Home রাজনীতির রংমহল ৩ রাজনীতির রংমহল ৩ পর্ব ২০

রাজনীতির রংমহল ৩ পর্ব ২০

রাজনীতির রংমহল ৩ পর্ব ২০
সিমরান মিমি

১৯৯২ সাল, বছরটা সবে শুরু হয়েছে। উনত্রিশ বছর বয়সী টগবগে যুবক ছিলেন শামসুল সরদার। উচ্চতা, উজ্জ্বলতা, ব্যক্তিত্ব, অকুতোভয় সংগ্রাম, দুঃসাহস, তেজস্বী কন্ঠস্বর সব মিলিয়ে তিনি ছিলেন চোখে পড়ার মতো। একবার তার দিকে নজর পড়লে, দ্বিতীয়বার ফিরে তাকিয়ে দেখেনি এমন নারী পাওয়া ছিলো দুস্কর। হাজার যুবকের মধ্যে সুপুরুষ ছিলেন তিনি ; অনন্য, অবর্ননীয়। সদ্য রাজনীতিতে যোগ দিয়েছেন সে সময়। তবে টুকটাক রাজনীতি যুবক বয়স থেকে করলেও সম্পুর্ন একটা দল নিয়ে এমপি পদে দাঁড়ানোর মতো দুঃসাহস সেবার দেখিয়েছিলেন। পক্ষে, বিপক্ষের নারীরা কোনোমতেই তার বিমুখ হতে পারেন নি।

তৎকালীন পিরোজপুরের এমপি ছিলেন আমজাদ শিকদার। বয়সে শামসুল সরদারের চেয়ে আট বছরের বড়। প্রথমে ক্ষুদ্র একটা দল নিয়ে বিরাজ করা শামসুল সরদারকে হাসির পাত্র হিসেবে দেখলেও পরবর্তীতে জনপ্রিয়তা দেখে চোখ কপালে উঠে যায়। সুদর্শন এ যুবকের সৌন্দর্য্যে, ব্যক্তিত্বে মুগ্ধ হয়ে নারীরা ক্রমশ ঝুঁকে পড়ছিলো সেদিকে। যার বিপরীত ঘটেনি আয়জা’র বেলাতেও। সদ্য সতেরো বছরে পদার্পিত আয়জা তৎকালীন এমপি আমজাদ শিকদারের একমাত্র আদুরে বোন। তবুও বড় ভাইয়ের শত্রুকে সে শত্রুরুপে দেখতে পারেনি। দেখেছে প্রাণপ্রিয় পুরুষ হিসেবে। আবেগের বয়সটা সম্পুর্ণ ভাবে দান করেছে সেই সুপুরুষের পেছনে। তবে তা লুকিয়ে। তার অনুভূতি গুলো ছিলো গোপন, নিজস্বতায় ঘেরা। চঞ্চলা আয়জা কল্পনার মধ্যে বড় হতে লাগলো শামসুল সরদারকে নিয়ে। লজ্জায় কখনো ভাইদের সামনে প্রকাশ করেনি এ ভালোলাগার কথা। এমনকি সরাসরি কখনো শামসুল সরদারের সম্মুখেও যায়নি। যাবেই বা কিভাবে? সে তো ছোট্ট একটা প্রজাপতি। ওমন লম্বাচওড়া, গম্ভীর পুরুষ রুপি রাজকুমারের সামনে কি করে দাঁড়াবে? ফলস্বরূপ, অনুভূতি প্রকাশ করতে লাগলো চিঠিতে। দুদিন পর পর’ই ডজনখানেক চিঠি নিয়ে সরদার মঞ্জিলের দোরগোড়ায় পৌছাতেন ডাকপিয়ন।

