রাজনীতির রংমহল ৩ পর্ব ১২
সিমরান মিমি
সোভামের কপালের উপর তিনটা মশা হুল ফুঁটিয়েছে। এখনো নামার নাম নেই সেগুলোর। স্পর্শীয়া হুশ – হুশ ধ্বনিতে আওয়াজ করে উঁড়িয়ে দিলো। সে মশা মারে না। মারলে বেজায় মন খারাপ হয়। ওরাও তো পেটের টানেই এসে রক্ত খায়। একজন মানুষের শরীরে কতখানি রক্ত। সেখান থেকে কয়েক ফোঁটা খেয়ে নিলে খুব বেশি ক্ষতি হবে বলে মনে হয় না। পাভেল নাক সিটকে তাকিয়ে রইলো। একটানা এক ঘন্টা জেলের ওই চৌদ্দ শিকের মধ্যে বসে মশার কামড় খেয়েছে। সারা পা এখন বেদম চুলকাচ্ছে। এলার্জির ন্যায় ফুলো ফুলো হয়ে উঠেছে জায়গা গুলো। দাঁড়িয়ে থাকা যাচ্ছে না একদমই। স্পর্শীয়ার এমন ধীর কাজে বিরক্ত হয়ে বললো,
– এএএএ!। এতো ঢং বাদ দিয়ে তোর ভাইটাকে তাড়াতাড়ি ওঠা। মশার যন্ত্রণায় দাঁড়াতে পারছি না।
চোখ লেগে গেছিলো সোভামের। নিস্তব্ধ এই মাঝরাতে খুবই কাছ থেকে হঠাৎ এমন আওয়াজ শুনে চমকে গেলো। ঘুম এবং ক্লান্তিতে চোখ দুটো টকটকে লাল হয়ে গেছে। সম্মুখে জেল থেকে মুক্ত হওয়া স্পর্শী এবং পাভেল কে দেখে অবাক হয়ে চাইলো।
– তোমাদের ছেড়ে দিয়েছে?
স্পর্শী মাথা নাড়িয়ে সম্মতিসূচক হ্যাঁ বললো। রাত প্রায় দুটো বাজে। এই মুহুর্তে গাড়ি পাওয়াও সম্ভব নয়। অথচ যাওয়ার মাধ্যম হিসেবে আছে শুধু বাইক। শেষে বাধ্য হয়ে ঠেলেঠুলে স্বল্প জায়গাটুকুতে তিন জন বসলো। প্রথমে পাভেল, পড়ে সোভাম এবং শেষে স্পর্শীয়া। স্থান সংকুলান থাকায় পাভেল প্রায় তেলের ট্যাংকের উপর চলে এসেছে। এদিকে স্পর্শী পড়ে যেতে পারে এই ভয়ে সোভাম এক হাত পেছনে দিয়ে স্পর্শীর পা এবং অন্যহাতে হাত টেনে শক্ত করে ধরলো। ঠিক পনেরো মিনিটের মাথায় সরকারি হাসপাতালের সামনে গিয়ে পৌছালো তারা। গাড়ি থেকে নামতেই গমগমে স্বরে পাভেল বললো,
– তোকে আমার সাথে ভাইয়ার কাছে যেতে হবে। বেশিক্ষণ লাগবে না… দশ মিনিট। এখন যাবি, নাকি কাল।
চোখের আকৃতি বড় করে তাকিয়ে রইলো স্পর্শী। খিটমিট
করে বলে উঠলো,
– অসম্ভব! কক্ষনো না।
পাভেল রেগে গেলো। ধমক মেরে বললো,
– একদম পাকামি করবি না। কালকের মধ্যে পিরোজপুর ছাড়বি। আর ভাইয়ার কাছে তোকে যেতেই হবে। এই এক শর্তেই ছেড়েছে। কেস কিন্তু এখনো তোলে নি।
– তো তোর ভাই আমায় না ছাড়লে, আমি কি জেলে বসে পঁচতাম নাকি? একদম এমপিগিরি ঘুঁচিয়ে দিতাম।
সোভাম ধমক মারলো স্পর্শীকে। এরপর পাভেলের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বললো,
– যদি দেখা করতেই হয়, তাহলে আমি গিয়ে করে আসবো। চড়ুই যাবে না। আর তাছাড়াও সকালের বাসে ও ঢাকা যাবে।
চলে গেলো পাভেল। সোজা হস্পিটালের তৃতীয় তলায়। গ্রাউন্ড ফ্লোরে রেখে গেলো ক্ষুদ্ধ এক রমনীকে। সে শাঁসিয়ে ভাইয়ের উদ্দেশ্যে বললো,
– তুই একদমই ওই পরশ শিকদারের কাছে যাবি না। ওর সামনে যাওয়া মানে ক্ষমা চেয়ে নিজেকে ছোট করা। আমরা কি কোনো ভুল করেছি যে ক্ষমা চাইবো?
