Home র‌ইলো প্রেমের নিমন্ত্রণ র‌ইলো প্রেমের নিমন্ত্রণ পর্ব ১৩

র‌ইলো প্রেমের নিমন্ত্রণ পর্ব ১৩

র‌ইলো প্রেমের নিমন্ত্রণ পর্ব ১৩
ইয়ুশরা রিমু

সায়রের ফোনের ছবির ঘটনাটি নিয়ে চারপাশে আবারও হাসাহাসি শুরু হয়ে গেলেও, বেলার ভেতরে তখনও যেন এক অদ্ভুত কাঁপুনি রয়ে গেছে। বাইরে থেকে সেটা বোঝার উপায় নেই।সে ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ধরে রেখেছে, বিহানের কথার জবাবে মাঝেমধ্যে দুই একটা কথা বলছেও কিন্তু তার চোখের সামনে যেন একটু আগের সেই এক ঝলক দৃশ্যটা বারবার ভেসে উঠছে।সায়রের ফোনের স্ক্রিনে ভেসে ওঠা নিজের সেই ছবিটা।খুব অল্প সময়ের জন্য দেখেছিল সে। আর সায়র এত দ্রুত সেটা সরিয়ে ফেললো, ভালো করে দেখতে পারলো না।
বেলা মনে মনে ভাবলো,

—না, এভাবে বসে থাকলে চলবে না। এখন যদি সে চুপচাপ হয়ে যায়, তাহলে ইরা হয়তো টের পেয়ে যাবে ওর কিছু একটা হয়েছে। বিহান তো আরও বেশি খোঁচা দেবে এইসব জানতে পারলে। আর সবচেয়ে বড় কথা সে নিজেই নিজের ভেতরের এই অদ্ভুত অস্থিরতাটাকে সহ্য করতে পারছে না। তাই পরের মুহূর্তেই সে নিজেকে প্রায় জোর করেই হাসিখুশি রাখার চেষ্টা করলো।
বিহান তখনও নিজের ছবিটা নিয়ে নাটক করে যাচ্ছে,
—আমি সত্যি বলছি, আজকে আমার সম্মান বলে কিছু আর অবশিষ্ট নেই। তোরা সবাই মিলে আমার ক্যারিয়ার শেষ করে দিতে উঠে পড়ে লেগেছিস।
ইরা সঙ্গে সঙ্গে বললো,
—কীসের ক্যারিয়ার? ছাদের ওপর লাফিয়ে লাফিয়ে পতাকা ওড়ানোর ক্যারিয়ার?
রুপসা হেসে বললো,
—না, আর্জেন্টিনার অফিশিয়াল চিৎকারবাজ সমর্থক হিসেবে বিহান বোধহয় উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ গড়তে চেয়েছিলো।
বিহান আহত মুখে বুক চেপে ধরে বললো,
— তোরা কেউই শিল্পী মানুষের মূল্য বুঝিস না।
বেলা এবার ইচ্ছে করেই একটু বাড়িয়ে হেসে উঠলো,
— শিল্পী? তুমি? কোন দিক দিয়ে?
বিহান ভ্রু নাচিয়ে বললো,

