Home রাজনীতির রংমহল ৩ রাজনীতির রংমহল ৩ পর্ব ২৩

রাজনীতির রংমহল ৩ পর্ব ২৩

রাজনীতির রংমহল ৩ পর্ব ২৩
সিমরান মিমি

মাথাটা বড্ড ঝিমঝিম করছে। দুশ্চিন্তায় ভীমড়ি খেয়ে পড়ার উপক্রম। অতি কষ্টে চোখ দুটো টানটান করে ড্রয়িংরুমে উপস্থিত সকলের মুখাবয়ব মেপে নিলো পাভেল। ঘটনা সুবিধার না। এক্ষুণি পর পর চারজন ক্ষিপ্ত হয়ে বোম ব্লাস্ট করবে স্পর্শীর সম্মুখে। প্রথমে পিয়াশা শিকদার, এরপর আমজাদ শিকদার এবং পরবর্তীতে পরশ শিকদার। তবে শেষ অবধি দেখতে গেলে প্রেমা বা আর্শিয়ার তরফ থেকেও কিছু ঝাঁঝালো উত্তর চলে আসতে পারে। পাভেল শঙ্কিত হলো। এতোগুলো মানুষ মিলে তার একাকী চড়ুইকে কথা শোনাবে! এটা কি সহ্য করার মতো? মোটেও না। সে অতি দ্রুত মুখ খুললো। পরিস্থিতি ঘোরাতে শান্ত কন্ঠে বলে উঠলো,

— তেমন কোনো ব্যাপার না। আর্শিয়া এসেছেই মাত্র দু-দিন। আরো কয়েকটা দিন বেড়াক, এরপর ও যেতে চাইলেই দিয়ে আসবো।
অতিব ভদ্র উত্তর। এতো মার্জিত আর ভদ্র উত্তর সহ্য হয় না স্পর্শীর। হজম করতে অসুবিধা হয়। ফলস্বরূপ বাঁকা চোখে পাভেলের দিকে তাকালো। এক ফালি অদৃশ্য ধমক এবং ভৎসনা ছুড়ে কোনো বাক্যব্যয় না করে পরশের দিকে তাকিয়ে মিষ্টি হাসলো। এই সেই সর্বনাশী হাসি — যা উপস্থিত কারোরই সহ্য হচ্ছে না। পরশ শিকদার ঘাবড়ে যায়, পাভেল শিকদার রেগে যায়, আর আমজাদ শিকদার অনুভূতিহীন চোখে বড় ছেলে এবং শত্রুপক্ষের মেয়েকে নিবিড় ভাবে পর্যবেক্ষণ করে। মেয়েটার হাসি সুবিধার নয়। সে খানিক বাদে এমনভাবে হাসছে যেনো যুগ যুগ ধরে পরিচিত পরশ শিকদারের সাথে। এটা অত্যন্ত ভয়ংকর ব্যাপার, যা পরবর্তীতে বিস্তর ধ্বংসাত্মক রুপ নিতে পারে। এখন তার কি করা উচিত? বুঝদার ছেলেটা কি এই সর্বনাশিনীর ফাঁদে পড়লো? তাহলে তো অতি দ্রুত সাবধান করতে হবে। বোঝাতে হবে এই সম্পর্কের ভবিষ্যৎ তান্ডব।

