Home যেই তুমি এলে যেই তুমি এলে পর্ব ৯

যেই তুমি এলে পর্ব ৯

যেই তুমি এলে পর্ব ৯
সিনথিয়া ইসলাম সীমা

বিকেলের রোদ তখন ধীরে ধীরে নরম হয়ে এসেছে। পশ্চিম আকাশ জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে সোনালি-কমলা আভা। হালকা বাতাসে আহমেদ নিবাসের বাগানের ফুলগুলো দুলে দুলে এক মায়াবী পরিবেশ তৈরি করেছে। দূরে কোথাও মাগরিবের পূর্ব মুহূর্তের পাখিদের কোলাহল, আর বাড়ির ভেতরে অনুষ্ঠানের প্রস্তুতির ব্যস্ততা—সব মিলিয়ে বিকেলটা যেন আলাদা এক প্রাণ ফিরে পেয়েছে।
ড্রয়িংরুমে বসে গল্প করছে কাইফা, অর্শী আর রোহান। রোহান কখনো খেলনা নিয়ে ব্যস্ত, কখনো আবার কাইফার পাশে এসে বসছে। অন্যদিকে রোশনী এক কোণে ল্যাপটপ খুলে বসে আছে। চোখ স্ক্রিনে থাকলেও মাঝেমধ্যে আড়চোখে সবার দিকে তাকাচ্ছে।
ঠিক তখনই বাইরে গাড়ির শব্দ ভেসে এলো।
রোহান উচ্ছ্বসিত হয়ে জানালার দিকে ছুটে গেল।

“ রিক্ত ভাইয়া এসেছে! ”
কয়েক মুহূর্ত পর সদর দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করল রাইয়ান আহমেদ রিক্ত।
সারাদিনের অফিস শেষে মুখে স্পষ্ট ক্লান্তির ছাপ। গাঢ় নেভি ব্লু শার্টের উপরের দুটো বোতাম খোলা, হাতা কনুই পর্যন্ত গুটানো। গলায় ঝুলে থাকা টাইটা আলগা হয়ে গেছে। এক হাতে গাড়ির চাবি, অন্য হাতে মোবাইল।
ঘরে ঢুকেই কারও দিকে না তাকিয়ে সোজা সিঁড়ির দিকে হাঁটা দিল সে। যেন বাড়ির এই কোলাহল তার দৈনন্দিন জীবনেরই এক পরিচিত অংশ, যার সঙ্গে আলাদা করে নিজেকে জড়ানোর প্রয়োজন বোধ করে না। এর মাঝেই রান্নাঘরের দিক থেকে বেরিয়ে এলেন অর্না বেগম।
“ রিক্ত, একটু দাঁড়াও তো। ”
পায়ের গতি থামাল রিক্ত। ধীরে ধীরে ঘুরে তাকাল।
“ কিছু বলবেন, আন্টি? ”
অর্না বেগম এগিয়ে এসে বললেন,
“ আজ তোমার একটা কাজ আছে। ”
রিক্ত সংক্ষেপে জিজ্ঞেস করল,

“ কী কাজ? ”
“ একদিন বাদেই তো অনুষ্ঠান। এখনো অনেক কেনাকাটা বাকি। আমি যেতে পারছি না, রান্নাঘরে অনেক কাজ পড়ে আছে। তুমি কাইফা, অর্শী, রোহান আর রোশনীকে নিয়ে মার্কেটে ঘুরে এসো।”
কথাটা শেষ হতেই রিক্ত এক মুহূর্ত দেরি না করে জবাব দিল,
“ ড্রাইভারকে বলে দিন। ”
অর্না বেগম যেন এমন উত্তর আগেই ভেবে রেখেছিলেন।
“ ড্রাইভারকে দিয়ে হবে না। ”
“ কেন হবে না? ”
“ এতগুলো ছেলেমেয়ে থাকবে। কেনাকাটা করবে। তাদের দেখাশোনা করবে কে? ড্রাইভার কি এসব বুঝবে? ”
রিক্ত নির্বিকার কণ্ঠে বলল,
“ রোশনী তো আছে। ”
রোশনী মাথা নিচু করল। সে বুঝতে পারল–রিক্ত ইচ্ছে করেই নিজেকে এই দায়িত্ব থেকে সরিয়ে রাখতে চাইছে। অর্না বেগম এবার একটু এগিয়ে এসে বললেন,
“ রোশনী একা সব সামলাতে পারবে না। আর কাইফা এই বাড়িতে নতুন এসেছে। ও শহরের কিছুই চেনে না। অর্শী আর রোহান তো ছোট। আমি নিশ্চিন্ত থাকব কীভাবে? ”
রিক্ত কয়েক সেকেন্ড নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে রইল।
তারপর শান্ত গলায় বলল,

