Home রাজনীতির রংমহল ৩ রাজনীতির রংমহল ৩ পর্ব ২২

রাজনীতির রংমহল ৩ পর্ব ২২

রাজনীতির রংমহল ৩ পর্ব ২২
সিমরান মিমি

পশ্চিমাকাশে চাঁদের সরু অংশ উদীয়মান হয়েছে আরো ঘন্টাখানেক পূর্বে। ধীরে ধীরে সন্ধ্যার অস্পষ্ট অন্ধকারের সহিত তাল মিলিয়ে চাঁদটা গাঢ় উজ্জ্বল হয়ে জ্যোৎস্না ছড়াচ্ছে ধরনীতে। অন্ধকারের তীব্রতার সাথে পাল্লা দিয়ে মশার উপদ্রবও বৃদ্ধি পাচ্ছে। কয়েলহীন এই ছাঁদে অবস্থান করা আর সম্ভব হচ্ছে না। নিরব, নিস্তব্ধ, আনমনা হয়ে সারাটা বিকেল ছাঁদে বসে ছিলো আর্শিয়া। প্রকৃতির অগাধ ওই সৌন্দর্য্যে দেখায় মাতোয়ারা হয়ে ছিলো মন। কিন্তু আদৌ কি এটা প্রকৃতির প্রতি টান? মোটেও না।

এতো সামান্যক্ষণ নিরিবিলি থাকার চাহিদা। যেখানে বসে শান্তিতে, নিরবে-নিভৃতে আর্শি ভাবতে পারবে সুখময় কিছু মুহুর্ত। কল্পনার সাগরে ভেসে মন শান্ত করবে কিছুক্ষণ। এইতো কিছুক্ষণ পূর্বেই সে ভাবছিলো বাবার কথা। শামসুল সরদার এলেন, বেশ তোড়জোড় করলেন আমজাদ শিকদারের সাথে। অধিকার দেখিয়ে বললেন, আমার মেয়ে আমার কাছেই থাকবে। কিন্তু উভয়পক্ষ তখন ক্ষ্যাপাটে৷ শেষে আদুরে, আহ্লাদী হয়ে মেয়ের নিকট গিয়ে দুহাত জড়িয়ে শামসুল সরদার বলে, — তুমি কি বাবার সঙ্গে যাবে, মামুনি?
উফফ! এরপর কি আর একবারও বাবার প্রতি বিমুখ হয়ে বসে থাকতে পারে আর্শিয়া? সেতো তখনই বাবার হাত ধরেছে, সাথে যাওয়ার জন্য।
কল্পনায় এতোটুকু দৃশ্য এগোনের পরে দেখা গেলো এক পাগলাটে যুবককে। সে হুট করে এসেই আর্শিয়ার সম্মুখে দাঁড়ালো। খানিক মলিন মুখে তাকিয়ে বিষাদ বিসর্জন দিয়ে বললো,

—এলেই তো দু-দিন। এরপরমধ্যেই চলে যাবে । আর ক-টা দিন থেকে যাও।
সেই চোখের দিকে আর্শি তাকাতে পারে না, তাকাতে চাও ও না। ওতোটা গভীরতায় হারিয়ে যাবে নিমিষেই। তার ভয় হয়, শঙ্কা বাড়ে। ফলস্বরূপ মাথা না তুলেই পা বাড়ায় বাবার সাথে। এরপরেও সেই সর্বনাশা যুবক পিছু ছাড়ে নি তার। প্রায়’ই যায় সরদার বাড়ির গেটের সামনে। নানা অজুহাত দিয়ে তাকে এক ঝলক দেখে বলে ওঠে – আব্বু পাঠিয়েছিলো। চলো দুদিন থেকে আসবে। ‘
অলীক সব কল্পনা। যা সত্যি হওয়ার কোনো আশা নেই। তবুও আর্শিয়া এসব ভাবে। ভাবতে ভালো লাগে। বিষাদময়, শূণ্য এ পৃথিবীর ফাঁকে নির্জনে কোথাও দুদন্ড বসে যদি নিজের মতো করে সুখময় ঘটনা কল্পনা করা যায়, তবে তাতে কারই বা ক্ষতি!
মশার আক্রমণে শেষমেষ ছাঁদ ত্যাগ করে আর্শিয়া। ড্রয়িংরুমের দেয়ালঘড়ি’টা সন্ধ্যা সাতটার ঘোষণা করে দিয়েছে মাত্র। আর্শি ধীর স্থির পায়ে প্রেমার রুমের দিকে আগায়। কিন্তু ভেতরে আর প্রবেশ করে না। মন চাইছে এ ঘরের পরের ঘরটাতে ঢুকতে, একটু উঁকি মারতে। কিন্তু কাজটা বড্ড আপত্তিজনক। কেউ দেখে ফেললে সন্দেহ করবে। নানা প্রশ্নের সম্মুখীন করবে আর্শিকে। এসব ভালো লাগে না তার। সে চুপ হয়ে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে রইলো পাভেলের দরজার দিকে। ভেতরের লাইট জ্বালানো না হলেও, বোঝা যাচ্ছে দরজা চাপানো। খানিকটা ফাঁকা হয়ে আছে তা।
শেষ মন-মস্তিষ্ক উভয়ের সাথে তর্ক করে এগিয়ে গেলো পাভেলের দরজার দিকে। আগে-পিছে কিছু না ভেবেই একহাতে ধাক্কা মেরে খুলে দিলো দুয়ার। ভেতরে অন্ধকারে এলোমেলো হয়ে শুয়ে ছিলো পাভেল। দরজার সামনে আর্শিয়ার অবয়ব দেখতেই চমকে উঠলো। দ্রুতপায়ে বিছানা ছেড়ে গায়ে শার্ট জড়ালো। রুমের লাইট জ্বালিয়ে অপ্রস্তুত হয়ে হেসে বললো,

