Home যাত্রাপথ যাত্রাপথ পর্ব ৫৭

যাত্রাপথ পর্ব ৫৭

যাত্রাপথ পর্ব ৫৭
মাশফিত্রা মিমুই

সকালের সূর্যটা ঠিক করে দ্যুতি ছড়ানোর পূর্বেই নতুন বধূ দেখতে প্রতিবেশীরা ভিড় জমিয়েছে বাড়িতে। সৈয়দুন নেছা এতে খুব বিরক্ত। বউ ভাতের আগে নতুন বউকে কারো সামনে নিয়ে যেতে নিষেধ করে দিয়েছেন তিনি। এমনটা সবসময়ই হয়ে আসছে। তবে সবচেয়ে আশ্চর্যজনক ঘটনা ঘটতে চলেছে বেচারা নওশাদের সঙ্গে। আসলেই কী সে বেচারা? আপাতত বলা যাচ্ছে না।

সবার জোরাজুরিতে ভাইয়ের সঙ্গে নওশাদও মাস্টার বাড়িতে রাতটা থেকে গিয়েছে। সকালে তার ঘুম ভাঙলো মাসুমের ডাকাডাকি আর ধাক্কায়। গত রাতে সবার সঙ্গে গল্প করে অনেক দেরিতে ঘুমাতে যেতে হয়েছে। তাই চোখ মেলে ঠিক করে তাকাতে পারলো না সে। ঘুম জড়ানো কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,“সকাল হয়ে গেছে?”
“শুধু কী সকাল? একটু পর দুপুর হইয়া যাইবো। তোর অপেক্ষায় সবাই বইয়া রইছে।”
“আমার অপেক্ষায়! কেন? নতুন বউ নাকি আমি?”
“নতুন জামাই।”

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

চোখ থেকে সমস্ত ঘুম এক মুহূর্তে গায়েব হয়ে গেলো। সোজা হয়ে বসলো নওশাদ। সবাই গত রাতে মেঝেতে মাদুর বিছিয়ে শুয়েছিল। এখন সেসবের চিহ্নটুকু নেই। যে যার মতো গোছগাছ করে চলে গিয়েছে। শুধু দেরি হয়ে গেলো তার। মাসুমের কথাকে মজা হিসেবে হাওয়ায় উড়িয়ে দিয়ে উঠে গেলো সে।
বাড়ি জুড়ে অতিথি গিজগিজ করছে। পা ফেলার জায়গাটুকুও কোথাও নেই। বিশেষ করে বাচ্চাগুলো ভীষণ দুষ্টু। গলায় গামছা ঝুলিয়ে সাবধানে ঘর থেকে বের হলো নওশাদ। পথিমধ্যে নজরুল আলমের সাথে দেখা হতেই তিনি তাড়া দিলেন,“মাত্র ঘুম থাইক্যা উঠছোস? আর দেরি করিস না, বাপ। তাড়াতাড়ি গিয়া গোসল সাইরা আয়।”
নওশাদের খটকা লাগলো। গতকাল থেকে তাকে যেন একটু বেশি তোষামোদ করা হচ্ছে এই বাড়িতে। শুধুই কী মেয়ে জামাইয়ের ভাই বলে? গ্ৰাম তো একই। তবে তার সেই খটকা বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। গোসল সেরে ঘরে আসতেই বড়ো ভাইয়ের সঙ্গে দেখা হয়ে গেলো। কিছু জিজ্ঞেস করার পূর্বেই হাতে নতুন একটি পাঞ্জাবী ধরিয়ে দিয়ে নাজির বললো,“চুল মুছোস নাই ক্যান? তাড়াতাড়ি মুইছা এইগুলা পর।”

