Home ম্যারিড লাইফ্ ‎ম্যারিড লাইফ্ পর্ব ৩

‎ম্যারিড লাইফ্ পর্ব ৩

‎ম্যারিড লাইফ্ পর্ব ৩
‎রঙ্গনা মৈত্র ঊর্মি

‎সকালবেলার আবহাওয়াটা আজ অদ্ভুত রকম শান্ত।
‎রোদ উঠেছে, কিন্তু সেই রোদের তেজ নেই। হালকা সোনালি আলো জানালার ফাঁক দিয়ে ঘরের মেঝেতে পড়েছে। বাইরে নারকেল গাছের পাতায় নরম বাতাস লেগে সসস শব্দ উঠছে। দূরে কোথাও শালিক ডাকছে টুপটাপ।
‎বাড়ির সবাই মোটামুটি দিনের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে।
‎রান্নাঘর থেকে ভাজা পেঁয়াজের গন্ধ আসছে। ইন্তিয়া পারভীন নাস্তা বানাচ্ছেন। ইশতিয়াক উঠোনে দাঁড়িয়ে কারও সাথে ফোনে তর্ক করছে। আর মুগ্ধা ডাইনিং টেবিলে বসে চুপচাপ চা খাচ্ছে। মাথায় আলগা ওড়না। ঘুমঘুম মুখ।

‎ইখতিয়ার অফিসে যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছে।
‎কালো প্যান্ট, হালকা ধূসর শার্ট। হাতঘড়িটা পড়তে পড়তে একবার ডাইনিংয়ের দিকে তাকালো সে। মুগ্ধা তখন কাপের ধোঁয়ার দিকে তাকিয়ে আনমনা হয়ে বসে আছে।
‎এক সেকেন্ডের জন্য ইখতিয়ারের চোখ থেমে রইল।
‎তারপর ধীরে দৃষ্টি সরিয়ে নিল।
‎আজ সকালে একটা কাজ আবশ্যক।
‎লোকটা ধীর পায়ে রহিমা খাতুনের ঘরের দিকে এগোল।
‎ঘরটার জানালা আধখোলা। বাইরে মেঘ জমছে একটু একটু করে। বাতাসে বৃষ্টির আগের স্যাঁতস্যাঁতে গন্ধ।
‎রহিমা খাতুন খাটে বসে তসবিহ পড়ছিলেন। ইখতিয়ারকে দেখে চোখ তুললেন।
‎“অফিসে যাইবা?”
‎“হ দাদি।”
‎ইখতিয়ার দরজার পাশে কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে রইল। তারপর ভেতরে এসে চেয়ার টেনে বসল।
‎রহিমা খাতুন ভ্রু কুঁচকালেন।
‎“কিছু কইবি?”
‎ইখতিয়ার শান্ত স্বরে বলল, “একটা কথা ছিল।”
‎“ক।”

‎বাইরে হালকা বাতাস উঠেছে। জানালার পর্দা আস্তে দুলছে।
‎ইখতিয়ার কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। যেন কথাগুলো গুছিয়ে নিচ্ছে।
‎তারপর ধীরে বলল,
‎ “আপনি ইশতিয়াক আর মুগ্ধারে নিয়ে যেভাবে বলেন… ওইটা আর বইলেন না দাদি।”
‎রহিমা খাতুন মুখ বাঁকালেন সঙ্গে সঙ্গে।
‎“আমি আবার কি কইলাম?”
‎“যা বলেন, ওইটা ওদের খারাপ লাগে।”
‎“খারাপ লাগলে আমার কি?”
‎ইখতিয়ার এবার সরাসরি তাকালো তার দিকে। চোখদুটো শান্ত, কিন্তু স্থির।
‎“ইশতিয়াক আর মুগ্ধা ছোটবেলা থেইকা একসাথে বড় হইছে। ওরা বেস্ট ফ্রেন্ড।”
‎রহিমা ঠোঁট উল্টালেন।
‎ “বন্ধুত্বের নাম দিয়া আজকাল কত কি হয়!”
‎ইখতিয়ার ধীরে নিঃশ্বাস ফেলল।
‎“সব সম্পর্ক খারাপ না দাদি।”
‎“তুমি ছোট মানুষ। দুনিয়া এত সহজ না।”
‎“আমি সহজ বলতেছি না। শুধু বলতেছি, ওদের সম্পর্কটা অন্যরকম।”