— কিন্তু আমার তো মনে হচ্ছে, আর্শিয়া তোমার থেকে আমার কাছে সুরক্ষিত থাকবে।
পরশের কন্ঠে গম্ভীরতা ব্যাপক। ভারী শব্দে প্রতিধ্বনি করে অনেক সময় পর উত্তরটা ছুড়ে মারলো। কিন্তু এই উত্তরের মানে কি? স্পর্শীয়ার সৎ বোন বলে কি সে ক্ষতি করবে আর্শিয়ার। এতোটা নিচু ভাবনা-চিন্তা নিয়ে বসে আছে এরা। অবশ্য শিকদারদের রক্ত থেকে মন-মানসিকতা সবই তো নষ্ট! ভাবাটা অস্বাভাবিক কিছু মোটেই নয়। তবুও স্পর্শীয়া না বোঝার ভান করলো। বাঁ হাতের দু আঙুলে কানের বাইরে আসা উড়োচুল গোছাকে সযত্নে কানের পেছনে গুঁজলো। সম্মোহনী দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে উঠলো,
— আমি কিছু বুঝতে পারলাম না নেতামশাই। মনে তো কতো কিছুই হতে পারে, কিন্তু সব কি ঘটে? এই যে এখন আমার মনে হচ্ছে, শিকদার বাড়ির রান্নাঘর থেকে বেশ কড়া করে এক কাঁপ চা আসবে। কিন্তু আসলেই কি তাই? অবশ্য এমপি শামসুল সরদার আতিথেয়তা পালনে মোটেও কৃপণতা করেন না।
স্পর্শীর মুখ স্থির, তবে চোখ দুটো চিকচিক করছে উজ্জ্বলতায়। যেনো পূর্নিমার সম্পুর্ণ জ্যোৎস্না গভীর কোনো দিঘির উপর প্রতিফলিত হয়েছে। স্থবির জলরাশির ঢেউহীন সৌন্দর্য্য নিমিষেই যেকোনো পুরুষের দৃষ্টি হেরফের করে দেয়। পরশ তাকাতে পারলো না। স্পর্শী তার দিকেই তাকিয়ে। এভাবে কোনো নারীর চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলা যায়? তাও সেই নারী, যার চোখে সন্দেহজনক কোনো অনুভূতি ফুটে উঠেছে। পরশ দৃষ্টি সরিয়ে অন্যত্র তাকায়। এই হাঁসি, এই দৃষ্টি এসবের মানে সে বুঝতে পারছে না। পারলেও চাইছে না। এই মেয়ের উদ্দেশ্য টা কি? সেদিন থেকে হেঁসেই যাচ্ছে, হেঁসেই যাচ্ছে। মাথামোটা!

— ইউ ক্যান কল মি পরশ শিকদার, প্লিজ!
পরশের কন্ঠে রাগের আভাস থাকলেও তা স্পষ্ট ফুটে উঠছে না। কেঁপে উঠছে গলা। ঘাবড়ে যাচ্ছে কথা বলতে গিয়ে। বাবা-মা, ছোট ছোট ভাই বোনের সামনে এমন আপত্তিকর দৃশ্যে কথা বলতে গিয়ে শব্দ এলোমেলো করে ফেলছে। ইচ্ছে হচ্ছে কিছু না বলেই চলে যেতে। কিন্তু সম্ভব না। আমজাদ শিকদারের মাথা গরম। যেকোনো ভাবে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে না যায়! তার চেয়ে অতি অল্পতে সেই সামলে নেবে সব। কিন্তু পারছে কই? স্পর্শী তাকে হতভম্ব করে পুণরায় বলে উঠলো,
— ডাকে কি এসে যায়? বিরাট নেতা আপনি, সে হিসেবে নেতামশাই ডাকাই যায়। অবশ্য এমপি হওয়ার চান্স থাকলে এমপিমশাই ডেকে ফেলতাম।
বলতে বলতে হেসে ফেললো স্পর্শী। তাচ্ছিল্য মাখানো হাঁসি। পরশ শান্ত দৃষ্টিতে তা দেখে গেলো। উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন মনে করলো না। আমজাদ শিকদার ক্রমশ গুমরে উঠছেন কথা বলার জন্য। কিন্তু পারছেন না। বারংবার বাঁধা পাচ্ছেন। এতোক্ষণে গমগমে আওয়াজে বলে উঠলেন,

