রাজনীতির রংমহল ৩ পর্ব ২৫
সিমরান মিমি
শীতের শুরুর দিকের বিকেলটা হয় অত্যন্ত চমৎকার। নরম আবহাওয়া, মিষ্টি রোদ আর সাথে দুষ্টু বাতাস। সব মিলিয়ে মন্দ নয়। খুব বেশি শীত নয়, তবে নদীর ধারের ঠান্ডা বাতাস শরীর কাঁপিয়ে দিচ্ছে। স্পর্শীয়া গায়ের চাদরটা আরেকটু জড়িয়ে নিলো। এটা বাবার। গতকালই দখল করে নিয়েছে সে। যদিও শামসুল সরদার নতুন চাদর কিনে দিতে চেয়েছেন, কিন্তু স্পর্শীয়া রাজি নয়। তার এটাই লাগবে। প্রয়োজনে বাবা যেনো নতুন আরেকটা কিনে নেয়। চাদরটা বহু পুরোনো। দেখেই বোঝা যায়, এটা কোনো বয়স্ক পুরুষের চাদর। তবুও সেটাকে নিয়ে নিলো স্পর্শীয়া। বাবার কোনো স্মৃতিই তো নেই। ভাগ্য যদি কখনো আবার আলাদা করে দেয়, তখন? অন্তত বাবার গায়ের গন্ধটা তো থাকুক।
— এটা কোনো জায়গা হলো কথা বলার জন্য?
গম্ভীর, ভারী, পুরুষালি কন্ঠের আওয়াজ শুনে তড়িৎ পেছনে ফিরলো স্পর্শীয়া। সাথে সাথেই বাতাসের তীব্র বেগে চুলগুলো সব কপাল, চোখে ছড়িয়ে গেলো। বাঁ হাতের আঙুল দিয়ে কানের নিচে চুল গুঁজে পরশ শিকদারকে দেখলো। লোকটার চোখে -মুখে বিরক্তির থেকেও অসস্তি বেশি। ক্রমশ আশেপাশে তাকিয়ে লোকজনের উপস্থিতি আন্দাজ করে নিচ্ছে। স্পর্শীয়া তাকিয়ে রইলো। হঠাৎ’ই ধীর কন্ঠে বললো,
—কংগ্রাচুলেশনস মিস্টার শিকদার!
পরশ ভড়কে গেলো। বুঝতে পারলো না কোনো কারন। কপালে ভাঁজ ফেলে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো। তা দেখে ঠোঁট চেপে হেসে ফেললো স্পর্শীয়া। নদীর ধারে ঘাঁসের উপর বসতে বসতে বললো,
— স্পর্শীয়া সরদার এই প্রথম কারো জন্য তেরো মিনিট অপেক্ষা করলো। নিজেকে সারা পৃথিবীর মধ্যে একমাত্র ভাগ্যবান পুরুষ হিসেবে মনে করতে পারেন। চাইলে বিস্তর অহংকারও করতে পারেন। তবে হ্যাঁ, সেটা অন্যদের সামনে।
নদীর ধারে প্রচন্ড বাতাস। হাওয়ার তোড়ে পরশের পাঞ্জাবি এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। বিরক্ত হয়ে এক হাতে ধরে স্পর্শীর উদ্দেশ্যে বললো,
— এটা কোনো জায়গা হলো কথা বলার জন্য? বিরক্তিকর!
