Home রাজনীতির রংমহল ৩ রাজনীতির রংমহল ৩ পর্ব ৩০

রাজনীতির রংমহল ৩ পর্ব ৩০

রাজনীতির রংমহল ৩ পর্ব ৩০
সিমরান মিমি

পরশ এবারেও হাসলো। গা জ্বালানো সেই হাসি। বললো,
— আরে রেগে যাচ্ছেন কেনো? কথা দিন, জিতলে মেয়ের জামাই বানাবেন। তাহলে নাহয় আজ থেকেই আঁটঘাট বেঁধে নামবো।
শামসুল সরদার এবার পুরোদস্তুর ক্ষেপে গেলেন। চক্ষু রাঙিয়ে দাঁত কটমট করে এগিয়ে এলেন। তার আদরের মেয়েদের নিয়ে এতো বড় কথা! আর সেটাও সে নিরব হয়ে হজম করবে, এ কখনোই মানা যায় না। রাজনৈতিক ব্যাপারে এই বেইমানের বাচ্চা কোন সাহসে পরিবার টেনে আনলো?
বাহার পরশের মুখের দুর্বোধ্য হাসির কারন ধরে ফেললো। নিমিষেই আটকালো শামসুল সরদারকে। চাপা আওয়াজে বললো,

— চাচা, ও কিন্তু ইচ্ছে করে আপনাকে রাগিয়ে দিচ্ছে। ইলেকশনের আগেই ঝামেলা করার উদ্দেশ্য নিয়া রাস্তায় নামছে।
শামসুল সরদার থেমে গেলেন। বাহার ভুল কিছু বলেনি। এক্ষুনি যদি তিনি কোনো ঝামেলা করে বসতেন, তাহলে সেটা পরবর্তীতে আরো জোরদার হয়ে ফিরে আসতো। শেষে হয় নির্বাচন বাতিল নাহলে তার নমিনেশন বাতিল হয়ে যেতো। আর মাত্র চার দিন। এ কটা দিন কোনো উস্কানিমূলক কথা গায়ে মাখানো যাবে না। তিনি রাগ সংবরণ করে তাচ্ছিল্য নিয়ে হাসলেন। মৃদু স্বরে অপমান করে বললেন,
— আমার মেয়ের পায়ের নখ অবধি পৌঁছানোর যোগ্যতাও তোর নেই, বিয়ে তো বহুদূর।
পরশ কপালে আঙুল ঘঁষে হাসলো। বাইরে রাগ না দেখালেও ভেতরটা অপমানে দগদগে ঘাঁয়ে রুপান্তরিত হয়েছে। এতোগুলো লোকের সামনে বসে পায়ের নখের সাথে তুলনা! ব্যাপারটা হজম করা অসম্ভব। শামসুল সরদার তার
লোক নিয়ে রাস্তার এক পাশ থেকে গ্রামের ভেতরে ঢুকছেন। পরশ আর বাঁধা দিলো না। শুধু হেসে বললো,
— চ্যালেঞ্জটা না ছুঁড়লেও পারতেন।
এরপর সেও তার দলের লোক নিয়ে গ্রামের বাইরে বেরিয়ে গেলো।

বেলা ঠিক বারোটা। মাত্র’ই বাংলা ক্লাস শেষ হয়েছে। সোভাম ক্লাস থেকে বের হতেই আর্শিয়া সিঁড়ির গোড়ায় গেলো। আজ পড়া পারেনি সে। অবশ্য পড়ে না আসাটা তার ক্ষেত্রে স্বাভাবিক। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে – পুরো ক্লাসের যারা যারা পড়া পারেনি, তাদেরকে বকলেও আর্শিয়াকে কিছুই বলে নি সোভাম। ধমক, রাগ, বিরক্তি কিছুই দেখায়নি। শুধু স্বাভাবিক ভাবে বলেছে, “কাল পড়ে আসবে। না বুঝলে স্পর্শীয়ার থেকে শিখে আসবে।”
এরপর! এরপর আর কিছুই না। সে তার মতোই ক্লাস করিয়েছে। কিন্তু বিষয়টা আর্শির নিকট অস্বাভাবিক ঘটনা। যা অত্যন্ত ভালো লেগেছে তার। কিন্তু হুট করে এতো ভালো ব্যবহার কি জন্য? এটা কি শুধুমাত্র সকালে টিফিন বক্স দেওয়ার জন্য? ভেবেই কেমন খুশি খুশি লাগলো আর্শির। এমন হলে সে প্রতিদিন টিফিন আনতে রাজি।
— এই, তোমার চোখ-মুখ চকচক করছে কেনো?
চমকে পিছু ফিরলো আর্শি। প্রেমাকে দেখতেই মুখ গম্ভীর করে ফেললো। বরাবরের ন্যায় না বোঝার ভান ধরে বললো,

