Home যাত্রাপথ যাত্রাপথ পর্ব ৫৬

যাত্রাপথ পর্ব ৫৬

যাত্রাপথ পর্ব ৫৬
মাশফিত্রা মিমুই

বহুদিন পর জম্পেশ একটা ঘুম দিয়েছে নওশাদ। শেষ কবে যে এমন শান্তির ঘুম ঘুমিয়েছিল মনে পড়ে না তার। ভোরের হালকা রোদ এসে পড়েছে উঠোনে।সকালে ঘুম থেকে উঠেই শিশির ভেজা ঘাসে খালি পায়ে হাঁটতে হাঁটতে দাঁত মাজছে সে। মর্জিনা ডেকে জিজ্ঞেস করলেন,“নাজিরে কই? দেখলাম না তো।”
“ভাইয়ে শ্বশুরবাড়ি জামাই আদর খায়।”
“তুই যাস নাই?”
“না, আজকে যাবো।”

বিথী আর শিউলি মিলে উঠোন ঝাড়ু দিচ্ছে। পারভেজ সিঁড়িতে বসে ঝিমুচ্ছে। গতরাতের এঁটো থালা-বাসন ধুয়ে এনে টিনের চালে সাড়ি সাড়ি করে রাখছেন ফরিদা। জিজ্ঞেস করলেন,“তোর কী খবর? কম লেখাপড়া তো আর করলি না। লাভ কী হইলো? সেই তো গেরামে বেকার পইড়া রইছোস। সংসারও করতে পারলি না, বউডা গেলো গা।”
উত্তর দেওয়া তো দূর, মহিলার দিকে নওশাদ ফিরেও তাকালো না। ফরিদা ক্ষুব্ধ হলেন। আজকাল মেজাজ শান্ত রাখতে পারেন না। এদের দুই ভাইয়ের আচরণ দেখলেই ইচ্ছে করে তেড়ে গিয়ে মেরে দিয়ে আসতে। বিড়বিড় করে বললেন,“দুধ কলা দিয়া কালসাপ পুষছি। আমারেই এহন ছোবল মারতে চায়। যেইদিন ধরমু ওইদিন বুঝবি।”

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

মুখ ধুয়ে গরুদের খাবার দিয়ে একেবারে গোসল সেরে এলো নওশাদ। ফজরের নামাজ আদায় করে মিল থেকে একবার ঘুরে এসেছে। কথায় আছে না, চোরের মন পুলিশ পুলিশ? ওরও হয়েছে সেই দশা। ধরা পড়ে যাওয়ার ভয় মন থেকে যাচ্ছেই না। তবে ভাগ্যিস গিয়েছিল! নইলে বাইরে রয়ে যাওয়া ছোপ ছোপ রক্তের দাগ কারো না কারো চোখে পড়ে যেতো।সেগুলোই সে হালকা আলোয় আবার পরিষ্কার করে এসেছে। জনবসতি কম থাকায় যা রক্ষা।
দড়িতে লুঙ্গি মেলে দিয়ে চাচাতো ভাইদের উদ্দেশ্যে বললো,“তোরা যাবি না?”
পারভেজ দুদিকে মাথা নাড়ালো। শাহরিয়ার বললো, “না, আমগো মেলা কাম আছে। ব্যবসা দেখতে হয়, চাষাবাদ করতে হয়। বিয়া বাড়ি যাওয়ার সময় কই?”

