Home রাজনীতির রংমহল ৩ রাজনীতির রংমহল ৩ পর্ব ১১

রাজনীতির রংমহল ৩ পর্ব ১১

রাজনীতির রংমহল ৩ পর্ব ১১
সিমরান মিমি

গভীর রাত। ঘড়ির কাঁটায় তখন বারোটা একচল্লিশ। নিস্তব্ধ, কোলাহল হীন মাঝরাতে পিরোজপুর সরকারি হাসপাতালের চিত্র ভিন্ন। অধিক রোগী হওয়ার দরুন সিট পরিপূর্ণ হওয়ার পরে ও ভর্তি নেওয়া হয়েছে রোগীদের। তাদের কে রাখা হয়েছে বারান্দার দু প্রান্তে। শিশু ওয়ার্ড থেকে থেমে থেমে বাচ্চাদের কান্নার আওয়াজ আসছে। কোথাও রোগীরা ঘুমালেও তাদের সঙ্গে আসা অভিভাবক রা চিন্তিত চিত্তে বসে আলাপ করছেন। সব মিলিয়ে পরিবেশ টা খুব বেশি কোলাহল পূর্ণ না হলেও, একদম নিস্তব্ধ নয়।
উদ্ভ্রান্তের মতো হস্পিটালের তৃতীয় তলায় ছুটে এলো পাভেল শিকদার। স্পর্শীয়ার সাথে ফোনালাপ সমাপ্ত হওয়ার পরমুহূর্তেই সাভার ছেড়েছে সে। লাইসেন্সকৃত নিজস্ব বাইক থাকায় খুব বেশি ভোগান্তি পোহাতে হলো না। রওনা দিলো অতি দ্রুতই। পদ্মা সেঁতুতে অবস্থানকালীন ফোন আসলো সুমনের। ‘ পরশ ভাই হস্পিটালে ভর্তি, তুই পিরোজপুরে আয়।’ – একথা শোনা মাত্রই মস্তিষ্ক ফাঁকা হয়ে গেছিলো তার। উদ্ভ্রান্তের মতো ছুটে এসেছে পিরোজপুরে। কতটা দ্রুততার সাথে সে এখানে পৌছেছে তা শুধু তার বাইক এবং সৃষ্টিকর্তাই জানে। মনে মনে বেজায় ক্ষোভ, কার এতো বড় সাহস যে পরশ শিকদারের উপর হামলা করে! তার কলিজা ছিঁড়ে দু ভাগ করবে পাভেল।

ভি আই পি কেবিনে ঢোকার সাথে সাথেই চমকালো সে। পা থামিয়ে তাকিয়ে রইলো ব্যান্ডেজের দিকে। হাতের মাংসপেশিতে লেগেছে আঘাত। আর কোথাও কোনো ব্যান্ডেজ নেই দেখে সস্তির নিঃশ্বাস ফেললো। ভেবেছিলো ভয়ংকর হামলা করেছে প্রতিপক্ষ। হস্পিটালে যখন ভর্তি রয়েছে, তখন আঘাত গুলোও জোরদার হবে। এসব ভেবে সারা পথ নিজেকে সাহস দিয়েছে। ভাইকে দেখে ভেঙে পড়লে চলবে না। শক্ত হতে হবে, প্রতিপক্ষের এই আক্রমনের শোধ তুলতে হবে।
পাভেল কে দেখে পরশের কুঁচকানো মুখ ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হলো। দু পলক দেখে চোখ ফিরিয়ে নিলো অন্যদিকে। ধীর পায়ে বেডের দিকে এগোলো পাভেল। ভাইয়ের পাশে বসে জিজ্ঞেস করলো,
– কি হয়েছিলো?