– মানে?
প্রেমা তার সামনে এসে দাঁড়ালো। জিজ্ঞেস করলো,
— সকালে দেখলাম সোভাম স্যারকে টিফিনবক্স দিচ্ছো। কেনো?
বিষয়টা অত্যন্ত ব্যক্তিগত। তাই প্রশ্নটা ভালো লাগলো না আর্শির। সে মুখ গম্ভীর করে বললো,
— তাড়াহুড়ো করে সকালে না খেয়ে এসেছে, তাই দিয়েছি। কিন্তু তুমি জানতে চাইছো কেনো? আর আমার পিছনে গোয়েন্দাগিরিই বা কেনো করছিলে? এটা আমাদের ব্যক্তিগত ব্যাপার।
চোখ বড় বড় করে তাকালো প্রেমা। বললো,
— আরেহ! তুমি রেগে যাচ্ছো কেনো?
আর্শি উত্তর দিলো না। বরং বিরক্তিকর চাহনি দিয়ে অন্যদিকে তাকালো। প্রেমা তাকে ভড়কে দিয়ে বলে উঠলো,
— তোমার মুখের চাকচিক্যটা কমে গেছে। তবে আমি যা বলবো তা শুনে তুমি ঝাড়বাতির মতো জলতে শুরু করবে।
প্রেমা ঠোঁট টিপে হাসছে। তা দেখে আর্শি কেমন ঢোক গিললো। বুঝে উঠতে পারলো না কিছুই। প্রেমা পূর্বের রেশ ধরেই ফিসফিস করে বললো,

— শুনলাম, তুমি আর পাভেল ভাইয়া নাকি প্রেম করছো?
আর্শি শ্বাস নিতে ভুলে গেলো। বুকের ভেতরটা ঢিপ ঢিপ শব্দে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। তার হাত-পা, গলা সব কাঁপছে। কোনোমতে ঢেকুর তুলে বললো,
— বাজে কথা! এসব কে বলেছে তোমায়?
_ উহু! এটাই সত্যি কথা। বাড়ির সবাই জানে। ইনফ্যাক্ট, তারা তো তোমাদের বিয়ের ব্যাপারেও আলোচনা করছে। হয়তো নির্বাচনের পরপর’ই তোমাদের বাড়িতে যাবে সম্বন্ধ নিয়ে। উফফ! আমার তো ভীষণ ভালো লাগছে। তুমি, আমি এরপর থেকে একসাথে কলেজে আসবো – যাবো।
আর্শির মাথা ঘুরছে। সারা শরীর অস্বাভাবিক মাত্রায় ঘামছে। যেনো মাত্র’ই সে নাগরদোলা থেকে মাটিতে নেমে এলো। অবিশ্বাস্য কন্ঠে অন্যদিকে তাকিয়ে বললো,

