রইলো প্রেমের নিমন্ত্রণ পর্ব ২৮
ইয়ুশরা রিমু
ডাইনিং টেবিলের ভারী পরিবেশটা অনেকক্ষণ পর্যন্ত কারও মন থেকেই সরে গেলো না। সকালের নরম রোদ জানালার কাঁচ ভেদ করে ঘরের ভেতর ছড়িয়ে পড়লেও, সেই আলো যেন উপস্থিত কারও মুখেই কোনো উজ্জ্বলতা এনে দিতে পারলো না। প্রত্যেকে নিজের নিজের চিন্তায় ডুবে ছিলো। কয়েক মিনিট আগেই সারোয়ার খানের নেওয়া সিদ্ধান্ত যেন পুরো বাড়ির বাতাসটাই বদলে দিয়েছে।
বেলা নিঃশব্দে নিজের সামনে রাখা নাস্তার প্লেটটার দিকে তাকিয়ে বসে ছিলো। খাওয়ার ইচ্ছেটা অনেক আগেই হারিয়ে গেছে। তার মনে হচ্ছে, একের পর এক নতুন নতুন পরিস্থিতির সামনে দাঁড়াতে হচ্ছে তাকে। কোনোটার জন্যই সে মানসিকভাবে প্রস্তুত নয়। তবুও মুখ তুলে প্রতিবাদ করার সাহস তার হলো না। বড়দের সিদ্ধান্তের সামনে মাথা নত করা ছাড়া যেন আর কোনো পথ খোলা নেই।
অন্যদিকে সায়রও খুব বেশি কথা বললো না। বাবার সিদ্ধান্তের পেছনের কারণ সে ভালোভাবেই বুঝতে পারছে। তবুও তার মনে একটাই চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে বেলা যেন এই সিদ্ধান্তের কারণে আরও অস্বস্তিতে না পড়ে। গত কয়েকদিনে সে বুঝে গেছে, মেয়েটার মনে যতটা ভয়, তার চেয়েও বেশি সংকোচ কাজ করছে।
নাস্তা শেষ করে সবাই ধীরে ধীরে উঠে গেলো। বেলা খাওয়া শেষে ঘরের দিকে হাঁটতে শুরু করলো। ঠিক তখনই সায়র খুব ধীর পায়ে তার পাশে এসে দাঁড়ালো। চারপাশে আর কেউ নেই দেখে নিচু স্বরে বললো,
— একটু দাঁড়াবি?
বেলা থেমে গেলো। মাথা নিচু করেই দাঁড়িয়ে রইলো।
সায়র কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে শান্ত কণ্ঠে বললো,
–আব্বুর সিদ্ধান্ত নিয়ে তুই অস্বস্তিতে আছিস, আমি জানি।
বেলা কোনো উত্তর দিলো না।
সায়র আবার বললো,
—একটা কথা মনে রাখিস। একই ঘরে থাকলেই সবকিছু বদলে যাবে, এমনটা আমি কখনোই চাই না। তোর যতটুকু সময় দরকার, ততটুকুই পাবি। তোকে কোনোদিন এমন কোনো পরিস্থিতিতে ফেলবো না, যেখানে তুই অস্বস্তি বোধ করিস।
বেলা ধীরে ধীরে মাথা তুললো। সায়রের চোখে কোনো অস্বস্তিকর দাবি নেই। বরং ছিলো এক ধরনের আশ্বাস।
সে খুব আস্তে বললো,
—আমিআমি আপনাকে ভুল বুঝিনি।
সায়রের ঠোঁটে মৃদু হাসি ফুটে উঠলো,
—তাহলে আর কিছু নিয়ে চিন্তা করিস না।
কথাটা বলেই সে সরে গেলো। বেলা কিছুক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো।
অন্যদিকে নিজের কক্ষে ঢুকেই মমতাজ বেগমের মুখের সংযম ভেঙে গেলো। তিনি বিরক্ত হয়ে হাতে যা ছিলো সোফার ওপর ছুঁড়ে ফেলে বললেন,
—কোনো কিছুই আর আমার মতামতের দরকার পড়ে না এই বাড়িতে!
নিজের সঙ্গেই কথাগুলো বললেন তিনি।তার চোখের সামনে বারবার ভেসে উঠছিলো বেলার মুখটা। যতবার তিনি নিজেকে বোঝাতে চাইছেন যে সবকিছু মেনে নেবেন, ততবারই মনে হচ্ছে এই মেয়েটিই যেন ধীরে ধীরে তাঁর ছেলেকে তাঁর কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে।ঠিক সেই সময় মোবাইলটা বেজে উঠলো।স্ক্রিনে ভেসে উঠলো একটি পরিচিত নাম।রুপসা।মমতাজ বেগম সঙ্গে সঙ্গে ফোনটা রিসিভ করলেন।ওপাশ থেকে ভেসে এলো অনেকটা শান্ত, কিন্তু ভেতরে চাপা আ”গুন লুকিয়ে থাকা কণ্ঠ,
—আন্টি কেমন আছেন?
