মৌটুসী পর্ব ১৯
ঋতস্বিনী মাহবিশ
খাওয়া-দাওয়ার পাট চুকে গেলে বিকেলের দিকে শুরু হলো খেলার আয়োজন। পাহাড়পুরের মনোরম প্রাঙ্গণে গোল করে কতকগুলো চেয়ার সাজানো হলো। সাউন্ড বক্সে গান বাজবে, আর গান থামার সাথে সাথে সবাইকে চেয়ার দখল করতে হবে। যে চেয়ার পাবে না, সে আউট। পরের রাউন্ডে আর একটা চেয়ার কমে যাবে। প্রতিটা ক্লাসের জন্য আলাদা আলাদা করে আয়োজন করা হবে।
প্রথমে ক্লাস ফাইভ, ফোর এভাবে ক্রমান্বয়ে বাচ্চারা খেলছে। তাদের ঘিরে গোল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে অন্য বাচ্চা এবং অভিভাবকরা। চড়ুই মৌটুসীর হাত ধরে দাঁড়িয়ে খুব মন দিয়ে সিনিয়রদের খেলা দেখছে। এবার মৌটুসী বলল, “চড়ুই পাখি, এভাবে খেলতে পারবে না?”
চড়ুই বেশ আত্মবিশ্বাসের সাথে ঘাড় নেড়ে বলল, “পারব তো! অনেক সহজ খেলা।”
“আচ্ছা মাম্মা, ভালো করে খেলতে হবে।”
চড়ুইয়ের কথা শুনে বোরাকের কোলে থাকা বীর বলল, “পাপা৷ আমিও খেলব?”
“অবশ্যই বাবা, তুমিও খেলবে।”
বড়দের রাউন্ড শেষ হওয়ার পর সবশেষে এবার চড়ুইদের ক্লাসের পালা এলো। নার্সারি ক্লাস হওয়ার কারণে বাচ্চাগুলো বেশ ছোট, তাই অনেকেই অংশগ্রহণ করতে ভয় পাচ্ছে। তবে চড়ুই দিব্যি উৎসাহ নিয়ে এগিয়ে এল, চড়ুইয়ের উৎসাহে উৎসাহিত হয়ে বীরও তার হাত ধরে এগিয়ে গিয়ে একটা চেয়ারে বসে পড়ল।
প্রথম রাউন্ড শুরু হলো। গান বাজার সাথে সাথেই সবাই উঠে দাঁড়িয়ে হেঁটে হেঁটে ঘুরতে লাগল। হঠাৎ—‘স্টপ!’ মিউজিক থেমে যেতেই হুড়োহুড়ি পড়ে গেল। চড়ুই চট করে একটা চেয়ারে বসে পড়ল। এদিকে বীর হঠাৎ সবাইকে হুড়মুড়িয়ে বসে যেতে দেখে অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল। ওর চোখদুটো ঘুরে ঘুরে পাপাকে খুঁজতে লাগল এবার। অথচ তার সামনের চেয়ারটা ফাঁকা পড়ে আছে। মৌটুসী চেঁচিয়ে বলল, “বীর! বাবা তোমার সামনের খালি চেয়ারটাতে বসে পড়ো।”
মৌটুসী আর বোরাককে দেখতে পেয়ে বীরের মধ্যে সাহস সঞ্চিত হলো যেন। সে তার সামনের ফাঁকা চেয়ারটাতে বসতে যাবে, ঠিক তখনই ওপাশ থেকে দৌড়ে আসা নীরব নামের একটা ছেলে পেছন থেকে ওকে ধাক্কা দিয়ে নিজেই সেটাতে বসে পড়ল।
ধাক্কা খেয়ে বীর টাল সামলাতে না পেরে আলতো করে পড়ে গেল মাটিতে। ঘটনার আকস্মিকতায় পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকা বোরাক-মৌটুসী দুজনেই হকচকিয়ে উঠল। পরক্ষণেই উভয়ই বিদ্যুৎ গতিতে ছুটে গেল সেদিকে।
“বীর!”