— বিয়ে!! এসব কি বলছো তুমি?
আর্শির পেটের মধ্যে প্রজাপতি উড়ছে। যতটা না খুশি লাগছে, তার চেয়েও ভয়, আতংক, অসস্তি বিরাজ করছে। সে ক্রমশ প্রেমার দিকে পিঠ দেখিয়ে অন্যদিকে তাকাচ্ছে মুখের অভিব্যক্তি লুকানোর জন্য। কিন্তু প্রেমা তা হতে দিচ্ছে না। সে ঘুরে ঘুরে আর্শিকে জ্বালানোর উদ্দেশ্যে তার সামনে এসে উঁকি মারছে। শেষমেশ প্রেমা বিরক্ত হয়ে উঠলো। বললো,
— দেখো, একদম ঢং করবে না। তুমি যে ভাইয়ার নাম্বারে কল দাও, বাড়ি থাকাকালীন তার ঘরে উঁকিঝুঁকি দাও, এসব আমি জানি। তাই কিছু না বোঝার ভান একদম করবে না।
আর্শি লজ্জা পেলো। পাভেলের প্রতি রাগ বাড়লো তরতর করে। খানিকটা জড়তা নিয়ে বললো,
— এগুলো তুমি জানলে কি করে? বলে দিয়েছে! আচ্ছা, তোমাদের বাড়ির সবাইকে বলেছে?
— নাহ! শুধু আমাকে বলেছে যে তুমি নাকি আমার সাথে কথা বলার জন্য ওকে ফোন দিয়েছিলে। কিন্তু তোমার কাছে তো আমার নাম্বার ছিলো আর্শি।
আর্শি এবারে লজ্জায় থতমত খেয়ে গেলো। ক্রমশ পালানোর চেষ্টা করলো ওখান থেকে। কিন্তু সক্ষম হলো না। প্রেমা ধরে ফেললো তার হাত। কিছুটা আদুরে কন্ঠে বললো,
— তুমি কিন্তু আমার ভাবী হিসেবে মন্দ হবে না। শুধু এসব গাম্ভীর্য বাদ দিয়ে একটু হাসি-খুশি থাকতে হবে, জমিয়ে আড্ডা দিতে হবে।
আর্শি বুঝে উঠতে পারলো না। কথার পৃষ্ঠে আনমনে বলে ফেললো,

— আমি হাসি তো!
শব্দ করে হেসে উঠলো প্রেমা। সেই হাসিতে আর্শি বুঝতে পারলো নিজের ভুল। লজ্জায় আড়ষ্ট হয়ে ছুটে গেলো ক্লাসের দিকে। হতবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে প্রেমা। পা বাড়াতে গিয়েও থেমে যায়। হাস্যোজ্জ্বল মুখশ্রীটা ধীরে ধীরে কুঁচকে আসে। একি হলো! নিজের কথাটুকু শুনেই এভাবে চলে গেলো আর্শি। একবারেও প্রেমার মনের কথা শুনতে চাইলো না। বুঝতেও চাইলো না কিশোরী মনটার ছটফটানি। স্বার্থপর! অত্যন্ত স্বার্থপর। তার মনটা আবারো খারাপ হয়ে গেলো। অপলক ভাবে চেয়ে রইলো সিঁড়িগুলোর দিকে। অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পর মন খারাপকে বিসর্জন দিয়ে পুণরায় ক্লাসে ঢুকলো। পুরো ক্লাসরুমে চোখ বুলিয়ে আর্শিকে খুঁজতেই পেয়ে গেলো। বেচারি লজ্জায় একদম পেছনের বেঞ্চে বসে আছে, মাথাটা ব্যাগের উপর ঝুকিয়ে। দেখে মনে হবে সে ক্লান্ত, নাহয় ঘুমিয়েছে। কিন্তু প্রেমা জানে তার বর্তমান পরিস্থিতি। রং – বেরঙের কল্পনা করছে এখন পাভেলকে নিয়ে। না জানি কতশত পরিকল্পনাও করে ফেলেছে। করবেই তো! এ কি কম খুশির খবর! প্রেমার বেলায় এমনটা হলে তো এতোক্ষণে চিৎকার করে পুরো ক্লাসরুম ফাটিয়ে ফেলতো। খুশিতে অজ্ঞান হয়ে পড়ে থাকতো বেঞ্চের এক কোনায়।
প্রেমা ধীর পায়ে এগিয়ে গেলো শেষের বেঞ্চের দিকে। আর্শির পাশে বসে মৃদু স্বরে বললো,