— ওহহ, তুমি।
আর্শি তখনো দরজার সামনে দাঁড়িয়ে। দেয়ালে কিছুটা হেলান দিয়ে গম্ভীর কন্ঠে বললো,
— বিরক্ত করলাম আপনাকে?
— না না, একদমই না। কিছু বলবে তুমি?
পাভেল বিরক্ত না হলেও আকস্মিক এ ঘটনায় চমকে গেছে। হুট করে তার ঘরের সামনে আর্শিয়ার আগমনে দ্বিগুণ অবাক হয়েছে। তারপরেও অপ্রস্তুত হয়ে বললো,
— আরে ভেতরে এসো। বাইরে কেনো দাঁড়িয়ে আছো? প্রেমা কোথায়?
— প্রেমা ওর রুমে আছে।
এবারে পুণরায় হোঁচট খেলো পাভেল। এই মেয়ে একা একা তার রুমে কেনো এসেছে? কি উদ্দ্যেশ্য তার? সে ভেবে পেলো না। লাইট জ্বালিয়ে দাঁড়িয়ে রইলো বিছানার সামনে। আর্শিয়া প্রায় একটানা দশ সেকেন্ড তাকিয়ে রইলো পাভেলের দিকে । তা দেখে হতভম্ব হয়ে, লজ্জা পেয়ে নিজেই চোখ সরিয়ে নিলো। আঁড়চোখে অন্যদিকে তাকিয়ে দাঁত দিয়ে দাঁত ঘষতে লাগলো।

— আই এম সরি! ওই দিনের ব্যবহারের জন্য।
পাভেল উৎসুক দৃষ্টিতে তাকালো। আমতা-আমতা কন্ঠে জানতে চাইলো,
— আমি ঠিক বুঝলাম না। তুমি কোন ব্যাপারে কথা বলছো?
এ পর্যায়ে বেশ বিরক্তই হলো আর্শিয়া। এতো প্রশ্ন কিভাবে করে মানুষ? এতো বড় ছেলে, অথচ বিস্তারিত ভাবে খুলে কথা বলতে হয়। নাহলে বুঝতে পারে না।
— আপনি কি ভয় পাচ্ছেন? আমি কিন্তু এখনো আপনার রুমে ঢুকিনি।
কি ভয়ংকর হুমকি। পাভেল ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইলো। সে ভয় কেনো পাবে এই মেয়েকে? সে রুমে ঢুকলেও বা কি? কিন্তু এ ব্যাপারে কোনো প্রশ্ন করতে পারলো না জড়তায়। এরমধ্যে চলে গিয়েছে আর্শিয়া। সে হুট করে সন্তুষ্ট হয়ে গেলো। মুখে তৃপ্তির হাসি। এই যে পাভেলকে খানিকটা ভড়কে দিয়েছে, এ নিয়ে অদৃশ্য এক সুখ বিরাজ করছে মনে। সে ধীর পায়ে ঢুকে গেলো প্রেমার ঘরে।
পুরো দৃশ্যটাই নজর কেড়েছে পিয়াশার। ড্রয়িংরুমে বসে দেখছিলো এতোক্ষণের কান্ডকারখানা। এই যে ছাঁদ থেকে আর্শির নিচে আসা, এরপর প্রেমার ঘরের সামনে গিয়ে থমকে দাঁড়ানো – পাভেলের ঘরের দিকে তাকিয়ে থাকা। নিঃসংকোচে দরজায় ধাক্কা দেওয়া, কথা বলা এবং পরিশেষে মুচকি হেসে স্থান ত্যাগ করা। এ সকল কিছুই কেমন সন্দেহজনক। পাভেল-আর্শির কথাপোকোথন কিছু না শুনলেও , অস্বাভাবিক কিছু যে তার চোখের আড়ালে ঘটছে সে ব্যাপারে পিয়াশা নিশ্চিত। নজর রাখতে হবে এখন থেকে।