‎বাইরে মেঘ গর্জে উঠল আস্তে।
‎ঘরের ভেতর কয়েক সেকেন্ড নীরবতা নেমে এলো।
‎ইখতিয়ার আবার বলল,
‎ “মুগ্ধা এই বাড়িতে নতুন। আপনি এমন কথা বললে ও অস্বস্তিতে পড়ে।”
‎“অস্বস্তি হইলে হইব।”
‎“না, হওয়া উচিত না।”
‎লোকটার গলায় রাগ নেই। কোনো উঁচু স্বর নেই। কিন্তু কথাগুলো কেমন শক্ত।
‎রহিমা খাতুন এবার তসবিহ নামিয়ে রাখলেন।
‎“তুমি তোমার বউরে বেশি মাথায় তুলতেছো।”
‎ইখতিয়ার মাথা নাড়ল।
‎ “আমি কাউরে মাথায় তুলতেছি না। শুধু অন্যায় কথা বন্ধ করতে বলতেছি।”
‎“অন্যায়?”
‎“হ।”
‎রহিমা এবার একটু চুপ করলেন।
‎ইখতিয়ার ধীরে বলল,
‎“ইশতিয়াক মুগ্ধারে নিজের বোনের মতোই দেখে। ছোটবেলা থেকে তাই দেখে আসতেছি।”
‎“তুমি এত জোর দিচ্ছ কেমনে?”
‎“কারণ আমি ওদের দুইজনরে ছোট থেকে দেখতেছি।”

‎বাইরে বাতাসটা ঠান্ডা হয়ে উঠছে ধীরে ধীরে। মনে হচ্ছে কিছুক্ষণের মধ্যেই বৃষ্টি নামবে।
‎ইখতিয়ার নিচু স্বরে বলল,
‎ “সবকিছুর মধ্যে খারাপ কিছু খুঁজলে সম্পর্ক নষ্ট হয় দাদি।”
‎রহিমা খাতুন মুখ ফিরিয়ে জানালার দিকে তাকালেন।
‎“আমি বুড়া মানুষ। যা বুঝি তাই কই।”
‎“সব বুঝা ঠিক না।”
‎কথাটা খুব আস্তে বলল ইখতিয়ার।
‎তারপর উঠে দাঁড়াল।
‎“আমি অফিসে যাই।”
‎দরজার কাছে গিয়ে আবার থামল সে।
‎“আর একটা কথা।”
‎রহিমা তাকালেন।
‎ইখতিয়ার শান্ত গলায় বলল,
‎“মুগ্ধা অনেক ভালো মেয়ে। ওরে কষ্ট দিয়েন না।”
‎এক টমুহূর্তের জন্য রহিমা খাতুনের মুখে কোনো কথা এলো না।
‎ইখতিয়ার ধীরে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
‎ঠিক তখনই বাইরে বৃষ্টি নামল।
‎টুপ… টাপ… টুপ…
‎ছাদের কার্নিশ বেয়ে পানি পড়ছে। বাতাসে ভেজা মাটির গন্ধ ছড়িয়ে গেল পুরো বাড়িজুড়ে।
‎ডাইনিংয়ে বসে থাকা মুগ্ধা চমকে বাইরে তাকালো।
‎আর রহিমা খাতুন স্থির হয়ে বসে রইলেন।
‎বড় নাতিটা আজ প্রথমবারের মতো তার কথার জবাব দিয়ে গেল।