— এসব কল্পনা করা বাদ দাও। তুমি চাইলে তোমার অনুভূতি গুলো লিখে জানাতে পারো। চিঠিটা পাভেল ভাইয়ার কাছে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব আমার।
আর্শি তৎক্ষণাৎ মাথা তুললো। গোল গোল চোখে হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইলো। দু-পাশে মাথা নাড়িয়ে অপ্রস্তুত হয়ে বললো,
—না না, তার কোনো দরকার নেই।
— আরে লজ্জা পাচ্ছো কেনো? আমি তো তোমার কথা বলবো না। তুমি বেনামি চিঠি লিখবে, আমি লুকিয়ে ওর খাটের উপর রেখে আসবো।
এ পর্যায়ে আর্শির মধ্যে খানিকটা সম্মতির আভাস পাওয়া গেলো। তবে সে তা প্রকাশ করলো না। অবশ্য প্রকাশ করার মতো সময়ও দিলো না প্রেমা। এর মধ্যেই তাড়াহুড়ো করে বলে উঠলো,
— তবে একটা শর্ত আছে।
ভ্রুঁ কুঁচকে ফেললো আর্শি। মৃদু কন্ঠে বললো,
— কি শর্ত?
কাশি দিয়ে গলা পরিস্কার করে নিলো প্রেমা। বুকটা ধুকপুক
করছে। অন্যদিকে তাকিয়ে এক দমে বলে উঠলো,
— কাল আমি একটা টিফিন বক্স আনবো। ওটা তুমি সোভাম স্যারকে দেবে, আর বলবে বাড়ি থেকে এনেছো। রাজি?
আর্শি বুঝে উঠতে পারলো না। তীব্র সন্দেহের চোখে তাকালো। জিজ্ঞেস করলো,
—মানে? তুমি কেনো তাকে টিফিন বক্স দিতে যাবে?
প্রেমা সতর্ক হলো। এভাবে ধরা পড়ে গেলে হবে না। তাকে আরো সাবধান হতে হবে। এই ভেবে মুখশ্রী আঁধার করে ফেললো। কিছুটা করুণ কন্ঠে বললো,

— আমি জানতাম না, সোভাম স্যার তোমার ভাই। তার অনলাইন ক্লাসগুলো আরো আগে থেকে করি। ব্যক্তিগত ভাবে স্যার আমার খুবই প্রিয়। ভেবেছিলাম, তাকে একদিন বাড়িতে নিয়ে কবজি ঢুবিয়ে খাওয়াবো। কিন্তু পরিবারের যা অবস্থা, তা তো কোনোকালেই সম্ভব নয়। শোনো না, আমি অল্পকিছু নিজ হাতে রান্না করে আনবো। তুমি প্লিজ না করো না। অনেক দিনের শখ এটা। প্লিজ, প্লিজ আর্শি। সাহায্য টা করো, বিনিময়ে ভাইয়ার সব খবরাখবর তোমায় দেবো। প্রতি ঘন্টায় আপডেট জানাবো।
আর্শি থতমত খেলো। সন্দেহ একচুলও সরলো না। স্পর্শী সোভামের সাথে তার সম্পর্ক একদমই ভালো না। সোভামের সাথে তো এর আগে কথাই হয়নি। স্পর্শীর সাথেও যে আহামরি ভালো সম্পর্ক তাও নয়। সে সারাক্ষণ ঘরের মধ্যে থাকে। খাবার সময় বা ড্রয়িংরুমে দেখা হলে মাঝেমধ্যে স্পর্শী নিজে থেকে ডাকে। কখনো টুকটাক আলাপ করে বা পাশে বসতে বলে। এতে অবশ্য আর্শি আপত্তি করে না। শুধু চুপচাপ শোনে, আবার ফিরে যায় নিজের দিগন্তে।
কিন্তু ঘরের সম্পর্ক যাই হোক, বাইরে তো সেটাকে প্রকাশ করা উচিত নয়। আর্শিও তাই করলো। জড়তা ছাড়িয়ে বলে উঠলো

— তুমি কি সোভাম ভাইয়াকে পছন্দ করো?
প্রেমা মাথা চুলকে অন্যত্র তাকায়। অপ্রস্তুত হেসে বলে,
— এসব কি বলছো? উনি আমার টিচার হয়।
আর্শি তাকে সাবধানী আওয়াজে বলে,
— হ্যাঁ, সেটাই মাথায় রেখো। তাছাড়াও সোভাম ভাইয়া তোমার থেকে বয়সে দশ-এগারো বছরের বড়। কখনো এসব জানতে পারলে দুগালে থাপড়াবে।
হা হয়ে গেলো প্রেমা। তার সারা শরীর রাগে জ্বলে যাচ্ছে। আর্শির কথা বার্তায় স্পষ্ট অসম্মতি লক্ষ করা যাচ্ছে। তার মানে কি সে প্রেমাকে ভাবী হিসেবে অপছন্দ করছে? কই, প্রেমা তো তা করেনি। বললো,
— এক্সকিউজ মি! পাভেল ভাই ও তোমার থেকে অনেক বড়।
আর্শি উত্তর দিলো না। ফলস্বরূপ, রেগে মেগে উঠে দাঁড়ালো প্রেমা। বললো,