সোভাম খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে দোতলায় উঠতে লাগলো। স্পর্শীর উদ্দেশ্যে বললো,
– বাচ্চামি করিস না। সব জায়গায় মুখ চালালেই হয় না, বুঝে শুনে কথা বলতে হয়। এটা জাহাঙ্গীর নগর না, পিরোজপুর। এখানের একটা চায়ের দোকান পর্যন্ত রাজনৈতিক অন্তর্জালে সীমাবদ্ধ। সামান্য একটা বিষয় নিয়েও বড় আকার ধারণ করায় রাজনীতিবিদরা। আর তাছাড়াও, সামনে নির্বাচন। এসেছি সপ্তাহ ও হয়নি। অকারণে জড়িয়ে পড়েছি, বাদবাকি বাঁশ টুকু তুই এসে দিলি। যাই হোক, কাল চলে যাবি, বাকি টা আমি সামলে নেবো।
তৃতীয় তলার ভি-আইপি কেবিনের এক পাশে দাঁড়িয়ে রইলো পাভেল শিকদার। দৃষ্টি তার ফ্লোরে নিবদ্ধ। নত মস্তিষ্কে, নিশ্চুপ হয়ে অপেক্ষা করতে লাগলো বড় ভাইয়ের প্রশ্নের। পরশ শান্ত দৃষ্টিতে চেয়ে দেখলো পাভেলকে। কোনো কথা নেই, বার্তা নেই, অনুরোধ -অনুযোগ কিছুই নেই। যেনো এ যাবৎ কিছু ঘটেই নি এখানে। পরশ নিজেও চুপ করে পাভেলের পা থেকে মাথা অবধি চোখ বোলাতে লাগলো। এ পর্যায়ে ভয়ে হাসফাস করে উঠলো বেচারা। ঢোক গিলে বললো,
– ওষুধ খেয়েছো, ভাইয়া?
উত্তর এলো না। এতে পুণরায় হতাশ হলো সে। পাশে সুমন, সুজন, শাওন ও রয়েছে। আলাদা থাকলে ব্যাপার টা অন্যরকম হতো। কিন্তু এখন তার দলের লোকের সম্মুখে। কোনোমতে অপমান করে বসলে লজ্জায় মাথা তুলতে পারবে না। ইতোমধ্যেই জেলে ঢুকিয়ে মান- ইজ্জত সব লুটে নিয়েছে। পরিস্থিতি ঘোরাতে বললো,
– হস্পিটালে না থাকলেও তো হতো। এই টুকু চোট, বাড়ি যাই চলো। ক্লান্ত লাগছে অনেক।
– এতোটুকু চোট?
পরশের গম্ভীর কন্ঠস্বর শুনে ভড়কে গেলো পাভেল। কিছু বলার পূর্বেই সুমন গর্জে উঠলো। বললো,
– এইটুকু চোট মানে কি? ছয় ছয়টা সেলাই লাগছে। তুই কি আরো বেশি ক্ষতি চাইছিলি?
কটমট করে সুমনের দিকে তাকালো পাভেল। সে থেমে গেলো। পরশ রুদ্ধশ্বাস ফেলে জানতে চাইলো,
– মেয়েটা কে?
