যে শ্রাবণে প্রেম আসে পর্ব ১০
তোনিমা খান
নতুন প্রারাম্ভ অস্বাভাবিক রকমের আশ্চর্যজনক, সুখময় হয় দূর্ভাগা ইরার জন্য। এই যে সৃষ্টিকর্তা এতোটুকু তাকে দিয়েছে, তাতে সে পেছনের সব ক্লেশ ভুলে গিয়েছে নিমিষেই। স্বল্প চাহিদার মানুষ হওয়ায় এই পৃথিবীতে ইরার জন্য বেঁচে থাকা বেশ সহজ। স্বল্প চাহিদার মেয়েটি যখন চাহিদার উর্ধ্বে কিছু পেয়ে যায় তখন সেই অনুভূতি হয় অবর্ণনীয়। প্রভাতের শুরুটা ছিল কারোর আদরমাখা স্পর্শের সাথে। মুখশ্রীতে লাগাতার ছুঁয়ে যাওয়া পুরুষালী ওষ্ঠের স্পর্শে ঘুম জড়ানো চোখে ইরা লাজুক হেসে মুখ লুকায় বালিশে। সেই লাজের মাত্রা ছাড়িয়েই দম নিলো শ্রেয়ান। প্রভাতের শুরুটা এমনি সুখকর ছিল।
সকল আটটা। হোয়াইট বোর্ডের সামনে শ্রেয়ানের বাহুডোরে থাকা মেয়েটির, মলিনতা গাঢ় হয় বোর্ডটিতে সদ্য লেখা প্রশ্নটি দেখে।
–“গায়ে হাত তুলতো কেনো?”
প্রশ্নের জবাবের অপেক্ষায় অপেক্ষারত মানবটি কাঁধ থেকে থুতনি তুললো। বিগত জীবনের সব কথা নির্দ্বিধায় জানালেও এখানে খানিক আঁটকে গেলো কেনো? মেয়েটির মুখপানে তাকালে বড্ডো উদাসীনতা নজরবন্দী হয়। তবুও তার প্রশ্নের জবাব চাই। ইরা ফোঁস করে একটা নিঃশ্বাস ফেলে লিখলো,
–“অনেক সময় কাজ থেকে ফিরলে তার চাহিদা আমার কান পর্যন্ত পৌঁছাতো না। স্বাভাবিকভাবেই কাজ থেকে ফিরলে সবার মেজাজ খারাপ থাকে। তার উপর যদি প্রয়োজনীয় কিছু না পায় তবে রাগ তো করবেই। এছাড়াও আমি অজান্তে তার প্রয়োজনীয় অনেক কিছু ফেলে দিতাম কিংবা হারিয়ে ফেলতাম তার জন্য ও মাঝেমধ্যে গায়ে হাত তুলতো। আর শেষের এক বছর হয়তো একটু বেশি অসহ্য হয়ে গিয়েছিলাম আমি, তাই বিনা কারণেই হুটহাট হাত তুলতো!”
শ্রেয়ানের চোয়াল শক্ত হয়ে আসলো ইরার কথায়। কতো বড়ো পশু হলে দৈহিক প্রতিবন্ধকতা সম্পন্ন স্ত্রীর গায়ে হাত তুলে! ইরা বাঁধন থেকে ছোটাতে চায় নিজেকে। আর এই বিষয়ে কথা বলতে ইচ্ছে হয় না তার। এখন খুব করে চায় এগুলো ভুলে নতুন করে পাওয়া সবকিছু আগলে রাখতে। তবে শক্ত সেই বাহুডোর থেকে ছাড়া পাওয়া মুশকিল। ইরা ছলছলে নয়নে তাকায় শ্রেয়ানের মুখপানে। শ্রেয়ান মৃদু হেসে মেয়েটির ললাটে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিলো। সহসা ইরার ভরে ওঠা চোখের কার্নিশ থেকে নোনাজল গড়িয়ে পড়লো। শক্ত করে জড়িয়ে ধরে মানুষটাকে। জীবনে এই একটা মানুষ ই তো পেয়েছে যে তাকে সাদরে যত্নে আগলে রাখে। বিছানায় তখন দুই ভাই বোন বেঘোরে ঘুমাচ্ছে। সেদিকে তাকিয়ে স্মিত হাসলো শ্রেয়ান আর ইরা! তাদের দুটো সুখপাখি!
বেলা গড়াতেই বাচ্চাদের হৈচৈ বাড়লো। তারা ঘুম থেকে উঠেই যার যার পছন্দের মানুষটির বুকে আধিপত্য বিস্তারে মগ্ন। তবে গম্ভীর মেয়েটির ভালোবাসার মাঝেও যেনো ভরপুর গাম্ভীর্যতা। বাসার সকলে অবাক চোখে তাকিয়ে আছে গম্ভীর মেয়েটির দিকে যে কি-না ঘুম থেকে উঠেছে থেকে বাবার কলার মুঠোবন্দী করে বসে আছে। কলারটা ছাড়াতে গেলেই তার কঠোর দৃষ্টির সম্মুখীন হতে হয় নয়তো রাগে চিৎকার করে উঠবে। শ্রেয়ান বাধ্যগত ছেলের মতো মেয়েকে নিয়ে বসে আছে আর মিটিমিটি হাসছে। সুমনা আর সুস্মিতা হেসে বলল,
–“ভাইয়া বাজেভাবে ফেঁসে গিয়েছে, মামনি।”
মেয়েকে খাওয়াতে থাকা শ্রেয়ান খানিক অসহায়ত্ব নিয়ে মা বোনের দিকে তাকায়। খাচ্ছে তবুও কলার ছাড়ছে না। সে হতাশার সুরে বলে,
–“আজ সুন্দরী, পাপার জান বলে পার পেয়ে গেলো!”