— আর্শিয়া যাবে না। তুমি যেতে পারো এখন। আর তোমার হাতে ওকে তুলে দেওয়ার তো প্রশ্নই ওঠে না।
—কিন্তু আমি ওকে নিয়ে যেতেই এসেছি, আংকেল।
আর্শিয়া নেমে এলো দোতলা থেকে। সিঁড়ির পাশে দাঁড়িয়ে দেখছিলো এতোক্ষণ। অবশেষে ঘটনার মধ্যমনি হয়ে সে ধীর পায়ে নেমে এলো ড্রয়িংরুমে। থমথমে মুখে তাকালো স্পর্শী এবং অন্যদের দিকে। মুহুর্তটা একটু টানটান উত্তেজনাপূর্ণ। পরশসহ বাকিরা হিমশিম খাচ্ছে চিন্তাতে — আর্শি কি তাদের অপমান করে আসলেই চলে যাবে বোনের সাথে? ভেবে পেলো না। কিন্তু এমনটা যেনো না ঘটে সে ব্যাপারেই প্রত্যাশা তাদের। এদিকে স্পর্শী শ্বাসরুদ্ধ হয়ে বসে রইলো। কিন্তু উপরাউপর দৃষ্টি শান্ত, হাস্যোজ্জ্বল। সে সম্পুর্ন অচেনা, অজানা একজন। তার উপর সম্পর্কের পূর্বে সৎ ট্যাগ। এমনকি তাদের আগমনে আর্শিয়া রেগে সরদার বাড়ি ছেড়েছে এ ব্যাপারেও সে শতভাগ নিশ্চিত। এমন একটা টানাপোড়েন যুক্ত সম্পর্কের জের ধরে শিকদার বাড়িতে এসে বোকামি করে ফেলে নি তো। তবুও মনে জোর রাখলো। সোফা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে আর্শিয়ার দিকে তাকালো। যত্ন নিয়ে ডেকে বলে উঠলো,

— আর্শিয়া, ব্যাগ গুছিয়ে নিয়ে এসো। আমার সাথে বাড়িতে যাবে।
সামনে দাঁড়িয়ে থাকা স্পর্শীয়াকে দেখে আর্শি খুব বেশি চিৎকার -চেঁচামেচি করতে পারলো না। সে শান্ত দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে দেখলো। এই মুখটা তার চেনা। সেবার এক্সিডেন্টের সময় এই অজানা মুখটা ছাড়া অন্য কাউকে আপন মনে হয়নি। এমনকি এই মুখটাও তাকে ছেড়ে এক মুহুর্তের জন্য যায়নি। সৎ শব্দটা ভেতরে ক্ষোভের সৃষ্টি করলেও সরাসরি এই মুখটাকে দেখে আর্শি রেগে যেতে পারলো না। তার বিদ্বেষটা অদৃশ্য হয়েই পড়ে রইলো মনের এক কোনে। তবুও যেতে সাধ দিলো না। মাথা নিচু করে মৃদু স্বরে বললো,
— আমি এখন যাবো না। যখন ইচ্ছে হবে তখন চলে যাবো।
ব্যক্তিগত সব কথাবার্তা শিকদার বাড়িতে বসে বোঝানো উচিত নয়। হিতে বিপরীত হবে। এছাড়াও স্পর্শী চায় না তাদের ভেতরকার সম্পর্কের সমীকরণ গুলো অন্যকেউ বুঝুক বা জানুক। সে আর্শির সামনে সরাসরি দৃষ্টি দিয়ে তাকালো। চোখ দিয়ে ইশারা করে শান্ত স্বরে বললো,

— এটা তোমার মামা বাড়ি। শুনেছি, এর আগে আব্বু আসতে দিতো না। রাগ করতো। তবে এখন আর এমন কিছু হবে না। আমি কথা দিচ্ছি, যখন খুশি এ বাড়িতে চলে আসতো পারো। তবে এখন, এই মুহুর্তে আমার সাথে বাড়িতে যাবো। সময়টা এখানে থাকার মতো উপযুক্ত না। আট দিন পর নির্বাচন। তুমি বেশ বুদ্ধিমতী। আশা করছি এর চেয়ে বিস্তারিত ভাবে তোমাকে বোঝাতে হবে না। মামাকে জানিয়ে দাও – খুব বেশি টান থাকলে যেনো নির্বাচনের পর গিয়ে নিয়ে আসে।
আর্শিয়া হুট করেই কেমন চমকে গেলো। গম্ভীর মুখে একবার আমজাদ শিকদার এবং পরের বার স্পর্শীর মুখের দিকে চাইলো। মাথাটা ঝিমঝিম করছে। এমন প্যাঁচালো, ইশারা-ইঙ্গিত পূর্ণ কথাবার্তা বুঝতে বেশ বেগ পেতে হয়। তবুও কিছু একটা ভেবে সিদ্ধান্ত হীনতায় গুমরে উঠলো। অজানা কারনেই তাকালো পাভেলের দিকে। তার দায়সারা চাহনি দেখে মুহুর্তেই চোখ সরিয়ে নিলো। ছোট্ট করে বললো,