“সকালবেলায় পাঞ্জাবি পরতে যাবো কেন? হঠাৎ কী হয়েছে, বলো তো? নতুন বর বউকে বাদ দিয়ে সবাই আমায় নিয়ে কেন পড়েছে? অদ্ভুত আচরণ করছে।”
নাজির উত্তর দেওয়ার জন্য সময় নিলো। নওশাদ ধৈর্য ধরতে পারলো না।
“শুনেছি ভাবি… না মানে তুমি নাকি বাবা হতে চলেছো? আর আমি চাচা!” বলতে গিয়ে আনন্দ যেন উপচে পড়ল তার চোখের কোটরে।
“হ, তার লাইগাই তো নতুন চাচীর ব্যবস্থা করতাছি।”
“চাচী?”
নাজির হাসলো,“তুমি তো আকাইম্মা, ভন্ড। সহজে বিয়া করবা না জানি। তাই এক ঢিলে দুই পাখি মারতাছি। আইজ তোর বিয়া।”

“কীহ!” অবাক হলো সে।
“চিন্তা নাই, ঘরোয়া বিয়া। চাচাগো কাছে এতক্ষণে মনে হয় খবর পৌঁছাইয়া গেছে। হেরা আইতে আইতে তাড়াতাড়ি কবুল কইয়া ফেলবি। নে, তৈয়ার হ।”
বাকরুদ্ধ হয়ে বিছানায় বসে পড়ল নওশাদ। নিজেকে শান্ত রাখার চেষ্টা করে বললো,“কীসব বলছো? আজ বিয়ে মানে? মজা করছো? আমায় না জানিয়ে এত বড়ো একটা সিদ্ধান্ত কীভাবে নিতে পারো? আমি পুরুষ মানুষ। আমার কোনো ইচ্ছে, মতামত নেই?”
“না, নাই। প্রথমবার নিজ ইচ্ছায় ভুল মানুষ ধইরা আইনা মারা খাইছোস। এহন আর কীয়ের মতামত? তোর কপাল ভালা যে আমি তোরে নিয়া এহনো ভাবি। না হইলে কেডায় তোর বিয়া দিবো? হুট কইরা না জানাইয়া ঠিক করলাম না মানে? প্রায় দুই তিন মাস আগে থাইক্যা তো আমি তোরে বুঝাইতাছি।”
“একটা প্রস্তুতি তো আছে।”
“দুই নম্বর বিয়ায় আবার প্রস্তুতি কীয়ের? এত ভালা একটা মাইয়া পাইতাছোস এইডাই তো কপাল। মাইর খাওয়ার আগে তৈয়ার হ।”

তাকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে তৈরি হওয়া পর্যন্ত সেখানেই বসে রইলো নাজির। আর কোনো উপায় না পেয়ে বাধ্য হয়েই তৈরি হলো নওশাদ। বড়ো ভাইয়ের পিছুপিছু এসে উপস্থিত হলো বসার ঘরে। বয়োজ্যেষ্ঠরা সকলেই উপস্থিত সেখানে। সাথে বসে আছেন আফাজ উদ্দিন এবং কাজী সাহেব। মাস্টার বাড়ির যেকোনো অনুষ্ঠানেই আফাজ উদ্দিনকে সবার আগে দাওয়াত দেওয়া হয়। নওশাদ সবাইকে সালাম দিয়ে কেদারায় বসলো, আড়চোখে তাকালো ভাইয়ের দিকে। নাজির সেই দৃষ্টিকে অবজ্ঞা করে বললো, “বিয়া পড়ানো শুরু করেন।”
অলিউল খান আজ মহাখুশি। গতকাল রাতে কাশেম আলীই এই বিয়ের বুদ্ধি তাঁর আর নাজিরের মাথায় ঢুকিয়েছেন। তিনিই সবাইকে বুঝিয়ে বললেন,“শুভ কামে বেশি দেরি করতে নাই, দুলাভাই। আবার কবে না কবে বাড়িত বিয়া হয়! এর থাইক্যা নওশাদের বিয়াডা কাইলই শালিকের লগে দিয়া দেন। রুহুল, শালিক দুই ভাই-বোনের একদিনেই বউ ভাত হইয়া যাক।”