সুমনা আর সুস্মিতা ফিক করে হেসে উঠলো। ছেলের আদর খেতে খেতে ইরা অবুঝ নয়নে দেখে তাদের হাসি। বরাবরের মতো ইরার আঁচলের এক অংশ শ্রবণের হাতের মুঠোয়। সুমনা মাঝেমধ্যে অবাক হয় অবুঝ দুই বাচ্চা কিভাবে তাদের সুখ বন্টন করে নিলো।
সুস্মিতা দশটার দিকেই শশুর বাড়িতে চলে গিয়েছে।বারোটা নাগাদ ছেলে মেয়েদের গোসল করিয়ে, খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে দেয়া এক ধুরন্ধর শ্রেয়ান। কাঁধে শুয়ে থাকা বাচ্চা মেয়েটির হাতের মুঠো থেকে নিজের কলারটা ছেড়ে যেতেই শ্রেয়ান ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেললো। পা টিপে টিপে মেয়েকে দোলনায় শুইয়ে দিয়ে সে প্রফুল্ল হেসে ঘর থেকে বের হয়। বসার ঘর পর্যন্ত যেতেই মায়ের দেখা পেলো শ্রেয়ান। সে দেয়ালে হেলান দিয়ে শুধায়,
–“মামনি আমার টুকি-টাকি’র মা কোথায় জানো?”
শ্রেয়ানের প্রশ্নে সুমনা বিরক্তি নিয়ে তাকালো। বলল,
–“কি অদ্ভুত সম্বোধন শ্রেয়ান?”
–“এটা আমার ব্যক্তিগত সম্বোধন মামনি, তুমি নাক ছিটাতে পারো না।”, শ্রেয়ান গম্ভীর গলায় বলল। সুমনা মুখ ঝামটা মেরে বলল,
–“আচ্ছা, কিন্তু তোর বউ যখন এই সম্বোধনে রেগে যাবে তখন বুঝিস!”
–“সে কখনো আমার উপর রাগে না মামনি। সে লক্ষ্মী একটা মেয়ে! তাকে যদি তুমি মার ও দাও, তবুও সে টু শব্দটি করবে না।”, শ্রেয়ানের দাম্ভিকতায় পরিপূর্ণ কণ্ঠে সুমনা’র গতিরোধ হলো। ফুলদানি হাতে সে স্নেহের চোখে তাকায় ছেলের পানে। এবার বুঝি ছেলেটার কপালে একটু সুখের দেখা মিললো? সে মিহি স্বরে শুধায়,
–“সে কি আসলেই অনেক লক্ষ্মী?”
বুকে হাত গুঁজে দাঁড়িয়ে থাকা শ্রেয়ান প্রগাঢ় হেসে মাথা নাড়লো। বলল,
–“আসলেই লক্ষ্মী, মামনি। পৃথিবীর সকল ভালোবাসা পাওয়ার যোগ্যতা রাখে সে। তাকে কখনো ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত করো না। মায়ের মতো ভালোবাসা দিও। আর মাঝেমধ্যে শাশুড়িদের মতো একটু খোঁচা দিতে পারো— “যে তোমার ছেলেকে কি দিয়ে সে বশ করলো?” এই বলে। কিন্তু এর বেশি কিছু করবে না কিন্তু! আমার টুকি-টাকির মা চুপচাপ বলে সবাই তাকে কষ্ট দিতে পারে না।”
–“ওরে বাঁদর ছেলে! তোকে জন্ম দিয়েছি আমি, বড়ো করেছি আর উনি এসেছে বউয়ের তরফদার করতে। কুটনী শাশুড়ি হবো আমি। কি করবি তুই কর!”, সুমনা তেতে উঠলো। শ্রেয়ান ফিক করে হেসে উঠে বলল,
–“কিছু করবো না মামনি। শুধু তোমাকে চটাস চটাস করে দু’টো চুমু খাবো। কারণ আমার বউ বকা খেয়ে তো আমার বুকেই মুখ লুকিয়ে কাঁদবে। তুমি বকা দিও, যতো ইচ্ছা ততো। আর আমি তার কান্না থামানোর জন্য তৈরি থাকবো।”
সুমনার কণ্ঠে নম্রতা আসে। বিগত বাজে অভিজ্ঞতা স্মরণ করে বলল,
–“অত্যাচারি শাশুড়ি হওয়ার হলে, তখনি হতাম যখন খারাপ বউ ছিলো। তখন যখন করিনি এখনো করবো না।”
মায়ের মলিন মুখটি দেখে শ্রেয়ান অসন্তোষের কণ্ঠে বলল,
–“আহা! রাগ করো না মামনি। আমি তো মজা করছিলাম।”
–“তো আমি কখন বললাম তুই রাগ দেখাচ্ছিস? বাজে কথা বন্ধ কর এখন। ইরামের চুল ঘাড় ছুঁয়ে গিয়েছে। ঘেমে যায় আর সারাদিন শুধু মাথা চুলকায়। ওর চুল কাটাতে হবে।”, সুমনা ব্যস্ত কণ্ঠে বলল।
–“সেটা তুমি আগে বলবে না? গোসল করানোর আগে কাটিয়ে আনতাম।”, শ্রেয়ান কপাল কুঁচকে বলল।
–“বুড়ি হয়েছি, এতো কিছু মনে থাকে আমার? তোদের খেয়াল রাখা উচিৎ না? ইরা কোথায়? রান্না হয়েছে কখন! ও এখনো রান্নাঘরে কি করে?”
