Home রাজনীতির রংমহল ৩ রাজনীতির রংমহল ৩ পর্ব ২৪

রাজনীতির রংমহল ৩ পর্ব ২৪

রাজনীতির রংমহল ৩ পর্ব ২৪
সিমরান মিমি

আমজাদ শিকদার গম্ভীর হয়ে বসে আছেন। সারামুখে দুশ্চিন্তার ছাপ। নানা ধরনের ইতিবাচক -নেতিবাচক ভাবনা-চিন্তা কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে। মস্তিষ্ক তার সমীকরণ মেলাতে পারছে না। হুট করেই শামসুল সরদারের বড় মেয়ের আগমন, এতোটা নম্র-ভদ্র আচরণ। কোনো হাঙ্গামা বা ঝামেলা না করেই আর্শিয়াকে নিয়ে যাওয়া। এসব হজম হচ্ছে না কোনোভাবেই। তবে সবচেয়ে যে বিষয়টা তাকে ভাবাচ্ছে তা হচ্ছে স্পর্শীয়ার আচরণ। পরশের দিকে তার তাকানো, মুচকি হাঁসা, চোখের চাহনি — সবকিছুই বড্ড সন্দেহজনক। আমজাদ শিকদারের জানামতে পরশের সাথে স্পর্শীয়ার সম্পর্ক শামসুল সরদারের থেকেও ভয়ংকর। কেননা তাদের প্রথম সাক্ষাৎ’ই ছিলো আপত্তিজনক।

এতোসবের মধ্যে এমন কোমল আচরণ মেনে নেওয়া যাচ্ছে না। তিনি ক্রমশ গুমরে উঠলেন দুশ্চিন্তায়। তার ছেলেটা কি তবে ফাঁদে পড়লো সরদারদের? নাহ, এমনটা হতে দেওয়া যায় না। দীর্ঘ দুই যুগ পূর্বের কাহিনি পুণরায় ঘটতে দেওয়া যাবে না। সরদারের রক্ত তো অনুভূতিহীন, পাষাণের রক্ত। যারা উসকে দিয়ে উদ্দেশ্য হাসিল করে পরবর্তীতে ছুঁড়ে মারে অবলীলায়। এভাবে ছেলের জীবনটা নষ্ট করতে দেওয়া যাবে না। তার পূর্বেই আটকাতে হবে।
আমজাদ শিকদার দ্রুতপায়ে দোতলায় গেলেন। পরশ তার রুমে ঢুকেছে খানিক পূর্বে। আধ ঘন্টার মধ্যেই বেরিয়ে যাবে বাইরে। যা জানার এবং আলোচনা করার দরকার রয়েছে, তা এক্ষুনি করাই শ্রেয়।
পরশ শিকদারের রুমের দরজা পুরোপুরি খোলা। বাইরে থেকেই পুরোটা দেখা যাচ্ছে। মনোযোগী দৃষ্টিতে ড্রয়ারের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কিছু কাগজ খুঁজছে সে। আমজাদ মৃদু স্বরে ছেলেকে ডাকলেন। বললেন,

— তোমার সময় থাকলে কিছু কথা বলতাম।
হাতের ফাইলপত্র ওভাবেই ড্রয়ারে রেখে দিলো পরশ। জোরপায়ে এগিয়ে এলো দরজার দিকে। চেয়ার এগিয়ে দিয়ে বললো,
— হ্যাঁ, বলো না। আমি ফ্রি আছি, বোসো।
আমজাদ বসলেন। এক পায়ের উপর অন্য পা তুলে, সেই পায়ের হাটুর উপর ডান হাতের কনুই দ্বারা ভর দিলেন। থুতনির সম্পুর্ন ভারসাম্য সেই হাতের উপর রেখে ভাবুক দৃষ্টিতে ছেলেকে দেখলেন। বললেন,
— যা ঘটাচ্ছো তার পরিমাণ কতটা ভয়ংকর হবে, ভেবে দেখেছো?
পরশ ভ্রুঁ কুঁচকে ফেললো। প্রশ্নের সারমর্ম বুঝতে না পেরে পুণরায় জিজ্ঞেস করলো,
— কোন বিষয়ে?
— শামসুল সরদারের বড় মেয়ের বিষয়ে। আমার সামনে না জানার ভান ধরবে না।
পরশ বিরক্ত হওয়ার ন্যায় অন্যদিকে তাকালো। বাবার প্রশ্নের ভাবার্থ এখন কিছুটা বোঝা যাচ্ছে। কিন্তু তারপরেও! আমজাদ শিকদারের মতো একজন চতুর, দুরদর্শি ব্যক্তি অকারণে কিভাবে ছেলেকে জেরা করতে চলে আসে সেটা নিয়ে পরশ সন্দিহান। খানিকটা উঁচু স্বরে বললো,

