Home রাজনীতির রংমহল ৩ রাজনীতির রংমহল ৩ পর্ব ১৩

রাজনীতির রংমহল ৩ পর্ব ১৩

রাজনীতির রংমহল ৩ পর্ব ১৩
সিমরান মিমি

জানালার পর্দা ভেদ করে সকালের মিষ্টি রোদ ভেতরে উঁকি দিচ্ছে। ক্ষণে ক্ষণে নরম, শীতল হাওয়া গুলোও তেজের সাথে ছুঁয়ে দিচ্ছে দেহ। গ্রীষ্মের শেষ সময়। এই তো শীত নিজের সূচনা ঘটিয়ে নিয়েছে ইতোমধ্যে। ভোর রাতে নরম, কোমল, ঠান্ডা আবহাওয়া, সকালের ক্ষানিক কুয়াশার বিচরণ প্রমাণ দিচ্ছে শীতের। স্পর্শীর হাত টা যন্ত্রণায় ছিঁড়ে যাওয়ার উপক্রম। ঘাড়টাও সোজা করা কষ্টসাধ্য। এমন মিষ্টি আবহাওয়ায় দুষ্ট যন্ত্রণায় ঘুম ভেঙে গেলো তখনই। চোখ খুলে ধ্যান আনতেই খেয়াল হলো ব্যথার কারন। ছোট্ট বেডটার এক পাশে হাটু ভাঁজ করে ঘুমিয়ে রয়েছে সোভাম। তার পায়ের পাশের ফাঁকা স্থান টুকুতে হাত-পা গুঁটিয়ে শুয়েছিলো সে। ঘুমের মধ্যে মাথা এবং হাত বেঁকে থাকায় যন্ত্রণা হচ্ছে ভীষণ। হাতটা তো নাড়ানোই যাচ্ছে না। নব্বই দশকের সেই ঝিরঝিরে টিভির পর্দার ন্যায় অনুভব হচ্ছে।

এখানকার বাথরুমের অবস্থা খুব একটা আশানুরূপ নয়। অতিরিক্ত লোকের প্রভাবে তা পরিণত হয়েছে ডাস্টবিনে। সরকারি হাসপাতাল হলে যা হয় আর কি! এখানকার ঝাড়ুদারের আচরণেই আপনি দ্বিধায় পড়ে যাবেন। তাকে দেখে বুঝতে পারবেন না সে মালিক নাকি ঝাড়ুদার। ঠিক নির্দিষ্ট কিছু স্কুল এবং কলেজের দপ্তরির মতো। তাদের প্রভাব এবং আচার-আচরণ দেখে মনে হবে ইনিই এখানকার প্রিন্সিপাল। এতো বিস্তারিত কথায় না-ই বা যাই….
হালকা ফ্রেশ হওয়ার উদ্দেশ্য নিয়ে বাথরুমে ঢুকলেও খুব একটা সফল হলো না স্পর্শীয়া। বের হলো বমি করার ন্যায় কাঁশতে কাঁশতে। সোভামের ঘুম ভেঙে গেছে। বোনকে দেখে চিন্তিত হয়ে বললো,
– খুব বেশি সমস্যা হচ্ছে?
সোভামের প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে স্পর্শী তার পাশে বসলো। নাক-মুখ চেপে সেকেন্ড খানেক বসে নিজেকে সামলে নিলো। তারপর কপালে ভাঁজ ফেলে বললো,

– এখানে ভর্তি থাকার কোনো প্রয়োজন নেই। বাসায় চল! নিয়ম মতো ওষুধ খাবি, আর সপ্তাহে এক —দু-বার এসে ডাক্তার দেখিয়ে নিবি। যা পরিবেশ তাতে সুস্থ মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়বে।
দ্বিমত করলো না সোভাম। বোনের কথায় সায় দিয়ে বললো,
– ঠিক আছে! নার্স এলে ছাড়পত্রের ব্যাপারে কথা বলে নিবো। তবে এখন তুই ওঠ! বাইরে থেকে হালকা কিছু নাস্তা করে বাসে উঠে পড়। নয়টা- দশটার বাসে উঠলে দিনের মধ্যে পৌঁছে যাবি।
আকস্মিক এমন কথায় স্পর্শী হতবাক হয়ে গেলো। ওষুধ গুলো ব্যাগে গুঁছিয়ে নিয়ে ভর্তি ফর্মটা হাতে নিলো। তীর্যক শাসনের সুরে বললো,
– পাগল নাকি তুই? কাল এসেছি মাত্র, এখনই চলে যাবো! আমাকে কি তোর রোবট মনে হয়? বাসে চড়ার মতো এনার্জি নেই। তাছাড়াও রাতে ঘুম হয়নি, খাওয়া হয় নি। সবমিলিয়ে বেজায় ক্লান্ত! আগে তোর বাসায় যাবো, ঘুমাবো, খাবো —— এরপর দেখা যাবে।
স্থির দৃষ্টিতে বোনের দিকে তাকিয়ে রইলো সোভাম। এই কথার প্রেক্ষিতে ঠিক কি বলা উচিত ভেবে পেলো না। তবে নতুন কোনো ঝামেলার আশংকা হতে লাগলো। ভাইয়ের দুশ্চিন্তাগুলো মুখের দিকে তাকিয়েই পড়ে ফেললো স্পর্শীয়া। তাকে সম্পুর্ন ভাবে আশ্বস্ত করে বললো,
– আরেহহ! এতো ভাবিস না। তোকে আর কোনো বিপদে ফেলবো না। শুধু দুদিন বিশ্রাম নেবো, এরপরই চলে যাবো।