–“আমি দেখছি।”
–“হ্যাঁ দেখ। গিয়ে বল তাড়াতাড়ি গোসল করতে। সারাদিন শুধু খুঁটিনাটি কাজ করতেই থাকে। চুপচাপ বসতে পারে না মেয়েটা।”
–“কাজের মানুষেরা চুপচাপ বসতে পারে না মামনি।”, শ্রেয়ান স্মিত হেসে বলল। পা বাড়ায় রান্নাঘরের দিকে। রান্নাঘরে যেতেই তার কপাল কুঁচকে গেলো। কিচেন কেবিনেটের উপর পা ঝুলিয়ে বসা মিলা আর ইরা বড়ো আমোদের সাথে চেরি খাচ্ছে। নারীটিকে শুধু শুধু সে নির্দয় বলে? আর একদিন আছে সে! আর নির্দয় নারী এখানে বসে চেরি খাচ্ছে ! শ্রেয়ানকে দেখতেই মিলা খেতে খেতে বলল,
–“ভাইজান সেই মজা! এরপর আবার যখন যাইবেন তখন আরো আইনেন।”
শ্রেয়ান কপাল কুঁচকে এগিয়ে যায়। ইরার হাত থেকে চেরির বক্সটা নিয়ে মিলার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল,
–“এই নে, পুরোটা খা। কিন্তু ঘরে গিয়ে, যা।”
মিলা নাচতে নাচতে চলে গেলো। আধখাওয়া চেরি হাতে ইরা কপাল কুঁচকে তাকিয়ে আছে শ্রেয়ানের দিকে। শ্রেয়ান সেই দৃষ্টি উপেক্ষা করে চট করে কোলে তুলে নেয়। ইরা ছটফট করে উঠলো এলোমেলো দৃষ্টি ফেলে। শ্রেয়ান চাপা আক্রোশে বলল,
–“মা মেয়ের সারাদিন কি একটাই কাজ, আমার মতো ভোলাভালা ছেলেটার দিকে কড়া দৃষ্টি নিক্ষেপ করা? অনেক হয়েছে আর সহ্য করবো না আমি।”
বাহুডোরে গুটিয়ে থাকা দেহটি একপ্রকার যুদ্ধ লাগিয়ে দিয়েছে ছাড়া পওয়ার জন্য। শাশুড়ি যদি দেখে নেয়? তবে তেমন কিছুই হলো না বরং তার ভাবনা থমকায় নিজেকে ওয়ারশরুমে দেখে। সে বড়ো বড়ো নেত্রে তাকায় মিটিমিটি হাসতে থাকা শ্রেয়ানের দিকে। তীব্র আক্রোশ নিয়ে কিছু বলার আগেই এক পশলা ঝর্নার পানি ছুঁয়ে গেলো নারী বদন। সিক্ত বদন, লাগাতার ধেয়ে আসা ঝিরিঝিরি পানির প্রকোপে আধো আধো নয়নে স্পষ্ট হয় সম্মুখের পুরুষালী মুখটির বদলে যাওয়া আদল দেখে। লাজে সংকুচিত দেহ পিছিয়ে যেতে নিলে একটাসময় দেয়ালে আঁটকে গেলো। অলস পায়ে তার দিকে এগিয়ে আসা মানুষটার গতিবিধিও রোধ হলো। ললাটে ললাট, নাকে নাক হাতের আঙুলের ভাঁজে পুরুষালী পাঁচ আঙুল এঁটে যায়। দেহের এক একটা স্নায়ু তখন অস্থির হয়ে পড়ে অনুভূতির তীব্রতায়। রোধ হয় প্রবাহমান কিছু সময় ও! সময়গুলো বড্ডো এলোমেলো, অনুভূতি ও প্রবল ভাবে গ্রাস করে দু’জনকে। কিন্তু এতো এতো সুখের আড়ালে ইরা যে ভুলেই গেলো তার জীবনে সুখ ক্ষণস্থায়ী!
বিকাল চারটার দিকে শ্রেয়ান ইরামকে নিয়ে চুল কাটাতে যায়। ইরা ছেলেকে নিয়ে আর শাশুড়ি মিলার কাছে ছিল। বলাবাহুল্য শ্রেয়ান বিয়ের পরদিন থেকে ইরাকে তার পরিবারের ধারেকাছেও ঘেঁষতে দেয়নি আর না দিয়েছে তাদের পরিবারকে ঘেঁষতে। বহুবার সখ্যতা বাড়ানোর প্রয়াসে সালমা ছুটে এসেছিল কিন্তু কোন উপায় হয়নি। সুমনা আগে যতোটা স্নেহ করতো এখন সেটুকুও করে না। শাহেদ চৌধুরী ও মোজাম্মেল কে এড়িয়ে চলে বেশ। ভেবেছিল ইরাকে বিয়ে দিয়ে সুযোগ সুবিধা লুফে নিবে কিন্তু কিছুই হলো না। তাদের পরিকল্পনা সব যেনো বিফলে গেলো।
তাই ইরার বেশিরভাগ সময় কাটেই এখানে। তবে মিহাদের এই বাড়িতে আসতে কখনো কোন বাঁধা নেই। সে আসে ইরাম আর শ্রবণের সাথে খেলে, থাকে সময় কাটায়। সবাই তাকে আদর করে। ভাবনার মাঝেই ইরার ফোনটা জ্বলে উঠলো। সে কৌতুহলী হয়ে ফোনটা হাতে নিলে হতচকিত হয়। বজ্রাহত চাহনিতে তাকায় ভেসে ওঠা মেসেজটির দিকে। ঠিক এই ভয়টার জন্যই বিগত দেড় মাস যাবৎ সে গুমড়ে গুমড়ে মরেছিল। তবে কি তার সুখের অন্ত এসে গেলো?
–“আমাকে না জানিয়ে সিম পরিবর্তন করেছো কোন সাহসে? আমি এক মাস যাবৎ যোগাযোগ করার চেষ্টা করছি কিন্তু…আমার মেয়ে কেমন আছে ইরা? ওকে আমি একমাস যাবৎ দেখতে পারছি না। আর না তুমি টাকা চেয়েছো? সিম পরিবর্তন করার কারণ কি? তুমি কি কোন পরিকল্পনা করছো নাকি? নাকি নতুন নাগর জুটিয়েছো? এখন আমার মেয়েকে আমার থেকে দূরে করতে চাইছো? খবরদার ইরা আমার মেয়েকে নিয়ে কোন প্রকার ছেলেখেলা করার চেষ্টা করে থাকো, তবে আমি তোমার বেঁচে থাকা মুশকিল করে দেবো! শুনেছি তুমি ঢাকাতে। আমি ঢাকায় এসেছি দেখা করবো।”
বিয়ের সিদ্ধান্তটা ইরার জন্য একরোখা একটা সিদ্ধান্ত ছিল। ঐ বাচ্চাটির দুধের আহাজারির কাছে তার মাতৃত্ব দূর্বল হয়ে পড়ে। তাই কোনদিক চিন্তা না করেই সে এতো বড়ো সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু ইরামের বাবা? ইরামের বাবা যদি এখন ইরামকে তার থেকে নিয়ে যায়? কম্পিত হাতটি অস্বাভাবিক ভাবে কাঁপতে শুরু করলো। কাঁপনের তীব্রতা এতোটাই যে হাত থেকে ফোনটাও পড়ে যায়। সুমনা ইরা চকিতে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় ইরার বিবর্ণ মুখটির দিকে। সুমনা ইরার কাঁধে হাত রেখে শুধায়,
–“কি হলো ইরা? এমন করছিস কেনো?”