আবেদা প্রথমে রাজি হননি। মেয়ের বিয়ে নিয়ে তাঁর অনেক স্বপ্ন ছিল। মেয়ের জন্য বেশ কিছু গহনা গড়িয়ে রেখেছিলেন, আলমারিতে তুলে রেখেছিলেন শাড়ি। কিন্তু অলিউল খান স্ত্রীর কথা না শুনেই রাজি হয়ে গেলেন। তিনিও আর দেরি করতে চান না। মেয়ের বয়স তো কম হলো না। লোকে সুযোগ পেলেই খোঁচা দেয়। তাছাড়া আজকালকার বিয়ের বাজারে সবদিক থেকে এমন ভালো ছেলে পাওয়া যায়? বংশ ভালো হলে ছেলে দেখতে শুনতে খারাপ। দেখতে শুনতে ভালো হলে বংশ মর্যাদা খারাপ। এই ছেলেও অবশ্য সবদিক দিয়ে নিখুঁত নয়, পূর্বে বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটেছিল। তবে এটা আহামরি কোনো বিষয় নয়। তাই সেই রাতেই মাসুমকে নিয়ে বাড়িতে গিয়েছিলেন শাড়ি গহনা নিয়ে আসতে।

নানীর ঘরে বউ সেজে বসে আছে শালিক। পাশে নানী সৈয়দুন নেছা, মা আবেদা, মামী, খালা আর খালাতো ফুফাতো বোনেরা তাকে ঘিরে বসে আছে।এই বিয়েতে বেশি খুশি মিছরি। তার প্রিয় ফুফাতো বোন তার জা হতে চলেছে। এখন থেকে শাহ বাড়িতে আর তাকে একা থাকতে হবে না। তারও একজন সঙ্গী হবে।
কাজী বিয়ে পড়ানো শুরু করেছে। কবুল বলার আগ মুহূর্তে নওশাদের বুকের ভেতর খানিক কেঁপে উঠলো। প্রথমবারের কথা মনে পড়ল, বিশেষ করে মনে পড়ল লিলিকে কবুল বলে জীবনে গ্ৰহণ করার মুহূর্তটা। তখনো কী ভেবেছিল, এই সম্পর্ক একদিন শেষ হয়ে যাবে? একদিন সে আবার একই জায়গায় বসে অন্য কাউকে গ্ৰহণ করবে জীবনে? অথচ সব এলোমেলো হয়ে গেলো। তখনি কানের কাছে কেউ ফিসফিস করে বললো,“মনের সব ময়লা, পুরান স্মৃতি মুইছা কবুল ক। যারে নতুন কইরা জীবনে জড়াইতাছোস তার নামে নিজেরে লেইখা দে। এইসব আবেগ, অনুভূতি, ভালোবাসা, অধিকার একমাত্র তার যে শেষ পর্যন্ত পাশে থাকে।”

নওশাদ চমকে পাশে তাকালো। দেখতে পেলো তার জীবনের সব সমস্যার সমাধান বড়ো ভাইকে। চোখ বন্ধ করল সে, ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলে বলে দিলো তিন কবুল। জীবনের সবটুকু লিখে দিলো আরেক নতুন নারীর নামে। কাবিননামায় উভয়ের স্বাক্ষর হতেই সমাপ্ত হলো বিয়ে।
কাশেম আলী উচ্চস্বরে আলহামদুলিল্লাহ পড়লেন।সকলের উদ্দেশ্যে বললেন,“আমগো বাড়িতে খালি আনন্দ আর আনন্দ। কাইল বাড়িত রুহুলের বউ আইলো, আমার পোলা আর মাইয়ার ঘরে নাতি নাতনি হইবো, এহন আবার আমার ভাগ্নিরও বিয়া হইয়া গেলো। এক গেরামেই থাকবো। সবাই আইজ দুপুরে খাইয়া যাইবেন, বিশাল আয়োজন করা হইছে।”

