মৌটুসী পর্ব ২০
ঋতস্বিনী মাহবিশ
সূর্য পশ্চিম আকাশে মোড় নিচ্ছে। বিকেলের সোনালী আভাও ম্লান হয়ে আসছে। পাহাড়পুরের সারা দিনের উত্তাপ আর ক্লান্তি ঝরিয়ে প্রকৃতি এখন কিছুটা শান্ত, নিস্তব্ধ। কর্মচঞ্চল পরিবেশ বিদায় নিয়ে নেমে এসেছে এক স্নিগ্ধ স্থিরতা।
সারাদিনের উদ্দীপনা আর ছোটাছুটির পর ক্লান্ত শরীরে বাসে ওঠার কিছুক্ষণের মধ্যেই প্রায় সকলেই ঘুমের রাজ্যে তলিয়ে গেল। ঘুমন্ত বীরকে আগলে নিয়ে ওর মাথার সাথে মাথা ঠেকিয়ে মৌটুসীও কখন যেন বিভোর ঘুমে তলিয়ে গিয়েছে, তা সে নিজেও জানে না।
এদিকে বোরাকের কোলে মাথা রেখে সিটের মধ্যেই গুটিশুটি মেরে শুয়ে ঘুমচ্ছে চড়ুই। তবে বোরাকের চোখে ঘুম নেই, গাড়ির মধ্যে ঘুমানোর অভ্যাস তার কখনোই নেই। সে ডান হাতে চড়ুইয়ের ছোট্ট দেহটা আগলে নিয়ে বাঁ হাতে মন দিয়ে ফোনে কিছু একটা করছে।
”আচ্ছা, ওই ছেলেটা কে? ওখানে ব্লু ডেনিম পরে দাঁড়িয়ে আছে! আগে কখনো দেখেছি বলে তো মনে হচ্ছে না!”
দোলার কথায় উপস্থিত সকলেই তার দৃষ্টি অনুসরণ করে ক্লাব কর্নারের দিকে তাকাল। কোণের নির্জন একটা জায়গায় বুকে হাত গুজে ঠাঁই দাঁড়িয়ে আছে সাফওয়ান। তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ড্রিংক সেলফে সাজিয়ে রাখা লাল-কালো কাঁচের বোতলগুলোর দিকে, সেগুলোর লোগো খুব মন দিয়ে পর্যবেক্ষণ করছে সে।
ওকে দেখে রাজ বলল, “ছেলেটাকে তো আরোয়ার সাথে আসতে দেখেছিলাম।”
দোলা এবার দৃষ্টি ঘুরিয়ে আরোয়ার দিকে তাকিয়ে বলল, “আরোয়া, তোর পরিচিত?”
”হুম। আপু সাথে পাঠিয়েছে।”
নিবিড় বলল, “সাথে পাঠিয়েছে মানে কী? কোনো পরিচয় নেই?”
জয় এতক্ষণ চুপচাপ সবার কথা শুনতে শুনতে হাতের গ্লাসে চুমুক দিচ্ছিল। এবার এক হাতে আরোয়ার কোমর আঁকড়ে ধরে তাকে আলতো করে নিজের কাছে টেনে নিয়ে বাঁকা চোখে বলল, “বডিগার্ড, রাইট?”
আরোয়া কিছুটা অস্বস্তিতে পড়ে গেল। কাঁচুমাচু ভঙ্গিতে জয়ের হাতটা আস্তে করে কোমর থেকে সরিয়ে দিল সে। মুখে এক চিলতে হাসি ফুটিয়ে বলল, “হ্যাঁ, অনেকটা তেমনই। আমাদের পরিবারের দেখাশোনা করে।”
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা দোলা একদৃষ্টিতে সাফওয়ানের দিকে তাকিয়ে আছে। চোখেমুখে এক অদ্ভুত আকর্ষণ তার। এ পর্যায়ে মোহিত কণ্ঠে বলে উঠল, “বাই দ্য ওয়ে, সাচ আ সুইট বডিগার্ড হি ইজ!”
বলেই হাতে থাকা গ্লাসের সবটুকু লাল পানীয় একবারে শেষ করে গ্লাসটা ধপ করে কাউন্টারের উপর রেখে দিল। তারপর হেলেদুলে হাঁটা দিল সাফওয়ানের দিকে।
ওর যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থেকে নিবিড় বিড়বিড় করে বলল, “হায়রে! এ দেশে দেখছি বডিগার্ডরাও নিরাপদ না।”
সরাসরি সাফওয়ানের সামনে এসে দাঁড়াল দোলা। শরীরে ব্যবহারকৃত তার এক্সপেনসিভ পারফিউমের কড়া গন্ধে বাতাস ভারী হয়ে এল। দোলা সাফওয়ানের দিকে ডান হাত বাড়িয়ে রেখে চোখের চাউনিটাকে যতটা সম্ভব আকর্ষণীয় করে বলল, “হ্যালো হ্যান্ডসাম! লেট’স হেড টু দ্য ডান্স ফ্লোর!”