মমতাজ বেগম দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
—ভালো নেই, মা।
রুপসা কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে জিজ্ঞেস করলো,
—সায়র কেমন আছে?
প্রশ্নটা শুনেই মমতাজ বেগমের মুখ শক্ত হয়ে উঠলো।
—আজ আবার নতুন সিদ্ধান্ত হয়েছে। আজ থেকেই বেলাকে সায়রের ঘরে থাকতে বলা হয়েছে।
ওপাশে কিছুক্ষণ কোনো শব্দ শোনা গেলো না।তারপর খুব নিচু গলায় রুপসা বললো,
—এত তাড়াতাড়ি…?
—হ্যাঁ।
রুপসার হাতের আঙুলগুলো ধীরে ধীরে মুঠো হয়ে গেলো। চোখের কোণে আবারও পানি জমলেও এবার সেই পানির সঙ্গে মিশে ছিলো এক অদ্ভুত জেদ।সে ধীরে ধীরে বললো,
—আন্টি আমি এত সহজে হেরে যাওয়ার মেয়ে নই।
মমতাজ বেগম শান্ত স্বরে বললেন,
—আমিও চাই না, সবকিছু এত সহজে শেষ হয়ে যাক।
রুপসার চোখ দুটো কঠিন হয়ে উঠলো।
–একটা সম্পর্ক শুধু কাগজে-কলমে তৈরি হলেই সেটা সত্যিকারের সম্পর্ক হয়ে যায় না। মানুষের মনটাই আসল।
মমতাজ বেগম কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে বললেন,
—তাই কোনো তাড়াহুড়ো করবি না। ধৈর্য ধর। সময়ের অপেক্ষা কর।
রুপসা ধীরে ধীরে জানালার বাইরে তাকালো। দূরের আকাশে সাদা মেঘ ভেসে যাচ্ছে।তার ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে একটুকরো রহস্যময় হাসি ফুটে উঠলো,
—সময়ই যদি সব বদলে দিতে পারে। তাহলে সেই সময়কে নিজের পক্ষে আনতেও তো জানা লাগে, আন্টি।
মমতাজ বেগম নীরব রইলেন।
রুপসা খুব শান্ত কণ্ঠে আবার বললো,
—আমি কাউকে কষ্ট দিতে চাই না। কিন্তু নিজের ভালোবাসাকে লড়াই না করেই হারিয়ে যেতে দেবো না। আমি অপেক্ষা করবো একটা মোক্ষম সুযোগের।
ফোন কে’টে যাওয়ার পর ঘরের ভেতর আবারও নীরবতা নেমে এলো।কিন্তু সেই নীরবতার আড়ালে অদৃশ্যভাবে শুরু হয়ে গেলো নতুন এক অধ্যায়।একদিকে ধীরে ধীরে বিশ্বাসের সেতু গড়ে উঠছে সায়র আর বেলার মধ্যে ।অন্যদিকে ঈর্ষা, অভিমান আর অপূর্ণ ভালোবাসা মিলেমিশে জন্ম নিচ্ছে এমন এক ঝড়ের, যার আঁচ হয়তো খুব শিগগিরই পৌঁছে যাবে খান বাড়ির প্রতিটি মানুষের জীবনে।
বিকেলের নরম আলো ধীরে ধীরে খান বাড়ির চারপাশে ছড়িয়ে পড়েছে। বাগানের নানা রঙের ফুলগুলো বাতাসে দুলছে, দূরে কোথাও নাম না-জানা পাখির ডাক ভেসে আসছে। অথচ বাড়ির ভেতরের পরিবেশটা এখনও অদ্ভুত রকমের নীরব।
নিজের ঘরে বসে আলমারির সামনে অনেকক্ষণ নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে রইলো বেলা। আলমারির ভেতরে গুছিয়ে রাখা কাপড়গুলোর দিকে তাকিয়ে তার বুকের ভেতরটা আবারও কেমন করে উঠলো। এই ঘরটা শুধু একটা ঘর নয়, ছোটবেলা থেকে অসংখ্য স্মৃতির সাক্ষী। এই বিছানা, এই জানালা, এই বুকশেলফ সবকিছুর সঙ্গে জড়িয়ে আছে তার হাসি, কান্না, অভিমান, স্বপ্ন।
আজ সেসব ছেড়ে অন্য একটি ঘরে যেতে হবে। যদিও সেই ঘরটা তার রুম থেকে কয়েক রুম পরেই, তবুও মনের ভেতরের সংকোচ কিছুতেই কমছে না।খুব ধীরে আলমারির দরজা খুলে একে একে কয়েকটি শাড়ি, কিছু থ্রি-পিস, আর প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র বের করতে লাগলো সে।ঠিক তখনই দরজায় নরম শব্দ হলো।টক… টক…।বেলা ফিরে তাকাতেই দেখলো, নাজনীন সুলতানা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন।মুখে মমতাভরা হাসি, কিন্তু সেই হাসির আড়ালেও স্পষ্ট উদ্বেগের ছাপ।তিনি ধীরে ধীরে ঘরের ভেতরে এসে বেলার মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে দিলেন,
–কী করছিস, মা?