— আমি আবেগের শিল্পী। ম্যাচ চলাকালীন আমার এক্সপ্রেশন, আমার চিৎকার, আমার লাফ সবকিছুই একটা আর্ট।
ইরা হাততালি দিয়ে বললো,
—হ্যাঁ, একদম। বিশেষ করে আপনার ওই ছবিটার এক্সপ্রেশনটা তো আধুনিক শিল্পের পর্যায়ে পড়ে!
আবারও চারপাশে হাসির রোল উঠলো। বিহান নকল রাগ দেখিয়ে মুখ ভার করে বসে র‌ইলো।বেলাও হেসে উঠলো, আর এবার সেই হাসিটা আগের চেয়ে অনেক বেশি স্বাভাবিক দেখালো। নিজের ভেতরের ঝড়টাকে চেপে রেখে সে কথায় কথায় যোগ দিতে লাগলো, ইরার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বিহান’কে আরো ভেঙালো। এখন তাকে দেখলে মনে হবে, ‌একটু আগের ফোনের বিষয়টা সত্যিই তার কাছে কোনো গুরুত্বই ঘটনা না।
কিন্তু ছাদের একপাশে বসে থাকা সায়র খুব স্পষ্ট দেখছিলো। বেলা যতটা জোরে হাসছে, যতটা প্রাণখোলা ভঙ্গিতে কথা বলছে, তার ভেতরে ততটা স্বস্তি নেই। বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে সে পুরোপুরি আগের মতো হয়ে গেছে।কিন্তু সায়রের চোখ এড়ালো না, বেলা মাঝেমধ্যে অকারণে ওড়নার কোণা মুচড়ে ধরছে, কোনো কথার মাঝখানে হঠাৎ দু’সেকেন্ড থেমে যাচ্ছে, কিংবা সবার সঙ্গে কথা বলতে হঠাৎ অন্যমনস্ক হয়ে পড়ছে।যেন সে ইচ্ছে করেই নিজেকে ব্যস্ত রাখছে, যাতে মাথায় আর কিছু না আসে।
ফোনের স্ক্রিনে বেলার ছবি ধরা পড়ে যাওয়ার সেই এক সেকেন্ডের ঝুঁকি সায়রের মাথা থেকে এখনও নামেনি । কিন্তু তার চেয়েও বেশি অদ্ভুত লাগছে বেলাকে। বেলা কি কিছু দেখেছে? ওর চেহারাটা দেখে সন্দেহ লাগছে সায়রের। যদি দেখে থাকে, তাহলে ও কী ভাবছে? বেলা কি ভাবছে , সায়র ইচ্ছে করেই ছবিটা তুলেছিলো? অন্য কোনো কারণ থেকে? নাকি স্রেফ ঘটনাচক্রে ধরা পড়া একটা ছবিই মনে করছে?
এই প্রশ্নগুলোর একটারও উত্তর সে জানে না। আর জানে না বলেই বোধহয় তার চোখ বারবার অজান্তেই গিয়ে থামছে বেলার ওপর।অথচ সে নিজেকে বোঝাতে চাইলো যে এসব নিয়ে ভাবার কিছু নেই, বেলা কি ভাবলো না ভাবলো তাতে তার কি? কিন্তু বারবার চোখ গিয়ে আটকে থাকলো বেলার দিকেই।
ওদিকে খেলা আর গল্পের মিশেলে ছাদের আড্ডা আবার জমে উঠলো। বিহান হাল ছাড়ার পাত্র নয়। সে ঘোষণা করলো,

— না, এইভাবে শুধু আমার ই’জ্জত নিয়ে খেললে হবে না। এবার সবাইকে কিছু না কিছু করতে হবে। না হলে ছাদ ছাড়ার অনুমতি নাই।
ইরা ভ্রু কুঁচকে বললো,
— আপনি কি ছাদের মালিক নাকি?
— অবশ্যই। আজকের রাতের জন্য আমি ছাদের স্বঘোষিত শাসক।
— ত হলে আমরা বিদ্রোহী প্রজা।
— বিদ্রোহী প্রজাদের জন্য শা’স্তি আরও কড়া।
বেলা হেসে বললো,
— তোমার সব শা’স্তি শুনলেই আমার ছোটবেলার ট্রমা মনে পড়ে।
বিহান নাটকীয় গলায় বললো,
— ট্রমা না, ওগুলো চরিত্র গঠনের অংশ ছিলো।
রুপসা মৃদু হেসে বললো,
—তোমার চরিত্র গঠনের পদ্ধতি শুনে ভয় লাগছে।
— ভয় পাওয়ার কিছু নেই। আমি খুব সভ্য মানুষ।
ইরা সঙ্গে সঙ্গে বেলার দিকে চেয়ে নাটকীয় ভঙ্গিতে বললো,
— কেউ যদি নিজে থেকে বলে সে খুব সভ্য, ধরে নিবি সে মোটেও সভ্য না।

বেলা এবার সত্যি সত্যিই হেসে ফেললো। হাসতে হাসতে ইরার কাঁধে হালকা ধাক্কা দিলো। বেলা যখন ইরার সঙ্গে হেসে উঠলো, তখন তাকে এত সুন্দর, এত প্রাণবন্ত লাগছিল যে সায়র সেটা দেখে নিজের ভেতরে হঠাৎ করে তীব্র নরম অনুভূতি টের পেলো।
একসময় বিহান কী একটা ব্যাপার নিয়ে সায়র আর রুপসাকে নিয়ে ছাদের একপাশে চলে গেলো।ওরা তিনজন কিসব বিষয়ে যেন কথা বলতে লাগলো। ইরা তখন হঠাৎ বেলার হাত ধরে বললো,
—চল, আর বসে থাকলে হবে না। একটা গান ছাড়।
বেলা ভ্রু উঁচু করে বলে,
—এখন?
— হ্যাঁ, এখনই। এত বড় জয়ের রাত, আর আমরা নাচবো না?

