বাম হাত দিয়ে ঘাড় চাপড়াতে থাকে।
মিশান বিস্মিত হয়ে বলে,
— রুমে দিয়ে আসার দুই ঘণ্টা পরই ভেঙে গেছে?
আদ্রিক চোখ ছোট করে আরভিদের দিকে তাকিয়ে বলে,
— জাস্ট দুই ঘণ্টা? বেশি কম হয়ে গেলো না?
আরভিদের চোখ লাল করে তাকায় আদ্রিকের দিকে। আরভিদের ইচ্ছে করছে ওঠে আদ্রিকের গলা টিপে ধরতে। মেহজার কান গরম হয়ে গেছে এসব কথা শুনে। টেবিলের সবাই অস্বস্তিতে নড়েচড়ে বসছে। অর্তিহার ইচ্ছে করছে লজ্জায় মাটিতে মিশে যেতে। অথচ আদ্রিক এমন ভাবে কথা বলছে যেন এগুলো স্বাভাবিক কথা!
ফারাবি আর তাফসির মুখ চেপে হাসছে। তাদের কথাই সঠিক হয়েছে। তাহলে আরভিদ সকালে এই কারণেই রেগে ছিলো।
মিশান আদ্রিকের কথা বুঝতে না পেরে আবার জিজ্ঞেস করে,
— কি কম হয়ে গেছে?
আস্মিতা বিরক্ত হয়ে বলেন,
— মিশান, চুপ করে দ্রুত খাও!
মিশান চুপ হয়ে যায়। খাবারের টেবিলে আবার নিরবতা জমে। সাথে অস্বস্তি আর লজ্জাও। অস্বস্তি কাটানোর চেষ্টা করে আভীর কারদার ফারাবিকে জিজ্ঞেস করেন,
— তুমি সকাল সকাল এখানে? কোনো কাজে এসেছিলে?
আভীর কারদারের কথা শুনে আরভিদ দ্রুত ফারাবির দিকে তাকায়। চোখের ইশারায় বলতে মানা করে। কিন্তু ফারাবি একবারের জন্যও আরভিদের দিকে তাকায় না। আরভিদের নিষেধ করাটাও দেখে না।
ফারাবী মন খারাপ করা গলায় বলে,
— স্যার, আইনমন্ত্রীর মেয়ে তৃণাকে তো চেনেনই?
তৃণার নাম শুনে আরভিদ হতাশ হয়ে বাম হাতের আঙুল দিয়ে কপাল চেপে ধরে। কারণ সে জানে, মেহজা যদি শুনে যে তৃণা তার জন্য হারপিক খেয়েছে, তাহলে মেহজা তাকে সন্দেহ করবে, ঝগড়া করবে। আর সেটাই হলো। তৃণার নাম শুনে মেহজার রাগ একটু সরে গিয়ে মুখে কৌতূহল ভর করে। তৃণার কথা এখানে কেন? মেহজা ফারাবীর দিকে উৎসুক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে বাকি কথাটা শুনার জন্য।
আভীর কারদার কিছু বলার আগেই আদ্রিক বলে ওঠে,
— হ্যা, হলুদের অনুষ্ঠানে আরভিদ যে মেয়েটার সাথে হেসে হেসে কথা বলছিল, সেই মেয়েটা না?
কথা শুনে আরভিদ চোখ বন্ধ করে। মনে মনে ভাবে, আজকে তাকে মেহজা মেরেই ফেলবে। এমনিতেই রাতের জন্য এখনো রেগে আছে তার ওপর এখন আবার তৃণা! আরভিদ চোখ খুলে আদ্রিকের দিকে তাকাতেই দেখে আদ্রিকের ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি। আরভিদ মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে, আজকে সে আদ্রিককে মেরেই ফেলবে! এদিকে মেহজা এবার পুরো ক্ষেপে গেছে। তৃণার সাথে আরভিদ হেসে হেসে কথা বলেছিল?
