Home যেই তুমি এলে যেই তুমি এলে পর্ব ৩

যেই তুমি এলে পর্ব ৩

যেই তুমি এলে পর্ব ৩
সিনথিয়া ইসলাম সীমা

রিক্তকে লাগাতার কল করে যাচ্ছে ওদের টিমের লোকেরা। মোবাইল সাইলেন্ট করে এতক্ষণ সব ফোন কল সম্পুর্ণ উপেক্ষা করেছে রিক্ত। তবে এবেলায় বাইরে এসে কল রিসিভ করল সে। সাথে সাথেই ওপাশ থেকে ভেসে আসলো উত্তেজিত কণ্ঠস্বর,
“ রিক্ত মেয়েটা তো পালিয়েছে কোথাও খুঁজে পাচ্ছি না ওটাকে। তুই তো পাশের কক্ষেই ছিলি তাহলে কীভাবে পালাল মেয়েটা? আর তুই এখন কোথায়? ”
“ মেয়েটাকে ওর রক্ষাকারী এসে বাঁচিয়ে নিয়ে গেছে আমি ওদের পিছু নিতে গিয়েই এক জায়গায় আটকে গেছি। ”
ওপাশের ব্যক্তিরা বোধ হয় বেশ অবাক হলো। কতক্ষণ চুপ থেকে বিস্ময় নিয়ে বলল,

“ তোর হাত থেকে পালিয়েছে…! এখন রিয়াজুল স্যারকে কি বলবি? ”
“ স্যারের দিক আমি সামলে নিব। ওসব নিয়ে তোদের ভাবতে হবে না। ”
“ ঐ মাইয়ার এতো বড় স্পর্ধা আমাদের চোখে ছাই দিয়ে পালায়! ঐটাকে যদি আবার ধরে না এনেছি….”
কথা সম্পূর্ণ করতে পারল না ব্যক্তি এর আগেই এপাশ হতে ধ্বনিত হলো মানবের অদ্ভূত স্বর,
“ ভুল করেও এই ভুল দ্বিতীয়বার করবি না। তোদেরকে যেন আর ভুলেও ঐ মেয়ের ধারে কাছেও না দেখি। ”
“ কেন? ”
“ শালার ব্যাটা, দুনিয়াতে কি আর মেয়ে ছিল না? ওটাকেই তুলে আনতে হলো তোদের? ”
“ মাইয়াডারে তো ভালো দামে বিক্রি করা যেত। পুরাই কড়া মা….”
“ অমূল্য রত্ন বিক্রয়ের জন্য নয়। ”
“ বুঝলাম না কি বলছিস? ”
“ বুঝতে হবে না কিছু। এক কথা ব্যাস, ঐ মেয়ের ব্যাপারে কিছু শুনতে চাইনা আমি। হারানো জিনিস দ্বিতীয় বার খুঁজা রিক্তর পছন্দ নয়। ”
“ আচ্ছা তাহলে অন্য ব্যবস্থা করছি। ”
“ হুম আগামীকালের মধ্যেই একটাকে তুলে আন। রিয়াজুল স্যার এর কাছে ট্রান্সফার করতে হবে আমায়। ”
বলেই খট করে কল কেটে দিল রিক্ত। পরপর হাতে থাকা সিগারেট টায় লম্বা টান মারল। জ্যোৎস্না রাতের আকাশে চেয়ে ভাবতে লাগল কিছু একটা।