পাভেল চমকে উঠলো। ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে পুণরায় দৃষ্টি নামিয়ে ফেললো। ধীর আওয়াজে বললো,
– আমার ফ্রেন্ড, বেস্ট ফ্রেন্ড।
– সবার সামনে আমাকে এভাবে হাসির পাত্র না বানালেও পারতি!
পাভেল আঁৎকে উঠলো। জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে ভাইয়ের দিকে তাকালো। সাথে সাথেই অভিমান মিশ্রিত কন্ঠে বললো,
– একটা মেয়ে, তার ভাই কে মেরেছি বলে আমার উপরে হামলা করলো। শত শত জনতার সামনে আমার কলার ধরে অপমান করলো, আমাকে হত্যা করার চেষ্টা করলো। অথচ তাকে জেল থেকে ছাড়ানোর জন্য আমারই ছোট ভাই থানায় গিয়ে তামাশা শুরু করলো। এমনকি মেয়েটাকে না ছাড়লে সেও আসবে না। ব্যাপার’টা বড্ড সুন্দর। আমার প্রতিপক্ষরা এ কথা শুনে মিষ্টি বিতরণ করবে যে, “ আমার শত্রুদের বাইরের কেউ নয়, আমার ভাই’ই বাঁচিয়েছে।”
পাভেল দ্বিধা নিয়ে ভাইয়ের নিকট গেলো। তার পাশে বসে মাথা নিচু করে অনুরোধের সুরে বললো,
– বিশ্বাস করো ভাইয়া, আমি এমন কিছুই ভাবি নি। পুরো সময়টাতে সিদ্ধান্ত হীনতায় ভুগছিলাম। মাত্র এক সপ্তাহ হবে স্পর্শীয়ার ভাই পিরোজপুরে এসেছে, চাকরির জন্য। এর মধ্যে কি এমন করেছে যার কারনে তোমরা ওকে এভাবে মারবে? সেসবও নাহয় বাদ দিলাম। কিন্তু স্পর্শীর থেকে যা শুনলাম তাতে ও পিরোজপুরে এসেছে সন্ধ্যারও অনেক পড়ে। এসে শামসুল সরদারের মুখোমুখি পড়েছিলো। তুমিই বলো, যে মেয়েটা ঘন্টা খানেক ও হয়নি পিরোজপুরে এসেছে, সে কিভাবে তোমায় চিনবে আর এভাবে খুন করার চেষ্টা করবে? ও নাকি থানায় যাচ্ছিলো কেস করতে, এর মধ্যেই গাড়ি থেকে নেমে তোমায় আক্রমণ করলো! ব্যাপার টা সন্দেহজনক না? আরে সরদার রা চাইছিলোই তুমি কোনো ফ্যাঁসাদে পড়ো। একে তো একজন শিক্ষককে অকারণে মেরেছো, অন্যদিকে তার বোনের গায়েও হাত তুলেছো। ভাগ্যিস ওটা স্পর্শীয়া ছিলো, আর রাগ সামলাতে না পেরে ছুরি ঢুকিয়ে দিয়েছে। না হয় পুরো ঘটনাটা অন্যভাবে রটতো। দেখো, আমি নিশ্চিত ভাবে বলতে পারি ——— এ ঘটনায় স্পর্শী বা সোভাম ভাইয়ের কোনো হাত নেই। কারোর প্ররোচনায় এমন ঘটনা ঘটেছে, আর মাঝখানে ফেঁসে গিয়েছে।
পরশ গম্ভীর হয়ে পুরোটা শুনলো । এর মধ্যেই সুমন ক্ষ্যাপাটে কন্ঠে বললো,