– আসছি।
এরপর গটগট পায়ে উঠে গেলো দোতলায়। শিকদার বাড়িতে রান্নার কাজে সাহায্য করা মধ্যবয়স্ক মহিলাটি মাত্র’ই নাস্তার ট্রে নিয়ে এসেছেন। টেবিলের উপর রেখে কোনো টু- টা শব্দ না করেই ত্যাগ করলো স্থান। পিয়াশা কিছু বলতে চেয়েও পারে নি। বড় ছেলের ইশারায় থেমে গিয়ে দাঁড়িয়ে আছে রান্নাঘরের সামনে। রাগে ফোঁসফোঁস করে উঠছে। মেয়েটা কিভাবে ভুজুংভাজুং বুঝিয়ে ব্রেনওয়াশ করে ফেললো।
সিঁড়ির উপর থেকে ঠক্ ঠক্ আওয়াজ আসছে। স্পর্শীয়া তাকিয়ে দেখলো এবার। আর্শিয়া ব্যাগ হাতে দ্বিধাগ্রস্থ পায়ে এগিয়ে আসছে। স্পর্শী তৃপ্তি নিয়ে পরশ শিকদারের দিকে তাকালো। মুখে মুচকি হাসি। হঠাৎই সকলকে চমকে দিয়ে নাস্তার ট্রে থেকে এক কাঁপ গরম চা নিলো। সশব্দে পরশের সামনে রেখে মৃদু হেঁসে বললো,

— এটা আমার তরফ হতে। আপনিই নাহয় খান।
ব্যাপারটা অতিশয় অপ্রীতিকর ঘটনা এই যে, চায়ের কাপ এতোটাই গতি নিয়ে টেবিলের উপর ফেলেছে — যার কারনে কাপের অর্ধেকটা চা পড়ে আছে টেবিলটাতে, ছড়িয়ে- ছিটিয়ে। কয়েকটা গরম ফোঁটা ছিটে পরশের পাঞ্জাবির গায়েও পড়লো। অবস্থা এতোটাই বেগতিক মনে হলো যে – স্পর্শী পারে না চায়ের কাপটা ছুড়ে পরশ শিকদারের মুখে মারতে।
হতভম্ব হয়ে কাপের দিকে চেয়ে রইলো পাভেল। এতোটা অপমান, অসম্মান — তাও বাড়িতে এসে। এর সমস্ত প্রভাব যে তার উপর পড়বে এ ব্যাপারে মোটেও সন্দেহ নেই। দ্রুত কেটে পড়তে হবে। পাভেল কাচুমাচু করে তাকিয়ে রইলো ফ্লোরের দিকে। আর্শির হাত ধরে পূর্বের মতোই দাম্ভিকতা নিয়ে শিকদার বাড়ি ছাড়লো স্পর্শীয়া। একবার পিছু ফিরে দেখলোও না কারো মুখ। তবে আর্শি তাকালো। সে প্রতিটা কদম ফেলার সাথে সাথে দ্বিধাভরা দৃষ্টি নিয়ে তাকাচ্ছে পাভেলের দিকে। অজানা, অদৃশ্য কারনে বারংবার চাইলো এই মানুষটা একবার বলুক – সে আনতে যাবে আর্শিকে। কিন্তু বললো না। এমনকি লোকটা তাকালোও না তার দিকে। বরং সদর দরজা পার হওয়ার সাথে সাথে লোকটা ছুটেছে দোতলায়। আর্শিয়ার অবাক লাগলো। কিছু দেখা যাচ্ছে না আর। হঠাৎই মন ভার হলো সন্দেহজনক কিছু প্রশ্নে। আচ্ছা, পাভেল কেনো ওভাবে উপরের দিকে ছুটলো? সে কি অভিমান করেছে আর্শির যাওয়ার কারনে।

