Home যেই তুমি এলে যেই তুমি এলে পর্ব ২

যেই তুমি এলে পর্ব ২

যেই তুমি এলে পর্ব ২
সিনথিয়া ইসলাম সীমা

ঘড়িতে তখন রাত সাতটা কি আটটা। নিস্তব্ধ নিশি, হালকা তিমিরতায় ঘিরে আছে চারপাশ। রাস্তাঘাট তখন প্রায় মানবশূন্য। কোথাও কারো হাঁটা চলার বালাই নেই। দিনের কোলাহল থেমে গিয়ে প্রকৃতি তখন নির্জীব রূপ ধারণ করেছে।
এমনি সময় একটা গাছপালায় ঘেরা নির্জন রাস্তায় হেঁটে চলছে দুটো মানব- মানবী। কাইফার চোখে মুখে ভয়, ভিতরে বাড়ি ফেরার তৃষ্ণা। সেই তৃষ্ণা থেকেই এক অচেনা মানবের সাথে নির্দ্বিধায় পথ এগোচ্ছে সে। ওরা এখন কোথায় আছে জানা নেই কাইফার। দুচোখে যতটুকু দৃষ্টিগোচর হচ্ছে সবটুকুই অচেনা। রিক্তর পেছন পেছন হাঁটছে সে। দুজনের মাঝে কেউই কোনোরূপ শব্দ উচ্চারণ করছে না। সেই যে কক্ষ থেকে বেরোনোর সময় শেষ কথপোকথন হয়েছিল ওদের

“ আমি একা একা কীভাবে যাব এখান থেকে? এখানকার কিছুই তো চিনি না আমি। ”
উত্তরে কিছুক্ষণ চুপ করে রয় মানব। অতঃপর ভেসে আসে তার সেই গাম্ভীর্যভরা স্বর,
“ চলো আমার সাথে। ”
ব্যস এটুকুই এরপর রিক্ত নিজের মতো নিঃশব্দে পথ এগোয় আর কাইফা তার পিছন পিছন আসে। এবেলায় এসে নীরবতা চিরে মুখ খুলে রমণী। মিহি স্বরে জিজ্ঞেস করে,
“ আমরা কোথায় আছি? বাড়ি ফিরতে আরো কতক্ষণ লাগবে? ”
“ কথা না বলে হাঁটতে থাকো, বাড়ি পৌঁছলেই দেখতে পাবে। ”
বরাবরের মতোই গম্ভীর গলায় জানান দিল রিক্ত। কাইফার ভ্রূ যুগল খানেক বেঁকে গেল মানবের আচরণে। মনে মনে ভাবল- কি পেঁচামুখো লোকরে বাবা! তবে মুখে কিছুই বলল না সে। চুপচাপ এগোতে লাগল। কিছুদূর যেতেই হঠাৎ ওদের পেছন থেকে গাড়ির শব্দ ভেসে এলো। সাথে সাথেই পদ যুগল থেমে গেল রিক্তর। এদিকটায় গাড়ি চলাচল একেবারে নেই বললেই চলে। আর রাতের বেলা তো গাড়ির গ ও দেখা যায়না। শুধুমাত্র ওদের টিমের গাড়িই এই পথে যাতায়াত করে। রিক্তর বুঝতে দেরি হলো না যে, গাড়ি নিয়ে কারা এগিয়ে আসছে। সে তৎক্ষনাৎ পাশ দিয়ে যাওয়া গ্রামের রাস্তার উপর নজর দিল। পেছন ফিরে পরপর কাইফাকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“ এ পথে এখন যাওয়া যাবে না গ্রামের রাস্তা দিয়ে ঘুরে যেতে হবে। জলদি পা চালাও। ”
কাইফা প্রথমে খানেক অবাক হয়। পরক্ষণেই মস্তিস্ক নির্দেশনা দেয়- এতক্ষণে নিশ্চয়ই ওকে না পেয়ে ওখানকার বাকি লোকেরা তার খুঁজ শুরু করে দিয়েছে। আর গাড়িতে আসা লোকগুলো বোধ হয় তারাই। রমণী পায়ের গতি বাড়ায়, ছুট লাগায় রিক্তকে অনুসরণ করে। রিক্তর পুরুষালী পায়ের সাথে তাল মিলিয়ে পারেনা মেয়েটা। রিক্ত যখন রাস্তার শেষ সীমানায় পৌঁছে গেছে ও তখনো কেবল রাস্তার মধ্যসীমাতেই আটকে আছে। দুহাতে নিজের বোরকা ধরে দিকবেদিক ছুটছে সে। রাস্তার শেষ মাথায় একটা গাছের নিচে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে, মৃদু মন্দ চাঁদের আলোয় সেই দৃশ্য পরখ করল রিক্ত। কিন্তু তখনি তার এই শান্ত দৃষ্টির বিপরিতে রাস্তার ওপাশ থেকে কয়েক জোড়া হিংস্র চোখও পড়ল ছুটতে থাকা সপ্তদশীর উপর। তারা যেন হাতে চাঁদ পেল। একজন চেঁচিয়ে বলল,
“ এই এই ঐতো মেয়েটা! ঐতো ছুটছে, শীগ্রই যা তুলে নিয়ে আয় ওটাকে। শালি যাবে কোথায়? ”
বিলম্বিহীন পাঁচ ছজন লোক গাড়ি থেকে লাফিয়ে নামল। ছুটল রমণীর পেছন পেছন।