সোভাম গিয়েছিলো উপজেলায়। স্টুডেন্টদের জন্য অধিক সুবিধাজনক কিছু বই বাছাই করতে। তারা পরামর্শ চেয়েছে এ ব্যাপারে। এ ছাড়া নিজের জন্যেও কিছু বই প্রয়োজন। সেই বিকেলে বের হলেও, পৌছাতে পৌছাতে প্রায় আটটা পেরিয়ে গেলো। ক্লান্ত চিত্তে তিনতলায় উঠে ফ্লাটের দরজায় তালা দেখতেই থমকে গেলো। প্রথমেই মস্তিষ্কে প্রশ্ন এলো – স্পর্শী কোথায়? এখানে এমন কোনো জায়গা নেই, যেখানে সে স্বেচ্ছায় বের হবে। যতদুর সোভাম জানে, তাতে বাবার সাথেও খুব বেশি সখ্যতা হয়নি তার। তাহলে যাবে কোথায়?
দ্রুত ফ্লাটের দরজা খুলে বইয়ের ব্যাগটা ছুড়ে মারলো টেবিলে। পকেট থেকে ফোন বের করে চিন্তিত হয়ে নাম্বার খুঁজতে লাগলো। এরইমধ্যে সামনে দৃশ্যমান হলো স্পর্শীয়ার মেসেজ। সন্ধ্যার পর পর’ই দিয়েছে, কিন্তু ব্যস্ততায় চেক করা হয়নি।

মেসেজটা পড়ার পর ক্লান্ত শরীরটা আরেকটু অবশ হয়ে গেলো। শীত শীত আবহাওয়ার মধ্যেও ফ্যান ছেড়ে শুয়ে পড়লো খাটে। চিৎ হয়ে, বুকের শার্টের বোতাম গুলো খুলে। হাতের ফোনটা পড়ে আছে অবলীলায়। তার মাথা কাজ করছে না স্পর্শীর মেসেজ পড়ে। হুট করে কি এমন হলো যে স্পর্শীয়া শামসুল সরদারকে এতোটা যত্নের সাথে আব্বু বলে ডাকছে? কি করে যেতে পারলো তার সাথে?
শরীরটা ক্রমশ দুশ্চিন্তায় ঘেমে যাচ্ছে। শেষ পর্যন্ত স্পর্শী সেই সরদার বাড়িতেই গেলো। যাকে ফেরানোর জন্য এতো এতো আয়োজন, এতো বছরের বেড়াজাল — সেই তাকেই আটকাতে পারলো না! এবারে কি জবাব দেবে সোভাম, মায়ের কাছে? কিভাবে জানাবে তার একটা ভুলের কারনে মায়ের গড়া ছোট্ট সংসার টা ধীরে ধীরে ভেঙে গেছে?
চিন্তায় মাথা ফেঁটে যাওয়ার উপক্রম। সে পুণরায় উঠে বসলো। আচ্ছা, শামসুল সরদার জোর করে স্পর্শীয়াকে নিয়ে যায় নি তো! এমন আশংকা উদয় হতেই শার্টের বোতাম আটলালো। দ্রুতপায়ে ফোন হাতে নেমে এলো নিচে। রওনা দিলো সরদার বাড়ির উদ্দেশ্যে।