ভ্রুঁ কুঁচকে তাকায় স্পর্শী। ত্যাড়ামি করে বলে,
—সেকি! আমাদের প্রথম ডেটের স্পট আপনার পছন্দ হয় নি? এটা তো ভীষণ খারাপ হলো।
— ফালতু কথা বলবে না। এসেছি দু মিনিট কথা বলতে। যা বলবো চুপচাপ মাথায় ঢুকিয়ে নেবে।
—আচ্ছা, তা না হয় করা যাবে। আগে বসুন তো।
স্পর্শীয়া নিজের পাশে ইশারা করে পরশকে একথা বললো। এক পলক সেদিকে তাকিয়ে মুহুর্তে’ই চোখ সরিয়ে নিলো। দাঁড়িয়ে রইলো ঠায় হয়ে। তা দেখে স্পর্শীয়া শান্ত হলো। ধীর কন্ঠে বললো,
—মাঝেমধ্যে মাটি ছুয়েও দেখতে হয়। এতে হৃদয়টা শুদ্ধ হয়। কংক্রিটের ওই ঘর-বাড়ি কতক্ষণ’ই বা শান্তি দেবে? কখনো কখনো একাকীত্ব অনুভব হলে, মন অস্থির হলে নদীর পাড়ে আসবেন। এরকম মিষ্টি হাওয়ায় নরম রোদ গায়ে মেখে, দুহাত ছড়িয়ে ঘাসের উপর শুয়ে থাকবেন। ভাববেন না লোকে কি বলবে? মনের তৃপ্তিই সবথেকে বড়। কারন নেতা হলেও দিনশেষে আপনি একজন মানুষ।
পরশের দৃষ্টি সুদুরে, নদীর ঢেউয়ের দিকে। কি অপরুপ দৃশ্য। শেষ বিকেলে সূর্যের রশ্মিগুলো নদীর উপর পড়ে চিকচিক করছে প্রবলভাবে। যেনো আগুন লেগেছে নদীর বুকে। সে মনোযোগ দিয়ে স্পর্শীর কথা শুনলো। তবে উত্তর দিলো না। একসময়ে সকল কথাকে এড়িয়ে গম্ভীর হয়ে বলে উঠলো,
— স্পর্শীয়া, তোমার বাবার সাথে আমার রাজনৈতিক, পারিবারিক দ্বন্দ আজ দু যুগ পেরিয়েছে। তোমার সাথেও যে আমার সম্পর্ক খুব একটা ভালো, তাও নয়। তবুও সাবধান করছি। ইদানীং তোমার আচরণ গুলো নেওয়া যাচ্ছে না। যে উদ্দেশ্য নিয়েই তুমি এগোয় না কেনো সফল হবে না। তাই এসব ছেলেমানুষী বন্ধ করো। নিজের মতো থাকো, আমার ধারেকাছে ঘেঁষার চেষ্টাও করো না। এটা তোমার জন্য খুব একটা ভালো ফল বয়ে আনবে না।
স্পর্শী শুনেও না শোনার ভান ধরলো। বললো,
— কি মুছিবত! আরে এখানে কোনো রাজনৈতিক সভা চলছে না। তাই এসব ভাষণ দেওয়া বন্ধ করুন। এই নেতাগিরি বাদ দিয়ে নরম হয়ে কথা বলুন। এতো সুন্দর একটা পরিবেশে এসেও আপনার মধ্যে কোনো পরিবর্তন আসেনি।
পরশের রাগ হলো। হঠাৎ -ই ক্ষিপ্ত হয়ে ধমক দিয়ে উঠলো। বললো,
— শাট আপ! বললাম না আমার সামনে বাজে কথা বলবে না।
— আচ্ছা, বেশ। যা বলার তো আমিই বলছি। কিন্তু এতে আপনার এতো ভয় কিসের? আবার প্রেমে – ট্রেমে পড়ে যান নি তো আমার?
আর এক মুহুর্তও সেখানে দাঁড়ালো না পরশ। বড় বড় পা ফেলে উঠে গেলো বড় রাস্তায়। গাড়িতে উঠে মিনিটের মধ্যেই অগ্রসর হলো সামনের দিকে। পরশ যেতেই স্পর্শীয়া তাচ্ছিল্য নিয়ে হাঁসলো। বললো,
— হাহ! পাগলের সুখ মনে মনে। পৃথিবীতে তো আর কোনো ছেলে নেই যে তোর প্রেমে পড়বো!
পরক্ষণেই নিশ্চুপ হয়ে গেলো। মিনিটখানেক অতিবাহিত হওয়ার পর দাঁতে দাঁত চেপে বললো,
— তোকে রাস্তার পাগল বানিয়ে তবেই ছাড়বো। আমার বাবাকে বছরের পর জেল খাটিয়েছিস, আজও কোর্টে ছোটাছুটি করছে এই শরীর নিয়ে। তোকে আর তোর বাপকে যদি নারী নির্যাতনের মামলায় জেলের ভাত না খাইয়েছি, তবে আমার নামও স্পর্শীয়া সরদার না। তোর যৌবন যাবে জেলের ডাল খেতে খেতে। আর তোর বাপের চল্লিশা আমি বরিশাল কেন্দ্রীয় কারাগারে গিয়ে খাবো, নিজ দায়িত্বে। জানোয়ার!