স্থান একসময় ফাঁকা হয়ে গেলো। নওশাদকে নববধূর কাছে যেতে বলা হলেও সে গেলো না। বরং বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলো। নাজির সবাইকে বোঝ দিলো, হুট করে বিয়ে হওয়ায় ছেলে লজ্জা পাচ্ছে। রাতে না হয় দেখা সাক্ষাৎ করবে।
নাজির বাড়ি যাচ্ছিলো। চাচাদের সঙ্গে মাঝরাস্তাতেই দেখা হয়ে গেলো তার। দুজনে এদিকেই আসছিলেন। পেছনে সামিউল। সে-ই প্রথমে বললো,“নওশাদের নাকি বিয়া? এই খবর কিনা মাইনষের কাছ থাইক্যা জানতে হইলো? আমগো বাড়িত কী হইছে?”
হাতের ইশারায় ছেলেকে থামিয়ে দিলেন আমিরুল শাহ। ভাতিজার উদ্দেশ্যে বললেন,“বিয়ার পরে আমরা পর আর মাস্টর বাড়ি আপন হইয়া গেছে? হেগো লগে সব শত্রুতা শেষ? তগো অভিভাবক কী আমরা না? তোর বিয়ার কথাবার্তাও তো আমরা কইছিলাম। তাইলে নওশাদের বিয়ার সময় আমগো ছাড়াই নিজেরা নিজেরা সব সিদ্ধান্ত নিয়া নিলি কেমনে?”

“আইয়েন বাড়িত যাই।”
“প্রশ্নের উত্তর দে।”
“আমার বিয়ার সময় আমার বাপের অসুখ আছিলো। তাই অভিভাবক আছিলেন আমনেরা। কিন্তু নওশাদের অভিভাবক হিসাবে হের বড়ো ভাই আছে, এতকাল সব দায়িত্ব পালন করছে। বড়ো ভাই থাকতে অন্য কেউ গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ক্যান নিবো? এই বিয়া আমার দাদাশ্বশুর মরার আগে ঠিক কইরা গেছিলো, আইজকার সব আয়োজন আমার শ্বশুর আর চাচা শ্বশুরের। এত ভালা সুযোগ কেউ হাতছাড়া করে? রাইতে হুট কইরা সিদ্ধান্ত নেওয়া হইলো যে, সকালে বিয়া। তাই সবাই সকালেই জানছেন।”

“তাইলে বাড়িত যামু ক্যান?”
“বিয়া শেষ।”
“মানে?” সকলে অবাক হলো।
নাজির বাড়ির দিকে হাঁটা ধরলো,“শেষ মানে শেষ। আমনেরা আইতে দেরি কইরা ফেলাইছেন। থাউক, দুপুরে দাওয়াত খাইতে যাইয়েন। আমি যাই, নতুন বউয়ের লাইগা চাচীগো সব গোছাইতে কই।”
আমিরুল শাহ হতভম্ব হয়ে গেলেন। ছেলে, ভাইয়ের উদ্দেশ্যে বললেন,“কী কইয়া গেলো ওয়? বিয়া শেষ মানে? আমগো ছাড়াই বিয়া শেষ?”
মুমিনুল শাহ নীরব দর্শক হয়ে রইলেন। তাঁর এসবে কিছুই আসে যায় না।
নওশাদকে সারাদিন আর পাওয়া গেলো না কোথাও। নাজির বাড়ি ফিরে সবাইকে জানালো, সাথে চাচীদের গালমন্দও খেলো। ঘরগুলো কলিমের মাকে দিয়ে পরিষ্কার করিয়ে নতুন করে আবার উঠোন লেপালো ভাই, ভাবিদের দিয়ে সাজানো হলো নওশাদের বাসর।

