রইলো প্রেমের নিমন্ত্রণ পর্ব ২০
ইয়ুশরা রিমু
আজ সকালের রোদটা আজ যেন অন্যদিনের তুলনায় অনেক স্নিগ্ধ। জানালার সাদা পর্দা ভেদ করে আসা সোনালি আলো ধীরে ধীরে বেলার মুখের ওপর পড়ছে। টেবিলের ওপর সুন্দর করে সাজিয়ে রাখা ডাক্তার লেখা ওষুধ, এক গ্লাস পানি আর আধখাওয়া স্যুপের বাটি। সব মিলিয়ে পুরো ঘরটা যেন বলে দিচ্ছে, এই বাড়ির সবাই এখন এক মানুষকেই ঘিরে চিন্তায় আছে।
বেলা আধখোলা চোখে ছাদের দিকে তাকিয়ে রইলো। শরীরটা এখনও দুর্বল। মাথাটা কেমন ভার লাগছে। গতকালের ঘটনাগুলো মনে পড়তেই বুকের ভেতরটা আবারও কেঁপে উঠলো।ঠিক তখনই দরজা আলতো করে খুলে ভেতরে ঢুকলেন নাজনীন সুলতানা। হাতে গরম দুধ আর হালকা নাস্তার ট্রে।বিছানার পাশে বসে মেয়ের কপালে হাত রাখলেন।
— এখন কেমন লাগছে মা?
বেলা মৃদু হেসে বললো,
—অনেকটা ভালো আছি, আম্মু।
নাজনীন সুলতানা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
— ভালো থাকলেই হবে না। নিজের শরীরেরও যত্ন নিতে হয়। পড়াশোনা করতে হবে, সেটা ঠিক আছে। কিন্তু পড়াশোনার জন্য নিজের জীবনটাই যদি শেষ করে ফেলিস, তাহলে সেই পড়াশোনার মূল্য কী?নাকি আমি একটু বকাবকি করি দেখে এতো পড়ালেখা চাপ নিচ্ছিস মা?
বেলা মাথা নিচু করে রইলো।এরই মধ্যে বাশার খান, সারোয়ার খান আর বিহানও ঘরে ঢুকলেন।বিহান এসে বোনের মাথায় আলতো একটা টোকা দিয়ে বললো,
—এই পাগলি, তুই কি আমাদের সবাইকে টেনশন দেওয়ার প্ল্যান করেছিলি?
বেলা একটূলজ্জা পেয়ে নিচের দিকে তাকিয়ে রইলো।বাশার খান গম্ভীর অথচ স্নেহমাখা কণ্ঠে বললেন,
—শোন মা, জীবনে ভালো রেজাল্ট করাটা বড় কথা নয়। মানুষের সুস্থ থাকা তার থেকেও বড় কথা। যতটুকু পারিস, মন দিয়ে চেষ্টা করবি। কিন্তু নিজের শরীর আর মনকে কষ্ট দিয়ে নয়।
সারোয়ার খানও মৃদু হেসে বললেন,
— পৃথিবীতে এমন কোনো পরীক্ষা নেই, যেটার জন্য নিজের জীবনকে ঝুঁ’কির মধ্যে ফেলতে হয়। সফলতা ধীরে ধীরে আসে। নিজের মেধা অনুযায়ী চেষ্টা করবি। বাকিটা আল্লাহর ওপর ছেড়ে দিবি।
বেলার চোখ ভিজে উঠলো। পরিবারের সবাই তাকে নিয়ে কতোটা চিন্তা করে। আর সে কি-না এমন একটা মানুষের কথা চিন্তা করে নিজেকে কষ্ট দিচ্ছে ।যে কিনা তাকে এখন পর্যন্ত একটি বারের জন্য ও দেখতে আসেনি। সে আস্তে করে সবার সামনে বললো,
—আমি আর এমন করবো না।
নাজনীন সুলতানা মেয়েকে বুকের সঙ্গে জড়িয়ে ধরে বললেন,
— শুধু বিশ্রাম নিবি। এটা কিন্তু আমাদের সবার আদেশ। কোনো লাফালাফি আর পড়াশোনার প্রয়োজন নেই।
বিহান সঙ্গে সঙ্গে হেসে বললো,