প্রায় পাঁচ মিনিট পর ফোন হাতে নিলো। পুণরায় জ্বালানোর উদ্দেশ্যে মেসেজ দিলো গুটিগুটি অক্ষরে। বললো,
— আবারো কংগ্রাচুলেশনস মিস্টার শিকদার। একটা মিষ্টি মেয়ে আপনার প্রেমে পড়েছে। কি সৌভাগ্য আপনার! এক্ষুনি শুকরিয়া জানান।
মেসেজটা সেন্ড করার পর সে নিজেই হেসে গড়াগড়ি খেলো। লোকটা ভীষণ গম্ভীর আর কঠোর হলেও সে ভয় পাচ্ছে স্পর্শীকে। নিশ্চিত প্রেমে পড়ে যাবে ভেবেই হয়তো এই ভয়।
স্পর্শীয়া আরো অনেকক্ষণ বসে রইলো নদীর পারে। ধরণীতে যখন সন্ধ্যা নামলো, মশারা তখন প্রবল ভাবে হামলা করলো তাকে। আর বসে থাকা গেলো না। সে উঠে গেলো। ফোন করলো ড্রাইভারকে। এখানে আসার পরেই গাড়ি নিয়ে ড্রাইভারকে সদরে পাঠিয়েছিলো সে। কোনোমতেই বাবার কানে এসব কথা পৌছাক, তা সে চায় না।
গাড়ি এসে থামলো সদরে। সোভামের বিল্ডিং এর সামনে। স্পর্শীয়া টিফিন বক্স হাতে নিয়ে গাড়ি থেকে নামলো। দু -চোখ বন্ধ করে আকাশের দিকে ফিরে জোরে একটা শ্বাস নিলো। ড্রাইভারকে যেতে বলে ধীর পায়ে এগিয়ে গেলো ভেতরে। সোভামের ফ্লাটের সামনে দাঁড়াতেই বুকটা ধক্ করে উঠলো। উত্তেজনায় কলিজাটা বের হওয়ার উপক্রম। ফ্লাটের দরজা ভেতর থেকে লক করা। এর মানে সোভাম ভেতরেই আছে।
স্পর্শীয়া ধীর আওয়াজে টোকা মারলো। একবার, দুবার….. এভাবে করতে করতে প্রায় পাঁচবার টোকা মারার পর ভেতর থেকে হেঁটে আসার শব্দ এলো। স্পর্শী শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। বিগত দু দিনে সে একবার ফোনও দেয় নি। ভেবেছিলো, ঘটনার পরপরই সোভাম পিপাসাকে নিয়ে সরদার বাড়িতে যাবে। কিন্তু এমন কিছুই ঘটেনি। মা-ভাই, এদের দুজনের পক্ষ থেকে এমন নিরবতা মানা যাচ্ছে না। তারা কি ভুলে গেলো স্পর্শীকে?
দরজা খুলে সম্মুখে স্পর্শীকে দেখে অবাক হলো সোভাম। কয়েক সেকেন্ড তাকানোর পর চোয়াল শক্ত করে ফেললো। পুণরায় দরজা বন্ধ করে দিতে উদ্যত হতেই তাকে থেলে এক কোনা থেকে ভেতরে ঢুকে পড়লো স্পর্শী। টিফিন বক্সটা টেবিলের উপর রেখে সারাঘরে চোখ বুলাতেই আতকে উঠলো। সকালের বিছানা এখনো ওভাবেই এলোমেলো পড়ে আছে। খাটের উপর বেশ কিছু শার্ট, প্যান্টও আছে। এপাশে রান্নাঘরের দিকটায় এঁটো বাসন-কোসন। দেখেই বোঝা যাচ্ছে এগুলো গতকালের। রুমের এক কোনায় সবজি পঁচে আছে। অন্য কোনায় বাইরে থেকে আনা খাবারের প্যাকেট। স্পর্শীয়া কপালে হাত দিয়ে বিছানায় বসে পড়লো। বললো,
—ইয়া আল্লাহ! রুমটাকে তো একদম গোয়াল ঘর বানিয়ে রেখেছিস?
