Home রাজনীতির রংমহল ৩ রাজনীতির রংমহল ৩ পর্ব ৩৬

রাজনীতির রংমহল ৩ পর্ব ৩৬

রাজনীতির রংমহল ৩ পর্ব ৩৬
সিমরান মিমি

মেডিকেলের গ্রাউন্ড ফ্লোরে পা রাখতেই থেমে গেলো স্পর্শীয়া। মনের মধ্যে নিদারুণ খচখচানি। মাথা নিচু করে অপরাধীর ন্যায় ভাইয়ের উদ্দেশ্যে মুখ খুললো। নুয়ে পড়া কন্ঠে বললো,
— সবাই কি রেগে যাবে আমার উপর?
সোভাম উত্তর দিলো না। রাগ, অভিমান দুটোই হচ্ছে। সে তাকিয়ে রইলো অন্যদিকে। ঢাকায় আসার পুরোটা সময়ে একবারও স্পর্শীয়ার সাথে কথা বলেনি। শুধু কল রিসিভড করে তার লোকেশন জানিয়েছে। স্পর্শীয়া বরিশালে আসতেই বাস ধরে চলে এসেছে ঢাকায়। মধ্যখানে না স্পর্শীয়া কথা বলেছে, আর নাতো সোভাম টু শব্দ করেছে। সে পূর্বের মতোই গো ধরে চলে এলো লিফটের সামনে। পিপাসা তিনতলায় একটা কেবিনে ভর্তি। অথচ লিফট আছে নয়তলায়। নামতে নামতে যতটা সময় লাগবে, ততক্ষণে তারা সিঁড়ি বেয়েই উপরে উঠে যাবে। তাই সেকেন্ড সময় ব্যয় না করেই পুণরায় এগিয়ে গেলো সিঁড়ির দিকে। পাঁচ বছরের বাচ্চার মতো স্পর্শীয়া বড় ভাইয়ের পায়ে পায়ে ঘুরছে। কোন ফ্লোরে, কোন কেবিনে মা-বাবা ভর্তি তা কিছুই জানে না। তাই ভাইয়ের পিছুই নিতে হচ্ছে।
ছোটোখাটো একটা কেবিন। চার পাশে চারটা সিট। দরজার সামনে পৌঁছাতেই স্পর্শীয়া বিপাশাকে দেখতে পেলো। সে এক মুহুর্তও দাঁড়ালো না। ছুটে গিয়ে খালামনিকে জড়িয়ে ধরলো। বিপাশা হতভম্ব হয়ে স্পর্শীকে ঘোরালেন। সোভাম পূর্বেই কল করে তাকে জানিয়েছে। তাই খুব একটা ইমোশনাল হলেন না। বরং ধমক দিয়ে বললেন,

“ কাজটা মোটেও ভালো করো নি। তুমি বাচ্চা না।”
খালামনির থেকে মৃদু ধমক খেয়ে তাকে ছেড়ে দিলো। তাকালো মায়ের দিকে। তিনি বুক অবধি চাদর টেনে শুয়ে আছেন। মাথার বালিশটা উঁচু করা। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছেন মেয়ের দিকে। সে চাহনিতে রাগ, অভিমান, কান্না কিছুই নেই। শুধু রয়েছে স্তব্ধতা। যেনো পরিস্থিতি তাকে ছুতে পারছে না। স্পর্শীয়া সুস্থ আছে, স্বাভাবিক আছে — এটা সে বিশ্বাস করতে পারছে না। বারবার মনে হচ্ছে মেয়েটা তার নেই।
স্পর্শীয়ার লজ্জা লাগলো ভীষণ। সে চোখ নামিয়ে নিলো। মায়ের পাশে বসে নির্লজ্জের মতো ছুয়ে ছুয়ে দেখছে ব্যান্ডেজ। পিপাসা চোখ বন্ধ করে নিলো। সময় নিয়ে অভিমান মিশ্রিত কন্ঠে প্রশ্ন করলো,
— এসেছো কেনো?
স্পর্শীয়া নাক টেনে কান্না আটকালো। বললো,
— কোনো এক ভদ্রমহিলা নাকি তার মেয়ের শোকে অসুস্থ হয়ে পড়েছে। তাই দেখতে এসেছি।
— বাজে কথা। চলে যাও।
স্পর্শী সরলো না। বেহায়ার মতো আরো জোরে হাত দুহাতের মুঠোয় নিলো। মাথাটা ঝুকিয়ে মায়ের পেটের উপর রেখে চোখ বন্ধ করে নিলো। এ যেনো নরম এক বালিশ। বললো,
— কিভাবে এক্সিডেন্ট করেছো?
— তোমায় কেনো বলবো?
— আচ্ছা, বলতে হবে না। তোমার ছেলের কাছেই বইলো।