— আর যদি লুকিয়ে পড়তে বসিস, তাহলে বইগুলো আমি বিক্রি করে ফেলবো। যদিও জানি তুই পড়বিনা। কারন পড়ার থেকে বেশি তুই পড়ালেখা নিয়ে টেনশন করিস।
বিহানের কথা শুনে অনেকক্ষণ পর বেলার ঠোঁটে একটুখানি স্বাভাবিক হাসি ফুটে উঠলো।
সারাদিন বাড়ির সবাই প্রায় পালা করে বেলার খোঁজ নিলো। কেউ ফল কে’টে দিলো, কেউ জুস বানিয়ে আনলো, কেউ আবার ওষুধ খেতে মনে করিয়ে দিলো।
বিকেলের দিকে সূর্যের আলো ধীরে ধীরে নরম হয়ে এলো। জানালার বাইরে শিউলি গাছের ডালগুলো বাতাসে আস্তে আস্তে দুলছে। দূরে পাখিরা বাসায় ফিরছে।আর বেলা বিছানায় আধশোয়া হয়ে জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিলো।ঠিক তখনই দরজায় খুব আস্তে একটা নক শোনা গেলো।টোকাটা এতটাই পরিচিত ছিলো যে, না দেখেও সে বুঝে গেলো কে এসেছে।
দরজা খুলে ভেতরে ঢুকলো সায়র।আজ তার মুখে সেই চিরচেনা কঠোরতার বদলে অদ্ভুত এক নীরবতা। কালো শার্টের হাতা কনুই পর্যন্ত গোটানো। চোখ দুটোতে সারারাতের ক্লান্তির স্পষ্ট ছাপ।সে ধীরে ধীরে বিছানার পাশে এসে দাঁড়ালো।কয়েক মুহূর্ত কেউ কোনো কথা বললো না। ঘরজুড়ে শুধু দেয়ালঘড়ির টিকটিক শব্দ।সায়র প্রথমে বেলার মুখের দিকে তাকালো। তারপর খুব শান্ত স্বরে বললো,
— এখন কেমন আছিস?
বেলা চোখ নামিয়ে আস্তে বললো,
— অনেকটাই ভালো।
সায়র যেন নিশ্চিত হতে চাইলো।
— মাথা ঘুরছে?
—-না।
—দুর্বল লাগছে?
বেলা হালকা মাথা নাড়লো।সায়র কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো। তারপর টেবিলের ওপর রাখা ওষুধের দিকে তাকিয়ে বললো,
–সময়মতো খেয়েছিস?
বেলা ছোট্ট করে বললো,
— হ্যাঁ।
আবার নীরবতা।দুজনের মাঝখানে হাজারটা অপ্রকাশিত কথা জমে আছে, অথচ কেউই সেগুলো উচ্চারণ করার সাহস পাচ্ছে না।একসময় সায়র খুব ধীরে বললো,
–কাল খুব ভয় পাইয়ে দিয়েছিলি।
কথাটা শুনে বেলার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠলো।সে ধীরে ধীরে মুখ তুলে তাকালো।প্রথমবার সে স্পষ্ট দেখলো সায়রের চোখ দুটো লাল। যেন দীর্ঘ সময়ের দুশ্চিন্তা এখনও পুরোপুরি কা’টেনি।সায়র দৃষ্টি সরিয়ে নিয়ে নিচু স্বরে বললো,
—আর কখনও এমনভাবে নিজের যত্ন না নিয়ে থাকবি না। নিজের শরীরের ওপর এতটা অবিচার করার অধিকার তোর নেই।
বেলার চোখ আবার ভিজে উঠলো।সে খুব আস্তে বললো,
—চেষ্টা করবো।
সায়র হালকা দীর্ঘশ্বাস ফেললো।বিছানার পাশে রাখা জগ থেকে গ্লাসে পানি ঢেলে বেলার দিকে বাড়িয়ে দিলো।
— আগে পানি খা।