স্পর্শীয়া হতবাক হয়ে বসে আছে ড্রয়িংরুমের সোফায়। আশেপাশে আশ্চর্য হয়ে ফ্যালফ্যাল দৃষ্টিতে তাকিয়ে ঘটনা বুঝে ওঠার চেষ্টা চালাচ্ছে। তার একপাশে বসে আছেন সোনালী এবং অন্যপাশে রিহানের স্ত্রী। সামনে কাচের টেবিলে রাখা হরেক রকমের নাস্তা। দুজনে খানিকক্ষণ পর পর এটা ওটা খাওয়ার জন্য তাড়া দিয়ে বেড়াচ্ছেন স্পর্শীকে। যেনো সে একটা আট বছরের বাচ্চা। খলিলুর সরদার বাড়িতে নেই। রাজনৈতিক কাজে পার্টি অফিসে গিয়েছেন। সেখানে আজ শামসুল সরদারের উপস্তিতির প্রয়োজন হলেও তিনি জাননি। নিজ হাতে , চক্ষু জুড়িয়ে বাড়ির সাহায্যকর্মী ভদ্রমহিলাকে আদেশ দিচ্ছেন স্পর্শীর রুম গুছিয়ে দেওয়ার জন্য। তার রুমের ঠিক পাশের বড় বেডরুম টা স্পর্শীকে দিয়েছেন। প্রথমে পরিস্কার -পরিচ্ছন্ন, মোছা এবং তারপর খাট, আলমারি, টেবিল থেকে শুরু করে অন্যান্য আসবাবপত্র নিজ ইচ্ছে মতো সাজিয়ে দিচ্ছেন। এটা শামসুল সরদারের বহু দিনের সাধ। নিজের হাতে বড় করতে চেয়েছিলেন মেয়েকে, শোয়ার ঘর থেকে শুরু করে খাবার-দাবার, পোশাক-পরিচ্ছদ এবং পুতুলের মতো সাজিয়ে দেওয়ার ইচ্ছেটুকুও মনে পোষা ছিলো। কিন্তু বিধাতা ভাগ্যে রাখেন নি। সে সময়টা কেটে গেছে বিচ্ছেদে। তাই বলে তিনি থেমে থাকবেন নাকি? যতটুকু করা যায় তা তো করবেন। এই যে মনের মাধুরি মিশিয়ে ঘরটাকে সাজাচ্ছেন এই তো অনেক। স্পর্শীকে এই ধুলোময় ঘরে ঢুকতেও দেন নি। ড্রয়িংরুমে বসিয়ে রেখেছেন। তার মেয়ের শুতে কষ্ট হয়। কি করে আবারো সেই আর্শি বা অন্যকারো রুমে ঘুমাতে দেবেন আজ? এর চেয়ে যত পরিশ্রম ই হোক, মেয়ের ঘর সাজিয়ে তবেই শান্তিতে ঘুমাবেন।
আজ বাহাদুর কাকা সোভামকে গেটে আটকে রাখলো না। বরং দূর থেকে দেখার সাথে সাথেই হাসি হাসি মুখ নিয়ে ছুটে এসে গেট খুললেন। বললেন,

— আপনে যে আইবেন তা বড় ভাইজান আগেই কইছে। আসেন।
দারোয়ানের কথার প্রেক্ষিতে কোনো উত্তর দিলো না সোভাম। ক্ষিপ্ত পায়ে এগিয়ে গেলো সদর দরজার দিকে। ড্রয়িংরুমে পা রাখতেই রুহান হো হো করে হেসে উঠলো। কিছুটা পিঞ্চ মেরে বললো,
— হেইই ব্রো! আমি জানতাম, তুমি এইভাবে রেগে লাল হয়েই বাড়িতে ঢুকবা।
স্পর্শী সোভামকে দেখা মাত্রই উঠে দাঁড়ালো। সে এখনো নিশ্চিত নয় ভাই রেগে আছে কি-না। তবে খুব করে চায় এটা না হোক। এর চেয়ে অভিমান করুক, তবুও রেগে না যাক। কারন সোভাম রেগে গেলে বোধশক্তি হারিয়ে ফেলে। কাকে কি বলে বসে তার হুশ থাকে না। আর পরবর্তীতে এটা নিয়ে নিজেই গুমরে মরে।
— এতো দেরি হলো আসতে? উপজেলা থেকে কখন এসেছিস?
স্পর্শীর প্রশ্নের কোনো উত্তর দিলো না সোভাম। বরং শান্ত হয়ে তার হাত ধরলো। শীতল কন্ঠে শুধালো,
— বাসায় চল।
দু-পা এগিয়ে যেতে যেতেও থেমে গেলো স্পর্শী। সোভামের সম্মুখে দাঁড়িয়ে বলল,