ঘরের দরজা আলতো হাতে ঠেলে একটা ছায়া প্রবেশ করলো পরশের ঘরে। একজন নারী! আকর্ষণীয় গড়নের অত্যধিক সুন্দরী নারী। সে অবলীলায় হেঁটে গিয়ে বিছানার পাশে দাঁড়ালো। মুখে বিস্তর হাঁসি। পরশ অনেক চেষ্টা করেও চোখ খুলতে পারলো না। হাতের যন্ত্রণায় গত রাতে জ্বর এসেছে শরীরে। নারীটি পরশের সাড়াশব্দ না পেয়ে হেঁটে গেলো জানালার দিকে। দুহাতে ধরে টেনে খুলে দিলো পর্দা,জানালা। মুহুর্তে’ই আলোর সেই তীর্যক রশ্মি এসে পড়লো পরশের চোখের উপর। সে বিমুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে দেখলো মেয়েটাকে। যার পরণে ফিনফিনে সুতির শাড়ি। পর্দা সরিয়ে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দৃশ্যমান হলো স্বল্প মেদ যুক্ত উদর। যা দেখতেই ঢোক গিললো সে। ইচ্ছে করলো দুহাত বাড়িয়ে ছুঁয়ে দিতে। কিন্তু পারলো না। শরীরের তাপমাত্রাকে ব্যর্থ করে চোখ ই খুলতে পারলো না।
নারীটি হাসি মুখে এগিয়ে গেলো তার দিকে। মুখের উপর ঝুঁকে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিলো কপালে। উফফফ! অকল্পনীয় স্পর্শ! পরশ তৃষ্ণার্ত হলো। সারা গা জ্বরের তাপমাত্রায় কাবু। তৎক্ষনাৎ এমন ঠান্ডা, কোমল স্পর্শ যে তাকে সুস্থ করে দিতে সক্ষম। পরশ ক্ষান্ত হলো না। নারী টি ঠোঁট সরিয়ে নিতেই ঘুম ঘুম কন্ঠে আবদার করে বললো,
– আরেকটা, প্লিজ!

কিন্তু তার সেই আকুল হওয়া আবদার সম্পুর্ন রুপে অবহেলা করে নারী টি মিলিয়ে গেলো সূর্যের প্রথম তেজস্বী, মিষ্টি কিরণের সাথে। তৎক্ষণাৎ চোখ খুলে ফেললো পরশ। সম্মুখে অন্ধকার রুম টা আবিষ্কার করে চোখ বন্ধ করে ফেললো পুণরায়। এতোগুলো বছর পার হওয়ার পর এমন অদ্ভুত, চিত্তস্পর্শী, অনাকাঙ্ক্ষিত স্বপ্ন দেখার মানে কি? এটা কি শুধুই জ্বরের ঘোরের দুঃস্বপ্ন! নাকি ভিন্নকিছু…
মস্তিষ্ক সচল হওয়ার সাথে সাথে জ্বরের কথা বেমালুম ভুলে বসলো পরশ। হাতের ক্ষতকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ঢুকে পড়লো বাথরুমে। গতকাল সারাদিনে বের হওয়া হয়নি বাড়ি থেকে। একের পর একেক রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ বাড়িতে এসেই দেখে গেছে তাকে। সঙ্গে নানা পরামর্শও ছিলো। তবে এখন আর বসে থাকলে চলবে না। সামনে সপ্তাহে নির্বাচন — এই মুহুর্তে ঘরে বসে থাকলে চলবে না।
গতকাল গোসল করা হয় নি। কাঁচা সেলাই ভিঁজে গেলে ইনফেকশন হবে ভেবেই মায়ের কড়া বারণ ছিলো। সে কথা মেনেছে পরশ। তবে আজ আর এভাবে থাকা যাচ্ছে না। গোসল না করলে একটু পর থেকেই মাথা যন্ত্রণা শুরু হয়ে যাবে। তাছাড়াও গোসল না করলে সে নিদ্রাহীন থাকে। চোখের পাতায় ঘুম আসে না। গোসল সেরে মাথা মুছতে মুছতে রুমে প্রবেশ করলো পরশ। গায়ে গেঞ্জি জড়ানোর পর মনে হলো বাইরে কেউ আছে। সে তাকালো, দরজা চাপানো দেখে পুণরায় তোয়ালে নিয়ে বারান্দায় মেলে দিলো। তবুও সন্দেহ ক্ষীণ হচ্ছে না। সে এগিয়ে গেলো সেদিকে। এরইমধ্যে চিকন, স্নিগ্ধ, সুরেলা কন্ঠে প্রেমা বলে উঠলো,