বেলারও যেন হঠাৎ করেই ইচ্ছে হলো সবকিছু কিছুক্ষণের জন্য ভুলে যেতে। মাথার ভেতরের জটিলতা, বুকের ভেতরের ধুকপুকানি সবকিছু সরিয়ে রেখে শুধু এই রাতটাকে উপভোগ করতে। সে আর বেশি ভাবলো না। নিজের ফোনটা বের করে তাড়াতাড়ি একটা সুন্দর গান ছেড়ে দিলো।
ছাদের নীল-সাদা আলোয় মুহূর্তেই পরিবেশটা বদলে গেলো। ইরা হাত তুলে ঘুরে উঠলো প্রথমে, তারপর বেলাকেও টেনে নিলো সঙ্গে। বেলা এক সেকেন্ড ইতস্তত করলেও পরমুহূর্তেই হেসে ফেললো। তারপর সত্যিই নিজের দু’হাত ছড়িয়ে, চুল এলোমেলো হয়ে, মুখভরা হাসি নিয়ে সে ইরার সঙ্গে তাল মিলিয়ে নাচতে শুরু করলো। শেষের দিকে বেলা একাকী একটা গানে নাচলো।নীল-সাদা আলোয় তার ওড়নার প্রান্তটা হালকা বাতাসে দুলে উঠছিলো। মুখে নাচের উচ্ছ্বাসের লালচে আভা, চোখদুটো উজ্জ্বল। গানের তালে সে ধীরে ধীরে হাত তুললো, একবার ঘুরলো, তারপর নিজের মতো করে তাল ধরলো। এতে কোনো বাড়াবাড়ি ছিলো না, কোনো সাজানো ভঙ্গিও না।বরং ছিলো একরাশ স্বতঃস্ফূর্ততা। যেন এই কয়েক মিনিটের জন্য সে সত্যিই সব ভুলে গেছে। মাথার ভেতরের জটিলতা, বুকের ভেতরের ধুকপুকানি, একটু আগের সব অস্বস্তি সবকিছু।
ওদিকে কথা বলতে বলতে অনেক্ষণ ধরে বিহান, সায়র আর রুপসা ছাদের মাঝখানে ইরা আর বেলা’কে দু’জন নাচ করতে দেখছে।বিহান কিছু সময় থমকে থেকে চেঁচিয়ে উঠলো,

–ওহহো! এইদিকে কী চলছে! আমার অজান্তে কনসার্ট শুরু হয়ে গেছে নাকি?
ইরা নাচ থামিয়ে বললো,
—চুপ! আপনি এদিকে আসবেন না। এটা ভিআইপি পারফরম্যান্স।
বিহান নাটকীয় ভঙ্গিতে বুক চেপে বললো,
—নিজের বাসার ছাদে আমি আউটসাইডার! বেইমানি! চরম বেইমানি!
বেলা হেসে ফেললো। গানের তালে তালে সে এখনও পুরোপুরি থামেনি। গাল দুটো লালচে হয়ে উঠেছে, চোখদুটো উজ্জ্বল, মুখে এমন এক নির্ভার হাসি।
সায়র ঠিক তখনই ওর দিকে তাকিয়ে রইলো একদৃষ্টে। কোনো কথা না বলে। তার চোখে তখনও সেই চাপা মুগ্ধতার রেখা। বেলাকে এমন উচ্ছ্বাসে ভেসে যেতে দেখতে তার মনটা অদ্ভুদ ভালো লাগায় ভরে যাচ্ছে। বিহান আবার শুরু করলো,