— আমি আব্বুর কাছে বাড়িতেই থাকবো, ভাইয়া। বাসায় শুতে কষ্ট হয়।
চোখ বন্ধ করে নিজেকে সংযত করলো সোভাম। বললো,
— বেশ! শুতে কষ্ট হলে আজ খাটে ঘুমাস। আমি নিচে শোবো। তবুও সাথে চল।
আবারো চলতে চলতে পা থামিয়ে দিলো স্পর্শী। সোভামের হাত চেপে ধরে গুরুগম্ভীর কন্ঠে বললো,
— আব্বুর সাথে আমার কথা হয়েছে, ভাইয়া। তুই অনেক কিছু জানিস না। অযথাই একটা ঘটনার উপর ভিত্তি করে তাকে দোষারোপ করছিস। অথচ সেই ঘটনা গুলো ঘটার কারন সম্পর্কে আমরা সম্পুর্ন অজ্ঞাত।
— আমি এই মুহুর্তে কিচ্ছু জানতে চাইছি না স্পর্শী। তুই আমার সাথে যাবি – এক্ষুনি, এই মুহুর্তে। যা শোনার আমি মায়ের থেকে শুনে নেবো।
— কিন্তু আমি মায়ের থেকে শুনতে চাইছি না। গত তেইশ টা বছর ধরে শুনতে চেয়েছি। কিন্তু কেউ বলেছিস? বরং সম্পুর্ন মিথ্যে একটা ভিত্তির মধ্যে নিজেকে এতিম ভেবে বড় হয়েছি। কি হতো সত্যিটা বললে? বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করেছে, তাই মা সংসার ছেড়েছে আমাদের নিয়ে। ওকে ফাইন! কিন্তু এই কথাটুকু আমায় জানালে কি এমন হতো? তা না করে আব্বু মারা গেছে, তার পরিবার নেই, সে একটা ফ্যাক্টরি তে কাজ করতো — উফফফফ! মিথ্যের পর মিথ্যে! ভাগ্য যদি পিরোজপুরে টেনে না আনতো, তাহলে আজীবনেও জানতে পারতাম না এসব।
সোভাম তাচ্ছিল্যের সুরে হাসলো। বললো,

— তো, এখন কি করতে চাইছিস? আমাকে, মাকে ছেড়ে তোর বাবার কাছে থাকবি?
স্পর্শী ঢোক গিললো। মিইয়ে যাওয়া কন্ঠে শুধালো,
— নাহ, বাবার জন্য তোদের ছাড়বো কেনো? যদি বাবাকে পেতে গেলে মা-ভাই হারাতে হয়, তাহলে আমার কাউকেই প্রয়োজন নেই। আগে এতিম হিসেবে বড় হয়েছি, এখন নাহয় কুলহারাই হবো। তাতে ভয় নেই। তবে আম্মুর কাছে আমি আর যেচে কিছু জিজ্ঞেস করবো না। সে অনেক বলেছে গত তেইশ বছরে। এবার বাদবাকি কিছু বলার থাকলে নিজে থেকেই বলুক।
সোভাম অসহায় চিত্তে তাকালো। বললো,
— মা আমায় ভুল বুঝবে চড়ুই, দোষারোপ করবে। তোর দায়িত্ব নিয়ে তবে পিরোজপুরে এনেছি। সাথে চল।
স্পর্শীর চোখ জ্বলছে। ভাইয়ের এতোটা অসহায় মুখ দেখতে ইচ্ছে করছে না। আজ সে তাকে ফিরিয়ে দিলে সোভাম অপমানিত হয়ে এ বাড়ি থেকে বের হবে। বোনের প্রতি চাপা একটা অভিমান জমকে। ভীষণ গাঢ়ভাবে। কিন্তু কিছু করার নেই। সবাই যদি অবুঝ হয় তাহলে কিভাবে ঠিক হবে সবকিছু? স্পর্শী শক্ত গলায় বললো,
— কারোর সংসার কানায় কানায় পূর্ণ করবো আমি। আব্বুকে দেওয়া কথা রাখতে গিয়ে তোকে যদি মায়ের সামনে একটু দায়িত্বহীন বানাই, তাতে খুব বেশি কি কষ্ট পাবি?
সোভাম আর সেকেন্ড ক্ষণ ও সময় ব্যয় করলো না। নত মস্তিষ্কে বেরিয়ে গেলো সরদার বাড়ি থেকে। বুকের ভেতরটাতে কেমন চিনচিনে ব্যথা হচ্ছে। মানতেই কষ্ট হচ্ছে তার চড়ুই, তাকে ফিরিয়ে দিয়েছে। সকলের সামনে অদৃশ্য ভাবে অপদস্থ করেছে। এই অপমান, যন্ত্রণা কি করে সইবে সোভাম। অভিমানে তার চোখ শক্ত হয়। অশ্রুর পরিবর্তে দুচোখ রক্তবর্ন হয়। হুট করেই ফোন বের করে। পিপাসাকে কল করে শক্ত কন্ঠে জানায়,
— তোমার মেয়ে তার বাবার কাছে চলে গেছে। আমি ধরে রাখতে পারিনি, মা। সে এখন অনেক সিদ্ধান্তই একা নিতে পারে।

