Home ম্যারিড লাইফ্ ‎ম্যারিড লাইফ্ পর্ব ৩৭

‎ম্যারিড লাইফ্ পর্ব ৩৭

‎ম্যারিড লাইফ্ পর্ব ৩৭
‎রঙ্গনা মৈত্র ঊর্মি

বৃষ্টি সেই যে শুরু হয়েছে, থামার যেন কোনো নামগন্ধ নেই।
আকাশটা আজ যেন তার সমস্ত জমে থাকা অভিমান একসঙ্গে পৃথিবীর বুকের ওপর ঢেলে দিয়েছে। একটানা ঝরে পড়ছে জল—কখনো সরু সুতোর মতো, কখনো ঝাপসা পর্দার মতো ঘন হয়ে। দূরের গাছগুলো বৃষ্টির আড়ালে কেমন অস্পষ্ট হয়ে আছে, যেন জলরঙে আঁকা কোনো ছবির ওপর কেউ বারবার ভেজা তুলির আঁচড় টেনে দিয়েছে। বাতাসে ভেজা মাটির গন্ধ, পাতার গায়ে জমে থাকা জলের শব্দ আর ছাদের কার্নিশ বেয়ে টুপটাপ পড়তে থাকা ফোঁটার এক অদ্ভুত সুর।

সেই সুরের মাঝখানেই দাঁড়িয়ে আছে মুগ্ধা।
এতক্ষণে তার পরণের সুতার কাপড় টুকু শরীরের সঙ্গে মিশে গেছে। চুলগুলো ভিজে পিঠ জুড়ে লেপ্টে আছে, কিছু এলোমেলো গোছা গাল ছুঁয়ে নেমে এসেছে। বৃষ্টির ফোঁটাগুলো তার মুখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে—কোনটা জল, কোনটা হাসির ঝিলিক, বোঝার উপায় নেই। শিশুর মতো দুহাত ছড়িয়ে কখনো আকাশের দিকে তাকাচ্ছে, কখনো চোখ বন্ধ করে মুখ তুলে দিচ্ছে বৃষ্টির দিকে। মনে হচ্ছে, বহুদিন বন্দি থাকা কোনো পাখি হঠাৎ করে খোলা আকাশ পেয়ে গেছে।

বারান্দার একপাশে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ ধরেই তাকে দেখছিল ইখতিয়ার। প্রথমদিকে তার অর্ধাঙ্গিনীর এই শিশুসুলভ উচ্ছ্বাস দেখে ঠোঁটের কোণে অজান্তেই হাসি ফুটেছিল। কিন্তু সময় যত গড়িয়েছে, সেই হাসিটা ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেছে। মুগ্ধার কাঁধ কাঁপছে কি না, ঠোঁট নীলচে হয়ে যাচ্ছে কি না—ইখতিয়ারের চোখ এখন সেসবই খুঁজছে।
নিজের অসুবিধা নিয়ে তার কোনো মাথাব্যথা নেই। কিন্তু মুগ্ধার সামান্য হাঁচিতেও তার ভ্রু কুঁচকে যায়। ভালোবাসা কখন যে মানুষের ভেতরে এভাবে নীরব পাহারাদার হয়ে বসে থাকে, ইখতিয়ার হয়তো নিজেও জানে না।

অবশেষে আর সহ্য হলো না। বৃষ্টির মধ্যেই এগিয়ে গেল সে। ভেজা মেঝেতে তার পায়ের শব্দ প্রায় হারিয়ে গেল জলের শব্দে। মুগ্ধা তাকে এগিয়ে আসতে দেখে ঘুরে দাঁড়াল। চোখে সেই একই দুষ্টু ঝিলিক। ইখতিয়ার কাছে গিয়ে তার হাতটা ধরল।
“ভেতরে চলো।”

মুগ্ধা প্রথমে বাধ্য মেয়ের মতো মাথা নাড়ল। তারপরই মুখটা এমন করে বাঁকাল, যেন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় অন্যায়টা এইমাত্র তার সঙ্গে করা হয়েছে। আরও কিছুক্ষণ ভিজতে চায় সে।
সেই আবদার তার চোখেমুখে এমনভাবে ছড়িয়ে ছিল যে, কথার খুব একটা প্রয়োজন পড়ল না। ভেজা চোখের পাতার নিচে শিশুর মতো অনুরোধ, ঠোঁটের কোণে চাপা হাসি—সব মিলিয়ে এমন এক মুখ, যাকে দেখে রাগ ধরে রাখা কঠিন।