–এই যে বেলা! এত লাফাস না, ছাদ যদি ভেঙে পড়ে?
ইরা সঙ্গে সঙ্গে চেঁচিয়ে উঠলো,
— ভাঙ্গলে ভাঙবে। বেশি কথা বললে আমরা আরো জোরে লাফিয়ে নাচবো।
বিহান দমলো না সে বললো,
— নাচো তাতে আমার কি। বরং আমি তো ভাবছি, তোদের ভিডিও করে ভাইরাল করে দেবো আর্জেন্টিনা জেতার পর দুই উন্মাদ সমর্থকের অসাধারণ নৃত্য।
বেলা এবার হেসে বললো,
—আগে নিজের লাফানোর ছবিটা ভাইরাল করো, তারপর আমাদেরটা করিও।
রুপসাও হেসে উঠলো। বিহান কপট রাগে বললো,
—না, আজকে সবাই মিলে আমাকে টার্গেট করছে। আমি এই বাড়িতে আর নিরাপদ না।
এইসব খুনসুটি, চেঁচামেচি, হাসাহাসির মধ্যেই আরও কিছুক্ষণ কাটলো। তারপর নিচ থেকে ডাক এলো। মমতাজ বেগমের গলা ভেসে উঠলো,

—তোরা আর কত রাত করবি? নিচে আয় সবাই!
বিহান মুখ বাঁকিয়ে বললো,
— আহা! আনন্দ এইখানেই সব শেষ।
এক এক করে সবাই সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেলো। রুপসা বিহানের সঙ্গে কথা বলতে বলতে নামলো, ইরা বেলার হাত জড়িয়ে পেছন পেছন নামতে লাগলো। সায়র সবার পর নিচে নেমে এলো।
দুতলায় গিয়ে যার যার মতো গুছিয়ে নিতেই রাত আরও গভীর হয়ে এলো। বিহান নিজের ঘরে চলে গেলো। রুপসা থাকবে গেস্ট রুমে ।ইরা আজ বেলার ঘরেই থাকবে। দু’জনে একসঙ্গে গল্প করতে করতে ঘুমাবে। আর সায়র? সে কোনোদিকে না তাকিয়ে চুপচাপ নিজের রুমে চলে গেলো। মুখে আগের মতোই সেই নির্লিপ্ত ভাব, কিন্তু তার চোখে এখনও ভাসছে ছাদের মাঝখানে আনন্দে নাচ করতে থাকা বেলার উজ্জ্বল মুখটা।

বেলার ঘরটায় এখনো আলো জ্ব’লছে। বিছানার ওপর ইরা ইতিমধ্যেই নিজের দখল বসিয়ে দিলো।এক লাফে উঠে বসলো, তারপর বালিশটা জড়িয়ে ধরে বললো,
— আহ্‌, কী শান্তি! আজকে আমি এই বিছানার অর্ধেকেরও বেশি জায়গা দখল করবো।
বেলা আলমারি খুলতে খুলতে বললো,
—স্বপ্ন দেখিস না। তোকে এক কোণায় ফেলে রাখবো।
—এই যে! অতিথির সঙ্গে এমন ব্যবহার?
— তুই আবার অতিথি কবে থেকে?
— আমি সবসময়ই ভিআইপি।
বেলা হালকা হেসে নিজের কাপড় বের করলো।
— ঠিক আছে, ভিআইপি ম্যাডাম, আগে ফ্রেশ হয়ে আয়।

ইরা ওয়াশরুমে ঢুকে গেলো। বেলা তখন ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে চুলের ক্লিপ খুললো। সারাদিনের লাফালাফি , ছাদের হাওয়ায় এলোমেলো হয়ে যাওয়া চুল, কপালে লেগে থাকা হালকা ঘাম সব মিলিয়ে নিজেকে কেমন ক্লান্ত লাগছিলো।আর চুলের তো বেহাল দশা হয়েছে। তবু আজকের রাতের ভেতরে একটা অদ্ভুত উষ্ণতাও ছিলো। যা তার মন ভালো করে দেওয়ার মতো। ইরা বের হয়ে আসতেই, তারপর সে মুখে পানি ছিটিয়ে নিতে গেলো, নিজেরও ফ্রেশ হয়ে এলো ।
বেলা ওয়াশরুম বেরিয়ে বিছানায় গিয়ে ধপ করে পড়লো। ইরা চুলে বেনি করতে করতে দীর্ঘশ্বাস ফেললো,
— উফ! এখন যদি কেউ আমার হাতে কফি ধরিয়ে দিতো!
বেলা বালিশে মাথা রেখে বললো,
— রাত দেড়টার সময় কফি খেয়ে আবার সারারাত চোখ কপালে তুলে রাখবি?
— আজকে তো এমনিতেই ঘুমাবো না।
— তুই এই কথা যতবার বলিস, ততবারই আমি নিশ্চিত হই তুই আগে ঘুমাবি।
ইরা এবার পাশ ফিরে বেলার দিকে তাকালো। তার চোখে তখন সেই চেনা দুষ্টু ঝিলিক।

