রাগে অনুরাগে পর্ব ৮ (২)
সুহাসিনি ফাতেহা
”নিয়ে আয়!”
কি শানিত কণ্ঠ! সপ্তাদশীর বুক ছ্যাৎ করে উঠল। আঁচ পেলো মানুষটার ক্ষুব্ধ মেজাজের। কালো শার্ট, প্যান্ট পরা যুবকটার দিকে হা করে চেয়ে রইলো। এতক্ষন ভালো করে না তাকালেও তাকাতেই যেন এই লোকের উপর নতুন করে ক্রাশ নামক বাঁশ খেলো মেয়েটা। যখন ফারাজ খান কলেজে নতুন জয়েন হয়েছিল তখন তিতলি লোকটার দিকে তাকিয়ে থাকতো মনে হতো এভাবে যদি সারাজীবণ তাকিয়ে থাকতে পারতাম। কিন্তু একদিন তিতলি ক্লাসে গালে হাত রেখে ফারাজের দিকে চেয়ে ছিলো বলে — অপমান করে ক্লাস থেকে বের করে দেয় তিতলিকে! তখন থেকেই সপ্তাদশী ভেবে নিলো জীবণে আর কখনো এই নাকউঁচু লোকের দিকে ফিরেও চাইবে না। একদম চাইবে না। শুধু ঝগরা করবে! সপ্তাদশীর অভিমানে সেদিন রাত টা একদম ভালো কাটেনি। কিন্তু অবাধ্য মন কি আর মানে? আড়ালে আবড়ালে মেসেজ দিয়ে বিরক্ত করা সব যেন আর বেড়েছিল। কিন্তু এতকিছু করেও কোনো লাভ হলো না। তিতলির এই নিয়ে দুঃখে রীতিমত মাঝে মাঝে কাঁদতে কাঁদতে বালিশ ভিজিয়ে ফেলে। নিজের প্রতি হতাশায় দ্বিখণ্ডিত বুক! কি পাষান লোক একটু মায়াও নেই মনে।
” মাথায় কুমড়া টা তুলে দে!”
তিতলি যখন হা করে ফারাজের দিকে তাকিয়ে ভাবনায় বিভোর ছিলো,
আদেশ টা ধেয়ে এলো তখনি!
নড়েচড়ে তাকালো তিতলি! প্রশ্নটা কি তাকেই করেছে?
সে বেশ দ্বিধাহীনতায় মিনমিন করে বলল,
”আমাকে বলছেন? আমি আপনার মাথায় তুলে দিবো! ঝিলিক আপু কুমড়া টা দাও তো আমি তুলে দিচ্ছি!”
”আপনাকে তুলে দিতে বলি নি। আপনার মাথায় তুলে দিতে বলেছি!”—— ফারাজ ফের ঝিলিকের উদ্দেশ্য হুকুম ছাড়লেন,
”কি বলছি শুনতে পাস নি?”
”কি-কি বলছো ভাইয়া এত বড় কুমড়া ওর মাথায় তুলে দিবো!”
”তুকে দিতে বলছি দে?”
”ভাইয়া দোষ তো আমাদেরও ছিলো তুমি কেন একা তিতলিকে শাস্তি দিচ্ছো?”
”আমি কৈফিয়ত দিই না সেটা নিশ্চয় তোরা জানিস!”
ভাইয়ের সাথে এক কথায় উপর দুই কথা বলতে না পারা ঝিলিক আজ ভয় পেলো না। সে কিছুতেই চাই না তিতলির মতো মিষ্টি মেয়েটার সাথে এমন কাজ করতে। নিজেকে শক্ত করে ফের উত্তর দিলো,
”ভাইয়া তুমি জানো না ও বাড়ির মেহমান! তুমি তো কখনো বাড়ির মেহমানদের সাথে এমন করো না।”
”আচ্ছা তাহলে তোর সাথে করি! নে কুমড়া টা মাথায় তুলে পুরো ছাঁদে হাঁটা শুরু কর! তোর যেহেতু এত দরদ উপছে পড়ছে তাহলে শাস্তি টা তোরই দি!”
ভয়ে ঝিলিকের রুহুআত্মা কেঁপে উঠলো। চার-পাঁচ কেজির বড় একটা কুমড়া! এটা মাথায় নিয়ে হাঁটলে নিশ্চিত মাথা আর মাথার জায়গায় থাকবে না।
”ঝিলিক আপু তুমি আমার মাথায় কুমড়া টা তুলে দিতে পারো। আমি কিন্তু মাইন্ড করবো না।”
”সুন্দর সাবলীল ভাষায় বলে আঁড়চোখে ফারাজের মুখের দিক তাকাল মেয়েটা ৷ ব্যাটার চোখমুখের কোনো পরিবর্তন নেই৷ আরে কানাটা কী দেখছে না তিতলির এই সুন্দর পরিবর্তন! সে নিজ থেকে বলছে এটা কম কিসের! আসলে,লোকটা একটা কানা! ”
ঝিলিক অসহায় চোখে কাঁপাকাঁপা হাতে তিতলির মাথায় কুমড়া টা তুলে দিলো।
তিতলির মাথায় কুমড়া টা তুলে দিতে দেরি ওর হাটতে দেরি হয় নাই। বিধিবাম কয়েক পা এগোতেই আচমকা তাল হারিয়ে ফেলল মেয়েটা। হোচট খেয়ে পড়লো কারো গায়ের উপর। সে লোকটাও আকস্মিক তাল হারিয়ে নিচে পড়ে গেলো তখনি। তবে নিজেকে যথেষ্ট সামলিয়ে!