সায়রের এই এক স্বভাব বেলাকে সামনে পেলেই বলবে পানি পান কর। না পান করলেও ধমকাবে । বেলা গ্লাসটা নিতে গিয়ে দুর্বল হাতে ঠিকমতো ধরতে পারলো না। গ্লাসটা কেঁপে উঠতেই সায়র দ্রুত আরেক হাত দিয়ে গ্লাসটা সামলে দিলো।এক মুহূর্তের জন্য দুজনের আঙুল ছুঁয়ে গেলো।সময়টা খুব ছোট ছিলো, কিন্তু সেই ক্ষণিকের স্পর্শে দুজনেই অদ্ভুতভাবে থমকে গেলো।বেলা দ্রুত হাত সরিয়ে নিল। গাল দুটো অকারণেই লাল হয়ে উঠলো।সায়রও স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করে ধীরে বললো,
— সাবধানে।
বেলা ছোট ছোট চুমুকে পানি পান করলো।গ্লাসটা টেবিলে রেখে সায়র দরজার দিকে কয়েক পা এগিয়ে গেলো।দরজার কাছে গিয়ে আবার থামলো।পেছন ফিরে না তাকিয়েই শান্ত কণ্ঠে বললো,
—বিশ্রাম নে। আর একটা কথা মনে রাখবি সবসময়। কারো জন্য নিজেকে হারিয়ে ফেলা কখনও জয়ের কাজ নয়।
কথাটা বলে সে ধীরে ধীরে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো।দরজা বন্ধ হওয়ার পরও বেলা অনেকক্ষণ সেদিকেই তাকিয়ে রইলো।তার ঠোঁটের কোণে অজান্তেই একফোঁটা হাসি ফুটে উঠলো।কিন্তু সেই হাসির আড়ালেও লুকিয়ে ছিল হাজারটা না বলা অনুভূতি, যার ভাষা হয়তো এখনও সময়ের কাছেই বন্দি।
পরদিন সকালে বেলার শরীর আগের চেয়ে অনেকটাই ভালো লাগছিল। দুর্বলতা পুরোপুরি না কাটলেও মুখে আগের সেই প্রাণচাঞ্চল্য ধীরে ধীরে ফিরে আসছিল।
নাস্তার টেবিলে সবাই একসঙ্গে বসে ছিলো। নাজনীন সুলতানা বারবার বলে দিচ্ছিলেন,
—শরীর খারাপ লাগলে কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে বাসায় চলে আসবি। এই বলে দিলাম আমি।
বেলা হালকা হেসে মাথা নাড়লো।ঠিক তখনই বাশার খান গম্ভীর গলায় বললেন,
— আর একটা কথা। আজ থেকে কিছুদিন বেলা একা কলেজে যাবে না। সায়র, তুই ওকে নিয়ে যাবি, আবার নিয়ে আসবিও।
সায়র শান্তভাবে মাথা নাড়ল।
— আচ্ছা, চাচ্চু।
বেলা একবার চুপিচুপি সায়রের দিকে তাকালো। সায়র তখন স্বাভাবিক ভঙ্গিতেই নাস্তা করছিলো।কিছুক্ষণ পর দুজন বাইকে করে কলেজের উদ্দেশ্যে বের হলো
আজকের পথটা যেন অন্যরকম লাগছিলো।সকালের শীতল বাতাস, রাস্তার দুই পাশে সারি সারি গাছ, আর মাঝেমধ্যে উড়ে যাওয়া সাদা বক সব মিলিয়ে পরিবেশটা ছিলো শান্ত।সায়র খুব ধীরগতিতে বাইক চালাচ্ছিলো।মাঝপথে একবার শুধু বললো,
—শরীর খারাপ লাগলে সঙ্গে সঙ্গে বলবি আমাকে।
বেলা ছোট্ট করে উত্তর দিলো,
— জি।
তারপর আবার দুজনেই নীরব।কিন্তু সেই নীরবতায়ও অদ্ভুত এক স্বস্তি ছিলো।কলেজে পৌঁছাতেই ইরা প্রায় দৌড়ে এসে বেলাকে জড়িয়ে ধরলো,
— আল্লাহ্! তুই ঠিক আছিস তো? জানিস, গতকাল আন্টির কাছে যেনো কী ভ’য় পেয়েছিলাম!