—আচ্ছা, একটা কথা বল।
—বল।
— তখন সায়র স্যারের ফোনের স্ক্রিনে কী ছিলো?
প্রশ্নটা শুনেই বেলার বুকের ভেতরটা ধক উঠলো। সে দ্রুত স্বাভাবিক গলায় বললো,
—মানে?
—মানে, আমি তো দেখতেই পাইনি। বিহান ভাই আর ওই ছবিটা নিয়ে এত হইচই করলো, কিন্তু তুই তখন কেমন চুপ হয়ে গেলি। কিছুটিছু দেখেছিস নাকি স্যারের ফোনে?
বেলা বালিশটা বুকে টেনে নিলো।
— না তো।
ইরা চোখ সরু করলো।
—মিথ্যা।
— কেন মিথ্যা বলবো?
— কারণ তোর মুখটা তখন এমন ছিলো, যেন তুই পৃথিবীর সব থেকে কোনো গোপন তথ্য জেনে ফেলেছিস।
— তুই সবার দিকে নজর রাখিস নাকি?
—অবশ্যই।
বেলা এবার সত্যিই হেসে ফেললো। ইরার এই অতিরঞ্জিত গলায় বলা কথাগুলো সবসময়ই তাকে হাসায়। বেলা আচমকা মোবাইলটা হাতে তুলে বললো,

—শোন, একটা কাজ করি?
— কী?
বেলা চোখ টিপে বলে,
— হিটলার বেটাকে একটু ডিস্টার্ব করি।
ইরা ভ্রু তুললো।
—মানে?
—ফেক আইডি দিয়ে মেসেজ দেই।
ইরা অবাক হয়ে বলে,
—এই রাত্তিরে?
বেলা একটু ভাব নিয়ে , নিজের সেই বিখ্যাত ফেক আইডিতে লগইন করলো। ইরা গা ঘেঁষে এসে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইলো। ইরা বললো,
—- শুরুটা জম্পেশ হতে হবে, একদম সোজা কিছু লিখবি না।
বেলা ঠোঁট কামড়ে একটু ভেবে লিখলো,
—জেগে আছেন, সায়র সাহেব?
বার্তাটা পাঠিয়ে সে ফোনটা দু’হাতে ধরে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইলো। ইরা পাশে বসে মুখ চেপে হাসছে মিনিটখানেকের মধ্যেই উত্তর এলো,

—জি। বলুন।
ইরা সঙ্গে সঙ্গে চাপা স্বরে বললো,
— উফ! কী ভদ্র! তাড়াতাড়ি পরেরটা দে।
বেলার ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠলো। সে আবার লিখলো,
— আপনি খুব হ্যান্ডসাম। এতো হ্যান্ডসাম কিভাবে হলেন?
বার্তাটা পড়েই ইরা এমনভাবে হেসে উঠলো যে বেলা তাড়াতাড়ি তার মুখ চেপে ধরলো।
—চুপ! কেউ শুনে ফেলবে!
ইরা বালিশে মুখ গুঁজে হাসতে হাসতে বললো,
—না না, এটা একদম ঠিক হয়েছে। এখন দেখি তোর হিটলার ভাই কী বলে!
ওপাশ থেকে উত্তর আসতে একটু সময় নিলো। তারপর ভেসে উঠলো,
— কারন আমি ছোটবেলা থেকেই হ্যান্ডসাম। আর আপনি এসব জানতে এতো রাতে আমাকে ডিস্টার্ব করছেন?
বেলা মুখ বাঁকিয়ে বললো,

— দেখছিস? ভাবটা দেখ! একটু সুনাম করেছি তাই ভাব ভেরে গেছে।
ইরা বললো,
— ভাব থাক, তুই থামবি না। এবার একটু অন্যকিছু লিখ।
বেলা আঙুল চালিয়ে রোমান্টিক ভাইবে লিখলো,
—আমি আপনার ভিকটিম হতে চাই সায়র সাহেব।
বার্তাটা যেতেই ইরা বিছানায় ধপাস করে পড়ে গেলো হাসতে হাসতে বললো,
— বেলা! তুই একদিন আমাকে হাসাতে হাসাতে শেষ করে দিবি!
বেলা নিজেও হাসি চেপে রাখতে পারলো না। বুকের ভেতরটা কেমন ধুকপুক করছে, কিন্তু সেই ধুকপুকানির মধ্যেই সে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইলো। একটু পর উত্তর এলো,
—ভিকটিম হওয়ার শখ জাগলো কেন এতো রাতে?
ইরা বললো
— অসহ্য কী মানুষ রে বাবা! না, এইবার আরও জ্বা’লা।
বেলা ভুরু তুলে বললো,