পিয়াশা শিকদার আনমনা হয়ে সোফায় বসলেন। এখনো দৃষ্টি বাইরের দিকে। কোনো জটিল সমীকরণ মিলিয়ে ফেলেছে প্রায়। খানিকটা সময় নিয়ে ভেবে-চিন্তে স্বামীর দিকে তাকালো। পাভেল উপস্থিত নেই এখানে। সময়টা উপযুক্ত। তা ভেবেই কপালে ভাঁজ ফেললো। কিঞ্চিৎ আর্তচিৎকার করে বলে উঠলো,
— এই মেয়ের সাথে আর্শি থাকবে! কিভাবে? এতোটা ধুরন্ধর, বদমেজাজি সৎবোন হলে সরদার বাড়িতে টিকবে কি করে? ওকে তো ওই স্পর্শী এক হাঁটে বেচবে, অপর হাটে কিনবে। না না, মেয়েটা ওই সৎ-ভাই বোন গুলোর মধ্যে একটুও সুরক্ষিত থাকবে না। ওকে ওখানে রাখা যাবে না। আপা যে আগুনে জ্বলছে, সেই আগুনে তার বাচ্চা মেয়েটাও জ্বলবে এমনটা আমরা হতে দিতে পারি না।
আমজাদ শিকদার খানিকটা ক্ষেপেছেন। আকস্মিক ধমক মেরে বলে উঠলেন,

— আমরা বললেই কি হয়ে যায় নাকি? আটকাবো কি করে? চলে গেলো তো সেই সৎ বোনের সাথে। আটকাতে পেরেছো?
পিয়াশা চুপ করে গেলেন। বিরতি নিয়ে ধীর কন্ঠে বললেন,
— এবার পারবো আটকাতে।
আমজাদ ভ্রুঁ কুঁচকে চাইলেন। জিজ্ঞেস করলেন,
— রহস্য না করে বুঝিয়ে বলো।
— আমি না এ কদিন খেয়াল করলাম মেয়েটার দিকে। শুধু আর্শি না পাভেলকেও দেখেছি। দুজনের মধ্যেই কেমন একটা অদ্ভুত সম্পর্ক। আমার মনে হয় আর্শিয়া পাভেলকে পছন্দ করে। আমাকে ভুল প্রমাণ করতে চেয়ো না, আগে পুরোটা শোনো – ভাবো। আর্শি প্রায়’ই পাভেলের রুমের দিকে তাকিয়ে হাসে, উঁকি মারে, কথা বলার চেষ্টা করে। আমার সন্দেহ ভুল না। শোনো, পাভেল আর আর্শির বিয়ের ব্যাপারে একবার সম্বন্ধ নিয়ে দেখো। মেয়েটা নিশ্চিত রাজি হবে। তখন ওর বাবা-ভাই বিরুদ্ধে গেলেও মেয়েটা আমাদের কাছে চলে আসবে। যদি বিরুদ্ধে নাও যায়, তবুও আমি জানি বিয়ের পর মেয়েটা পাভেল ছাড়া আর কিছু বুঝবে না। আমি ওকে দেখেছি এ কদিন। তুমি কিন্তু ভেবে দেখতে পারো। ও ওর মায়ের মতোই ভালোবাসার কাঙাল। একবার আমাদের বাড়িতে সম্পর্কে জড়িয়ে গেলে দেখবে

– ও যেতে চাইবে না।
পরশ কপালে ভাঁজ ফেলে মায়ের দিকে চাইলো। স্বল্প অসন্তোষের সাথে আপত্তি জানিয়ে বললো,
— তুমি এসব কি বলছো, তা ভেবে দেখেছো?
— হ্যাঁ দেখেছি। তুমি আর তোমার আব্বু বুঝতে পারছো না। মেয়েটার বিয়ে তো হবেই কোনো একদিন। এমনিতেই এতোগুলো দিন ওই বাড়িতে ভুগলো, এরপর যদি কপালে আবার খারাপ ঘর – সংসার পড়ে? তবে সারাটা জীবন ধুকতে ধুকতে যাবে। আমার পাভেল কি খারাপ নাকি? আর আর্শির সম্মতি ছাড়া তো আগাবো না। যদি ও রাজি থাকে তবেই আনবো। মেয়েটার মুখের দিকে তাকাতে পারি না। কতটা মায়া মুখে। একা একা বসে থাকে, হাঁসে না, কথা বলে না, ঠিকমতো ঘুমায় না। চুপচাপ বসে থাকে এক কোনায়। কিন্তু পাভেলের সামনে গেলেই কেমন লজ্জা পায়, হাঁসে, যে-চে কথা বলার চেষ্টা করে, ঘরে উঁকি দেয়। তোমাদের কি মনে হয় না, বিয়েটা হলে ও একটা স্বাভাবিক জীবন পাবে।
আমজাদ শিকদার ভাবুক ভঙ্গিতে মাথা নাড়লো। কপালে আঙুল ঘষতে ঘষতে বললো,