কিন্তু ইখতিয়ার এবার নড়ল না। তার হাত ধরে ভেতরের দিকে টানতে চাইল।
মুগ্ধা গেল না।
বরং দুপা আরও শক্ত করে মাটিতে গেঁথে দাঁড়াল। যেন সে কোনো মানুষ নয়, বর্ষার মাটিতে শেকড় ছড়িয়ে থাকা একগুঁয়ে গাছ। যতই বাতাস বইুক, যতই কেউ টানুক—আজ তাকে নড়ানো যাবে না।
ইখতিয়ার আবারও সামান্য টান দিল।
তবুও না। তারপরই থেমে গেল সে।
মুগ্ধার দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ইচ্ছা করলেই সে জোরে টেনে নিয়ে যেতে পারত। তার হাতের শক্তি মুগ্ধার চেয়ে অনেক বেশি। কিন্তু ভেজা মেঝে। চারদিকে পানি। একটু অসাবধান হলেই পা পিছলে যেতে পারে মুগ্ধার। আর সেই আশঙ্কাটুকুই ইখতিয়ারের সমস্ত জোরকে মুহূর্তে থামিয়ে দিল।
তার কাছে মুগ্ধাকে জোর করে সরিয়ে নেওয়ার চেয়ে, তাকে নিরাপদে রাখা অনেক বেশি জরুরি।

ইখতিয়ারের ভেজা চুল কপালের ওপর নেমে এসেছে। গাঢ় চোখ দুটোতে বিরক্তির ছায়া থাকলেও তার নিচে লুকিয়ে আছে গভীর উদ্বেগ। বৃষ্টিতে ভেজা শার্ট শরীরের সঙ্গে লেপ্টে আছে, প্রশস্ত কাঁধ থেকে টপটপ করে পানি পড়ছে। মুখের চোয়াল শক্ত হয়ে আছে—যেন নিজের ধৈর্যের শেষ সীমায় দাঁড়িয়ে থাকা একজন মানুষ।
সে একবার মুগ্ধার দিকে তাকাল। তারপর চারপাশে তাকাল। কেউ আছে কি না! না কেউ নেই আশেপাশে। সব ছাদ ই ফাঁকা, তাদের লক্ষ করার মতো কেউ নেই।
পরের মুহূর্তেই এমন কিছু ঘটল, যার জন্য মুগ্ধা একদম প্রস্তুত ছিল না। ইখতিয়ার হঠাৎ নিচু হয়ে তাকে দুই হাতে তুলে নিল। এক হাত মুগ্ধার হাঁটুর নিচে, আরেক হাত তার পিঠের নিচে।
মুগ্ধা বিস্ময়ে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইল। তার শরীর মুহূর্তের জন্য শক্ত হয়ে গিয়েছিল। তারপরই আতঙ্ক আর লজ্জার মিশ্র অনুভূতিতে দুহাত উঠে গেল ইখতিয়ারের শার্টের কলারের কাছে। শক্ত করে চেপে ধরল সে।
যেন হঠাৎ উত্তাল নদীর মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা একটি ছোট নৌকা তার একমাত্র নোঙর খুঁজে পেয়েছে। ইখতিয়ারের বুকের সঙ্গে লেপ্টে আছে মুগ্ধা।

 