বেলা হেসে বললো,
— আরে আমি এখন একদম ঠিক আছি।
ইরা মুখ ফুলিয়ে বললো,
— ঠিক আছিস আবার! আর একবার এমন করলে কিন্তু তোকে আমি নিজেই হাসপাতালে ভর্তি করে রাখবো।
দুজনেই হেসে উঠলো।ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে গল্প, খুনসুটি, ক্যান্টিনে বসে ঝালমুড়ি ভাগাভাগি করে খাওয়ার পর বেলার মুখে প্রাণ খুলে মুখে হাসি ফুটে উঠলো
ইরা মনে মনে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো।
দুপুরের শেষ ক্লাস শেষ হতেই কলেজের মাইক থেকে ঘোষণা ভেসে এলো,
—সম্মানিত শিক্ষক-শিক্ষার্থী সবাইকে জানানো যাচ্ছে যে আগামী রবিবার আমাদের কলেজে বার্ষিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে। অনুষ্ঠান উপলক্ষে তার আগের দিন, অর্থাৎ শনিবার কলেজের সকল কার্যক্রম বন্ধ থাকবে। অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের আগামীকাল থেকেই নাম নিবন্ধনের জন্য সাংস্কৃতিক কমিটির সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলা হচ্ছে।
ঘোষণা শেষ হতেই পুরো কলেজজুড়ে আনন্দের রেশ ছড়িয়ে পড়লো।ইরা উ”ত্তেজিত হয়ে বেলার হাত চেপে ধরে বললো,
—-ইয়েস! অবশেষে কালচারাল প্রোগ্রাম!
বেলার চোখও আনন্দে চকচক করে উঠলো,
—-অনেকদিন পর এমন একটা অনুষ্ঠান হবে!
ইরা আর এক মুহূর্ত দেরি না করে পরিকল্পনা শুরু করে দিল।
— শুন, আমরা কিন্তু এবার শাড়ি পরেই আসবো।
বেলা মুচকি হেসে বললো,
—আমিও সেটাই ভাবছিলাম।
—আমি প্যাস্টেল নীল জামদানি পরবো। সঙ্গে সিলভার ঝুমকা।
বেলা একটু ভেবে বললো,
—আমি হয়তো সাদা-লাল না বা হালকা বেগুনি শাড়ি পরবো।
ইরা হাততালি দিয়ে উঠলো,
—- অসাধারণ! তারপর আমরা একসঙ্গে অনেক ছবি তুলবো। পুরো ক্যাম্পাস ঘুরবো। ফুচকা খাব, আইসক্রিম খাবো, রিল বানাবো, গ্রুপ সেলফি তুলবো। এত ছবি তুলবো যে ফোনের মেমোরিই ফুল হয়ে যাবে!
বেলা হেসে ফেললো,
—আর অনুষ্ঠান শেষে সবাই মিলে গান শুনবো, নাচ দেখবো। কত মজা হবে!
দুজনের চোখেই তখন শিশুসুলভ উচ্ছ্বাস।তারা বুঝতেই পারলো না, কিছু দূরে দাঁড়িয়ে কেউ তাদের প্রতিটি হাসি, প্রতিটি আনন্দ গভীর বিদ্বেষ নিয়ে দেখছে।
তানিয়া।তার ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে এক বাঁকা হাসি ফুটে উঠলো।সে নিচু স্বরে নিজের মনেই বললো,
—খুব খুশি হয়েছিস, তাই না বেলা? হোক এই আনন্দ বেশিক্ষণ থাকবে না।
তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা দুই বান্ধবীর দিকে তাকিয়ে সে আরও নিচু গলায় বলল,
—সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের দিনই হবে আসল খেলা। এমন একটা ফাঁ’দ পাতবো, যেখান থেকে বেলা চাইলেও নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে পারবে না।
তিনজনের চোখে তখন একই রকম ষড়যন্ত্রের ঝিলিক।
বিকেলের নরম আলো তখন ধীরে ধীরে পুরো বাড়িটাকে সোনালি আভায় রাঙিয়ে দিচ্ছে। বেলা দুতলা থেকে ভেতরে মুখভরা হাসি নিয়ে এক দৌড়ে রান্নাঘরের দিকে চলে গেলো,
—আম্মুউউউউ কোথায় তুমি?