আভীর কারদার বলেন,
— হ্যা চিনি তো! এখন তুমি কেন এসেছো সেটা বলো।
ফারাবি বলে,
— আসলে তৃণা ম্যাম আরভিদ স্যারকে ভালোবাসেন। উনি স্যারকে বিয়ে করতে চান। উনি নাকি উনার বাবাকে বলেছেন যে উনি আরভিদ স্যারের দ্বিতীয় বউ হতে চান। কিন্তু উনার বাবা মানেননি। আর তাই তৃণা ম্যাম হারপিক খেয়ে ফেলেছেন।
মেহজা তীক্ষ্ণ চোখে আরভিদের দিকে তাকায়। আরভিদ সকলের অগোচরে না সূচক মাথা নাড়তে থাকে। মেহজা চোখের ইশারায় আরভিদকে বলে,
— রুমে গিয়ে দেখে নেব!
তারপর মেহজা খাবার টেবিল ছেড়ে ওঠে চলে যায়। হঠাৎ এমন চলে যাওয়া দেখে সবাই থমকে যায়। আরভিদও উঠে দাঁড়ায়।
তা দেখে তাহিয়া কারদার জিজ্ঞেস করেন,
— কি হলো? দাঁড়ালে কেন?
আরভিদ শান্ত গলায় বলে,
— আর খাবো না।
বলেই আরভিদও খাবার টেবিল ছেড়ে উঠে চলে যেতে লাগে। তখনি আদ্রিক ঠোঁটের কোনে নিজের অভ্যাসগত হাসিটা টেনে বলে,
— খেয়ে যা!
আরভিদ আদ্রিকের পাশ ঘেঁষে যেতে যেতে আস্তে দাঁতে দাঁত চেপে বলে,
— জীবনের শেষ খাওয়া খেয়ে নে!
বলেই চলে যায়। তাহিয়া কারদার কপাল কুঁচকে বলেন,
— ছেলেটার আবার কি হলো? না খেয়ে চলে গেল যে!
আভীর কারদার কিছুটা চাপা রাগে বিরক্ত কন্ঠে বলে,
— দেখোনি? বউ চলে গেছে! এখন তোমার ছেলেকে শিকল দিয়ে বেঁধেও রাখা যাবে না!
আভীর কারদারের কথা শুনে তাহিয়া কারদার আস্মিতা আর মাশরিফ তালুকদারের দিকে তাকান।দুজনই খাবার থামিয়ে চুপচাপ বসে আছে। আস্মিতার তালুকদারের মুখ পুরো ফ্যাকাশে। মাশরিফ তালুকদারের মুখ শক্ত হয়ে আছে। মাশরিফ তালুকদার বুঝতে পারেন, আভীর কারদারের মনে মেহজাকে নিয়ে এখনো রাগ জমে আছে। আভীর মেহজাকে কোনো দিনই মানবেন না। আজকের কথায় তা আরও পরিষ্কার।
এই থমথমে পরিস্থিতি ঠিক করতে তাহিয়া কারদার হেসে বলেন,
— কি হলো সবাই এমন চুপ করে বসে আছে কেন? মাসরিফ ভাই, আপনি খাচ্ছেন না কেন? আস্মিতা, তুমিও খাও?
মাসরিফ তালুকদার শান্ত গলায় বলেন,
— না ভাবি, আর ইচ্ছে করছে না।
বলে উঠে যাবেন ঠিক তখনি আভীর কারদার তাকে থামিয়ে দৃঢ় কন্ঠে বলেন,
— শোনো মাসরিফ! তোমার সাথে আমার সম্পর্ক শুধু বেয়াইনের না। তুমি আমার বোনের জামাইও। কিন্তু তুমি সেটা ভুলে যাও! সারাক্ষণ প্রথম সম্পর্কটাই মাথায় রাখো! দ্বিতীয় সম্পর্কটার তোমার কাছে কোনো মূল্যই নেই!