– ভাইয়া, আসবো?
থেমে গেলো পরশ। পুণরায় আয়নার সামনে গেলো। গম্ভীর আওয়াজে বললো,
– আয়!
বাঁ হাত দিয়ে অতি সন্তর্পণে দরজা খুললো প্রেমা। চঞ্চল পায়ে হেঁটে এলো ভেতরে। পরশের টেবিলের উপর হাতের শৌখিন বাটি টা রেখে রয়েসয়ে বললো,
– তোমার নাকি অনেক জ্বর, মা বললো। শোনো ভাইয়া, জ্বরের সময় ঝাল- টক খেলে ভালো লাগে। জ্বর কমে যায়।
এটুকু বলে থামলো প্রেমা। আঁড়চোখে তাকালো পরশের দিকে। সে খাটে বসে ফোন টিপছে। মুখের ভাব পূর্বের মতোই গম্ভীর। প্রেমা দমলো না। এ পর্যায়ে উৎফুল্ল কন্ঠে বললো,
– আমি আজ ঝাল ঝাল নুডুলস রেঁধেছি। একদম মায়ের মতো। তুমি তো আবার মায়ের রান্না ছাড়া পছন্দ করো না। একবার টেস্ট করে দেখো অনেক মজা হয়েছে।
পরশ টেবিলে রাখা বাটির দিকে চাইলো। নুডুলসের রঙ ই বলে দিচ্ছে তার ঝাঁঝ। সে প্রেমার দিকে তাকিয়ে শান্ত কন্ঠে বললো,

– আচ্ছা!
মৃদু হেসে যেতে গিয়েই দাঁড়িয়ে পড়লো প্রেমা। বললো,
– আমার সামনেই টেস্ট করো। ভালো না লাগলে ফেলে দিও না প্লিজ! তুমি না খেলে পাভেল ভাইকে দেবো।
এই কথা শুনে চমকালো পরশ। হাত বাড়িয়ে বাটি নিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
– পাভেলের জন্য রাখিস নি?
– না! শুধু তোমার আর আমার জন্য বানিয়েছি। ওকে দেবো না। আমি ভীষণ রেগে আছি।
পরশ অগোচরে হাসলো। এক চামচ মুখে নিয়ে চিবিয়ে স্বাদ বোঝার চেষ্টা করলো। মন্দ নয়। তবে ঝাল টা একটু বেশিই দিয়েছে। পরশ খাবারে খুব কম ঝাল খায়। নিত্যদিন এতো ঝালের খাবার ছুঁয়ে না দেখলেও আজ খাচ্ছে। জ্বরে তেঁতো হয়ে থাকা জিভ টা অন্যরকম স্বাদ পাচ্ছে। তবে খুব বেশি খেতে পারলো না। চার-পাঁচ চামচ খাওয়ার পর রেখে দিলো বাটি। ধীরস্থির কন্ঠে বললো,