নাজনীন সুলতানা হাঁড়িতে নাড়তে নাড়তে মুচকি হেসে বললেন,
—- এই তো রান্নাঘরে। কী হয়েছে? আজকে দেখি আমার মেয়েটার মুখে এত হাসি কেন?
বেলা ঠোঁট ফুলিয়ে একদম ছোট্ট বাচ্চাদের মতো গলায় বলল,
— আম্মু, আমার একটা শাড়ি লাগবে। খুব সুন্দর একটা শাড়ি। আমাকে কিনে দিবে?
নাজনীন সুলতানা অবাক হয়ে হেসে ফেললেন।
—- হঠাৎ শাড়ির শখ হলো?
বেলা একটু লজ্জা পেয়ে বললো,
— কলেজে সামনের সপ্তাহে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হবে। সবাই শাড়ি পরে আসবে। আমিও একটা সুন্দর শাড়ি পরতে চাই। প্লিজ আম্মু।
নাজনীন সুলতানা স্নেহভরা চোখে মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
—আমি কি না করেছি কখনো? কিন্তু এখন সমস্যাটা হলো বাড়িতে তো কোনো পুরুষ মানুষ নেই। তোর বাবা ব্যবসার কাজে বাইরে। বিহানও কোথায় যেন গেলো। আমি তোকে একা পাঠাতেও পারবো না।
বেলার মুখটা মুহূর্তেই মলিন হয়ে গেল।
— তাহলে আমার শাড়ি পড়া হবে না?
ঠিক তখনই বাইরে মোটরসাইকেলের শব্দ ভেসে এলো।বেলা জানালার ফাঁক দিয়ে তাকিয়েই বুঝে গেলো।সায়র এসেছে। সেও বেরিয়ে ছিলো কোথায় যেন। বেলার বুকের ভেতরটা কেমন যেন ধক করে উঠলো।নাজনীন সুলতানা একটু ভেবে মৃদু হেসে বললেন,
— সায়র তো এসেছে। ওকে বলি না? তোকে নিয়ে গিয়ে একটা শাড়ি কিনে আনুক।
বেলা লজ্জায় একদম লাল হয়ে গেল।
—- না না আম্মু উনি কেন যাবেন?
—কেন যাবে না? নিজের মানুষই তো। তাছাড়া ওর চয়েস ও ভালো। সুন্দর একটা শাড়ি বেছে দিতে পারবে।
ঠিক তখনই সায়র ভেতরে ঢুকলো।নাজনীন সুলতানা মুচকি হেসে বললেন,
— বাবা, একটা কাজ ছিলো।
— জি, বলো চাচি।
— বেলার একটা শাড়ি লাগবে। বাড়িতে কেউ নেই। তুমি যদি ওকে নিয়ে গিয়ে একটা কিনে দিতে মার্কেট এ নিয়ে?
সায়র একবার বেলার দিকে তাকালো।বেলা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। লজ্জায় যেন মাটির সঙ্গে মিশে যেতে চাইছে।সায়র শান্ত স্বরে বললো,
—ঠিক আছে। ফ্রেশ হয়ে বের হই। বেশি দেরি করবো না।
বেলার বুকের ভেতরটা আনন্দে ভরে উঠলেও মুখে কিছুই প্রকাশ করল না।শুধু আস্তে করে বললো,
— জি।
আধঘণ্টা পরে।বেলা হালকা আকাশি রঙের থ্রি-পিস পরে বের হলো। চুলগুলো সুন্দর করে আঁচড়ে খোলা রেখেছে। মুখে একটুও বাড়তি সাজ নেই, তবুও তাকে অদ্ভুত সুন্দর লাগছে।সায়র বাইকের পাশে দাঁড়িয়ে ছিলো।একবার তাকিয়েই কয়েক সেকেন্ডের জন্য চোখ স্থির হয়ে গেলো।তবে পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিলো।
— রেডি?
বেলা ছোট্ট করে মাথা নাড়লো।বাইক চলতে শুরু করলো।
বিকেলের বাতাস বারবার বেলার ওড়নাটা উড়িয়ে দিচ্ছিলো। সে এক হাতে ওড়না সামলাচ্ছে, আরেক হাতে সাবধানে সিট ধরে বসে আছে।সায়র রিয়ার ভিউ মিররে কয়েকবার তাকিয়ে দেখলো, বেলা ঠিকমতো বসেছে কি না।একসময় বললো,
—ভয় লাগছে?