— আমার ভাইয়ের বিয়ে আমার পছন্দ অনুযায়ীই হবে।
হতভম্ব হয়ে সেদিকে তাকিয়ে রইলো আর্শি। ভেবে পেলো না কি বলবে। তবে প্রেমার উদ্দেশ্য টুকু ঠিকই আয়ত্তে নিলো। তাকে মেনে নেওয়ার মূল স্বার্থ তাহলে সোভামের সাথে একটা সম্পর্ক গড়ে তোলা। ব্যাপারটা খুবই আপত্তিজনক। তবে কি শিকদার বাড়িতে তার আর পাভেলের বিয়ের আলোচনা হয়নি, এসবই কি প্রেমার বানোয়াট কথা ছিলো? ভেবেই আর্শির মন খারাপ হয়ে গেলো। সে গম্ভীর মুখে ব্যাগ কাঁধে নিলো। কারো সাথে কোনো কথা না বলেই বেরিয়ে গেলো ক্লাসরুম থেকে। আর ক্লাসে মনোযোগ আসবে না। মনটা শুধু কাতর হচ্ছে পাভেল শিকদারের নামে।

স্পর্শী সারাদিন অপেক্ষা করলো। প্রতি আধ ঘন্টা পর পর নিয়ম করে ফোনের কল, মেসেজ চেক করলো। কিন্তু আশানুরূপ নাম্বার থেকে কোনোটাই আসলো না। তবে কি এবারের পরিকল্পনায়ও সে ব্যর্থ? পরশ শিকদারের মন কি এবারেও গলে নি? এতোটা পাথর মানুষ কি করেই বা হয়?
অথচ তার ছোটো ভাইটা না চাইতেও প্রেমে মজে আছে। কোনোমতে সামান্য একটু আশকারা পেলেই পাগলাটে রুপ নিবে। কিন্তু স্পর্শী তা চায় না। পাভেলকে ঠকানোর কথা ভাবলেই আত্মা কেঁপে ওঠে। সে স্পর্শীর নিকট থেকে বেইমানি ডিজার্ভ করে না। এতে পুরো জীবনটা নষ্ট হয়ে যাবে।
ঘড়ির কাঁটায় তখন তিনটা বেজে ছাপ্পান্ন। দুপুরের খাওয়া-দাওয়া সেই কবেই শেষ। জ্বরটাও সেরে উঠেছে পুরোপুরি। তবে শীত কমেনি। কনকনে এই ঠান্ডায় ভর দুপুরেও কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছে স্পর্শীয়া। ভালো লাগছে না। এ কদিনে তো কম চেষ্টা করে নি। বেহায়ার মতো, লজ্জাসরম ভুলে কতবার মেসেজ, কল দিয়েছে। আত্মসম্মান ভুলে ভালোলাগার কথা জানিয়েছে। তবুও সে গললো না? শুধুমাত্র একটু ফাঁদে ফেলার জন্য এতোসব চেষ্টা। অথচ ওই শিকদার পাত্তাই দিলো না? ভীষণ আফসোস হচ্ছে স্পর্শীয়ার। কেনো যেচে পড়ে এমনটা করতে গেলো। এমনিতেই নির্লজ্জের মতো কাজকর্ম করেছে, তার উপরে পরশ শিকদার অবহেলা করেছে। ইশ! লজ্জায় সারা শরীর রি রি করে উঠলো। নিজের প্রতিই ঘৃণা বাড়লো। স্পর্শীয়া এ পর্যায়ে কিছু ভেবে শঙ্কিত হলো। যদি তার মেসেজ, কল — এসব ভাইরাল করে দেয় পরশ শিকদার? অথবা দলের সবার সাথে এ ব্যাপারে আলোচনা – সমালোচনা করে মজা নেয়? তখন? উফফ! উফফ! উফফফফফ!