বীরকে তাড়াহুড়োয় ওঠাতে গিয়ে নোরাক মৌটুসীর দুজনের মাথার ওপরের দিকটা একে অপরের সঙ্গে বেশ সজোরে ঠুকে গেল। কিন্তু এই মুহূর্তে ব্যথার দিকে খেয়াল করার মতো অবস্থা তাদের কারোরই নেই।
বোরাক তৎক্ষণাৎ বীরকে মাটি থেকে পাঁজাকোলা করে তুলে নিল। কোলে উঠতেই ঠোঁট উল্টে কেঁদে দিল বীর, “পাপা.….ব্যথা দিয়েছে।” ছোট ছোট হাত দিয়ে বোরাকের জ্যাকেটের কলারটা খামচে ধরে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে সে।
বোরাক ছেলেকে শান্ত করতে করতে ভিড় ঠেলে বাচ্চাদের কোলাহল থেকে বেরিয়ে দ্রুত ফাঁকা একটা জায়গার দিকে এগিয়ে গেল। মৌটুসীও এল তাদের সাথে।
টিচাররা পরিস্থিতি আঁচ করতে পেরে দ্রুত তাদের দিকে এগিয়ে এলেন। খেলার মাঠের গোলমাল কিছুটা স্তিমিত হয়ে এল। নীতি উদ্বিগ্ন হয়ে বীরের পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল, “বীর বাবা কোথায় আঘাত পেয়েছে দেখি?”
“আঘাত তেমন পায় নি নীতি। মূলত ভয় পেয়েছে তাই কাঁদছে।”
অন্য একজন টিচার কিছুটা লজ্জিত হয়ে বললেন, “উই আর সরি মি. শিকদার। আসলে….”
বোরাক উনাকে থামিয়ে দিয়ে বিনয়ী কণ্ঠে বলল, “ইটস ওকে মিস। সমস্যা নেই। বাচ্চারা খেলতে গেলে একটু আধটু ব্যথা পাবেই, এটা স্বাভাবিক। আপনারা প্লিজ খেলা অব্যাহত রাখুন। বাচ্চারা খেলুক।”
টিচার মাথা নেড়ে বললেন, “ধন্যবাদ মি. শিকদার।”
চড়ুইও খেলা ছেড়ে তাদের পিছু পিছু এখানে চলে এসেছে। মৌটুসী ওর মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, “মাম্মা আর খেলতে হবে না, থাক।”
কিন্তু নাছোড়বান্দা চড়ুই। “না, আমি খেলবই। এসো।”
মৌটুসীর হাত ধরে ওকে টেনে নিয়ে এল চড়ুই।
টিচাররা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করে আবারো খেলা আরম্ভ করলেন। চড়ুই মনোযোগ দিয়ে খেলছে, তবে তার ছোট্ট মনে ঠিক কী চলছে তা কেউ জানে না। বোরাক আর এদিকে আসে নি। ও বীরকে নিয়ে বাইরের দিকে হেঁটে বেড়াচ্ছে। বীরের কান্না থেমে গিয়েছে। এবার সে বাবার কাঁধ থেকে মাথা তুলে বলল, “পাপা চুলুই পাখি খেলা কলছে?”
বোরাক ছেলের চোখের পানি মুছে দিয়ে বলল, “হ্যাঁ বাবা, চড়ুই পাখি খেলা করছে।”
“আমি খেলা দেখব। ওখানে চলো।”
“আচ্ছা চলো।”
বোরাক বীরকে নিয়ে খেলার কাছে এসে দাঁড়াল।
দশম রাউন্ড। আর মাত্র তিনজন বাকি। চড়ুই, রাহুল আর নীরব নামের ছেলেটা। চেয়ার মাত্র দুটো, তা ঘিরে ওরা তিনজন ঘুরছে। এবার চড়ুইয়ের সামনে সামনেই হাঁটছে নীরব।
স্টপ!
