Home যেই তুমি এলে যেই তুমি এলে পর্ব ১০

যেই তুমি এলে পর্ব ১০

যেই তুমি এলে পর্ব ১০
সিনথিয়া ইসলাম সীমা

সূর্যের সোনালি আলো জানালার ফাঁক গলে ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়েছে ঘরময়। আহমেদ নিবাসে আজ যেন উৎসবের ভিন্ন এক আবহ। বাড়ির প্রতিটি কোণেই ব্যস্ততার ছাপ। কোথাও ফুল দিয়ে সাজানো হচ্ছে প্রবেশদ্বার, কোথাও অতিথি আপ্যায়নের প্রস্তুতি, আবার রান্নাঘরজুড়ে চলছে নানা রকম খাবার তৈরির ধুম।
আজ রোহানের খৎনার হলুদ বলে কথা।
নিজের জন্য নির্ধারিত কক্ষেই চুপচাপ বসে ছিল কাইফা। বাইরে আত্মীয়-স্বজনের ভিড় থাকায় সকাল থেকে আর বের হয়নি সে। এমনকি সকালের নাস্তাটাও অর্শী ঘরে এনে দিয়েছে। ফলে পুরো সময়টা নিঃশব্দেই কাটছিল।
ঠিক তখনই–

ধাম করে দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে পড়ল অর্শী। মুখভর্তি উচ্ছ্বাস, হাতে কয়েকটি বড় বড় শপিং ব্যাগ।
“ কাইফা আপি! ”
কাইফা খানিকটা চমকে তাকাল। প্রশ্নাত্মক দৃষ্টিতে তাকিয়ে শুধাল,
“ কী হয়েছে? ”
অর্শী কোনোরূপ উত্তর না দিয়ে হাতের ব্যাগগুলো একে একে বিছানার ওপর রেখে বলতে লাগল,
“ দেখো তো এগুলো! ”
কাইফা অবাক হয়ে ব্যাগগুলোর দিকে তাকাল।
“ এগুলো কার? ”
“ তোমার। ”
“ আমার? ”
অর্শী মাথা নাড়ল।
“ হ্যাঁ। মাত্রই আম্মু এগুলো আমার হাতে ধরিয়ে দিল। তারপর বলল তোমার রুমে দিয়ে যেতে। ”
কাইফা বিস্মিত হয়ে একটি ব্যাগ খুলল। পরপর আরো কয়েকটা। মুহূর্তেই থমকে গেল মেয়েট। এগুলো তো সেই আবায়া আর লং গ্রাউন গুলো… যেগুলো গতকাল শপিংমলে অর্শী তার সামনে মেলে ধরেছিল আর সে দেখে বলেছিল– সবগুলোই সুন্দর!
রমণীর আঁখি যুগল মারবেলাকার ধারণ করল। অবাক মিশ্রিত কণ্ঠে উচ্চারণ করল,

“ এসব…! ”
অর্শী হেসে বলল,
“ চমকে গেছো, তাই না? ”
কাইফা ধীর স্বরে বলল,
“ কিন্তু… আমি তো একটা নিলেই হবে বলেছিলাম। ”
“ হুম, কিন্তু এখন তো সবগুলোই চলে এসেছে। সুতরাং সবগুলোই রেখে দাও। ”
কাইফা কিছুক্ষণ নীরবে পোশাকগুলোর দিকে তাকিয়ে রইল। আঙুলের ডগা দিয়ে কাপড়গুলো স্পর্শ করল। তারপর ধীর গলায় জিজ্ঞেস করল,