— কিন্তু ওই মেয়েটা! শামসুলের বড় মেয়েটা ভীষণ ধুরন্ধর। নিমিষেই সিদ্ধান্ত পালটে ফেলবে।
পিয়াশা আর্তচিৎকার দিয়ে উঠলো। দ্রুত গলায় বললো,
— সেটাই তো। ওই মেয়ের দ্বারা যেনো প্রভাবিত না হয়, সেজন্য দ্রুত সিদ্ধান্ত নাও।
পরশের এসব আলাপ-আলোচনা ভালো লাগছে না। হুট হাট ঘটনার মোড় পাল্টাচ্ছে। মেজাজটাও খারাপ হচ্ছে ধীরে ধীরে। আয়জা শিকদারের ছবিটা ভাসছে চোখের সামনে। দেখতে প্রায় আর্শির মতোই। এমন নরম, শান্ত একটা মেয়েকে স্ত্রী থাকা সত্ত্বেও শামসুল সরদার অবৈধ সম্পর্কে ফাঁসিয়েছে। আবেগের বয়সটাকে সম্পুর্ন বশ করে ঘর ছাড়া করেছে, অপমান করেছে, অসম্মান করেছে। বিয়ের পূর্বেই ক্লাবে নিয়ে শিকদার বাড়ির সম্মান নষ্ট করেছে। তারপরেও ক্ষান্ত হয়নি। শারীরিক, মানসিক নির্যাতন করতে করতে প্রাণটাকেই মেরে ফেলেছে একসময়। পরশ নিমিষেই চোখ দুটো বন্ধ করে নিলো। শামসুল সরদার হয়তো তার নিজের মেয়েকে আয়জা শিকদারের মতো কষ্ট দেয়নি, কিন্তু কতখানি ভালোবাসা দিয়ে আগলেও রাখে নি। শুধুমাত্র দায়িত্ব এবং জেদের বস্তু বানিয়ে সঙ্গে রেখেছে। সেই মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে খুব একটা বাছ-বিচার করে, ভালো একটা পরিবারে তুলে দেবে এটা ভাবাও অযৌক্তিক। পরশ সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো। রাশভারি কন্ঠে বললো,
— বেশ! আর্শির সম্মতি থাকলে আমি নিজে থেকে আগাবো। কিন্তু আগে ওর সাথে একান্তে কথা বলতে হবে এ বিষয়ে।

স্পর্শীর বুকটা এখনো ধক্ ধক্ করছে। উত্তেজনা কাটাতে পারছে না কিছুতেই। আর্শির হাত এখনো তার মুঠোয়। মেয়েটা ছাড়াচ্ছেও না। শুধু নিস্তেজ হয়ে চোখ বন্ধ করে আছে। তার মায়াবী মুখের দিকে তাকিয়ে আশ্চর্য হয়ে ভাবতে বসলো স্পর্শী। মেয়েটা চাইলেই তাকে অপমান, অসম্মান করে চলে যেতে পারতো রুমে। এমনকি সম্পর্ক নিয়েও নানা বাজে কথা বলতে পারতো। নেহাত ই বয়স ছোটো ভেবে এমনটাই ভেবেছিলো সে। বাবার কথা অনুযায়ী আর্শির আচার- আচরণে উগ্রতা থাকারও কথা ছিলো। কিন্তু তেমনটা কিছুই প্রকাশ করলো না সে। বরং কোনো বাক্য ব্যয় না করেই চলে আসলো হাত ধরে। আচ্ছা, এই সম্মান কোন কারনে দিয়েছে আর্শিয়া? স্পর্শী বোন বলে, নাকি বাবার নির্বাচনের কথা ভেবে? প্রথম টা হওয়ার তেমন কোনো সম্ভাবনা নেই। তাই দ্বিতীয় টাই ভেবে নিলো। তবুও স্পর্শী সন্তুষ্ট। অন্তত বাবাকে ভালোবাসুক, তার সংসার টা পূর্ণ থাকুক সন্তানদের নিয়ে। এতোবছর দু- সন্তানের অনুপস্থিতির পূর্ণতা যেনো তৃতীয় সন্তানের শূন্যতায় না হয়।