বেলা জোর করে ছোট্ট একটা হাসি ফুটিয়ে বললো,
—জিনিসপত্র গুছাচ্ছি, আম্মু।
নাজনীন সুলতানা কিছুক্ষণ চুপ করে মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর খুব আস্তে বললেন,
—মন খারাপ করছে?
এই একটি প্রশ্নেই যেন বেলার বুকের ভেতরের সমস্ত শক্ত হয়ে থাকা অনুভূতিগুলো নড়ে উঠলো।তবুও সে নিজেকে সামলে নিয়ে মৃদু হেসে বললো,
—না তো।
মা মেয়ের চোখের দিকে তাকিয়েই বুঝে গেলেন, এই “না”-এর ভেতরে কতটা কষ্ট লুকিয়ে আছে।তিনি ধীরে বেলাকে নিজের বুকে টেনে নিলেন।
—মায়ের কাছে মিথ্যে বলতে নেই।
এই কথাটুকু শুনেই বেলার চোখ ভিজে উঠলো। সে মাথাটা মায়ের কাঁধে রেখে কিছুক্ষণ নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে রইলো।
নাজনীন সুলতানা নরম কণ্ঠে বললেন,
—-প্রতিটা মেয়ের জীবনেই একটা সময় আসে, যখন নিজের পরিচিত জায়গা ছেড়ে নতুন একটা জীবনের দিকে এগিয়ে যেতে হয়। তোরও সেই সময় এসেছে। ভয় পাবি না। আর তুই তো অন্য বাড়িতে যাচ্ছিস না। আল্লাহ ভালো মানুষের সঙ্গেই তোকে বেঁধেছেন।
বেলা খুব আস্তে বললো,
—আমি মানুষটাকে নিয়ে ভয় পাই না, আম্মু।
–তাহলে?
—আমি ভয় পাই চাচি হয়তো তোমার সঙ্গে আবারো খারাপ ব্যবহার করবে চাচ্চুর এই সিদ্ধান্তের জন্য।আর চাচি আমাকেও আবারো ভুল বুঝবে।
নাজনীন সুলতানা মেয়ের দুই গাল নিজের হাতে ধরে বললেন,
—সব মানুষের মন একদিনে জয় করা যায় না, মা। ধৈর্য ধরতে হয়। তুই নিজের ব্যবহারটা যেমন আছে তেমনই রাখিস। একদিন দেখবি, যারা আজ তোকে দূরে ঠেলে দিচ্ছে, তারাই তোকে ছাড়া থাকতে পারবে না।
বেলা মায়ের কথাগুলো মন দিয়ে শুনলো।তারপর খুব আস্তে মাথা নাড়লো।ঠিক তখনই বাইরে থেকে বিহানের গলা শোনা গেলো,
–এই বালুর কনা! এতক্ষণ ধরে কী করছিস?
বেলা চোখের পানি তাড়াতাড়ি মুছে ফেললো।
দরজা খুলতেই বিহান ভেতরে ঢুকে চারদিকে তাকিয়ে নাটকীয় মুখ করে বললো,
—ওহ! দেখি তো, একেবারে ঘর বদলির প্রস্তুতি চলছে!
বেলার মুখটা একটু লজ্জায় লাল হয়ে উঠলো।বিহান মুচকি হেসে বললো,
—আচ্ছা, এত লজ্জা পাচ্ছিস কেন? একই বাড়ির এক ঘর থেকে আরেক ঘরেই তো যাচ্ছিস। বিদেশে তো আর পাঠিয়ে দিচ্ছে না!
নাজনীন সুলতানা হেসে ফেললেন।বেলার মুখেও একটুখানি স্বাভাবিক হাসি ফুটে উঠলো।বিহান ইচ্ছে করেই পরিবেশটা হালকা করতে লাগলো। বিহান বললো,
—চল, ব্যাগগুলো আমাকে দে। তোর বইগুলোও নিয়ে যাই। তবে একটা কথা বলে রাখছি।
বেলা অবাক হয়ে তাকিয়ে বলে,
—কী কথা?