মাসরিফ তালুকদার দাঁড়িয়ে থেকেই গম্ভীর কণ্ঠে বলেন,
— ভুলে তো তুমিও যাচ্ছো, আমার মেয়েটা শুধু তোমার ছেলের বউ না। তোমার বোনের মেয়েও। কিন্তু তুমি সব সময় বোনের মেয়েকে ভুলে গিয়ে শুধু ছেলের বউ হিসেবে ধরো। আর সুযোগ পেলেই দোষ ধরার চেষ্টা করো।
বলেই মাসরিফ তালুকদার চেয়ার সরিয়ে চলে গেলেন। আভীর কারদার গম্ভীর মুখে আস্মিতার দিকে তাকান। আস্মিতা ভাইয়ের চোখে চোখ পড়তেই মাথা নিচু করেন। তাহিয়া কারদার দীর্ঘশ্বাস ফেলেন।
রোজ রোজ এমন অশান্তি আর ওনার ভালো লাগছে না।
আরভিদ রুমের দরজার সামনে এসে দাঁড়াতেই ভেতরে চোখ যায়। বেডের সাইড টেবিলের ওপর রাখা ফুলের ঝুড়িতে সাধারণত যে ছুরিটা থাকে, সেটা নেই। যা দেখেই বুঝে ফেলে ছুড়িটা আসলে কার হাতে পড়েছে। আরভিদ রুমে ঢুকে ঘাড় পাশে ফেরাতেই দেখে, সোফায় মেহজা বসে আছে। হাতে সেই ছুরি। মেহজা বেশ মনোযোগ দিয়ে ছুড়িটা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখছে। একটু পর মেহজা আরভিদের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলে,
— কি অদ্ভুত না? আমার জীবনের প্রথম খুনটা আপনিই হবেন!
আরভিদ চোখ বড় করে বলে,
— আস্তাগফিরুল্লাহ, আস্তাগফিরুল্লাহ!
মেহজা ছুরি ওপরে তুলে তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে প্রশ্ন করে,
— আগে বলুন, ছুরিটা গলায় চালাবো নাকি বুকে? ভাবছি কোনটা দিলে একবারেই কাজ হয়ে যাবে!
আরভিদ এগিয়ে এসে অসহায় চোখে বলে,
— আমি আবার কি করলাম? আমার ওপর কেন রাগ দেখাচ্ছিস?
মেহজা কড়া গলায় বলে,
— ঐ তৃণার সাথে হেসে হেসে কথা বলা হচ্ছিলো না?
— এসব আদ্রিক বানিয়ে বলেছে, তোকে রাগানোর জন্য!
মেহজা উঠে দাঁড়ায়।
— ওনি মিথ্যে বলছে না! ঐদিনই আমার সন্দেহ হয়েছিল। আজ তো পুরো নিশ্চিত হয়ে গেছি!
আরভিদ অবাক হয়ে বলে,
— আজ আবার কি করলাম?
মেহজা ছুরিটা হাতে ঘুরিয়ে বলে,
— আপনি কিছু করেননি। আপনার প্রিয় তৃণা করেছে! খুব প্রেম না? পেটে ছুরিটা ঠুস করে ঢুকিয়ে টুস করে সব প্রেম বের করে দেবো!
আরভিদ অসহায় গলায় বলে,
— মেহু, সত্যি বলছি, ঐ মেয়ের সাথে আমার কিছুই নেই!
মেহজা চোখ রাঙিয়ে বলে,
— আমাকে দেখতে তো বলদ লাগে তাই না? আপনার দিক থেকে কিছু নেই, আর ঐ মেয়ে আপনাকে বিয়ে করার জন্য হারপিক খেয়ে বসে থাকে?
আরভিদ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,
— আরে, ওর বাসার সব হারপিক এক্সপায়ার্ড হয়ে যাচ্ছিলো। তাই খেয়ে অপচয় বাঁচিয়েছে!
মেহজা চোখ রাঙিয়ে বলে,
— ফালতু কথা বলবেন না! রাগ লাগছে আমার! সত্যি বলেন, কি চলছে আপনাদের মধ্যে?
আরভিদ হতাশ কন্ঠে বলে,
— নিজের বউয়ের সাথেই এখন পর্যন্ত কিছু শুরু করতে পারলাম না, আরেক মেয়ের সাথে কি চলবে?
মেহজা চোখ সরু করে বলে,
— তাহলে তৃণা এমনি এমনি হারপিক খেলো?