সাফওয়ান এতক্ষণ ড্রিংক সেলফের দিকেই তাকিয়ে ছিল, দোলার কথায় সে তার দিকে ফিরে তাকাল। তার চোখেমুখে কোনো উত্তেজনার ছাপ নেই, বরং একরাশ অস্বস্তি। গম্ভীর স্বরে বলল, “সরি, আই কান্ট।”
সাফওয়ানের এই সরাসরি প্রত্যাখ্যানে দোলার ইগোতে বেশ ভালোই আঘাত লাগল। তবে সে দমার পাত্রী নয়; পরিস্থিতি সামাল দিতে একগাল হেসে বলল, “ওহ, ইটস ওকে! কোনো ব্যাপার না। লেটস গেট ইন্ট্রোডিউসড ফার্স্ট। মাইসেল্ফ, দোলা চৌধুরী।”
সাফওয়ান দোলার হাতটা না ধরেই বলল, “নাইস টু মিট ইউ মিস দোলা চৌধুরী।”
দোলা ভ্রু নাচিয়ে জিজ্ঞেস করল, “ইউ?”
”সাদিয়ার হাসব্যান্ড, মাই ওয়ান অ্যান্ড ওয়ানলি আইডেন্টিটি।” সহজ উত্তর সাফওয়ানের।
সাফওয়ানের এমন অদ্ভুত পরিচয়ে দোলা কিছুটা বিভ্রান্ত হলো। কিছুক্ষণ চুপ থেকে বিষয়টা ভালোভাবে বোঝবার চেষ্টা করল সে। সহসা তার উজ্জ্বল মুখটা কুঁচকে গেল, “আর উই ম্যারিড?”
সাফওয়ান বাঁকা হেসে বলল, “ইয়াহ্! সেকেন্ড হ্যান্ড। ইউজড বাই সাদিয়া।”
একজন ক্লাব স্টাফ গ্লাস ভর্তি ট্রে হাতে জয়ের সামনে এসে দাঁড়াল। জয় সেখান থেকে একটা গ্লাস উঠিয়ে নিতেই স্টাফটি সামান্য মাথা নুইয়ে সম্মান জানিয়ে প্রস্থান করল সেখান থেকে। জয় গ্লাসটা আরোয়ার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল, “হ্যাভ আ ড্রিংক, বিউটিফুল!”
আরোয়া মৃদু হেসে বলল, “নো, থ্যাঙ্কস।”
”অহ কাম-অন আরোয়া! নো প্রবলেম, ইট’স সফট। স্পেশালি মেড ফর ইউ।”
আরোয়া একটু থেমে গ্লাসটা হাতে নিল, “ওকে!”
অবশেষে রাত সাড়ে আটটার দিকে পিকনিক বাস রাজরাজড়া রাজশাহী শহরে এসে পৌঁছাল। যাত্রার ক্লান্তি আর ঘুম মাখা চোখে একে একে সবাই বাস থেকে নামতে শুরু করল। ঘুমন্ত বীর আর চড়ুইকে কোলে করে নেমে এল বোরাক-মৌটুসী। স্কুলের সামনের রাস্তায় বোরাকের ড্রাইভার গাড়ি নিয়ে আগে থেকেই তাদের রিসিভ করার জন্য অপেক্ষা করছিল। আজকেও মৌটুসীকে রিকশা ধরতে দিল না বোরাক। অগত্যা মৌ বীরকে নিয়ে উঠে বসল গাড়িতে।
গলির মুখে এসে গাড়ি থামল। বীর তখনও বিভোর হয়ে মৌটুসীর কোলে ঘুমাচ্ছে। বোরাক নেমে এসে জানালা দিয়ে মৌটুসীকে বলল, “বীরকে সিটে শুইয়ে দিয়ে নেমে আসুন আপনি।”
মৌটুসী তাই করল, বীরকে সিটে শুইয়ে ওর কপালে স্নিগ্ধ একটা চুমু একে গাড়ি থেকে নেমে এল সে। এরপর বোরাকের কোল থেকে ঘুমন্ত চড়ুইকে নিজের কোলে পার করে নিল। বোরাকের দিকে তাকিয়ে মৃদু স্বরে বলল, “আসি, মি. বোরাক।”
বোরাক মৃদু মাথা নাড়িয়ে সায় দিল, “হুম। আবার দেখা হবে।”
মৌটুসী উল্টো ঘুরে হাঁটা দিল গলির দিকে। বোরাকও সেদিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে ব্যাক সিটে উঠে বসল। ড্রাইভারকে নির্দেশ দিল গাড়ি স্টার্ট দিতে।
