Home ম্যারিড লাইফ্ ‎ম্যারিড লাইফ্ পর্ব ২৪

‎ম্যারিড লাইফ্ পর্ব ২৪

‎ম্যারিড লাইফ্ পর্ব ২৪
‎রঙ্গনা মৈত্র ঊর্মি

‎তীক্ষ্ণ কালো চোখদুটো দরজার ফাঁকে দাঁড়িয়ে থাকা ইশতিয়াকের ওপর স্থির হয়ে রইল।
‎ঘরের ভেতরের নীরবতা যেন মুহূর্তেই ভারী হয়ে গেল। ঠিক যেমন হঠাৎ বজ্রপাতের আগে চারপাশের বাতাস অস্বাভাবিক নিস্তব্ধ হয়ে যায়।
‎ইশতিয়াকের গলা শুকিয়ে কাঠ। তার মনে হচ্ছে বুকের ভেতর হৃদপিণ্ড না, ড্রাম বাজছে। যেটা আবার খুলে ইশতিয়াকের হাতে চলে আসবে। এমনি সে তার ভাইয়াকে ভয় পায় না।কিন্তু দোষ করলে হাঁটু কাপে ইশতিয়াকের।

‎ইখতিয়ার ধীরে ধীরে বিছানা থেকে উঠে দাঁড়াল।
‎লম্বা শরীরটা সোজা করে দরজার দিকে এগিয়ে এলো। ভেজা চুল থেকে এখনও পানির ফোঁটা ঝরে পড়ছে। সাদা তোয়ালে জড়ানো শরীর নিয়ে সে দরজার সামনে এসে দাঁড়াল। ভ্রু কুঁচকে বলল,
‎ “এত রাতে আমার ঘরের সামনে কী করছিস?”
‎ইশতিয়াক শুকনো ঢোক গিলল।
‎ “আমি? মানে… আমি তো… ওই…”
‎”ওই কী?”
‎”এইদিকে যাচ্ছিলাম।”
‎”আমার দরজার সামনে দাঁড়িয়ে?”
‎”করিডোর তো সবার।”
‎ইখতিয়ারের চোখ আরও সরু হয়ে এলো।
‎যেন কোনো গোয়েন্দা অপরাধীর জবানবন্দি শুনছে। ইশতিয়াক নিজেকে বাঁচানোর আপ্রাণ চেষ্টা করল। কিন্তু শেষ রক্ষাটা আর করা গেল না।
‎ইখতিয়ারের দৃষ্টি পড়ল ফোনের স্ক্রিনে। স্ক্রিনে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে মুগ্ধার মুখ। মুহূর্তের জন্য ইখতিয়ারের মুখভঙ্গি বদলে গেল। সে একবার ফোনের দিকে তাকাল। একবার ইশতিয়াকের দিকে। আবার ফোনে। আবার ইশতিয়াকের দিকে। ঠিক যেন কোনো জটিল অঙ্ক মেলানোর চেষ্টা করছে। বোঝার চেষ্টা করছে এখানে হচ্ছিল টা কি?

‎আর ইশতিয়াক? সে এমনভাবে বত্রিশ পাটি বের করল যেন পৃথিবীর সবচেয়ে নির্দোষ মানুষ সে।
‎তার সাদা চকচকে দাঁত দেখিয়ে বলল,
‎”আমি কিন্তু কিছু করিনি ভাইয়া। আমি তো একটু সমাজসেবামূলক কাজ করতেছিলাম।”
‎ইখতিয়ার কোনো কথা না বলে হাত বাড়াল।
‎”ফোনটা দে।”
‎ইশতিয়াকের বুক ধক করে উঠল। তবুও বাধ্য ছেলের মতো ফোন এগিয়ে দিল। ইখতিয়ার ফোন হাতে নিয়ে স্ক্রিনের দিকে তাকাল।
‎ওপাশে মুগ্ধা এমনভাবে বসে আছে যেন পরীক্ষার হলে নকল করতে গিয়ে ধরা খেয়েছে। চোখ বড় বড়। মুখে বিব্রত ভাব।
‎ইখতিয়ার ভ্রু উঁচু করল।
‎ “কি ব্যাপার? দুজনে মিলে কী জটলা করছিলে?”
‎মুগ্ধা আমতা আমতা করে বলল,
‎ “মানে… আমরা…”
‎”মানে তোমরা?”
‎মুগ্ধা সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিতে পারল না। গলাটা কেমন শুকিয়ে গেল। কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর বলল,