বউ ভাতের অনুষ্ঠান শেষ হলো। নতুন বউ নিয়ে বাড়ি ফিরলো নওশাদ। অলিউল খান, আবেদাও মেয়ের সাথে তার শ্বশুরবাড়িতে এলেন। শুধু শ্যালকদের উপর বিশ্বাস করে অপরিচিত এক ছেলের কাছে মেয়ে বিয়ে দিয়েছেন। ছেলের বাড়িঘর না দেখলে কী হয়?
চারিদিকে চাপা গুঞ্জন উঠেছে। এই প্রথম শাহ বাড়ির কোনো ছেলে তালাক হওয়ার পর ঘরে দ্বিতীয় বউ তুলেছে। মর্জিনা নতুন বউয়ের মুখ দেখে বললেন, “এইবারের বউডা ভালা হইলেই হয়। হুনো মাইয়া, মন দিয়া সংসার করবা। স্বামীর কথা হুনবা, বাড়ির বড়ো গো সম্মান করবা। মাইয়া মাইনষে এতটুকু সহ্য করতে না পারলে কহনো সংসার করা যায় না।”

শালিক ঘোমটার আড়ালে মাথা নিচু করে রাখলো। ধীরে ধীরে ঘর থেকে লোকজন কমলো। আবেদা মেয়ের পক্ষ থেকে হেসে বললেন,“আমগো বাড়ির মাইয়াগো আমরা এসব শিখাইয়াই বড়ো করি, ভাবি। একজন তো সংসার কইরা খাইতাছেই। শালিকও পারবো। আমনেরা তাও নিজেগো মতন একটু শিখাইয়া, পড়াইয়া লইয়েন।”
“তা আর কইতে? নাজিরের বউডা ভালা পড়ছে, কথা হুনে। তয় নওশাদের আগের বউডা তেমন ভালা আছিলো না। জামাইয়ের কথা হুনতো না, কিছু হইলে দৌড় দিতো বাপের বাড়ি। তাই তো শেষমেশ সংসার টিকে নাই। আল্লাহ যা করেন ভালার লাইগাই করেন। কার ভাগ্যে কী আছে আগে থাইক্যা কেউ জানে?”
আবেদা সহমত পোষণ করলেন,“ঠিক কইছেন। ওর বাপে কত পোলা দেখলো, কিন্তু শেষমেশ বিয়া হইলো আমার বাপের বাড়ির এলাকায় আইয়াই।”

আবেদার সঙ্গে মর্জিনার ভালোই ভাব জমলো। দুজন এক প্রকৃতির মানুষ। মর্জিনা শাহ বাড়িতে বউ হিসেবে পা দেওয়ার পূর্বেই আবেদার বিয়ে হয়ে গিয়েছিল। তাই তাদের এই প্রথম দেখা সাক্ষাৎ হলো।
সন্ধ্যার দিকে অলিউল খান, আবেদা মেয়েকে রেখে বিদায় নিয়ে চলে গেলেন বাড়িতে। মেয়ে আর নতুন জামাইকে এসে নিয়ে যাবেন পরশু। মিছরি, শিউলি মিলে শালিককে নওশাদের ঘরে নিয়ে বসালো। ঘোমটার আড়াল থেকে মুখ বের করল সে। হাঁপাতে হাঁপাতে বললো,“একটু পানি দে।”
শিউলি পানি আনতে গেলো। মিছরি উচ্ছ্বোসিত কণ্ঠে বলে উঠলো,“আমার কী যে আনন্দ হচ্ছে, শালিক আপা!”
“আর আনন্দ! আমার তো ডরে হাত-পা কাঁপতাছে। শ্বশুর-শাশুড়ি নাকি নাই? কেমনে সংসার করমু?”
“ঢং! তোমার তো তাও বোন আছে। আর আমি যখন এসেছিলাম তখন আমার কেউ ছিল না। পুরোপুরি একা ছিলাম। বাবা, ভাইরাও এ বাড়িতে পা রাখতো না। কী ঝড়ের মধ্য দিয়ে যে গিয়েছি! নেহাৎ উনি ভালো মানুষ ছিলেন তাই টিকতে পেরেছি।”