– এক সপ্তাহও হয় নি পিরোজপুরে এসেছে। কিন্তু তেজ তো আকাশ ছোঁয়া! ওই দুই টাকার মাস্টার আমাগো অমানুষ, জানোয়ার যা ইচ্ছা তাই বলে গালি দিছে। সুজনের মাথা ফাঁটাইছে। আর তাছাড়াও শামসুল সরদারের সাথে ওর ভাব ছিলো… সন্ধ্যায়ও ও বাড়িতে ঢুকতে দেখছি।
– তো, ও বাড়ি ঢোকা কি নিষিদ্ধ? যে ঢুকবে তারেই মারবা? এই তোমাদের জন্যই বাড়তি বাঁশ আমার ভাই খায়। যেখানে সেখানে মারামারি, ঝামেলা করে বেড়াও —— আর নাম হয় পরশ শিকদারের।
দুজনের তর্ক বিতর্কের মধ্যেই উঠে দাঁড়ালো পরশ। হাতের ফোন টা পকেটে ঢুকিয়ে বেরিয়ে গেলো কেবিন ছেড়ে। ওরা অবাক হলো। রেশ কাটতে না কাটতেই ছুটলো পেছনে। মাত্রই গাড়ির মধ্যে প্রবেশ করেছে পরশ। পাভেল হতদন্ত হয়ে ঢুকে পড়লো পাশের সিটে। বাকিরা ঢুকতে গেলেও বাঁধ সাধলো পরশ। গম্ভীর আওয়াজে নিস্তব্ধ রাতটাকে জাগ্রত করে বললো,
– যে যার বাড়ি চলে যা। নাহয় ক্লাবে গিয়ে পড়ে থাক। বিরক্ত করবি না।
ওরা আর কথা বাড়ালো না। চুপচাপ বাইকে উঠে চলে গেলো বাড়ির উদ্দেশ্যে। পরশের মেজাজ খারাপ হলেই চুপ হয়ে যায়। কন্ঠে শীতলতা বাড়ে, যেনো ঝড়ের পূর্বাভাস। আজকের রাত টুকু হস্পিটালে পার করে দেবার কথা ছিলো পরশের। যাতে সকাল হলেই সকল নিউজের হেডলাইন হয়, ‘ প্রতিপক্ষের সাজানো ষড়যন্ত্রের স্বীকার হয়ে গুপ্ত এক নারী ঘাতক দ্বারা প্রাণ সংশয়ে পড়েছিলেন তরুন রাজনৈতিক নেতা পরশ শিকদার!’
সেজন্যই ড্রাইভার কে বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছে সুমন। কিন্তু এই মাঝরাতে হুট করেই মত ঘুরে গেলো পরশের। এখানে থাকা কোনো মতেই তার পক্ষে সম্ভব না। ঘুম হচ্ছে না। তাছাড়াও দীর্ঘ একটা দূরত্ব পাড়ি দিয়ে পাভেল এসেছে। এভাবে জেলে, হস্পিটালে নির্ঘুম থাকলে নিশ্চিত অসুস্থ হয়ে পড়বে। সব মিলিয়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে কাউকে না জানিয়েই হুট করে নিচে নেমে এসেছে। পরশের আঘাত লেগেছে ডান হাতের পেশিতে। ধাঁরালো চিকন ছুরিটা প্রায় দেবে গেছে এক ইঞ্চি। ব্যান্ডেজে বাঁধা হাত টাকে কোলের মধ্যে রেখে বাঁ হাত দিয়ে স্টিয়ারিং ঘুরাতেই পাভেল বাঁধ সাধলো। কতকটা ভয়, জড়তা নিয়ে বললো,
– আমি চালাই গাড়ি….