ইখতিয়ার কোনো কথা বলল না। শুধু দৃঢ় পায়ে এগিয়ে চলল নিজেদের ঘরের দিকে। ভেজা সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময় তার প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল সাবধানী। যেন নিজের হাতে শুধু একজন মানুষকে নয়, নিজের পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান জিনিসটাকেই বহন করছে। মুগ্ধা তার কলার ছাড়ল না। ইখতিয়ারও তাকে নামাল না।
ঘরের সামনে পৌঁছে দরজা খুলে সরাসরি ওয়াশরুমের দিকে গেল। সেখানে গিয়ে ধীরে ধীরে তাকে নামিয়ে দিল। মুগ্ধার পা মেঝেতে পড়তেই সে আবার মুখ বাঁকিয়ে দাঁড়াল।
তার চোখে তখনও বৃষ্টির জন্য অসমাপ্ত আবদার।
মনে হচ্ছে, সুযোগ পেলেই আবার ছুটে বেরিয়ে যাবে। ইখতিয়ার সেই মুখের দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইল। তারপর মাথা নেড়ে ওয়াশরুমের দরজাটা ভেজিয়ে দিল।
মুগ্ধাকে ভেতরে রেখে বাইরে এসে নিজের ভেজা জামাকাপড় বদলে ফেলল। শরীর থেকে ভেজা কাপড় সরিয়ে শুকনো পোশাক পরে নিলেও তার মনটা স্থির হলো না। কারণ চোখ পড়তেই সে
বুঝল—তাদের দুজনের বৃষ্টিভেজা অভিযানের ফলাফল পুরো সিঁড়িজুড়ে ছড়িয়ে আছে। ভেজা পায়ের ছাপ। মেঝেটা এমন হয়ে গেছে যেন ঘরের ভেতর দিয়ে ছোটখাটো একটা নদী বয়ে গেছে।

ইখতিয়ার কপালে হাত দিল। তারপর দ্রুত একটা শুকনো ভাঙা হাতে নিয়ে মেঝে মুছতে শুরু করল।
সিঁড়ির ধাপ থেকে করিডোর পর্যন্ত জায়গাগুলোতে পানি জমে আছে। কোথাও কোথাও এতটাই ভিজে যে পা পড়লেই পিছলে যাওয়ার সম্ভাবনা। সে দ্রুত একবার মুছে আবার কাপড়টা নিংড়াল।
আবার মুছল। তার মুখে বিরক্তির ছাপ স্পষ্ট।
কিন্তু সেই বিরক্তি মুগ্ধার ওপর নয়। বরং নিজের ভাগ্যের ওপর।
কারণ সে খুব ভালো করেই জানে, এই পানি না মোছা থাকলে একটু পরে মুগ্ধাই হাঁটতে গিয়ে পিছলে পড়বে। আর মুগ্ধা না পড়লেও ইশতিয়াকের পড়ার সম্ভাবনা শতভাগ।
ইশতিয়াক এমন মানুষ, যার সামনে শুকনো মেঝেও বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। আর এই ভেজা সিঁড়ি? সেই সম্ভাবনা মাথায় আসতেই আরও দ্রুত হাত চালাল সে।

 

 

 

 

 

 

বৃষ্টি বাড়তেই আছে। থামাথামির কোনো নাম নেই।
কিছুক্ষণ আগেও পৃথিবীটা অন্তত নিজের চেনা আলোটুকু ধরে রেখেছিল। আকাশ ধূসর ছিল, চারপাশ ভিজে ছিল, কিন্তু দিনের অস্তিত্ব বোঝা যাচ্ছিল। এখন কালো মেঘের আনাগোনায় সেই আলোটুকুও যেন ধীরে ধীরে গিলে ফেলেছে অন্ধকার। দুপুরবেলাতেই চারপাশ এমন মলিন হয়ে এসেছে, যেন সন্ধ্যা ভুল করে অনেক আগেই নেমে পড়েছে।
আকাশের বুকজুড়ে কালো মেঘগুলো ছুটে বেড়াচ্ছে—মনে হচ্ছে, শত শত অভিমানী মানুষ একসঙ্গে মুখ ভার করে দাঁড়িয়ে আছে। মাঝেমধ্যে বিদ্যুতের চিকচিক আলো সেই অন্ধকারকে ছিঁড়ে ফেলছে এক মুহূর্তের জন্য, তারপর আবার সবকিছু ডুবে যাচ্ছে বৃষ্টির ঘন পর্দার আড়ালে।
ঠিক সেই বৃষ্টি ভেদ করে মেরুন রঙা বাইকটা এসে থামল মুগ্ধাদের বাড়ির সামনে।
ইশতিয়াক সম্পূর্ণ ভিজে গেছে।
হেলমেটের ওপর থেকে পানি গড়িয়ে পড়ছে, শার্ট ভিজে শরীরের সঙ্গে লেপ্টে আছে, চুলের ডগা থেকে অনবরত জল ঝরছে। াইকটা একপাশে দাঁড় করিয়ে সে দ্রুত গেট পেরোল।