সোফায় বসে টিভিতে ডাবিং সিরিজ দেখছে আশা। সাড়ে আটটায় দীপ্ত টিভিতে তার পছন্দের একটা ডাবিং করা তুর্কি সিরিয়াল হয়। এটা তার মিস করা যাবে না কোনোভাবেই। ভুবনকে টাইটানের সাথে পায়ের কাছে মেঝের উপর বসিয়ে রেখেছে। সামনে দিয়েছে কয়েকটা টয়স। ব্যস, ছেলের আর কোনো বিরক্ত নেই। খেলনা নিয়ে সে দিব্যি মগ্ন হয়ে আছে।
টিভির পর্দায় তখন টানটান উত্তেজনার দৃশ্য। এদিকে খেলারত ভুবন একসময় হামাগুড়ি দিয়ে কাঁচের সেন্টার টেবিলটার কাছে গিয়ে তার পা ধরে দাঁড়িয়ে গেল। টেবিলের কোণাটা বেশ সুচালো, একবার কপাল বা চোখে লাগলে তা গভীর ক্ষত তৈরি করতে সক্ষম। আশার সেদিকে বিন্দুমাত্র খেয়াল নেই, সে টিভিতে বুঁদ হয়ে আছে।
কিন্তু পোষ্য টাইটান ঠিকই লক্ষ্য করল ভুবনকে। বিপদের আঁচ পেয়ে সে ক্ষিপ্র গতিতে টেবিলের ওপর লাফিয়ে উঠে টেবিলের সেই সুচালো কোণাটা পা দিয়ে চেপে ধরল, যাতে ভুবন তাতে কোনোভাবেই আঘাত না পায়। এরপর আশার দিকে তাকিয়ে তীব্র স্বরে ‘ম্যাও ম্যাও’ করে চিৎকার করে উঠল সে।
এমন ইম্পর্ট্যান্ট একটা সিন চলাকালীন টাইটানের চিৎকারে বিরক্ত হলো আশা। ভ্রু কুঁচকে তার দিকে তাকাতেই আতঙ্কে চোখদুটো রসগোল্লা হয়ে উঠল। আশা এক লাফে সোফা থেকে নেমে ছুটে গেল সেদিকে। ভুবনকে ধরে মাটিতে বসিয়ে দিল। হাঁফ ছেড়ে বলল, “বাবা, কী করতে যাচ্ছিলে তুমি, হ্যাঁ?”
”অ্যাঁ, য়ুঁ!”
”এ য়ু? ওখানে উঠেছিলে কেন? ব্যথা লাগত না? ভাগ্যিস টাইটান ছিল! আল্লাহ বাঁচিয়েছেন।”
এরপর টাইটানের দিকে তাকিয়ে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে ওর দিকে হাত বাড়িয়ে কাছে ডাকল ওকে, “ওওও টাইটান, এসো বাবা!”
আদর পাগল বিড়ালটা টাইটান লেজ নাড়িয়ে সুলসুল করে আশার কোলের মধ্যে ঢুকে গেল। আশা ওর নরম শরীরে আদুরে হাত বুলিয়ে দিতেই আপ্লুত হয়ে শরীর এলিয়ে দিল ও। কিছুক্ষণ এভাবেই থাকার পর সোফার উপরে আশার ফোনটা বেজে উঠল। আশা ভুবনকে কোলে তুলে সেদিকে এগিয়ে গেল। হাসানের ভিডিও কল। আশা রিসিভ করে ভুবনের সামনে ধরল, “এটা কে? আমার বাবা? বাবাটা আমার কী করছে?”
স্ক্রিনে বাবাকে দেখে খুশি হয়ে উঠল ভুবন। চঞ্চল চিত্তে হাত-পা নাচাতে লাগল সে। হাত নাড়িয়ে তার নিজস্ব ভাষায় ডাকল পাপাকে, “পাপ্পা আয়!”
ছেলের এমন ভালোবাসায় আপ্লুত হয়ে পড়ল হাসান। এই ছেলেটা যে তার সাত বছরের সাধনার ফল! তার সাত রাজার ধন! হাসান ছেলের সাথে তাল মিলিয়ে সেভাবেই বলল, “হ্যাঁ, বাবা আসব তো! এই যে আমি গাড়িতে, আমার বাবার কাছে আসছি! তোমাকে আর মাকে এবার আমার কাছে নিয়ে চলে আসব। এখন লক্ষ্মীটি হয়ে মাম্মা, দুন ঘুমিয়ে পড়ো বাচ্চা!”