এরপর আর কোনো কথা হলো না। পিপাশা স্থির হয়ে চেয়ে রইলেন ছাদের দিকে। স্পর্শীও শুয়ে রইলো ওভাবে। উঁচু টুলের উপর বসে মাথা রাখলো মায়ের উদরে। খানিকক্ষণ পর সে উঠে দাঁড়ালো। পাশের বেডেই শুয়ে আছে শামসুল সরদার। ডাক্তার জানিয়েছেন তিনি এখন সুস্থ। শুধুমাত্র সাময়িকভাবে ব্রেনে চাপ পড়ার কারনে মিনি স্ট্রক করেছেন। ডাক্তার সাথে সাথে সাবধানী বার্তাও ছুড়ে দিয়েছেন। এ নিয়ে দু দু বার মিনি স্ট্রক। পরবর্তীতে কোনো চাপ পড়লে শরীর সামলাতে পারবেন না। তাই তাকে যেনো এসব দুশ্চিন্তার মধ্যে না রাখা হয়। সোভাম ডাক্তারের সাথে কথা বলে ওষুধ এবং খাবার নিয়ে এলো। এতো দুশ্চিন্তা এবং বিপদের মধ্যে খাওয়া-দাওয়া কিছুই হয়নি।
সন্ধ্যা হয়েছে অনেকক্ষণ। ঘড়ির কাঁটায় সাড়ে আটটা। সোভাম নাস্তা এবং শামসুলের ওষুধ নিয়ে কেবিনে প্রবেশ করলো। ওষুধ এবং নাস্তা স্পর্শীয়ার হাতে দিয়ে সে বসলো মায়ের কাছে। বোনের উদ্দেশ্যে বললো,

— তোর বাবাকে উঠিয়ে খাওয়া।
স্পর্শী প্রত্যুত্তর করলো না। চুপচাপ বাবার বেডের কাছে গেলো। তারা যখন এসেছিলো তখন শামসুল বেঘোরে ঘুমাচ্ছিলো। ওষুধের প্রভাবে। তাই আর উঠানো হয় নি। এমনকি স্পর্শীয়া যে বেঁচে আছে, সুস্থ আছে — সেটা সম্পর্কেও তিনি অবগত নন। বেডের পাশ থেকে টুল নিয়ে সেখানে বসলো স্পর্শী। হাত বাড়িয়ে আলতো করে ছুঁয়ে দিলো কপাল। মৃদু স্বরে ডাকলো,
— আব্বু, আব্বু?
শামসুলের ঘুম খানিকটা হালকা হলো। তবুও চোখ খুললেন না। ঘুমাতে বেশ ভালো লাগছে। তিনি শুয়ে রইলেন ওভাবেই। স্পর্শী আবার ডাকলো। বললো,
— আব্বু, ওঠো। ওষুধ খাবে না?
কন্ঠটা সরাসরি ধাক্কা খেলো কানের পর্দায়। শামসুলের সম্বিত ফিরে এলো। সে ধীরে ধীরে চোখের পর্দাটা খুললো। পাপড়িগুলো ভিঁজে আছে এখনো। টিপটিপ করে তাকালেন স্পর্শীয়ার দিকে। সমুজ্জ্বল প্রদীপের ন্যায় মুখটা সামনে দৃশ্যমান হলো। তিনি অস্থির চোখে তাকালেন। বাঁ হাত বাড়িয়ে মেয়ের কপোল ছুলেন। ভাঙা, অস্পষ্ট স্বরে বললেন,