এই বলে সে বিছানার কম্বল গোছাতে লাগলো। মুহূর্তে’ই খপ করে ধরে টেনে ছুড়ে ফেলে দিলো সোভাম। ক্ষিপ্ত কন্ঠে বললো,
— কেনো এসেছিস?
—আজব! কেনো এসেছি মানে? আমি আসবো না তোর কাছে?
— না আসবি না। যা এখান থেকে।
সোভামের ডান হাতের তালুতে ব্যান্ডেজ করা। সেদিকে নজর যেতেই হতবাক হয়ে গেলো স্পর্শী। খপ করে ধরে ফেললো হাত।
— হাত কাটলো কবে? এজন্যই ঘরের বাসন-কোসনও আধোয়া। কতটা কেটেছে! সেলাই লেগেছে নাকি? আমায় জানাস নি কেনো?
সোভামের এসব আহ্লাদীপনা বিরক্ত লাগছে। সে নিমিষেই হাত টেনে ছাড়িয়ে নিলো। অন্যদিকে তাকিয়ে তাচ্ছিল্যের স্বরে বললো,
— এসব ন্যাকামি বন্ধ করে, রুম থেকে বের হ। তোকে এক সেকেন্ড ও সহ্য হচ্ছে না।
স্পর্শীয়া ছলছল চোখে তাকালো। পরক্ষণেই সব কিছু মাথা থেকে ঝেড়ে ওড়না কোমড়ে বাধলো। এরপর এগিয়ে গেলো আধোয়া বাসনের দিকে। জোর করে ধুতে লাগলো সেগুলো। এরপর খাবারের প্যাকেট, পঁচে যাওয়া সবজি গুলো ময়লার ঝুড়িতে ফেলে রুম ঝাড়ু দিলো। এসব মোটেই সহ্য হচ্ছে না সোভামের। রাগে কপালের শিরা গুলো দপদপ করে জ্বলছে। দুহাতে কপাল চেপে মাথা ঝুঁকিয়ে বসে রইলো। খানিকক্ষণ পর চেঁচিয়ে উঠলো উচ্চস্বরে। বললো,
— স্পর্শীয়া, দু মিনিটের মধ্যে রুম ছাড়বি।
ফ্যালফ্যাল করে ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে রইলো স্পর্শী। সে আর তাকে চড়ুই বলে ডাকছে না। এভাবে অপমান করছে। বিষয়টা ভেতর থেমে দুমড়ে মুচড়ে দিচ্ছে তাকে। তবুও কিচ্ছু বললো না। বরং হাসার চেষ্টা করলো। টিফিন বক্সটা হাতে নিয়ে বিছানার কাছে গেলো। দুশ্চিন্তা করে বললো,
— হাত কেটে গেছে, রান্না করতে পারিস নি — জানালে কি হতো? বাইরে থেকে কি খেয়েছিস, কে জানে! দেখ, আজকে আমি ও বাড়িতে প্রথম রান্না করেছি। খাসির মাংস আর ইলিশ মাছ। আমার’ই ভুল। আরো আগে আসা উচিত ছিলো। দুপুরে কি খেয়েছিলি?