— শামসুল সরদারের বড় মেয়ের বিষয়ে আমি কি জানি! আজব, তুমি আমায় কেনো জিজ্ঞেস করছো?
আমজাদ ক্ষুব্ধ হলেন। পরশ তার সামনে সবটা অস্বীকার করছে কোনোরকম ভণিতা ছাড়াই। যেনো এসব বিষয়ে কিছুই জানে না। ধমক দিয়ে বললেন,
— আমি তোমাকে শেষবারের মতো সাবধান করছি। ওই মেয়ের সান্নিধ্য ছেড়ে দাও। এরা হলো মায়া রাক্ষসী। তোমার মাত্র শুরু হওয়া রাজনৈতিক জীবনটা ধ্বংস করে দেবে। সাবধান!
— আব্বু তুমি এসব কথা আমাকে কেনোই বা বলছো? স্পর্শীয়া সরদারকে নিয়ে এসব আকার-ইঙ্গিতে বলা কথাগুলো আমার কাছে অসহ্য লাগছে। তার সাথে আমার কোনো রকমের স্বাভাবিক সম্পর্ক নেই।
আমজাদ তাচ্ছিল্য নিয়ে হাঁসলেন। বললেন,

—স্বাভাবিক কোনো সম্পর্ক থাকলে আমি আটকাতাম ও না। কিন্তু ঘটনা এ জায়গাতেই। এটা একটা অস্বাভাবিক সম্পর্ক। যেটা ওরা বাপ-মেয়ে মিলে পরিকল্পনা করেছে। তুমি শক্ত হও। ওদের পরিকল্পনা কিন্তু ভয়ানক! নির্বাচনের আগেই তোমায় ধূলিসাৎ করে দিতে চাইছে। এসব মেয়েলি মায়া ছেড়ে দাও।
নাহ! আর সহ্য করা যাচ্ছে না এসব আজগুবি, সন্দেহজনক কথাবার্তা। মাথা গরম হয়ে যাচ্ছে নিমিষেই। পরশ মুহুর্তে’ই বিরক্তিসূচক শব্দ ‘চ্যাহ’ উচ্চারণ করলো। দাঁতে দাঁত চেপে অন্যদিকে তাকিয়ে বললো,
— এইসব আকার-ইঙ্গিতে কথা বলা বন্ধ করো। এসব ব্যাপারে তোমার সন্দেহই বা হলো কেনো বুঝতে পারছি না। আর সবচেয়ে বড় কথা — স্পর্শীয়া সরদারের সাথে আমার স্বাভাবিক, অস্বাভাবিক কোনো সম্পর্কই নেই।
রেগে গেলেন আমজাদ। ধমকের সুরে বললেন,

— আমায় মাথামোটা মনে হয়? কোনো সম্পর্ক না থাকলে কেউ এভাবে কথা বলে? আমি কি ঘাসে মুখ দিয়ে চলি। ওই মেয়ে কথা বলার সময় তোমার দিকে তাকিয়ে হাসছিলো না? আমি খুব ভালো বুঝতে পারছি তুমি ওই কালসাপের পাল্লায় পড়েছো। আর ওই কালসাপ বিঁষ ছাড়তে এসেছে।
কিছুদিন ধরে স্পর্শীয়ার আচরণে পরিবর্তন লক্ষ করেছে পরশ। তাকে দেখলেই সে হাসে, ভিন্ন দৃষ্টিতে তাকায়। কিন্তু এতে কি করার আছে? সে কি গিয়ে মুখ চেপে ধরবে হেঁসো না বলে? অদ্ভুত! তবুও বাবার সম্মুখে শান্ত রইলো। পূর্বের ন্যায় স্থির গলায় বললো,
— সে কেনো হাঁসে বা হেঁসেছে, তা আমার জানার কথা নয়। জানতে চাইও না। তাই ফালতু কোনো ইঙ্গিত করে তুমি আমায় খোটা দেবে না। কাজ আছে, আসছি।
দ্রুতহাতে ড্রয়ারে তালা মেরে ফোন পকেটে ঢুকালো। চুলের উপরটাতে মিহি একটু আঁচড় দিয়েই বেরিয়ে গেলো রুম ছেড়ে, বাবাকে অবজ্ঞা করেই।