শাশুড়ির ছোঁয়া পেতেই ইরা টলটল দৃষ্টি তুলে তাকায়। সহসা তার চোখ মুখ ঠিকরে ভয়ের কান্না বেরিয়ে আসে। ঝাঁপিয়ে পড়ে শাশুড়ির বুকে। অস্ফুট স্বরে জানায় অন্তঃস্থলে দানা বাঁধা ভয়ের কথা।
বিগত আধা ঘন্টা যাবৎ শ্রেয়ান সেলুনে বসে আছে। কিন্তু কোনভাবেই সেলুনের স্টাফরা ইরামকে ছুঁতে পারছে না। ছুলেই সে গগনবিদারী চিৎকার করে ওঠে। অতঃপর শ্রেয়ান নিরূপায়, ছুটে যায় পার্লারে। সেখানে অন্তত মেয়েদের যদি চুল ছুঁতে দেয় তার মেয়ে। সেখানে গিয়ে একটা উপায় হলো! ইরাম চুল ছুঁতে দিলেও তার কোল থেকে নামতে নারাজ। ফলস্বরূপ মেয়েকে কোলে নিয়ে শ্রেয়ানের বসতে হয়েছে আর পার্লারের মেয়েটা ইরামের চুল কেটেছে।
চুল কেটে শ্রেয়ান আর ইরাম শপিং সেন্টারে ঘুরছিল কিছু কেনাকাটার জন্য। পথিমধ্যে অজ্ঞাত কতো বাচ্চাপ্রিয় মানুষ তার পথরোধ করে—কোলে থাকা অপার্থিব সৌন্দর্যের অধিকারী বাচ্চাটিকে একটু ছুঁয়ে দিতে। তেমনি হঠাৎ এক অজ্ঞাত পুরুষ শ্রেয়ানের পথ আঁটকে দাঁড়ায়। শ্রেয়ান গতিরোধ করে কোর্ট প্যান্ট পড়া পরিপাটি, যুগের সাথে তাল মিলিয়ে চলা আধুনিকতার রেশ স্পষ্ট। লোকটি কেমন অদ্ভুত ক্রুব্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার দিকে। শ্রেয়ান সৌজন্য হেসে শুধায়,
–“আমি কি আপনাকে চিনি? আপনি পথ আটকালেন কেনো?”
লোকটি জবাব দেয় না। স্থির দৃষ্টিতে ইরামের দিকে তাকিয়ে আছে সে। শ্রেয়ানের কপাল কুঁচকে যায় মেয়ের দিকে ওভাবে তাকাতে দেখে। বিষয়টা খুব একটা পছন্দ হলো না তার। সে মেয়ের মাথা কাঁধে চেপে পুনরায় শুধায়,
–“এক্সকিউজমি!”
লোকটি চোখ রাখে শ্রেয়ানের দিকে। কেমন অধিকারবোধের সাথে কাট কাট কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করে,
–“আপনার কোলে থাকা বাচ্চাটি আপনার কে হয়?”
শ্রেয়ানের কপাল কুঁচকে গেলেও, স্বাভাবিক ভাবেই বলল,
–“আমার মেয়ে! আমার কোলে তো আমার মেয়েই..”
কিন্তু হঠাৎ করেই তার মুখশ্রী থেকে স্বাভাবিকতা মিলিয়ে যায়। যখন ব্যগ্র কণ্ঠে সম্মুখের লোকটি দাঁতে দাঁত চেপে বলল
–“আমার মেয়ে! আপনার কোলে থাকা মেয়েটি আমার মেয়ে, ইরাম শেখ। খবরদার আমার মেয়েকে নিজের মেয়ে বলে পরিচয় দেবেন না।”
শ্রেয়ানের কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে হাস্যকর জোক মনে হলেও শ্রেয়ান হাসতে পারলো না। কারণ তার স্মৃতি থেকে বেরিয়েই গিয়েছে সে যাকে কথায় কথায় আমার মেয়ে বলে দাবি করে সে আদোতে তার অংশ নয়। বিবর্ণ মুখশ্রী নিয়ে শ্রেয়ান নির্নিমেষ তাকিয়ে রইলো। তার হাত কাঁপছে কেনো? কেনো হঠাৎ করেই তার পিতৃত্ব নামক খুঁটি নড়বড়ে দূর্বল হয়ে পড়লো? শুকনো ঢোক গিলে ঘন ঘন পলক ঝাপটায় শ্রেয়ান। কিয়ৎকাল বাদ শুধায়,
–“আপনি ইরফান শেখ?”
ইরফান থমথমে গম্ভীর গলায় বলল,
–“জি, কিন্তু আপনি কে?”
শ্রেয়ান মিহি কণ্ঠে বলল,
–“আমি শ্রেয়ান চৌধুরী। ইরার হাজব্যান্ড!”
ইরফানের ভ্রু উঁচিয়ে যায়। বাঁকা সরু চোখে শ্রেয়ানের আপাদমস্তক দেখে সে। চেহারা, বাচনভঙ্গিতে বিত্তবান, আভিজাত্য ছাপ দেখে খানিক আশ্চর্য হয়। পরপরই চোয়াল শক্ত হয়ে আসে। তার মানে এর জন্যই ইরার এতো পরিবর্তিত আচরণ! তার ভাব বেড়েছে? তাকে তার মেয়ের থেকে দূরে করতে চাইছে?