“ নাউ আ’ম টায়ার্ড আন্টি, অন্য কাউকে বলুন।”
অর্না বেগম দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
“ সারাক্ষণ শুধু অফিস, মিটিং আর কাজ! নিজের জন্য তো সময় রাখো না, পরিবারের জন্যও না। কতদিন পর বাড়িতে অতিথি এসেছে, তবুও তোমার এত অনীহা! ”
রিক্ত এবারও চুপ। অর্না বেগম ফের নরম গলায় বললেন,
“ শোনো রিক্ত, তোমাকে তো আমি প্রায় কখনো কিছু বলি না। আজ বলছি। কাইফা প্রথমবার আমাদের বাসায় এসেছে। মেয়েটা যেন ভালোভাবে ঘুরে আসে। আমার মুখের দিকে তাকিয়ে একবার না কোরো না। ”
রিক্ত চোখ তুলে অর্না বেগমের দিকে তাকাল।
এই বাড়িতে একজন মানুষের অনুরোধ সে খুব কমই ফিরিয়ে দিতে পারে। আর তিনি হলেন অর্না বেগম। ছেলেটা কয়েক মুহূর্ত নীরব থাকার পর প্রশ্ন ছুঁড়ল,

“ কখন বের হতে হবে? ”
অর্না বেগমের মুখে হাসি ফুটে উঠল।
“ এই কিছুক্ষণ পর, সবাই ততক্ষণে তৈরি হয়ে নেবে। ”
রিক্ত সংক্ষিপ্তভাবে মাথা নাড়ল।
“ ঠিক আছে। ওদের রেডি হতে বলো আমি ফ্রেশ হয়ে আসছি। ”
এটুকু বলেই আর কোনো কথা না বাড়িয়ে সোজা সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে গেল।

রিক্ত উপরে চলে যেতেই ড্রয়িংরুমে যেন মুহূর্তেই উৎসবের আমেজ নেমে এলো।
রোহান আনন্দে দু’হাত উঁচু করে চিৎকার করে উঠল,
“ ইয়েস! আজকে আমরা মার্কেটে যাব! ”
অর্শীও আর বসে থাকতে পারল না।
“আমি এখনই রেডি হতে যাচ্ছি। রোশনী আপু, তুমিও তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নিন। ”
রোশনী মুচকি হেসে ল্যাপটপ বন্ধ করে উঠে দাঁড়াল।
“ হুম, যাচ্ছি। ”
সবাই যখন নিজ নিজ রুমের দিকে ছুটছে, তখন কেবল স্থির হয়ে বসে রইল কাইফা। অর্না বেগম বিষয়টা লক্ষ্য করে কাছে এসে বসলেন।
“ কি হলো খালামনি? তুমি উঠছো না কেন? ”
কাইফা ইতস্তত করে বলল,

“ খালামনি… আমার না গেলেও হবে। ”
“ কেন? ”
“ আমার তো কিছু লাগবে না। আর আপনাদের এত ঝামেলার মধ্যে আমার জন্য আলাদা করে কষ্ট করারও দরকার? ”
অর্না বেগম হেসে ফেললেন।
“ তোমার আম্মু- আব্বু কি আমার বাড়ির কিছু নিতে নিষেধ করে দিয়েছে নাকি তোমায়? ”
“ না না তা না… কিন্তু…”
“ কোনো কিন্তু নয়। ”
এমন সময় অর্শী দৌড়ে নেমে এলো। প্রশ্নাত্মক চোখে জিজ্ঞেস করল,
“ কী হয়েছে? ”
উত্তরে অর্না বেগম বললেন,

“ তোমার আপি বলছে, ও নাকি যাবে না। ”
“ কি! ”
অর্শী চোখ বড় বড় করে তাকাল।
“ কেন যাবে না? ”
“ তোমরা যাও। আমি বাসায় থাকি। ”
“ একদম না। ”
অর্শী হাত ধরে টেনে বলল,
“ তুমি না গেলে আমিও যাব না। ”
এর মাঝেই রোহানও ছুটে এল।
“ আপি যাবে না? ”
শিশুটার মুখ মুহূর্তেই মলিন হয়ে গেল। ওভাবেই শুধাল,