সেসব দেখে নিজ থেকে কখনো প্রতিক্রিয়া জানাতো না শামসুল সরদার। কখনো বিরক্ত হয়ে অবহেলা করতো, কখনো আবেগপ্রবণ লেখা দেখে হাসতো, তো কখনো শত্রুর বোনের এমন ভালোবাসা দেখে আমজাদ শিকদারের প্রতি তাচ্ছিল্য করে হাসতো। বস্তুত, এসব আবেগঘন চিরকুট বা চিঠি শুধু আয়জা শিকদারই করতো না — অজস্র মেয়ে তাকে পাওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করেছে। নানাভাবে মোহে ফেলার চেষ্টা করেছে। কিন্তু দিনশেষে রাজনীতির বাইরে প্রেম, ভালোবাসায় প্রাধান্যতা দেওয়ার সূযোগ পায় নি শামসুল। পেলেও হেসে উড়িয়ে দিতো দাম্ভিকতার সাথে। এতো এতো মেয়েকে সে অবহেলা করছে, ভাবতেই তৃপ্তি আসতো। নিজের প্রতি আলাদা সন্তুষ্টি পেতো।
কিন্তু এভাবে আর কতদিন? একসময় সে তো প্রেমে পড়লো। তবে রূপবতী কোনো রাজকন্যার নয় — অনাথ, শ্যামবর্নের এক মায়াবতীর উপর। সেবার কোনো এক কাজে তাকে ষাট গম্বুজ যেতে হয়েছিলো। সেখানেই দৃষ্টি পড়ে এলোমেলো ভঙ্গিতে, চিন্তিত হয়ে আশেপাশে তাকাতে থাকা এক নারীর দিকে। বয়স খুব বেশি হলে একুশ-বাইশ হবে। রোদ এবং দুশ্চিন্তার প্রভাবে শ্যামবরণ মুখশ্রীটা ঘেমে কালো হয়ে গেছিলো। তার ডাগর- ডাগর, বড় বড় পাপড়িওয়ালা চোখ দুটোর ঘন ঘন পলকে থমকে গেছিলো শামসুল৷ সকল কাজ বাদ দিয়ে চেয়েছিলো সেই মায়াবতীর দিকে।
একসময় তার ধ্যান ভাঙালো পিপাসা নিজেই। কাছে এসে দাঁড়িয়ে চিন্তিত মুখশ্রী নিয়ে অসস্তিমাখা গলায় শুধিয়েছিলো,

– শুনুন, আপনি কি এখানকার স্থানীয়? আমাকে একটু সাহায্য করতে পারবেন। আসলে আমি যশোর থেকে এসেছি, বান্ধবীদের সাথে ঘুরতে। কিন্তু হুট করে ওদের হারিয়ে ফেললাম। আমি এখানকার কিছু চিনি না। একটা পুকুরপাড়ে ছিলাম সবাই, ওখান থেকেই ঘুরতে ঘুরতে হারিয়ে গেছি। এখন বুঝতে পারছি না কিছুই।
এই বাক্যটুকু শামসুল সরদারের কাছে বসন্তের কোনো কোকিলের সুরেলা কন্ঠের মতো লাগলো। সে মুগ্ধ হয়ে শুনতে লাগলো। এ কথা কভু শেষ না হোক, বলতেই থাকুক…. বলতেই থাকুক। কিন্তু বলবে টা কি পিপাসা। সে নিজের অনুরোধ টুকু শেষ করে কবেই উত্তর পাওয়ার আশায় চাতক পাখির ন্যায় চেয়ে আছে। কিন্তু সামনে দাঁড়ানো ব্যক্তিটি নিরব, নিস্তব্ধ। অবশেষে বিরক্তির চরম শিখরে পৌছালো। মুখে একটা ভেঙচি মেরে অন্য আরেক ব্যক্তিকে খুজতে খুঁজতে বললো,

– সাহায্য করতে পারবেন না বললেই হয়। ওমন বোবার মতো দাঁড়িয়ে থাকার কি মানে?
দাম্ভিক এই পুরুষটির কাছে সেবার মেয়েলি ধমকও অন্ত্যন্ত সুমধুর লাগছিলো। সে এগিয়ে গেলো সামনের দিকে। বললো সাথে আসতে। পিপাসা যেতে গিয়েও আমতা-আমতা করলো। পরক্ষণে নিজের বিপদের কথা ভেবে পিছু নিলো শামসুলের। যেতে যেতে জেনে নিলো তার গ্রামের নাম।অবশেষে পিপাশা খুঁজে পেলো বান্ধবীদের। তাড়াহুড়োয় ধন্যবাদ টুকুও দেওয়া হলো না। কিন্তু মন ঠিকই নিয়ে গেলো।
সেবার বাড়িতে আসার পরে ভয়ংকর জ্বরে পড়লো শামসুল সরদার। বলতে গেলে মৃত্যু পথযাত্রী রোগী তিনি। একটানা তিন দিন পরে রইলেন বিছানায়। মন ছটফট করতে লাগলো। মস্তিষ্ক বললো, একবার তাকে দেখলেই বুঝি ছেড়ে যাবে এই জ্বর। প্যারাসিটামল থোরাই কাজ করবে? কিন্তু দেখতে তো আর পারলো না। একসময় ডাক্তারের পথ্যতেই গায়ের তাপমাত্রা কমলো। কিন্তু মনের তাপমাত্রা কি এতো তাড়াতাড়ি কমে?