এই পালাই পালাই স্বভাবটা আরো ভাবিয়ে তুললো আমজাদকে। তার সন্দেহ গাঢ় হলো, চোখ সতর্ক হলো। ভবিষ্যৎ কিছু ঘটনা ভেবে লোম খাড়া হলো। মুহুর্তে’ই ধপ করে উঠে বসলেন। নাহ! এমনটা হতে পারে না। তার সবচেয়ে বুঝদার, বুদ্ধিমান ছেলেটা এমন ভুল করতে পারে না জীবনের শুরুতেই। কিন্তু তাও করেছে। করে ফেলেছে। অবশ্য এ দোষ পরশের নয়। সুশ্রী মুখের আড়ালে লুকিয়ে থাকা বিষধর সাপটার। সেই তো ছেলেটার মগজ শুঁষে ফেলেছে। আজ বাবার কাছে সম্পর্কের কথা অস্বীকার করেছে, কাল অন্যকিছু নিয়ে মিথ্যা বলবে। আর পরেরদিন, পরেরদিন যে-চে গিয়ে দুধ-কলা দিয়ে সেধে সেধে সাপ ঘরে নিয়ে আসবে। তারপর? তারপর ঘটবে শিকদার বাড়ির ধ্বংস!
মেজাজ পরিপূর্ণ ভাবে খারাপ অবস্থায় বাড়ি থেকে ধেয়ে বের হয়ে গেলো পরশ। গাড়িতে বসে রওনা দিলো সদরের উদ্দেশ্যে। গুরুত্বপূর্ণ কিছু কাজ পেন্ডিং এ রয়েছে। যেতে যেতে সে চোখ বন্ধ করে আরো কিছু ভেবে নিলো। সিদ্ধান্ত নিলো আরো কিছু প্রয়োজনীয় কাজের সুরাহা করবে। এভাবে চুপ করে থাকা যায় না। আজ বাবার চোখে পড়েছে, ক-দিন পর গোটা পিরোজপুরের চোখে পড়বে। তখন সেই পূর্বের দূর্নাম। এর থেকে খোলাখুলি কথা বলা শ্রেয়। সেই মেয়েকে ডেকে পরশ কারন জানবে। দেখা হলেই আহাম্মকের মতো হেসে ওঠার ক্ষেত্রটা ঠিক কি তা বুঝেই ছাড়বে।
পরশ জিভ দিয়ে ঠোঁটের ঢগা ভেজালো। আলতো হাতে কল লাগালো পাভেলকে। রিসিভড করতেই স্বাভাবিক কন্ঠে বললো — “ স্পর্শীয়া সরদারের ফোন নাম্বার দে। ”

পাভেল বাড়িতে নেই। স্পর্শী যাওয়ার পরপরই বেরিয়েছে বন্ধুদের সাথে। উদ্দেশ্য বেড়ানো ছিলো না। স্পর্শীর উপর হওয়া রাগের প্রকোপ থেকে বাঁচার জন্যই তার স্থান ত্যাগ। পরিকল্পনা ছিলো রাত এগারোটার পর বাড়িতে ঢুকবে। বড় ভাইয়ের ফোনকল পেয়ে সে নিশ্চিত ছিলো। পরশ যে স্পর্শীয়ার সম্পর্কেই কিছু বলবে তা সে জানতো। কিন্তু সরাসরি ফোন নাম্বার চেয়ে বসবে এ কস্মিনকালেও ভাবেনি।
আচমকা ফোন নাম্বার চাওয়ায় দুশ্চিন্তা, সন্দেহ প্রবলভাবে হামলা করলো পাভেলকে। চিন্তায় চোয়াল ঝুলে পড়ার উপক্রম। তবুও যথাসম্ভব সামলালো নিজেকে। ধীর স্থির হয়ে বলে উঠলো,
— চড়ুই এর নাম্বার নিয়ে তুমি কি করবে?
— তোকে আগে কৈফিয়ত দিতে হবে?
গম্ভীর এই উত্তরটুকুতে ছিলো রাগের আভাস। পাভেল শঙ্কিত হলো। ভাইয়া রাগ করেছে। এখন আর কথার মধ্যে কোনো টু শব্দটিও করা যাবে না। ব্যর্থ হয়ে হতাশার শ্বাস ফেললো সে। মলিন কন্ঠে শুধালো,
— আচ্ছা!