“ কেন যাবে না? ”
“ এমনিই, আপির ভালো লাগছে না। তোমরা যাও। ”
“ তাহলে আমার সঙ্গে আইসক্রিম খাবে কে? ”
কাইফা হেসে ফেলল।
“ ওটা নাহয় পরে একদিন খাব। ”
“ না! আজকেই। ”
বলেই ছোট্ট দুই হাত দিয়ে কাইফার হাত জড়িয়ে ধরল।
“ প্লিজ আপি, চলো না…”
রোশনীও এতক্ষণ চুপ ছিল। এবেলায় এসে সেও মুখ খুলল। কাইফাকে উদ্দেশ্য করে শান্ত গলায় বলল,
“ সবসময় ঘরে থাকো। একটু বাইরে গেলে মনটাও ভালো লাগবে। ”
অর্না বেগমও সায় দিলেন।
“ ঠিক তাই। এলে ধরে তো সারাক্ষণ রুমেই বসে আছো। আজ একটু বাইরে ঘুরে এসো। ”
শেষ পর্যন্ত সবার অনুরোধ আর রোহানের নিষ্পাপ মুখের কাছে হার মানল কাইফা। অতঃপর সম্মতি জানিয়ে বলল,
“ আচ্ছা যাচ্ছি। ”
“ ইয়েস! ”
রোহান আরেকদফা লাফিয়ে উঠল। অর্শী মুচকি হেসে বলল,
“ চলো তাহলে। এক্ষুণি রেডি হতে হবে। নয়তো ভাইয়া এসে রেগে যাবে। ”
“ হুম চলো। ”
কাইফা ধীর পায়ে উঠে দাঁড়াল। অর্শীর হাত ধরে হাঁটা দিল নিজ কক্ষে।

সন্ধ্যার নরম আলোয় শহরের ব্যস্ত রাস্তাগুলো তখন গাড়ির সারিতে ভরে উঠেছে।
আহমেদ নিবাসের কালো এসইউভিটাও ধীরে ধীরে গেট পেরিয়ে মূল সড়কে উঠে এলো।
স্টিয়ারিংয়ে বসে আছে রাইয়ান আহমেদ রিক্ত।
ফ্রন্ট সিটে তার পাশেই বসে আছে কাইফা। ওদের মাঝখানে বসে আছে রোহান। মূলত রোহানের জোরাজুরিতেই কাইফাকে এখানে বসতে হয়েছে। শিশুটি নিজেও বসেছে সঙ্গে তাকে নিয়েই বসেছে। পিছনের সিটে রোশনী, অর্শী নিজেদের মতো শপিং নিয়ে কথাবার্তা বলছে।
গাড়ির ভেতর টুকটাক হাসির শব্দ ভেসে এলেও কাইফা পুরোটা সময় নিশ্চুপ। কালো বোরকা আর নিকাবে নিজেকে সম্পূর্ণ আবৃত করে রেখেছে সে। শুধু দুটি চোখ দৃশ্যমান। জানালার কাঁচ নামানো। প্রকৃতির শীতল বাতাসে নিকাবের কিনারা বারবার দুলে উঠছে। চুপচাপ জানালার বাইরে তাকিয়ে আছে সে।
ব্যস্ত শহর, একটার পর একটা উঁচু ভবন, রাস্তার দু’পাশে আলো ঝলমলে দোকান, মানুষের ভিড়।
মাদ্রাসার চার দেয়ালের বাইরে এই ব্যস্ত শহরটাকে খুব কমই দেখা হয় তার। তাই গভীর মনোযোগে সবকিছু দেখছিল।