কোনো উত্তর এলো না। শুধু নিরবতায় পরিবেশ টাকে আচ্ছন্ন করে বাড়ির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। সিটে গা হেলিয়ে দিয়ে চোখ বন্ধ করলো পাভেল। রুদ্ধশ্বাস ফেলে অবলীলায় বলে উঠলো,
– আমি ভয় পেয়ে গেছিলাম।
– পাওয়াটা অস্বাভাবিক কিছু ছিলো না। ছুরিটা বুকে লাগলে কলিজা অবধি ঢুকে যেতো।
মাথা নিচু করে ফেললো পাভেল। যেনো দোষ টা তার। বললো,
– সোভাম ভাইয়ার সাথে কোনো শত্রুতা রেখো না। সে এখানকার বেসরকারি কলেজের শিক্ষক। ঢাকা থেকে এসেছে। এতো প্যাঁচগোছ বোঝে না। সুমন ভাইদেরও একটু বারণ করে দিও। আর.. আর স্পর্শী কাল সকালেই চলে যাবে ঢাকায়।
বাড়ির গেটের সামনে এসে গাড়ি থামালো পরশ। দারোয়ান চাচা নেই। আজ রাতে আসবে না বলেই সে তালা দিয়ে চলে গেছে ঘুমাতে। পরশ পকেট থেকে চাবির রিং বের করলো। গেটের তালা খুলতেই পাভেল এগিয়ে এসে গেট টেনে খুলে দিলো। কিন্তু তার এই সাহায্য ফিরেও দেখলো না পরশ। গাড়ি গ্যারেজে রেখে ধপাধপ পায়ে চলে গেলো নিজের রুমে। হতাশ চিত্তে দাঁড়িয়ে ভাইকে চেয়ে দেখলো, এরপর চুপচাপ চলে গেলো নিজের রুমের দিকে।
‘কলেজে যাচ্ছিস না কেনো? ’
পরশের গম্ভীর আওয়াজ পেয়ে কেঁপে উঠলো প্রেমা। সকালের নাস্তা খেতেই নিচে নেমেছে সে। বাকিরা ইতোমধ্যেই বসে গেছে। চেয়ার টেনে বসতেই ভাইয়ের প্রশ্নে চমকে উঠলো। কিছুটা রাগ, ক্ষোভ, অভিমান মিশ্রিত কন্ঠে বলল,
– যাবো না।
পরশ ভ্রুঁ কুঁচকে বোনের দিকে তাকালো। খাওয়া বন্ধ করে বললো,
– কারন বল।
– ভাইয়া, সবদিনই যে কলেজে যেতে হবে এমন কোনো কথা নেই। আমার ইচ্ছে করেনি, তাই যাই নি।
প্রেমার ধাঁরালো উত্তর। পিয়াশা আহাম্মক হয়ে গেলেন। মেয়ের দিকে তাকিয়ে রগচটা কন্ঠে বললেন,
– বড় ভাইয়ের সাথে এ কেমন আচরণ? মুখ ভেঙে দেবো।
পরশ সন্দেহ নিয়ে চেয়ে রইলো বোনের দিকে। প্রেমা যে রেগে কথাগুলো বলছে তা স্পষ্ট বোধগম্য হচ্ছে। কিন্তু রাগের কারন টা ধরতে পারছে না। কন্ঠে শীতলতা এনে ধীর কন্ঠে বললো,
– ইচ্ছে না হলে যাস না। তবে এখানে ভিন্ন কিছুর ইঙ্গিত পাচ্ছি আমি। কারন বল, এক্ষুণি।
শেষের এক্ষুণি শব্দের জোড়ালো ধমকে প্রেমা কেঁপে উঠলো। ভয়ে কেঁদে দিলো। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বললো,
– কোন মুখে আমি কলেজে যাবো? আমার কি লজ্জা নেই, মান নেই, সম্মান নেই। আমার টিচারকে তোমার গুন্ডা-পান্ডারা রাস্তায় ফেলে পিটিয়েছে, হাত ভেঙে দিয়েছে—— এর থেকে লজ্জার আর কিইবা হতে পারে? আমি কোন মুখে তার ক্লাস করবো? আর সহপাঠীদের সামনেই বা কিভাবে দাঁড়াবো? যাবো না আর কলেজে। লেখাপড়া সব বন্ধ। যার ভাই রাজনীতির নাম নিয়ে গুন্ডামি করে বেড়ায়, তার বোনের লেখাপড়া করার দরকার নেই।
চোখ খিঁচিয়ে বন্ধ করে ফেললো প্রেমা। কি বলতে গিয়ে কি বলে ফেলেছে। না জানি এক্ষুণি একটা দাবাং মার্কা চড় এসে তার গালে লাগে। প্রেমা শরীর খিঁচিয়ে সংকুচিত হয়ে মাথা নত করে রইলো। এদিকে পিয়াশা অনবরত ঝাড়ছেন মেয়েকে। পরশ চেয়ে রইলো প্রেমার দিকে। খানিক সময় নিয়ে কিছুক্ষণ ভাবলো। এরপর না খেয়েই উঠে গেলো টেবিল থেকে। এতোক্ষণ চুপ করে থাকলেও এবারে কথা বলে উঠলো আমজাদ। মেয়ের দিকে তাকিয়ে ধমক মেরে বললেন,
– এতো লজ্জা তোমার! ছেলেটাকে খেতে অবধি দিলে না। তোমার স্যারের সাফাই গাইছো? সে কি করেছে তা জানো? সুজনের মাথা ফাঁটিয়েছে, সরদার দের সাথে হাত মিলিয়ে বোনকে লেলিয়ে দিয়েছে পরশের পিছনে। সেই বেয়াদপ মেয়ে কাল রাতে শত শত লোকের সামনে খুন করার চেষ্টা করেছে তোমার ভাইকে। ভাগ্যিস বুকে না লেগে হাতে লেগেছে। কতটা সাংঘাতিক বিপদ গিয়েছে ওর ওপর থেকে ভাবতেই আত্মা উঁড়ে যাচ্ছে। আর তুমি এখনো তোমার স্যার কে নিয়ে পড়ে আছো!
হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইলো প্রেমা। বারকয়েক চোখের পলক ফেলে পাভেলের দিকে তাকালো। এতোকিছু হয়ে গেলো, অথচ সে কিছু জানেই না। তারমানে ভাইয়া কাল ক্লাবে নয়, হস্পিটালে ছিলো। উফফফ! কতটা নৃশংস মেয়ে, ভেবেই কান্না পাচ্ছে প্রেমার। বাবা উঠে গেছেন রেগে। পিয়াশাও এঁটো প্লেট হাতে রান্নাঘরে গেলেন। মুখটাকে প্রেমার খুব কাছে নিয়ে ঠোঁট এলিয়ে হাসলো পাভেল। ওমন বিশ্রী হাসি দেখে বিরক্তি নিয়ে দূরে সরে গেলো প্রেমা। বললো,
– দাঁত ব্রাশ করিস নি? ছিহ!
পাভেল এই প্রশ্নের উত্তর দিলো না। বরং বোনকে পুনরায় ভড়কে দিতে বলে উঠলো,
– এরপর সেই মেয়ের কি হয়েছে জানিস?
প্রেমার কৌতূহল বাড়লো। দ্রুত কাছে এসে পলক ঝাপটে বললো,
– নাহ! তুই বল।
– মেয়েটাকে গ্রেফতার করে পুলিশ নিয়ে গেছে।
চোখ মুখ চকচক করে উঠলো প্রেমার। সন্তুষ্টি নিয়ে বললো,
– ভালো হয়েছে।
পাভেল পুণরায় হাসলো। রহস্য করে বললো,
– তারপর কি হয়েছে শুনবি?
উপরনিচ মাথা ঝাঁকিয়ে হ্যাঁ সম্মতি দিলো প্রেমা। পাভেল রসিয়ে রসিয়ে বললো,
– এরপর কল এলো আমার মতো এক নামী দামী ব্যক্তির কাছে। মেয়েটা বললো তার সাহায্য প্রয়োজন। আমি আসলাম, তাকে জেল থেকে ছাড়ানোর জন্য জেদ ধরলাম ভাইয়ার সাথে।
কথা শেষ করার পূর্বেই প্রেমা মুখ বিকৃত করে বলে উঠলো,
– ছিহ! তুই কি মানুষ? কিভাবে ওই নৃশংস মেয়েটাকে ছাড়াতে গেলি ——যে কিনা ভাইয়াকে খুন করতে চেয়েছে?