আরভিদ নিষ্পাপের মতো চেহারাটা করে বলে,
— জান, সত্যিই কিছু নেই! বিশ্বাস কর!
মেহজা এবার কিছুটা বিশ্বাস করে। কিছুটা শান্ত হয়ে চোখ সরু করে বলে,
— এটা নাহয় বাদ দিলাম। কিন্তু আপনি যদি কালকে বেড না ভাঙতেন আর আপনার প্রাণ প্রিয় বন্ধুকে এসব না বলতেন, তাহলে আজ খাবার টেবিলে এত লজ্জা আর অপমান হতো?
আরভিদ চমকে বলে,
— ওয়েট! আমি আদ্রিককে কিছু বলিনি!
মেহজা রাগি চোখে তাকিয়ে বলে,
— আপনি না বললে সে জানলো কিভাবে?
— মেহু, আমি সত্যিই জানি না!
মেহজা বিরক্ত হয়ে বলে,
— আপনি কিছুই করেন না। কিছুই জানেন না। সবকিছু নাকি আপনাআপনি হয়ে যায়!
আরভিদ কপালে ভাজ ফেলে বলে,
— আমি কেন এসব পার্সোনাল কথা আদ্রিককে বলবো?
মেহজা একটু থেমে জিজ্ঞেস করে,
— সত্যিই বলেননি?
— না।
— তাহলে ওনি জানলো কিভাবে?
আরভিদ দাঁতে দাঁত চেপে বলে,
— সেটা তো ঐ সালাকে মেরে জিজ্ঞেস করবো!
মেহজা মুখ ফিরিয়ে বলে,
— ঠিক আছে, বিশ্বাস করলাম। এখন কান ধরে ওঠবস করেন!
আরভিদ ভ্রু কুঁচকে বলে,
— কেন?
— কাল বেড ভাঙার জন্য!
— তার জন্য তো কালকে রুম থেকে লাথি মেরে বেরই করে দিয়েছিস!
— ভালোই করেছি! এখন তাড়াতাড়ি কান ধরুন। না হলে আজ আপনার খবর আছে!
আরভিদ দীর্ঘশ্বাস ফেলে দরজার দিকে হাঁটতে থাকে। মেহজা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে,
— কোথায় যাচ্ছেন?
— দরজাটা লক করতে!
দরজা লক করে আরভিদ এসে দাঁড়ায় মেহজার সামনে। মেহজার হাতে এখনো ছুরি। আরভিদ অনুরোধের চোখে বলে,
— জান…
মেহজা ছুড়ি তাক করে বলে,
— শশশ! কোনো কথা না! তাড়াতাড়ি করেন!
আরভিদ বাম কান ধরে ওঠবস করতে যাবে, তখনি মেহজা বলে,
— হয়নি! দুই কান ধরে!
আরভিদ দুই হাতে দুই কান ধরে ওঠবস শুরু করে। দুইবার করার পর জিজ্ঞেস করে,
— হয়েছে?
মেহজা শান্ত গলায় বলে,
— সমান পঁচিশটা!
আরভিদ চোখ বড় বড় করে জোরে বলে,
— কি! কমর ব্যথা করবে!
— তাহলে এখন ৩০টা!
— মেহু…
— এখন ৩৫টা!
হতাশ হয়ে আরভিদ আবার ওঠবস শুরু করে। মেহজা চুপচাপ দাঁড়িয়ে দেখতে থাকে। ২৩ বার শেষ, আরভিদ ২৪তম জন্য নিচে বসবে, ঠিক তখনি দরজায় নক করার শব্দ হয়।
আরভিদ দুই কান ধরা অবস্থায় দরজার দিকে তাকিয়ে বলে,
— কে?
দরজার ওপাশ থেকে ফারাবীর গলা শোনা যায়,
— স্যার, আমি ফারাবী! আপনার সাথে একটু জরুরি কথা ছিল!
আরভিদ চোখে প্রশ্ন নিয়ে মেহজার দিকে তাকায়। সে যাবে কিনা এটা জানতে৷ মেহজা চোখের ইশারায় যাওয়ার অনুমতি দেয়। আরভিদ কান ছেড়ে দরজা খুলতে যাবে, ঠিক তখনি মেহজা বলে,
— এসে কিন্তু বাকি গুলো দেবেন!