রাতের প্রায় শেষ ভাগে কক্ষে ফিরে এলো রিক্ত। কক্ষে পা রাখতেই কর্ণপাত হলো কাইফার হেঁচকির শব্দ। রিক্তর মনে হলো থেকে থেকে আসা হেঁচকির শব্দের সাথে তার শক্ত বুকেও যেন কিছু একটা হচ্ছে। ছেলেটা বড্ডো বিরক্ত হলো। কণ্ঠে প্রচণ্ড অনিহা নিয়ে উচ্চারণ করল,
“ কি সাংঘাতিক নারী জাতিরে বাবা! এই মেয়েতো দেখছি সামান্য চোখের পানি দিয়েই আমার শক্ত বুকে তান্ডব বইয়ে ছাড়বে! ”
সে অতিষ্ট হয়ে কাইফার নিকট এগিয়ে এলো। উদ্দেশ্য- একটা রাম ধমক দিয়ে কান্না ছুটিয়ে দিবে রমণীর। তবে কিছুটা এগিয়ে আসতেই পদ যুগল থমকে গেল কঠোর মানবের। চোখের সামনে আবিষ্কার করল এক আশ্চর্যরূপের অধিকারী নারীকে। কৃষ্ণ রঙ্গা হিজাবের মধ্যে চাদের রূপালী আলোয় জ্বলজ্বল করছে একটা চন্দন রঙা মুখশ্রী। সেখানে বিদ্যমান সুচাল নাকের ডগা লালিত, কান্নার দরূন কপোল দ্বয়েও ফুটে উঠেছে হালকা লালিত ভাব। দেখে মনে হচ্ছে মেয়েটার মুখে যেন লাল গোলাপেরা আলোকচ্ছটা ছড়িয়ে দিচ্ছে! আঁখি যুগলের সুদীর্ঘ পল্লব ভিজে একটার সাথে আরেকটা লেগে যেন ভয়ানক মায়া সৃষ্টি করছে- সবকিছু মিলিয়ে ফোলা ফোলা ঐ গালমুখ যেন এক লহমায় রিক্তর পুরুষালী বুকটাকেই কাঁপিয়ে তুলেছে। সে স্তব্ধ হয়ে রয়, স্তব্ধ হয় ওর মস্তিষ্ক। পা ঠেলেঠুলে সামনে এগোয়। বসে গিয়ে কাইফার মুখোমুখি। সময় নিয়ে থেমে থেমে উচ্চারণ করে,

“ এত্তো টা মায়াবী কবে হলি তুই? ধ্বংস কি তবে নিশ্চিত করেই ছাড়বি আমার! ”
কাইফা তখন নিদ্রাচ্ছন্ন। কোনোমতে কেবল মুখের নিকাবটা খুলে ঘুমিয়েছে সে। আর বাদবাকি সব আগের মতোই। কেঁদে কেটে ঘুমানোর ফলে ঘুমের মধ্যেই এখনো হেঁচকি তুলছে। যার দরুন ক্ষণে ক্ষণে কেঁপে উঠছে ওর নারীসুলভ দেহ। রিক্ত কতক্ষণ পূর্ণ দৃষ্টিতে ওকে নিরীক্ষণ করে। পরপর হুট করেই বসা থেকে উঠে পড়ে। গিয়ে দাঁড়ায় জানালার নিকট। অতঃপর ফের সিগারেট ধরায় সে। এভাবেই নির্ঘুম কাটিয়ে দেয় সেই রাতটুকু।

ফজরের আযানের কিছুটা বাদেই ঘুম ভেঙে যায় কাইফার। পিটপিট করে ভারী চোখের পাতা মেলে তাকায় সে। ও জানালার দিক মুখটা দিয়েই ঘুমিয়েছিল। যার দরুন চোখ খুলতেই জানালার কাছে আবিষ্কার করল রিক্তকে। ওমনিই চেঁচিয়ে উঠল রমণী,
“ কে আপনি! ”
সদ্য ঘুম থেকে উঠা কাইফার মস্তিস্ক তখন কার্যক্ষম। কিন্তু রিক্তর সজাগ মস্তিস্ক ওর কথা শুনে তৎক্ষনাৎ ঘুরে তাকাল। শান্ত দৃষ্টিতে একবার পরখ করল সদ্য ঘুম থেকে উঠা নববধূকে। পরপর ফিচেল হেসে জবাব দিল,
“ তোমার কেউনা! আবারও খুব কাছের কেউ! ”
ওর এহেন রহস্যময় কথার অর্থ বুঝতে সক্ষম হলো না কাইফার সরল সত্তা। সে রিক্তকে দেখতেই রাতের সব ঘটনা ইয়াদ করল। পরপর চোখ ঘুরিয়ে পর্যবেক্ষণ করল কক্ষটাকে। অপরিচিত কক্ষ খানা দেখতেই পুনরায় চোখে অশ্রুকণারা ভিড় জমাতে শুরু করল। তবে তা চোখ বেয়ে তা নির্গত হওয়ার আগেই শুনতে পায় মানবের গম্ভীর কণ্ঠ,
“ কুইকলি তৈরি হয়ে নাও এক্ষুণি বেরোব আমরা। ”
কাইফার ছলছলে আঁখিতে এবার আশার আলো ফুটে উঠল। মেয়েটা ব্যস্ত গলায় প্রশ্ন ছুঁড়ল,
“ আমায় বাড়ি দিয়ে আসবেন তো? ”
“ হুম। ”
সব্দটুকু উচ্চারণ করেই কক্ষ ত্যাগ করল রিক্ত। কাইফা ত্রস্ত পায়ে বিছানা থেকে নামল। এর মাঝেই কক্ষে প্রবেশ করল এক মধ্যবয়স্ক নারী। তিনি এসেই কাইফা উদ্দেশ্য করে বললেন,