“ ড্যাম ইট! এতো স্লো কীভাবে কীভাবে হয় একটা মেয়ে! ”
হাত ঝাড়া মেরে বিরক্তি নিয়ে উচ্চারণ করে রিক্ত। ততক্ষণে প্রাণপণ ছুটে এসে তার নিকট পৌঁছাল কাইফা। এক পল পেছন তাকিয়ে দেখল সকালে তাকে তুলে আনা সেই লোকগুলোই এদিকে ছুঁটে আসছে। সে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,
“ এখন কোথায় যাব? লোকগুলো যে পেছনে লেগে গেছে! ”
“ ইচ্ছে তো করছে তোমাকে ওদের হাতেই তুলে দেই ইডিয়ট গার্ল, গায়ে জোর নেই? ”
একে তো সারাদিন কিছু খায়নি সাথে এতো কান্নাকাটি আর বিপত্তির মাঝেও যে কাইফা নিজের পা এগোতে পেরেছে এটাই অনেক বেশি। আর রিক্ত কিনা ওর সাথেই মেঝাজ দেখাচ্ছে? মেয়েটার বেশ রাগ হলো। তবে নিজেকে দমিয়ে চুপ হয়ে রইল সে। রিক্ত কিয়ৎক্ষণ বিরক্তি নিয়ে আশপাশ পরখ করল। আপাতত কোথাও একটা লুকানো দরকার। অদূরে বেশ কয়েকটা হাঁস মুরগীর খামার দেখা যাচ্ছে। কোনোকিছু না ভেবেই সেদিকে রওনা হলো সে। কাইফার দিকে এক হাত বাড়িয়ে দিলে রমণী তা নিঃশব্দে এড়িয়ে গেল। নিজেই চলল রিক্তর পেছন পেছন। ব্যাপারটা চোখে পড়লেও তেমন একটা তোয়াক্কা করল না মানব। বরং হাত খানা আলগোছে গুটিয়ে নিল। অতঃপর দুজনে আশ্রয় নিল একটা খামারে।