উত্তর দিলো না পরশ। পাশ থেকে ফোন বের করে বিরক্তিকর ভঙ্গিতে স্ক্রল করতে লাগলো। যেনো পাশে বসে থাকা লম্বা-চওড়া, ফর্সা গড়নের ছোট ভাইটার অস্তিত্ব নেই এখানে। থাকলেও তার উপর বিরক্ত ও। কথা বলতে চায় না। সুজনের মাথা ফেঁটেছিলো সোভামের হাতে। বিগত ঘটনায় তাকে মারার সময়ে সোভামই আঘাত করেছে। এর আগে বেডে চিৎ হয়ে শুয়ে থাকলেও পরশের উপর আক্রমণের কথা শুনে বসে থাকতে পারেনি। মাথার ব্যান্ডেজ সহ ভিখারীর মতো হাটু গুঁটিয়ে বসে আছে টুলের উপর। চোখে ঘুম থাকা সত্ত্বেও যাচ্ছে না। বসে বসে ঝিমুচ্ছে। সুজন, রবিন, শাওন – তারাও বসে আছে বাঁ পাশের একটা বেডে। বাকিদের ধমকে হস্পিটাল থেকে পাঠিয়ে দিয়ে পরশ। সে নিজেও এখানে থেকে বিরক্ত। শুধু যেতে পারছে না ছেলেদের অনুরোধে। অন্ততপক্ষে এক রাত থাকতেই হবে এখানে। নাহলে তারা যাবে না কোথাও। শুধু ব্যান্ডেজ করে চলে গেলে তো হবে না, এতে কি প্রেস – মিডিয়া জানবে? না তো! সেজন্যই জোর করে, অনুরোধের সহিত ভর্তি করেছে পরশ কে। সেই রাত থেকে দলে দলে প্রেসের লোক এসেছে। ছবির পর ছবি তুলে নিয়েছে কাল সকালে ছাপানোর জন্য। দলের ছেলেরা বড় ভাইয়ের হাতের আঘাত টুকুকে উলটে – পালটে, নানা এঙ্গেলে জুম করে ছবি তুলেছে। ইতোমধ্যে সেগুলো ফেসবুকে ছড়িয়ে দিয়ে তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানানোও শেষ । এবার বাকি রইলো অপরাধীর শাস্তি নিয়ে। তাকে পুলিশে কেনো দিলো পরশ, এ নিয়ে বেজায় আপত্তি। এই মেয়েকে কেনো দলের হাতে ছেড়ে দিলো না, এ নিয়েও আফসোসের শেষ নেই ভেতরে ভেতরে। কিন্তু সরাসরি তা বলা সম্ভব হচ্ছে না। আজকাল তাদের বড় ভাই এর রাগের শেষ নেই। কোন কারনে রেগে যাবে, কোন টা বললে খুশি হবে, সেসব নিয়েও দ্বিধা-দ্বন্দের শেষ নেই। অতএব চুপ থাকাই উত্তম।
পরশ শিকদার যখন পাভেলের প্রশ্নের উত্তর দিলো না, তখন এগিয়ে এলো সুমন। কাঁধে হাত রেখে গম্ভীর গলায় বললো,

– সুজনকে দেখে চায়ের দোকানে দাঁড়িয়েছিলাম সবাই। এরমধ্যে কোত্থেকে ঝড়ের মতো এসে কলার চেপে ধরলো মেয়েটা। কি সব আবোল-তাবোল বলছিলো, চেচাঁমেচির মধ্যে বোঝা যাচ্ছিলো ন। ভাই রেগে থাপ্পড় বসালো। দেখলাম মেয়েটা ছিটকে অজ্ঞানের মতো বসে রইলো। হুট করেই সেকেন্ডের মধ্যে ছুরি দিয়ে হামলা করলো। ভাগ্যিস বুকে লাগেনি।
হতভম্বের মতো চেয়ে রইলো পাভেল। রেগে, তেজের সহিত বললো,
– একটা মেয়ে আমার ভাইয়ের উপরে হামলা করেছে। আর তোমরা কি আঙুল চুঁষতে ছিলা? ও কি জাদু জানে যে নিমিষেই ছুরি ঢুকিয়ে দিলো! নিশ্চিত পরিকল্পনা ছিলো। ছুটে এসে ছুরি ঢুকিয়ে দিলো আর তোমরা বসে বসে দেখলে। হাস্যকর! মাথায় রক্ত উঠে যাচ্ছে…… মেয়েটা কোথায়?

– জেলে!
‘জেল’ – শব্দটা কর্ণকুহরে পৌছাতেই টনক নড়ে উঠলো পাভেলের। মনে পড়লো পিরোজপুরে আসার প্রধাণ কারন। রাত একটা, অথচ স্পর্শী এখনো জেলে। ভাবতেই উঠে দাঁড়ালো। পরক্ষণেই এলোমেলো ভাবনা নিয়ে বসে পড়লো। পুণরায় জিজ্ঞেস করে উঠলো-
– মেয়েটা জেলে?
– হ্যাঁ, জেলে।
– আসলেই জেলে…..
পরশ ভ্রুঁ কুঁচকে তাকালো। সুমন পুনর্বার বললো,
-হ্যাঁ জেলে। কিন্তু কেনো? কোনো সমস্যা…..
– ওহহহ শিট! ওটা চড়ুই ছিলো…..