“ তোমরা কি এখনি চলে যাবে? ”
“ জ্বি। ”
“ তোমাদের বাড়ি কোথায়? ”
“ আমার বাড়ি কুমিল্লা। ”
“ আর তোমার স্বামীর? ”
স্বামী শব্দটা শুনতেই কেমন যেন একটা অনুভূতি হলো কাইফার। সে কিছুক্ষণ চুপ থেকে জবাব দিল,
“ তার সম্পর্কে কিছুই জানিনা আমি। ”
ভদ্রমহিলা নাক মুখ সিঁটকালেন। কাইফার কথাটা মোটেও বিশ্বাস করলেন না। ভাবলেন নিশ্চই মিথ্যা বলছে মেয়েটা। এই বিষয়ে আর কথা বাড়ালেন তিনি। তাকে যে কারণে এখানে পাঠানো হয়েছে সেটাই জানিয়ে চলে গেলেন,
“ মোড়ল বউ বলেছে যাওয়ার আগে সকালের নাস্তা খেয়ে যেতে তোমরা দুজন। রাত থেকে তো কিছুই খাওনি। ”
কাইফার মাথাতে খাওয়ার কোনো চিন্তাই নেই। তার শুধু বাড়ি যাওয়ার চিন্তা। মা- বাবাকে দেখার চিন্তা। না জানি তার নিখোঁজ হওয়ার খবরে তার আম্মুর আব্বুর অবস্থা কি হয়েছে! কাইফা ব্যস্ত হাতে নিজের হিজাব ঠিক করে নিয়ে মুখে নিকাব বাঁধে। পরপর হাঁটা দেয় কক্ষের বাইরে।
কাইফাকে দেখতেই সোজা গন্তব্যে হাঁটা দেয় রিক্ত। পেছন থেকে মোড়ল বাড়ির লোকেরা ডাকলেও পরোয়া করেনা। একেবারে লা পরোয়া ভঙ্গীতে কাইফাকে নিয়ে গ্রাম ছাড়ে সে।

কাইফা ভেবেছিল রিক্তই ওকে একেবারে বাড়ি অব্দি পৌঁছে দিবে। আর সেটা নিয়েই পুরো রাস্তা চিন্তায় ছিল রমণী। রিক্তকে দেখে সবাই কেমন রিয়েক্ট করবে? কিভাবে, কি বলে সবকিছু সামলাবে সে? আদৌ কি সামলাতে পারবে? নাকি এর আগেই কোনো সমস্যা হয়ে যাবে? আর লোকটা যে রাতে বলল- ওদের পথ আলাদা হয়ে যাবে? এর মানে কি তাকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে লোকটা চলে আসবে? তাহলে তো কাইফার পক্ষে সবকিছু সামলানো আরো অসম্ভব হয়ে উঠবে। পরিবার যেমন তেমন সমাজ কীভাবে সামলাবে সে?
কিন্তু সেরকম কিছুই হলো না। উল্টো ওর বাড়ির রাস্তায় এসে রিক্ত কল করে কোথা যেন একজন বয়স্ক নারী আনলেন। তিনি আসলেন নিজস্ব প্রাইভেট কার নিয়ে। সেটাতেই কাইফাকে বসিয়ে দিল রিক্ত। মেয়েটা প্রশ্নাত্মক দৃষ্টিতে তাকিয়ে কিছু বলতে নিবে এর আগেই রিক্ত বলে উঠল,
“ গতকাল যা হয়েছে সব ভুলে যাও। এখন আন্টি যা যা শিখিয়ে দিবে বাসায় পৌঁছে সেটাই বলবে। ”
কাইফা থেমে গেল । মুখে আসা কথাটুকু গিলে নিল সন্তর্পণে। মাথা দুলিয়ে জবাব দিল,