পাভেলের থেকে ছোট্ট এই উত্তরটুকু পেয়েই কল কেটে দিলো পরশ। তাকালো স্ক্রিনের দিকে। ঠিক পঞ্চাশ সেকেন্ডের মাথায় ক্ষুদ্র একটা মেসেজ আসলো। সেখানে গুটিগুটি অক্ষরে লেখা রয়েছে স্পর্শীয়ার নাম্বার।
পরশ শিকদার সেকেন্ড সময়ও ব্যয় করলো না। দ্রুত নাম্বার উঠিয়ে নিলো। পূর্বের রেশ ধরে কলও দিলো সেই নাম্বারে। কিন্তু তারপর আর সফল হলো না। অজানা, অচেনা, অদ্ভুত আতংকে ভেতরটা কেমন দামামা বাজিয়ে উঠলো। জড়তায় রিং পড়ার পূর্বেই কেটে দিলো ফোন। এভাবে হয় না। এই ভয়ংকরী মানবীর সাথে হুট করে কথা বলে পেরে ওঠা সম্ভব নয়। ভাবতে হবে, চিন্তা করতে হবে। যাচাই-বাছাই করে ঠিক দু-বাক্যে ফোন কাটতে হবে। যেনো এই দুটো বাক্যের রেশ’ই সে ভুলতে না পারে।
ফোন কেটে সিটের পাশে ফেলে রাখলো। চোখ দুটো বন্ধ করে মাথা হেলিয়ে দিলো। কিন্তু সস্তি আর পেলো না। হুট করেই মনের মধ্যে কেমন খচ্ খচ্ করছে। মস্তিষ্ক বারবার এলার্ম দিচ্ছে তাকে। আসলেই কি কলটা সে ঠিকভাবে কাটতে পেরেছে? ওপাশে রিং পড়েনি তো? পড়লে কি ভাববে স্পর্শীয়া? মেয়ে তো খুব একটা সুবিধার নয়। যদি এক্ষুণি কল ব্যাক করে বলে,

“ নেতামশাই, মিসড কল কেনো দিচ্ছেন? ফোনে টাকা নেই?”
পরশ ঘেমে উঠলো আতংকে। কি অপমান জনক কথা! সে কল করেছে একটা মেয়েকে৷ আবার রিং পড়ার পূর্বেই ভয়ে, ঘেমে-নেয়ে কেটে দিয়েছে ফোন। এমনকি পকেটেও ঢুকায়নি সেই কৃত্রিম যন্ত্রটি। আতংকে প্রায় দেড়হাত দূরে রেখেছে।
এগুলো মানা যায় না। পরশ নিজের উপর ক্ষুদ্ধ হলো। রেগে, তেজ নিয়ে পুণরায় কল লাগালো স্পর্শীর নাম্বারে। নিজের উত্তেজনাকে দমিয়ে, দাঁতে দাঁত চেপে চোখ বন্ধ করে, শক্ত হয়ে জমে রইলো।
—হ্যালো, আরে কে বলছেন? হ্যালো!
পরশের ধ্যান ভাঙলো স্পর্শীর কর্কশ কন্ঠে। এই চিকন, মিষ্টি কন্ঠটা নিমিষেই অন্যসব পুরুষের অশান্ত হৃদয় শান্ত করে দেবে। উপাধি পাবে সুরেলা কোকিল কন্ঠের। কিন্তু পরশের তুলনায় তা হলো না। পৃথিবীর সবথেকে আতংকময়, কর্কশ কন্ঠ এটা। অন্তত তার মনে হয়। সে রাশভারী কন্ঠে বললো,
— স্পর্শীয়া সরদার?
—জি, বলছি। বলুন…
— বিকেলের মধ্যে দেখা করবে পার্টি অফিসে এসে।
স্পর্শীর টনক নড়লো। কন্ঠটা মাত্রই চিনতে পেরেছে। সে অবাক হয়ে ভ্রুঁ উচিয়ে ফেললো। টেনে টেনে উত্তর দিলো,
— ওহহ! আপনি? এতো তাড়াতাড়ি ফোন দিলেন। আমি তো ভাবলাম আরো দুদিন লাগবে পৌঁছাতে।
পরশ উত্তর দিলো না। পরমুহূর্তেই স্পর্শীয়া বললো,
— আমি আপনার রাজনৈতিক কোনো শুভাকাঙ্ক্ষী নই। এমনকি রাজনৈতিক কোনো সম্পর্কও নেই আমাদের মধ্যে। যা আছে তা শুধুই ব্যক্তিগত। তাই পার্টি অফিসে আমি যাচ্ছি না। অন্যকোথাও হলে ভেবে দেখতে পারি।