ছুটলো পাভেল। পরশের ইশারায় তার পেছনে সুজন এবং শাওনও ছুটলো। বাইকে উঠে একটানে থানার দিকে চললো। অফিসের বারান্দায় ক্লান্ত ভঙ্গিতে বসে আছে এক যুবক। মাথায় এবং হাতে সদ্য বাঁধানো ব্যান্ডেজ। মাথা হেলিয়ে অবসাদগ্রস্ত হয়ে বসে আছে বেঞ্চে। পাভেল চিনলো না। কখনো সরাসরি দেখা হয়নি সোভামের সাথে। দু একবার স্পর্শীয়া ছবি দেখালেও খেয়াল করা হয় নি। এতোসব না দেখে দ্রুতপায়ে ভেতরে ঢুকলো। অফিসার পাভেল শিকদারকে দেখেই হাসলেন। খানিকটা চাটুকারিতা করে বললেন,
– আরে ছোট শিকদার যে, তা কি মনে করে? বসো, চা দেবো নাকি কফি?
এতো তেলবাজি গায়ে মাখলো না পাভেল। ব্যস্ত পায়ে জেলের দিকে উঁকি মারতে মারতে বললো,
– ওই মেয়েটা কোথায়?
কিছুটা ঘাবড়ে গেলেন অফিসার। বুঝিয়ে বললেন,
– দেখো, এতোটা উত্তেজিত হইয়ো না। জেলেই থাক কিছুদিন। এভাবে মেয়েটাকে তোমাদের হাতে তুলে দিতে পারি না আমি। উপর মহল থেকে চাপ আসবে।

ইতোমধ্যে সুজন এবং শাওন পাভেলের পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে। পাভেল কিঞ্চিৎ সময় ও ব্যয় করলো না। একা একাই এগিয়ে গেলো জেলের দিকে। চৌদ্দটা লোহার শিকে আবদ্ধ ছোট্ট একটা কুঠরিতে বসে আছে স্পর্শীয়া। বেনী করা চুলগুলো এলোমেলো হয়ে গেছে, যেনো ঘুম ভেঙেছে মাত্রই। কুঠুরির এক কোনে মাথা নিচু করে তাকিয়ে আছে ফ্লোরের দিকে। তার চোখ মুখ লাল। হ্যাঁ কেঁদেছে অনেকক্ষণ। তবে নিজের জন্য নয়, ভাইয়ের জন্য। ওকে গ্রেফতার করার পরপরই সোভাম ছুটে এসেছে অসুস্থ শরীর নিয়ে। বারংবার অনুরোধ, অনুযোগ করেও গলাতে পারে নি মন। ইনস্পেকটরের একটাই কথা – ‘দেখুন, যাকে হত্যা করার চেষ্টা করেছে সে যেনো তেনো লোক নয়। তার দলীয় ছেলে-পেলেরা বাইরে হিংস্র বাঘের ন্যায় ওঁৎ পেতে বসে আছে। সে হিসেবে জেলের মধ্যেই আপনার বোন নিরাপদ। বাইরে গেলে যেকোনো মুহুর্তে খুন, ধর্ষণ, গাড়ি চাপা – যা কিছু হয়ে যেতে পারে। শেষে আমাদের দোষারোপ করবেন না। এর চেয়ে ভালো আপনি ফিরে যান। আপনার বোন এখানে চার/পাঁচ দিন থাকুক। পরিস্থিতি ঠান্ডা হলে নিজে গিয়ে পরশ শিকদারকে অনুরোধ করবেন। উনি ভালো মানুষ, কেস তুলে নিলেও নিতে পারেন। এরপর পাঠিয়ে দিন পিরোজপুরের ত্রি – সীমানার বাইরে। বুঝেছেন?