– খেতে ভালো লাগছে। তবে এর থেকে বেশি ঝাল আর খেতে পারছি না।
খুশিতে প্রেমার চোখ চকচক করে উঠলো। সে ব্যস্ত হাতে বাটি নিয়ে বেরিয়ে গেলো রুমের বাইরে। নুডুলস টুকু চামচ দিয়ে নাড়িয়ে চাড়িয়ে জড়ো করলো। এরপর দাঁত মেলে হাসতে হাসতে পাভেলের রুমে ঢুকলো। সে শুয়ে শুয়ে ফোন টিপছে। প্রেমা সরাসরি পেটের উপর নুডুলসের বাটি রাখলো। পায়ের উপর পা তুলে আয়েষ করে বললো,
– তোর সাত জন্মের ভাগ্য — আমার হাতের রান্না নুডুলস কপালে জুটেছে। খেয়ে দেখ, এই স্বাদ সোনারগাঁও হোটেলেও পাবি না।
পাভেল বাটি হাতে নিয়ে উঠে পা ভাঁজ করে বসলো। কোনো রকম কথা না বলে গোগ্রাসে দু চামচ মুখে নিলো। এরপর নাক ছিঁটকে প্রেমাকে রাগাতে বললো,
– ইঁয়াক! ছিহ! এটা কোনো রান্না হলো? কতখানি ঝাল দিয়ে বসে আছিস। কিসব কু খাদ্য খাওয়ালি আল্লাহই জানে। যদি ডায়রিয়া হয়?
মুহুর্তে’ই ছোঁ মেরে বাটি নিয়ে গেলো প্রেমা। রেগেমেগে বললো,

– আমি জানতাম তুই কখনোই আমার প্রশংসা করবি না। এজন্যই ভাইয়ার এঁটো খাবার দিয়েছি।
চোখ দুটো বাইরে বেরিয়ে আসার উপক্রম পাভেলের। খপ করে ধরে ফেললো প্রেমার চুলের বেণী। টেনে বিছানায় বসিয়ে হাত থেকে বাটি টা নিয়ে নিলো। পাশে রেখে ভ্রুঁ কুঁচকে জিজ্ঞেস করলো,
– এঁটো.. তাও আবার এতোখানি? নিশ্চয়ই মুখে তোলার পর আর গিলতে পারে নি। তাই বাধ্য হয়ে আমার কাছে নিয়ে এসেছিস প্রশংসা শুনতে।
নাক-মুখ বিকৃত করে পাভেলের হাতে জোরে চিমটি কাটলো প্রেমা। রগচটা কন্ঠে বললো,
– একদমই না। ভাইয়া অনেক খানি খেয়েছে, প্রশংসাও করেছে। শুধুমাত্র একটু ঝাল বেশি হওয়ার আর খেতে পারে নি।
বেণী ছেড়ে দিলো পাভেল। পুণরায় বাটি হাতে নিয়ে নুডুলস খেতে লাগলো। প্রেমাকে রাগিয়ে দিয়ে বললো,
– এসব লাফাঙ্গিপনা বাদ দিয়ে রান্নাঘরে ঢোক। মায়ের দেখাদেখি সব শেখ। না হলে এ জীবনে বিয়ে জুটবে বলে মনে হচ্ছে না।

খ্যাঁচখ্যাঁচ শব্দে বাঁধাকপি কাটছে স্পর্শীয়া। এরইমধ্যে ভাত উতলে এলো। দ্রুত পাক্কা গৃহিনীর মতো খালি হাতে ঢাকনা সরিয়ে চুলার আঁচ কমিয়ে দিলো। সোভাম নিরলস ভঙ্গিতে তাকিয়ে তা দেখলো। পরপরই ধমক দিয়ে বললো,
– পাকামো করিস না, হাত পুড়বে।
স্পর্শী পেছন ফিরে হাসলো। আজ প্রায় তিন দিন পিরোজপুরে আছে। এরমধ্যে প্রথম দিন জেল-মারামারি করে শেষ। দ্বিতীয় দিন সোভামের ছাড়পত্র আনতে আনতে বিকেল গড়িয়ে গেছে। এরপর দিশা হারিয়ে রাতে বাইরে থেকে খাবার এনে খেয়েছে। তবে আজ আর তা করা সম্ভব না। যারা ঘরের রান্না খেতে অভ্যস্ত, তারা কখনোই বাইরের রান্নায় স্বাদ পায় না। পেট ভরে না, তৃপ্তি পায় না। স্পর্শী এবং সোভামের বেলায় ও তাই ঘটলো। তাই তো ঘুম ভাঙার সাথে সাথেই নেমে পড়লো কাজে। তিন দিন পূর্বের এটো বাসন- কোসন ধুয়ে ভাত চড়ালো। ঘরে ডিম এবং ছোট একটা বাঁধাকপি থাকায় আর ঝামেলায় পড়তে হলো না। সকালের এই আয়োজনে গরম ভাত, ডিম ভাজা, বাঁধাকপি ভাজি এবং ডাল হলেই যথেষ্ট। যদিও ডাল দুপুরের জন্যই বেশি করে রান্না করেছে স্পর্শীয়া।