নওশাদ আর কথা বাড়ালো না। চাচাতো ভাইগুলো সুযোগ পেলেই সর্বদা তাকে হেয় করে কথা বলে, নিচু দৃষ্টিতে দেখে। শুধু নাজিরের বেলায় পারে না। চুপ থাকে, সম্মান করার ভান করে। নাজিরকে খোঁচা মারলে নাজির তাদের ছেড়ে দেবে নাকি? মেরে হাত-পা ভেঙে দেবে না?
মাস্টার বাড়ির আনাচে-কানাচে বিয়ের ব্যস্ততা। তার মধ্যে মিছরির শরীরটা বিশেষ ভালো নেই। কয়েকদিন ধরে বেশ দখল যাচ্ছে। তবুও মুখ ফুটে কাউকে কিছু বলেনি মেয়েটা। আজ যেন তা মাত্রা ছাড়িয়ে গিয়েছে। সকালে পছন্দের খিচুড়ি খেতে বসে বমি করে দিয়েছে। তারপর থেকেই শরীরটা ভীষণ দুর্বল। বড়ো ভাইয়ের বিয়ে নিয়ে যত আনন্দ ছিল, সব মুহূর্তেই যেন অসুস্থতায় রূপ নিলো। সেই খবর শুনে সৈয়দুন নেছা তৎক্ষণাৎ নাতনির ঘরে এলেন। তাকে বিছানায় শুয়ে কাতরাতে দেখে চিন্তিত হলেন। ছোটো থেকেই মেয়েটা ভীষণ আহ্লাদী, আদুরে। সামান্য সর্দি হলেও কেঁদে কুটে বাড়ি মাথায় করে তুলতো। পারুল মেয়ের শিয়রে বসে মাথা টিপে দিচ্ছেন। বাড়ির বাকি নারীরা হেঁশেলে ব্যস্ত। কিছুক্ষণ আগে বরযাত্রী কনের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছে।

স্ত্রীর অসুস্থতার খবর নাজির জানে না। গত রাতেও মেয়েটা ঠিক ছিল, তাকে মানাতে মাথার ঘাম পায়ে ফেলতে হয়েছে। যাওয়ার পূর্বেও কতবার জিজ্ঞেস করল,“যাইবা না ক্যান? কী হইছে? আমার উপরে রাগ কইরা আছো?”
সত্যটা মিছরি জানালো না। পেট ব্যথার বাহানা দিয়ে মিথ্যে বললো। মাকেও সায় দিতে বাধ্য করল। সৈয়দুন নেছা বিছানায় বসলেন। প্রথমে নাড়ি তারপর চোখ পরীক্ষা করে গুরুগম্ভীর কণ্ঠে পুত্রবধূর দিকে তাকিয়ে বললেন,“হাবভাবে তো আমার অন্যকিছু মনে হইতাছে, বউ।”
পারুল তাল মেলালেন,“আমারো একবার মনে হইছে, আম্মা। কিন্তু আন্দাজে কী কমু কন?”
বৃদ্ধা নাতনির উদ্দেশ্যে প্রশ্ন ছুঁড়লেন,“এর আগেও বমি করছিলি? মাথা ঘুরাইছে? ঘন ঘন পে…
“কাল দুপুরেও একবার বমি হয়েছিল, মাথা আজই শুধু ঘুরেছে। তবে কিছুদিন ধরে শরীরে জোর পাই না, খেতে ইচ্ছে করে না, গা গুলিয়ে ওঠে।”

কিছুক্ষণ চুপ রইলেন বৃদ্ধা। পারুল আম্মা বলে ডাকার পরেও তিনি জবাব দিলেন না। কিছু সময় পর আচমকা হেসে উঠলেন। বললেন,“একলগে এত খুশি তোমরা কই রাখবা, বউ? তোমার পোলার বউ পোয়াতি, কয়দিন পর হের পোলাপাইন হইবো। এহন আবার মাইয়াও! ওইদিকে ফাহমিদারও একই হাল, আইজ আবার নতুন বউ আইবো। এই বছরে তো আমগো বাড়িত মোট চাইর জন মাইনষের আগমন ঘটতাছে!”
মিছরি উঠে বসলো। অবুঝ বালিকার মতো দাদী আর মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে দেখলো। কিছুক্ষণ আগে যাদের ললাটে দুশ্চিন্তার ভাঁজ ছিল, তারাই এখন মুচকি হাসছে। মুখ ভার করে সে জিজ্ঞেস করল, “হাসছো কেন? কী হয়েছে? আমার অসুস্থতায় তোমাদের হাসি পাচ্ছে?”