আরভিদ মাথা নেড়ে আচ্ছা বলে দরজা খুলে বের হয়ে যায় রুম থেকে। ফারাবী আর তাফসির করিডোরে দাড়িয়ে আছে। আরভিদ রুম থেকে বের হয় রুমের দরজাটা লাগাতেই ফারাবী আস্তে বলে,
— স্যার? সায়েমকে পেয়েছি!
এই কথা শুনে আরভিদের মুখ মুহূর্তেই বদলে যায়। স্বাভাবিক চেহারা গম্ভীর হয়ে ওঠে। আরভিদ একবার পিছনে তাকিয়ে দেখে মেহজা শুনছে কিনা। তারপর নিচু স্বরে কঠিন মুখে জিজ্ঞেস করে,
— কোথায় পেয়েছো?
ফারাবীও নিচু গলায় বলে,
— স্যার, ধোলাইখালের এক পুরনো গলির ভাঙা বাড়িতে লুকিয়ে ছিল।
— ওর কাছে থাকা প্রমাণগুলো, কাউকে পাঠাতে পারেনি তো?
— না স্যার। সব প্রমাণ ওর কাছেই আছে। কাউকে পাঠায়নি!
আরভিদের মুখ শক্ত হয়ে যায়। চোয়াল শক্ত করে বলে,
— গাড়ি রেডি করো। ১০ মিনিটের মধ্যে বের হবো।
— ওকে স্যার।
— আর শুনো, আমার রুমে বেড লাগবে। ২ ঘণ্টার মধ্যে যেন আসে।
— ঠিক আছে স্যার।
আরভিদ মাথা অল্প নেড়ে বলে,
— আচ্ছা, এখন যাও।
ফারাবী আর তাফসির চলে যায়। আরভিদ দরজা খুলে রুমে ঢোকে। মেহজাকে বেডে বসে থাকতে দেখে। মেহজা ওঠে দাঁড়িয়ে বিরক্ত মুখে বলে,
— এতক্ষণ লাগে?
আরভিদ মৃদু হেসে মাথা চুলকে বলে,
— সরি জান।
— হয়েছে, এত জান জান না করে বাকি ওঠবস শুরু করেন!
আরভিদ আবার কান ধরে ওঠবস শুরু করে। দুবার করার পর মেহজা বলে,
— হয়েছে, আর লাগবে না।
আরভিদ থেমে কান ছেড়ে দেয়। তারপর এগিয়ে এসে মেহজাকে টেনে নিজের কাছে আনে। মেহজা চোখ কুঁচকে তাকায়।
আরভিদ নরম গলায় মুচকি হেসে বলে,
— ওঠবস তো করলাম! এখন একটু রাগ কমা।
মেহজা মুখ বাঁকায় কিন্তু কিছু বলে না। আরভিদ আবার বলে,
— আচ্ছা, বেশি কমাতে হবে না। একটু কমা। এখন বাইরে যাবো। একটা হাসি দে! তোর হাসিটা না দেখলে দিনটা খারাপ যাবে!
মেহজা বলে,
— কোথায় যাবেন?
আরভিদ মেহজার নাকে নাক ছুঁইয়ে বলে,
— একটা কাজ আছে।
মেহজা চোখ ঘুরিয়ে বলে,
— সে কাজ আপনি করুন। কিন্তু হাসি দিতে পারব না। মুখে আসছে না।
আরভিদ ঠোঁটের একপাশ উঁচু করে হাসে,
— তাহলে একটা চুমু দে? এটা তো না করিস নি!
মেহজা ভেংচি মেরে আরভিদকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে বলে,
— যান তো! এমনিতেই মেজাজ খারাপ! সারারাত সোফায় ঘুম, কোমর ব্যথা করছে!
আরভিদ দীর্ঘশ্বাস ফেলে আয়নার সামনে গিয়ে চুল ঠিক করতে করতে বলে,
— ২ ঘণ্টার মধ্যে বেড চলে আসবে। তখন ঘুমিয়ে নিস আরামে!