‎বিকেলের প্রথম ভাগ।
‎আকাশে ভারী মেঘ। শহরের উঁচু বিল্ডিংগুলো ধূসর আলোয় কেমন নিস্তেজ লাগছে। দূরে কোথাও বৃষ্টি নামছে হয়তো। বাতাসে ভেজা গন্ধ।
‎অফিসের কাঁচঘেরা কেবিনে বসে আছে ইখতিয়ার।
‎টেবিলের উপর ফাইলের স্তূপ। ল্যাপটপের স্ক্রিনে নকশা খোলা। একটা বড় প্রজেক্ট শেষ হয়েছে আজ।
‎কিছুক্ষণ আগেই বস এসে প্রমোশনের খবর দিয়েছে।
‎”কনগ্ৰাজুলেশন, মি. ইখতিয়ার আহমেদ”
‎সবাই হাত মিলিয়েছে। কেউ পিঠ চাপড়ে দিয়েছে। কেউ বলেছে, “ইউ ডিজার্ভ দিজ.”
‎ইখতিয়ার শুধু ছোট্ট হাসি দিয়েছে।
‎এখন পুরো অফিস ফাঁকা হয়ে আসছে ধীরে ধীরে। বাইরে মেঘের ছায়া পড়েছে কাঁচের গায়ে।
‎ইখতিয়ার চেয়ারে হেলান দিল।
‎ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে সে সফল। ভালো চাকরি। ভালো স্যালারি। সম্মান।
‎সব আছে।
‎তবুও বুকের ভেতর কোথাও কেমন শূন্য লাগে।
‎বাইরে বাতাসে গাছের ডাল দুলছে। ঠিক তার নিজের জীবনের মতো। বাইরে সব স্থির। ভেতরে অদৃশ্য ঝড়।
‎মুগ্ধার কথা মনে পড়ল।
‎মেয়েটা সকালেও হাসিমুখে পানি এগিয়ে দিয়েছিল।

‎প্রতিদিন দেয়।
‎প্রতিদিন কথা বলার চেষ্টা করে।
‎আর সে?
‎সে ইচ্ছে করেই দূরে থাকে।
‎চোখ বন্ধ করল ইখতিয়ার।
‎তার নিজের উপরই বিরক্ত লাগে মাঝে মাঝে।
‎মুগ্ধা কোনো ভুল করে না। বরং অতিরিক্ত ভালো।
‎এ বাড়ির সবার সাথে মিশে গেছে। ইন্তিয়া মেয়ের মতো ভালোবাসে। আব্বু ওকে নিয়ে বাজার থেকে পছন্দের খাবার আনে। ইশতিয়াক তো পাগল প্রায় ওর জন্য।
‎শুধু সে…
‎সে-ই দূরে।
‎বাইরে মেঘ গর্জে উঠল হালকা।
‎ইখতিয়ার ধীরে নিঃশ্বাস ফেলল।
‎মুগ্ধা যখন হাসে, পুরো মুখ উজ্জ্বল হয়ে যায়। কথা বললে চোখদুটো চিকচিক করে। মন খারাপ হলে চুপচাপ বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকে।
‎সব সে খেয়াল করে।
‎সব।

‎তবুও কাছে যায় না।
‎কারণ সে জানে— যত কাছে যাবে, তত ডুবে যাবে।
‎আর ডোবার অধিকার তার নেই।
‎ইখতিয়ার টেবিলে রাখা ফোনটা হাতে নিল।
‎ওয়ালপেপারে একটা পরিবারের ছবি। বিয়ের পর তোলা। মুগ্ধা পাশে দাঁড়িয়ে আছে। ঠোঁটে ছোট্ট হাসি।
‎ইখতিয়ারের বুকের ভেতর মোচড় দিল।
‎সে অন্যায় করছে।
‎খুব।
‎একটা মেয়েকে বিয়ে করে এভাবে দূরে রাখা ঠিক না।
‎কিন্তু তার কিছু করারও নেই।
‎কিছু অনুভূতি মানুষ নিজের ইচ্ছায় বদলাতে পারে না।
‎জানালার বাইরে বৃষ্টি নামতে শুরু করেছে এবার। ছোট ছোট ফোঁটা কাঁচে আঘাত করছে।
‎ইখতিয়ার স্থির চোখে তাকিয়ে রইল।
‎তার জীবনটাও এমন। বাইরে থেকে শান্ত। ভেতরে জমে থাকা বৃষ্টি। আকাশের অশ্রুতে কারো হৃদয়বান, আবার কারো উল্লাস।