— আমার মা!
স্পর্শীয়া চোখ বন্ধ করে নেয়। এরপর সান্ত্বনা দিয়ে বলে,
— আমি একদম সুস্থ আছি। তুমি কেনো টেনশন করেছো?
শামসুল উঠে বসার চেষ্টা করলো। তাকে সাহায্য করলো স্পর্শীয়া। এরপর চিন্তিত হয়ে বললো,
— কাল তো নির্বাচন। তুমি এখানে কেনো?
ধীরে ধীরে পূর্বের ঘটনাগুলো চোখের সামনে প্রকট হলো। শামসুল অভিমানে চোখ সরিয়ে নিলেন। বললেন,
— এতোটা অবুঝ হও কি করে তুমি? জানো, গত তিন দিন ধরে কতটা দৌঁড়ের উপর থেকেছি।
স্পর্শী মাথা নিচু করে নেয়। কিছু না জানার ভান ধরে বলে,
— আমি কি জানি তোমরা গোষ্ঠীসুদ্ধ সব একসাথে নেমে আমাকে খুঁজবে!
পরক্ষণেই সে উঠে দাঁড়ায়। অভিমান মিশ্রিত কন্ঠে বলে,

— মানছি, আমি ভুল করেছি। আমার এই ভুলের জন্য আমি অনুতপ্ত। কিন্তু তোমরা কি করেছো? মা, বাবা, ভাই — তিন দিক থেকেই প্রতিনিয়ত মানসিক টর্চার করেছো আমায়। মাকে চাইলে বাবাকে পাবো না, বাবাকে চাইলে ভাইকে পাবো না, মাকে পাবো না। উফফফ! আমি যেনো কোনো সম্পদ। ভাগাভাগি চলছে আমায় নিয়ে। আর আমাকেও যেকোনো এক মালিকের অধীনে থাকতে হবে। ভুল বোঝাবুঝি, পরিস্থিতির স্বীকার হয়ে তোমরা আলাদা আছো। মানিয়ে নেওয়াটাও সম্পুর্ন তোমাদের ব্যক্তিগত ব্যাপার। কিন্তু আমার উপর চাপ দিচ্ছো কেনো? এগুলো কতক্ষণ’ই বা ভালো লাগে। আমার তো তিন জনকেই লাগবে। একসাথে, একই বাড়িতে, একই খাবার টেবিলে। এই ভাগাভাগি আমি মেনে নিতে পারবো না। ক’দিনই বা তোমাদের একসাথে চাইছি? আমিও বা কদিন তোমাদের কাছে থাকবো? খুব বেশি হলে এক বছর। এরপর তো আমাকেই নতুন কোনো সম্পর্কে বেঁধে দেওয়া হবে। তাহলে এইটুকু সময়ের জন্য কেনোই বা আমাকে এতোটা যন্ত্রণা দিচ্ছো? লাস্ট বার ওয়ার্নিং করছি, সবাইকে! আমি এসব ঝামেলা আর সহ্য করবো না। আমাকে গুটির মতো ভাগাভাগি করলে আবারো নিরুদ্দেশ হয়ে যাবো। বেঁচে আছি নাকি মরে গেছি — তাও কখনো জানতে পারবে না।