সোভামের হাতের অবস্থা পূর্বের ন্যায় থাকলেও পা ঠিক হয়ে গেছে। হকি স্টিকের আঘাতে জখম না হলেও এতোদিন খুঁড়িয়ে হাঁটতে হয়েছে। তবে এখন আর তেমনটির প্রয়োজন নেই। সুস্থ মানুষের মতোই দু পায়ে ভর দিয়ে হাঁটা যায়। যদিও চিনচিনে ব্যথা এতো সহজে যাওয়ার নয়। তবুও সে স্পর্শীর সামনে সম্পুর্ন সুস্থ। নিজেকে যত তাড়াতাড়ি ফিট হিসেবে দেখাবে, তত দ্রুতই স্পর্শীকে ঢাকায় যেতে রাজী করাতে পারবে।
সোভামের ছোট্ট অপটু সংসারে কোনো ফ্রিজ নেই। থাকবার কথাও না। ব্যাচেলার মেয়েরা বাড়িওয়ালী বা প্রতিবেশী আন্টির ফ্রিজে মাছ -মাংস রাখতে পারলেও ছেলেদের ক্ষেত্রে তা বরই বিরল। কিভাবে অন্যের ফ্লাটের সামনে গিয়ে প্রতিবার মাছ-মাংসের তাগিদ দিবে? এছাড়াও ফ্লাটে তো মা-মেয়ে থাকেই। সেক্ষেত্রে পুরুষ দের সাথে এমন দেওয়া – নেওয়ার সম্পর্ক বড়ই অসম্ভব। এজন্য একসাথে খুব বেশি বাজার করে না সোভাম। ঘরে বলতে গেলে অপচনশীল সদয় বাদে কিচ্ছুটি নেই। স্পর্শী সকালের নাস্তা খেয়ে তৈরী হয়ে নিলো। মাছ-মাংস কিছু একটা কিনতেই হবে। আস্তেধীরে ফ্লাটের দরজা টেনে রেখে বেরিয়ে গেলো বাইরে। সোভাম ঘুমিয়ে পড়েছে। ভাত খাওয়ার পর ওষুধ খেয়ে খুব বেশি হলে পনেরো মিনিট সজাগ ছিলো। এরপর ধীরে ধীরে জড়িয়ে গেছে তন্দ্রার ঘোরে। এটা অবশ্য স্পর্শীর জন্য আনন্দের। কারন জেগে থাকলে তা যাওয়া নিয়েও বড্ড ঝামেলা করতো এই মাস্টার।

আর্শিয়ার মন আজ বেজায় খারাপ। তবে এই মন খারাপের কারন সে জানে না। স্যারদের অমান্য করে ক্লাস থেকে বেরিয়ে যায় – একথা শুনে সেদিন শামসুল সরদার বড্ড ক্ষেপেছে। মেয়েকে ডেকে কড়া করে কয়েকটা কথাও বলেছে। তার এই আচরণের কারনে স্যার ’রা অপমানিত হচ্ছে অথবা তার লেখাপড়া গোল্লায় যাচ্ছে এ নিয়ে বকেন নি তিনি। কথা শুনিয়েছেন নিজের স্বার্থ সিদ্ধির জন্য। আর্শিয়ার কারনে স্কুল-কলেজে তার মান খারাপ হচ্ছে, সবাই গোপনে সমালোচনা করছে এতেই ক্ষিপ্ত তিনি। অবশ্য অষ্টাদশী এই আর্শিয়ার জীবনে কি হলো বা না হলো তা নিয়ে কোনো চিন্তা নেই বাবা নামক শামসুল সরদারের। মেয়ের ভবিষ্যৎ, বর্তমান তো দূর — আর্শিকে তিনি মেয়ে হিসেবে মানতেও অনিচ্ছুক। তবে তাও মানছেন, বাধ্য হয়ে। শুধুমাত্র আমজাদ শিকদারের কারনে। একমাত্র বোনঝি’র প্রতি বাবার এই অবহেলা সম্পর্কে জানার পর থেকেই আর্শিয়াকে নিয়ে দু পরিবারের মধ্যে টানাটানি। অন্যকোনো পরিবার হলে হয়তো জন্মের পর পরই ছুড়ে ফেলে আসতো শামসুল সরদার। কিন্তু শিকদার দের বেলায় তা পারে নি। আত্মদাম্ভিকতা কাজ করেছে। যত যাই হোক, রক্ত তো! নিজ মেয়েকে শিকদার দের হাতে দেওয়া মানে ওদের সামনে হেরে যাওয়া, মাথা নত করা। এটা অসম্ভব। তবে দমে থাকে নি আমজাদ শিকদারও। নানাভাবে কেস-মামলা করে এখনো যুদ্ধ করেই যাচ্ছেন। শুধু আর্শিয়ার একটু সম্মতি প্রয়োজন।