খামারে অচেনা মানুষের আগমন ঘটতেই হাঁস মুরগী গুলো ছোটাছুটি শুরু করে দিল। কাইফাকে নিয়ে দরজার আড়ালে দাঁড়াল রিক্ত। ওর এক হাত কাইফার মাথার উপর টিনে ঠেস দেয়া। রমণীর অবস্থা কাঁচুমাচু। অস্বস্তি ভরা চোখে ক্ষণে ক্ষণে তাকাচ্ছে সম্মুখের পুরুষটির পানে। রিক্ত শকুনি দৃষ্টিতে দরজার ফাঁক দিয়ে বাইরের পরিস্থিতি দেখছে। ওদের টিমের ছেলেগুলো ততক্ষণে খামার পেরিয়ে রাস্তা ধরে চলে গেছে। প্রথম কয়েকটা খামার চেক করলেও এই খামারের দরজা খোলা তাকায় ভিতরে ঢুকেনি। বাইরে থেকেই উঁকি ঝুঁকি মেরে চলে গেছে। রিক্ত বুদ্ধি করেই দরজা খানিকটা খোলা রেখে তার আড়ালে এসে লুকিয়েছে যেন কারো সন্দেহ না হয়। কাজ হতেই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল সে। বেরোনোর উদ্দেশ্যে পা বাড়াবে এর আগেই দরজা ধাক্কা দিয়ে ভিতরে প্রবেশ করল খামারের মালিক। কাইফার এক হাত বেখেয়ালি দরজা ও পিলারের মাঝে রাখা ছিল। যার দরুন দরজাটা পুরোপুরি খুলতেই ওর হাত চাপা পড়ে সেখানটায়। রিক্ত কিছু বুঝে উঠার আগেই মেয়েটা ব্যথায় অস্ফুট স্বরে আর্তনাদ করে ওঠে,

“ আউচ…”
অকস্মাৎ ওর ব্যাথাতুর চিৎকারে ভরকে যায় মানব। মুখ দিয়ে শব্দ উচ্চারণ করার আগেই মালিক নামক লোকটা চেঁচিয়ে উঠে,
“ এই কেরে এখানে? ”
তৎক্ষনাৎ দরজা ভিড়িয়ে ওদেরকে দৃশ্যমান করেন ভদ্রলোক। কোনোরূপ কথাবার্তা হীন আশেপাশের খামারের লোকদের উদ্দেশ্য করে হাঁক ছেড়ে উঠলেন,
“ এই হাশেম, কাদের, তাহের সব কই তোরা! তাড়াতাড়ি এইহানে আয়। ”
লোকটার কাণ্ডে ওরা দুজন একেবারে হতবাক হয়ে যায়। কাইফা যেন নিজের লালিত হাতের ব্যথাও ভুলে গেছে। ভরকানো চিত্তে ফ্যালফ্যাল করে আছে থাকে সে। এর মাঝেই রিক্ত মুখ খুলে। শক্ত গলায় লোকটার উদ্দেশ্যে বলে,
“ সমস্যা কি এভাবে চেঁচাচ্ছেন কেন? ”
“ চেঁচাচ্ছি? এখুনি বুঝবে কেন চেঁচাচ্ছি? বাড়ি থেকে পালিয়ে এসে যেখানে সেখানে নষ্টামি না?”
রিক্তর বাঁকানো ভ্রূ কুঁচকে যায়। আশ্চর্য হয়ে বলে,
“ নষ্টামি মানে? নষ্টামির কি দেখেছেন আপনি? ”

কথার মাঝেই সেখানে এক দল মুরুব্বি হুড়মুড় করে প্রবেশ করেন। লোকটা যেন এবার গায় জোর পান। ওদেরকে দেখিয়ে সবার উদ্দেশ্যে বললেন,
“ দেখো দেখো, এই পোলা মাইয়া গুলা বাড়ি থেকে পলাইয়া আইসা এখানে নষ্টামি করতেছিল। এখন আমি দেখে ফেলায় আমার চোখে ধুলো দিতে চাইছে। ”
বাক্যগুলো কর্ণপাত হতেই রিক্তর মাথায় রক্ত উঠে যায়। ও হুট করেই লোকটার ফতুয়ার কলার চেপে ধরে। অগ্নি কণ্ঠে বলে,