বিহান ভুরু নাচিয়ে দুষ্টু হেসে বললো,
—সায়র যদি তোকে একটুও বিরক্ত করে, আমাকে শুধু একটা ফোন দিবি। আমি এসে ওকে উওম মাধ্যম দিব।
কথাটা শুনে বেলা হেসে ফেললো।ঠিক সেই মুহূর্তে দরজার পাশ দিয়ে যাচ্ছিলো সায়র।ভেতর থেকে ভেসে আসা বেলার সেই প্রাণখোলা হাসির শব্দ শুনে সে অজান্তেই থেমে গেলো।তার ঠোঁটের কোণেও অদৃশ্য এক টুকরো হাসি ফুটে উঠলো।মনে মনে শুধু একটি কথাই বললো,
—অবশেষে আমার চঞ্চল বেলাটা ধীরে ধীরে ফিরে আসছে।
আর সেই হাসিটুকুই যেন সায়রের সারাদিনের সমস্ত ক্লান্তি এক মুহূর্তে দূর করে দিলো।
বিহান একের পর এক ব্যাগ, বই আর ছোট ছোট বাক্স হাতে নিয়ে করিডোর দিয়ে সায়রের ঘরের দিকে হাঁটতে লাগলো। তার পেছনে ধীর পায়ে এগিয়ে আসছিলো বেলা। মুখে আগের মতোই লাজুক নীরবতা, কিন্তু ভেতরে ভেতরে অদ্ভুত এক অস্থিরতা কাজ করছে। মনে হচ্ছে, প্রতিটি পদক্ষেপ যেন তাকে জীবনের এক নতুন অধ্যায়ের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।
খান বাড়ির দ্বিতীয় তলার করিডোরটা বিকেলের আলোয় শান্ত হয়ে আছে। জানালা দিয়ে ঢুকে পড়া হালকা বাতাসে সাদা পর্দাগুলো ধীরে ধীরে দুলছে। করিডোরের একপাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন মমতাজ বেগম। তিনি দূর থেকে সবকিছুই দেখছিলেন। বেলার হাতে ব্যাগ, বিহানের মুখে হাসি, আর সায়রের ঘরের সামনে গিয়ে থেমে যাওয়া।সবকিছুই তাঁর চোখ এড়ালো না।
এক মুহূর্তের জন্য তাঁর মুখের রঙ বদলে গেলো। বুকের ভেতরে জমে থাকা অস্বস্তিটা যেন আরও তীব্র হয়ে উঠলো। কিন্তু সারোয়ার খানের সকালের দৃঢ় কণ্ঠস্বরটা মনে পড়তেই তিনি নিজের রাগটা চেপে রাখলেন। ঠোঁট শক্ত করে একবার শুধু বেলার দিকে তাকালেন। সেই দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্যতা ছিলো না, ছিল এক গভীর অনীহা। তারপর কোনো কথা না বলেই নিজের ঘরের দিকে চলে গেলেন।
বেলা সেই দৃষ্টিটা অনুভব করলেও মুখ তুলে তাকালো না। সে বুঝে গেছে, কিছু যুদ্ধ নীরবে লড়তে হয়। সব কষ্টের জবাব মুখে দেওয়া যায় না।এদিকে বিহান সায়রের ঘরের দরজার সামনে এসে দাঁড়িয়ে উচ্চস্বরে বললো,
—এই সায়র! দরজাটা খুলে রাখ। আজ থেকে কিন্তু তোর রুমে নতুন একজন স্থায়ী অতিথি আসছে!
ঘরের ভেতর থেকে সায়রের শান্ত কণ্ঠ ভেসে এলো,
—দরজা খোলাই আছে। চলে আয়।
বিহান ভেতরে ঢুকেই চারপাশে তাকিয়ে বললো,
–বাহ! ঘরটা তো একদম অফিসের মতো। এত পরিপাটি ঘরে মানুষ থাকে, নাকি শুধু বই থাকে?
সায়র হালকা হেসে উত্তর দিলো,
—তোদের মতো ঝড় এখানে ওঠে না।
—আজ থেকে উঠবে।
বিহানের কথায় ঘরের পরিবেশটা কিছুটা হালকা হয়ে উঠলো।সে একে একে ব্যাগগুলো বিছানার পাশে রেখে বললো,
—এই নে, আমার দায়িত্ব শেষ। এখন তোরা নিজেরা বুঝে নে কোনটা কোথায় রাখবি।
তারপর বেলার দিকে তাকিয়ে নরম গলায় বললো,
–কোনো কিছু লাগলে আমাকে ডাকিস।
বেলা মৃদু হেসে মাথা নাড়লো।
বিহান বেরিয়ে যাওয়ার সময় সায়রের কাঁধে আলতো চাপ দিয়ে ফিসফিস করে বললো,
—-আমার বোনকে বকাবকি করবিনা ভুলেও।
সায়র কোনো উত্তর দিলো না। শুধু খুব আস্তে মাথা নাড়লো।বিহান চলে যেতেই ঘরটা আবার নিস্তব্ধ হয়ে গেলো।একই ঘরে দাঁড়িয়ে আছে দু’জন মানুষ। অথচ কারও মুখে কোনো কথা নেই।বেলা ধীরে ধীরে জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়ালো। বাইরে বিকেলের আলো ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে আসছে।কিছুক্ষণ পর সায়র নীরবতা ভেঙে বললো,
—আজ থেকে এটা শুধু আমার ঘর না তোরও।
বেলা একটু অপ্রস্তুত হয়ে গেলো। কী উত্তর দেবে বুঝতে পারলো না।
সায়র তার অস্বস্তিটা বুঝে নিয়ে আবার বললো,
—একটা কথা আগে থেকেই বলে রাখি। এই ঘরে তুই কখনো অস্বস্তি বোধ করবি না। আলমারির অর্ধেক অংশ আমি খালি করে দিয়েছি। ড্রেসিং টেবিলটাও তোর জন্য গুছিয়ে রেখেছি। আর….