কালো রঙের একটা প্রাইভেট কার। সদ্য সূর্য ওঠা রৌদ্রজ্জ্বল সকালটাতে রাস্তায় ধুলো উড়িয়ে গাড়িটা থামলো শিকদার বাড়ির গেটের সম্মুখে। ভেতর থেকে গায়ে মিষ্টি রোদ মাখিয়ে বেরিয়ে এলো স্পর্শীয়া সরদার। চোখের সানগ্লাস টা খুলে শীতল চোখে তাকালো শিকদার মঞ্জিলের দিকে। আলিশান এ বাড়িটার কোনায় কোনায় শৌখিনতার ছাঁপ। স্পর্শী ঠোঁট এলিয়ে নিঃশব্দে হাসলো। দু -মিনিট একটানা তাকিয়ে বাড়িটার কোনায় কোনায় মেপে নিলো। এরপর দাম্ভিকতা নিয়ে মেরুদণ্ড সোজা করে এগিয়ে গেলো গেটের দিকে। দারোয়ান বসে আছে টুলে। স্পর্শীয়াকে দেখে তিনি কিঞ্চিৎ ভ্রুঁ কুঁচকালেন। দামি গাড়িতে করে অচেনা নারী, যাকে এ বাড়িতে এর আগে দেখা যায়নি। পরিচিত কেউ হলে এতোক্ষণে ভেতরে থেকে তো লোক আসতো। দারোয়ান কিছুটা দ্বিধায় পড়ে গেলেন। আমতা-আমতা করে জিজ্ঞেস করলেন,
— আপনে কেডা আম্মা? বড়সাহেব তো বলে নায় সকালে কেউ আসবে।
স্পর্শী হাতের সানগ্লাসটা ব্যাগে ঢুকালো। কিছুটা গুরুগম্ভীর হয়ে তাকিয়ে দারোয়ানের উদ্দেশ্যে বললো,
— আপনার বড় সাহেব জানেন না। গিয়ে বলুন শামসুল সরদারের বড় মেয়ে এসেছে। শিকদার বাড়ির আতিথেয়তা গ্রহণ করতে।