‎ “আমরা শুধু…”
‎”তোমরা শুধু?”
‎”উঁকি দিচ্ছিলাম।”
‎কথাটা বলেই নিজের জিভে কামড় দিল।
‎ইখতিয়ারের ঠোঁটের কোণে অদ্ভুত একটা হাসি ফুটে উঠল। সে ধীরে ধীরে মাথা ঘুরিয়ে ইশতিয়াকের দিকে তাকাল। সেই দৃষ্টিটা দেখে ইশতিয়াকের মনে হলো তার কেয়ামত খুব কাছেই। ইখতিয়ার গলা গম্ভীর করে জিজ্ঞেস করল,
‎”তুই আমার ঘরে উঁকি দিচ্ছিলি?”
‎”না ভাইয়া!”
‎”তাহলে?”
‎”ফোন দিছিল।”
‎”ফোন উঁকি দিচ্ছিল?”
‎ইশতিয়াক জীভ দিয়ে ঠোট ভেজাল। গলা শুকিয়ে যাচ্ছে তার। কি বিপদ,কি বিপদ! নিজের পকে্ষে সপাই গাওয়ার সুরে বলল,
‎”প্রযুক্তির যুগ ভাইয়া।”
‎ইখতিয়ার কপালে হাত ঠেকাল। তার ভাইটা শুধু হাতে পায়েই বড় হয়েছে। মস্তিষ্কে কিছু নেই।
‎তারপর গম্ভীর স্বরে বলল,
‎ “একটা থা’প্পর খাবি?”
‎ইশতিয়াক সঙ্গে সঙ্গে মুখ বন্ধ করে ফেলল।
‎ইখতিয়ার আবার বলল,

‎”সবসময় বদবুদ্ধি ঘোরে মাথায়। ভালো হয়ে যা। বুঝছিস?”
‎”জ্বি।”
‎”ভদ্রলোকের মতো চলাফেরা কর। নয়ত কবে দেখবি তোর কান চিলে নিয় গেছে”
‎ “জ্বি।”
‎মুগ্ধার দিকে অবশ্য একটাও ধমক গেল না। বরং কণ্ঠস্বর অনেকটাই নরম হয়ে গেল।
‎”খেয়েছ?”
‎মুগ্ধা মাথা নাড়ল। বলল,
‎”হ্যাঁ।”
‎”ঔষধ খেয়েছ?”
‎”খেয়েছি।”
‎”শরীর কেমন?”
‎”ভালো।”
‎”মাথা ব্যথা করছে?”
‎”না।”
‎মুগ্ধা উল্টো প্রশ্ন করার সাহস পেল না। লজ্জা লাগছে তার। অডিও কল হলে তাও একটা কথা ছিল।

‎ইশতিয়াক দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে চোখ ঘুরাতে লাগল।
‎তার মনে হচ্ছে সে এখানে অতিরিক্ত। ভীষণ অতিরিক্ত। ভাইয়ের বেলায় ধমক আর বউয়ের বেলায় মধু ঝড়ছে যেন। অবশেষে আর সহ্য করতে না পেরে জোরে বলে উঠল,
‎”ফোন দাও!”
‎দুজনেই তার দিকে তাকাল।
‎ইশতিয়াক নাটকীয় ভঙ্গিতে বুকের ওপর হাত রাখল। চোখ উল্টালো সে। তারপর আরও জোরে বলল,
‎ “নিজেদের ফোন নাই যত্তসব! আমার ফোন দাও। আমার মতো সিঙ্গেল মানুষের সামনে দুই দামড়া প্রেম করতেছে!”
‎এক সেকেন্ড থামল। তারপর আবার বলল,
‎”আমে দুধে মিলে যায়, আমি আঠি গড়াগড়ি খাই! যত্তসব নাটক ”
‎মুগ্ধার মুখ লাল হয়ে গেল। ইখতিয়ার চোখ বন্ধ করে ফেলল। ইশতিয়াক কোনো সুযোগ না দিয়ে ফোনটা কেড়ে নিল। লাল সার্কেলে ক্লিক করল। সঙ্গে সঙ্গে মুগ্ধার মুখ অদৃশ্য হয়ে গেল।
‎ “যথেষ্ট হয়েছে।”
‎বলেই হনহন করে হেঁটে চলে গেল।
‎করিডোরের শেষ মাথায় পৌঁছেও বিড়বিড় করতে লাগল,
‎ “প্রেম করুক, কর না ,আমারে কেন মাঝখানে স্যান্ডউইচ বানায়!”