সে কয়েক সেকেন্ড থেমে নরম গলায় বললো,
—বিছানা নিয়ে যদি তোর অস্বস্তি থাকে, তাহলে সেটা নিয়েও ভাবতে হবে না।
বেলা বিস্মিত চোখে তাকালো।
সায়র খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে সোফার দিকে ইশারা করে বললো,
—আমি সোফাতেই ঘুমিয়ে নেবো। তুই নিশ্চিন্তে বিছানায় ঘুমাবি।
বেলা সঙ্গে সঙ্গে মাথা নেড়ে বললো,
—না, তা কেন হবে? আপনি সোফায় ঘুমাবেন কেন?
সায়র হালকা হেসে উত্তর দিলো,
— তাহলে কি তুই আমার সঙ্গে ঘুমাতে চাস?
বেলা অপ্রস্তুত হয়ে গেলো নিজের কথায়। বেলা কথাটা শুনেই যেন কয়েক মুহূর্তের জন্য কথা বলার ভাষা হারিয়ে ফেললো। তার চোখ দুটো বিস্ময়ে বড় হয়ে গেলো, আর পরক্ষণেই লজ্জায় গাল দুটো টকটকে লাল হয়ে উঠলো। সে তাড়াতাড়ি চোখ নামিয়ে নিয়ে অপ্রস্তুত গলায় বললো,
—আমি আমি সেটা বলিনি।
সায়র ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটিয়ে বললো,
—জানি। একটু মজা করলাম।
—আপনি সবসময় আমাকে এভাবে লজ্জায় ফেলেন কেন?
বেলা কথাটা বলেই নিজের অজান্তেই মুখ ফুলিয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে রইলো। তার সেই অভিমানী মুখটা দেখে সায়রের হাসিটা আরও একটু গভীর হলো। কিন্তু সে আর কিছু বললো না। বরং কিছুক্ষণ পর গম্ভীর হয়ে বললো,
—-তুই চাইলে আমি তোর সঙ্গে বিছানায়ও ঘুমাতে পারি। যদি তুই চাস।
বেলা এবার ধীরে ধীরে তার দিকে তাকালো। সায়রের চোখে কোনো দুষ্টুমির রেখা । সে খুব আস্তে বললো,
—আপনি সবসময় এত বেশি ভাবেন কেন?আমি কি না করেছি?
সায়র কয়েক মুহূর্ত তার দিকে তাকিয়ে থেকে শান্ত স্বরে উত্তর দিলো,
—কারণ তোর জীবনে এমনিতেই অনেক কিছু তোর ইচ্ছার বিরুদ্ধে হয়েছে। অন্তত আমার কারণে যেন তোর আর কোনো অস্বস্তি না হয়, সেটা আমি চাই।
কথাটা শুনে বেলা আর কোনো উত্তর দিতে পারলো না। বুকের ভেতর কোথাও যেন নরম একটা অনুভূতি এসে জমা হলো। সে দ্রুত নিজের ব্যাগের দিকে এগিয়ে গেলো, যেন নিজের চোখেমুখে ফুটে ওঠা অনুভূতিটা সায়রের চোখে পড়ার আগেই আড়াল করতে পারে।
একটা একটা করে নিজের জামাকাপড় বের করতে লাগলো। আলমারির সামনে দাঁড়িয়ে কাপড়গুলো গুছিয়ে রাখার সময় হঠাৎ তার চোখ পড়লো আলমারির ভেতরের অর্ধেক অংশে। সেখানে সুন্দর করে ফাঁকা করে রাখা হয়েছে তার জন্য জায়গা। শুধু তাই নয়, পাশে কয়েকটি নতুন হ্যাঙ্গারও রাখা।বেলা অবাক হয়ে পেছনে তাকিয়ে বললো,
—এগুলোও আপনি করেছেন?
সায়র তখন টেবিলের ওপর থাকা কয়েকটি বই গুছিয়ে রাখছিলো। সে মাথা না তুলেই বললো,
—হুম।
—কখন?