কোথায় খুঁজবে সেই সর্বনাশীকে? না জানে নাম, আর নাতো ঠিকানা। শুধু জানে সে যশোরের কেশবপুর গ্রামে থাকে। কিন্তু এভাবে কি যাওয়া যায়? দীর্ঘ কয়েকদিন ছটফট করার পর আর অপেক্ষা করতে পারলো না। রওনা হলো যশোরে। সেদিন পিপাশাকে নিয়ে বান্ধবীদের কাছে পৌছানোর পর একটা মেয়ে বারবার সেধে কথা বলার চেষ্টা করছিলো। নাম তার রাবেয়া। ইন্টার শেষ করে সদ্য কেশবপুর ডিগ্রি কলেজে প্রথম বর্ষে অধ্যয়ন করছে। শামসুল সে ঠিকানা অনুযায়ী রওনা দিলো সেথায়। কলেজে গিয়ে অনেক খোঁজাখুঁজির পরে অবশেষে পেয়ে গেলো রাবেয়াকে। নানাভাবে শাসিয়ে হুমকি দিতে লাগলো। যদি পিপাসাকে দেখা করাতে না আনতে পারে, তবে পাড়ায় দূর্নাম রটাবে। মানের ভয়ে বান্ধবীকে বুঝিয়ে অবশেষে নিয়ে এলো। তবে অনেক দূরে, গ্রামের বাইরে। অতঃপর দেখা হলো, কথা হলো, জোর করে হাতে ধরিয়ে দিলো একখানা জামদানি শাড়ি। তারপর? তারপর তো প্রণয়। যার একমাত্র মাধ্যম ডাকপিয়ন। কখনো কখনো চিঠির উত্তর পেতে পেতে সপ্তাহ , মাস পেরিয়ে যেতো। ধৈর্যহারা শামসুল একই সাথে দশ – বারোটা চিঠি দিতেন। তবুও তার কথা ফুরাতো না। এভাবে একমাস, দুমাস করতে করতে সাড়ে চার মাসে পৌছালো প্রেম।

পিপাসা অনাথ। সাথে দুই বছরের ছোট্ট আরেকটা বোন ও রয়েছে। থাকছে মামার বাড়ি, তার দায়িত্বে। দু দুটো বিবাহ যোগ্য মেয়ে নিয়ে নিম্নবিত্ত মামা পড়েছেন ফ্যাসাদে। অবশেষে দীর্ঘদিন খোঁজার পর বড় ভাগনীর জন্য খুঁজে পেলেন যোগ্য এক পাত্র। পনেরো শত টাকা বেতনে বড় মোটরসাইকেল শো-রুমে ম্যানেজার পদে চাকরি করেন। এ কম কিসে? নব্বই এর দশকে এই তো অনেক। পিপাসা ইদানীং মস্ত ঝামেলায় ফেঁসেছে। মন দিয়ে ফেলেছে সেই অজ্ঞাত রাজনৈতিক নেতাকে। কিন্তু সে তো জানে, পিপাসা তার কতটা অযোগ্য। কখনোই কি ওমন সুপুরুষের পাশে শ্যামবর্ণ, অনাথ পিপাশাকে মানায়? নিশ্চয়ই লোকটা তাকে ঠকাবে। হয়তো বিয়ের কথা শুনতেই বিচ্ছেদ ঘটাবে এ সম্পর্কে। কতটা দূর! অচেনা -অজানা জায়গা, সব নিয়ে সে ভীত হলো। চিঠি বিনিময় চালিয়ে গেলো পূর্বের মতো। জানালো না কিছুই। হুট করে একদিন সন্ধ্যায় ডাকপিয়ন পৌছালো সরদার মঞ্জিলের দোরগোড়ায়। বিয়ের তখন তিন দিন বাকি। কোনো অধিকার, রাগ, ঘৃণা, মায়া কিছুই না দেখিয়েই গোটা গোটা অক্ষরে চিঠিতে লেখা ছিলো,