নিজের প্রতিই রাগ ক্রমশ বাড়ছে। সে বোকামি করে ফেলেছে। বাচ্চাদের মতো কোনো কিছু না ভেবে – চিন্তেই আজগুবি পরিকল্পনা করেছে। স্পর্শীর মাথা ধরে গেছে। ফোনটাকে দুরে ছুড়ে মেরে বলহীন শরীর নিয়ে কলাগাছের মতো পড়ে রইলো বিছানায়। ঘৃণায় চোখে জল এসে পড়েছে। এভাবে বেশ কিছুক্ষণ কেটে যাওয়ার পর ফোনে রিংটোন বেজে উঠলো। স্পর্শী চমকালো। স্ক্রিনে পরশ শিকদারের নাম দেখে থমকালো। সময় নিয়ে রিসিভড করে হ্যালো বললো। ওপাশ থেকে ঝরঝরে কন্ঠে পরশ বললো,
— সকালে আর্জেন্ট বের হতে হয়েছিলো। তাই কেটে দিয়েছি। তা কি যেনো বলছিলে তখন?
স্পর্শী জিভে কামড় মারলো। লজ্জা পেয়ে নিচু স্বরে বললো,
— কিছু না।
—উহু! বলেছিলে তো। আমাকে নাকি তোমার ভালোলাগে, মায়ায় পড়েছো —এসব বলেছো।
স্পর্শী আবারো নিজের করা ভুলে আফসোস এ ভুগলো। ঘৃণাও হলো। পরশ তখন ফোন কেটে দিয়ে এখন আবার এসব কেনো তুলছে? তার পাশে কি কেউ আছে? কোনোভাবে সে কি স্পর্শীয়াকে অপমান করতে চাইছে? এসব ভেবে আরো খারাপ লাগতে শুরু করলো স্পর্শীয়ার। নরম গলায় শুধালো,

— না, এমন কিছুই বলিনি। আপনি ভুল শুনেছেন।
ঠোঁট টিপে পরশ হাসলো। অবাক হওয়ার ভান ধরে চেঁচিয়ে বললো,
— সেকি! তাহলে কি আমি ভুল শুনলাম? এদিকে তো তোমার বাবাকে বিয়ের প্রস্তাবও দিয়ে ফেলেছি।
স্পর্শী আতংকে শোয়া থেকে বসে গেলো। চোখ গুলো যেনো ফেটে বাইরে বেরোবে। দরজা খোলা। দ্রুত উঠে গিয়ে ভেতর থেকে দরজা আটকে দিলো। ফোনটাকে কানে চেপে ধরে মৃদু আর্তনাদ করে বললো,
— বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছেন মানে? কি বলেছেন আব্বুকে?
— বলেছি, বিয়ে করবো আপনার মেয়েকে।
পরশের দায়সারা উত্তর পেয়ে রাগে, ভয়ে স্পর্শীর গায়ের তাপমাত্রা আবারো বেড়ে গেলো। সে খানিক আর্তনাদ করে বললো,

— আপনার কি আক্কেল-জ্ঞান কিচ্ছু নেই? আশ্চর্য!
স্পর্শীর কথা শেষ হওয়ার পূর্বেই পরশ প্রশ্ন করলো। কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করলো,
— এভাবে বলছো কেনো স্পর্শীয়া? তুমি নিজে থেকেই তো আমাকে ভালোলাগার কথা জানালে। ভাবলাম, পাত্র হিসেবে পরিবারের কাছে প্রস্তাব আমার’ই রাখা উচিত। তাই করেছি।
লম্বা লম্বা শ্বাস নিয়ে স্পর্শী নিজেকে শান্ত রাখার চেষ্টা করলো। তার এখন পরশকে সন্দেহ হচ্ছে। বিশ্বাস হচ্ছে না, আদৌ এমন কিছু ঘটেছে কি-না। কারন যদি এমন প্রস্তাব সে রাখতোই তবে এতোক্ষণে বিরাট ক্যাঁচাল লেগে যেতো। বাবা নিশ্চয়ই জিজ্ঞাসাবাদ করতো তাকে। কিন্তু খাবার টেবিলে তেমন কোনো আলোচনাই তো হলো না। স্পর্শীয়া শান্ত হলো। বললো,