কোনো দ্বিধা-জড়তা নয়। সরাসরি লক্ষ্যে অগ্রসর হলো চড়ুই। সামনের চেয়ারটাতে নীরব চট করে বসতে যাবে, তার আগ মুহূর্তেই দুই হাতে ওকে সজোরে ধাক্কা দিল চড়ুই। নীরব টাল সামলাতে না পেরে ধপাস করে নিচে পড়ে গেল। আর চড়ুই একটা বিজয়ী হাসি হেসে চেয়ারটিতে বসে পড়ল।
নীরবের বাবা-মা তৎক্ষনাৎ ছুটে এলেন ছেলের দিকে। ইতিমধ্যেই ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে কান্না জুড়ে দিয়েছে নীরব। উনারা ওকে উঠিয়ে কোলে তুলে নিলেন। বোরাক বীরকে মৌটুসীর কোলে দিয়ে সেদিকে এগিয়ে গেল। ভালোই ব্যথা পেয়েছে ছেলেটা, উচ্চস্বরে কাঁদছে। নীরবের বাবা রাগান্বিত হয়ে প্রথমে একটু চিল্লাপাল্লা করলেন। উপস্থিত টিচাররা উনাকে বুঝিয়ে শান্ত করলেন, এখানে সবাই ছোট বাচ্চা, খেলতে গেলে এমন পরিস্থিতি আসেই। এছাড়া একটু আগে উনার ছেলেও তো এই একই কাজ করেছে!
হঠাৎ পরিবেশ থমথমে হয়ে এল। টিচাররাও বিরক্ত, তবে তা প্রকাশ করে কাউকে কিছু বলতেও পারছেন না তারা।
বীর মৌটুসীর কাঁধে মাথা এলিয়ে চুপচাপ সব দেখছে। এদিকে মৌটুসী হা করে মেয়ের দিকে তাকিয়ে। হালকার উপর ঝাপসা করে নিজেরই ছোটবেলার একঝলক ছায়া যেন সে চড়ুইয়ের মাঝে দেখতে পেল। মেয়েটা একেবারে তার নিজেরই খাঁটি ফুলকপি চাষ করছে নিজের মধ্যে। না মানে বেছে বেছে তার কুখ্যাত জিনটাই পেতে হলো মেয়েকে?
আর মাত্র এক রাউন্ড বাকি। চড়ুই আর রাহুল উভয়কেই বুঝিয়ে বলা হলো, এবার যে ধাক্কা দিবে সে আউট অর্থাৎ দ্বিতীয় হবে। আর অপরজন উইনার হয়ে যাবে। তাই ধাক্কা দেওয়া যাবে না।
গান চালু হলো। রাহুল আর চড়ুই চেয়ারটাকে কেন্দ্র করে ঘুরছে। এক মিনিটের মাথায় চড়ুই চেয়ারের অপর প্রান্তে, তখনই গান স্টপ হয়ে গেল। চড়ুই এপাশ থেকে যাওয়ার আগেই রাহুল চট করে বসে গেল চেয়ারটায়। সাথে সাথেই চারদিক থেকে করতালির আওয়াজ ভেসে আসতে লাগল। রাহুল বিজয় বেশে বুক ফুলিয়ে চেয়ারে পায়ের উপর পা তুলে বসল। চড়ুইয়ের দিকে তাকিয়ে হালকা সুরে মিষ্টি একটা হাসি দিয়ে বলল, “মন খারাপ করো না কিউটি। আমার প্রাইজটা আমি ভালোবেসে তোমাকেই দিব। কেমন?”
ছোট্ট চড়ুই গোমড়া মুখে তাকিয়ে আছে রাহুলের দিকেই। তখনই বোরাক এসে ওকে কোলে তুলে নিল। হাসিমুখে বলল, “ব্রাভো স্পেরো। অনেক ভালো খেলেছে আমাদের চড়ুই পাখি।”
চড়ুই ঠোঁট উল্টে মলিন মুখে বলল, “উইনার হতে পারি নি, পাপা!”