“উনি?”
“আমার স্বামী, এখন থেকে তোমার ভাসুর। আর হ্যাঁ, আমায় বুবু বলে ডাকবে, বেশি বেশি সম্মান করবে। অভিজ্ঞ বড়ো জা বলে কথা!”
শালিক চোখ রাঙালো,“ধইরা একটা দিমু। আমারে জা গিরি দেখাইতে আইছে। আগে বড়ো বোইন, পরে জা।” পরক্ষণেই সে চিন্তিত হয়ে বললো,“আমারজন কেমন রে?”
“একেবারে আমারজন?” ভ্রু নাচালো মিছরি।
শালিক লজ্জা পেলো। জোরপূর্বক রাগ দেখানোর চেষ্টা করে বললো,“ক না, তোর দেওরা কেমন?”
“মানুষ তো ভালো। নরম, ভদ্র, দশ কথায় রা পারে না। মেয়েদের সঙ্গে চোখ নামিয়ে কথা বলে। এই যে আমি বয়সে কত ছোটো! তবুও কখনো অসম্মান করেনি, আর চার পাঁচটা দেওরের মতো হাসি ঠাট্টাও করে না। যা কথা বলবে একান্তই প্রয়োজন হলে। নাহলে তাকাবে না পর্যন্ত। এখন বউয়ের কাছে কেমন হয় সেটাই দেখার পালা। আমারজন তো বাইরে সিংহ, ঘরের ভেতর বউয়ের কাছে বিলাই।”

“কসকি!”
“হ্যাঁ, যদিও শুরু শুরুতে সিংহই ছিল। কথায় কথায় ধমকাতো, রাগ দেখাতো। পরে গিয়ে আমিও পাল্টা ধমক দেওয়া শুরু করলাম, বকলে সেজেগুজে কান্না করতে বসতাম। ব্যস, হয়ে গেলো সিংহ থেকে বিলাই। এখন আমিই সিংহি।”
শালিক হেসে ওঠে,“মহা চালাক হইয়া গেছোস তো!”
“পরিস্থিতি আর স্বামী করেছে।”
“হাছা একটা কথা ক, তোর দেওরের তালাক হইছিল ক্যান? শুধু কী মাইয়ারই দোষ?”

“আমি অতশত জানি না। আমি এই বাড়িতে আসার অনেকদিন আগেই বিয়ে করেছিল। শুনেছিলাম, ভালোবাসার বিয়ে। যখন এলাম তখন তো ভালোই লাগলো। সুন্দর করে কথা বলতো, আমাকে অনেক বার সাজিয়ে দিয়েছিল, শাড়ি পরা শিখিয়েছিল। সমস্যা হচ্ছে মানসিকতার। দুইজন দুই পরিবেশের মানুষ। একজন শান্ত, প্রতিবাদ করতে পারে না, আরেকজন অশান্ত, রাগী, খুঁতখুঁতে। সংসার করতে গেলে একটু তো মানিয়ে নিতেই হয় তাই না? শুরু শুরুতে আমার তো এখানে থাকতেই ইচ্ছে করেনি, লোকটাকেও সহ্য হতো না, বাপের বাড়িতে চলে যেতাম, দাদাজানের কাছে নালিশ করতাম। আব্বা, বড়ো ভাইজানদের সাথে কথা বলাও বন্ধ করে দিয়েছিলাম। কিন্তু দাদী আমায় বোঝালো, উনিও নরম, যত্নশীল হওয়া শুরু করলেন। তাই শেষ পর্যন্ত সংসার টিকেছিল। তাদের ক্ষেত্রে এমনটা হয়নি। দুই পক্ষের কেউ কাউকে ছাড় দেয়নি।”