“ এগুলো কে এনেছেন? খালামনি? ”
অর্শী কাঁধ ঝাঁকাল।
“ জানি না। আম্মুকে জিজ্ঞেস করেছিলাম। আম্মু শুধু বলল– এগুলো কাইফার রুমে দিয়ে আয়। আম্মুই এনেছে হয়তো সকালে তো মার্কেট গিয়েছিল। ”
কাইফা খানিকটা ভাবনায় পড়ে গেল। মন গহীনে উঁকি দিতে লাগল কিছু প্রশ্ন–
খালামনি এনেছেন পোশাকগুলো! কিন্তু ঠিক এই পোশাকগুলোই কীভাবে আনলেন?
পরক্ষণেই মনে হলো-
গতকালের পুরো ঘটনাই তো অর্শী খালামনিকে বলেছিল। কোন দোকানে গিয়েছিল, কে কি পছন্দ করেছিল– সবই নিশ্চয়ই শুনেছেন। তাছাড়া মার্কেটটাও খালামনির চেনা। হয়তো আজ সকালে সেখানে গিয়ে কিনে এনেছেন এগুলো।
মেয়েটা আর কিছু ভাবতে গেল না। শুধু খালামনির স্নেহের কথা ভেবে বুকের ভেতর এক উষ্ণ অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ল। অতঃপর পোশাকগুলো গুছিয়ে আলমারিতে তুলে রেখে দিল। অথচ ঘরে থাকায় সে জানলই না যে অর্না বেগম মার্কেট থেকে ফেরার সময় তার হাতে কোনোরূপ শপিং ব্যাগই ছিল না।

বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামতেই একে একে সকল অতিথিরা আসতে শুরু করলেন।
অল্প সময়ের মধ্যেই আহমেদ নিবাস পরিণত হলো কোলাহলমুখর এক মিলনমেলায়। ড্রয়িংরুমে তখন অতিথিদের সমাগম। রান্নাঘরের দিক থেকে ভেসে আসছে নানা রকম খাবারের ঘ্রাণ। কাজের লোকজনের আনাগোনা, আত্মীয়-স্বজনদের হাসি-আড্ডা—সব মিলিয়ে পুরো বাড়িটাই যেন প্রাণ ফিরে পেয়েছে।
কেউ রোহানকে নিয়ে মজা করছে, কেউ অর্না বেগমের সঙ্গে গল্পে মেতে উঠেছে। শিশুরা পুরো বাড়ি জুড়ে ছোটাছুটি করছে।
অর্শীও নিজের বান্ধবীদের নিয়ে ভীষণ ব্যস্ত। কখনো ছবি তুলছে, কখনো অতিথিদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে। সবার মাঝেই বিরাজ করছে এক অন্যরকম খুশির আমেজ।
তবে কাইফার ক্ষেত্রে ব্যাপারটা ভিন্ন। এই ভিড়ের মাঝে মোটেও স্বস্তি মিলছে না তার। ঘরের এক কোণে নিশ্চুপ হয়ে আছে সে। এত মানুষের ভিড়, উচ্চস্বরে হাসাহাসি, অবাধ চলাফেরা– সবকিছুতেই যেন এক ধরনের আনইজি অনুভব হচ্ছে মেয়েটার।
অর্শী বিছানায় বসে বান্ধবীদের সাথে মেহেদী দিচ্ছিল। এর মাঝেই কয়েকবার ওকে নিজের বন্ধুদের কাছে নিয়ে গেল।

“ এ হচ্ছে আমার কাজিন, আমার কাইফা আপি। ”
সবাই হাসিমুখে কথা বলল। কেউ পড়াশোনার কথা জিজ্ঞেস করল, কেউ মাদ্রাসা জীবন নিয়ে জানতে চাইল।
কাইফাও ভদ্রতা বজায় রেখে উত্তর দিল।
কিন্তু কিছুক্ষণ পরই তার মনে হতে লাগল—সে যেন এই পরিবেশের সঙ্গে ঠিক মানিয়ে নিতে পারছে না।
কথোপকথনের মাঝেও নিজেকে অচেনা লাগছিল।
চুপচাপ সেখান থেকে সরে এসে বারান্দায় দাঁড়াল সে।
বাড়ির আঙিনাজুড়ে রঙিন আলোর ঝলকানি, দূরে স্টেজে মাইক্রোফোনের শব্দ, অতিথিদের কোলাহল—সব মিলিয়ে চারদিক মুখর।
তবুও কাইফার মনটা অদ্ভুতভাবে নিঃশব্দ।
ঠিক তখনই অর্না বেগম রুমে প্রবেশ করলেন। আশপাশ পরখ করে বোনঝি কে দেখতে না পেয়ে ভ্রূ কুঁচকে ফেললেন। মেয়ের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন ছুঁড়লেন,