সোভাম বুঝেছে, মেনেছেও। কিন্তু থানা ত্যাগ করতে পারে নি। দুশ্চিন্তায় বসে আছে থানার বাইরের বারান্দায়। এভাবে বোনকে জেলে রেখে সে যেতে পারবে না হস্পিটালে। এ কথা শোনার পরপরই নিঃশব্দে কেঁদে ফেলেছে স্পর্শীয়া। অসুস্থ শরীর নিয়ে কি করে সারারাত বসে থাকবে বাইরে। এমনিতেও প্রচুর মশা!
স্পর্শীর মুখ দেখেই পিলে চমকে উঠলো পাভেল। চিৎকার করে অফিসারের উদ্দেশ্যে বললো,
– ওকে মেরেছেন আপনারা? কি বলেছেন, কাঁদছে কেনো ও। চড়ুই, আমাকে বল কি করেছে?
হতভম্ব হয়ে গেলো অফিসাররা। পাভেল শিকদার ঠিক কোন পক্ষ নিয়ে বাকবিতন্ডায় জড়িয়েছেন, তা বোঝা গেলো না। তিনি অনবরত বললেন,
– না না। মারি নি, আপনার ভাই বারন করেছে কিছু বলতে।
থানার ভেতরে হুট করেই ঘটা এই গোলযোগ শুনে হতদন্ত হয়ে ছুটে এলো সোভাম। সুমন, শাওনের সাথে নতুন আরেকটা মুখ দেখে আরো চমকালো। শক্ত কন্ঠে বললে,
– চড়ুই ভুল করেছে, জেলে দিয়েছেন। আমরা কেস লড়বো। কিন্তু এভাবে মাঝরাতে এসে থানার মধ্যে বিশৃঙ্খলা করতে পারেন না। খুব খারাপ হবে। আমি ছেড়ে কথা বলবো না। অফিসার……!
অবস্থা বেগতিক! এক দিকে পাভেল শিকদার উত্তেজিত, অন্যদিকে আসামীর ভাই ও উত্তেজিত। এদিকে সুমন, শাওন দুজনেই হতভম্ব হয়ে নানা প্রশ্ন করে যাচ্ছে পাভেল কে। সব মিলিয়ে অফিসার বিরাট ফ্যাঁসাদে পড়ে গেছেন। এমন পর্যায়ে স্পর্শীয়া চিৎকার করে উঠলো। পাভেলকে ধমক মেরে বললো,

– চুপ করবি তুই!!!!!!! তুই এখানে আমাকে ছাড়াতে এসেছিস নাকি ঝগড়া করতে?
মুহুর্তে’ই থমথমে হয়ে গেলো পরিবেশ। সোভাম পাভেলের দিকে তাকালো। ছেলেটা কি স্পর্শীর পরিচিত! কথা শুনে তো তাই বোঝা যাচ্ছে। এটা ভেবে সে চুপ করে দেখতে লাগলো। পাভেল অফিসারের দিকে তাকিয়ে বললো,
– ওকে ছাড়ুন।
হতভাগ হয়ে গেলো সুজন, শাওন। চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইলো পাভেলের দিকে। বললো,
– এই মেয়েকে ছাড়বে মানে? ও পরশ ভাইরে খুন করতে চাইছে।
দ্বিধা নিয়ে মুখ চাওয়া-চাওয়ি করলো পাভেল। কি করবে সে? স্পর্শীয়া কেনো এটা করতে গেলো। এবারে কার পক্ষ নেবে ও।
– তুই ভাইকে ছুরি দিয়ে মারতে গেলি কেনো?
অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো স্পর্শী। পরশ শিকদার নামটা পাভেল শিকদারের সাথে অনেক টাই মেলে। পূর্বে নামটা পরিচিত মনে হলেও তাৎক্ষণিক এতোসব ভাবার সময় হয়ে ওঠেনি। অবশেষে সে সম্পর্কের জোড়া বুনতে সক্ষম হলো। অতি আশ্চর্যের সুরে বললো,
– পরশ শিকদার তোর ভাই?
মাথা নাড়িয়ে সায় দিলো পাভেল। কিন্তু স্পর্শীর মুখাবয়ব পরিবর্তন হলো না। পূর্বের মতোই চোয়াল শক্ত রেখে বললো,