কলিংবেলের শব্দটা ঘরের নীরবতার মধ্যে ছড়িয়ে পড়তেই ভেতর থেকে পায়ের শব্দ শোনা গেল।
দরজা খুলল স্নিগ্ধা। আর দরজা খুলেই যেন সময়টা এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল।
সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ভেজা মানুষটাকে দেখে প্রথমে তার চোখ দুটো বিস্ময়ে বড় হয়ে উঠল। তারপর সেই বিস্ময় মুহূর্তের মধ্যে বদলে গেল উদ্বেগে। স্নিগ্ধার মুখের রং কেমন ফিকে হয়ে গেল। এত বৃষ্টির মধ্যে কেউ এভাবে বাইক চালিয়ে আসে?
তার চোখ দ্রুত ইশতিয়াকের মাথা থেকে পা পর্যন্ত ঘুরে গেল। কোথাও আঘাত পেয়েছে কি না, ঠান্ডায় কাঁপছে কি না—যেন এক মুহূর্তেই হাজারটা প্রশ্ন তার চোখের মধ্যে ভিড় করে এসেছে।
কিন্তু সেই উদ্বেগের প্রকাশ সে মুখে আনল না।
বরং খুব দ্রুত একপাশে সরে দাঁড়াল।
ইশতিয়াক ভেতরে ঢুকতেই স্নিগ্ধা তাড়াহুড়ো করে একটা গামছা এনে এগিয়ে দিল। চোখ তুলে তার দিকে তাকাল না পর্যন্ত। যেন গামছাটা ইশতিয়াকের হাতে দেওয়াটাও কেবল একজন অতিথির প্রতি দায়িত্ব—এর বেশি কিছু নয়।

ইশতিয়াক গামছাটা হাতে নিয়ে একবার তার দিকে তাকাল। স্নিগ্ধা ততক্ষণে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে।
তার এই এড়িয়ে যাওয়ার ভঙ্গিটা অদ্ভুতভাবে বিঁধল ইশতিয়াকের ভেতরে। অথচ সেই কষ্টের প্রকাশ মুখে এল না। সে শুধু ধীরে ধীরে মাথার পানি মুছতে লাগল।ঠিক তখনই রান্নাঘরের দিক থেকে প্রায় ছুটে এলেন আয়েশা বেগম।
“আল্লাহ! এই বৃষ্টির মধ্যে ভিজে ভিজে এসেছিস কেন বাবা?”
তার কণ্ঠে এমন উদ্বেগ, যেন বহুদিন পর নিজের ছেলে দূরদেশ থেকে ফিরে এসেছে।
ইশতিৎআক তার চিরচেনা হাসি উপহার দিলো বলল,
“আন্টি একটু বাইরে বেরিয়েছিলাম, হঠাৎ বৃষ্টি ধরে ফেলেছে, দেখি তোমাদের বাড়ি কাছে চলে আসছি”
“তা বেশ করেছিস বাপ, তাড়াতাড়ি মাথা মুছে নে”
পেছন থেকে রেজোওয়ান তালুকদারও বেরিয়ে এলেন। হাতে তখনও খাবারের চামচ। ইশতিয়াককে দেখে প্রথমে ভ্রু কুঁচকালেন, তারপর মুখে হাসি ফুটল।
“বাহ! বৃষ্টি দেখতে বেরিয়েছিলে, নাকি বৃষ্টিকে সঙ্গে নিয়ে এসেছ?”

ইশতিয়াক গামছা দিয়ে চুল মুছতে মুছতে বলল,
“আঙ্কেল, বৃষ্টি আমাকে ছাড়তেই চায়নি। আমি তো অনেক বুঝিয়েছি।”

রেজোওয়ান তালুকদার গম্ভীর মুখে মাথা নাড়লেন।
“তা বুঝতেই পারছি। তোমার মতো ছেলেকে ছাড়তে বৃষ্টিরও কষ্ট হওয়ার কথা।”

আয়েশা বেগম বিরক্ত চোখে স্বামীর দিকে তাকালেন।
“আপনার সবকিছুতেই মজা করতে হবে?”
“না করলে কি বৃষ্টির পানি শুকিয়ে যাবে?”