‎ইখতিয়ার কিছুক্ষণ সেদিকে তাকিয়ে রইল।
‎তারপর ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ করল। একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো। এদের কান্ডকারখানা সত্যিই বোঝা মুশকিল। মাথা নেড়ে ঘরের ভেতরে ঢুকে দরজা বন্ধ করল সে।
‎পোশাক পরিবর্তন করে বিছানায় বসে ফোন হাতে নিল ইখতিয়ার। কিছুক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থেকে মুগ্ধার নাম্বারে কল দিল। প্রথম রিং শেষ হওয়ার আগেই কল রিসিভ হয়ে গেল।
‎ওপাশে মুগ্ধার মুখ। আজ অদ্ভুত কোমল লাগছে তাকে। ইখতিয়ারকে কিছু বলার সুযোগ দিলো না মুগ্ধা। ঠোঁট ফুলিয়ে আদুরে গলায় বলল,
‎ “আমি বাড়ি যাব।”
‎ইখতিয়ার প্রথমে বুঝতেই পারল না। অবিশ্বাস্য মনে হলো তার। ভুল শুনলো কি ইখতিয়ার? ভ্রু কুঁচকে বলল,
‎”এহহ?”
‎মুগ্ধা এবার আরও স্পষ্ট করে বলল,
‎”আমি বাড়ি যাব। নিয়ে যান”

‎কয়েক সেকেন্ড লাগল কথাটা বুঝতে ইখতিয়ারের।
‎ঠিক যেন অন্ধকার ঘরে কেউ হঠাৎ একশোটা বাতি জ্বালিয়ে দিয়েছে। ইখতিয়ারের মুখ মুহূর্তে ঝলমল করে উঠল। চোখদুটো উজ্জ্বল হয়ে গেল।
‎বুকের ভেতর জমে থাকা ভার যেন হঠাৎ অনেকটা হালকা হয়ে গেল। সে অবিশ্বাসের স্বরে বলল,
‎”সত্যি?”
‎মুগ্ধা মুখ বাঁকিয়ে বলল,
‎”কেন নিয়ে যাবেন না নাকি?”
‎ইখতিয়ারের ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটল। অনেকদিন পর এমন হাসি। একেবারে মন থেকে উঠে আসা। মাথা নেড়ে হ্যাঁ বোঝাল। তার ঘাড়ে কয়টা মাথা নাকি! একমাত্র বউ তার,কেন আনবে না।
‎”কাল গুছিয়ে থেকো, সকালে যাব।”
‎কিন্তু মুগ্ধা সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়ল। অবুঝ স্বরে বলল,
‎”না।”
‎”না মানে?”
‎”এখন আসেন। আমি এখনই বাড়ি যাব”
‎ইখতিয়ার অবাক হয়ে দেয়ালে ঝোলানো ঘড়ির দিকে তাকাল। সাড়ে দশটা।
‎রাত বেশ হয়ে গেছে।
‎”এখন?”
‎”হ্যাঁ।”
‎”এই সময়?”
‎”হুম।”