“তাতে কী? রানার আপ তো হয়েছে! আর কেউ পেরেছে তোমার মতো রানার আপ হতে? দেখাও তো দেখি।”
প্যাস্টেল সফট থিম নিয়ে ডেকোরেটেড একটা চোখ ধাঁধানো সুন্দর রুম, ঘরের দেয়াল থেকে আসবাবপত্র সব কিছুই বেবি পিংক আর হোয়াইট কালার কম্বিনেশনে সজ্জিত। ঘরের কোণে রাখা আর্টিফিশিয়াল প্ল্যান্টগুলোর ফাঁকে ফাঁকে গোল্ডেন ফেয়ারি লাইটগুলো মৃদু আলোয় ঝকমক করছে।
ভ্যানিটি টেবিলের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে কার্লি আয়রন দিয়ে চুল সেট করছে আরোয়া। পরনে তার স্কিনি প্যান্টের সাথে ব্ল্যাক জর্জেট টপ, মুখে মানানসই হালকা মেক-আপের আস্তরণ। সোজা চুলগুলোকে হালকা ঢেউ খেলিয়ে পিঠে ছড়িয়ে দিতেই চেহারায় এক অন্যরকম আভিজাত্য ফুটে উঠল যেন। ড্রয়ারের লিপস্টিক কালেকশন থেকে একটা ডার্ক শেডের লিপস্টিক বের করে মোলায়েম ঠোঁট দুটো রাঙিয়ে নিল সে। আয়নায় নিজের লুকটা শেষবার খুঁটিয়ে দেখতেই ঠোঁটে তৃপ্তির এক চিলতে হাসি ফুটল তার। দুই পা পিছিয়ে মেঝের উপর থেকে তিন ইঞ্চি হাই হিল জোড়া তুলে নিয়ে দুই পায়েই পরে নিল। এরপর বিছানার উপর থেকে বেবি পিংক জ্যাকেট আর স্লিং ব্যাগটা তুলে নিয়ে হিলের গটগট শব্দ তুলে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এল তরুণী।
ড্রয়িং রুমের সোফায় বসে ছেলেকে সিরেলাক খাওয়াচ্ছে আশা। সামনের বিশাল পর্দার টিভিতে একটা কার্টুন সিরিজ চলছে। সেটার দিকে দৃষ্টি রেখে থেমে থেমে খাবার মুখে তুলছে ছোট্ট ভুবন। সিঁড়ি বেয়ে নামতে থাকা আরোয়ার হিলের শব্দ কানে আসতেই আশা ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল। এই অসময়ে আরোয়ার এমন সাজগোজ দেখে ভ্রু কুঁচকে উঠল তার। আরোয়া কাছে আসতেই জিজ্ঞেস করল, “কোথায় যাচ্ছিস?”
“তোমাকে তখন বললাম না, আমার ফ্রেন্ডের জন্মদিন। ওই পার্টিতে যাচ্ছি।”
“তোকে না ভাইয়া ফ্রেন্ড সার্কেল থেকে বেরিয়ে আসতে বলেছে!”
“এটা ওই সার্কেলের কোনো ফ্রেন্ড না, এটা আমার মেয়ের বেস্ট ফ্রেন্ড। ও অনেক ভালো। নাম তো মনে হয় শুনেছ ‘জেবা’।”
“আচ্ছা বুঝলাম, কিন্তু আর আধা ঘণ্টা পরই তো সন্ধ্যা নামবে!”
আরোয়া চোখ পাকিয়ে বিরক্ত নিয়ে বলল, “অহ! বার্থডে পার্টি তো সন্ধ্যাতেই হয় আপু। নাকি আমার একার জন্য তারা দুপুরে পার্টি অ্যারেঞ্জমেন্ট করত?”