– আমি জানি তুমি আমার মোহে পড়েছো। কিছুদিন যোগাযোগ না থাকলে ভুলেও যাবে। অবশ্য এতে আমি তোমার দোষ দিচ্ছি না। আমাদের মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাৎ। সেটা মেনেও নিয়েছি। শোনো, পরশু আমার বিয়ে। মামা ঠিক করেছে। আমিও ঠিক করে ফেলেছি বিয়েটা করবো। আর কতই বা মামাকে কষ্ট দেবো। যদিও তোমার প্রতি অনেকটা মায়া জমেছে, কিন্তু ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করবো। তুমি আর চিঠি দিও না। কেমন?
বাজ ভেঙে পড়েছিলো শামসুল সরদারের মাথায়। সে রাতেই রওনা দিয়েছিলেন যশোরের উদ্দেশ্যে। পৌছাতে পৌছাতে প্রায় দুপুর। উদ্দেশ্য ছিলো গিয়ে বস্তা ভর্তি করে তুলে নিয়ে আসবে। কিন্তু যাওয়ার পর সিদ্ধান্ত বদলালো। পিপাশার নরম, শান্তিপ্রিয় মামার সাথে কথা বলে তৎক্ষণাৎ কাজী ডেকে বিয়ে পড়লো। মামা-মামীর চিন্তাকে মুক্ত করতে দেনমোহর রাখলো এক লাখ। এরপর? রাজনৈতিক কার্যক্রম থাকার কারনে বিকেলের মধ্যেই রওনা হলো পিরোজপুরে।
বউ নিয়ে সরদার বাড়িতে ঢুকতে গেলে প্রথমেই আপত্তি জানান শামসুল সরদারের বাবা। তার এমন ছেলের পাশে এ মেয়ে যে কিছুই না। কোন আক্কেলে ছেলে তার এহেন কাজ করলো ভেবে পাচ্ছেন না। তবে শামসুল সরদার থেমে থাকেননি। সাথে সাথেই জবাব দিয়েছেন কড়াভাবে। হুশিয়ারি দিয়ে জানিয়েছেন,

– বউ আমার, সংসার আমার, তাই আমার চোখে তাকে সুন্দর লাগলেই হলো। বাকি সবার চোখে ভালো লাগলো না খারাপ লাগলো সেসব নিয়ে আমার কোনো মাথাব্যথা নেই। তৃষ্ণাকে মেনে নিতে খুব বেশি আপত্তি হলে জানিয়ে দাও, চলে যাচ্ছি।
এরপর টু শব্দটিও করেনি কেউ। মেনে নিয়েছেন মনের বিরুদ্ধে। দুজনের সংসার শুরু হয়ে গেলো। একজন সারাদিন রাজনৈতিক কাজে ভবঘুরে, অন্যজন সংসার, পরিবার, সকলের মন রাখতে ব্যস্ত। তবে নিশীরাতেই ঘটতো দুজন ব্যস্ত মানুষের পরিণয়। সুখী সংসার, সন্তান, ভবিষ্যৎ এসবের পরিকল্পনা। শামসুল সরদার তো বাসর রাতেই জানিয়েছেন তার মেয়ে চাই। যার নাম রাখবেন – স্পর্শীয়া শিকদার।
সুখী একটা সংসারের স্বপ্ন দেখলেই তো হয় না। সৌভাগ্য থাকতে হয়। ফলস্বরূপ, সংসারের শুরু থেকেই তাদের মধ্যে ছিলো ঝামেলা। যে ঝামেলার নাম আয়জা শিকদার।

শামসুল সরদার বিয়ে করেছে একথা শোনার পর থেকে পাগলিনীর মতো ছটফট করতে থাকে। সারা বাড়ি মাথায় তুলে কাঁদতে শুরু করে। তার কান্নায় থমথমে হয়ে যায় শিকদার মহল। সকলের মনে ভ্রান্ত ধারণার সৃষ্টি হয় এটাই যে, শামসুল সরদার নিশ্চয়ই আয়জার সাথে এতোদিনের সম্পর্কে ছিলো। ছোট্ট অবুঝ মেয়েটাকে গুটি বানিয়েছে শিকদার দের নিচু করার জন্য। শুরু হয় নতুন করে শত্রুতা। বাড়ির মেয়েকে শামসুল সরদারের থেকে দূরত্বে রাখার চেষ্টা করে। কিন্তু কতদিন? একসময় আয়জা হিতাহিতজ্ঞানশূন্য হয়ে সরদার বাড়িতে ছুটে আসে। বাড়ির দোরগোড়ায় বসে শামসুলের জন্য কাঁদতে থাকে। কিন্তু পরক্ষণেই তার স্ত্রী পিপাশাকে দেখে থমকে যায়। মনে জোর আসে। এক অলীক আত্মবিশ্বাস নিয়ে সেবার ঘর ছাড়ে। তার রুপের সামনে এই মেয়ে কিছুই না। সে ছিনিয়ে নেবে শামসুল সরদারকে।
এরপর পুণরায় শুরু হয় চিঠি। শুধু তাই নয়, যেখানে সেখানে হুটহাট শামসুলকে বিরক্ত করে আয়জা। হাপিয়ে ওঠে শামসুল। এদিকে পিপাশা আছে ভ্রান্ত ধারণায়। আমজাদ শিকদারের মতো তার ধারণাও অটুট। শামসুলের বুঝি আয়জার সাথে সম্পর্ক ছিলো বিয়ের পূর্বে। এ নিয়ে ঝামেলা হতে থাকে বারবার।
হঠাৎ একদিন আয়জার দেওয়া পুরাতন চিঠি গুলো চোখে পড়লো পিপাশার। সে থমকে যায়, নিশ্চিত হয়। অভিমানী কন্ঠে জিজ্ঞেস করে,