মেহজা তাকায় আরভিদের দিকে। সে বুঝতে পারে না, ধাক্কাটা দেওয়ায় আরভিদ কি রাগ করেছে? কারণ সাধারণত আরও কিছুক্ষণ চেষ্টা করে রাগ ভাঙাতে। তাহলে কি আজকে বিরক্ত হয়ে গেছে মেহজার প্রতি? ভাবতে ভাবতেই মেহজার মনটা খারাপ হয়ে যায়। কিছুক্ষণ আগেও মেহজার কাছে ভালো লাগছিল আরভিদের এমন রাগ ভাঙানো।
আরভিদ হাতে ঘড়ি পরে, বেড থেকে মোবাইল নিয়ে পাঞ্জাবির পকেটে রাখে। শালটা ঠিক করে গায়ে জড়িয়ে নেয়। তারপর মেহজার কাছে এসে মেহজার ডান হাতটা তুলে ধরে নরম করে একটা চুমু খায়। মুহূর্তেই মেহজার মনটা নরম হয়ে যায়। সে লাজুক চোখে তাকায় আরভিদের দিকে।
আরভিদ হেসে বলে,
— যাবো, ম্যাম?
মেহজার চেহারায় মুহুর্তেই মৃদু হাসি ধরা দেয়। হালকা স্বরে বলে,
— আচ্ছা।
আরভিদ দরজার দিকে যেতেই মেহজা পেছন থেকে বলে,
— সাবধানে যাবেন। আর
বলেই থেমে যায়। আরভিদ পেছন ফিরে হেসে বলে,
— তাড়াতাড়ি আসবো!
বিপরীতে মেহজাও হাসে। আরভিদও হাসতে হাসতে রুম থেকে বের হয়। নিচে লিভিং রুম পার হয়ে মেইন ডোরের কাছে যেতেই আভীর কারদার তাকে থামিয়ে বলেন,
— কোথায় যাচ্ছো?
আরভিদ থেমে ঘুরে আভীর কারদারের কাছে গিয়ে দাঁড়ায়।
— সায়েম কে পেয়েছি!
আভীর কারদার ভ্রু কুচকে জিজ্ঞেস করেন,
— কখন?
আরভিদ গম্ভীর কন্ঠে বলে,
— কিছুক্ষণ আগেই!
আভীর কারদার বলেন,
— প্রমাণগুলো কোথাও…
আরভিদ আভীর কারদারকে থামিয়ে বলে,
— না! সেই সুযোগ পায়নি!
— ওর কাছেই যাচ্ছো?
— হুম।
— শেষ করে এসো। কোনো প্রমাণ যেন না থাকে!
আরভিদ ঠান্ডা স্বরে বলে,
— শত্রুকে বাঁচাতে যাচ্ছি না, ড্যাড! আসছি।
আভীর কারদার মাথা নাড়েন। আরভিদ বাড়ি থেকে বের হয়ে আসে। বাইরে আগে থেকেই গাড়ি নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল তাফসির ও ফারাবী। আরভিদ আসতেই তারা গাড়ির পেছনের দরজা খুলে দেয়। আরভিদ বসে, তার পাশে ফারাবী। সামনে থাকে তাফসির।
ড্রাইভার গাড়ি স্টার্ট দেয়। গাড়ি চলতে শুরু করে। ধীরে ধীরে গাড়ি জনমানবহীন রাস্তা ধরে এগোতে থাকে। প্রায় দুই ঘণ্টা পর গাড়ি থামে জঙ্গলের মতো নির্জন একটি জায়গায়। তাফসির দ্রুত নেমে সামনে যায়। ফারাবী নেমে অন্য পাশে এসে দরজা খুলে দাঁড়ায়।
আরভিদ গাড়ি থেকে নেমে পাঞ্জাবিটা ঠিক করে নেয়। তারপর দুজনে হাঁটতে শুরু করে। পাঁচ মিনিট এগোতেই দেখা যায় পুরনো, একতলা, মাঝারি আকারের পরিত্যক্ত একটা ইটের বাড়ি। বাইরের সিমেন্টের দেয়াল কালচে দাগে ভরা। গেট খোলা ছিল। আরভিদ আর ফারাবী ভেতরে ঢোকে। ভেতরে ঢুকেই দেখে তাফসির একটা চেয়ার মুছে প্রস্তুত করছে। তাফসির চেয়ারটা এনে আরভিদকে বসতে দেয়। আরভিদ পায়ের ওপর পা তুলে বসে, ফারাবীর দিকে তাকিয়ে বলে,
— কতক্ষণ লাগবে ওদের আসতে?