কলেজে নিয়মিত ক্লাস হচ্ছে। একটার পর একটা পিরিয়ড। শিক্ষার্থীদের জিরোনোর জোঁ নাই। সকাল সাড়ে এগারোটায় ইন্টারমিডিয়েট দ্বিতীয় বর্ষের ব্যাকরণ ক্লাস। যা অত্যন্ত সযত্নের সাথে সোভাম সরদার নিয়ে থাকেন। কিন্তু ইদানীং ক্লাসে মনোযোগ দেওয়া যাচ্ছে না। মেজাজ গরম হয়ে আসে। বেশ কিছু অল্প বয়সী মেয়েরা বই রেখে হা করে তাকিয়ে থাকে স্যারের দিকে। অপলকভাবে। কখনো কখনো বান্ধবীদের সাথে একে অপরে চাপা হাসাহাসি করে। পড়ানোর মধ্যে স্পিচ দিতে গিয়ে কখনো কোনো মেয়ে শিক্ষার্থীর দিকে তাকালেই ঘটনা রটে যায়। সেই শিক্ষার্থী ক্লাসের মধ্যেই উৎফুল্ল হয়ে যায়। নানাভাবে অন্যদের বোঝানোর চেষ্টা করে তার গুরুত্ব। সোভাম স্যার তাকে আলাদা ভাবে দেখে বলেই তাকান। এসব কথাবার্তা চলে সোভামের আড়ালে। তবুও বুঝতে অসুবিধা হয় না। আজকাল লাইব্রেরি কক্ষেও স্যার-ম্যামদের কানাঘুঁষা শোনা যায়। সোভাম সরদারের ক্লাসে মেয়েদের উপস্থিতির হার নাকি চোখে পড়ার মতো! মাঝেমধ্যে কিছু শিক্ষকরা টিপ্পনী কাটে। জিজ্ঞেস করে — আপনি কি এমন করেন যে ক্লাসে এতো শিক্ষার্থী?

প্রশ্নগুলো গায়ে লাগার মতো হলেও হেসে উড়িয়ে দেয় সোভাম। এই প্রশ্নের উত্তর কিইবা দিতে পারে। সে নিশ্চুপ থাকে। আজকাল আর মেয়ে শিক্ষার্থীদের দিকে তাকানোই হয় না। ইচ্ছে করেই তাকায় না। এই যে কিছুক্ষণ পূর্বেই ক্লাসে ঢুকলো, এটেন্ডেন্স শিটে নাম তুললো — তবুও এক মুহুর্তের জন্য তাকায়নি কারোর দিকে। প্রথমে শিট, তারপর বই এরপর কিছু কিছু ছেলের দিকে দৃষ্টি। কিন্তু এভাবে কতক্ষণ?
বিষের মতো কতগুলো চাহনি সরাসরি এসে গায়ে বিঁধছে। কিছু চাপা সম্বোধন ও শোনা যাচ্ছে। মাত্র’ই পেছন থেকে কেউ একজন কানাঘুঁষা করে বলে উঠলো,
— স্যারের শার্ট টা দেখ। বুকের কাছ থেকে টানটান হয়ে আছে। যেনো এক্ষুণি বোতাম ছিড়ে যাবে।
মুহুর্তে’ই চাপা হাসি। নিজেকে সংযত করতে পারলো না সোভাম। এক ঝলক শার্টের দিকে তাকালো। বোতামটা সত্যিকার অর্থেই প্রায় ছিঁড়ে যাচ্ছে। তার লজ্জা লাগলো। একহাতে বোতামের অংশটা ধরে টেনে শার্টের সামনেটা সামান্য ঢিলা করতে চাইলো। কিন্তু হলো না। ব্যর্থ হতেই মস্তিষ্ক জ্বলে উঠলো। শক্ত, মোটা কাগজের তৈরি এটেন্ডেন্স শিট টা ধরে স্বজোরে আঘাত করলো লেকচার টেবিলের উপর। মেয়েদের দিকে তাকিয়ে সরাসরি বলে উঠলো,