আশা বুঝল বোনকে এখন কোনোভাবেই আটকানো যাবে না। তাই সে কথা না বাড়িয়ে ফোনটা হাতে নিয়ে সাফওয়ানকে ডায়াল করল। ওপাশ থেকে রিসিভ হতেই বলে উঠল, “হ্যালো সাফওয়ান, কই আছিস তুই?”
“বাড়িতে আপু। কেন, আসতে হবে?”
“হুম, দ্রুত আয়।”
“আচ্ছা আপু যাচ্ছি।”
আশা ফোন রাখতেই আরোয়া অধৈর্য হয়ে বলল, “আমি এবার যেতে পারি আপু?”
“একটু বস। সাফওয়ান আসুক আগে।”
“ওর সাথে আমার যাওয়ার সম্পর্ক কী?”
“ও সাথে যাবে।”
“মানে কী আপু? আমি কি এখনো বাচ্চা? আমি এখন টুয়েন্টি প্লাস।”
“এত কথা কেন আরোয়া? সাফওয়ান গেলে কি কোনো সমস্যা? ফ্রেন্ডের পার্টিতেই তো যাচ্ছিস।”
কী আর করার? এখন পার্টিতে যেতে হলে সাফওয়ান নামক লেজটাকে পেছনে বেঁধে নিয়েই যেতে হবে। রাগে ফোসফোস করতে করতে সোফায় এসে বসল আরোয়া। বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর সাফওয়ানের দেখা না মেলায় সে আরও বিরক্ত হয়ে বলল, “কোথায়, তোমার সোনার সোহাগা ভাই কোথায়?”
“আসছে। মুখ দিয়ে বললেই তো আর উড়ে আসতে পারবে না, একটু দেরি হবেই।”
তখনই গেট দিয়ে প্রবেশ করল সাফওয়ান। এগিয়ে এসে ভুবনকে কোলে তুলে আদর করতে লাগল।
আশা বলল,
“আরোয়া ওর ফ্রেন্ডের বার্থডে পার্টিতে যাবে, ওকে নিয়ে যা সাফওয়ান।”
“আচ্ছা।” সম্মতি দিয়লই সাফওয়ান আরোয়ার দিকে তাকাল। আরোয়া ততক্ষণে উঠে দাঁড়িয়েছে। সাফওয়ান ইশারায় বলল, “চলো।”
আরোয়াদের এগিয়ে দিতে আশা মেইন গেট পর্যন্ত এলো। সাফওয়ান গ্যারেজ থেকে গাড়ি বের করে গেটের কাছে আনতেই আরোয়া ব্যাক সিটের দরজা খুলতে গেল। আশা ধমকে উঠল, “ওখানে কেন আরোয়া? সাফওয়ান তোর ড্রাইভার? সামনে এসে বস।”
আরোয়া চাপা রাগে গজগজ করতে করতে সজোরে দরজাটা আটকে ফ্রন্ট সিটে এসে বসল। গাড়ি ছাড়ার মুহূর্তে আশা জানালা দিয়ে ঝুঁকে সাফওয়ানকে কড়া নির্দেশ দিল, “সাফওয়ান, ওকে চোখে চোখে রাখবি সবসময়।”
সাফওয়ান গাড়ি স্টার্ট দিয়ে গেট পেরিয়ে মেইন রাস্তায় গাড়ি তুলে নিল। মিনিটখানেক নীরবতা বজায় রেখে জিজ্ঞেস করল, “কোথায় যেতে হবে?”
“স্টারলাইট ক্লাব।”
সাফওয়ান অবাক হলো। ঘাড় ঘুরিয়ে একবার আরোয়ার দিকে তাকিয়ে বলল, “মানে? তুমি না বলছিলে তোমার ফ্রেন্ডের বার্থডে পার্টিতে যাচ্ছ?”
“হুম! পার্টি ওখানেই হবে।”
“আপু কি এটা জানে?”