আশা ছেলেকে ব্রেস্ট ফিড দিয়ে স্বামীর কাছে সুখময় অভিযোগের ঝুড়ি খুলে বসল, “তোমার ছেলে খুব চঞ্চল হয়েছে হাসান।”
হাসান স্ত্রীর অভিমানী মুখ পানে তাকিয়ে হেসে বলল, “কেন? মিসেস তালুকদারকে কি বেশি বিরক্ত করছে আমার ছেলে?”
”এক মুহূর্তও চোখের আড়াল করতে পারছি না। কিছু না কিছু অঘটন ঘটাচ্ছেই। একটু আগেই টাইটানের জন্য ব্যথা পায়নি।”
”দুইটা বছর একটু এমনই হবে আশা, চোখে চোখে রাখতে হবে। একটু বুঝতে শিখলে তখন আর সমস্যা হবে না।”
”আচ্ছা, কিছু খেয়েছ তুমি?”
”না, একেবারে গিয়ে খাব।”
”গিয়ে খাব মানে কী? তোমার আসতে এখনো পাঁচ ঘন্টার মতো দেরি হবে। এতক্ষণ না খেয়ে থাকবে?”
”সমস্যা নেই আশা, চিন্তা করো না। ক্ষুধা নেই।”
”আগে একটা রেস্টুরেন্টের সামনে গাড়ি থামিয়ে কিছু খাও। তারপর আবার রওনা দিবে, বুঝা গেল?” এভাবেই স্বামীর সাথে টুকটাক কথা সেরে ফোন রাখল আশা। ইতিমধ্যে ভুবনও ঘুমিয়ে পড়েছে। আশা ওকে এখনই ঘরে নিয়ে গেল না, এখানেই বেডিং সেটে শুইয়ে দিল।
এরই মধ্যে গেট দিয়ে প্রবেশ করল বোরাক। তার কোলে বীর, ঘুমঘুম চোখ নিয়ে বোরাকের কাঁধে মাথা রেখে আছে সে। বাড়ির কাছাকাছি এসেই ঘুম ভেঙেছে তার। আশা একটু এগিয়ে গিয়ে বীরকে নিজের কোলে পার করে নিল। তাকে নিয়ে সোফায় বসতে বসতে বলল, “বীর বাবা ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে এসেছে না-কি?”
বীর লম্বা একটা হাই তুলে উপর-নিচ মাথা নাড়াল।
আশা হেসে ভাইপোর চোখমুখে চুমুর বন্যা বয়ে দিতে লাগল।
বোরাক টেবিলের উপর একটা প্লাস্টিক ব্যাগ রেখে বলল, “তোদের জন্য কিছু গিফট।”
আশা হাত বাড়িয়ে নিজের কাছে চাইল ব্যাগটা, “ভাইয়া এদিকে দাও।”
বোরাক এগিয়ে দিল। আশা একে একে ব্যাগ থেকে জিনিসগুলো বের করতে লাগল—বেতের ঝুড়ি, কাঠের আয়না, কাঠের হেয়ার ক্লিপ আর কিছু শোপিস। সবশেষে স্যান্ড টাইমারের সুন্দর একটা কলমদানি বের করতেই বীর আঙুল দিয়ে সেটাকে দেখিয়ে দিয়ে বলল, “ফুপুমনি এটা আমাল মাম্মা আমাকে উপহাল দিয়েছে।”
বীরের এই কথায় আশা থমকাল। চকিতে বোরাকের দিকে প্রশ্নসূচক দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বলল, “ভাইয়া!”
বোনের দৃষ্টি বুঝে বোরাক কৈফিয়ত দেওয়ার মতো করে বলল, “ঐ! চড়ুইয়ের দেখাদেখি ওর মাকে মাম্মা ডাকছে। নাথিং মোর!”
মুহূর্তের জন্য চকচক করে ওঠা আশার চোখদুটোর সেই উজ্জ্বলতা ধপ করে নিভে গেল যেন। আশাহত হয়ে ছোট করে উচ্চারণ করল, “ওহ!”
”আরোয়াকে দেখছি না!”
”আরোয়া ওর ফ্রেন্ডের বার্থডে পার্টিতে।”
দৃষ্টি সরু হয়ে এল বোরাকের, “মানে? কটা বাজে এখন?”