– তোর ভাই একটা জানোয়ার। তার নির্দেশে আট/নয়জন সন্ত্রাসী মিলে আমার ভাইকে পিটিয়েছে। তাও বিনা কারনে, কোনো ভুল ছাড়াই। ওকে খুন করিনি এটাই তো ভাগ্য। এরকম একটা অমানুষ কে ছুরি দিয়ে মারবো না তো চুমু দেবো?
ভড়কে গেলো পাভেল। স্পর্শী নিজেও থতমত খেয়ে তাকালো। পাভেল ছাড়াও এখানে যে আরো লোক আছে সেসব ভুলেই বসেছিলো। কথার তোড়ে ঘটিয়ে ফেলেছে এমন অঘটন। ঘটনা এড়াতে শক্ত কন্ঠে স্পর্শিয়া বললো,
– তোর ভাই সেটা আগে বললেই হতো। এবার কি আমাকে সাহায্য করবি না? তাহলে এসেছিস কেনো, মজা লুটতে?
ব্যস্ত চোখে সোভামের দিকে একবার তাকিয়ে স্পর্শীর দিকে ফিরলো। শান্ত কন্ঠে বুঝানোর স্বরে বললো,
– আমি আসলেই কিছু জানতাম না চড়ুই। সোভাম ভাইয়াকে কেনো মেরেছে তাও জানি না। জেনে নেবো, আগে তোকে ছাড়িয়ে নিই।
অফিসার সন্দেহের চোখে পাভেলের দিকে চাইলো। বললো,
– নাহ! ছাড়ানো যাবে না। যতক্ষণ না তোমার ভাই কেস না তুলবে, ততক্ষণে ছাড়া যাবে না।
পাভেল কিঞ্চিৎ সময় ব্যয় করলো না। তৎক্ষণাৎ কল লাগালো ভাইয়ের নম্বরে। রিসিভড হতেই হাই-হ্যালো না বলেই সরাসরি বললো,

– ভাইয়া, আমি থানায় আছি। চড়ুই কে ছাড়তে বলো।
পরশ অজ্ঞাত হয়ে চড়ুই নামটা আওড়ালো। পরক্ষণেই নিজেকে শুধরে নিলো পাভেল। এসব চড়ুই- টুনটুনি বললে তো আর ভাই চিনবে না। পুণর্বার শান্ত কন্ঠে বুঝিয়ে বললো,
– দেখো ভাইয়া, স্পর্শীয়া আমার বেস্টফ্রেন্ড। ওকে ছেড়ে দিতে বলো।
এতোক্ষণে নিশ্চিত হলো পরশ। তবে মুখভঙ্গি বদলালো না। চিবুক শক্ত করে বললো,
– ওই অসভ্য মেয়েটা শত শত মানুষের সামনে আমার কলার ধরেছে। পরশ শিকদারের কলার!!
চোখ বন্ধ করে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা চালালো পাভেল। স্পর্শীর দিকে তাকিয়ে ক্ষ্যাপাটে স্বরে বললো,
– তুই সবার সামনে আমার ভাইয়ের কলার ধরেছিস কেনো?
অবাক হয়ে তাকালো স্পর্শী। পরক্ষণেই ব্যঙ্গ করে বললো,
– ওহহ, আমি খুবই দুঃখিত! বড় ভুল হয়ে গেছে। আমার তো উচিত ছিলো লোকজনকে ডেকে জড়ো করা বলা “ আপনারা প্লিজ এখান থেকে যান। আমি পরশ শিকদারের কলার ধরে ঝাঁকাবো। ” এটাই তো! ওকে ডান। পরের বার থেকে খেয়াল রাখবো।
থতমত খেয়ে চোখ পাকালো পাভেল। সাথে সাথেই ওপাশ থেকে ভেসে এলো ঝাঁঝালো স্বর।
– এই অসভ্য, অভদ্র, বেয়াদপ মেয়েটাকে চুপ করতে বল। আমি এলে জিভ টেনে ছিড়ে ফেলবো।
– দেখো ভাইয়া, চড়ুই এমন মেয়ে নয়। ওর ভাইকে তোমরা মেরেছো বলেই রেগে গিয়ে এমনটা করেছে। আর যে কোনো বোনের পক্ষেই নিজেকে সামলানো কঠিন হবে। তুমি প্লিজ ওকে ছাড়তে বলো। বিষয়টা আলাদা ভাবে সমাধান করা যায় তো!
পাভেলের হাত থেকে ফোন টা টেনে নিলো অফিসার। বললো,