“না, আর কোনোভাবেই যেন জানতেও না পারে। এখন চুপচাপ গাড়ি চালাও।”
সাফওয়ান আর কথা বাড়াল না। মন দিয়ে ড্রাইভ করতে লাগল।
প্রশস্ত রাস্তা দিয়ে গাড়ি শোঁ শোঁ শব্দে এগিয়ে চলেছে, ভেতরে গুমোট নিস্তব্ধতা। দুজনের কারোর চেহারায়ই কোনো ভাবান্তর নেই।
ক্লাবের সামনে এসে গাড়ি ব্রেক নিল। সাফওয়ান, আরোয়া দুজনেই দুপাশ থেকে বেরিয়ে এলো। আরোয়া গাড়ির দরজা লাগিয়ে সাফওয়ানের সামনে এসে দাঁড়িয়ে কাঠ কাঠ করে বলল, “সাফওয়ান! আমি যে এখানে এসেছি, ভাইয়া-আপু যেন কোনোভাবেই না জানে, বুঝতে পেরেছ?”
সাফওয়ান কোনো উত্তর দিল না, কেবল শান্ত দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে রইল। আরোয়া ঘুরে ক্লাবের দিকে হাঁটতে শুরু করল। কয়েক কদম এগিয়েই কী মনে করে থমকে দাঁড়াল সে। পেছনে তাকিয়ে সাফওয়ানকে আসতে দেখে কপালে ভাঁজ ফেলে বলল, “তুমি কোথায় যাচ্ছ?”
“তুমি যেখানে যাচ্ছ।” শান্ত স্বর সাফওয়ানের।
“আমি এখানে ইনভাইটেশনে এসেছি সাফওয়ান। কিন্তু তুমি?”
“আমি তোমার সাথে এসেছি।”
আরোয়া বিরক্ত হয়ে বলল, “অহ! ওরা বাইরের কাউকে ভেতরে এলাউ করবে না, বুঝেছ?”
সাফওয়ান নির্বিকার ভঙ্গিতে কাঁধ ঝাকিয়ে বলল, “তাহলে চলো, ফিরে যেতে হবে। এছাড়া আর কিছু করার নেই।”
“ডিসগাস্টিং!”—দাঁতে দাঁত চেপে শব্দটা ছুঁড়ে দিয়েই আরোয়া চুল ঝাপটা মেরে উল্টো ঘুরে ফের ক্লাবের ভেতরে হাঁটতে শুরু করল। সেই চুলের মৃদু সুগন্ধ আর ঝাপটার ছোঁয়া সাফওয়ানের চোখ-মুখ ছুঁয়ে গেল। কিন্তু সে সেদিকে কোনো পাত্তা না দিয়ে, শান্ত ভঙ্গিতে হাত দুটো প্যান্টের পকেটে গুঁজে আরোয়ার পিছু পিছু এগিয়ে চলল।
ক্লাবের প্রবেশপথে দায়িত্বরত গার্ডরা ইনভাইটেশন কার্ড চেক করছেন। আরোয়া সাইড ব্যাগ থেকে তার কার্ডটা বের করে দেখিয়ে ভেতরে ঢুকে গেল। এবার সাফওয়ানকে আটকানো হলো, ইনভাইটেশন কার্ড দেখতে চাওয়া হলো তার থেকে। সাফওয়ান তখনো শান্ত ভঙ্গিতে পকেটে হাত গুঁজে দাঁড়িয়ে। যেন এর পরে কী হবে তা সে অবগত।
সাফওয়ানকে আটকাতে দেখে আরোয়া থমকে দাঁড়াল। একটা দীর্ঘ বিরক্তিকর নিঃশ্বাস ফেলে পেছন ফিরল সে। তারপর গার্ডদের উদ্দেশে বলল, “ও আমার লোক, আসতে দিন।”