তবে কোন বিষয়ে সম্মতি দেবে আর্শি? চেনা নেই, জানা নেই, সম্পুর্ন অপরিচিত আত্মীয়তার বন্ধন একটা। যারাও ভালো লোক নয়। দু পরিবার’ই তাকে দাবার গুটি বানিয়ে নিজেদের ভাগে নিতে চাইছে। তা কি হতে দেওয়া যায়? মাঝেমধ্যে ভীষণ ক্লান্ত লাগে তার। ইচ্ছে হয় একবার উড়াল দিতে। কিন্তু তার তো ডানা নেই। কে হবে তার ডানা?
স্কুল-কলেজে ঘটা কোনো ঘটনা সম্পর্কেই বাবার কাছে নালিশ করে না আর্শিয়া। সম্পর্ক টা তেমন আহ্লাদের নয় বলেই হয়তো। কিন্তু তাও থেমে নেই কিছু। কোনো ভাবে জেনেই যায় সবকিছু। হয়তো ক্লাসের ছেলেদের থেকেই রিহান খবর গুলো নেয়, যা পরবর্তীতে শামসুল সরদারের কানে দেয়। তবে এসব চায় না আর্শি। ওইদিন ড্রয়িং রুমে সোভাম স্যার এবং বাবাকে দেখে সে অবাক হয়। লজ্জা লাগে ভীষণ! কিন্তু কিছু করা আর হয়ে ওঠে না। পরদিন কলেজে এসে শোনে সে হস্পিটালে ভর্তি। সন্ত্রাসী দ্বারা হামলা করা হয়েছে তার উপর। সন্দেহ পুরোপুরি বাবার উপর যায়, ঘৃণা হয়। তবে সেই ঘৃণা বেশিক্ষণ স্থায়ী হয় না। এরমধ্যেই শোনা যায় মাস্টার কে পরশ শিকদারের লোক মেরেছে। এ কাহিনি শোনা মাত্রই আর্শিয়া হেঁসে ওঠে। কি ভাগ্য তার! একটা সুস্থ স্বাভাবিক পরিবার কি সৃষ্টিকর্তা তাকে দিতে পারতো না? মায়ের বাড়ি, বাবার বাড়ি — দু পরিবার’ই রাজনৈতিক সন্ত্রাসী। একটু ক্লান্ত হয়ে পড়লে কার আছে আশ্রয় নেবে? কেউ নেই তার! আর্শিয়া সবাইকে ঘৃণা করে। সবাইকে!

ক্লাসে মন নেই তার। হাঁটতে হাঁটতে বেরিয়ে পড়েছে গেটের বাইরে। অন্যমনস্ক হয়ে জীবনের কঠিন ঘটনাগুলো ভাবতে ভাবতে মেইন রোডের মাঝখানে চলে এলো। এরইমধ্যে বেজে উঠলো ট্রাকের সাইরেন। হতভম্ব হয়ে পেছনে দৌঁড় দিলো আর্শিয়া। সাথে সাথে ধাক্কা লাগে একটা কালো রঙের প্রাইভেট কারের সাথে। স্পর্শী আঁতকে ওঠে। অন্যমনস্ক, ভাবুক মেয়েটাকে নজরে এসেছে কিছুক্ষণ পূর্বেই। তবে ছুটে আসতে আসতে দূর্ঘটনা যা ঘটার ঘটে গেছে। হাতের বাজারের ব্যাগ অবহেলায় পাশে ফেলে মেয়েটার মাথা কোলে নেয়। আর্শির কপাল এবং হাটু ছিলে গেছে। কনুই তেও আঘাত পেয়েছে ভীষণ। যন্ত্রণায় কাঁদতে পারছে না। জ্ঞানহীনের মতো স্পর্শীর হাত টা জড়িয়ে পড়ে আছে কোলে। চোখ দিয়ে জল গড়াচ্ছে নিরবিচ্ছিন্ন ভাবে।
গাড়ি টা পরশ শিকদারের। এক্সিডেন্ট হয়েছে দেখে দ্রুত নেমে এলো বাইরে। স্পর্শীকে দেখে চোয়াল শক্ত করে ফেললো। এই মেয়ে তার গাড়ির সামনে এসেই কেনো মরতে গেলো? কি পরিকল্পনা ওর!