আশা ভাইকে আশ্বস্ত করে বলল, “চিন্তা করো না। সাফওয়ানকে সাথে পাঠিয়েছি।”
”আচ্ছা।” তারপর ছেলের দিকে হাত বাড়িয়ে দিল, “এসো বাবা। ফ্রেশ হতে হবে।”
বীরকে নিয়ে উপরে নিজের ঘরে চলে গেল বোরাক।
জয়ের দেওয়া ড্রিংকটা খাওয়ার পরপরই নেশার ঘোর লাগা আচ্ছন্নতা গ্রাস করল আরোয়াকে। চোখের চাহনি বদলে গেল তার, হারিয়ে গেল স্বাভাবিক সচেতনতা। ক্লাবের উচ্চশব্দের মিউজিকের সাথে তাল মিলিয়ে জয়ের সাথে ঘনিষ্ঠ হয়ে নাচতে শুরু করল সে। নেশার ঘোরে আরোয়ার শরীর এলিয়ে পড়ছে, আর জয় সেই সুযোগের পূর্ণ ব্যবহার করছে। নাচের ছলে সে আরোয়ার শরীরের স্পর্শকাতর জায়গাগুলোতে হাত দিতে শুরু করল, অথচ উন্মত্ত আরোয়া তাতে বিন্দুমাত্র বাধা তো দিল না, উল্টো অসংলগ্নভাবে জয়ের সাথে শরীর মিলিয়ে নেচে তাকে আরও উৎসাহ দিয়ে যাচ্ছে।
অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা সাফওয়ানের চোখের সামনে এই দৃশ্য ক্রমান্বয়ে আগুনের হলকা হয়ে লাগছে যেন। তাদের সম্পর্ক? মালিক-চাকর। তবুও ছোট থেকে একই ছাদের তলে বেড়ে ওঠা, শৈশবে একই খেলনা ভাগাভাগি করে নেওয়া, এসব থেকেই কেবল দায়বদ্ধতা বা আনুগত্যের ওপারেও একটা স্নেহপূর্ণ দায়িত্ব তৈরি হয়েছে সাফওয়ানের মাঝে।
আর সেই স্নেহ থেকেই চোখের সামনে মেয়েটার এই বেসামাল অবস্থা ও তার প্রতি এক পুরুষের নোংরা আচরণ সাফওয়ানের ধৈর্যের বাঁধ ভাঙার উপক্রম করল। হাত দুটো রাগে শক্ত হয়ে মুষ্টিবদ্ধ হয়ে উঠল তার। দাঁতে দাঁত চেপে নিজেকে স্থির রাখার আপ্রাণ চেষ্টা অব্যাহত রাখল, কিন্তু যখন দেখল জয় তার বুকের দিকে কলুষিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে সেদিকে হাত বাড়াতে উদ্যত হচ্ছে, তখন সাফওয়ান আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। পা দুটো আপনাআপনি ক্ষিপ্র গতিতে অগ্রসর হয়ে গেল।
বিদ্যুৎগতিতে ডান্স ফ্লোরের মাঝখানে পৌঁছে এক ঝটকায় আরোয়ার হাত ধরে টেনে নিজের দিকে সরিয়ে আনল সাফওয়ান। আকস্মিক ঘটনায় জয় কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে থমকে গেল, বাড়িয়ে দেওয়া হাতটা শূন্য থেকে স্বাভাবিক অবস্থানে সরিয়ে আনল সে।
মাঝখানে সাফওয়ানের হঠাৎ এই আগমন পছন্দ হলো না আরোয়ার। সে নেশাচ্ছন্ন চোখে সাফওয়ানের দিকে তাকিয়ে টালমাটাল বিরক্তির সুরে বলল, “কী করছ সাফওয়ান? ছাড়ো! দেখছ না আমি নাচছি?”
সাফওয়ান আরোয়ার হাতটা আরও শক্ত করে ধরে গম্ভীর স্বরে বলল, “আরোয়া, চলো। বাসায় যেতে হবে আমাদের।”
”না! আমি এখন যাব না,” আরোয়া ঝটকা দিয়ে হাত ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করল এবারও।
সাফওয়ানের মুখে আরোয়ার প্রতি তুমি সম্বোধন শুনে কিঞ্চিত অবাক হলো জয়। একজন বডিগার্ড তার মালিককে সরাসরি তুমি বলে সম্বোধন করাটা তো আর স্বাভাবিক নয়! তবে সে দ্রুত এই বিস্ময় কাটিয়ে দাপট নিয়ে এগিয়ে এসে সাফওয়ানের জ্যাকেটের কলার আঁকড়ে ধরল। “পোর বাস্টার্ড! হাউ ডেয়ার ইউ? সামান্য বডিগার্ড হয়ে ওর হাত ধরার সাহস পাস কোথায়? ছাড় এক্ষুনি!”