সুসংবাদ সবার কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য পারুল ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। সৈয়দুন নেছা নাতনির গাল টেনে বললেন,“ঢং করোস, ছেরি? জামাইয়ের আদর সোহাগে পোয়াতি হইয়াও এহনো নাকি বুঝে না কী হইছে। তোর পেটে নতুন আরেক প্রাণ বাইড়া উঠতাছে, বু। আল্লাহ দুইজনরে সুস্থ রাখুক, হেফাজত করুক। নাতজামাই আইলে সুসংবাদটা তুই জানাইবি নাকি আমি জানাইমু?”
মিছরি বিশ্বাস করতে পারছে না। হাতটা অজান্তেই পেটে গিয়ে থেমেছে। অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে দাদীর পানে কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে লজ্জায় শাড়ির আঁচলে মুখ লুকিয়ে বললো,“জানি না।”
“মাইয়া শরম পাইতাছে। এইডা শরম পাওয়ার কিছু? এইডা হইলো গর্বের বিষয়।”
মিছরি ওভাবেই শুয়ে রইলো। সৈয়দুন নেছা নাতনিকে রেখে আর গেলেন না কোথাও। কাছেই বসে রইলেন। ধীরে ধীরে বাড়িতে উপস্থিত নারীদের মধ্যে খবরটা পৌঁছে গেলো। বাড়ির পুরুষ আর জোয়ান ছেলে- মেয়েরা বরযাত্রীতে গিয়েছে। শুধু পলি আর ফাহমিদা যায়নি। কিছুক্ষণ পর তারাও এসে হানা দিলো মিছরির ঘরে।

বিয়ের গেট পেরিয়ে বরযাত্রী ভেতরে প্রবেশ করেছে। খাওয়া-দাওয়া শেষে নির্ঝঞ্ঝাটে রুহুলের বিয়ে সমাপ্ত হলো। নাজির ফিসফিস করে বললো,“ওই যে খয়েরী শাড়ি পরা মাইয়াডা দেখছোস?”
নওশাদ ভিড়ের মধ্যে চোখ বুলালো। জিজ্ঞেস করল, “দুজন দেখতে পাচ্ছি। তুমি কোনটার কথা বলো?”
“চিকন, ফর্সা মতন যে। আমগো লগে আইছে।”
“ওহ, হ্যাঁ দেখেছি।”
“এইডা আকবর মিয়ার মেজো মাইয়ার ঘরের নাতিন। ওই যে চাইরদিনের মিলাদে হের বাপের লগে কথা হইলো?”
“ওহ।”
“পছন্দ হইছে?”

চোখ সরু করে ভাইয়ের দিকে তাকালো নওশাদ। নাজির সেই দৃষ্টি উপেক্ষা করে বললো,“এর লগেই তোর বিয়ার প্রস্তাব দিছে। পরিবার যথেষ্ট ভালা, সমাজে উচ্চ বংশ। নাখরা বাদ দিয়া রাজি হইয়া যা। বিয়াতে তোরই লাভ। শক্তি, ক্ষমতা আরো বাড়বো। চাচারা ক্ষতি করার সাহস পাইবো না।”
“বাঁচলে তো ক্ষতি করবে।”
“মারার লাইগাও তো ক্ষমতা লাগে রে, নওশাদ। এই যে সোহেল মরলো, লাশ গুম করতেও শ্বশুরের সাহায্য নিতে হইছে। যাতে বিপদে পড়লে তারে চাপ দেওয়া যায়। এহন দুপুর, এতক্ষণে সিরাজের খোঁজও মনে হয় শুরু হইয়া গেছে। পরে যহন পাইবো না তহন তো ফরিদা বানুর সব সন্দেহ আইয়া পড়ব আমার উপরে। চাচা গো মারার পর হেগো পোলারা বাইচ্চা থাকবো। মানুষ মারা কী অত সহজ? আমার পায়ের তলার মাটি শক্ত করা শেষ। এইবার তোর পালা। যে গেছে, তার কথা ভাইবা লাভ নাই।”