স্পর্শীয়ার গাল বেয়ে টুপটাপ করে অশ্রুর ফোঁটা পড়ছে। তবুও সে অনড়, দৃঢ়। গলার স্বরটাও কাঁপছে না। কথা শেষ করে আর সেথায় দাঁড়ালো না। বেরিয়ে এলো কেবিনের বাইরে। শামসুল দীর্ঘশ্বাস ফেললো। বিপাশা চুপটি করে বসে রইলো বোনের পাশে। খাবার বের করছিলো সোভাম, কিন্তু তা সম্পুর্ন করতে পারে নি। হাত থেমে গেছে। চোখ দুটো খাবারেই নিমজ্জিত। মুখে নেই টু পরিমানেও শব্দ। যেনো স্পর্শীর কথার ভাঁজে ঘোরে হারিয়ে গেছে।
পিপাসা স্থির নয়নে শামসুলের দিকে তাকালো। লোকটার যুবক বয়সের সেই সৌন্দর্যের একটুও ক্ষয় হয়নি। লম্বা-চওড়া, গৌর বর্ন। তবে পরিবর্তন ঘটেছে চুলে। সব চুলে পাক না ধরলেও অর্ধেকটা পেকে গেছে। দাঁড়িতেও সাদা পাকন ধরে গেছে। হয়তো কপালের চামড়ার ক্ষীন ভাঁজ আর পাক ধরা চুল-দাঁড়িই তার বয়স বাড়ার প্রমাণ। দুপুরে যখন তার সামনে এসেছিলো, তখন হৃৎপিন্ড বাইরে বেরিয়ে এসেছিলো পিপাশার। সে আরেকটু খেয়াল করলো। লোকটা হুট করেই যেনো বুড়ো হয়ে গেছে। কয়েক ঘন্টার ব্যবধানে বয়স বেড়েছে কয়েক বছর। দেখে কেমন জীর্ণ, শীর্ণ, দূর্বল মনে হচ্ছে। প্রিয়জনের বিচ্ছেদ বুঝি এভাবেই মানুষকে কাবু করে ফেলে।
পিপাসা চোখ ফিরিয়ে ছেলের দিকে তাকায়। ধীর স্বরে বলে,

— তোমার যেতে ইচ্ছে করলে, তুমিও যাও।
চমকে তাকায় সোভাম। মৃদু ধমক দিয়ে বলে ওঠে,
— এসব ফালতু ঝামেলা বাদ দিয়ে চুপচাপ খাও।
শামসুল হাসলো। তাচ্ছিল্যের সেই হাঁসি। সরাসরি তাকালো পিপাসার দিকে। ঝরঝরে কন্ঠে বললো,
— কতটা অদ্ভুত তুমি! নিজের চিন্তা, অলীক ভাবনা থেকে বেরিয়ে একবারও বাস্তবতা বোঝার চেষ্টা করলে না। তা নাহয় নাই-বা করলে! আমি খারাপ। তোমার চোখে অমানুষ, সংসার করার অযোগ্য। ছেলে-মেয়েকে নিয়ে পালিয়ে এলে। জানলামও না আমার একটা মেয়েও আছে! খোঁজার চেষ্টা করলাম, সন্তান মেরে ফেলার ভয় দেখালে। অথচ আজ আমার সন্তানরা আমায় প্রশ্ন করছে, কেনো এতোবছর তাদের খুঁজি নি! ডিভোর্স লেটার পাঠালে। আমাকে চরিত্রহীন প্রমাণ করে পুরো শহরের সামনে নিচু করলে, মাসের পর মাস – বছরের পর বছর জেল খাটালে।
সোভাম হতভম্ব হয়ে চেয়ে রইলো। পিপাসা নিজেও হতবাক। নিজের সাফাই গেয়ে তৎক্ষনাৎ বলে উঠলো,

— আমি কখন আপনাকে জেল খাটালাম? মিথ্যে কেনো বলছেন?
শামসুল মৃদু হাসলো।
— যার স্ত্রী, স্বামীকে চরিত্রহীন বলে ঘর ছাড়ে, তাকে জেলে ভরতে এর থেকে আর কি প্রমাণ লাগে? আমাকে আসামী বানানোর প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী আমার স্ত্রীই ছিলো। যে নিজের স্বামীকে ইচ্ছে করে নরকে ঠেলে দিয়েছে, শুধুমাত্র তার ভাবনা সত্যি করার জন্য।
পিপাসা চিৎকার করে উঠলো। দিশাহীন হয়ে বলে উঠলো,
— চুপ করুন। আমি এসব শুনতে চাই না।
— আমিও এতোগুলো বছর শেষে এগুলো বলতে চাই না। তুমি তোমার ভাবনা গুলো নিয়েই থাকো। শুধু একটা অনুরোধ! আমার সন্তানদের সামনে আমায় ছোটো করো না। তাদেরকে আমায় ঘৃণা করতে শিখিয়ো না। আমার কষ্ট হয়। আমার যন্ত্রণা হয় এটা ভেবে যে, আমার বুঝদার, যুবক ছেলে তার মায়ের কথায় এতটাই প্রভাবিত হয়েছে যে — আমাকে কখনো জিজ্ঞেস ও করেনি “কেনো আমি আলাদা? ” আর একটা কথা। মেয়েটাকে আর যন্ত্রণা দিও না। ও তোমার কাছেই থাকুক। শুধু সপ্তাহে একদিন আমায় দেখার সুযোগ দিও। আমার স্পর্শীয়ার এই মানসিক যন্ত্রণা আমার আর সহ্য হচ্ছে না।