সাফওয়ান জয়ের দিকে একবারও ফিরে তাকাল না, এমনকি নিজের কলার থেকে জয়ের হাতটা সরানোর চেষ্টাও করল না একবারও। কেবল আরোয়ার চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে শান্ত স্বরেই বলল, “আরোয়া, আশা আপু ফোন করেছিল। বোরাক ভাইয়া তোমার খোঁজ করছে।”
বোরাক ভাইয়া! নামটা শোনা মাত্রই আরোয়ার নেশা যেন মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। নেশাগ্রস্ত অবস্থাতেও ভেতর থেকে তার ভীত সত্তাটি জেগে উঠল। আতঙ্কিত কণ্ঠে বলল, “ভা…ভাইয়া এসেছে?”
পার্টির উৎসবমুখর চঞ্চল পরিবেশ কিছুটা থমথমে হয়ে এল। সকলেই নাচ থামিয়ে কৌতুহলী দৃষ্টিতে এদিকেই তাকিয়ে, কেউ কেউ তো সিনেমাটিক এই দৃশ্যে বেশ মজাও নিতে লাগল। সাফওয়ানের এই শান্ত প্রবল দৃঢ়তা মুগ্ধ করল অনেক তরুণীকে। একজন তো মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে ফিসফিস করে বলেই উঠল, “হাউ কুল ম্যান! সুপার রয়েল পার্সোনালিটি।”
আরোয়া এবার গেটের দিকে সাফওয়ানের হাত টানতে লাগল, “তাড়াতাড়ি এসো সাফওয়ান।”
সাফওয়ান তখনো নিরেট দাঁড়িয়ে। জয় তার কলার ছাড়েনি। আরোয়া তা লক্ষ্য করে নিজেই এগিয়ে এসে সাফওয়ানের কলার থেকে জয়ের হাত ছাড়াতে ছাড়াতে বলল, “জয়, এখন ছাড়ো ওকে। কালকে আবার আসব, তখন ধরো। এখন বাড়ি যেতে হবে, নাহলে ভাইয়া বকা দিবে।”
আরোয়ার কথাগুলো টালমাটাল। কথার আগা-মাথা, শব্দের উচ্চারণ কোনোটিই ঠিক নেই।
শোঁ শোঁ আওয়াজ তুলে গাড়ি ছুটছে। আরোয়া চোখ বুঝে সিটে মাথা এলিয়ে দিয়ে আছে। মুখ দিয়ে মৃদু শব্দে গুনগুন করে গান গাইছে সে, তবে কী গান তা ঠিক বোঝা যাচ্ছে না।
হঠাৎ গান থামিয়ে মাথা উঠিয়ে সোজা হয়ে বসল আরোয়া, একপ্রকার চিৎকার করে বলতে লাগল, “সাফওয়ান, সাফওয়ান গাড়ি থামাও, গাড়ি থামাও, এক্ষুনি থামাও।”
আরোয়ার হঠাৎ এই চিৎকারে সাফওয়ান হকচকিয়ে গিয়ে ব্রিজের ওপরেই গাড়ি সাইড করল। গাড়ি থামতেই আরোয়া টলমল পায়ে গাড়ি থেকে নেমে পড়ল। সাফওয়ানও অপর পাশ থেকে দ্রুত নেমে জিজ্ঞেস করল, “এখানে নামলে কেন?”
আরোয়া এবার খপ করে সাফওয়ানের একটা হাত ধরে ফেলল। হাসতে হাসতে আকাশের দিকে আঙুল তুলে বলল, “দেখো আকাশে তারা দেখা যাচ্ছে। চলো তারা গুনব আমরা।”
”এত রাতে এই মাঝরাস্তায় দাঁড়িয়ে তারা গুনব আমরা? পাগল হয়েছ তুমি?”
”আমি তারা গুনবই গুনব।” বলেই ব্রিজের রেলিংয়ে হাত রেখে মাথা উঁচিয়ে করুণ দৃষ্টিতে আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল আরোয়া।
সাফওয়ান বিরক্তিতে কপালে দুই আঙুল চেপে ধরল। এই মাতালকে নিয়ে এখন এই মাঝরাস্তায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তারা গুনবে সে?