“ভাবিও না, কবেই ভুলে গেছি।”
“তাইলে আইজ গিয়াই হ কইয়া দিমু। বিয়া কইরা বিদেশে যাবি? নাকি কয়েক বছর বিদেশে কাটাইয়া হেরপর আইয়া বিয়া করবি? বিয়া কইরা গেলেই ভালা।”
“আমার দেশ ছেড়ে যাওয়ার ইচ্ছে নেই। দেশে কী কাজের অভাব? তবুও তোমার জন্য দৌড়াদৌড়ি করে ভাষা শিখতে হচ্ছে, সব তথ্য জমা দিতে হয়েছে পাসপোর্টের জন্য। এখন আবার বিয়ে?”
“চাকরির থাইক্যা বিদেশ ভালা। কয়েক বছর মাথার ঘাম পায়ে ফেলাইয়া কাম কইরা পয়সা পাতি কামাবি। হেরপর দেশে আইয়া ব্যবসা খুইল্যা বইবি। সাথে যদি সুন্দর একটা বাড়ি বানাইতে পারোস তাইলে তো আর কথাই নাই। হেরপর না হয় একেবারে দেশে আইয়া পড়বি। সাথে বিয়াও দরকার। মানুষ সারাজীবন একলা থাকতে পারে না।”
নওশাদের মন মানে না। তবুও মাথা নাড়ায়। নাজির এতে খুশি হলো। বিয়ের কাজ শেষ হতেই কয়েকজন বাদে বরযাত্রীর বাকি সবাই রওনা দিলো বাড়ির উদ্দেশ্যে। বউ নিয়ে ছেলে ফিরবে সন্ধ্যায়।

বাড়ি ফিরতেই সৈয়দুন নেছার ঘরে নাজিরের ডাক পড়ল। নওশাদকে আবার অলিউল খান ডেকে নিয়ে নিজের পাশে বসিয়েছেন। শুরু থেকেই ছেলেটার দিকে তাঁর বিশেষ নজর ছিল। আগেও একবার বেশ আলাপচারিতা হয়েছিল। তাই কাছে বসিয়ে ঘুরিয়ে প্যাঁচিয়ে প্রশ্ন করতে লাগলেন। নওশাদের বাচনভঙ্গি সুন্দর। মানুষকে খুব সহজেই নিজের দিকে আকৃষ্ট করতে পারে। যার দ্বারা ভদ্রলোক মুগ্ধ হলেন বলেই মনে হলো। শ্যালকের থেকে প্রশংসা শুনে আগেই তো মন গলে গিয়েছিল। এখন যেন পুরোপুরি। জিজ্ঞেস করলেন,“ভবিষৎ পরিকল্পনা কী? কিছু একটা তো করতে হইবো।”
“আমার ইচ্ছে ছিল চাকরি বাকরি করার। কিন্তু ভাই রাজি না। বলছে, দেশের বাইরে গিয়ে কিছু একটা করতে। ভাইয়ের কথা কী করে অমান্য করি? ছোটো থেকে সে-ই তো বাবার দায়িত্ব পালন করেছে।”

মাথা নাড়ালেন ভদ্রলোক,“তা ঠিক। আইজকালকার যুগে ভাইয়ে ভাইয়ে মিল তেমন একটা দেখা যায় না। বড়ো হইলেই তো কেমনে বাপের ভাগের সম্পত্তি একলা ভোগ করবো, আরেক ভাইরে ঠকাইবো সেই চিন্তা করে। আমার কতগুলা চাচতো ভাই আছে। এক নম্বরের খাটাইস।”
জোরপূর্বক হাসলো নওশাদ। এখান থেকে উঠে যেতে পারলেই যেন বাঁচে। কিন্তু অলিউল খান কিছুতেই তাকে ছাড়লো না। বরং হাঁক ছেড়ে কন্যাকে ডাকলেন, “শালিক আম্মা! এইদিকে আয়।”
পিতার ডাকে শালিক ঘোমটা টেনে দৌড়ে এলো। অলিউল খান মেয়েকে দেখিয়ে বললেন,“আমার দুই মাইয়ার মাঝে এইডা ছুডো মাইয়া। এইবার কেলাশ টেইনে উঠছে। পোলাডা সবার ছুডো, ফাইভে পড়ে। বড়োজনের অনেক আগেই বিয়া হইয়া গেছে। মাইয়ার ঘরে এহন দুই নাতি।”