— আপনি মজা করছেন, তাই না?
— আরেহ, মজা করতে যাবো কেনো?
— আচ্ছা, মেনে নিলাম আব্বুর কাছে আপনি প্রস্তাব রেখেছন। তো তারপর আব্বু কি বললো?
পরশ হাসলো। খানিক তাচ্ছিল্য করে বললো,
— শ্বশুর মশাই বললেন, তার মেয়ের পায়ের নখের সমান যোগ্যতাও নাকি আমার নেই।
স্পর্শী তৎক্ষণাৎ তৃপ্তি নিয়ে হাসলো। আনমনে, কথার ছলে বলে উঠলো,
—ভুল কি বলেছে?
পরশ চুপ করে রইলো। সময় নিয়ে কন্ঠে স্নিগ্ধতা এনে জিজ্ঞেস করলো,
— স্পর্শীয়া, আমাকে কি তোমার সত্যিই ভালো লেগেছিলো? নাকি ফোন নাম্বার পেয়ে ক-দিন মজা উড়িয়েছো?
স্পর্শী সতর্ক হলো। পরশ শিকদারের কন্ঠ বড্ড নরম লাগছে। তবে কি সে স্পর্শীর প্রতি দূর্বল হয়ে পড়লো? পরিকল্পনা নিশ্চয়ই তবে ভুল নয়। ভেবে আবারো পুর্বের ন্যায় ঝাকিয়ে বসলো সে। নরম কন্ঠে বললো,
— আব্বু আর আপনার যা রাজনৈতিক সম্পর্ক, তাতে এ কথা বলা টা অস্বাভাবিক নয়।
— হুম। তবে তোমারও কি মনে হয় আমি তোমার অযোগ্য?

স্পর্শী লাফ মেরে বসলো। পরশ শিকদারের কন্ঠ আবারও নরম শুনালো। পরিকল্পনা কাজে লাগছে দেখে সে উত্তেজিত হয়ে পড়লো। ছোট্ট ছোট্ট শ্বাস নিয়ে উত্তেজনা দমিয়ে নরম কন্ঠে শুধালো,
— এমনটা আমার মনে হয়নি কখনো। শুধু জানি, আপনাকে ভালো লেগেছে। কোনো কারন ছাড়াই।
পরশ ক্রুর হাসলো। শান্ত কন্ঠে বললো,
— জানিনা এর সত্যতা কতটুকু। আদৌ মজা নিচ্ছো কি-না। তবে কেনো জানি তোমায় বিশ্বাস করতে মন চাইছে। আমি কি তোমায় বিশ্বাস করতে পারি, স্পর্শীয়া?
স্পর্শী সময় নিলো না। বললো,
—নিঃসন্দেহে!

তাদের কথাপকোথন আজ এতটুকুতেই সমাপ্ত হলো। কল বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর পরশ শিকদার ফোন টাকে পাশে রেখে ক্রুর হাসলো। দাঁতে দাঁত চেপে ক্ষিপ্ত কন্ঠে বলে উঠলো,
— আমাকে চ্যালেঞ্জ করা তোমার উচিত হয়নি। এবারে রেজিস্ট্রি পেপারে সই না করা পর্যন্ত তো আমি দমবো না। আমার যোগ্যতা ঠিক কতটুকু, তা তোমার মেয়েকে তোমার সামনে বসে বিয়ে করে তবেই কড়ায়-গণ্ডায় বুঝিয়ে আসবো।
অন্যদিকে স্পর্শীয়া সরদার তার পরিকল্পনায় সফলতার আভাস পেয়ে নিশ্চিন্ত রইলো। পরশ শিকদারের ফোন নাম্বারের দিকে চেয়ে ক্ষিপ্ত কন্ঠে বললো,

রাজনীতির রংমহল ৩ পর্ব ২৯

— আমাকে বিয়ে করার খুব সাধ না তোমার? রাস্তার পাগল না বানানো পর্যন্ত ছাড়ছি না। যেদিন তুমি আর তোমার বাপ আমার বাড়ির দোরগোড়ায় এসে আমাকে পাওয়ার জন্য অনুরোধ করবে, সেদিন তোমার যোগ্যতাটুকু চোখে আঙুল দিয়ে বুঝিয়ে দেবো।

রাজনীতির রংমহল ৩ পর্ব ৩১