এইদিকে গাড়িটা যখনই কোনো সিগন্যালে থামছে কিংবা অন্য গাড়ির পাশ কাটিয়ে যাচ্ছে, আশপাশের অনেকের দৃষ্টিই অজান্তে গিয়ে থামছে রমণীর চোখ দুটোর ওপর।
কালো নিকাবের আড়ালে বড় বড় দুটি হরিণচোখ। ঘন, লম্বা পাপড়ির ছায়ায় চোখ দুটো যেন আরও গভীর হয়ে উঠেছে।
কেউ মুহূর্তের জন্য তাকিয়ে আবার সামনে ফিরছে, কেউবা দ্বিতীয়বারও তাকাচ্ছে।
রিক্ত প্রথমে বিষয়টা অতো খেয়াল করেনি। আর করলেও গুরুত্ব দেয়নি।
কিন্তু কয়েক মিনিটের মধ্যেই একই দৃশ্য বারবার চোখে পড়তেই অস্বস্তি হতে লাগল তার।
সামনের লাল সিগন্যালে গাড়ি থামতেই পাশের একটি প্রাইভেটকারের দু’জন যুবক কৌতূহলী চোখে কাইফার দিকে তাকিয়ে রইল। কাইফার নজর তখন প্রকৃতির দিকে।
রিক্তের চোয়াল শক্ত হয়ে এলো। মস্তিষ্ক জ্বলে উঠল আপনাতেই।
আঙুলগুলো জোর দিয়ে স্টিয়ারিংটা চেপে ধরল। বিরক্তি নিয়ে বিড়বিড় করল,

“ হোয়াট আ ননসেন্স একটিভিটি! ”
কথাটুকু কেউ শুনল না। সবুজ বাতি জ্বলতেই আবার গাড়ি চলতে শুরু করল। কিন্তু কিছুদূর এগিয়েই হঠাৎ–
ক্যাঁচ…
রাস্তার একপাশে গাড়িটা থামিয়ে দিল রিক্ত।
অপ্রত্যাশিত ঘটনাটায় সবাই অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল। অর্শী অবাক গলায় বলল,
“ কি হয়েছে ভাইয়া? ”
কোনো উত্তর দিল না রিক্ত। শুধু সামনের দিকে ঝুঁকে কাইফার পাশের জানালার সুইচে চাপ দিল। ধীরে ধীরে কাঁচটা ওপরে উঠে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেল। কাইফা বিস্মিত চোখে তাকাল। অজান্তেই মুখ ফসকে বলে উঠল,

“ জানালাটা বন্ধ করলেন কেন? ”
রিক্ত নির্বিকার স্বরে বলল,
“ এসি চলছে। জানালা খোলা রাখার দরকার নেই। ”
কাইফা ধীর গলায় বলল,
“ আমার গরম লাগছিল না… বাতাসটা ভালো লাগছিল। ”
রিক্ত একবার তার দিকে তাকাল। শান্ত অথচ গম্ভীর গলায় জবাব দিল,
“ বাতাস পরে খাওয়া যাবে। ”
“ কিন্তু…”
“ আমি ড্রাইভ করছি। ”
তিনটি শব্দ। শীতল, সংক্ষিপ্ত, প্রশ্নের সুযোগহীন।
কাইফা চুপ করে গেল। রোহান মুখ বাড়িয়ে বলল,
“ ভাইয়া, জানালাটা বন্ধ থাকলে ভালো লাগে না, দমবন্ধ লাগে। ”
রিক্ত এবার চোখ ঘুরিয়ে ওর দিক তাকাল। মিথ্যে আশা দিয়ে বলল,
“ পাঁচ মিনিট পর খুলব। ”
কথাটা বলেই আবার গাড়ি চালাতে শুরু করল।
কাইফা আর কিছু বলল না।
তবে তার মনে হলো, মানুষটা যেন অকারণেই জানালাটা বন্ধ করে দিল। মেয়েটা মনে মনে অসন্তুষ্ট কণ্ঠে বিড়বিড় করল,
“ পেঁচামুখো লোক! ”
অন্যদিকে রিক্ত যেন কিছুই হয়নি এমন ভাবেই আবার গাড়ি চালাতে শুরু করল।

কয়েক মিনিট পর গাড়িটা এসে থামল গুলশানের অভিজাত এক শপিংমলের সামনে।
চারপাশে মানুষের ভিড়। কেউ পরিবার নিয়ে এসেছে, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে। কাঁচঘেরা বিশাল ভবনের সামনে সারি সারি গাড়ি এসে থামছে, আবার একের পর এক বেরিয়েও যাচ্ছে।
রিক্ত ইঞ্জিন বন্ধ করে দরজা খুলে নামল।
তার দেখাদেখি বাকিরাও নেমে পড়ল।
রোহান নামতেই কাইফার হাত ধরে টান দিল।
“ আপি, আজকে কিন্তু তুমি শুধু আমার সাথেই থাকবে। ”
কাইফা মুচকি হেসে বলল,
“ আচ্ছা বাবা, থাকব। ”
অর্শী হেসে উঠল।
“ রোহান, আপিকে একটু শ্বাস নিতে দে। ”
“ না, আপি হারিয়ে গেলে? ”
“ আমি আবার হারাব কেন? ”