‎বিকেলের দিকে বৃষ্টি থেমেছে। উঠোনে জমে থাকা পানিতে আকাশের ধূসর রং পড়েছে। বাতাসে ভেজা মাটির গন্ধ।
‎গেট খুলে ভেতরে ঢুকলেন ইসরায়েল শেখ।
‎দুই হাতে বাজারের ব্যাগ।
‎ইশতিয়াক সাথে সাথে দৌড়ে গেল।
‎“আব্বু কি আনছো?”
‎ইসরায়েল শেখ ব্যাগ সরিয়ে বললেন,
‎ “হাত দিস না।”
‎“ক্যান!”
‎“এইটা মুগ্ধা আম্মুর জন্য।”
‎মুহূর্তে মুখ বাঁকা হয়ে গেল ইশতিয়াকের।
‎“আমি কি পালক পোলা?”

‎ড্রয়িংরুমে বসে থাকা মুগ্ধার হাসি পেল।
‎ইন্তিয়া রান্নাঘর থেকে বের হয়ে বললেন,
‎ “কি আনছেন আবার?”
‎ইসরায়েল শেখ গর্বের সাথে বললেন,
‎“মুগ্ধা কাঁচা আমের আচার পছন্দ করে না? পাইছি বাজারে।”
‎মুগ্ধার চোখ চকচক করে উঠল।
‎ “সত্যি আব্বু?”
‎“হ।”
‎ব্যাগ থেকে আরেকটা প্যাকেট বের করলেন তিনি। “আর এইটা ফুচকা।”
‎“আল্লাহ!”
‎মুগ্ধা একদম ছোট বাচ্চাদের মতো খুশি হয়ে গেল।
‎ইশতিয়াক বুক চেপে ধরল।
‎ “আম্মু, আমি এই বাড়িতে অবহেলিত।”
‎ইসরাফিল শেখ হেসে উঠলেন।
‎“তোরে ফুচকা দিলে দোকান বন্ধ হয়ে যাইত।”
‎“চাচ্চু!”

‎পুরো বাড়ি হাসিতে ভরে গেল।
‎রাফেয়া রান্নাঘর থেকে বললেন,
‎ “মুগ্ধা, আগে হাতমুখ ধুয়ে আয়।”
‎“আচ্ছা চাচি।”
‎মুগ্ধা উঠতেই রহিমা খাতুন মুখ বাঁকালেন।
‎“হুম, বউরে এমন মাথায় তুলছো যেন রানী।”

‎ইন্তিয়ার মুখটা অস্বস্তিতে পড়ল।
‎ইসরায়েল শেখ শান্ত গলায় বললেন,
‎ “ছোট মাইয়া মানুষ। ভালোবাসলে সমস্যা কি?”
‎“সমস্যা পরে বুঝবা।”
‎“দাদি আবার শুরু করছে…দজ্জা’ল বুড়ি একটা”
‎বিড়বিড় করল ইশতিয়াক।
‎রহিমা শুনে ফেললেন।
‎“কি কইলি?”
‎“কিছু না।”
‎মুগ্ধা দ্রুত বিষয় পাল্টাতে বলল,
‎ “আব্বু, ফুচকা এখন খাব?”
‎“হ, খাও।”
‎ইশতিয়াক সাথে সাথে প্লেট টান দিল।
‎“আমি আগে খাব।”
‎“এইটা মুগ্ধার জন্য!”
‎বললেন ইসরায়েল শেখ।
‎“সবকিছু মুগ্ধার জন্য ক্যান!”
‎মুগ্ধা হেসে বলল,
‎“কারণ আমি আব্বুর ভালো মেয়ে।”
‎“আমি খারাপ?”
‎“অনেক।”
‎“মিথ্যা অপবাদ!”

‎ম্যারিড লাইফ্ পর্ব ২

‎‎ঠিক তখন কলিংবেল বাজল।
‎ইন্তিয়া বললেন,
‎“মুগ্ধা আম্মু দরজাটা তো খোলো।”
‎মুগ্ধা দরজার দিকে এগিয়ে গেল।
‎দরজা খুলতেই মুগ্ধার মুখ উজ্জ্বল হয়ে গেল।
‎“স্নিগ্ধা!”

‎ম্যারিড লাইফ্ পর্ব ৪