— তোমরা কি চাও আমি ক্লাস থেকে বের হয়ে যাই?
চমকে উঠলো পেছনের সেই মেয়ে তিনজন। শঙ্কিত চোখে তাকালো আশেপাশে। সামনের সারিতে বসা কয়েকজন ছেলেমেয়ে সমস্বরে বলে উঠলো —
— না স্যার! আপনি প্লিজ ক্লাস কন্টিনিউ করুন।
এতে ক্ষান্ত হলো না সোভাম সরদার। রাগে তার কপালের শিরা ফুলে উঠেছে। ক্ষিপ্ত কন্ঠে বললো,
— এতো স্টুডেন্ট পড়িয়েছি, কিন্তু এই ক্লাসের মতো বেহায়া,বেশরম, অসভ্য স্টুডেন্ট পাইনি। আমি আশ্চর্য হয়ে যাচ্ছি নিজের ধৈর্যের উপর। টিচার্স রুম থেকে শুরু করে কলেজের ক্যান্টিন পর্যন্ত আমায় নিয়ে সমালোচনা হচ্ছে। কেনো, কাদের জন্য? শোনো, তোমাদের শেষবার সাবধান করছি। যদি এরপর থেকে কেউ ক্লাসে কোনোভাবে বিশৃঙ্খলা বা আপত্তিজনক ইঙ্গিতে কথা বলে, তাহলে আমি তার অভিভাবককে তো ডাকবোই। সাথে কলেজ থেকেও বহিষ্কার করবো।

ক্লাসরুমে পিনপতন নিরবতা। কেউ টু শব্দটাও করছে না এখন। শুধু চলছে পূর্বের মতোই একে অপরের দিকে চাওয়া-চাওয়ি। দৃষ্টি বিনিময় করেই চলছে দোষারোপ। একজন অন্যজনকে অদৃশ্যভাবে বলছে — তোর জন্যই স্যার রাগ করলো।
এতোকিছুর মধ্যে তৃপ্তি পেলো প্রেমা। সে প্রশান্তি নিয়ে বইয়ের দিকে তাকিয়ে রইলো। কেনো যেনো সে এ অবধি সোভামের চোখের দিকে তাকাতে পারে না। চোখাচোখি হতেই কলিজা কেঁপে ওঠে, দৃষ্টি নড়বড়ে হয়। ধরা পড়ে যাওয়ার আশংকা জাগে মনে। অথচ অন্য টিচারদের চোখের দিকে তাকিয়ে তো অবলীলায় লেকচার শোনে। তাহলে সোভামের দিকে তাকাতেই এতো লজ্জা, অসস্তি, ভয় কেনো? এই প্রশ্নের উত্তর আজও খুঁজে পায়নি। তাই ক্লাসের পুরো ৪৫ মিনিট সে বই-খাতা, বোর্ড ইত্যাদির দিকে তাকিয়ে মনোযোগ দেয়। তবে সহ্য হয় না ক্লাসের কিছু ফালতু মেয়েদের। যারা কারনে-অকারনে, সময়ে-অসময়ে সোভাম স্যার কে নিয়ে চর্চা করে। বাজে, আপত্তিজনক মন্তব্য করে। এগুলো কেনো যেনো সহ্য হয় না প্রেমার। আবার কিছু বলতেও পারেনা। কিন্তু আজ হঠাৎই এ নিয়ে রেগে যাওয়ায় প্রেমা তৃপ্ত। ফুরফুরে মন নিয়ে বসে রইলো বাকিটা সময়।