“ কাইফা কোথায়? ”
পৃষ্ঠে বারান্দা হতে ভেসে আসলো রমণীর রিনরিনে স্বর,
“ খালামনি আমি এখানে। ”
অর্না বেগম গলা অনুসরণ করে সেখানে গেলেন। গিয়েই প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলেন,
“ তোমার আম্মুর- আব্বুর সাথে কথা হয়েছে? কি বলল কাল আসবে? ”
কাইফা ঘুরে তাকায়। না সূচক ভঙ্গিতে মাথা নাড়িয়ে জবাব দেয়,
“ উহু, আসবে না। ”
“ জানতাম! তোমার আববু- আম্মুকে আর আমার বাড়িতে আনতে পারলাম না আমি! ”
একটু থেমে প্রফুল্ল কণ্ঠে বললেন,
“ থাক তোমাকে যে আসতে দিয়েছে এতেই অনেক খুশি আমি। ”
কাইফা মৃদু হেসে নিরুত্তর রয়। অর্না মমতাভরা চোখে কিছুক্ষণ কাইফার মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে নরম গলায় বললেন,

“ কি হয়েছে খালামনি? ভালো লাগছে না? ”
কাইফা হালকা হাসার চেষ্টা করল।
“ না… মানে… এত ভিড়ে থাকতে অভ্যাস নেই তো। ”
মেয়েটার চোখে মুখেই যেন স্পষ্ট অস্বস্তি ভাবটা ফুটে উঠেছ। অর্না বেগম স্নেহভরে ওর মাথায় হাত রাখলেন।
“ আমি বুঝতে পারছি। সকাল থেকে দেখছি তুমি নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছো। ”
কাইফা কিছু বলল না। অর্না বেগম একটু ভেবে বললেন,
“ তুমি খালামনির সাথে এসো। ”
“ কোথায় যাব? ”
“ তুমি এসো আগে। ”
কাইফার হাত ধরে কক্ষ থেকে বেরিয়ে এলেন তিনি। পাশের লক করা রুমের দরজা খুলে বললেন,

“ এক কাজ করো তুমি আপাতত এই রুমে থাকো। ”
কাইফা অবাক হয়ে তাকাল।
“ এই রুমে? এটা তো…”
“ সমস্যা নেই। রিক্ত বাসায় নেই। অফিসের কিছু জরুরি কাজে বের হয়েছে। আজ ফিরতে অনেক রাত হবে। এমন আছে নাও ফিরতে পারে। ”
একটু থেমে আবার বললেন,
“ আর ওর রুমে আমার অনুমতি ছাড়া কেউ আসবে না। তাই এখানে নিশ্চিন্তে থাকতে পারবে। ভিড়ভাট্টাও নেই। ”
কাইফা ইতস্তত করল।
“ কিন্তু..”