অবাক কন্ঠে বলল কাইফা। ওদের কথার মাঝেই রোশনী ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে ধীর পায়ে এগিয়ে গেল। রিক্ত ইতোমধ্যে গাড়ির দরজা লক করে সোজা মূল প্রবেশপথের দিকে হাঁটা ধরেছে। কারও জন্য অপেক্ষা করার মানুষ সে নয়।
সবাইও তার পিছু নিল।
হাঁটতে হাঁটতেই কাইফা হঠাৎ থেমে গেল।
বাতাসে নিকাবের একপাশ সামান্য সরে গিয়েছিল।
চারপাশে পুরুষ মানুষের ভিড়। তাই দ্রুত দু’হাতে নিকাবটা ঠিক করে নিল সে।
এই সামান্য কয়েক সেকেন্ডেই বাকিরা খানিকটা সামনে চলে গেল।
কাইফা নিকাব ঠিক করে মাথা তুলতেই দেখল, সবার সঙ্গে তার বেশ কিছুটা দূরত্ব তৈরি হয়েছে।
সে দ্রুত পা বাড়াতে যাবে–
ঠিক তখনই সামনে হাঁটতে থাকা রিক্ত আচমকা থেমে গেল। তবে পেছনে ফিরে তাকাল না। শুধু দাঁড়িয়ে রইল।
অর্শী অবাক হয়ে বলল,

“ ভাইয়া? দাঁড়িয়ে গেলে কেন? ”
রিক্ত নির্বিকার গলায় বলল,
“ সবাই একসঙ্গে ঢুকবে। ”
কথাটা এতটাই স্বাভাবিক ছিল যে কেউ দ্বিতীয়বার ভাবল না। ঠিক সেই সময় কাইফাও দ্রুত হেঁটে এসে বাকিদের সঙ্গে মিলিয়ে গেল। রিক্ত আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না। ঘুরে আবার হাঁটা শুরু করল। যেন এজন্যই দাঁড়িয়েছিল সে।
রোহান দৌড়ে এসে কাইফার হাত আঁকড়ে ধরল।
“ দেখেছো! আমি না থাকলে তুমি পিছিয়েই যেতে। ”
কাইফা হেসে বলল,

“ আচ্ছা, এবার থেকে আর পিছিয়ে পড়ব না। ”
সামনে হাঁটতে হাঁটতে রিক্ত নির্লিপ্ত স্বরে সবাইকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“ অযথা এদিক-ওদিক দাঁড়ানোর অভ্যাস থাকলে বাদ দিয়ে দ্রুত চলো। ”
হঠাৎ কথাটা শুনে সবাই তার দিকে তাকাল।
কাইফার মনে হলো কথাটা যেন ওকেই উদ্দেশ্য করে বলা হয়েছে। মেয়েটার ভ্রু খানিকটা কুঁচকে গেল।
কি অদ্ভুত লোক রে বাবা! সে কি অকারণে দাঁড়িয়েছিল নাকি? না দেখেই শুধু শক্ত কথা!
ওর ভাবনার মাঝেই রোহান মুখ বাঁকিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“ ভাইয়া সব সময় এমন রাগী কেন? ”
অর্শী মৃদু হেসে উত্তর দিল,
“ ওটাই তো রিক্ত ভাইয়ার স্বভাব। ”
রোশনীও নিঃশব্দে একবার রিক্তের দিকে তাকিয়ে আবার চোখ ফিরিয়ে নিল। আর কাইফা কয়েক মুহূর্ত স্থির দৃষ্টিতে মানুষের দূরে সরে যাওয়া পিঠটার দিকে তাকিয়ে রইল।
লোকটাকে বুঝে ওঠা সত্যিই কঠিন।
কখনো অকারণে রূঢ়, কখনো বিনা কারণে ধমক দেয়, আবার কখন কী ভাবছে–তার বিন্দুমাত্রও প্রকাশ পায় না।
মেয়েটা মনে মনে শুধু একটাই কথা বলল,
“ অদ্ভুত মানুষ! ”
ভাবনাটা মাথায় নিয়েই ধীর পায়ে বাকিদের অনুসরণ করল কাইফা।
বিশাল কাঁচের দরজা পেরিয়ে সবাই একে একে প্রবেশ করল শপিংমলের ভেতরে।