‎ইখতিয়ার কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর মুগ্ধার চোখের দিকে তাকাল। সেই চোখে আজ আর অভিমান নেই। রাগ নেই। আছে শিশুসুলভ জেদ।
‎এক ধরনের নীরব আহ্বান ।
‎যেন দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা একটা দরজা অবশেষে একটু ফাঁক হয়েছে। আর সেই ফাঁক দিয়ে আলো ঢুকছে। ইখতিয়ারের বুকের ভেতরটা কেমন উষ্ণ হয়ে উঠল। ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল সে।
‎”আচ্ছা।”
‎মুগ্ধার চোখ জ্বলে উঠল।
‎”সত্যি?”
‎”হ্যাঁ।”
‎”কখন আসছেন?”
‎ইখতিয়ার উঠে দাঁড়াল। আয়নায় তাকিয়ে নিজের উজ্জ্বল মুখখানি দেখল। তারপর নরম স্বরে বলল,
‎”গুছিয়ে নাও। আমি আসছি।”
‎”কতক্ষণ লাগবে?”
‎মুগ্ধার এমন অধৈর্য আচরণ দেখে ইখতিয়ারের বুকে শিহরণ জাগল। হালকা হেসে বলল,
‎”ত্রিশ মিনিট।”
‎কথাটা শুনে মুগ্ধার ঠোঁটের কোণে অজান্তেই হাসি ফুটে উঠল। নাচতে মন চাইল তার। আর ইখতিয়ার?
‎কল কেটে যাওয়ার পরও কিছুক্ষণ ফোনের কালো স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল।
‎মনে হলো বহুদিন পর তার জীবনের দীর্ঘ, অন্ধকার রাতের শেষে কোথাও খুব দূরে একটা ছোট্ট ভোরের রেখা দেখা দিয়েছে।

‎কল কেটে যাওয়ার পরও কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল ইখতিয়ার। মনে হচ্ছিল বুকের ভেতর কোথাও একদল অস্থির পাখি ডানা ঝাপটাচ্ছে।
‎এতদিন পর এমন অনুভূতি হচ্ছে তার।
‎অদ্ভুত, অপরিচিত অনুভূতি। তবু ভীষণ সুন্দর।

‎মুগ্ধা ফিরতে চায়। কথাটা বারবার মাথার ভেতর প্রতিধ্বনিত হতে লাগল। ঠিক যেন পাহাড়ের গায়ে উচ্চারিত একটি শব্দ বারবার ফিরে আসে প্রতিধ্বনি হয়ে। সে দ্রুত আলমারি খুলল।
‎যে মানুষটা সাধারণত সবকিছু ধীরেসুস্থে করে, সেই মানুষটাই আজ অস্থির হয়ে গেছে।
‎শার্ট বের করতে গিয়ে অন্য জামা টেনে ফেলল।
‎চাবি খুঁজতে গিয়ে আবার টেবিলে রেখে দেওয়া চাবিই খুঁজতে লাগল।
‎নিজের ওপরই বিরক্ত হয়ে হেসে ফেলল।
‎আজ তাকে দেখে কেউ বিশ্বাসই করবে না যে এই মানুষটাই সবসময় স্থির, গম্ভীর আর হিসেবি।
‎কিছু আনন্দ মানুষকে শিশু বানিয়ে দেয়।ইখতিয়ারের ক্ষেত্রেও তাই হলো। দ্রুত পোশাক পরে গাড়ির চাবিটা আঙুলে ঘোরাতে ঘোরাতে ঘর থেকে বেরিয়ে এল সে। তার পদক্ষেপে আজ অদ্ভুত তাড়াহুড়ো। মনে হচ্ছে পৃথিবীর সমস্ত রাস্তা সরিয়ে দিলে সে উড়ে পৌঁছে যাবে।
‎বাড়ির করিডোর পেরিয়ে নিচে নামতে নামতে তার ঠোঁটের কোণে অজান্তেই হাসি ফুটে উঠল। এমন হাসি বহুদিন দেখা যায়নি। যেন বহু বছরের খরার পর শুকিয়ে যাওয়া নদীর বুকে আবার জল ফিরেছে।