কথা শেষে মেয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন,“সালাম দে উনারে।”
বাধ্য মেয়ের মতো শালিক সালাম দিলো। সালামের জবাব নিয়ে মাথা তুলে তাকাতেই মেয়েটির সাথে চোখাচোখি হলো নওশাদের। চেহারার সঙ্গে সঙ্গে কণ্ঠস্বরও ভারি মিষ্টি। বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকতে পারলো না সে। মেয়েটার বোধহয় লজ্জা কম। নইলে দৃষ্টি সরাচ্ছে না কেন? তাই সে নিজেই অন্যদিকে ঘুরে তাকালো। কোনো একটা বাহানা বানিয়ে সেখান থেকে সরে এলো।
সৈয়দুন নেছা বিছানায় বসে আছেন। নাজির অনুমতি নিয়ে ঘরে প্রবেশ করে সালাম দিলো। তিনি সালামের জবাব নিয়ে ইশারায় তাকে বসার নির্দেশ দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,“বিয়া শেষ?”

“হ।”
“আইজ রাইতে তো থাকবা নাকি?”
“না, তালমিছরি থাকলে থাকুক। আমার বাড়ি ফিরতে হইবো।”
“আইজ থাকো। একেবারে বউ ভাত শেষ হইলেই না হয় যাইয়ো। একটা পরিবারে কত ধরণের মানুষ আছে, বোঝোই তো। লোকে পিঠপিছে কথা বানাইয়া কইবো। মাইয়াডারও খারাপ লাগবো।”
কী বলবে বুঝে উঠতে পারলো না নাজির। সৈয়দুন নেছা পুনরায় বললেন,“বউরে এহন থাইক্যা বেশি বেশি যত্ন করতে হইবো, মুখ ফুইটা কিছু না কইলেও বুইঝা নিতে হইবো, সারাক্ষণ চোখে চোখে রাখতে হইবো, এই সময়ে মাইয়া মাইনষেরে কেউ একটা ধমক দিলেও সারাজীবন মনে রাইখা দেয়, কষ্ট পায়।”
“এই সময় মানে? নতুন বউ নাকি যে এত রংঢং করমু? এমনিতেই আমনের জামাই ছুডো এক মাইয়া ধরাইয়া দিছিলো। এই কয় মাসে এতটুকু বড়ো করতে কী কম খাটনি গেছে?”
সৈয়দুন নেছা মৃদু হাসলেন। নাজির এতে বিরক্ত হলো,“হাইসেন না তো। এইসব হাসির মানে আমি বুঝি না। যা কওয়ার সরাসরি কন।”

“তোমার বউ এইবার হাছা হাছাই বড়ো হইয়া গেছে। সকালে তো বমি কইরা, মাথা ঘুইরা অবস্থা খারাপ! পরে নাড়ি পরীক্ষা কইরা দেহি ঘটনা জটিল।”
“বমি করছে! কই আমারে তো কিছু কইলো না? কত জিগাইলাম।” চিন্তিত শোনালো নাজিরের কণ্ঠস্বর।
“তুমি চিন্তা করবা দেইখাই কয় নাই।”
“ঘটনা কী আসলেই জটিল? সদরে নিতে হইবো?”
“তোমার সময় সুযোগ মতো নিও। তয় ঘটনা জটিল। পোয়াতি হওয়া কী চারটে খানি কথা!”
“কীহ!” চমকায় সে।
বৃদ্ধা হাসেন,“তোমার ছুডো বউডা এহন পোয়াতি। কয়দিন পর তুমি বাপ হইবা। সেই কথা হুনার পর থাইক্যা মাইয়া শরমে বাঁচে না। সারাদিন ঘর থাইক্যাও বাহির হয় নাই। যাও বউয়ের কাছে যাও।”
নাজির বেশ কিছুক্ষণ হতভম্ব হয়ে বসে থাকে। নড়ার শক্তিটুকুও দেহে পায় না। শেষে অনেক কষ্টে ভারী দেহখানা নিয়ে ঘর পর্যন্ত পৌঁছায়। ভেতর থেকে ভেসে আসে মেয়েদের হাসির ঝংকার। দরজায় কড়া নেড়ে ডাকে সে,