“ কোনো কিন্তু নয়। ওখানে দাঁড়িয়ে অস্বস্তি করার চেয়ে এখানে থেকে গিয়ে একটু বিশ্রাম নাও। ”
অর্না বেগমের অনুরোধ আর ফেলতে পারল না কাইফা। ধীরে পায়ে মৃদু শব্দে দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করল সে। বাইরের কোলাহলের তুলনায় ঘরটা একেবারেই বিপরীত। নিঃশব্দ, গুছানো ও পরিপাটি।
ঘরের প্রতিটি জিনিস নির্দিষ্ট জায়গায় সাজানো। এক পাশে ফাইলভর্তি আলমারি, টেবিলের ওপর ল্যাপটপ আর কিছু অফিসের কাগজপত্র। জানালার পাশে রাখা একটি ছোট্ট ইনডোর প্ল্যান্ট ঘরটায় অদ্ভুত প্রশান্তি এনে দিয়েছে।
কাইফা কৌতূহলী দৃষ্টিতে ঘরের ভেতরটা নিরীক্ষণ করল। সেদিন রাতে কক্ষটাকে খেয়াল করা হয়নি।
রুমের ভিতর দেখা হলে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে নিচের অনুষ্ঠান দেখতে লাগল। দূর থেকে ভেসে আসা হাসির শব্দ এখানে এসে অনেকটাই ম্লান হয়ে যায়।
কিছুক্ষণ পর সোফায় গিয়ে বসল সে।
হাতে তুলে নিল টেবিলে রাখা একটি বই।
দু-এক পৃষ্ঠা উল্টেও মন বসল না। বইটা আবার জায়গামতো রেখে দিল।
সারাদিনের ক্লান্তি, গত কয়েক দিনের নির্ঘুম রাত আর বাইরে থেকে ভেসে আসা শব্দের একঘেয়ে ছন্দ– সব মিলিয়ে চোখদুটো ভারী হয়ে আসতে লাগল।
মাথাটা সোফার পেছনে হেলিয়ে দিল কাইফা।
ভাবল,

“ একটু চোখ বন্ধ করি… তারপর রুমে চলে যাব।”
কিন্তু সেই “একটু ” আর একটুতেই সীমাবদ্ধ রইল না। কখন যে অজান্তেই গভীর ঘুম তাকে আচ্ছন্ন করে ফেলল, সে নিজেও টের পেল না।
বাইরে তখনও অনুষ্ঠান চলছে।
আর আহমেদ নিবাসের সবচেয়ে নীরব কক্ষটিতে, অজানা এক নিশ্চিন্ততায় ডুবে ঘুমিয়ে গেল রমণী।

রাত প্রায় সাড়ে এগারোটা।
অনুষ্ঠানের কোলাহল তখনও পুরোপুরি স্তিমিত হয়নি। নিচতলায় এখনো অতিথিদের হাসি-আড্ডা, শিশুদের দৌড়ঝাঁপ আর মাঝেমধ্যে মাইক্রোফোনে ভেসে আসা কারও কণ্ঠে মুখর হয়ে আছে আহমেদ নিবাস।
ঠিক সেই সময় বাড়ির মূল ফটকের সামনে এসে থামল কালো রঙের এসইউভি। গাড়ি থেকে নেমে এল রিক্ত।
সারাদিনের কাজের ক্লান্তি স্পষ্ট তার মুখে। কালো কোটটা এক হাতে ঝুলছে, গলার টাই অনেক আগেই খুলে ফেলেছে। মোবাইলে সংক্ষিপ্ত একটি কল শেষ করে ফোনটা পকেটে রাখল।
বাড়ির ভেতরে ঢুকেই একবার চারপাশে চোখ বুলিয়ে নিল। অতিথিদের দিকে বিশেষ কোনো ভ্রুক্ষেপ করল না। দূর থেকে দু-একজন সালাম দিলে যথারীতি শুধু মাথা নেড়ে জবাব দিল।
তারপর ধীর, স্থির পদক্ষেপে সোজা সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে গেল।
করিডোরের শেষ প্রান্তে নিজের কক্ষের সামনে এসে অভ্যাসবশত দরজার হাতলে হাত রাখল।
খট…
দরজা খুলতেই তার পদক্ষেপ থেমে গেল।
ঘরের লাইট জ্বলছে।