‎বাইরে রাত নেমেছে। স্নিগ্ধ,ঝলমলে,মায়াময়।
‎আকাশজুড়ে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য তারা।
‎আর মাঝখানে গোল চাঁদ। চাঁদটাকে আজ উজ্জ্বল লাগছে। মনে হচ্ছে কেউ কালো মখমলের ওপর রূপার থালা সাজিয়ে রেখেছে। আবার কখনো মনে হচ্ছে পৃথিবীর সমস্ত ক্লান্ত মানুষের জন্য আকাশ নিজেই একটি প্রদীপ জ্বালিয়ে দিয়েছে।
‎রাস্তার ল্যাম্পপোস্টগুলোর আলো দীর্ঘ ছায়া ফেলে রেখেছে পথের গায়ে। নিস্তব্ধ রাতের বুক চিরে ছুটে চলল ইখতিয়ারের বাইক। বাতাস এসে আঘাত করছিল তার গায়ে। কিন্তু আজ সেই বাতাসও ভালো লাগছে। অনেক ভালো। কারণ বহুদিন পর সে কোথাও যাচ্ছে বাধ্য হয়ে নয়।
‎কর্তব্যবোধে নয়। সে যাচ্ছে নিজের মানুষটাকে নিতে। নিজের একান্ত কাউকে নিজের করতে।

‎ওদিকে মুগ্ধার বাড়িতে ছোটখাটো যুদ্ধ শেষ হয়েছে মাত্র। অবশেষে অনেক কষ্টে সবাইকে ম্যানেজ করতে পেরেছে সে। রহিমা দাদির কথা বলতেই আয়েশা বেগমের মন নরম হয়ে গেছে।
‎রেদোয়ান সাহেবও শেষ পর্যন্ত আর কিছু বলেননি।
‎মেয়ে বিয়ে হয়ে গেলে তাকে আর আগের মতো আটকে রাখা যায় না। যে বাড়িতে তার সংসার, সেই বাড়িরও তো অধিকার আছে। আর জামাই নিজে এসে নিয়ে যাবে।
‎সেখানে আপত্তি করার মতো কী আছে?
‎সব অনুমতি মিলে যেতেই মুগ্ধা দ্রুত নিজের জিনিসপত্র গুছিয়ে ফেলল। প্রয়োজনীয় কাপড়।
‎কিছু বই। ছোটখাটো জিনিস।
‎সব ব্যাগে ভরে নিল। যা যা সে এনেছিল। তারপর ব্যালকনিতে এসে দাঁড়াল।
‎তার চোখ বারবার রাস্তার দিকে ছুটে যাচ্ছে।মোবাইলের স্ক্রিনে সময় দেখছে। আবার রাস্তার দিকে তাকাচ্ছে। আবার সময় দেখছে। এভাবেই
‎প্রথম ত্রিশ মিনিট খুব দ্রুত কেটে গেল।
‎কিন্তু তারপর…
‎সময় যেন হঠাৎ হাঁটা ভুলে গেল।
‎এক মিনিট যেন দশ মিনিটের সমান হয়ে উঠল।
‎মুগ্ধার বুকের ভেতর ধীরে ধীরে অস্বস্তি জমতে লাগল। ঘড়িতে এক ঘণ্টা পেরিয়ে গেছে।
‎ইখতিয়ারের কোনো খবর নেই। কোথাও কিছু হয়েছে না তো? বাইক নষ্ট? অ্যাক্সিডেন্ট?
‎রাস্তার কোনো ঝামেলা? নানারকম আশঙ্কা একসঙ্গে মাথায় ভিড় করতে লাগল।

‎মানুষ যখন কাউকে নিয়ে ভাবতে শুরু করে, তখন তার কল্পনাশক্তি সবচেয়ে ভয়ংকর রূপ ধারণ করে।
‎মুগ্ধারও তাই হলো। সে নিজেই নিজের ভয় বাড়াতে লাগল। বারবার ফোন হাতে নিল।
‎আবার রেখে দিল।
‎ফোন করলে বিরক্ত হবে না ?
‎বাইক চালানোর সময় ফোন ধরতে গিয়ে বিপদ হবে তো? তার বুকের ভেতর কেমন একটা অস্থিরতা কাজ করতে লাগল।
‎হঠাৎ সে নিজেই চমকে উঠল।
‎কেন এমন হচ্ছে? এত চিন্তা কেন?
‎তার স্বামী বলে? তিন কবুলের সম্পর্কে এত জোর?
‎মুগ্ধা চোখ বন্ধ করল। বুকের ভেতর অদ্ভুত এক অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ল। ঠিক যেন অচেনা কোনো লতা নীরবে হৃদয়ের চারপাশে জড়িয়ে ধরছে।