শ্রেয়ান ভদ্রতার সাথে বলল,
–“আমরা বসে কথা বলতে পারি।”
রেস্তোরাঁয় একে অপরের মুখোমুখি বসা ইরফান এবং শ্রেয়ান। তবে প্রবল অসহায়ত্ব শ্রেয়ানের মুখ জুড়ে। কেননা ইরাম তার কোলে নেই। গম্ভীর মেয়েটি এখন আর তার কলার আঁকড়ে ধরে নেই, সে তার নিজের বাবার কোলে শান্ত হয়ে বসে আছে। অথচ কতো আশ্চর্যের বিষয় ইরামের চোখেমুখে কোন গাম্ভীর্যতা নেই। যেখানে ইরাম সে ব্যতীত অন্য কারোর কোলে যেতে চায় না, ছুঁতে পর্যন্ত দেয় না সেখানে সে কতো অবলীলায় বসে আছে ইরফানের কোলে। তবে কি সব বিরক্তি, গাম্ভীর্যতা শুধুই তার জন্য? সূক্ষ্ম ব্যথায় চৌচির হয়ে আসলো শ্রেয়ানের বুক জুড়ে। নিজেকে কেমন তুচ্ছ এক মানুষ বলে মনে হলো ইরামের জীবনে।
মেয়েকে আদরে আদরে ভড়িয়ে তুললো ইরফান। দীর্ঘ দুই মাস পরে স্বচক্ষে দেখলো মেয়েকে। আদুরে গলায় বলে,
–“আমার বাচ্চা! পাপাকে মিস করেছে? তোমার খুব কষ্ট হয়েছে তাই না এতোদিন অচেনা মানুষদের সাথে থাকতে? পাপা, আর কোন কষ্ট পেতে দেবো না তোমায়। পাপা দ্রুত তোমায় আমার কাছে নিয়ে যাবো।”
ছোট্ট ইরাম পাপা বলতে একটা মানুষকেই বোঝে সেটা হলো ঐ বিরক্তিকর মানুষটিকে। হঠাৎ করেই সে বলে উঠলো,
–“পাহ…পা।”
শ্রেয়ান চোখ তুলে তাকায় মেয়ের দিকে। মেয়ের গম্ভীর দৃষ্টি তার দিকেই। তবে আজ আর আলোড়ন সৃষ্টি হলো না শ্রেয়ানের মাঝে। মেয়ে তাকে নয় তার বাবাকে পাপা বলেছে। ইরফানের মুখশ্রী চকচক করে উঠলো আনন্দে মেয়ের কণ্ঠ শুনে। মেয়ে তার কথা বলতে পারে এমনকি তাকেও ডাকতে পারে। খুশিতে আত্মহারা হয়ে সে অজশ্র চুমুতে ভরিয়ে তুললো মেয়ের মুখ। তবে তাকে অবাক করে দিয়ে সহসা ইরাম চিৎকার করে কেঁদে উঠলো। কাঁদতে কাঁদতে টেবিল চাপড়ে শ্রেয়ানের দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করলো। ইরফান চমকে উঠলো ক্রন্দনরত মেয়ের গলায় পাপা ডাকটি অন্য কারোর জন্য উপলব্ধি করতে পেরে। ইরাম ইরফানের কোল থেকে টেবিল টপকে শ্রেয়ানের দিকে দেহ বাড়িয়ে দিচ্ছে বারবার। কাঁদছে আর বলছে, পাহ..পা! চেয়ারে গা এলিয়ে বসা উদাসীন দেহটিতে যেনো শক্তি ফিরে আসলো। ছলছল নয়নে মেয়ের কান্নারত মুখটির দিকে তাকিয়ে উঠে দাঁড়ায়। চমকানো ইরফানের থেকে মেয়েকে নিজের কোলে তুলে নিয়ে বলল,
–“কেউ আদর করলে কিংবা ছুঁয়ে দিলে ও বিরক্ত হয়। দুঃখিত!”
শ্রেয়ানের কোলে যেতেই ইরাম কান্না থামিয়ে রাগান্বিত চোখে তাকায় তার দিকে। যেই দৃষ্টির মানে, তাকে অন্যের কোলে দিয়েছে কেনো? শ্রেয়ান নিরবে মেয়ের শাসন দেখলো। বাবাকে নিরুত্তর দেখে ইরাম থমথমে মুখে কাঁধে মাথা রেখে শুয়ে পড়ে। ইরফান কিছুটা সময় থমথমে মুখে বসে রইল। কিয়ৎকাল বাদ নিরবতা ভেঙে শ্রেয়ান কিছু বলতে নিলে ইরফান তাকে আঁটকে দিলো। কাটকাট কণ্ঠে বলল,
–“আমার মনে হয় না আমাদের মধ্যে কথা বলার মতো কোন টপিক আছে। যদি থেকে থাকে সেটা আমার মেয়ে ইরাম শেখ। আর আমার প্রাক্তন আমায় না জানিয়ে আমার মেয়ে নিয়ে এতো বড় সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। তাই আমি আমার মেয়েকে আমার কাছে নিয়ে যাওয়ার চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত করবো। আশাকরি তাকে জানিয়ে দিবেন আপনি।”
শ্রেয়ান বিস্ফোরিত নয়নে তাকায় ইরফানের কথার প্রেক্ষিতে। অস্ফুট স্বরে বলে ওঠে,
–“চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত মানে?”
ইরফান চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। পকেটে হাত গুঁজে বলে,
–“হ্যাঁ, চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত। আমি ইরামকে নিজের কাছে নিয়ে যাবো। ও আর ইরার কাছে থাকবে না। কারোর দ্বিতীয় সংসারে, আমার মেয়ে রাখার প্রশ্ন’ই আসে না। যেখানে তার বাবা জীবিত রয়েছে।”
শ্রেয়ানের মস্তিষ্ক শূন্য হয়ে পড়লো সদ্য সুখের দেখা মিলা সংসারটিকে শূন্য হতে দেখে। গমগমে স্বরে বলে,
–“কারোর দ্বিতীয় সংসারে আপনি আপনার মেয়ে রাখবেন না— অথচ নিজের দ্বিতীয় সংসারে রাখবেন। মেয়েকে দ্বিতীয় সংসারে থাকতে দেবেন না, তবে মেয়ের মাকে ডিভোর্স কেনো দিয়েছিলেন? আপনার মেয়ের জন্য আপনার এতো ভালোবাসা তখন কোথায় ছিল— যখন রাতের অন্ধকারে তার বোবা বধির মায়ের সাথে তাকে বাসে তুলে দিয়েছিলেন? আজ যখন তারা একটু ভালো থাকতে শিখেছে তখন আপনার মনে হয়েছে আপনার মেয়ের কথা? আদোতে আপনি বাবা নাকি সন্তানের সুখ না দেখতে পারা এক অমানুষ?”