এসব আদিখ্যেতা মোটেই সহ্য হচ্ছে না। মাথায় রক্ত উঠে যাচ্ছে। সোভাম রেগে উঠে দাঁড়ালো। তার সম্মুখেই বক্সের মুখ খুলে ধরে দাঁড়িয়ে আছে স্পর্শীয়া। মাংসের কালার সুন্দর হয়েছে কি-না তা দেখতে বলছে। নিজেকে আর সামলানো গেলো না। বক্সটা ধরে স্বজোরে ছুড়ে মারলো ফ্লোরে। মাছ ও মাংসের পিসগুলো সারা রুমে ছড়িয়ে পড়লো। মাত্রই পরিস্কার করা ফ্লোরটা পুণরায় নোংরা হলো ঝোলের আস্তরণে। স্পর্শী ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলো সেদিকে।
এতটুকুতেই ক্ষান্ত হলো না সোভাম। বোনের হাত ধরে টেনে বার করলো বাইরে। মুখের উপর আটকে দিলো দরজা। বললো,
— আমি তোকে চিনি না। দ্বিতীয়বার এ বাসায় ঢোকার সাহস করবি না। তোর জন্য যেনো বাসা চেঞ্জ করতে না হয়।
কেমন ট্রমার মধ্যে চলে গেলো স্পর্শী। প্রতিটা সিঁড়ি পার হতে মাথার তালু পর্যন্ত ঝাকুনি লাগছে। কিছুই বিশ্বাস হচ্ছে না। মনে হচ্ছে স্বপ্ন দেখছে। ধীরে ধীরে এক পা একপা করে নিচে নামলো। ড্রাইভার নেই। তাকে তো সেই রাত আটটায় আসতে বলেছে। অথচ ভাইয়ের কাছে দশ মিনিট ও বসতে পারলো না সে। পুরোটা ভাবতে ভাবতে একসময় চোখ দুটো ঝাপসা হয়ে এলো। হাত-পা কাঁপছে উত্তেজনায়। সোভাম রেগে যাবে, অপমান করবে, বাসা থেকে বের হয়ে যেতে বলবে এতোটুকু পর্যন্ত আন্দাজ করেই এসেছিলো সে। কিন্তু খাবার গুলো এভাবে ছুঁড়ে মারবে, তাকে টেনে-হিঁচড়ে বের করে দেবে — এটা কল্পনায়ও ভাবেনি। একসময় দায়সারা হয়ে বসে পড়লো চায়ের দোকানের বেঞ্চিতে। ভেতর থেকে কান্নারা দলা পাকিয়ে বের হতে চাইছে। চোখ যেনো বাঁধা মানছে না। স্পর্শী আশেপাশে তাকিয়ে দুহাতে চোখ মুছে বসলো। কাঁপা হাতে কল লাগালো মায়ের নম্বরে। কিন্তু প্রতিবার’ই কল কেটে দিচ্ছে পিপাসা। একবার, দু-বার করে পাঁচবার দেওয়ার পর পিপাসা কল রিসিভড করলো। ঝাঝালো স্বরে বললো,
— কি সমস্যা তোর? কল কেটে দিলে বুঝিস না ব্যস্ত আছি।
স্পর্শী হু হু করে কেঁদে উঠলো। ঠোঁট ভেঙে বললো,
— আম্মু!
— কোনো সমস্যা? হলে তোর বাবাকে বল। সে তো আছেই। বহুত ক্ষমতা তার। বড় বাড়ি, গাড়ি, ক্ষমতা, টাকা পয়সার অভাব নেই। তোকে আর ভাড়া বাড়িতে, কষ্টে টিউশনি করে কাটাতে হবে না। আমি বিজি আছি ফোন কাট।
— আম্মু, তুমি পিরোজপুরে আসবে না?
—কেনো যাবো? ওখানে আমার কিচ্ছু নেই। ছেলেটা আছে, সেও সামনে মাসে চলে আসবে।
স্পর্শীয়া হতভম্ব হয়ে চেয়ে রইলো স্ক্রিনের দিকে। বললো,
— আমি কেউ না?
এ প্রশ্নের জবাব দিলো না পিপাসা। বরং গম্ভীর হয়ে বললো,
— স্পর্শীয়া, আমাকে দ্বিতীয়বার কল করে বিরক্ত করবি না।না হলে সিম চেঞ্জ করে ফেলবো। পার্লার নিয়ে এমনিতেই ব্যস্ত থাকতে হয়। এসব ঝামেলা ভালো লাগছে না।
কেটে দিলো ফোন। স্পর্শীয়া পুণরায় ধাক্কা খেলো। চেয়ে রইলো স্ক্রিনের দিকে। ভেবেছিলো, মা-ভাই তার চলে যাওয়ার কথা শুনতেই ছুটে আসবে তারা। বাবার সম্মুখে বসিয়ে সকলের নালিশ শুনবে। ভুল বোঝাবুঝি টুকু দূর করে শেষ বয়সটুকু যেনো একসাথে কাটাতে পারে সেই ব্যবস্থা করবে। কিন্তু তা হলো না। বরং তারা এভাবে মুখ ফিরিয়ে নিলো। এতো অভিমান! তাহলে স্পর্শীয়ার সিদ্ধান্ত কি ভুল ছিলো? নাকি তার ভাগ্য এবার শেষ আশ্রয় টুকুও কেড়ে নেবে?