“ হরমজাদা তুই দেখেছিলি নষ্টামি করতে? মিথ্যে বলবি তো একদম গেড়ে দেব এখানে বলে দিলাম কুত্তেশালা! ”
ছেলেটা ভুলে যায় যে ও এখন অন্য এলাকায় আছে। তাও একগাদা গ্রাম বাসীর সামনে দাঁড়িয়ে নিজের জেদ দেখাচ্ছে। উপস্থিত গ্রামের বাসিন্দারা তার উপর তৎক্ষনাৎ ঝাপিয়ে পড়ে। রিক্তর থেকে লোকটাকে ছাড়িয়ে নিতে নিতে বলে,
“ এই ছেলে এই! তোমার তো সাহস কম না? আমাদের গ্রামে এসে আমাদের লোকের গায়েই হাত তুলছো? ”
লোকটাকে ছেড়ে দেয় রিক্ত। ওর চেহারা অস্বাভাবিক, রাগে কপালের রগ সুদ্ধ ফুলে উঠেছে। রক্তবর্ণ ধারণ করেছে অক্ষি যুগল। শ্বাস ফেলছে ঘন ঘন যেন নিজেকে দমানোর চেষ্টা চালাচ্ছে। এক পর্যায়ে পাড়ার সকল বাসিন্দা রা ছুটে আসে। লোক মুখে গুজব ছড়িয়ে পড়ে- “ গ্রামের এক খামারে ছেলে মেয়ে এক সাথে ধরা পড়েছে! ” পরিস্থিতি পুরোপুরি হাতের বাইরে চলে যায়। অতঃপর গ্রাম প্রধানের বাড়িতে জোর করে ধরে নিয়ে যাওয়া হয় রিক্ত ও কাইফাকে। সবকিছু এতটাই দ্রুত হয় যে কোনো কিছু বুঝে উঠারও সুযোগ হয়না ওদের।

গ্রাম প্রধানের বা মোড়লের বাড়িতে আজ সালিশ বসেছে। সালিশের প্রাণকেন্দ্র হয়ে উঠেছে অজানা গ্রাম থেকে আসা দুই নর- নারী। প্রথমেই তাদেরকে পরিচয় জিজ্ঞেস করা হলো। রিক্তকে তার পরিচয় জিজ্ঞেস করতেই সে ভারিক্কি গলায় জানান দিল,
“ রাইয়ান আহমেদ রিক্ত। ”
পরপর কাইফাকে ওর পরিচয় জিজ্ঞেস করতেই মেয়েটা ধরে আসা গলায় উত্তর করল,
“ কাইফা বিনতে কৃশান। ”
পরিচয় পর্ব শেষ হতেই তিনি তাদের থেকে আসল ঘটনা জানতে চাইলেন। রিক্ত কাটকাট গলায় জানান দিল যে বিপদে পড়ে জাস্ট ঐ খামারে আশ্রয় নিয়েছিল তারা। কিন্তু কে বিশ্বাস করে কার কথা? তেনারা তথ্য নিলেন ঠিকই কিন্তু সিদ্ধান্ত নিলেন নিজেদের মতো। এক পর্যায়ে মোড়ল লোকটি একজনের উদ্দেশ্যে আদেশ ছুঁড়ে,
“ যাও গিয়ে কাজির ব্যবস্থা করো। ওদেরকে এখনি বিয়ে পড়ানো হবে। ”
উপস্থিত সকলে স্বাভাবিক থাকলেই কাইফার পুরো ধরিত্রী কেঁপে ওঠে বিয়ে শব্দটা শুনে। চোখ টলমলে হয় অশ্রুতে। সে করুন দৃষ্টি তুলে তাকায় রিক্তর পানে। বুঝায় কিছু একটা করতে। রিক্ত জানে এতো এতো গ্রামবাসীর মধ্যে কিছুই করতে পারবে না সে। তবুও জোর গলায় বলল,