শালিক শুধু মাথা নাড়ালো। সে বোঝদার সাংসারিক মেয়ে। মায়ের সংসারে সব হাতেখড়ির মতো শিখেছে। ভাই হওয়ার পর সে আর বড়ো বোন মিলেই তো গোটা সংসার সামলেছে। মিছরি পুনরায় গম্ভীর কণ্ঠে বললো,“ছাড় না দিলে, ত্যাগ না করলে শুধু সংসার কেন? কোনোকিছুই টিকে না। তাই বলে একজন ছাড় দেবে, ত্যাগ করবে আর অপরজন তার ফায়দা লুটবে এমনটাও হওয়া উচিত না। উনি বলেন, স্বামী-স্ত্রী একে অন্যের পোশাক। পোশাক যেমন মানুষের লজ্জা ধরে রাখে তেমনি স্বামী-স্ত্রীকে একে অন্যের দোষ ত্রুটি গোপন রাখতে হয়। ভুল বোঝাবুঝি, ঝগড়া, ঝামেলা সব জায়গাতেই হয়। পৃথিবীতে কেউ সবদিক থেকে সুখী বা নিখুঁত নয়। তাই সেই ঝামেলা ঘরের মধ্যে লোক চক্ষুর আড়ালে মিটিয়ে নেওয়াই ভালো। লোকে জানলে ঝামেলা আরো জটিল হয়। আর বিয়ের পর মেয়েদের আপন মানুষ শুধুই স্বামী।”

শালিকের মুখমন্ডলে চাপা হাসির ঝিলিক দেখা যায়। শিউলি পানি নিয়ে ফিরতেই দুজনার কথা ওখানেই থেমে যায়। নানা বাড়ির দিকে সবার আদরের মেয়ে হচ্ছে মিছরি। ছেলেবেলা থেকে বাবা, ভাই, মামাদের কোলে কোলে বড়ো হয়েছে। রান্নাঘর কিংবা কোনো কাজে তাকে কখনো দেখা যায়নি। অথচ সেই মেয়ে কি বোঝদার এখন! শালিক বুঝতে পারে, মেয়েটা সঠিক একজন জীবনসঙ্গী পেয়েছে বলেই আজ তার এত পরিবর্তন। তাই সে এত সুখী! এটাই তো একজন নারীর জীবনে সবচেয়ে বড়ো পাওয়া। তবে চিন্তাও হয়। কে জানে, তার স্বামী আবার কেমন হয়?
রাত বাড়তেই বড়ো ভাইয়ের ধমক খেয়ে ঘরে এলো নওশাদ। চাচাতো ভাইরা টাকার জন্য পথ আটকালো না। তবে বুঝা গেলো, বড় চাচা-চাচী বাদে বাকি সবাই যে এই বিয়েতে বেশ খুশি হয়েছে। নাজির তার ঘর বদলে দিয়েছে। আগে যে ঘরে বাবা থাকতো, সেই ঘর খালি হওয়ার পর ওখানে করা হয়েছিল খাওয়ার ব্যবস্থা। এখন সেখানে রাখা হয়েছে নওশাদের যাবতীয় আসবাব। খাওয়ার জিনিসপত্র রাখা হয়েছে আগের ঘরে।

যাত্রাপথ পর্ব ৫৬

তার শব্দ পেয়ে ঘোমটার আড়ালে বসে থাকা লাল বধূ নড়লো খানিক। ইতস্তত করতে করতে নওশাদ এসে বসলো বিছানায়। তার জন্য এটা দ্বিতীয় হলেও মেয়েটার জন্য প্রথম। কীভাবে সে এই মেয়েটার অনুভূতিতে আঘাত করে প্রথম রাতটা নষ্ট করে দিতে পারে? তাই নিজেকে সামলালো। দুই হাতে তুললো ঘোমটা। বুক চিনচিন করে উঠলো। গত দিনের থেকে আজ মেয়েটাকে অন্যরকম লাগছে। বিড়বিড় করে বললো,“মাশাআল্লাহ।”
সেকথা শালিকের কানে পৌঁছাতেই লাজুক হাসলো সে। পলকহীন চোখে তাকিয়ে মেয়েটাকে দেখলো নওশাদ। কথা খুঁজে না পেয়ে জিজ্ঞেস করল,“কেমন আছো?”

যাত্রাপথ পর্ব ৫৮