রাগে হুঁশ হারা শ্রেয়ান ক্ষিপ্ত কণ্ঠে বলল। ইরফান দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
–“আমার স্ত্রী, আমার মেয়ে—আমি কি করবো তাদের সাথে সেটা আমার ব্যপার। কার সাথে আমি থাকবো, কার সাথে নয় এটার কৈফিয়ত আমি আপনাকে দেবো না মিঃ শ্রেয়ান চৌধুরী। আপনি শুধু এতোটুকু মাথায় রাখুন আমি ইরামকে শিঘ্রই আমার কাছে নিয়ে যাবো।”
–“আমি নিতে দেবো না। সাড়ে আটমাসের একটা দুধের শিশু ও। মায়ের দুধ খায় ও এখনো। আপনি ওকে নিয়ে যাওয়ার কথা কি করে বলতে পারেন?”, শ্রেয়ান চোয়াল শক্ত করে বলল। ইরফান ও পাল্টা তেজ নিয়ে বলল,
–“যাদের মা থাকে না তারা কি বাঁচে না? দুনিয়াতে ফর্মুলা দুধ খেয়ে কতো বাচ্চা বেঁচে আছে! আর ও আমার কাছে যতোটা যত্নে থাকবে আর কারোর কাছে থাকবে না। আর আমি আপনাকে কৈফিয়ত ই বা দিচ্ছি কেনো? আপনি কে? আমি ওর বায়োলজিক্যাল ফাদার! দিনশেষে ওর উপর সবচেয়ে বেশি আমার অধিকার।”
–“বায়োলজিক্যাল ফাদার? এখন মনে পড়েছে আপনার এই কথা? আপনি আদোতে একজন বাবা হওয়ার থেকেও একজন স্বার্থান্বেষী হিংসুক। শুধু ভরণপোষন করলেই কি বাবা হওয়া যায়? একটা সন্তানের বিকাশে যে সুস্থ সুন্দর পরিবেশ আর শক্ত ঢালের দরকার, তা কি আপনি ওকে দিয়েছেন? নিজের সুখের জন্য ওর বোবা বধির মাকে ডিভোর্স দিয়েছেন। আপনার নতুন স্ত্রী অন্য ঘরের বাচ্চা লালন পালন করতে চায় না দেখে তাকে মায়ের কাছে ফেলে রেখেছেন। তবে আজ কেনো সন্তানের হক চাইছেন? থাকতে দিন না মা মেয়েকে তাদের মতো ভালো!”
–“ওর মা কে নিয়ে আমার আদৌ কোন মাথা ব্যাথা নেই আর না হবে। কিন্তু আমি আমার মেয়েকে কোনমতেও আর ইরার কাছে রাখবো না।”
শ্রেয়ান শিড়ঁদাড়া সোজা করে দাঁড়ায়। কন্ঠ আর চেহারা থেকে নম্রতা উবে যায়। সে শক্ত কণ্ঠে বলল,
–“আমি এতক্ষণ আপনাকে ভালোভাবে বোঝানোর চেষ্টা করেছি কিন্তু আপনি বোঝেননি। আপনি যদি ওর বায়োলজিক্যাল ফাদার হন তবে ইরাও ওর বায়োলজিক্যাল মাদার। ইরা কেনো সৎ মায়ের ঘরে তার মেয়েকে রাখবে। আর আপনার সন্তানের প্রতি এই ভালোবাসাটা যদি শুরু থেকে থাকতো তবে আমি বিনা দ্বন্দ্বে মেনে নিতাম। কিন্তু ইরামের জন্য সৎ আশ্রয়স্থল আপনি নন। আমরা নাহয় আইনী প্রক্রিয়ায় পথ চলি। এটা আমাদের দুই পক্ষের জন্য উত্তম হবে।”
–“অন্যের বাচ্চা নিয়ে আপনার এতো আগ্রহ কেনো?”
–“আমার বাচ্চা, অন্যের বাচ্চা বিবেচনা করার মতো নিচু মন মানসিকতা আমার এখনো তৈরি হয়নি, ইরফান সাহেব। আমার কাছে বাচ্চা মানেই সৃষ্টিকর্তার দেয়া শ্রেষ্ঠ নেয়ামত। আর যেদিন থেকে এই নেয়ামত আমার ঘরে, আমার বুকে এসেছে—সেদিন থেকে তাকে আমি সযত্নে আগলে রেখেছি। নিজেকে তার ভবিষ্যৎ হিসেবে দেখেছি, যেদিন থেকে আমি তার মায়ের হাত ধরেছি। তার বাবা হিসেবে মনস্থির করিনি বরং তার বাবা আমি! এটাই মেনে এসেছি। জানিনা অযাচিত এই অধিকার দিনশেষে আমার সঙ্গ দেবে কি না! তবে আমি আমার সর্বোচ্চ চেষ্টা করবো তবুও কোন স্বার্থান্বেষী মানুষের হাতে তাকে দেবো না।”
–“আপনি যাকে স্বার্থান্বেষী বলছেন সে ওর বাবা।”
–“বাবারা তো সন্তানের জন্য সব করতে পারে। একটা বোবা বধির মেয়ের সাথেও সংসার করে যেতে পারে। নিজের জৈবিক সুখের জন্য স্ত্রী সন্তানকে ছেড়ে দেয় না। তবে আপনি কেমন বাবা? এটা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে!”
–“আপনি তবে সহজে বিষয়টা সমাধান করতে চাইছেন না?”