– তুমি তাহলে সত্যিই ওই মেয়েটার সাথে সম্পর্কে ছিলে?
শামসুল হতাশ হয়। নানাভাবে বোঝানোর চেষ্টা করে। বলে,
– আমি এসব চিঠির বিপরীতে কোনো চিঠিই দেই নি। ওখানের বেশির ভাগ চিঠিই এখনো অক্ষত। খোলাই হয় নি। মেয়েটাকে বাচ্চা ভেবে এতোদিন কিছু বলি নি। কিন্তু এতো দূর এসে যাবে এ-ও ভাবিনি।
পিপাশা ক্ষান্ত হয়। সত্যিই তো! এখানে যাবতীয় সব চিঠি ওপাশ থেকেই দেওয়া। এমনকি প্রায় চিঠির খাম ছেড়া নেই। তার মানে এগুলো পড়েইনি শামসুল। তার বিশ্বাস হয়। সে আবারো সংসারে মন দেয়। এক পর্যায়ে সোভাম আসে। মাঝে প্রায় চার বছর চলে যায়। সে পুণরায় গর্ভবতী হয়। এর মধ্যে তেমন কোনো ঝামেলা হয়নি। আয়জাকে বাড়ি থেকেই তার মামার কাছে ঢাকায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়। সেখানে বসে পড়াশোনা শুরু হলেও শামসুল কে ভোলেনি। নিত্য নতুন চিঠি দিয়ে শামসুলকে ভোলানোর চেষ্টা, আর স্ত্রীয়ের ভয়ে ক্রমশ চিঠি গুলো গেট থেকেই ফেলে দেওয়ার মধ্যে অনেকটা সময় সীমাবদ্ধ থাকে।
পিপাশার গর্ভের বয়স তখন আটমাস। সংসারে সেই পূর্বের ঝামেলা। প্রায় চার মাস পূর্বেই পিরোজপুরে এসেছে আয়জা। বয়সে পরিণত হলেও ভোলেনি আগের ছেলেমানুষী। এবার শুধু চিঠি নয়, সরাসরি দেখা করার চেষ্টা চালায়। হুটহাট বাড়িতে চলে আসে। শিকদার বাড়িতে এ নিয়ে নালিশ করলেও তাতে কাজ হয়নি। ওনারা নিজেরাই মেয়ে সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন। অন্যদিকে সম্পুর্ন রেষ জমেছে শামসুলের উপর। সেই আয়জাকে টার্গেট করেছে শত্রুতার জের ধরে।

প্রতিদিন স্বামী- স্ত্রীর মধ্যে ঝগড়া-ঝামেলায় বাড়ির টান হারিয়ে ফেললো শামসুল। রাজনৈতিক ভরাডুবি, সম্পর্কের টানাপোড়েন, পারিবারিক অশান্তি, সবমিলিয়ে প্রায়’ই রাত যাপন করতেন ক্লাবের দোতলায়। সেদিন ও তেমন একটি রাত ছিলো। কিন্তু ভয়ংকর, বিভীষিকা ময় রাত! বিষাদে মদ্যপান করে মাতাল হয়ে ঘুমিয়ে ছিলেন শামসুল। তবে ঘুম ভাঙে ভোর চারটায়। নিজের বিছানায় ঘুমন্ত আয়জা এবং রুমের বাইরে শতশত মানুষের চেঁচামেচি, উচ্ছ্বাস শুনে থমকে যায়। বিছানা থেকে নেমে হতভম্ব হয়ে চেয়ে থাকে। নাহ! তাদের মধ্যে আপত্তিজনক কিছুই ঘটেনি। ঘুমন্ত শামসুল সরদারের দ্বারা এমনটা হওয়া অসম্ভব। কিন্তু বাইরের মানুষকে কিভাবে বুঝাবে। তবে সব থেকে বড় প্রশ্ন হলো, কে সেই বিশ্বাসঘাতক? যে কিনা তার দূর্বলতার সুযোগ নিয়ে আয়জাকে ঘরের মধ্যে ঢুকিয়েছে। আয়জার একার পক্ষে এমন দুঃসাহসিক কাজ করা অসম্ভব। তার দলের কেউই ছিলো এই কার্যে।
এভাবে কতক্ষণ দরজা বন্ধ করে থাকা যায়? দরজা প্রায় ভাঙার পর্যায়ে এসেছে। ওদিকে হিতাহিতজ্ঞানশূন্য হয়ে আবেগে পড়ে এমন নিকৃষ্ট কাজ করলেও এখন আফসোস হচ্ছে আয়জার। ভয় হচ্ছে। এতো এতো মানুষ দেখে সে চুপসে গেছে।