কান্না আটকানো যাচ্ছে না। চোখ দিয়ে অনর্গল পানি পড়ছে। আশেপাশে প্রচুর মানুষ। সবাই চেনে শামসুল সরদারের মেয়েকে। এভাবে রাস্তার বেঞ্চে বসে কাঁদছে, বিষয়টা বড্ড আপত্তিজনক। সে দুহাতে চোখ মুছে উঠে দাঁড়ালো। মুহুর্তেই মাথাটা ঘুরে উঠলো এলোমেলো পায়ে রাস্তায় পড়তে পড়তেও নিজেকে সামলে দাঁড়ালো। চোখ দুটো লাল, রক্তবর্ন হয়ে গেছে। একটা রিকশা নেওয়া প্রয়োজন। শরীরটা কাঁপছে। এক্ষুণি বাড়িতে না গেলে দেখা যাবে, অজ্ঞান হয়ে রাস্তায় পড়ে আছে।
রাস্তার ওপাশে রিকশা। হাত নাড়িয়ে ডেকেও লাভ হয় নি। ড্রাইভার অমনোযোগী ছিলো। এ পর্যায়ে রাস্তা পার হওয়ার জন্য এগিয়ে গেলো স্পর্শী। কাঁপা শরীর নিয়ে, এলোমেলো ভাবে পা ফেলতেই গা গুলিয়ে এলো। নিমিষেই হেলে পড়লো রাস্তায়। এরইমধ্যে এগিয়ে এলো একটি প্রাইভেট কার। স্বশব্দে হর্ন বাজিয়ে থামলো ঠিক চার ইঞ্চি দুরত্বে। ড্রাইভার অদক্ষ হলে হয়তো এতোক্ষণে গাড়িটা তুলে দিতো গায়ের উপর। আশেপাশের লোকজন হইহই করে এগিয়ে এলো। পরিস্থিতি এমন যে বোজা যাচ্ছে, গাড়িটা মেয়েটার গায়ের উপর চাপিয়ে দিয়েছে।
পরশ আর এক সেকেন্ড ও দাঁড়িয়ে থাকতে পারলো না। ছুটে এলো মেইন রাস্তায়। ক্লাবের দোতলাতেই অবস্থান করছিলো এতোক্ষণ। হঠাৎই চোখ যায় চায়ের দোকানে বসে কাঁদতে থাকা স্পর্শীর দিকে। পুরোটা সময় হতভম্ব হয়ে বসে ছিলো। মেয়েটা এভাবে কেনো কাঁদছে তা বুঝতেই পারছিলো না। একবার মনে হয়েছে এসে জিজ্ঞেস করবে। কিন্তু পরক্ষণেই জড়তায় ফেসে দাঁড়িয়ে থাকে। এক্ষুণি স্পর্শীর নিকট গিয়ে কান্নার কারন জিজ্ঞেস করা মানে তাকে প্রশ্রয় দেওয়া। কিন্তু এভাবে আর কতক্ষণ? ফোনে কথা বলার পর মেয়েটাকে আরো ভঙ্গুর মনে হয়েছে। তার এলোমেলো পা, কম্পনরত শরীর দেখে ঠিক লাগেনি। ফলস্বরূপ, কৌতুহল বশত নেমে এসেছে নিচে। কিন্তু স্পর্শীয়ার নিকট পৌছানোর পূর্বেই সে মেইন রোডে চলে যায়। আর মুহুর্তেই এক্সিডেন্ট হওয়ার ন্যায় পরিস্থিতি। আশেপাশের এতোসেতো লোকজন দেখে সাময়িক ভাবে সে হতভম্ব হয়ে যায়। মেয়েটা কি গাড়ির নিচে চাপা পড়লো? ভেবে আঁতকে ওঠে অজানা কারনেই। দ্রুত ছুটে আসলো।
স্পর্শী মাথা তোলার চেষ্টা চালাচ্ছে। কিন্তু চোখ খুলতে পারছে না কিছুতেই। অতিরিক্ত মানসিক চাপে মাথাটা যন্ত্রণা করছে প্রচুর। পরশ লোকজন সরিয়ে স্পর্শীর পাশে গিয়ে ঝুকলো। খেয়াল করলো মেয়েটার চোখের নিচ ফুলে গেছে। হাতে ভর দিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে। পরশ ঝুঁকে বসলো। স্পর্শীর মাথা তুলতে সাহায্য করলো। সাথে সাথে ডান হাত দিয়ে গালে আলতো করে থাবর দিয়ে বললো,
—তুমি ঠিক আছো? স্পর্শীয়া!