ক্লাস শেষ হওয়ার পর পরই লেকচার টেবিলের উপর হামলে পড়লো প্রেমা। সোভাম স্যার ভুলে ফোন রেখে গেছেন। এখন এটাকে তার কাছ অবধি পৌছে দিতে হবে। কিন্তু প্রিয় স্যারের এতটুকু সান্নিধ্য কেইবা মিস করে। ফলস্বরূপ, ফোনটা কম জনের টার্গেটে ছিলো না। কমপক্ষে আট-নয়জন চেয়েছিলো ফোন নিয়ে নিজে গিয়ে স্যারের নিকট দিয়ে আসবে। কিন্তু তারা ব্যর্থ হলো। সামনের বেঞ্চের একেবারে কর্নারে বসে ছিলো প্রেমা। আজ সেই সুযোগ একটুও হাতছাড়া করলো না। একপ্রকার বাতাসের গতিতে হামলে পড়লো ফোনের উপর। এরপর অন্যদের দিকে তাকিয়ে দাঁত বের করে হেঁসে বললো,
— আমি দিয়ে আসছি স্যারকে। তোদের এতো কষ্ট করতে হবে না।
এই বলে আর সেকেন্ড ও দাঁড়ালো না। যদি ক্লাস ক্যাপ্টেন এসে মাতব্বরি করে বলে বসে — প্রেমা, আমি ক্যাপ্টেন। স্যারকে ফোন আমি দিয়ে আসছি।”
তখন? তখন এতো বড় সুযোগটা তো হাতছাড়া হয়ে যাবে।
সোভাম টিচার্স রুমে এখনো প্রবেশ করেনি। এরইমধ্যে গতি নিয়ে ছুটে এলো প্রেমা। হাঁপাতে হাঁপাতে ফোন বের করে বললো,

— স্যার, আপনার ফোন। ভুলে রেখে এসেছিলেন টেবিলের উপর।
হতবাক হয়ে ফোনের দিকে তাকালো সোভাম। এতো বড় ভুল! নিজের আহাম্মক কাজে বিরক্ত হয়ে ফোন নিয়ে নিলো। কোনো প্রকার শব্দ উচ্চারণ না করেই পা আগালো সামনের দিকে। প্রেমা এ পর্যায়ে হতভম্ব। স্যার অন্যদের সাথে যতটুকুও কথা বলে, কিন্তু তার সাথে মোটেও না। যে-চে আসলেও কেমন এড়িয়ে যান। এটা কি শুধু মাত্র সে পরশ শিকদারের বোন বলে? সামান্য রাজনৈতিক জের ধরে এভাবেই কি তার প্রতি বিমুখ হয়ে থাকবে সোভাম স্যার?
এসব ভেবে কান্না পেয়ে গেলো প্রেমার। কিন্তু কাঁদলো না। পুণরায় অন্যদের মতো কিঞ্চিৎ বাড়াবাড়ি করে ডেকে উঠলো,

— স্যার,
সোভাম তাকালো। তার দৃষ্টি নির্লিপ্ত, কৌতূহলী।
প্রেমা সময় বাড়ালো না। বললো,
—আমার সমাসে একটু প্রবলেম আছে। বুঝিয়ে দেবেন?
সেকেন্ড ইয়ারের মেয়েগুলোকে আজকাল সহ্য হয় না সোভামের। দু চোখের বিষে রুপান্তরিত হয়েছে তারা। স্বাভাবিক প্রশ্নের মধ্যেও অস্বাভাবিক ইঙ্গিত খুঁজে পায়। তাই পুরোপুরি অস্বীকার করে গমগমে স্বরে বললো,
— এখন ব্যস্ত আছি।
— তাহলে ফ্রি হয়ে বোঝান।
সোভাম ভ্রু কুচকে তাকালো। মুহুর্তে’ই কিঞ্চিৎ হেঁসে প্রেমা বললো,
— আমি আপনার অনলাইন ক্লাসগুলো করতাম। ওখানে ফোন নাম্বারও দিয়েছিলেন একদিন। আমার কাছে আছে। স্যার, ফ্রি হয়ে একটু বিকেলে বা সন্ধ্যায় বুঝিয়ে দিলে ভালো হতো। সামনে তো এক্সাম।
—অনলাইনে রেকর্ড ক্লাস আছে সমাসের উপর। করে নিও।
উফফফফ! অসহ্য। প্রেমা বিরক্ত হলো। একজন টিচার্স মানুষ এতো তর্ক কেনো করবে বুঝে এলো না। সে পূণরায় আমতা-আমতা করে বলে উঠলো,