–“সহজ সমাধান বলতে আপনি কি বোঝাতে চাইছেন? আমি ওকে দিয়ে দেবো আপনার কাছে?”
–“হ্যাঁ!”
–“তবে ওর মায়ের কি দোষ? ওর মা কিভাবে তার সন্তান ছাড়া থাকবে? এই বাচ্চাটা এখনো মাতৃদুগ্ধপান করে। আর আপনি কতো অবলীলায় বলে দিলেন ওকে কেড়ে নিবেন ওর মায়ের থেকে। আমি মোটেই সহজ সমাধানে আগ্রহী নই মিঃ ইরফান শেখ। তার থেকে চলুন জটিল সমাধানে যাই। আমি নাহয় ওর মাতৃদুগ্ধ ওর জন্য বরাদ্দ করতে লড়বো, আর আপনি আপনার স্বার্থান্বেষী মনের জেদ!”, শ্রেয়ানের শক্ত কণ্ঠ।
ইরফান নিরুত্তর চোয়াল শক্ত করে তাকিয়ে রইল।
সেই সাক্ষাৎকারের সমাপ্তি সেখানেই ঘটলো। সন্ধ্যা নাগাদ শ্রেয়ান অন্তঃস্থলে বিদীর্ণ অসুখ নিয়ে বাড়ি ফিরলো। শাহেদ চৌধুরীর মুখশ্রী চিন্তিত। ছেলেকে দেখতেই সে উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বলল,
–“ইরা হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ে। বারবার কি যেনো বলছে কিছু বুঝতে পারছি না।”
শ্রেয়ানের স্থবিরতা ভঙ্গ হলো। সে মেয়েকে বাবার কোলে দিয়ে দ্রুত ঘরে যেতে চাইলে ছোট্ট হাত দু’টো ক্ষিপ্র বেগে তার কলার চেপে ধরলো। কড়া গম্ভীর দৃষ্টি শ্রেয়ানের মুখপানে। দাঁত খিটিমিটি দিচ্ছে রাগে। শ্রেয়ান ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলে মেয়েকে আবার কোলে তুলে নিতেই মেয়েটা শান্ত হয়। শ্রেয়ান তার চোখে চোখ রেখে খানিক রাগ ঝেড়ে বিড়বিড় করে বলে,
–“সব গাম্ভীর্যতা রাগ শুধু আমার জন্য। আর ভালোবাসা, নম্রতা সব অন্যের জন্য, তাই না?”
কলার চেপে ধরা ইরাম কপট চোখ মুখ কুঁচকে তাকায় বাবার রাগ দেখে। শাহেদ চৌধুরী ডানে বামে মাথা নাড়লো বাবা মেয়ের পাল্টাপাল্টি সংঘর্ষ দেখে। কেউ কারোর থেকে কম নয়।
মর্মযন্ত্রনা, উদগ্রীবতা নিয়ে নিজের ঘরে ঢুকতেই, বিছানায় বসা উন্মাদপ্রায় নারীটি দৃষ্টি আকর্ষণ করে শ্রেয়ানের। ক্রন্দনরত ইরা মেয়েকে দেখতেই দৌড়ে আসে বিছানা থেকে নেমে। শ্রেয়ানের কোল থেকে তাকে নিয়ে নেয়। বুকে চেপে ধরে অজশ্র চুমুতে ভরিয়ে তুললো। কাঁদতে কাঁদতে অস্ফুট স্বরে শ্রেয়ানকে কতোকিছু বলছে। শ্রেয়ান যেনো বুঝে নেয় স্ত্রীর ভয়। সুমনা বিছানা ছেড়ে নামে। চিন্তিত কণ্ঠে বলল,
–“হ্যাঁ রে শ্রেয়ান। দেখনা সেই বিকাল থেকে কেঁদে যাচ্ছে। কাঁদতে কাঁদতে অজ্ঞান হয়ে পড়েছিল। কি হয়েছে ঠিক করে বুঝিয়ে বলছেও না।”
শ্রেয়ান মায়ের দিকে তাকিয়ে মিহি স্বরে বলল,
–“কিছু হয়নি, চিন্তা করোনা। আমি দেখছি।”
–“আচ্ছা তুই সামলা ওকে। দাদুভাইদের আমি নিয়ে যাই।”
–“দরকার নেই মামনি, ওরা থাকুক।”, সুমনা মাথা নেড়ে সায় জানিয়ে কক্ষ থেকে বের হয়। মা যেতেই শ্রেয়ান আগলে নেয় স্ত্রীকে। নম্র স্বরে শুধায়,
–“কি হয়েছে ইরা, কাঁদছেন কেনো?”
ইরা দ্রুতপায়ে মোবাইলটির কাছে যায়। মোবাইলটা এনে শ্রেয়ানের হাতে দিয়ে অস্ফুট স্বরে কিছু বলে। শ্রেয়ান মেসেজটা পড়লো, অতঃপর ফোনটা রেখে দেয়। ইরা অনাহুত দৃষ্টিতে তাকায়। শ্রেয়ান মৃদু হেসে ইরার দুইগাল আঁকড়ে ধরে চোখের পানি মুছিয়ে দিয়ে শব্দ আর ইশারা ইঙ্গিতে বলল,
–“দিনশেষে ইরাম আমাদের মাঝে, আপনার বুকে এভাবেই থাকবে। এটা আমার ওয়াদা। এতো ভয়ের কিছু নেই, ইরা।”
ইরা শান্ত হতে পারে না ছুটে যায় হোয়াইট বোর্ডের কাছে। মার্কার দিয়ে বোর্ডে শব্দ করে দেখিয়ে শ্রেয়ানকে মাথা ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে ইশারা করে বলে, এখানে লিখতে। শ্রেয়ান এগিয়ে গিয়ে বোর্ডে একই কথা লিখলো। ইরা অশ্রুসিক্ত নয়নে তাকিয়ে লিখলো,
–“ওয়াদা?”