‎নিস্তব্ধ রাতের বুক চিরে ভেসে এলো পরিচিত ইঞ্জিনের শব্দ। মুগ্ধার মাথা ঝটকা দিয়ে উঠল।
‎সে দ্রুত নিচের দিকে তাকাল।
‎আর পরক্ষণেই তার মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
‎কালো একটা বাইক এসে থেমেছে বাড়ির সামনে।
‎বাইকের ওপর বসে আছে একজন। কালো ট্রাউজার। ছায়ারঙা গেঞ্জি। মাথায় কালো হেলমেট।
‎তবুও তাকে চিনতে এক সেকেন্ডও লাগল না।
‎ইখতিয়ার।
‎মুগ্ধার বুকের ভেতর যেন হঠাৎ শত শত আতশবাজি ফুটে উঠল। মুহূর্তের মধ্যে সমস্ত ভয়, সমস্ত উদ্বেগ,সমস্ত অস্থিরতা উধাও হয়ে গেল।
‎সে প্রায় দৌড়ে ঘরের ভেতর ঢুকল।
‎ব্যাগটা হাতে নিল। তারপর সিঁড়ির দিকে ছুটল।
‎নিচে বসে ছিলেন আয়েশা বেগম আর রেদোয়ান সাহেব। মুগ্ধার মুখের উজ্জ্বলতা দেখেই দুজনেরই হাসি পেয়ে গেল।
‎মুগ্ধা দ্রুত বলল,

‎”তোমাদের জামাই এসেছে।”
‎কথাটা বলেই দরজার দিকে এগিয়ে গেল।
‎ঠিক তখনই ইখতিয়ার বাইকটা সাইড করে ভেতরে প্রবেশ করল। হেলমেট খুলতেই পরিচিত মুখটা স্পষ্ট হয়ে উঠল। সে ভদ্রভাবে এগিয়ে এসে প্রথমে রেদোয়ান সাহেবের পা ছুঁয়ে সালাম করল।
‎তারপর আয়েশা বেগমের।
‎আয়েশা বেগম স্নেহভরা চোখে তাকালেন। মেয়েকে সুখে রাখার ক্ষমতা এই ছেলেটার আছে কিনা, সে প্রশ্ন তার মনে বহুবার এসেছে। কিন্তু আজ মুগ্ধার মুখের হাসি দেখে প্রশ্নটা যেন কিছুটা মুছে গেল। মুগ্ধার এই রাতবিরেতে ফিরে যাওয়ার ছটফটানি তারা কি বোঝেনি? অবশ্যই বুঝেছে। প্রশান্তি ও পেয়েছে।
‎কিছুক্ষণ কথাবার্তা ,খোঁজখবর নেওয়া হলো।
‎তারপর অনুমতি নিয়ে মুগ্ধাকে সঙ্গে করে বেরিয়ে এল ইখতিয়ার।