পরশ চমকে উঠলো গায়ের তাপে । মেয়েটার গায়ে অত্যধিক জ্বর। স্পর্শী চোখ খুলতে পারলো না। কিন্তু পরশের কন্ঠস্বর চিনলো। ভাঙা গলায় বললো,
—আমি বাড়ি যাবো। একটু দিয়ে আসুন।
— তোমার গায়ে অনেক জ্বর। হস্পিটালে নিয়ে যাই।
আপত্তি জানালো স্পর্শী। কিছুটা বিরক্ত হয়ে কান্না মিশ্রিত কন্ঠে বললো,
—বাড়ি যাবো আমি!
পরশ আর সময় ক্ষেপণ করলো না। হাত ইশারা দিয়ে গাড়ি বের করতে বললো। এদিকে আশেপাশে ইতোমধ্যে চাপা উত্তেজনা সৃষ্টি হয়ে গেছে। সরদার দের ক্লাব থেকে ছেলে-পেলে বেরিয়ে পড়েছে। স্পর্শীয়াকে পরশ শিকদার নিয়ে যাচ্ছে বলে আপত্তির শেষ নেই। আজ পরশ শিকদারের পরিবর্তে অন্যকেউ থাকলে নিশ্চিত মারামারি লাগতো। কিন্তু নেহাত পরশ এখানে, তাই সাহসে কুলাচ্ছে না।
গাড়ি নিয়ে এসেছে ড্রাইভার। পরশ ওঠানোর চেষ্টা করলো স্পর্শীকে। কিন্তু পারলো না। ক্রমশই হাটু ভেঙে পড়ে যাচ্ছে স্পর্শী। এ পর্যায়ে আরো অসস্তিতে পড়ে গেলো সে। কেনো আসতে গেলো আগ বাড়িয়ে? সরদারের মেয়েকে নিশ্চয়ই কেউ ফেলে রাখতো না। এখন কোলে নেওয়া ছাড়া কোনো উপায় নেই। কিন্তু এই সাহায্য টুকু যে অন্যভাবে রটতে সময় লাগবে না সে ব্যাপারে সে নিশ্চিত। দেখা গেলো, কাল শামসুল সরদার বন্দুক নিয়ে এলো পরশকে দোষারোপ করতে। বললো — আমার মেয়েকে কোলে নেওয়ার জন্য এই পরিকল্পনা তুমি করেছো।
রাজনীতির রংমহল ৩ পর্ব ২৪
অন্যদিকে আমজাদ সরদার আসবেন বটি নিয়ে। বলবেন – এই মেয়ের সাথে তোমার সম্পর্ক। তাও কেনো অস্বীকার করলে? এই মেয়ে তোমার ক্যারিয়ার ধ্বংস করবে!
দৃশ্যগুলো চোখের সামনে ভাসছে। তবুও সে নিরুপায়। এই যে স্পর্শীয়া তার হাত খামচে ধরে আছে। শেষমেশ বাধ্য হয়ে কোলে তুলে নিলো। দশ সেকেন্ডের মধ্যে গাড়ির মধ্যে ঢুকে রওনা দিলো সরদার বাড়ির উদ্দেশ্যে।