বিশাল শপিংমলের ভেতরে ঢুকতেই শীতল বাতাস এসে ছুঁয়ে গেল সবাইকে। চারদিকে ঝলমলে আলো, কাঁচঘেরা ব্র্যান্ড শপ, মানুষের কোলাহল আর হালকা সুরের মিউজিক—সব মিলিয়ে প্রাণচঞ্চল এক পরিবেশ।
রিক্তরা প্রথমেই ঢুকলো একটি বড় লেডিস বুটিকে।
সবাই যে যার মতো জামা কাপড় পছন্দ করতে লাগল। তবে কাইফার মাঝে কোনো তাড়াহুড়া দেখা গেল না। সে চুপচাপ বসে সবকিছু পরখ করতে লাগল। অর্শী বিষয়টা খেয়াল করে নিজের ড্রেস ছেড়ে ওর দিকে মনযোগ দিল। অতঃপর বেশ কয়েকটা আবায়া আর লঙ গ্রাউন বের করে কাইফার সামনে ধরল।
“ এগুলো দেখো আপি? সুন্দর না? ”
পরক্ষণেই আরো কিছু ড্রেস সামনে ধরল।
“ এটাও অনেক সুন্দর! দেখো? ”
রোশনীও মুচকি হেসে আরেকটা পোশাক এগিয়ে দিল।

“ এটার ডিজাইনটাও খুব এলিগ্যান্ট। ”
কাইফা ধৈর্য নিয়ে প্রতিটি পোশাকই দেখল। কোথাও তাড়াহুড়ো নেই, কোথাও অযথা খুঁত ধরা নেই। সবগুলো দেখার পর মৃদু হেসে বলল,
“ হুম সবগুলোই সুন্দর।”
অর্শী কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করল,
“ তাহলে কোনটা নেবে আপু? ”
কাইফা শান্ত স্বরে উত্তর দিল,
“ একটা নিলেই তো হবে। ”
“ মানে? কি একটা নিলেই হবে? ”
“ হুম, যেকোনো একটা হলেই চলবে আমার। ”
অর্শী ভ্রু কুঁচকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল ওর দিকে। পরপর ফুস করে শ্বাস ফেলে একটা গাঢ় বেগুনি কালারের লঙ গ্রাউন দেখিয়ে বলল,

“ তাহলে এটা নেই? ”
“ হ্যাঁ, নিয়ে নাও। ”
দূরে দাঁড়িয়ে পুরো ঘটনাটা নীরবে পর্যবেক্ষণ করছিল রিক্ত। তবু মুখে কোনো মন্তব্য করল না।
শুধু বিলিং কাউন্টারের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় নিচু স্বরে সেলসম্যানকে কয়েকটি কথা বলে এগিয়ে গেল। কেউই সেই কথোপকথনের অর্থ বুঝতে পারল না।

লেডিস শপ থেকে বের হতেই রোহানের চোখ আটকে গেল খেলনার দোকানে।
“ ভাইয়া… ভাইয়া…! ”
বলেই দৌড়ে ভেতরে ঢুকে পড়ল।
একটা বিশাল রিমোট কন্ট্রোল স্পোর্টস কার হাতে নিয়ে ছুটে এলো।
“ আমি এটা নিব! ”
অর্শী কপালে হাত ঠেকাল।
“ তোর রুমে খেলনা রাখার জায়গা আছে? ”
“ আছে! ”
“ মিথ্যা বলিস না। ”
“ আমি এটা নিব! ”
বলেই গাড়িটা বুকে জড়িয়ে ধরল।
অর্শী কেড়ে নিতে গেলে রোহান প্রায় কান্না শুরু করে দিল।