‎রাত আরও গভীর হয়েছে। চারপাশে লোকজন প্রায় নেই।
‎রাস্তা প্রায় ফাঁকা। দূরে কোথাও কুকুরের ডাক শোনা যাচ্ছে।উহু! শয়াল ও হতে পারে।চাঁদের আলোয় রাস্তা যেন রূপালি নদীর মতো ঝলমল করছে। ইখতিয়ার বাইকের পাশে দাঁড়িয়ে হেলমেট বের করছিল।
‎হঠাৎ দুটো নরম হাত এসে তাকে জড়িয়ে ধরল। আছড়ে পড়র ইখতিয়ারের বুকে। মুহূর্তের জন্য সে স্থির হয়ে গেল। মুগ্ধা?
‎মুগ্ধা তাকে জড়িয়ে ধরেছে।
‎শুধু জড়িয়েই ধরেনি। শক্ত করে ধরেছে।
‎এমনভাবে, যেন অনেকদিনের হারানো কিছু ফিরে পেয়েছে। যেন ছেড়ে দিলে আবার হারিয়ে যাবে।
‎ইখতিয়ারের শরীর জমে গেল।
‎শ্বাস আটকে যাওয়ার। অবস্থা। পৃথিবী যেন থেমে গেল তার।
‎এতদিন ধরে যে স্পর্শের জন্য তার ভাঙাচোরা হৃদয় নিঃশব্দে অপেক্ষা করেছে, সেই স্পর্শ আজ নিজে থেকেই তার কাছে এসেছে। কোনো অনুরোধ ছাড়া।
‎কোনো দাবি ছাড়া। শুধু ভালোবাসার টানে।
‎মুগ্ধা মুখ গুঁজে দিল তার বুকে। তার কণ্ঠ কাঁপছিল।
‎শ্বাসও। এক ঘণ্টার জমে থাকা ভয়, উদ্বেগ আর অপেক্ষা যেন সেই আলিঙ্গনের ভেতর গলে যেতে লাগল।
‎ইখতিয়ার ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ করল।
‎তারপর কাঁপা হাতে মুগ্ধার পিঠে হাত রাখল।
‎খুব সাবধানে। খুব যত্ন করে।
‎যেন বুকের মধ্যে কোনো কাঁচের পুতুল আগলে রেখেছে। উপরে আকাশে চাঁদ তখন নীরব সাক্ষী হয়ে তাকিয়ে আছে। চাঁদ হয়তো লজ্জা পেল! সাদা তুলোমেঘে চাদরে ঢেকে ফেলল নিজেকে
‎ইশতিয়াক বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল।
‎নিচে ইখতিয়ারের বাইকটা অন্ধকার রাস্তা কেটে দূরে মিলিয়ে যেতে দেখেছে। এবার বুঝি তার বোনের কপালে সুখ ধরা দিলো। আনন্দের প্রজাপ্রতিরা রঙ মাখালো। আলহামদুলিল্লাহ।

‎সে দুই হাত পকেটে ঢুকিয়ে দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ।
‎ তার নিজের বুকের ভেতরও অদ্ভুত এক অস্থিরতা।
‎মনে হচ্ছে ভালোবাসা নামক রোগটা সংক্রামক।
‎একজনের কাছ থেকে আরেকজনের গায়ে লেগে যায়। ইশতিয়াক ফিক করে হেসে ফেলল।
‎”ধুর! এদের দেখে আমারই প্রেম প্রেম লাগতেছে।”

‎বিড়বিড় করতে করতে নিজের ঘরে ঢুকল সে।
‎বিছানায় গা এলিয়ে দিয়ে ফোনটা হাতে নিল।
‎কয়েক সেকেন্ড স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থেকে একটা নাম্বারে কল দিল। দুইবার রিং হতেই কল রিসিভ হলো। ওপাশ থেকে ঘুম জড়ানো ভাঙা গলা ভেসে এলো—
‎”হ্যালো…”
‎শব্দটা শুনেই ইশতিয়াকের ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটল। সে চোখ বন্ধ করল। এই মেয়েটার ঘুম ঘুম কণ্ঠস্বরের একটা আলাদা জাদু আছে।
‎মনে হয় ভোরের শিশির কেউ শব্দ করে ঝরিয়ে দিচ্ছে। মনে হয় তুলোর মেঘের ভেতর থেকে কেউ ডাকছে। এইরকম আওয়াজ শুনে কি দূরে থাকা যায়? সম্ভব? একদমই না।
‎কিন্তু ইশতিয়াক তো ইশতিয়াক। সে ঠোঁট বাঁকিয়ে মুচকি হাসল। তারপর নরম গলায় গুনগুন করে সুরে গেয়ে উঠল—
‎” প্রাকটিক্যাল আমি লিখতেছি ,স্নিগ্ধা শুনছো?
‎পড়াশোনায় ফাঁকিবাজি করো না….
‎পরিক্ষা শেষে তুমি-আমি বিয়েতে বসিব,
‎ এ দূরত্ব আমার আর স’চ্চে না…

‎ম্যারিড লাইফ্ পর্ব ২৩

‎চুপ করে কেন? স্নিগ্ধা ইসলাম শুনছো?
‎আমি প্রেমে শেষ প্রায়…
‎প্রেমিক আমি অনাহারে দিন গুনছিইই,
‎অন্যের লুতুপুতু প্রেমে শরীর জ্বলে যায়য়য়”

‎ম্যারিড লাইফ্ পর্ব ২৫