ইশতিয়াক হেসে ফেলল।
স্নিগ্ধা দূরে দাঁড়িয়ে ছিল। তার ঠোঁটের কোণেও অতি ক্ষণিকের জন্য হাসি এসেছিল, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গেই সেটা চাপা দিয়ে ফেলল।
কিছুক্ষণ পর ইশতিয়াককে ডাইনিং টেবিলে বসানো হলো।

আজকের আবহাওয়ার সঙ্গে মানানসই করেই রান্না হয়েছে গরম গরম খিচুড়ি। সঙ্গে সুগন্ধি রোস্ট। বৃষ্টির দিনে ধোঁয়া ওঠা খিচুড়ির গন্ধ যেন ঘরের ভেতর আলাদা একটা উৎসব তৈরি করে। বাইরে যতই পৃথিবী ভিজে যাক, ভেতরে গরম খাবারের গন্ধ মানুষের মনকে অদ্ভুতভাবে নিরাপদ করে দেয়।
আয়েশা বেগম প্লেটে খাবার দিতে দিতে বললেন,
“ভিজে এসেছ, আগে ভালো করে খাও। তারপর যা বলার বলবে।”

ইশতিয়াক প্লেটের দিকে তাকিয়ে বলল,
“খিচুড়ি দেখে মনে হচ্ছে আমি ঠিক সময়েই এসেছি।”

রেজোওয়ান তালুকদার সঙ্গে সঙ্গে বললেন,
“তুমি সময় বুঝে আসোনি। খিচুড়ি তোমাকে ডেকে এনেছে।”
“তাহলে খিচুড়ির সঙ্গে আমার আত্মিক সম্পর্ক আছে। তাই না আঙ্কেল?”
“সেটা খেয়ে প্রমাণ করো। কথা দিয়ে নয়। বৃক্ষ তোমার নাম কি? ফলে পরিচয়”

আয়েশা বেগম এবার হেসে ফেললেন। এমনকি স্নিগ্ধাও মুখ নিচু করে হাসি লুকানোর চেষ্টা করল।
খাওয়ার মাঝখানেই ইশতিয়াকের ফোন বেজে উঠল। স্ক্রিনে ইখতিয়ারের নাম।
ইশতিয়াক ফোনটা হাতে নিয়ে একবার সবার দিকে তাকাল। তারপর কল রিসিভ করল।
ওপাশ থেকে ইখতিয়ারের গম্ভীর কণ্ঠ।
খোঁজ নিচ্ছে সে কোথায় আছে, ঠিকঠাক জায়গায় পৌঁছেছে কি না। বৃষ্টির মধ্যে বাইক নিয়ে বের হওয়ার জন্য নিশ্চয়ই কিছুটা বিরক্তিও প্রকাশ করেছে। ইশতিয়াক ফোন কানে রেখেই চোখ টিপে বলল,
“আমি জীবিত আছি, ভাইয়া। আর বর্তমানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটা কাজে ব্যস্ত।”

ইখতিয়ার সম্ভবত জিজ্ঞেস করেছিল কী কাজ। ফোনে কথা বলায় কেউ ইখতিয়ারের ঠিকঠাক শুনতে পেল না।ইশতিয়াক খিচুড়ির প্লেটের দিকে তাকিয়ে বলল,
“জাতীয় দায়িত্ব। খিচুড়ি ও রোস্টের নিরাপত্তা নিশ্চিত করছি।”