ফারাবী বলে,
— এই তো স্যার, কল করছি।
সে ফোন বের করতেই হঠাৎ কয়েকজনের পায়ের শব্দ শোনা যায়। আরভিদ হাত তুলে ফারাবীকে থামায়।
— লাগবে না।
রুমে ঢোকে সাতজন ছেলে। তাদের ঘিরে মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে একজন, যার মুখ কালো কাপড়ে ঢাকা, হাত বাঁধা। তাকে সবাই শক্ত করে ধরে রেখেছে, যেন লোকটা পালাতে না পারে। তারা লোকটাকে ধাক্কা দিয়ে আরভিদের পায়ের কাছে ফেলে দেয়। লোকটা ব্যথায় আহ্ করে ওঠে। ওরা ছয়জন—মিজান, তানভীর, রাব্বি, রকি, শুভ, মাহিন—চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে।
আরভিদ লোকটার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বলে,
— মুখটা খুল!
মিরাজ এগিয়ে এসে কাপড়টা খুলে দেয়। লোকটার বয়স প্রায় ৩৫-৩৬। আরভিদকে দেখেই তার চোখে ভয় ভেসে ওঠে।
আরভিদ স্বাভাবিক কন্ঠে বলে,
— তোর খুব ইচ্ছে আমাকে ফাঁস করে দেওয়ার! তাই না, সায়েম?
গরমে ঘেমে থাকা সায়েম এবার আরো ঘেমে যায় ভয় ও টেনশনে। তারপরও নিজেকে শক্ত করে বলে,
— জনগণের টাকা মেরে খাচ্ছিস! তোকে ফাঁস করবো না?
আরভিদ ভ্রু কুঁচকে বলে,
— তাতে তোর এতো চুলকানি কিসে? তোর টাকা খাচ্ছি?
সায়েম বলে,
— আমার টাকা তো আছেই! শুধু আমার না, আমাদের দলের প্রতিটা নেতা কর্মীর টাকা মেরে খাচ্ছিস!
আরভিদ রেগে বলে,
— শুয়োরের বাচ্চা, তোদের টাকা থাকলে তো মেরে খাবো! তোদের থেকে ঢাকার প্রতিটা ভিক্ষুকের টাকা বেশি আছে!
সায়েম বলে,
— থাকবেই তো! আমাদের দলের মানুষরা তো আর তোদের দলের মতো দেশ লুটপাট করে খাচ্ছি না!
আরভিদ বলে,
— সুযোগ পাচ্ছিস না! নয়ত সালা তোরা রাস্তার মুচি থেকেও চাঁদা তুলে খেতি!
সায়েম রেগে বলে,
— আমাদের এসব বলার তুই কে? তুই সালা ভোট ছেপে ক্ষমতায় এসেছিস!
আরভিদ স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলে,
— আমি ছেপে ভোট নিছি! কিন্তু তোদের দলকেও তো কেউ ভোট দিত না!
— জনগণ যদি ভোট দেওয়ার সুযোগ পেতো, তাহলে আমাদেরই ভোট দিতো!
আরভিদ ব্যঙ্গ করে বলে,
— তোদের দলকে ভোট দেওয়া যদি বাধ্যতামূলক হতো, তাহলে দেশের জনগণ নিজের হাত কেটে ফেলতো!
আরভিদ থেমে আবার বলে,
— অনেক হয়েছে কথা! এবার পুরষ্কার বিতরণ করি?
সায়েমের চোখে ভয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
— কিসের পুরষ্কার?