এর মধ্যেই আরোয়ার করুণ স্বর ভেসে এল, “আকাশে মা-বাবাকে দেখা যায়, ওরা ওখানেই থাকে। আমাকে ছেড়ে।”
আরোয়ার এই আবেগের বিপরীতে আর কোনো নিষেধাজ্ঞা বেরোল না সাফওয়ানের মুখ থেকে। বরং সেও এবার আরোয়ার পাশে অনেকখানি দূরত্ব রেখে পকেটে হাত গুজে দাঁড়াল। তরুণীকে অনুসরণ করে অপলক তাকিয়ে রইল আসমানের শূন্যতায়। সেখানে কি তার বাবারও বসবাস? তাহলে সে কখনো দেখতে পায় না কেন? বাবা তাকে দেখা দেয় না কেন? বাবার অভিমান বুঝি আজও ফুরায়নি!
দুজনার নীরবতা আর রাস্তা দিয়ে চলাচল করা দুই-একটা গাড়ির হর্নের শব্দের মাঝে কেটে গেল কিছুক্ষণ।
হঠাৎ ফুঁপানোর শব্দ কানে আসতেই সাফওয়ান অবাক হয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল। তরুণী আকাশের পানে তাকিয়ে ঠোঁট উল্টে কাঁদছে আর বাচ্চাদের মতো করে দুই হাতে চোখ মুছছে। না জানি কত জীবনের অভিযোগ-অনুযোগ দায়ের করছে শূন্য আকাশের কাছে। এই মেয়েটা আবার তার থেকে এক ধাপ বেশি দুঃখী। সাফওয়ান এক দীর্ঘশ্বাস ব্যতীত আর কিছুই দিতে পারল না। এমন সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা তার জানা নেই।
হঠাৎ এক পশলা হিমেল হাওয়া ছুঁয়ে দিল বিশ্বব্রহ্মাণ্ডকে। ঠান্ডায় শিউরে উঠল সাফওয়ানের শরীরের লোমকূপ। অথচ আরোয়ার পরনে কেবল একটা জর্জেট টপ। জ্যাকেটটা ক্লাব থেকে নিয়ে আসা হয়নি। সাফওয়ান বলল, “আরোয়া, দেখো এখানে প্রচণ্ড ঠান্ডা বাতাস বইছে। চলো বাসায় চলো। ঠান্ডা লেগে যাবে।”
তরুণীর হেলদোল নেই। সে ঠোঁট ভেঙে নিস্পৃহ দৃষ্টিতে তাকিয়েই আছে। সাফওয়ান ফাঁকা নিশ্বাস ফেলে ওর পরনের জ্যাকেটটা খুলে আরোয়ার দিকে বাড়িয়ে ধরল, “আচ্ছা, অন্তত এটা পরে নাও!”
খানিক বাদে তরুণীর মুখ খুলতে উদ্যত হলো। এদিকে না তাকিয়েই নাক টেনে বলল, “পরব না। আমার স্টাইল নষ্ট হয়ে যাবে।”
আহাহা! মেয়েলোক! একদিকে মৃত মা-বাবার শোক পালন করছে, অন্যদিকে ফ্যাশন সেন্সও কাঁটায় কাঁটায় ঠিক রেখেছে। মানে জাতে মাতাল তালে ঠিক! সাফওয়ান এবার কণ্ঠটা একটু শক্ত করে বলল, “না পরলে কিন্তু বোরাক ভাইয়াকে বলে দিব। জানোই তো ঠান্ডা লাগলে ভাইয়া তোমার কী অবস্থা করবে!”
সাফওয়ানের এই কথাটা ওষুধের মতো কাজ করল যেন। হাত বাড়িয়ে জ্যাকেটটা নিয়ে পরে নিল আরোয়া। এরপর সাফওয়ানের দিকে তাকিয়ে ঠোঁট উল্টে বলল, “তুমি খুব খারাপ সাফওয়ান। সবসময় ভাইয়ার ভয় দেখাও!”
আরোয়ার এই অনুযোগের ভঙ্গিটা এমন ছিল যে না চাইতেও সাফওয়ানের অধরপল্লব মৃদু হাসিতে প্রসারিত হয়ে উঠল।
এবার হুট করে আরোয়া তার শরীরটা ঘুরিয়ে সরাসরি সাফওয়ানের মুখোমুখি দাঁড়াল। কোনো কথা নেই, কোনো শব্দ নেই—কেবল সাফওয়ানের চোখের দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল তরুণী। তার বড় বড় চোখ দুটো যেন নেশার ঘোরে আরও বেশি মায়াবী আর গভীর হয়ে উঠেছে। আরোয়ার এই নিস্পলক চাহনি অপ্রস্তুত করে তুলল সাফওয়ানকে। বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা তোলপাড় টের পাচ্ছে সে, যা হওয়ারই ছিল। নারীর দৃষ্টি বলে কথা! সাফওয়ান অস্বস্তিতে একটা শক্ত ঢোক গিলে বলল, “কিছু বলবে?”