“ ঠিক আছে। ”
তৎক্ষনাৎ গাড়ি স্টার্ট হলো। রিক্তকে পেছন ফেলে ধোঁয়া উড়িয়ে চলে গেল গাড়িটা। রিক্ত ঠায় দাঁড়িয়ে রইল আগের জায়গাতেই। সেই দৃশ্য ভিউ মিররে শান্ত দৃষ্টিতে দেখল রমণী।
“ তোমার নাম কি? ”
পাশ থেকে আসা নারী কণ্ঠে মিরর থেকে চোখ সরাল কাইফা। সাবলীল গলায় উত্তর করল,
“ কাইফা বিনতে কৃশান। ”
“ নাইস নেম! ”
পৃষ্ঠে কিছুক্ষণ নীরব থাকে কাইফা। অতএব দ্বিধাদ্বন্দ্ব নিয়ে শুধায়,
“ আপনি উনার কি হন? ”
প্রশ্ন শুনে নারীটি হাসেন। সময় নিয়ে বলেন,
“ আন্টি। ”
“ ওহ। ”
“ শোনো আমি তোমার পরিবারকে বলব- রাতে তুমি আমাদের বাড়িতে ছিলে। গতকাল খারাপ লোকেরা তোমায় তাড়া করেছিল আর তাদের হাত থেকে বাঁচতে তুমি আমার গাড়িতে লিফট নিয়েছিল তারপর আমি তোমাকে আমার বাড়িতে নিয়ে গিয়েছিলাম। ওকে? ”
“ জ্বি আচ্ছা। ”
অতএব দুজনেই চুপ হয়ে যায়। কাইফা চুপচাপ বাইরের দৃশ্য দেখতে থাকে। ভাবে হয়তো কোনোকিছু।

ভোরের নিস্তব্ধতা যেন মির্জা বাড়িকে চতুর্দিক থেকে ঘিরে ধরেছে। বাড়ির প্রতিটা দেয়ালে দেয়ালে যেন বিরাজ করছে এক অদৃশ্য হাহাকার। বাড়িতে তখন সদস্যের সংখ্যা একেবারেই নগণ্য। বাড়ির ছোট ছেলে কৃশান মির্জা হার্ট অ্যাটাক করে হসপিটলে ভর্তি হয়ে আছে। আর তার স্ত্রী হুমায়রা জান্নাত হিমিকে কক্ষের মধ্যে ঘুমের ইনজেকশন পুশ করে শুইয়ে রাখা হয়েছে। তার পাশেই ক্লান্ত হয়ে বসে আছে ইকরা, জিনিয়া ও ডাক্তার নাছিমা বেগম। আর বাদবাকি সবাই হসপিটালে। হুমায়রা এখনো কৃশানের ব্যাপারে কিছুই জানেনা। তাকে এর আগেই ইনজেকশন দিয়ে দিয়েছেন নাছিমা বেগম। কিন্তু একদিকে মেয়ে হারানোর শোক সাথে স্ত্রীর এমন অবস্থা একসাথে সামলে উঠতে পারেনা কৃশান। হুট করেই হার্ট অ্যাটাক করে পড়ে যায় সে। রাতারাতি তাকে নিয়ে হসপিটাল যাওয়া হয়। অতঃপর এভাবেই শান্ত হয়ে আছে পুরো মির্জা নিবাস।
বাড়িতে পা রাখা মাত্রই বাড়ির এহেন নির্জীবিতা দেখে গা কাটা দেয় কাইফার। সে দরজা থেকেই কাঁপা কাঁপা গলায় ডেকে উঠে,

“ আব্বু আম্মু? ”
কারোরই কোনোরূপ সাড়া মেলেনা। তবে হুমায়রার কক্ষ থেকে ছুটে আসতে দেখা যায় জিনিয়া ও ইকরাকে। কাইফা নিজেও ছুট লাগায়। মুহূর্তেই ওর উপর এসে ঝাপিয়ে পড়ে দুটো নারী শরীর। তিন জনেই একত্রে শব্দ করে কেঁদে দেয়। কাইফা কাঁদতে কাঁদতেই প্রশ্ন করে,
“ আম্মু কই? বাবা ঠিক আছে তো? ”
“ কিচ্ছু ঠিক নেইরে মা, তুই কোথায় ছিলি গতকাল? ”
কাইফার ভয় হয়। কান্নার গতি বাড়ে। ওভাবেই ডুকরে ওঠে বলে,
“ বাবার কিছু হয়েছে? আম্মু কোথাও বলো না আমায়। ”
“ তেমন কিছুই হয়নি। শান্ত হও আম্মু। ”

যেই তুমি এলে পর্ব ২

কাইফার অবস্থা দেখে ওকে সামলাতে বলে উঠল জিনিয়া। সাথে ইকরাকেও শান্ত হওয়ার জন্য ইশারা করল। ইকরা নিজেকে ধাতস্ত করার চেষ্টা করল। ততক্ষণে কাইফা ওদেরকে অতিক্রম করে ত্রস্ত পায়ে ছুটল নিজের মায়ের রুমে। তখনি জিনিয়াদের নজর যায় বাড়ির মূল ফটকে শান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা রিক্তর আন্টির পানে। ভদ্রমহিলা অবাক দৃষ্টিতে তাদেরকেই দেখছেন।

যেই তুমি এলে পর্ব ৪