হঠাৎ আরভিদ উঠে দাঁড়িয়ে সায়েমের বুকে লাথি মারে।
— তুই যে এতো কষ্ট করে আমার বিরুদ্ধে প্রমাণ জোগাড় করেছিস, সেটাই পুরষ্কার দিবো তোকে!
সায়েম ছিটকে দূরে গিয়ে পড়ে। আরভিদ মিরাজের দিকে হাত বাড়ায়,
— প্রমাণগুলো কই?
মিরাজ এগিয়ে এসে একটা ফ্ল্যাশ স্টোরেজ চিপ দেয়। আরভিদ সেটা হাতে নিয়ে সায়েমের কাছে গিয়ে এক হাটুতে ভর দিয়ে বসে সায়েমের চোয়াল শক্ত করে ধরে, হিংস্র চোখে তাকিয়ে বলে,
— এটা এখন খাবি!
আরভিদ চিপটা জোর করে সায়েমের মুখে ঢোকাতে থাকে। সায়েম মাথা নাড়িয়ে, মুখ সরিয়ে বাঁচার চেষ্টা করে কিন্তু পারে না। আরভিদ চোয়াল শক্ত করে ধরে আবার বলে,
— খা শুয়োরের বাচ্চা, এটা!
সায়েম মরিয়া হয়ে বলে,
— আমাকে ছেড়ে দে…
আরভিদ গর্জে ওঠে,
— এটা চিবিয়ে খা! নয়ত ছাড়বো না!
উপায় না দেখে সায়েম চিপটা চিবিয়ে গিলে ফেলে। খুব কষ্ট হলেও খেতে হয়, কারণ এছাড়া উপায় নেই। নয়ত আরভিদ তাকে চেপেই ধরে রাখবে। সায়েম গিলে ফেলতেই আরভিদ ওঠে সরে দাঁড়িয়ে ফারাবীর দিকে তাকায়। আরভিদের সেই তাকানোতে ফারাবী বুঝে যায় আরভিদ কী চাইছে। তাই ফারাবী দ্রুত নিজের কাছে থাকা আরভিদের বন্দুকটা এগিয়ে এসে আরভিদের হাতে তুলে দেয়। আরভিদের চোখ রাগে লাল হয়ে আছে। তার চেহারার কঠোরতা তাকে ভয়ংকর করে তুলেছে। তাকে দেখতে একদম হিংস্র জন্তু লাগছে। যার মাথায় খুন চেপে আছে! তবুও আশেপাশের সবাই একদম স্বাভাবিক। কারো চোখে কোনো ভয় নেই। কারণ তারা অভ্যস্ত আরভিদের এই ভয়ংকর রূপে।
আরভিদ বন্ধুক হাতে নিতেই সায়েমের প্রাণ হারানোর ভয় হয়। ভয়ে শরীর কেঁপে ওঠে। শরীরের প্রত্যেকটা পশম দাড়িয়ে যায়। সায়েম কেঁদে ওঠে,
— আমাকে মাফ করে আরভিদ! আমি তোর কাছে প্রাণের ভিক্ষা চাচ্ছি!
আরভিদ বন্দুক সায়েমের কপালের দিকে তাক করে শান্ত কিন্তু কঠোর স্বরে বলে,
— আমার সাথে লাগতে আসলে কোনো কুত্তার বাচ্চা জীবিত থাকবে না!
মোহশৃঙ্খল পর্ব ২১
এ কথা বলেই আরভিদ পরপর চারটা গুলি ছোড়ে সায়েমের মাথার বরাবর। সায়েম সঙ্গে সঙ্গে পিছন ঠেলে পড়ে যায়, নিথর হয়ে যায় পুরো শরীর।
আরভিদের মুখে তৃপ্তির হালকা একটি হাসি ফুটে ওঠে।
— আমাকে ধ্বংস করা অসম্ভব! তবুও কোনো শুয়োরের বাচ্চা সেই বৃথা চেষ্টা করলে, তাহলে তাকে এভাবেই দুনিয়া থেকে ঝেড়ে ফেলে দিবো!