“তালমিছরি!”
তৎক্ষণাৎ শব্দ থেমে যায়। ফাহমিদা ফিসফিস করে বলে,“ওই যে আমগো মিছরির সোয়ামি আইয়া পড়ছে। গেলাম আমরা।”
ফাহমিদা, পলি ঘর থেকে বেরিয়ে এলো। একবার নাজিরের দিকে আড়চোখে তাকিয়ে মুচকি হাসলো। নাজির ঘরে ঢুকে বিছানায় বসলো। পরনের পাঞ্জাবি ঘামে ভিজে গিয়েছে। অস্থির হয়ে তা গা থেকে খুলে রাখলো সে বিছানায়। চুল থেকে কপাল বেয়ে গড়িয়ে পড়া ঘাম আঙুলের সাহায্যে মুছে স্ত্রীর লাজুক মুখের দিকে তাকালো। সামনে আসা চুলগুলো কানের পেছনে গুঁজে দিয়ে জিজ্ঞেস করল,“খাইছো দুপুরে?”
মুখে জবাব না দিয়ে উপরনিচ মাথা নাড়ালো মিছরি। নাজির তার আরো কাছ ঘেঁষে বসলো। সমস্ত দূরত্ব মিটিয়ে নিয়ে কাঁধে হাত রাখলো। আবেগ লুকাতে না পেরে বলেই ফেলল,“যা হুনছি সত্য? আমার তাল মিছরির পেটে আমার সন্তান? আমি বাপ হমু?”
মিছরি লজ্জায় মাথা নুইয়ে রাখলো।

“জানি না, দাদী বলেছে।”
“ক্যান জানো না? আমি তো হুনছি মায়ে গো ভিতরে নাকি কীসব অনুভূতি হয়।”
“আমার তো এটা প্রথমবার। পরেরবার ঠিক বুঝতে পারবো।”
না চাইতেই নাজির হেসে ফেলল। চুমু দিলো কপালে। তার কি যে আনন্দ হচ্ছে! এতগুলো বছর একাকিত্বে কাটিয়ে দেওয়া নাজিরেরও দুঃখ বোঝার একজন মানুষ আছে, ছোট্ট একটা পরিবার আছে, সে বাবা হতে চলেছে, পিতৃত্বের স্বাদ পেতে চলেছে।এই জীবনে আর কী চাই তার? বাঁচার ইচ্ছেটা যেন আরো কয়েক গুণ বেড়ে গেলো। চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে করল, “মিছরির হাতে হাত রেখে সহস্র পথ পাড়ি দেওয়ার জন্য হলেও আমি বহু বছর বাঁচতে চাই, একসঙ্গে নতুন ভোরের আলো দেখার জন্য আমি বাঁচতে চাই, আমার সন্তানকে সুন্দর একটা পরিবার আর পৃথিবী দেওয়ার জন্য হলেও আমি লড়াই করে বাঁচতে চাই, বাঁচতে চাই, বাঁচতে চাই।”

সন্ধ্যা নামলো ধরায়। বাড়িতে নতুন বধূর আগমন ঘটেছে। মেয়ে, বউরা ছুটেছে সেথায়। স্বামীর বাঁধন থেকে ছাড়া পেয়ে মিছরিও গেলো নতুন ভাবির সঙ্গে ভাব জমাতে। কিন্তু তা আর পারলো কই? দরজার অভিমুখেই বড়ো মামী তাকে খপ করে ধরে ফেলল। টেনে নিয়ে গেলো বসার ঘরে। এখানটা আপাতত ফাঁকা। পুরুষেরা একজোট চেয়ার পেতে বসে আছে উঠোনের পশ্চিম পাশের ফাঁকা পড়ে থাকা জমিতে। সেখানে গাছের হাওয়া ভালো।
নানী সেলিনা, চাচাতো বোন রেশমা, ফুফু তমিজা, সরলাও রয়েছে। বাবা মারা যাওয়ার পর এই নিয়ে দুই বার এসেছে সরলা। ভাইরা তেমন কিছু বলে না। কীই বা বলবে আর? বড়ো মামী গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,“কী হুনলাম তোর মায়ের থাইক্যা? পেটে পোলাপাইন আইছে নাকি?”
মিছরি অপ্রস্তুত হলো। সেলিনা বিরক্তি নিয়ে বললেন, “সবাইর সামনে এম্মে কেউ জিগায়, বউ?”