— না।
— তাহলে এত দূরে বসে আছিস কেন? রাস্তা একটু খারাপ সামনে। এখন তুই অসুস্থ একটু ধরে বস।
বেলা আরও লজ্জা পেয়ে ধীরে ধীরে একটু সামনে এগিয়ে বসলো।সায়রের ঠোঁটের কোণে অদৃশ্য একটুখানি হাসি ফুটে উঠলো।
শপিং মলে ঢুকতেই চারপাশে রঙিন শাড়ির সমারোহ।বেলা বিস্ময়ে চারদিকে তাকিয়ে আছে।সায়র বললো,
— যেটা পছন্দ হয় দেখ।
বেলা একটার পর একটা শাড়ি দেখছে।কিন্তু কোনোটা হাতে নিয়েই আবার রেখে দিচ্ছে।সায়র বুঝে গেলো।সে বললো,
—তোর পছন্দ হচ্ছে না??
— না আসলে বুঝতে পারছি না কোনটা নিবো।
সায়র বিক্রেতার দিকে তাকিয়ে বললো,
—হালকা রঙের, এলিগেন্ট কিছু দেখান।
কিছুক্ষণ পর বিক্রেতা একটা সাদা রঙের শাড়ি বের করলো। তার উপর হালকা লাল আর রূপালি কাজ।সায়র শাড়িটার দিকে তাকিয়েই বললো,
— এটা দেখান।
বেলা শাড়িটার দিকে তাকিয়ে যেন চোখ ফেরাতে পারলো না।খুব আস্তে বললো,
— খুব সুন্দর।
সায়র তার দিকে তাকিয়ে বললো,
— তোর এটা খুব মানাবে।
এই একটুকু কথাতেই বেলার গাল দুটো টুকটুকে লাল হয়ে উঠলো।সে আর চোখ তুলতে পারলো না।বিক্রেতা হেসে বললো,
— আপু, ভাইয়ার পছন্দ কিন্তু খুব ভালো।
বেলা লজ্জায় কিছু বললো না।আর সায়রও শুধু হালকা কেশে অন্যদিকে তাকিয়ে রইলো।শাড়িটা প্যাকেট করে দেওয়া হলো।বেলা নিজের ব্যাগ থেকে টাকা বের করতে যেতেই সায়র শান্ত গলায় বললো,
— রাখ ইডিয়েট।
— কিন্তু..
— টাকা বেশি হয়ে গেছে?
— না । আসলে আম্মু দিয়ে দিয়েছিলো।
— আমি দিচ্ছি। এটা নিয়ে তর্ক করবি না।
বেলা আর কিছু বলতে পারল না।শুধু নিচু স্বরে বললো,
— ধন্যবাদ।
সায়র মৃদু হেসে উত্তর দিলো,
— ধন্যবাদ বলার দরকার নেই।
রইলো প্রেমের নিমন্ত্রণ পর্ব ১৯
দোকান থেকে বেরিয়ে দুজনেই পাশাপাশি হাঁটছিলো। সন্ধ্যার নরম আলো কাঁচের দেয়ালে প্রতিফলিত হয়ে চারপাশকে আরও সুন্দর করে তুলেছে।বেলার হাতে নতুন শাড়ির প্যাকেট। সে বারবার সেটার দিকে তাকাচ্ছে, আবার অজান্তেই সায়রের দিকে এক ঝলক তাকিয়ে নিচ্ছে।আর সায়র সে কিছুই বলছে না। শুধু খুব অদৃশ্যভাবে খেয়াল রাখছে বেলা যেন ভিড়ে হারিয়ে না যায়, যেন হোঁচট না খায়, যেন তার মুখের সেই ছোট্ট হাসিটুকু মুছে না যায়।ফেরার পথে দুজনের মধ্যে খুব বেশি কথা হলো না। তবুও সেই নীরবতার মধ্যেই ছিল এক অদ্ভুত প্রশান্তি, এক অঘোষিত টান । যা শব্দে প্রকাশ করা যায় না, শুধু অনুভব করা যায়।