– উঁহু শোন না। এরপর ভাইয়া আমাদের দুজনকেই জেলে ভরে দিলো। ঠিক এক ঘন্টা পর ইনস্পেকটর এসে ছেড়ে দিলো।
প্রেমা ক্ষিপ্ত হলো। রুক্ষস্বরে বললো,
– ভালো করেছে। আমি হলে একটানা তিন মাস তোকে জেলে ভরে রাখতাম।
সরদার মঞ্জিলে গোপন বৈঠক চলছে। স্থান : শামসুল সরদারের স্ট্যাডি রুম। সেখানে মধ্যমনি তিনি হলেও আরো রয়েছে পাঁচজন। বাহার, রিহান, খলিল, সজল এবং কাদের। এতো সুন্দর সাঁজানো পরিকল্পনা নিমিষেই শেষ হয়ে গেলো। যেখানে খবরের কাগজের হেডলাইন হওয়ার কথা ছিলো -‘ পরশ শিকদারের নির্দেশে সন্ত্রাসীরা এক কিশোর এবং শিক্ষককে বিনা কারনে নৃশংস ভাবে পিটিয়েছে, এমনকি শিক্ষকের বোনের সম্মানের উপরেও আঘাত করেছে জনসম্মুখে।’
সেখানে নিউজ হচ্ছে উল্টো তাদের বিপক্ষে। পরশ শিকদারকে মার্ডার করার চেষ্টা! এই ঘটনায় একজন অন্ধ ব্যক্তিও সরাসরি সন্দেহ করবে শামসুল সরদারকে।
কপালে আঙুল দিয়ে ঘঁষতে লাগলেন শামসুল। সে চিন্তিত। বাহার বিরক্ত কন্ঠে বললো,
– ভাবতেই পারি নি এই মেয়ে সোজা ছুরি নিয়ে হামলা করবে।
শামসুল সরদার হাসলেন। বললেন,
– মেয়েটাকে কাজে লাগাতে হবে। মাস্টার একটু ঠান্ডা হলেও বোনটা পুরো আগ্নেয়গিরির লাভা। ওকে যে কোনো সময় দাবানলে পরিণত করতে পারবো। এর তেজ, দুঃসাহস, দীপ্তি
সবকিছুই পরশ শিকদারকে ধ্বংস করার জন্য যথেষ্ট।
বাহার মনোযোগী হলো। তাড়াহুড়ো করে লোলুপ দৃষ্টিতে বলে উঠলো,
– এমনিতেও তো ওই মেয়ে এখন পরশ শিকদারের চোখের বিষ। এই মুহুর্তে ওর কিছু হলে সোজা ওইই ফাঁসবে। চাচা, রেপ কেসে ফাঁসাইয়া দেই?
মুহুর্তে ’ই গালের উপর সপাটে থাপ্পড় মারলো শামসুল সরদার। উপস্থিত সবাই বাকহারা হয়ে গেলো। বাহার গাল ঘঁষতে ঘঁষতে লজ্জালু কন্ঠে বললো,
– না মানে চাচা…..
ক্ষুদ্ধ হলো শামসুল সরদার। চেঁচিয়ে উঠে বললেন,
– নির্বাচন পর্যন্ত আমি যা বলবো তার এক পাও বাইরে যাবি না কেউ। গেলে ওই পা কেঁটে ফেলবো আমি। এহহহ! আসছে আমার পরিকল্পনা নিয়া। কতটুকুই না রাজনীতি বুঝো তুমি? পারো শুধু আকাম ঘটাইতে। যেখানে আমি বললাম ওই মেয়েকে কাজে লাগাবো, সেখানে ওকে নিস্তেজ করে দেওয়ার পরিকল্পনা করছিস তুই? শু**য়োর!
– আমি বুঝতে পারি নাই চাচা।
কিছুটা শান্ত হলেন শামসুল। খানিক্ষণ বিরতি নিয়ে বললেন,
রাজনীতির রংমহল ৩ পর্ব ১১
– মেয়েটাকে কাল রাতে ছেড়ে দিছে। খুব সম্ভবত ও ওর অসুস্থ ভাইকে রেখে এখান থেকে যাবে না। সুযোগ তাহলে এতোটুকুই। ঠিক চার/পাঁচ দিনের মাথায় ওই মাস্টারের উপর এট্যাক করবি, যেনো কেউ চিনতে না পারে। তবে প্রাণে মারবি না। ও যেনো বোঝে তোরা শিকদারের লোক। আর এতোটুকু ওই মেয়ের কানে পৌঁছালেই হবে। বাকিটা ও করবে! নির্বাচনের আগে আর কোনো ঝামেলায় জড়াবি না।