ভেঙেচুরে যাচ্ছে হৃদয়। তবুও শামসুল এক ফোঁটা অশ্রুও বিসর্জন দিলেন না। পিপাসা কাঁদছেন বিপাশাকে ধরে। তার দোষ! সব তার দোষ! সে এতোদিন ধরে বিষিয়ে দিয়েছে ছেলে-মেয়ের মন। এটা বলতে পারলো? আজ দুই যুগ ধরে কোলে পিঠে করে মানুষ করেছে, সংসার করেছে, সেসব কি ফেলনা। এগুলো কি চোখে পড়ছে না। অথচ বিপরীত পাশের লোকটা তো দিব্যি সংসার করেছে। রাজনীতি করেছে, এমপি হয়েছে, পুরো শহর সামলেছে। তার জন্য অপেক্ষা করে বসে থাকেনি তো। একটা দিনও কি থেমে থেকেছে তার?
সে মৌন হয়ে এসব তর্ক করতে লাগলো। তবে সরাসরি বলতে পারলো না কিছুই। এক সময় শামসুলের ফোন বেজে ওঠে রিসিভড করতেই ওপাশ থেকে খলিল শুধায়,

— ভাইজান, স্পর্শীয়াকে নাকি পাওয়া গেছে? আপনি শুনেছেন কিছু।
— হ্যাঁ, আছে আমার কাছেই।
ক্ষেপে গেলেন খলিল। বললেন,
— জিজ্ঞেস করুন ওকে, “কেনো এই পাগলামি টা করলো। কত বড় ক্ষতি হয়েছে তার কোনো আন্দাজ আছে ওর। পুরো গোষ্ঠী সুদ্ধ নাচিয়েছে। কাল নির্বাচন। আপনি এখনো ঢাকায়। এদিকে আমাদের এক প্রতিনিধি প্রায় মার্ডার হয়ে গেছে। কোনো মতে পরাণ টুকু আছে। সুজনদের বাড়ির পাশে ভোট চাইতে গেছিলো, তখন কোপাইছে। এটা নিয়া আবার বাহার, রিহান গরম হয়ে আছে। যে – কোনো সময় ঝামেলা লাগবে বিশাল। আমি সামলাতে পারছি না একা। আপনি বললে ওরা শুনবে। নির্বাচনের পরেও তো শোধ নেওয়া যাবে।
শামসুল চুপ করে সবটা শুনলো। এরপর ধীর পায়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলো। এরইমধ্যে ভেতরে এলো স্পর্শী। বাবাকে দাঁড়াতে দেখেই ছুটে এসে ধরলো। অস্থির কন্ঠে বললো,