“আমারটা! কেউ নিবে না!”
কাইফা হাঁটু গেড়ে বসে ওকে সান্ত্বনা দিতে যাবে।
ঠিক তখনই রিক্ত এগিয়ে এসে খেলনাটা হাতে নিল। রোহান ভয়ে ভেবে বসল, বুঝি এবার আর পাওয়া হবে না। কিন্তু রিক্ত কিছু না বলেই খেলনাটা বিলিং কাউন্টারে দিয়ে কার্ড এগিয়ে দিল। দুই মিনিট পর বাক্সটা রোহানের হাতে।
রোহান আনন্দে লাফিয়ে উঠে রিক্তকে জড়িয়ে ধরল।
“আমি জানতাম ভাইয়া কিনে দিবে!”
রিক্ত শুধু বলল,
“চলো।”
এরপর সবাই একটি জেন্টস শপের সামনে এলো। রোশনী একটা নেভি ব্লু শার্ট হাতে নিয়ে রিক্তের সামনে ধরল।
“ এটা কেমন? ”
রিক্ত একবার তাকিয়ে বলল,
“ভালো।”
“তাহলে নেব?”
“যেটা ভালো লাগে নাও।”
ব্যস।
আর একটি শব্দও নয়। রোশনীর মুখের হাসিটা মুহূর্তেই ম্লান হয়ে গেল। সে আসলে শার্টটার মতামত জানতে চায়নি–চেয়েছিল মানুষটার একটু মনোযোগ। কিন্তু বরাবরের মতো আজও ব্যর্থ হলো। সবাই সামনে এগিয়ে গেল।
রোশনী কয়েক সেকেন্ড স্থির দাঁড়িয়ে থেকে ধীরে ধীরে তাদের অনুসরণ করল।

প্রায় এক ঘণ্টা কেনাকাটার পর সবাই নিচতলার দিকে নামছিল। উইকেন্ড হওয়ায় পুরো শপিংমলে উপচে পড়া ভিড়।
কেউ লিফটের সামনে, কেউ এসকেলেটরে, কেউ দোকান থেকে দোকানে ছুটছে।
এই ভিড়ের মধ্যেই রোহান এক দোকানের সামনে রাখা রোবট দেখে দৌড়ে গেল।
“আপি দেখো!”
কাইফাও ওর পিছু নিল।
ঠিক তখনই ভিড়ের চাপে অর্শী আর রোশনীর সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয়ে গেল। রোহানের ছোট্ট হাতটাও কখন যে কাইফার হাত থেকে ছুটে গেছে, সে নিজেই বুঝতে পারেনি।
চারদিকে তাকিয়ে কিছুটা অস্থির হয়ে উঠল।
“রোহান?”
কোথাও দেখা যাচ্ছে না।
আরও কয়েক কদম এগোতেই সামনে এসে দাঁড়াল এক অপরিচিত যুবক।
ভদ্রভাবে বলল,
“এক্সকিউজ মি…”
কথা শেষ হওয়ার আগেই কাইফার সামনে এসে দাঁড়াল লম্বা এক ছায়া– রাইয়ান আহমেদ রিক্ত।
তার দৃষ্টি একবার গিয়ে থামল ছেলেটার ওপর।
কোনো রাগ নেই। কোনো উচ্চস্বরে কথা নেই।
শুধু এক জোড়া ঠান্ডা, স্থির চোখ। সেই দৃষ্টিই যথেষ্ট ছিল। ছেলেটা অস্বস্তিতে হেসে বলল,

“সরি…”
তারপর নিজেই সরে গেল। রিক্ত কোনো মন্তব্য করল না। শুধু নিচু স্বরে বলল,
“সবাই একসঙ্গে চলতে বলেছিলাম।”
কাইফা কাচুমাচু ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে রইল। সে তো ইচ্ছা করে আলাদা হয়নি! তবু মানুষটা এমনভাবে বলল যেন সব দোষ তারই। রিক্ত আর এক মুহূর্ত দাঁড়াল না। সামনের দিকে হাঁটতে শুরু করল।
কিছুদূর গিয়েই রোহান দৌড়ে এসে আবার কাইফার হাত ধরে ফেলল।

যেই তুমি এলে পর্ব ৮

“আপি! আমি তো এখানেই ছিলাম!”
“তুমি হাত ছেড়েছিলে কেন?”
“রোবটটা দেখছিলাম।”
কাইফা হালকা বকা দিলেও শেষ পর্যন্ত হেসে ফেলল। এভাবেই সব কেনাকাটা শেষ করে বাসায় ফিরে আসলো ওরা। রাস্তায় অবশ্য আইসক্রিম খেতে ভুলল না রোহান।

যেই তুমি এলে পর্ব ১০