ওপাশ থেকে কী বলা হলো, সেটা কেউ শুনতে পেল না। তবে ইশতিয়াকের মুখের হাসি দেখে বোঝা গেল খুব একটা মধুর কিছু ছিল না।কল কেটে সে আবার খেতে শুরু করল।
কিন্তু খাওয়া শেষ হওয়ার পর তার ভেতরের মানুষটা আর আগের মতো হালকা রইল না।
কিছু কথা ছিল।অনেকদিন ধরে জমে থাকা কথা।
যে কথাগুলো হাসি-ঠাট্টার আড়ালে লুকিয়ে রাখা যায়, কিন্তু চিরকাল চাপা দিয়ে রাখা যায় না।
ইশতিয়াক ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল।
আয়েশা বেগম আর রেজোওয়ান তালুকদার তখনও খাওয়া শেষ করেননি। নিজেদের কথায় ব্যস্ত। এই সুযোগেই ইশতিয়াক চোখ দিয়ে স্নিগ্ধাকে ইশারা করল।
স্নিগ্ধা প্রথমে বুঝেও না বোঝার ভান করল।
তারপর অন্যদিকে হাঁটতে চাইলে ইশতিয়াকও ধীরে ধীরে তার পেছনে গেল।

ঘরের একটু নিরিবিলি অংশে গিয়ে স্নিগ্ধা থেমে দাঁড়াল। মাথা নিচু।
দুহাতের আঙুল একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে।
ইশতিয়াক তার সামনে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ কোনো কথা বলল না।
বাইরে বৃষ্টির শব্দ আরও বেড়েছে।
সেই শব্দের মাঝেই তার কণ্ঠটা এবার অস্বাভাবিক নরম হয়ে এল। হাসিখুশি, দুষ্টুমি করা মানুষটার কণ্ঠেও কখনো কখনো এমন ভারী আবেগ জমে থাকে—যা শুনলে বোঝা যায়, সব হাসির পেছনেও কিছু না বলা কষ্ট থাকে।
“আমাকে এড়িয়ে যাচ্ছ কেন?”

স্নিগ্ধা একবারও মাথা তুলল না। তার চোখ মেঝের দিকে। ইশতিয়াকের বিরক্ত লাগল। সে স্নিগ্ধার হাত ধরে কাছে আনল। তবে হাত ছাড়া আর কোন কিছুই যেন স্পর্শ না হয় এমন ভাবে। স্নিগ্ধা ভড়কাল। বড়বড় চোখ করে তাকালো ইশতিয়াকের দিকে। ইশতিয়াক চোখে চোখ রাখল। মৃদু শব্দে আওড়ালো,
“স্নিগ্ধা তুমি কিন্তু জানো আমি আমার প্রিয়মানুষদের ইগনোর নিতে পারি না, কষ্ট হয়, সেখানে তুমি প্রিয়র থেকেও প্রিয়, এমন করছো কেন তুমি?”
ইশতিয়াকের গলা ভেঙ্গে এলো। কি জানি! এই মেয়ের বেলায় এত আবেগ কেন কাজ করে? সামান্য দূরত্বেও যেন ইশতিয়াক পা ছুঁয়ে কাঁদতে পারে। অথচ ইশতিয়াক এইসব ব্যাপারে বরাবর নাক উঁচু ছেলে। সামান্য সরি শব্দটা আওড়াতে হাজার বার ভাবে। কিন্তু এই মেয়ের কাছে সব মিছে হয়ে যায়।
স্নিগ্ধা ইশতিয়াকের থেকে দূরে যাওয়ার চেষ্টা করল। ফিসফিস করে বলল,
“বেশি বাড়াবাড়ি করবা না, আমি কিন্তু আম্মু আব্বু কে ডাকব”

‎ম্যারিড লাইফ্ পর্ব ৩৬

ইশতিয়াক নাকমুখ কুঁচকে গেলো । চোখ পাকিয়ে বলল,
“হ্যাঁ তা তো বলবাই, যার জন্য চুরি করি থুড়ি কুত্তামরা বৃষ্টিতে কাকভেজা হয়ে আসলাম দেখি সেই মাইকিং করে বেড়াচ্ছে। হয় হয় এমন হয়, মিউ মিউ করি তো পাত্তা দাও না, হালুম ডাকলে ঠিক আসতে”
স্নিগ্ধার ঠোঁটের কোণে হালকা হাসির রেখা ফুটে উঠল । ইশতিয়াক কি খেয়াল করল? হয়তো। হয়তো বা না।

‎ম্যারিড লাইফ্ পর্ব ৩৮

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here