ভ্রু কুঁচকে এলো রিক্তর। স্পষ্ট মনে আছে, বের হওয়ার আগে নিজের হাতেই লাইট নিভিয়ে দরজায় লক দিয়েছিল।
তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে একবার পুরো ঘরটা পর্যবেক্ষণ করল সে।
পরমুহূর্তেই তার দৃষ্টি গিয়ে থামল জানালার পাশের সোফাটায়। ওমনিই স্তব্ধ হলো মানবের গম্ভীর সত্তা।
সোফায় শান্ত মুখে গুটিসুটি মেরে ঘুমিয়ে আছে কাইফা। পরনে অলিভ রঙের ফ্লোর-লেংথ আনারকলি। মাথায় একই রঙের হিজাব। ঘুমের ঘোরে মাথার কাছের হিজাবটা সামান্য আলগা হয়ে কপালে কগাছি এলোমেলো চুল বেরিয়ে এসেছে। দু’হাত বুকের কাছে জড়ো করা। ক্লান্তিতে মুখটা কেমন নিষ্পাপ আর প্রশান্ত দেখাচ্ছে।
রিক্ত কয়েক সেকেন্ড নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে রইল।
কপালের ভাঁজ ধীরে ধীরে শিথিল হয়ে এলো।
তবে সেই পরিবর্তন স্থায়ী হলো না।
পরক্ষণেই স্বাভাবিক, নির্লিপ্ত চেহারায় ফিরে এসে ঘরের দরজাটা ভেতর থেকে লাগিয়ে দিল।
একবার ঘড়ির দিকে তাকাল। রাত অনেক হয়েছে।
নিচু স্বরে নিজের কাছেই বিড়বিড় করল,

“ বাড়িতে এতো জায়গা থাকতে এখানে এসেই ঘুমাতে হলো ওর? ”
একটু থেমে বরাবরের ন্যায় বিরক্তি নিয়ে উচ্চারণ করল,
“ যত্তসব ঝামেলা! ”
ধীর পায়ে সোফার কাছে এগিয়ে গেল সে।
কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে থেকে ডাকল,
“ এই মেয়ে? ”
কোনো সাড়া নেই।কাইফা গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন।
রিক্ত এবার কিছুটা জোরে বলল,
“ এই ঝামেলা..! ”

তবুও কোনো প্রতিক্রিয়া নেই।
এক মুহূর্ত ইতস্তত করে টেবিলের ওপর রাখা পানির বোতলটা তুলে নিল। গ্লাসে সামান্য পানি ঢেলে টেবিলে টক করে শব্দ করতেই কাইফার চোখের পাতা কেঁপে উঠল। তৎক্ষণাৎ
চমকে চোখ মেলে চারদিকে তাকাতে লাগল সে।
কয়েক সেকেন্ড কিছুই বুঝে উঠতে পারল না।
হঠাৎ সামনে দাঁড়িয়ে থাকা রিক্তকে দেখে একেবারে সোজা হয়ে বসল।
বিস্মিত কণ্ঠে বলল,
“ আপনি…! ”
রিক্ত নির্বিকার গলায় উত্তর দিল,
“ প্রশ্নটা আমার করা উচিৎ… তুমি এখানে কি করছো? ”
কাইফা ঘুম ঘুম চোখে চারপাশ পরখ করল ম মুহুর্তেই লজ্জায় অপ্রস্তুত হয়ে গেল। তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
“ আমি… আসলে… নিচে অনেক ভিড় ছিল। খালামনি বলেছিলেন এখানে বসতে। ভাবছিলাম একটু বসে আবার চলে যাব। কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি বুঝতেই পারিনি। ”
রিক্ত সংক্ষেপে বলল,