—বিকেলে।
—কিন্তু আপনি তো বলেছিলেন, আপনার অনেক কাজ আছে।
সায়র এবার তার দিকে তাকিয়ে বললো,
—কাজ ছিল। তবুও তোর জন্য সময় বের করা যায়।
বেলা কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইলো।তারপর খুব আস্তে বললো,
–ধন্যবাদ।
সায়র এবার মৃদু হেসে বললো,
—এত ধন্যবাদ দিতে হবে না। এই ঘরে তোরও অধিকার আছে।
‘অধিকার’ শব্দটা কানে যেতেই বেলার বুকের ভেতরটা কেমন যেন কেঁপে উঠলো। সে জানে, সম্পর্কটা হঠাৎ করে তৈরি হয়েছে, কিন্তু এই মানুষটা ধীরে ধীরে তাকে সেই সম্পর্কের বন্ধন অনুভব করাচ্ছে।
বেলা কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থেকে নিজের গুছিয়ে রাখা জিনিসগুলোর দিকে তাকিয়ে রইলো। এতক্ষণ ধরে সায়রের কথাগুলো শুনতে শুনতে তার ভেতরের অস্বস্তিটা কিছুটা কমলেও, পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়ে যাওয়ার মতো মানসিক প্রস্তুতি এখনও তার তৈরি হয়নি। একই ঘরে থাকা, একই ছাদের নিচে রাত কা’টানো সবকিছুই তার কাছে এখনও নতুন, অচেনা এবং অদ্ভুত রকমের লজ্জার। তাই নিজের মনকে একটু সময় দেওয়ার জন্য সে ধীরে ধীরে কয়েকটা জিনিস হাতে তুলে নিলো।তারপর সায়রের দিকে তাকিয়ে খুব শান্ত গলায় বললো,
—আমি আজ রাতে আসবো। এখন আমি আমার রুমেই থাকি।
সায়র কয়েক মুহূর্ত তার দিকে তাকিয়ে রইলো। তারপর কোনো আপত্তি না করে খুব স্বাভাবিকভাবে মাথা নাড়লো।
–ঠিক আছে।
বেলা যেন একটু অবাক হলো। সে ভেবেছিল সায়র হয়তো আবার কোনো মজা করবে, কিংবা তাকে বোঝানোর চেষ্টা করবে। কিন্তু মানুষটা একটুও জোর করলো না।সায়র বরং মৃদু হেসে বললো,
— তোর রুম, তুই যখন মন চায় আসবি। এরজন্য পারমিশনের প্রয়োজন নেই।
বেলার বুকের ভেতরটা অদ্ভুতভাবে নরম হয়ে এলো। সে চোখ নামিয়ে খুব আস্তে বললো,
—ধন্যবাদ।
সায়র ভ্রু তুলে বললো,
—আবার ধন্যবাদ?
বেলা হালকা হেসে বললো,
—হ্যাঁ, আবারও।
—এভাবে চলতে থাকলে একদিন দেখবি, আমাদের কথাবার্তার অর্ধেকই শুধু ধন্যবাদ আর স্বাগতমে শেষ হয়ে যাচ্ছে।
বেলা মুখ টিপে হাসলো।
—তাহলে আজ থেকে ধন্যবাদ কমিয়ে দেবো।
—সেটাই ভালো।
বেলা দরজার দিকে এগিয়ে গেলো। কিন্তু দরজার কাছে পৌঁছে হঠাৎ থেমে পেছনে তাকালো।
—আর শুনুন…
—হুম?
—রাতে কিন্তু বেশি মজা করবেন না।
সায়র ভীষণ নিরীহ মুখ করে বললো,
—আমি তো কোনো মজা করার কথাই ভাবিনি।
বেলা চোখ ছোট করে তাকালো।
—আপনাকে আমি চিনি।
সায়রের ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি ফুটে উঠলো।
—আমাকেও তাহলে ভালোই চিনে ফেলেছিস।
বেলা আর কোনো উত্তর না দিয়ে দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো।দরজা বন্ধ হওয়ার পর সায়র কয়েক মুহূর্ত স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো।
রাত বাড়তে বাড়তে প্রায় এগারোটা ছুঁয়ে গেলো।খান বাড়ির একে একে সব কক্ষের আলো নিভে গেছে। নিচতলার ডাইনিং রুম, ড্রয়িংরুম, করিডোর সবকিছুই ধীরে ধীরে নিস্তব্ধ হয়ে এসেছে। বাইরে আকাশে চাঁদ উঠেছে, আর জানালার কাঁচ ভেদ করে সেই নরম জোৎস্না খান বাড়ির দ্বিতীয় তলার করিডোরে ছড়িয়ে পড়েছে।নিজের ঘরে বিছানায় শুয়ে থাকা বেলার চোখে কোনো ঘুম নেই।
সে এপাশ-ওপাশ করছে, কখনো ছাদের দিকে তাকাচ্ছে, কখনো জানালার বাইরে তাকাচ্ছে, আবার কখনো নিজের পাশে রাখা ছোট্ট ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে সময় দেখছে।তারপর নিজেকেই মনে মনে বললো,
—আমি কেন এত নার্ভাস হচ্ছি? সায়র ভাই তো আমাকে কিছুই বলবে না। নিজেই তো বলেছে, আমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে কিছু করবে না।
কথাটা মনে পড়তেই তার বুকের ধুকপুকানি একটু কমলো।অবশেষে সে বিছানা থেকে উঠে দাঁড়ালো। একটা বালিশ হাতে নিলো, সঙ্গে পাতলা একটা চাদর নিলো। দরজা খুলে ধীরে ধীরে করিডোরে বেরিয়ে এলো।প্রতিটি পদক্ষেপের সঙ্গে তার মনে হচ্ছিলো, সে যেন নিজের জীবনের নতুন কোনো অজানা অধ্যায়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।সায়রের ঘরের সামনে এসে দাঁড়িয়ে আবারও কিছুক্ষণ দ্বিধা করলো।তারপর খুব আস্তে দরজায় টোকা দিলো।ভেতর থেকে প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই সায়রের কণ্ঠ ভেসে এলো,
—দরজা খোলা আছে। চলে আয়।
বেলা ধীরে ধীরে দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করলো।সায়র তখন বিছানায় বসে একটি বই পড়ছিলো। বেলার পায়ের শব্দ শুনে সে বই থেকে চোখ তুলে তাকালো। এক মুহূর্তের জন্য তার চোখে মৃদু হাসি ফুটে উঠলো।
—অবশেষে এলি?