আরোয়ার কথায় গেট ছাড়ল গার্ডরা। সাফওয়ান গার্ডদের দিকে তাকিয়ে চোখ টিপ দিয়ে এক হাতে চুলে ব্যাকব্রাশ করতে করতে ভেতরে এগিয়ে এল। তবে ভেতরের জগৎ দেখে চোখ বড় বড় হয়ে গেল ওর। একপাশে সুসজ্জিত বার, সেখানে কাঁচের বোতলের সারিগুলো ঝকমক করছে। কয়েকজন নির্দিষ্ট পোশাকধারী স্টাফ ট্রেতে করে ম’দ নামের সেই ড্রিংকসগুলো পরিবেশন করছে। অন্য দিকটায় ডান্স ফ্লোর, সেখানে ছেলে-মেয়ে, যেই যার সাথে যেভাবে ইচ্ছে উন্মত্ত নাচে মত্ত। কারো কারো হাতে আবার একটা করে লাল পানির গ্লাস, থেকে থেকে চুমুক দিচ্ছে তাতে।
এমন দৃশ্য সাফওয়ান এতদিন কেবল পর্দায়গেই দেখে এসেছে। কিন্তু বাস্তবেও যে হুবহু এমন কিছু আছে বা ঘটে তা সে আজকে এখানে নিজ চোখে না দেখলে হয়তো কোনদিন বিশ্বাসই করত না। খানিকক্ষণ পর ওর চোখ দুটো থেকে বিস্ময় উবে গিয়ে এবার সেখানে বিরক্তি আর ঘৃণা জায়গা করে নিল। চোখ সরিয়ে নিল সে, এসব অর্ধনগ্ন মেয়েদের দিকে তাকানোও মহাপাপ। অবশ্য তাদের তুলনায় আরোয়ার পরনের পোশাক যথেষ্ট শালীন আছে।
আরোয়াকে প্রবেশ করতে দেখেই ভীড়ের ভেতর থেকে নিবিড় নামের এক তরুণ উচ্চস্বরে বলে উঠল, “ওহ মাই গুডনেস! আওয়ার আরোয়া দিল ইজ হিয়ার?”
উচ্ছ্বসিত আরোয়া হাসিমুখে দ্রুত পায়ে সেদিকে এগিয়ে গেল। “হাই গাইজ, হোয়াটস আপ অল?”
নিবিড় আরোয়ার দিকে হাত বাড়িয়ে লো-ফাইভ করে বলল, “গুড, বাট হোয়াট অ্যাবাউট ইউ? গোটা সপ্তাহ কোনো দেখা-সাক্ষাৎ নেই। আমি তো ভাবলাম, অ্যাব্রড ট্যুরে আছিস মনে হয়!”
“আরে না! দেশেই আছি, পরিবারের সাথে একটু ব্যস্ত ছিলাম এই যা।”
আরোয়া সবার সাথেই হালকা কুশল বিনিময় করে এবার আজকের মধ্যমণি তরুণের দিকে এগিয়ে গেল। তরুণ মিষ্টি হেসে দুই হাত প্রসারিত করে ধরল ওর পানে। আরোয়াও পাল্টা হেসে ধরা দিল সেই আলিঙ্গনে, “হ্যাপি বার্থডে জয়! মেনি মেনি রিটার্নস অফ দ্য ডে। বি হ্যাপি বি ইউ।”
মৌটুসী পর্ব ১৮
জয় আরোয়ার কাঁধে মুখ ডুবিয়ে গভীর একটা শ্বাস টেনে নিল। এক হাত ওর লতানো কোমড়ে রেখে অন্য হাত পিঠে আলতো বুলিয়ে দিতে দিতে সম্মোহনী স্বরে বলল, “ওহ মাই গর্জিয়াস লেডি! ইউ মেড মাই পার্টি জ্যাম-প্যাকড, বিউটিফুল!”
অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা সাফওয়ান কপালে ভাঁজ ফেলে স্পষ্ট দেখল তা।