— আপনার ফোন বাজছে।
আর্শিয়ার দ্বিধাগ্রস্থ কন্ঠের আওয়াজে সম্বিত ফিরে পেলো স্পর্শী। দ্রুত ফোন বের করলো ব্যাগ থেকে। মোবাইল টা সামনে ধরতেই কলিজাটা ধক্ করে উঠলো। ভয়ে ফোনটাকে রিসিভড না করেই মুঠোয় ফেলে লাগলো। পিপাসা সরদার কল দিচ্ছেন। মেয়ে ধরছে না দেখেও ক্ষান্ত হন নি। একের পর দিয়েই যাচ্ছেন। স্পর্শীয়া অনেকক্ষণ ভাবলো। কথা সাজিয়ে নিলো মনের মধ্যে। ভেবে-চিন্তে সময় নিয়ে রিসিভড করলো ফোন। কিন্তু কথা বলার সাহস পেলো না। নিরবে স্পিকারের অংশটা চেপে ধরলো কানে। ওপাশ থেকে মায়ের দীর্ঘশ্বাস শোনা যাচ্ছে। কেঁপে উঠলো স্পর্শী। চোখদুটো জ্বলছে।
— কেমন আছিস?
— ভা লো!
— ঢাকায় ফিরবি কবে?
এমন প্রশ্নে স্পর্শী চমকালো। মনে নানা প্রশ্নের উদয় হলো। মা কি এখনো কিছু জানে না? ভাই কি কিছুই জানায়নি। সে চিন্তিত হয়ে ঢোক গিললো। এলোমেলো শব্দে বললো,
— আসবো। দেরি হবে একটু।
— ওহহ!
স্পর্শী এই ছোট্ট ছোট্ট উত্তরে কেঁপে উঠছে। মনে ভীতি বাড়ছে। মায়ের থেকে এমন স্বল্প উত্তর নেওয়া যাচ্ছে না। শঙ্কিত কন্ঠে প্রশ্ন করলো,

— ভাইয়া কিছু জানায়নি?
পিপাসা মৃদু হাসলো। বললো,
— তুইও তো জানাতে পারতিস, জানতে পারতিস। কিন্তু তা কি করেছিস?
স্পর্শী নিঃশব্দে কেঁদে ফেললো। অভিমান মিশ্রিত কন্ঠে বললো,
— আসলেই কি আমি জিজ্ঞেস করি নি? নাকি তুমি বলো নি।
— তখন বলার প্রয়োজন ছিলো না বলেই বলিনি।
স্পর্শী নিজেকে আটকাতে পারলো না। মায়ের কথার প্রেক্ষিতে ফুঁপিয়ে উঠলো। খানিকটা অভিমান জড়িয়ে উচ্চস্বরে বলে উঠলো,

রাজনীতির রংমহল ৩ পর্ব ২২

— সেটা কি আমার দোষ? তুমি, ভাইয়া কেউ বলার প্রয়োজন মনে করোনি। কিন্তু আব্বু করেছে, সে বলেছে, পুরো ঘটনা শুনিয়েছে। অথচ এতোদিন পর এখন তুমি জানাচ্ছো কেনো জিজ্ঞেস করিনি! অদ্ভুত না? আম্মু প্লিজ! আমার এসব ভালো লাগছে না। কাছের মানুষগুলোর থেকে আলাদা সময়ে, আলাদা জায়গায়, আলাদা আলাদা ঘটনা গুলো শুনতে ভালো লাগছে না। প্লিজ একবার আসো। আমি তোমায় নত হতে বলছি না। শুধু দুজন প্রিয় মানুষকে সামনে রেখে তাদের কথাগুলো, অভিযোগ গুলো শুনতে চাইছি। এভাবে বাঁচা যায় না, বিশ্বাস করো। আমরা কেউ জানি না, আমাদের অনুপস্থিতিতে অপর পক্ষের মানুষটা কি ফেস করেছে। আমি শুধু সবটা জানতে চাই, বিচার করতে চাই। এরপর হয় সকলকে নিয়ে বাঁচবো, নাহয় একা বাঁচবো।

রাজনীতির রংমহল ৩ পর্ব ২৪