– গাড়ি কি মদ খেয়ে চালান?
ঝাঁঝালো কন্ঠে পরশের দিকে কথাটা ছুঁড়ে দিলো স্পর্শী। সে জানে ভুলটা ড্রাইভারের নয়, মেয়েটার। তাও এই অসভ্য,অভদ্র, অমানুষ লোকটাকে কিছু না বলে বসে থাকা যাচ্ছিলো না। পরশ ক্ষুদ্ধ পায়ে এগিয়ে এলো স্পর্শীর কাছে। কোলে পড়ে থাকা মুখটা দেখেই থমকে গেলো। এটা আর্শিয়া! বুঝতে পেরেই হাঁটু গেঁড়ে বসলো রাস্তায়। রক্ত পড়ছে ভীষণ! পাভেল নিজেও হতভম্ব। অনেক দিন পর ভাইয়ের সাথে বেরিয়েছিলো। কিন্তু এমন ঘটনায় স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। আর্শিয়াকে সে চেনে না। ছবি দেখেছে কয়েক বার। বেশিরভাগ সময় ঢাকায় থাকার কারনে এ বিষয়ে জানা-শোনাও নেই। তবে ফুপাতো বোন নামক যে মেয়েকে নিয়ে আজ এতোগুলো বছর সরদার -শিকদার দের মধ্যে ঝামেলা তা জানে।

– এটা আর্শিয়া না ভাই?
কিছুটা নিশ্চিত হওয়ার জন্য পাভেল প্রশ্ন করলো পরশকে। সে ব্যাথাতুর চোখে মাথা নাড়ালো। হাত ধরে দাঁড় করানোর চেষ্টা করলো আর্শিয়াকে। কিন্তু ক্রমশই ঢুলে শরীরের সার হারিয়ে স্পর্শীর গায়ের সাথে মিশে যাচ্ছে সে। এতো যন্ত্রণার মধ্যেও অশ্রুসিক্ত চোখ দুটো নিয়ে পাভেলের দিকে তাকালো আর্শি। লোকটা তার নাম জানে। কতটা সাবলীল ভাবে জিজ্ঞেস করলো পরিচয়। কিন্তু সে তো চেনে না এই যুবককে। কে ইনি?
আঘাত খুব বেশি গুরুতর হয় নি। পরশ গাড়ি স্লো করে ফেলেছিলো পূর্বেই। তবুও আর্শির অবস্থা বেগতিক। সে এ পর্যায়ে জ্ঞানশূন্য হয়ে পুরোপুরি পড়ে গেলো স্পর্শীর গায়ে। তাল সামলাতে না পেরে দু-পা পিছিয়ে, দুহাতে ঝাপটে ধরলো আর্শিকে। কিন্তু এভাবে তো রাখা যায় না। দু মিনিট পরেই সরকারি হস্পিটাল। এটুকু জায়গায় আবার কিসের গাড়িতে তুলবে? তবে পাভেল এবং পরশের কথাপোকথনে খানিকটা বিভ্রান্ত হয়ে গেলো। মেয়েটা যে ওদের পরিচিত কেউ সেটা বুঝতে সময় লাগলো না। কিন্তু তারপরেও কিন্তু থেকে যায়। পরিচিত মানুষ ছেড়ে সে কেনোই বা স্পর্শীর কোলে জ্ঞান হারালো? সে তো তাদের থেকে অপরিচিত। ওড়নার খোট মাথায় চেপে ধরে বাজারের ব্যাগের দিকে তাকালো। টমেটো গুলো ছড়িয়ে গেছে রাস্তায়। কিছু বেয়াক্কল লোক তা মাড়িয়ে থেতলে দিয়েছে রাস্তার সাথে। যেনো সিনেমা হচ্ছে। দর্শকের অভাব নেই।
স্পর্শী বিরক্ত হয়ে পাভেলের উদ্দেশ্যে বললো,