— যদি কোথাও না বুঝি বা প্রশ্ন থাকে, তবে কি সেটা কল জিজ্ঞেস করবো? নাকি মেসেজ দিবো স্যার।
সোভাম এক মুহুর্ত ও দাঁড়ালো না। ফার্স্ট ইয়ারের ক্লাসরুমের সামনে আজাদ স্যার দাঁড়িয়ে। তিনি সোভামের দিকে তাকিয়ে হাঁসছেন। ইঙ্গিত করছেন প্রেমার দিকে। বুঝতে সময় লাগলো না সোভামের। সে প্রেমাকে অবজ্ঞা করে ঢুকে গেলো টিচার্স রুমে। অপমানে থমথমে মুখশ্রী নিয়ে শেষ মেষ ক্লাসের দিকে রওনা হলো প্রেমা।
খানিক বাদে আজাদ স্যার এলেন টিচার্স রুমে। ডেস্কে বসতে বসতে সোভামের দিকে তাকিয়ে হাসলেন। আচমকা সকল ধরা-বাঁধা হারিয়ে বলেই বসলেন,
— কি ব্যাপার স্যার? শেষমেশ পরশ শিকদারের বোন! আপনার তো দেখছি কন্যা রাশি। তবে মেয়েটা কিন্তু অনেক ভদ্র।

প্রেমা আছে?
আজ পাভেলের মন ভালো নেই। মেজাজ চড়া। দুশ্চিন্তায় বুড়োদের মতো ঘুচিয়ে আছে কপাল। পরশ কেনো স্পর্শীর নাম্বার নিলো, তা দিয়ে কি করলো, কি বললো — এসব নিয়ে ভাবনার শেষ নেই। তবুও সে কিছু জানতে পারছে না। প্রশ্ন করতে পারছে না। টনটনে মেজাজ নিয়ে বসে ছিলো সারাটা সকাল। ভর দুপুরে হঠাৎ অচেনা নাম্বার থেকে কল আসলো। সে রিসিভড করলো। কিন্তু তার ফোনে কল দিয়ে তাকে না চেয়ে চাইছে প্রেমাকে। তার’ই জল্লাদ বোনকে। কি দূর্ভাগ্য তার। সমস্ত সৌভাগ্য নিয়ে জন্মেছে তো পরশ এবং প্রেমা শিকদার। এ-ই যে সুন্দরী সব মেয়েরা তাকে ডিঙিয়ে তার বড় ভাইকে চায়। মিষ্টি, সুরেলা কন্ঠের মেয়ে হয়ে পাভেল শিকদারের ফোনে কল দিয়ে প্রেমাকে চায়। কি মুছিবত! সে রেগে গেলো। ক্ষিপ্ত কন্ঠে বললো,
—প্রেমা আছে কি-না নেই, তা জানতে আমায় কেনো ফোন করেছেন?
আর্শিয়া খানিকটা ভড়কে গেলো। ভেবেছিলো প্রেমার অজুহাতে দু-এক মিনিট কথা বলা যাবে অদ্ভুত, অনুভূতিহীন যুবকের সাথে। কিন্তু তা আর হলো কই? সে তো মেজাজ দেখাতে ব্যস্ত। কিন্তু আদৌ কি আর্শিয়াকে চিনেছে পাভেল? চিনলে নিশ্চয়ই এভাবে বলবে না। বললো,

— আমি আর্শিয়া।
পাভেল হতভম্ব হয়ে নাম্বারের দিকে তাকালো। সন্দেহ আবারো বাড়ছে এবং তা গাঢ় হচ্ছে। কৌতূহল নিয়ে জানতে চাইলো,
—তুমি! কিন্তু আমার ফোন নাম্বার পেলে কোথায়? প্রেমার তো ফোন আছে। যাকে দরকার তার নাম্বার রেখে আমার টা নিলে কেনো?
এতো সরাসরি প্রশ্ন করতে হয়? আর্শির রাগ উঠলো। হ্যাঁ, তার আচরণে সন্দেহ জাগতেই পারে। কিন্তু তাই বলে সেটা সরাসরি জিজ্ঞেস করার কি আছে? সে কি বুঝে নিতে পারতো না। ক্ষোভ নিয়ে দাঁতে দাঁত পিষে বললো,

রাজনীতির রংমহল ৩ পর্ব ২৩

— দরকার টা যেহেতু আমার। তাই কার নাম্বার নেবো সেই সিদ্ধান্তটাও আমাকে নিতে দিন। এতো বেশি কথা বলেন কেনো? আর এক্সকিউজ মি! আপনি তো পাবলিক প্রোপার্টি, নাম্বারটাও তেমন। তাই এই ফালতু ফোন নাম্বারটা আমি রাস্তায় ফেলনাই পেয়েছি। আপনি বিলগেটস নন যে, নাম্বার পাওয়ার জন্য সাতদিন অনশনে বসতে হবে আমায়।

রাজনীতির রংমহল ৩ পর্ব ২৫