অতঃপর কি ঘটলো? স্থানীয় সকলে মিলে বাধ্য করলো শামসুলকে। পড়ানো হলো সেই ভোর রাতেই বিয়ে। কম চেষ্টা করেনি শামসুল এটা আটকানোর। কিন্তু সে তা পারেনি। কারন ক্ষমতা ছিলো শিকদার দের হাতে। এই ক্ষমতাই তো সব। বিয়ের পর এলোমেলো শামসুল স্তব্ধ হয়ে পড়ে ছিলো রাস্তার কোনে। বাড়ি যাওয়ার সাহস হচ্ছিলো না কিছুতেই। সকাল হলো, দুপুর পেরোলো, এমনকি পুণরায় রাত হয়ে গেলো। তবুও মাথা তুলে দাঁড়াতে পারলো না। এসব কি হচ্ছে তার সাথে? কেনোই বা হচ্ছে?

তার তৃষ্ণাকে প্রয়োজন। সে গিয়ে পা ধরে বসে থাকবে। বোঝাবে – কোনো ভুল ছিলো না তার। সব ষড়যন্ত্র আর ক্ষমতার খেলা। ক্ষমতাহীন শামসুল পেরে ওঠেনি সেই ক্ষমতাবান লোকেদের সাথে। সে বাড়ি গেলো। কিন্তু তার তৃষ্ণা কি ছিলো? সে তো শুনে নিয়েছে প্রাণপ্রিয় চরিত্রহীন স্বামীর ঘটনা। যে কিনা বাড়িতে ঝগড়া করে ক্লাবে গিয়ে মেয়ে নিয়ে মত্ত ছিলো। এই সংসার, এই টান আর কি কিছু অবশিষ্ট থাকে তখন? সে সারাদিন অপেক্ষা করলো এই ভেবে যে শামসুল আসবে। কিছু হলেও জানাবে। কিন্তু এলো না। হয়তো ফিরবে, সাথে সতীন নিয়ে। কিন্তু পিপাশা কি করে সংসার করবে? সপত্নীবাদ যে ভীষণ হিংস্র এবং অসহনীয় হয়। সে নিজের রাজসংসার ত্যাগ করলো। এক কাপড়ে, ছেলের হাত ধরে, আর আট মাসের গর্ভে বিরাজ করা মেয়েকে জড়িয়ে। কোথায় গেলো তা আর জানা গেলো না। বাড়ির লোকেরা কি কম চেষ্টা করেছিলো রাখার? কিন্তু কেইবা থাকে এমন বিষাদময় সংসারে?

শামসুল স্ত্রী- সন্তানকে না পেয়ে নিস্তব্ধ হয়ে বসে ছিলো। গায়ের তাপমাত্রা তখন একশো চারকে পার করে গেছে। সে আবারো পুড়লো সেই জ্বরে। এটা কি বিষাদের জ্বর? হ্যা, হবে হয়তো। বিষাদে শামসুলের অন্তর পুড়ে কালো হয়ে গেছে। প্রায় এক সপ্তাহ পড়ে রইলো বিছানায়। শরীরের চেয়েও মন ভেঙেছে ভীষণ ভাবে। মানসিক অশান্তিতে শরীর দূর্বল হয়ে পড়লো আরো। বাড়ির সকলের ঘৃণার দৃষ্টি, স্ত্রীর ছেড়ে চলে যাওয়া, নিজ দলের কারোর বিশ্বাসঘাতকতা, আশেপাশের ছি ছি শব্দ ব্যক্তিত্ববান পুরুষ টাকে ভেতর থেকে দুমড়ে মুচড়ে ভেঙে দিলো। সেই প্রিয় স্ত্রী, সে কি করে ছাড়তে পারলো সংসার। একবারও স্বামীর পাশে এসে দাঁড়ালোনা? তাকে বিশ্বাস করলো না, সকলের সামনে উঁচু গলায় চিৎকার করে বললো না – আমার স্বামী চরিত্রহীন নয়, তাকে চিনি আমি। সে কিছুতেই এমন কাজ করতে পারে না।”