– ওকে ধর! হাসপাতালে নিতে হবে তো!
মাথা নাড়িয়ে এগিয়ে এলো পাভেল। একপাশ থেকে ধরতে গেলেই ধমক মারলো স্পর্শী। বললো,
– এতোটুকু একটা মেয়েকে দুজনে মিলে নিবি? কোলে নে! ব্যথা পাবে তো।
স্পর্শীর ধমকে আর্শিকে কোলে তুলে নিলো পাভেল। ব্যস্ত পায়ে এগিয়ে গেলো হস্পিটালের দিকে। সাথে স্পর্শী গেলেও দাঁড়িয়ে রইলো পরশ। লোকজনে জড়ো হয়ে গেছে আশপাশ। নিশ্চিত এ ঘটনা নিয়ে কম ঝামেলা হবে না। হয়তো বিকালেই দেখা গেলো, শামসুল সরদার তাকে দোষারোপ করছে। প্রেসের লোক এনে সমানে বলছে — পরশ শিকদার গাড়ি চাপা দিয়ে তার মেয়েকে মারতে চেয়েছে।
ছোট্ট একটা নিঃশ্বাস নিয়ে গাড়িতে উঠলো। এক টানে এগিয়ে গেলো হস্পিটালের দিকে। ফাঁকা স্থান টুকুতে গাড়ি রেখে ব্যস্ত পায়ে ভেতরে গেলো। ফোন করলো আমজাদ শিকদারের নাম্বারে।
আর্শি পুরোপুরি অজ্ঞান নয়। তবে শরীরের যন্ত্রণায় নুয়ে পড়েছে একদম। এ যাবৎ দু বার চোখ মেলেছে। জ্বলে ভেঁজা পাপড়ি মেলে আবছা দৃষ্টিতে দেখে নিয়েছে পাভেল শিকদার কে। এই মুহুর্তে কোনো কিছু অনুভব না হলেও এটা বোঝা যাচ্ছে যে, সে এই লোকটার কোলে আছে। তবে লজ্জা, রাগ কিছুই লাগলো না। শুধু চাইলো ব্যথা টা কমুক! এই যন্ত্রণা তার মতো ননীর পুতুলের পক্ষে সহ্য করা অসম্ভব। বড্ড অসম্ভব!

আধ ঘন্টার মধ্যে পুরো হস্পিটাল ভরে গেছে মানুষে। শামসুল সরদার ঘেমে-নেয়ে ভেতরে প্রবেশ করলেন। রাগে তার পায়ের তালু জ্বলছে। ক্ষিপ্ত পায়ে কেবিনে ঢুকতেই দমে গেলেন। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালেন আশেপাশে। সেখানে উপস্থিত নেই আমজাদ শিকদার অথবা পরশ। শুধুমাত্র পিয়াশা শিকদার বসে আছেন পাশে। কিছুক্ষণ পর পর মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন। পাশেই ক্লান্ত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে স্পর্শীয়া। সে হতভম্ব! এতো এতো মানুষ দেখে মাথা ঘুরে যাচ্ছে। ওদিকে বাজারের ব্যাগের করুণ দশা কল্পনা করতেই মেজাজ খারাপ হচ্ছে।
শামসুল সরদার আর্শির দিকে নজর দিলেন। তার মাথায় ব্যান্ডেজ লাগানো। কনুই এবং পায়ে ও ওষুধ লাগানো হয়েছে। তিনি ক্ষুদ্ধ মুখশ্রী নিয়ে এগিয়ে এলেন। আর্শি ক্ষীণ দৃষ্টিতে বাবার দিকে চাইলো। পেছনে থাকা লোকজন কে দেখে পুণরায় বললো,

– দোষ টা আমার ছিলো। অন্যমনস্ক হয়ে রাস্তায় চলে এসেছিলাম।
ফুঁসে উঠলো শামসুল। এখানে আসার পূর্বেও এই কথা তিনি শুনেছেন। আর্শি নিজেই সাংবাদিক এবং পুলিশের লোকদের যে-চে পরশ শিকদারের নির্দোষ হওয়ার বিষয়ে জানাচ্ছেন। এ নিয়ে ক্ষোভের শেষ নেই শামসুলের। এতোক্ষণে চঞ্চল পায়ে তার দিকে এগিয়ে এলো স্পর্শীয়া। ধীরস্থির কন্ঠে আর্শিকে দেখিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
– আপনার মেয়ে?
মাথা নাঁড়িয়ে হ্যাঁ সম্মতি জানালো শামসুল। মুহুর্তে’ই আরেক পা এগিয়ে গেলো স্পর্শীয়া। কন্ঠ খাদে নামিয়ে ফিসফিস করে বললো,

রাজনীতির রংমহল ৩ পর্ব ১২

– আপনি নিজের স্বার্থসিদ্ধির জন্য আমাকে বিপদে ফেললেও, আমি কিন্তু আপনার মেয়েকে ফেলে যাই নি।
চমকে স্পর্শীর দিকে তাকালো শামসুল। স্পর্শীয়া ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসলো। মুহুর্তে’ই দৃষ্টি সরিয়ে অন্যদিকে তাকালো শামসুল। যেনো ওই দৃষ্টির সাথে দৃষ্টি মেলালেই সবটা পড়ে ফেলবে এই মেয়ে।

রাজনীতির রংমহল ৩ পর্ব ১৩ (2)