“ হুম। ”
এর বেশি কিছু বলল না। কাইফা ইতস্তত ভঙ্গিতে হিজাবটা ঠিক করল।
“ সরি… আপনার অসুবিধা হয়েছে।”
“ না। ”
এক শব্দের উত্তর। ঘরে আবার নীরবতা নেমে এলো। কাইফা বিলম্বনহীন কক্ষ ত্যাগ করতে উদ্যত হলো। দরজার কাছে গিয়ে হুট করেই থেমে গেল সে। কিছুক্ষণ নীরব থেকে পেছন ফিরে তাকাল।
“ আপনার সাথে কিছু কথা ছিল? ”
রিক্ত তখন কোটটা চেয়ারের ওপর রাখছিল।
মাথা না তুলেই বলল,
“ যা বলার কুইকলি বলো। ”
কাইফা কিছুটা ইতস্তত করে বলল,
“ বলছিলাম যে আমাদের… ডিভোর্সটা কবে হবে?”
কথাটা শুনে রিক্তর হাতের গতি এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল। খুব সামান্য। পরক্ষণেই আবার স্বাভাবিক ভঙ্গিতে কোটটা রেখে তার দিকে তাকাল। চোখেমুখে কোনো বিস্ময় নেই।
শান্ত, স্থির স্বরে বলল,

“ কিসের ডিভোর্স? ”
রমণী এবার চোখ সরাসরি মানুষটার দিক তাকাল। সময় নিয়ে মিহি স্বরে বলল,
“ আমাদের বিয়ের। এভাবে তো একটা পবিত্র সম্পর্ক ঝুলে থাকলে হবে না। আপনারও নিশ্চয়ই নিজের জীবন আছে… আমারও আছে। তাই ভাবছিলাম… আমি এখানে থাকতেই বিষয়টা মিটমাট হয়ে যাক। ”
রিক্ত কয়েক সেকেন্ড ওর দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,
“ যে বিয়েটা হয়েছে, সেটার আইনি প্রক্রিয়া শেষ করতেও সময় লাগবে। কিছু কাগজপত্রের ব্যবস্থা করতে হবে। ”
কাইফা ধীর গলায় জিজ্ঞেস করল,
“ কতদিন? ”
“ এখনই নির্দিষ্ট করে বলতে পারছি না। ”
“ মানে? ”
“ যখন সব প্রস্তুত হবে, তখন তোমাকে জানানো হবে। এত অস্থির হওয়ার দরকার নেই। তোমার সঙ্গে সংসার করার কোনো পরিকল্পনা আমারও নেই। ”

রিক্তর শেষ কথাটা কানে যেতেই কাইফা কয়েক মুহূর্ত নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে রইল। কেন যেন বুকের ভেতরটা হালকা কেঁপে উঠল।
অথচ এমন উত্তরেই তো স্বস্তি পাওয়ার কথা ছিল তার। সেও তো এই বিয়েকে কখনো মেনে নেয়নি। তবু মানুষটার মুখে কথাটা শুনে অদ্ভুত এক খোঁচা লাগল মনে। মেয়েটা দ্রুত নিজের অনুভূতিটা আড়াল করে শান্ত স্বরে বলল,
“ আমিও সেটাই চাই। ”
কাইফা আর কোনো প্রশ্ন করল না। রিক্তও আর কিছু বলল না।
রমণী ধীরে ধীরে দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে গেল। দরজাটা বন্ধ হওয়ার শব্দ হতেই ঘর আবার নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
রিক্ত কিছুক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে বন্ধ দরজার দিকে তাকিয়ে রইল।

যেই তুমি এলে পর্ব ৯

তারপর ধীরে ধীরে চোখ নামিয়ে টেবিলের ওপর রাখা ফাইলটা হাতে তুলে নিল।
মুখে আগের মতোই সেই নির্লিপ্ত ভাব।
যেন কয়েক মুহূর্ত আগের কথোপকথন তার মনে কোনো রেখাপাতই করেনি। তবে ঘরের ভেতর ছড়িয়ে থাকা হালকা নারীসুলভ সুগন্ধটা যেন এখনও নীরবে জানিয়ে দিচ্ছিল—কিছুক্ষণ আগেও এখানে আরেকজনের উপস্থিতি ছিল।

যেই তুমি এলে পর্ব ১১