“এইটুকুন একটা মাইয়া কীয়ের পোলাপাইন জন্ম দিবো, আম্মা?”
“ক্যান, আমরাও তো দিছি। কিছু হইছে? আমনে নিজের পোলার বউ কইরা নিয়া বুঝি বওয়াইয়া খাওয়াইতেন?” তমিজা বললেন কথাটা।
বড়ো মামী নড়েচড়ে বসলেন,“আরো সুখে রাখতাম। রানীর হালে থাকতো। আমগো কাছেই তো এতদিন বড়ো হইছে।”
“হইছে, মামী আর হড়ির মাঝে পার্থক্য আছে। তাও আবার নানা-নানী বাইচ্চা থাকাকালীনই যত আহ্লাদ দেহায়। আমগো মিছরি এহনো কী কম সুখী? শ্বশুর- শাশুড়ি নাই, নিজের সংসার। যহন যা খুশি করতে পারে, যা খায় তাজা খায়।”
“কত সুখী জানা আছে। সংসার তো চাচী হড়িগো দখলে। আবার একগাদা গরুও নাকি পালে।”
“মাইয়া মাইনষের চেহারা সুরত দেখলেই বুঝা যায়, কেডা সুখী আর কেডায় অসুখী। সংসার আলাদা না রে, মিছরি?”

বড়ো ফুফুর প্রশ্নের জবাবে মাথা নাড়ায় মিছরি,“হ্যাঁ, কবে থেকেই তো আলাদ। তবে দুইবেলা রান্না আর ঘর গোছানো ছাড়া আমার আর তেমন কোনো কাজ নেই। বাড়িতে কাজের জন্য আলাদা লোক রাখা আছে। ঘরবাড়ি লেপপোছ, ঝাড়ু দেওয়া, গোয়াল পরিষ্কার সব কলিমের মা করেন। আমি মনে হয় বিয়ের পর একবার গোয়াল ঘর ঝাড়ু দিয়েছিলাম। তারপর থেকে উনি আর কখনো এসব করতে দেননি। গরু, ছাগল যা পালার উনিই পালেন। বড়ো খামার তো! সাথে সহকারীও আছে। চাচী শাশুড়ি, আমার মা মুরগি পালনের পরামর্শ দিয়েছিল। উনি শুনতেই নিষেধ করে দিয়ে বললেন, তোমার এত পাকনামি করতে হইবো না। এমনকি মাছ আনলেও মাঝেমধ্যে উনিই কুটেন। আমি তো সব মাছ অত ভালো কুটতে পারি না। বিয়ের প্রথম প্রথম রান্নাও করতে পারতাম না। এখানেও আমি যথেষ্ট সুখে, রানীর হালেই আছি। নিজের মা, চাচীদের থেকে অন্তত বেশি। এমন সুখ কজন মেয়েই বা জীবনে পায়?”
কথাগুলো বলতে গিয়ে মুখমন্ডলে আনন্দ যেন উপচে পড়ছে মেয়েটার। ছোটো ফুফুর দিকে নজর যেতেই বললো,

যাত্রাপথ পর্ব ৫৫

“যেই বদনাম একবার রটেছিল! অবশ্য ঘরের মানুষেরাই রটিয়েছিল। তারপরেও যে এত ভালো স্বামী, সংসার পেয়েছি এটাই তো অবাক করা বিষয়। আল্লাহ যা করেন ভালোর জন্যই করেন। ভালো, সৎ মানুষদের সাথে কখনো তিনি অন্যায় পছন্দ করেন না।”
বড়ো মামীর মুখখানায় মলিনতা ভর করল। সরলাও ঠেস দিয়ে বলা কথাটা খুব সহজেই বুঝে গেলেন। তাই সেখানে আর বসলেন না। তিনি চলে যেতেই তমিজা মুখ বাঁকালেন,“দেমাগ এহনো কমে নাই। আমি হইলে জীবনেও এই বাড়িত পা দিতাম না।”

যাত্রাপথ পর্ব ৫৭