এমন বিষাদময় পরিস্থিতিতে পিপাশা তার পক্ষ নিলো না। তার পাশে দাঁড়ালো না। বরং ছেড়ে চলে গেলো। আর সবাইকে এটা প্রমাণ করে দিয়ে গেলো যে – শামসুল সরদারের চরিত্র ভালো না। সে ভালো হলে ঘরের স্ত্রী তাকে ত্যাগ করে চলে যেতে পারতো না। স্বামীর চরিত্র নিয়ে জানে বলেই আগেভাগে সরেছে।
জ্বর সাড়ার পর পরই যশোরে রওনা হয়েছিলো শামসুল। মামাশ্বশুর বাড়িতে গিয়ে তিনদিন অবস্থান করেছিলো, প্রেশার দিয়েছিলো। তারা এ বিষয়ে কিছুই জানেন না, এমনকি পিপাশা কোথায় যেতে পারে সে ব্যাপারেও কোনো ধারণা নেই। শামসুল বিশ্বাস করেনি। ভেবেছিলো স্ত্রী সেখানেই আছে লুকিয়ে। হয়তো এসে যাবে তার যাওয়ার পর। এসব ভেবেই লুকিয়ে অবস্থান করেছিলো তিন দিন। কিন্তু পিপাশার দেখা মেলেনি। এমনকি সেই বান্ধবীকেও অনেক জেরা করেছে। তবে খোঁজ পায়নি। অবশেষে যখন বুঝলো এরা আসলেই অজ্ঞাত, তখন ফিরে এলো পিরোজপুরে।
যশোর থেকে আসার পরদিনই ব্যাগ নিয়ে সরদার বাড়িতে ঢুকলো আয়জা। সে এখন থেকে এখানেই থাকবে। এটাই তার স্বামীর বাড়ি। নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারেনি শামসুল। সেদিন রাগে হিতাহিতজ্ঞানশূন্য হয়ে চুলের মুঠি ধরে টেনে বের করেছে বাড়ির বাইরে। ব্যাগ -পত্র লাথি মেরে ফেলে, থাপ্পড় মারতে মারতে ছুড়ে ফেলেছে গেটের বাইরে।
আলতাফ শিকদার বোনকে একা ছাড়তে পারেননি। কি হয়, নাহয় তা দেখার জন্য নিজেও এসেছিলেন। তবে ভেতরে ঢোকেন নি, গেটের বাইরে অপেক্ষা করছিলেন। একমাত্র বোনের এমন করুন দশা দেখে সেদিন সে হতভম্ব হয়ে যান। রক্ত টগবগ করে ফুটতে থাকে। কিন্তু তবু নিজেকে আটকেছিলেন। শান্ত দৃষ্টিতে সবটা দেখে বোনকে নিয়ে নিরবে চলে গেছিলেন বাড়িতে।

কিন্তু ঘটনা কি এখানেই থেমে থাকবে? শিকদার বাড়ির একমাত্র, আদুরে মেয়ে। এমপি আমজাদ শিকদারের বোন। তাকে এভাবে কুকুরের মতো মেরেছে, একি সহ্য হয়? তার দুদিনের মাথায় গভীর রাতে হামলা হয় শামসুল সরদারের উপর। ক্লাবঘর থেকেই ফিরছিলেন বাড়িতে। দশ – পনেরোজন নিয়ে ভয়ংকর ভাবে পিটিয়ে আধমরা করে ফেলেছিলেন তাকে। হয়তো খুন করার’ই অপচেষ্টা ছিলো। কিন্তু সক্ষম হন নি। আশেপাশের জনমানুষের আগমনে আহত,নিথর শরীরটাকে ব্রিজের নিচে চরে ফেলে পালিয়েছিলেন দুষ্কৃতিকারীরা। তখন শুধু শ্বাস টুকুই চলছিলো শামসুলের। শীতের রাতের পুরোটা সময় পড়েছিলেন ওই চরে। জ্ঞান হারাননি, তবে কথা বলার মতো অবস্থাতেও ছিলেন না। নিভু নিভু চোখে তাকিয়ে ছিলেন আশায়। কেউ একজন আসুক, তাকে বাঁচাক। তবে শামসুল সরদারের ভাগ্য কোনোকোলেই তাকে সাধ দেয় নি।