দারোয়ান যেনো খানিকটা চমকালেন। ব্যতিব্যস্ত হয়ে দ্রুত ছুটলেন ভেতর দিকে। স্পর্শী প্রায় পাঁচ মিনিট অপেক্ষা করলো। এতে তার মোটেও মন্দ লাগছে না। বরং কৌতূহল হচ্ছে ভেতরের দৃশ্য দেখার জন্য। সে এসেছে শুনে নিশ্চয়ই ছোটোখাটো বাজ পড়েছে শিকদার বাড়ির ড্রয়িংরুমে। উফফফ! বিরাট মিস। কিন্তু এর পরের ধামাকা গুলো আর মিস করা যাবেনা। সরাসরি উপস্থিত থাকতে হবে ঘটনা প্রাঙ্গণে।
কেউ একজন ভেতর থেকে ব্যতিব্যস্ত হয়ে ছুটে আসছে। পড়নে টি শার্ট এবং ট্রাউজার। চুলগুলো এলোমেলো, মুখে দুশ্চিন্তার ছাপ। কাছাকাছি আসতেই স্পর্শী পাভেলকে অবলোকন করলো। মুখটা একদম ফ্যাকাসে হয়ে আছে। দ্রুত গেট খুলে দিতেই কোনো টু শব্দ না করে সামনে হেঁটে গেলো স্পর্শীয়া। পাভেলকে কোনোরকম তোয়াক্কা না করেই। তা দেখে মুখচোখ দুশ্চিন্তায় নীল হয়ে গেলো। সে দ্রুত পা বাড়িয়ে চিন্তিত কন্ঠে বললো,
— আমি কিছু বুঝতে পারছিনা চড়ুই। কি ঝামেলা পাকাতে এসেছিস?
স্পর্শী পিছু তাকালো না। তবে হাসলো। হাঁটার গতি একই রেখে বলে উঠলো,
— এই প্রথম তোদের বাড়িতে এলাম। ভাবলাম, বরণ ডালা নিয়ে আসবে। কিন্তু আফসোস! তোরা স্পর্শীয়া সরদারের মূল্যই বুঝলি না।
পাভেলের পেটের মধ্যে ইতোমধ্যে মোচড়ানো শুরু করে দিয়েছে। আর যাই হোক, শুধু শুধু স্পর্শীয়া যে এ বাড়িতে আসবে না সে বিষয়ে নিশ্চিত। কোনো না কোনো উদ্দেশ্য তার আছেই।
সদর দরজা খোলা। স্পর্শী পরিচিতদের মতো ভেতরে ঢুকলো। সোফার এক পাশে চিন্তিত হয়ে পিয়াশা দাঁড়িয়ে আছে। আমজাদ শিকদার ও রিডিং রুম ছেড়ে বাইরে এসে দাঁড়িয়েছেন। কিছুই বোধগম্য হচ্ছে না তাদের। স্পর্শী কারো বলার অপেক্ষায় রইলো না। নিজে থেকেই পায়ের উপর পা তুলে সোফায় বসলো। পিয়াশার দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে বললো,

– আন্টি আসসালামু আলাইকুম। কেমন আছেন?
পিয়াশা ভড়কে গেলেন। কোনো ভাবে সালামের জওয়াব টুকু দিয়ে রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে গেলেন। মেয়েটাকে তার সুবিধের লাগছে না। এইতো সেই ভয়ংকর মেয়ে, যে তার ছেলের বুকে ছুড়ি মারতে চেয়েছিলো।
পরশ এতোক্ষণে নিচে নেমে এলো। স্পর্শীয়া সরদার এ বাড়িতে এসেছে তা ইতোমধ্যেই কানে পৌঁছেছে। একবার ভেবেছে নিচে নামবে না। পরক্ষণেই কিছু একটা ভেবে নেমে এলো। সিঁড়ি দিয়ে নামতেই তার দিকে তাকিয়ে চমৎকার ভাবে হাসলো স্পর্শী। ভড়কে গেলো উপস্থিত সবাই। সকলকে পুণরায় ঘাবড়ে দিয়ে বললো,
— তা নেতামশাই , শামসুল সরদারের বিপক্ষে ভোটে নেমেছেন। কিন্তু এতোটা অসামাজিক হলে কি হয়? প্রথমে গেটে দাঁড় করিয়ে রাখলেন, এরপর ড্রয়িংরুমে। কেউ টু শব্দটাও করলো না। যেনো আমি এসেই বাকশক্তি কেড়ে নিয়েছি।

রাজনীতির রংমহল ৩ পর্ব ২১

— কোন উদ্দেশ্য নিয়ে বাড়িতে ঢুকেছো?
পরশের কন্ঠ ভারী। প্রশ্নের প্রতিটা শব্দে গম্ভীরতা ছেয়ে আছে। চোখের দৃষ্টি সূচালো। কপালে তিন তিনটা ভাঁজ। স্পর্শী প্রশ্ন শুনে পুণরায় হাসলো। বললো,
— রাজনৈতিক নেতারা প্রতিটা শব্দে উদ্দেশ্য খোঁজে। স্বার্থ ছাড়া কিছুই বোঝে না। কিন্তু আমি তো কোনো নেত্রী নই নেতামশাই। একটু বেড়াতে আসলাম, মামার বাড়ি। ওপসস! সৎ বোনের মামার বাড়ি। ডেকে আনুন আমার বোনকে। আমার সাথে নিয়ে যাবো। আপনাদের ছিঁটেফোঁটাও বিশ্বাস নেই। সামনে নির্বাচন, না জানি কখন, কাকে টার্গেট করে স্বার্থ হাসিল করে নেন।

রাজনীতির রংমহল ৩ পর্ব ২৩