শ্রেয়ান মৃদু হেসে লিখলো,–“ওয়াদা।”
ইরা আবার লিখলো,
–“আমার এইটুকু সম্বল ছাড়া, নিজের বলতে আর কিছু নেই। এইটুকু কেড়ে নিলে আমার মরন ছাড়া উপায় নেই।”
শ্রেয়ান নির্নিমেষ তাকিয়ে থাকে ইরার দিকে। এই মাত্র কদিনের সংস্পর্শে সে ইরামকে ছাড়া এক মুহুর্ত ও কল্পনা করতে পারে না সেখানে ইরা? নিজের অংশ ছাড়া কিভাবে থাকবে? সদ্য ই না সুখের মুখ দেখলো তারা? তবে ফের কেনো? কম কি দুঃখ ছিল মেয়েটার জীবনে?
বসার ঘরে জরুরী বৈঠকে পরিবারের সদস্য সহ সুস্মিতা আর সুস্মিতার হাজব্যান্ড ও রয়েছে। শাহেদ চৌধুরী নিরবতা ভেঙে বললেন,
–“কি করতে চাও? আইনী পদক্ষেপ গ্রহণ করবে? সে ইরামের বায়োলজিক্যাল ফাদার। দায়িত্ব পালনেও কখনো কার্পন্য করেনি। তার দিকটা কতোটা ভারী ভেবেছ?”
শ্রেয়ান মাথা তুলে তাকায়। বলে,
–“বায়োলজিক্যাল ফাদার, দায়িত্ব এগুলো হলেই কি বাবা হওয়া যায়? দূরে বসে অন্য স্ত্রী নিয়ে সুখে সংসার করবে, আর বোবা মায়ের কাছে সন্তান রেখে লালন পালন করে শ্রেষ্ঠ বাবা হয়ে যাবে? ইরা যে ইরামের জন্মদাত্রী, ওনার কোন অধিকার নেই মেয়ের ওপর? আমি লড়বো ইরার হয়ে।”
–“ভাইয়া ঠিক বলছে পাপা। ইরাম আমাদের কছে ভালো আছে। আর ঐরকম বাবার কাছে ইরাম যে খুব ভালো থাকবে তার গ্যারান্টি কি?”, সুস্মিতা উৎকণ্ঠা নিয়ে বলল। শাহেদ চৌধুরী গম্ভীর গলায় বলল,
–“ঠিক আছে, তবে তাই হোক।”
ইরফান হাসপাতাল থেকে রিপোর্ট নিয়ে হোটেলে ফিরতেই, ছাব্বিশ সাতাশ বছরের একজন নারী বেরিয়ে আসলো দ্রুত কদমে। নিহার ইরফানের বিমর্ষ মুখটি উপেক্ষা করে ক্রুব্ধ কণ্ঠে শুধায়,
–“আমি কি শুনছি ইরফান? তুমি নাকি ইরামকে আইনীভাবে নিজের কাছে নিয়ে আসছো?”
ইরফান সোফায় বসতে বসতে গম্ভীর গলায় জবাব দেয়,
–“হ্যাঁ।”
–“কিন্তু কেনো?”, নিহার চোয়াল শক্ত করে শুধায়।
ইরফান জ্বলন্ত চোখে তাকায়। বলে,
–“কেনো মানে? ইরাম আমার মেয়ে ও আমার কাছে থাকবে এটাই স্বাভাবিক।”
–“কিন্তু বিয়ের আগে তোমার সাথে আমার কথা হয়েছে। ইরামকে আমি দেখাশোনা করতে পারবো না।”
–“তুমি এখনো এই কথা বলছো? ডাক্তার কি বলেছে শোননি? তোমার প্রেগন্যান্সিতে কমপ্লিকেশন রয়েছে। বাই এনি চান্স তুমি যদি গর্ভধারণ না করতে পারো, তবে আমি কি সারাজীবন সন্তানহীন থাকবো? নো ওয়ে। আমার পরীর মতো মেয়ে থাকতে আমি সন্তানহীন থাকবো কেনো? ইরাম আমাদের সাথে থাকবে তুমি ওর দেখাশোনা করতে বাধ্য।”, ইরফানের কঠোর কণ্ঠে নিহার ক্ষিপ্ত কণ্ঠে বলল,
–“ডাক্তার বলেছে কমপ্লিকেশন রয়েছে, কোনদিন বাচ্চা হবেই না এটা তো বলেনি ইরফান? আমি অন্যের বাচ্চা লালন পালন করবো কেনো? আমার জব রয়েছে। তোমার যদি মেয়ের প্রতি এতোই ভালোবাসা তবে তুমি তার মাকে ডিভোর্স দিলে কেনো? আমি একটা অবিবাহিত মেয়ে হয়ে , ডিভোর্সি বাচ্চা ওয়ালা লোককে বিয়ে করেছি কি এই কারণে? আমি এটা কখনো মানবো না ইরফান।”
–“তুমি মানতে বাধ্য। যদি সংসার করতে চাও তবে ইরামকে সাথে নিয়ে করতে হবে। তুমি সবকিছু জেনেই আমায় বিয়ে করেছো।”
যে শ্রাবণে প্রেম আসে পর্ব ১০
–“কিন্তু তুমি তখন আমায় কথা দিয়েছিলে ইরাম আমাদের সাথে থাকবে না।” , নিহার চিৎকার করে উঠলো। ইরফান রেগে একটা চড় বসিয়ে দেয় নিহারের গালে। দাঁতে দাঁত চেপে বলে,
–“নিজে একটা অসম্পূর্ণ মেয়ে হয়েও সন্তান নিয়ে তোমার এতো অবহেলা কেনো? আমি যেটা করছি তাতে চুপচাপ সায় দেবে নিহার। আমি যেমন যেমন বলবো কোর্টে তেমন বয়ান দেবে।”
বলেই ইরফান গটগট করে ঘরে চলে যায়। গালে হাত দিয়ে নিহার অশ্রুসিক্ত নয়নে চোয়াল শক্ত করে তাকিয়ে থাকে তার গমনের পথে।
সেদিনের পর থেকে শুরু হয় দ্বন্দ্ব, একটা ঘৃণ্য দ্বন্দ্ব! সন্তান নিয়ে কাড়াকাড়ি নামক ঘৃণ্য দ্বন্দ্ব।