বেলা একটু অপ্রস্তুত হয়ে বললো,
—হ্যাঁ।
—আমি তো ভাবছিলাম, তুই হয়তো আজকের রাতটাও নিজের রুমে কা”টিয়ে দিবি।
বেলা বালিশটা বিছানার ওপর রেখে বললো,
—কেন? আপনি কি আমার জন্য অপেক্ষা করছিলেন?
সায়র বইটা বন্ধ করে পাশে রাখলো।তারপর খুব শান্ত গলায় বললো,
—হ্যাঁ।
বেলা থমকে গেলো,
—সত্যি? কিন্তু কেন?
সায়র কয়েক সেকেন্ড তার দিকে তাকিয়ে থেকে বললো,
—তুই আসবি বলে ঘুমাইনি।
বেলার গাল মুহূর্তেই লাল হয়ে উঠলো।সে তাড়াতাড়ি অন্যদিকে তাকিয়ে বললো,
—আপনি ইচ্ছা করে এসব বলেন, তাই না?
সায়র মৃদু হেসে বললো,
—কী বললাম?
—যেটা শুনে মানুষ লজ্জা পায়।
—আমি তো সত্যিটাই বললাম।
বেলা চোখ রাঙিয়ে বললো,
—সত্যি কথা সবসময় এভাবে বলতে হয় না।
সায়র হাসতে হাসতে বললো,
—আচ্ছা, পরেরবার আগে অনুমতি নিয়ে বলবো।
বেলা মুখ ফুলিয়ে বিছানার একপাশে বসে পড়লো।
—আপনি একদমই পাল্টাননি।
—আর তুইও না।
—আমি কী করেছি?
—আগে যেমন রাগ করলে মুখ ফুলিয়ে বসে থাকতি, এখনও ঠিক একই কাজ করিস।
বেলা একটু অবাক হয়ে তাকালো।
—আপনি এত কিছু মনে রেখেছেন?
সায়র এবার একটু থেমে গেলো। তার চোখের দৃষ্টি নরম হয়ে এলো।কিছু স্মৃতি ভুলে থাকা যায় না, বেলা।কথাটা শুনে বেলা আর কোনো উত্তর দিলো না।তার বুকের ভেতরে যেন হঠাৎ করে অদ্ভুত এক ঢেউ উঠলো। সে জানে না সায়র কথাটা কোন অর্থে বলেছে, কিন্তু তার নিজের মন সেই কথাটার অর্থ খুঁজতে গিয়ে আরও বেশি অস্থির হয়ে উঠলো।সায়র যেন বেলার অস্বস্তিটা বুঝতে পারলো। তাই আর বিষয়টা বাড়ালো না।সে বিছানার একপাশে সরে গিয়ে বললো,
—চল, শুয়ে পড়। অনেক রাত হয়েছে।
বেলা ধীরে ধীরে বিছানায় উঠে শুয়ে পড়লো। যথেষ্ট দূরত্ব রেখে সে একেবারে কিনারার দিকে গিয়ে শুয়ে পড়লো।সায়র কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললো,
—-তুই কি বিছানা থেকে পড়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিস?
বেলা চোখ বন্ধ রেখেই বললো,
—না।
—তাহলে এত কিনারায় কেন শুয়েছিস?
—এখানেই ভালো লাগছে।
—তুই আরেকটু ওদিকে গেলেই দেয়ালে ব্যাথা পাবি।
বেলা একটু বিরক্ত হয়ে বললো,
—আপনি আপনার দিকে থাকুন।বকবক করবেন না।
সায়র হেসে বললো,
—আমি তো আমার দিকেই আছি। তুই বরং আমার দিক থেকে পালাতে পালাতে দেওয়ালের সঙ্গে বন্ধুত্ব করে ফেলেছিস।
বেলা কোনো উত্তর দিলো না। বরং আরও একটু দেওয়ালের দিকে মুখ ফিরিয়ে নিলো।সায়র কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললো,
—বেলা?
—হুম?
—দেওয়ালের সঙ্গে অভিমান করলি নাকি। আবার এদিকে এসে পড়লি যে?
বেলা এবার হেসে ফেললো।
—দেওয়ালের সঙ্গে আমার কোনো অভিমান নেই।
—তাহলে আমার সঙ্গে?