— অবশ্যই জ্বা’লাবো।
সে আবার লিখলো,
—আপনার বাচ্চা কিন্তু খুব শীঘ্রই পৃথিবীতে এসে পড়বে।
এইবার উত্তর আসতে একটু দেরি হলো। বেলা আর ইরা দু’জনেই স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইলো। তারপর সায়রের উত্তর ভেসে উঠলো,
— পৃথিবীতে আসলে ব্যাগপত্র গুছিয়ে মঙ্গল গ্রহে পাঠিয়ে দিয়েন। সাথে পারলে আপনিও চলে যাবেন।
বেলা আর ইরা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো দুজন দুজনের দিকে। তারপর হো হো করে হেঁসে উঠলো। বেলা আরো কিছু লিখলো কিন্তু সায়রের আইডি থেকে আর রিপ্লাই এলো না। হয়তো লোকটা রেগে গেছেন ওর উল্টাপাল্টা মেসেজ দেখে।সে আর উল্টাপাল্টা কিছু না লিখে শুধু ছোট্ট করে পাঠালো,
— শুভরাত্রি, সায়র সাহেব।

মেসেজটা পাঠিয়ে ফোনটা আস্তে করে বুকের কাছে টেনে নিলো বেলা। ঠোঁটের কোণে তখনও খুব ক্ষীণ একটু হাসি লেগে আছে। পাশেই ইরা শুয়ে হালকা হেসে কী একটা বলছিলো, কিন্তু বেলার মন তখন ধীরে ধীরে অন্য এক শান্ত নীরবতায় ডুবে যাচ্ছে। সে চুপচাপ চোখ বুজে রইলো।
অদ্ভুতভাবে আজ রাতটাকে অনেক হালকা লাগছে তার। সারাদিনের এতসব অস্থিরতা, বুকের ভেতর জমে থাকা সায়রের প্রতি তার এলোমেলো অবাধ্য অনূভুতিগুলো । সবকিছুর ভেতরেও এই ছোট্ট কথোপকথনটুকু যেন তার মনকে আলতো করে ছুঁয়ে দিলো। হোক না সেটা ফেক আইডির আড়াল থেকে, হোক না সব কথাই দুষ্টুমি আর উল্টাপাল্টা ঠাট্টায় ভরা।তবু দিনের শেষে এই মানুষটার সঙ্গে দু’চারটা মন খুলে কথা বলতে পারাটুকুই বেলার কাছে অদ্ভুত এক স্বস্তি এনে দেয় ।

র‌ইলো প্রেমের নিমন্ত্রণ পর্ব ১২

কিন্তু ঠিক তখনই আচমকা তার মনে পড়ে গেলো সায়রের ফোনের স্ক্রিনে ভেসে ওঠা সেই ছবিটার কথা। বুকের ভেতরটা আবার কেমন ধক করে উঠলো। সত্যিই কি ওটা তারই ছবি ছিলো? স্পস্ট দেখতে পায়নি। তবু এখন মনে হচ্ছে, ওটা বোধহয় সত্যিই তারই ছবি। কিন্তু যদি তাই হয়, তাহলে সায়র ছবিটা তুললো কেন?আর লুকিয়েই বা রাখলো কেন? মানুষটা তো তাকে খুব একটা পছন্দই করে না, অন্তত বেলার সবসময় তাই মনে হয়েছে। তাহলে হঠাৎ তার ছবি সায়রের ফোনে থাকবে কেন? প্রশ্নগুলো আবার ধীরে ধীরে মাথার ভেতর কিলবিল করে উঠতেই বেলা ধড়মড় করে উঠে বসলো। শেষমেশ সে নিঃশব্দে দীর্ঘশ্বাস ফেললো। না, সুযোগ পেলেই সায়র ভাইকে জিজ্ঞেস করতেই হবে।তার ছবিটা কেন তুলেছিলো সে।

র‌ইলো প্রেমের নিমন্ত্রণ পর্ব ১৪