– আপনি কিছু করুন। এদিকে আপনার ভাই মেয়েটাকে ছাড়ানোর জন্য থানায় হাঙ্গামা শুরু করেছে। ওদিকে আপনার লোকেরা হুমকি দিচ্ছে যেনো না ছাড়ি। আমি কি করবো??
– ছাড়বেন না।
ইনস্পেকটরের পাশে থাকায় পরশের কথা শুনতে পেলো পাভেল। তাৎক্ষণিক টেনে নিলো ফোন। জেদ নিয়ে বললো,
– দেখো ভাইয়া, চড়ুই কে আমি কিছুতেই হাজতে রাত কাটাতে দেবো না। সেই ঢাকা থেকে এসেছি, এখনো বাড়িতে যায় নি। ভীষণ ক্লান্ত! ওকে ছেড়ে দিতে বলো, নাহলে আমি সারারাতেও থানা থেকে যাবো না।
পরশ শুনলো। শান্ত কন্ঠে বললো,
– আচ্ছা! ইনস্পেকটরের কাছে ফোন দে।
পাভেল দিলো। স্পর্শীর দিকে তাকিয়ে চোখের পাতা নামিয়ে আশ্বস্ত করে বললো – পাঁচটা মিনিট অপেক্ষা কর।
অফিসার ফোন নিয়ে এগিয়ে গেলেন টেবিলের দিকে। চেয়ারে বসে জিজ্ঞেস করলেন,
– কি করবো, ছেড়ে দেবো মেয়েটাকে?
– প্রশ্নই আসে না!
অবাক হলো ইনস্পেকটর। বললো,
– এদিকে আপনার ভাই…….
পুরো বাক্য শেষ হওয়ার পূর্বেই ওপাশ থেকে উত্তর ভেসে আসলো। বললো,
– ওকেও লকাবে ঢোকান।
হতভম্ব হয়ে বসা থেকে দাঁড়িয়ে পড়লো অফিসার। আশ্চর্যের সুরে বললো,
– কি? কিন্তু কেনো?
– যা বলছি তাই করুন।
দ্বিধায় পরে গেলেন অফিসার। কি করবেন তা ভেবে পেলেন না। এদিকে পরশ শিকদার ঠিক কি বলছেন তা বোধগম্য হলো না। পুণর্বার জিজ্ঞেস করে বললো,

– কিন্তু ওকে কেনো রাখবো? কারন তো নেই।
পরশ নির্লিপ্ত ভাবে উত্তর দিলো। বললো,
– হত্যাচেষ্টায় গ্রেফতার হওয়া আসামী ছাড়ানোর জন্য থানায় গিয়ে হাঙ্গামা করেছে, এর থেকে বড় কোনো কারন লাগবে লকাপে রাখার জন্য?
অফিসার বিভ্রান্ত হয়ে উত্তর দেয় – না!
– তাহলে তাই করুন।
কেঁটে দিলো ফোন। অফিসার উঠে এসে পাভেলের নিকট গেলো। হাতে তার লকাপের তালার চাবি। সেটা দেখে আশ্বস্ত হলো পাভেল। অবশেষে চড়ুই কে সে ছাড়াতে পেরেছে। কিন্তু ঘটলো তার বিপরীত। তালা খুলে পাভেলের কাঁধে হাত দিয়ে নুইয়ে বললো,
– ঢুকুন, ভেতরে ঢুকুন।
ধাক্কা মেরে ভেতরে ঢুকিয়ে দিলো পাভেলকে। ও হতবাক হয়ে অফিসারের দিকে তাকালো। যেনো কথা বলতে পারছে না।অফিসার হাসতে হাসতে বললেন,

রাজনীতির রংমহল ৩ পর্ব ১০

– তোমার নামে ইতোমধ্যে মৌখিক একটা কেস হয়ে গেছে। ভুক্তভোগী পরশ শিকদার নিজে করেছেন। তার হত্যাচেষ্টায় গ্রেফতার হওয়া আসামীকে ছাড়িয়ে নেওয়ার জন্য থানায় হাঙ্গামা করেছো।
এরপর সুজন ও শাওনের দিকে তাকিয়ে বললো,
– এবার তোমরাও যাও। নাহলে তোমাদেরকেও ঢোকাতে হবে।
সোভাম হতবাক দৃষ্টিতে সব টা দেখে কপালে হাত দিয়ে চলে গেলো বারান্দায়। অসুস্থ, ক্লান্ত শরীর টাকে নিয়ে আবারো বসে পড়লো বেঞ্চে। এতোক্ষণে মুখ খুললো স্পর্শী। আশ্চর্যের চরম সীমায় পৌঁছে বলে উঠলো,
– ছিঃ ছিঃ ছিঃ! এই তোর বাহাদুরি!

রাজনীতির রংমহল ৩ পর্ব ১২