–আপনার সঙ্গেও নেই।
—তাহলে মুখটা ওইদিকে কেন?
বেলা একটু থেমে বললো,
—আমি এভাবেই ঘুমাই।
সায়র খুব গম্ভীর মুখ করে বললো,
—বুঝলাম।
বেলা কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করলো,
—কী বুঝলেন?
—তুই আমাকে এড়ানোর জন্য নতুন একটা অজুহাত আবিষ্কার করেছিস।
বেলা সঙ্গে সঙ্গে ঘুরে তাকিয়ে বললো,
—আমি আপনাকে এড়াচ্ছি না!
সায়র মৃদু হেসে বললো,
—এই তো। এতক্ষণ আমার দিকে তাকাচ্ছিলি না, আর আমি বলতেই সঙ্গে সঙ্গে তাকিয়ে ফেললি।
বেলা বুঝতে পারলো, আবারও সে সায়রের কথার ফাঁদে পড়েছে।সে বিরক্ত হয়ে বললো,
—আপনি আমাকে শুধু রাগান।
সায়র খুব শান্ত গলায় উত্তর দিলো,
—কারণ তুই রাগ করলে তোর মুখটা খুব সুন্দর লাগে।
বেলা একেবারে চুপ।তার গাল আরও লাল হয়ে উঠলো।সায়রও এবার আর বেশি কিছু বললো না। কয়েক মুহূর্ত পর হালকা হাসি দিয়ে বললো,
—আচ্ছা, আর রাগাবো না।
বেলা ধীরে ধীরে আবার দেওয়ালের দিকে মুখ ফিরিয়ে নিলো।কিছুক্ষণ পর সায়র খুব আস্তে বললো,
—তবে একটা সমস্যা আছে।
বেলা বিরক্ত স্বরে বললো,
—আবার কী?
—তুই দেওয়ালের দিকে মুখ করে শুয়ে থাকলে তোর মুখটা দেখা যায় না।
—তাতে কী হয়েছে?
—কিছু হয়নি। শুধু ভাবছিলাম, আজ সারাদিনে যতবার তোকে হাসতে দেখেছি, তার মধ্যে কোন সময়ের হাসিটা সবচেয়ে সুন্দর ছিল সেটা ঠিক করতে পারছি না।
বেলার বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেঁপে উঠলো।সে খুব আস্তে বললো,
—আপনি না…
—হুম?
—এসব কথা বলবেন না।
—কেন?
—কারণ…
সে আর বাকিটা বলতে পারলো না।সায়রও তাকে আর অস্বস্তি দিলো না।বরং কিছুক্ষণ পর খুব নরম কণ্ঠে বললো,
—ঠিক আছে। আর বলবো না।
কয়েক সেকেন্ড নীরবতার পর বেলা নিজেই খুব আস্তে বললো,
—তবে একটা কথা
—বল।
—আপনি সবসময় এমন থাকলে।আমি হয়তো আপনার সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে পারবো।
সায়রের মুখে মৃদু হাসি ফুটে উঠলো।
—আমি তো চাই তুই আমার সঙ্গে স্বাভাবিক থাকিস।
বেলা চোখ বন্ধ করলো।
—তাহলে চেষ্টা করবো।
এরপর দু’জনেই নীরবে শুয়ে রইলো।একই বিছানায়, অথচ নিজেদের মাঝখানে অদৃশ্য এক সীমারেখা রেখে।কিছুক্ষণ পর সায়র আবার ফিসফিস করে বললো,
—বেলা?
—হুম?
—শুভরাত্রি।
বেলা মৃদু হেসে বললো,
—শুভরাত্রি।
সায়র চোখ বন্ধ করে কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে আবার বললো,
—আর হ্যাঁ…
বেলা বিরক্ত হয়ে বললো,
–আবার কী?
— কিছু না। ঘুমা।
বেলা হেসে ফেললো।
—আপনি পা’গল!
সায়র মৃদু হেসে বললো,
—তোর জন্য একটু পা’গল হওয়াই যায়।
রইলো প্রেমের নিমন্ত্রণ পর্ব ২৭
বেলা এবার আর কোনো উত্তর দিলো না। শুধু লজ্জায় চোখ বন্ধ করে রাখলো, অথচ তার ঠোঁটের কোণে লুকানো হাসিটা অনেকক্ষণ পর্যন্ত মিলিয়ে গেলো না।
হয়তো তাদের সম্পর্কের পথ এখনও অনেক দীর্ঘ, হয়তো সামনে আরও অনেক বাধা অপেক্ষা করছে, কিন্তু এই ছোট্ট রাতটুকু তাদের দু’জনের জন্য এক নতুন অনুভূতির দরজা খুলে দিলো। যেখানে ভালোবাসার কোনো দাবি নেই, অধিকার দেখানোর কোনো তাড়াহুড়ো নেই,আছে শুধু দু’জন মানুষের ধীরে ধীরে একে অপরের কাছে স্বাভাবিক হয়ে ওঠার সুন্দর, লাজুক আর মিষ্টি এক যাত্রা।