“ আমরা এই বিয়ে করব না। আমি বারবার বলছি আপনাদের ভুল হচ্ছে! আপনারা যা ভাবছেন তার কিছুই ঘটেনি! উনি(খামারের মালিক) শুধু শুধু কোনোকিছু না দেখেই গুজব ছড়িয়েছেন। ”
“ আমাদের গ্রামে কোনো নষ্টামী চলে না। তোমরা যদি কোনোকিছু না ও করো তবুও রাত বিরাতে দুজন ছেলে মেয়ে একাকী অন্য এলাকায় এসে উঠেছ সেই সুবাদে তোমাদের বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করে পবিত্র করা আমাদের জন্য আবশ্যক।”
বলেই ভদ্রলোক আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়ান। যেতে যেতেই গ্রামবাসীদের উদ্দেশ্যে বলে যান,
“ ওদেরকে আমাদের বসার কক্ষে নিয়ে এসো। ওখানেই বিয়ে পড়ানো হবে। ”
অতএব দুজনকে মোড়ল দের বসার কক্ষে নিয়ে যাওয়া হলো। মানব মানবীর কোনো নিষেধাজ্ঞাই শুনল না কেউ।

কাইফার চোখের পানিতে ওর নিকাব ভিজে চুপচুপে হয়ে গেছে। সামনেই বসে আছে কাজি নামক একজন মুরুব্বি লোক। তাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে পাড়ার লোকেরা। রিক্ত ও কাইফাকে একটা চৌকিতে একসাথে বসানো হয়েছে। রিক্তর মুখে তখন কোনোরূপ মুখোশ নেই। ফর্সা আদল পুরোপুরি দৃশ্যমান তার। তবে কাইফার মুখে তখনো নিকাব বাঁধা। তার উপর দিয়েই লম্বা একটা বিয়ের দুপাট্টা টানা হয়েছে। টকটকে লাল উড়নাটাতে অত্যধিক স্নিগ্ধ লাগছে তাকে। দুজনকে একসাথে বেশ ভালো মানিয়েছে- কথাটাটুকু মুখ থেকে পড়ছেই না গ্রাম বাসিদের।
কাজি সাহেব কিছুক্ষণ প্রয়োজনীয় সব বাক্য আওড়ালেন। পরপর কাইফার উদ্দেশ্যে বললেন,
“ বলো মা কবুল। ”
রমণীর মস্তিষ্ক জুড়ে তখন পরিবারের সদস্যদের রাজত্ব চলছে। নিজের সবচেয়ে প্রিয় দুটি মুখ বারবার ভেসে উঠছে মানস্পটে। যে মেয়েটা নিজের মা বাবার অনুপস্থিতিতে কখনো সামান্য কোনো কাজও সম্পন্ন করেনি আজ সেখানে বিয়ে নামক জীবনের সবচেয়ে বড় কাজটাই কিনা সম্পন্ন করে ফেলবে? তাও এমন একজন লোকের সাথে? এ কোন মুড়ে এসে দাঁড়াল তার জীবন? রমণীর ছোট্ট সত্তা দিশেহারা হয়।মুখ দিয়ে শব্দ নির্গত হয় না। ফের শুনতে পায় একই বাক্য,