আরোয়া কোনো উত্তর দিল না। আগের মতোই স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে সে। তারপর….
তারপর? গড়গড়!
সাফওয়ান ধীরে ধীরে খিঁচে বন্ধ করে রাখা তার চোখ দুটো মেলে দিল। আর তাতেই সামনের দৃশ্যটি হলো, আরোয়া হাতের উল্টো পাশ দিয়ে মুখ মুছে করুণ বলল, “সরি… তোমার পোশাকটা নোংরা করে দিলাম।”
ইশ! কী নিষ্পাপ তরুণীর ওই দৃষ্টি।
সাফওয়ান সেই দৃষ্টি থেকে চোখ সরিয়ে এবার ধীরে ধীরে মাথা নামিয়ে নিজের শরীরের দিকে তাকাল। তার পরনের কালো টি-শার্টটার সামনের দিকটা ঘৃণিত তরলের আস্তরণে সয়লাব হয়ে আছে। উৎকট একটা গন্ধে বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। সাফওয়ান আবারও চোখ বুজে ফোস করে ফাঁকা নিশ্বাস ছাড়ল। মনে মনে একবার বিড়বিড় করে উঠল, “আল্লাহ! আল্লাহ ধৈর্য দাও মাবুদ!”
পরক্ষণেই পেটের ভেতর সব যন্ত্রপাতি এক জায়গায় প্যাঁচিয়ে গা গুলিয়ে এল ওর। আর এক মুহূর্ত সম্ভব নয়। টি-শার্টটা পিছন থেকে এক টানে শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিল সে।
এরপর দ্রুত গাড়ির ভেতর থেকে পানির বোতল বের করে এনে নিজের শরীরে ঢালতে লাগল। গলার কাছে ঠান্ডা পানির ঝাপটা লেগে বুক, পেট বেয়ে সেই পানি নামতে লাগল প্যান্টের ভেতর দিয়ে। কনকনে ঠান্ডায় পানির ঝাপটায় সাফওয়ানের শরীর শিউরে উঠছে, শিরদাঁড়া দিয়ে একটা হিমস্রোত বয়ে যাচ্ছে। পানি ঢালা শেষে খালি বোতলটা রাস্তার এক দিকে ছুড়ে দিয়ে আরোয়ার দিকে তাকাল। সে স্থির দাঁড়িয়ে, তার ঘোর লাগা দৃষ্টি সাফওয়ানের উন্মুক্ত বুকের দিকে। সাফওয়ান এবার অপ্রস্তুত হওয়ার বদলে বিরক্ত হলো। একবার এভাবে চেয়ে থেকে এক অঘটন ঘটিয়েও হয়নি, আল্লাহই জানেন এখন আবার মনে মনে কী ফন্দি আঁটছে! নির্ঘাত আজকে জ্বর আসবে তার।
”সাফওয়ান! তুমি না অনেক ফর্সা। আমার থেকেও বেশি।”
খানেক সম্মোহনী কণ্ঠে কথাটা বলেই সাফওয়ানের বুকের দিকে হাত বাড়িয়ে দিল আরোয়া। আঙুলগুলো মৃদু কাঁপছে, নেশার ঘোরে আচ্ছন্ন দৃষ্টিতে যেন সাফওয়ানের উজ্জ্বল বুকে লেগে থাকা পানির বিন্দুগুলোকে অনুভব করতে চাইছে সে। কিন্তু হাত ত্বক স্পর্শ করার আগমুহূর্তে সাফওয়ান ক্ষিপ্র গতিতে ওর কব্জিটা খপ করে চেপে ধরল। কণ্ঠে কাঠিন্যতা এনে বলল, “অনেক হয়েছে আরোয়া। আর এক মুহূর্তও এখানে নয়, এখন বাসায় যাবে, চলো।”
মৌটুসী পর্ব ১৯
বলেই সাফওয়ান আরোয়াকে গাড়ির দিকে টানতে লাগল। অথচ অবাধ্য আরোয়া পেছনের দিকে শরীর টান দিয়ে খামখেয়ালি সুরে বলল, “না! যাব না। আমার তারা গোনা এখনো শেষ হয়নি। তুমি কিচ্ছু বোঝো না!”
সাফওয়ান দাঁতে দাঁত চেপে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। “তারা গোনে শেষ করতে হবে না তোমার। আমি গুনেছি, এক হাজার একশ একটা তারা আছে আকাশে। এখন এসো, উদ্ধার করো আমাকে।”