তৎক্ষণাৎ ফারাজ তীক্ষ্ণ কণ্ঠে শুধালো,
”জানতাম আপনি এমন কিছু করবেন। বেয়াদব মেয়ে! ওঠো বলছি!”
তিতলি কিছু বলল না। সে হাঁ করে চেয়ে আছে। ফারাজের চওড়া বুকে পড়ে আছে বুঝতেই জগত পাল্টে গেছে বিমোহে। শরীরে বিদ্যুৎ প্রবেশ করেছে যেন। থরথর করে কাঁপতে চাইছে শরীর। লোকটার শরীর থেকে কি সুন্দর একটা ঘ্রাণ আসছে! সে ঘ্রাণে তিতলি হারিয়ে গেছে যেমন।
ফারাজ ভ্রু কুঁচকালো। খসখসে কণ্ঠে বলল,
”উঠবেন নাকি তুলে আছাড় দিবো!”
সপ্তাদশী নিজের মধ্যে নেই। খেই হারিয়েছে অনুভূতিতে। তৎক্ষণাৎ জ্বিভ ফস্কে বেরিয়ে এলো,
”না উঠলে হয় না… ”
”ঝিলিক গাছ থেকে একটা ঢাল ভেঙে আনতো….”
ঝিলিক মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে আছে ওদের দিকে। কি মানাচ্ছে দুজনকে। তার ভাইতো কখনো কোনো মেয়ের দিকে তাকায় না। ঝিলিকের ভাবনার মাঝেই তিতলি হুশ ফিরে এলো। নিজের অবস্থান বুঝতে পেরে মেয়েটা তখনি উঠে দাড়ালো। নিজের কাজে লজ্জায় মেয়েটা আর সেখানে দাড়াতে পারলো না। দৌড়ে চলে গেলো ছাঁদ থেকে।
সেদিন রাতে একটু ঘুম চোখে ধরা দিলো না সপ্তাদশীর। চোখ বন্ধ করলেই শুধু ভেসে উঠেছে ছাঁদের সেই দৃশ্যটা। সে ওই গম্ভীর লোকের উপর পড়ে ছিলো ভাবতেই মেয়েটার মুখখানা লজ্জায় লাল নীল হয়ে যায়।
সকাল ছয়টা ত্রিশ মিনিটে উঠে গেলো তিতলি। চলে যাবে বাড়ি! এই বাড়ি আর একমুহূর্ত ওনা। ওয়াশরুমে গিয়ে ফ্রেশ হতেই চোখ পড়লো তার পায়ে নুপুর একটা নেই। সপ্তাদশীর মুখটা অন্ধকারে ঢেকে গেলো। তার পছন্দের নুপুর হঠাৎ পা থেকে উধাও হয়ে গেলো। তিতলি ভাবলো হয়তো ছাঁদে পড়ে গেছে। তাই আর একমুহূর্ত না দাড়িয়ে চলে গেলো ছাঁদের উদ্দেশ্য।
কিন্তু ছাঁদে গিয়ে দেখলো দরজায় তালা দেওয়া।
”ভোরে ভোরে উঠে চুরি করে পালাতে চাচ্ছেন নাকি?”
সহসা পেছন থেকে পুরুষালী গম্ভীর কণ্ঠ শুনে ঘাঁড় ঘুরিয়ে পেছনে ফিরলো তিতলি। দেখলো স্বয়ং ফারাজ খান দাড়িয়ে আছেন। পরনে ছাই রঙা স্যান্ডো গেঞ্জির সাথে কালো ট্রাউজার। দেখতে মনে হবে এক্সারসাইজ করবেন।
তিতলির লজ্জা এখন কই গেলো। রাতে সে কি লজ্জা মেয়েটার ঘুমাতে পারছিলো না। আর এখন? এখন কই এত লজ্জা?
সে ও পাল্টা জবাব দিতে শুরু করলো,
”চুরি করতে আসিনি! আমার নুপুর চুরি হয়ে গেছে কে জানি আমার শখের নুপুর গুলো চুরি করেছে।”
”ওহ—— ”
শব্দ কম কণ্ঠ নিরেট।
তিতলি থামলো না। মুখখানায় দুষ্ট হাসি ফুঁটিয়ে ফের বললো,
রাগে অনুরাগে পর্ব ৮
”রাতে আমি সত্যি হোচট খায় নি! আমি ইচ্ছে করেই আপনাকে ফেলে দিয়েছি কেমন লেগেছে? একদম ঠিক করেছি না? আপনি শাস্তি দিতে চেয়েছেন? আমি আপনাকে ফিরিয়ে দিয়েছি! আগে শাবানা ছিলাম! কিন্তু সঙ্গ দোষে লোহা ভাসে তাই এখন আমি রিনা খান!””