ফলস্বরূপ, কারোর দেখাও মিললো না। ঠিক সকাল দশটার দিকে খুঁজতে খুঁজতে আধমরা, নির্জীব দেহটা পায় বাহারের বাবা। তিনি চিরকালই শামসুল সরদারের শুভাকাঙ্ক্ষী ছিলেন। দলের লোক ঢেকে হাসপাতালে নিয়ে গেলেন। ছেলে যে এ যাত্রায় বেঁচে উঠবেন, এ আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন শামসুলের বাবা। কিন্তু শামসুল বাঁচলো, হয়তো আরো দুঃখ জমে ছিলো তার আশায়। হাসপাতালে থাকাকালীন ঠিক এগারো দিনের মাথায় থানা থেকে পুলিশ এলো এরেস্ট ওয়ারেন্ট নিয়ে। তার বিরুদ্ধে ধর্ষণ এবং নারী নির্যাতনের মামলা করেছেন আমজাদ শিকদার। বড্ড কঠোর মামলা। এসব কেসে কারোর ফাঁসি হয়, আবার ক্ষমতাবানরা জেলেও ঢোকেন না। কিন্তু শামসুল সরদার অসহায় ছিলেন। রাজনৈতিক কার্যক্রম ধসে পড়ছিলো দিন দিন। শামসুল সরদারকে যে শিকদারের লোকেরা এমন ভাবে পিটিয়েছেন সে ব্যাপারে নিশ্চিত ছিলেন ইনস্পেকটর। কিন্তু কি আর করার! ক্ষমতার সামনে সেও তুচ্ছ। শামসুলের শুভাকাঙ্ক্ষী হয়ে তিনি বললেন,

– আয়জা শিকদারকে মেনে ঘরে নিয়ে যাও। দিন-পনেরো সংসার করলে মেয়ের মন গলে যাবে। তখন তাকে বুঝিয়ে শুনিয়ে কেস টা তুলে নিও।
এই পরামর্শ মানে নি শামসুল। কিছুতেই ওই মেয়েকে স্ত্রী হিসেবে মানবেন না। ফলস্বরূপ, অসুস্থ শরীর নিয়েই এরেস্ট হতে হলো। ক্ষমতা তারও কম নেই। তবে শিকদার দের তুলনায় তা অতি তুচ্ছ। অতএব, কেস টা ঘুরতে লাগলো দিনের পর দিন। আদালতে উঠলো, মীমাংসা হলো না। এভাবে করতে করতে, কোর্টের শুনানি পেছাতে পেছাতে চার মাস জেল খাটতে হলো শামসুলকে। অসুস্থ শরীর, জেলের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিবেশ, স্ত্রীর বিষাদ, সন্তানদের টান, রাজনৈতিক ধস সব মিলিয়ে শামসুল সরদার তখন প্রাণহীন। যেনো লাশটা ধুকছে মরার জন্য। এমতাবস্থায় সইতে পারলেন না তার বাবা। নিজে গিয়ে নিয়ে আসলেন আয়জা শিকদারকে। দু-তিন দিন ছেলেবউমা হিসেবে বাড়িতে রেখে নিয়ে গেলেন আদালতে। এরপর? এরপর শামসুল সরদার মুক্তি পেলেন। শুকনো, কালসিটে দাগ পড়া, একটা প্রাণহীণ ধর ফিরে এলো সরদার বাড়িতে।
ঢুকরে কেঁদে উঠলো স্পর্শীয়া। অতীতে ঘটা ঘটনাগুলোর বর্ননা শুনে হু হু করে কাঁদলো। কাঁপা কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো,

রাজনীতির রংমহল ৩ পর্ব ১৯

– এরপর?
শামসুল সরদার গায়ের চাদরটা পেঁচিয়ে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। পুরাতন অতীত বলতে বলতে বিষাদে গলা বসে গেছে তার। তিনি উদাস ভঙ্গিতে বারান্দার দিকে এগোলেন। অশ্রুসিক্ত চোখ লুকিয়ে আকাশের দিকে তাকালেন। দীর্ঘ একটা চাপা নিঃশ্বাস ত্যাগ করে অভিমানী কন্ঠে শুধালেন,
– এরপর আর তোমার মাকে খোঁজার ইচ্ছে হয়নি।

রাজনীতির রংমহল ৩ পর্ব ২১