“ বলো মা কবুল। ”
রিক্ত খেয়াল করল লোকটা কথার মাঝেই দুবার কবুল বলে ফেলেছে! ব্যাপারটা কেন যেন হজম হলো না মানবের না। সে তীক্ষ্ম চোখে কাজিটির দিক তাকাল।
“ বলো মা….”
যেই লোকটা তৃতীয় বার বাক্য টুকু উচ্চারণ করতে যাবে এর আগেই ছেলেটা তিরিক্ষি মেজাজে বলে উঠল,
“ এইত মিঞা, বিয়ে করতেছি আমি আর আমার আগেই কবুল বলতেছেন আপনি! দেখি দূরে সরুন এখান থেকে আপনার বিয়ে পড়ানো লাগবে না। ”
উপস্থিত সকলে রীতিমতো ভরকে যায় তার আচরণে। কক্ষের সবগুলো অদ্ভূত দৃষ্টি নিবদ্ধ হয় রিক্তর উপর। কাজি লোকটা পুরো আহাম্মক হয়ে তাকাল ওর পানে। সেদিকে মোটেও খেয়াল দেয়না বেপরোয়া মানব। অকস্মাৎ ঘামটি মেরে বসে থাকা হবু স্ত্রীকে ধমকে উঠে সে
“ এই মেয়ে কবুল বলো তাড়াতাড়ি। ”
কাইফা খানেকটা শিউরে ওঠে। চোখ দিয়ে বারি বর্ষণের মাত্রা আরো বেড়ে যায়। ওভাবেই অঝোরে অশ্রু বিসর্জনের মাঝে ভাঙা গলায় উচ্চারণ করে,
“ ক…কবুল। ”
অতঃপর একই শব্দ রয়ে সয়ে তিনবার উচ্চারণ করে রমণী। ওর পরে রিক্তর পালা আসলে সে মোটেও দেরি করেনা। পুরুষালী কণ্ঠ চিরে বেরিয়ে আসে তার বলা তিনটি পবিত্র শব্দ,
“ কবুল কবুল কবুল। ”
চারপাশে আলহামদুলিল্লাহর ধ্বনি ছড়িয়ে পড়ে। অতএব আল্লাহর হুকুমে আকস্মিক বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয় রাইয়ান আহমদ রিক্ত ও কাইফা বিনতে কৃশান।

ঐদিন রাতে আর বাড়ি ফেরা হলো না রিক্ত কাইফার। প্রায় মধ্যরাত হয়ে যাওয়ায় মোড়ল বাড়িতেই থাকতে হলো ওদের। আলাদা কক্ষে দুজনকে থাকতে দেয়া হয়েছে। সেই আলাদা কক্ষের ভিতরেই বিরাজ করছে ওদের মধ্যকার আলাদা দূরত্ব। কাইফা খাটের সাথে হেলান দিয়ে মুখ খুঁজে তখনো কেঁদেই যাচ্ছে। থামার কোনো নাম নেই। গায়ের বোরকা থেকে হিজাবটাও এই অব্দি খুলেনি সে। এক নাগাড়ে কাঁদতে কাঁদতে সবগুলো ভিজিয়ে ছাড়ছে। এক পর্যায়ে অতিরিক্ত কান্নার দরূন হেঁচকি ওঠে যায় মেয়েটার। রিক্ত কক্ষের জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ওর কান্ড কারাখানা কিছুক্ষণ পর্যবেক্ষণ করে। পরপর পকেট থেকে সিগারেট বের করে বিরক্তি নিয়ে মুখে পুরে। লাইটারের সাহায্যে তা জ্বালাতেই কক্ষে নিকোটিনের ধোঁয়ার রেশ ছড়িয়ে পড়ে। রমণীর বন্ধ নাকে কোনোরূপ প্রতিক্রিয়া না হলেও মুখের মধ্যে সেই নিকোটিনের রেশ পৌঁছাতেই হালকা কেশে উঠে সে। গুঁজে রাখা নারী দেহটা খানেক কেঁপে উঠে কাশির তুরে। রিক্তর বিরক্তির মাত্রা আকাশ ছুঁয়। ফুস করে একটা নিঃশ্বাস ফেলে রুম থেকে বেরিয়ে যায়। যেতে যেতেই বড্ডো অনিহা নিয়ে বলে,

যেই তুমি এলে পর্ব ১

“ এভাবে ফ্যাস ফ্যাস করে কাঁদার কোনো কারণ দেখছি না। কিছুক্ষণ আগের ওসব মনে রেখে লাভ নেই রাত পোহাতেই তুমি তোমার পথে আর আমি আমার! ”

যেই তুমি এলে পর্ব ৩