— একি! তুমি নেমেছো কেনো?
— যেতে হবে আম্মু। এক্ষুণি রওনা দেবো।
_কিন্তু তুমি তো অসুস্থ! কিভাবে যাবে? কাকাকে ডাকি।
_লাগবে না। পারবো।
স্পর্শী যেতে দিলো না। শক্ত করে ধরে রইলো। তার বাবাকে একা ছাড়তে ইচ্ছে করছে না। সোভামকে বাবার সাথে যেতে বলতেও দ্বিধাদন্দ্বে ভুগছে। যদি ভাই অস্বীকার করে, যেতে না চায়, তখন বাবা ভীষণ কষ্ট পাবে। এমনকি সেও লজ্জা পাবে। আবার সে যে সাথে যাবে তাও পারছে না। মা অসুস্থ, এতোদিন পর দেখতে এলো। এমনিতেই সে ভীষণ অভিমানী, এখন যদি মাকে রেখে বাবাকে নিয়ে চলে যায়, তবে পিপাসা ভীষণ কষ্ট পাবে। এদিকে এই অসুস্থ শরীরে বাবাকেও পাঠানো যায় না। আবার চাচাকে ফোন দিয়ে তাকে ঢাকায় আনবে, আবার বাবাকে নিয়ে বাড়িতে ব্যাক করতে রাত পেরিয়ে দিন হয়ে যাবে। সব মিলিয়ে ভীষণ ফ্যাসাদে পড়লো স্পর্শী। এরইমধ্যে সোভাম ইশারা দিলো তাকে। চোখ দিয়ে ইশারা করে খাবার এবং ওষুধ দেখালো। মুহুর্তেই চমকে ওঠে স্পর্শী। এতো ঝামেলায় মনেই ছিলো না। সে জোর করে বাবাকে বসায়। কয়েক চামচ নরম খিচুড়ি খাইয়ে ওষুধ খাওয়ায়। খাওয়া শেষে মলিন মুখে সোভামের দিকে তাকিয়ে বলে,

— আব্বু, অসুস্থ শরীর নিয়ে কিভাবে একা যাবে?
সোভাম প্রত্যুত্তর করলো না। মাথা নিচু করে অন্যদিকে তাকালো। এর পুণরায় ইশারা দিলো স্পর্শীকে। বললো, বাবার সাথে যাওয়ার জন্য। কয়েক সেকেন্ড অবাক হয়ে তাকালেও আবার পিছপা হয়ে যায়। শামসুল পুরোটাই লক্ষ করলো। এরপর ঝরঝরে কন্ঠে স্পর্শীকে বললেন,
— তোমার আম্মু অসুস্থ। তার কাছে থাকো। আমি যেতে পারবো।
এক নজর তাকালো পিপাসা। অন্যদিকে তাকিয়ে বললো,
— আমি সুস্থ আছি। তোমার বাবা অসুস্থ। তার সাথে যাও।
পরিস্থিতিটা ঝামেলাপূর্ণ। একজন অন্যদিকে ঠেলে দিচ্ছে স্পর্শীকে। শেষমেশ সোভাম কথা বলে উঠলো। ঝরঝরে কন্ঠে বললো,
— আম্মুর কাছে আমি আছি। তুই যা।
অবশেষে সমস্যার সমাধান হলো। একটা গাড়ি রিজার্ভ করে তার ডিকিতে মোটর সাইকেল টা তুলে দিলো সোভাম। এরপর স্পর্শীর হাতে টেস্টের রিপোর্ট এবং ওষুধ দিয়ে বিদায় নিলো। তবে একেবারে চলে গেলো না। দাঁড়িয়ে রইলো আড়ালে, যতক্ষণ না পর্যন্ত গাড়ি চোখের আড়াল হয়।

রাত প্রায় দশটা। কিছুক্ষণ পূর্বেই পদ্মা সেতু পার হয়েছে স্পর্শীয়া। শামসুল ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে পড়েছে। স্পর্শীয়াও প্রায় ঢুলুঢুলু অবস্থায়। এরইমধ্যে ফোন বেজে উঠল। সোভাম দিতে পারে ভেবেই ফোন বের করলো স্পর্শীয়া। কিন্তু স্ক্রিনের নাম্বারটা পরিচিত নয়। সে রিসিভড করে কানে তুললো। বাবার ঘুমের সমস্যা যেনো না হয়, সেজন্য কন্ঠ চাপিয়ে নিচু স্বরে বললো,
— আসসালামু আলাইকুম! কে বলছেন?
পরশ সস্তিতে চোখ বন্ধ করে নেয়। কন্ঠ শুনে সুস্থই মনে হচ্ছে। তবুও ধীর কন্ঠে সালামের জবাব দিয়ে বললো,
— তুমি কি ঠিক আছো?
কন্ঠটা অপরিচিত নয় স্পর্শীর। সে উত্তেজিত হতে গিয়েও চেপে গেলো। চোয়াল শক্ত করে বললো,
— আপনি!! আপনি আমাকে কেনো কল করেছেন? লজ্জা করে না।
— নাহ! লজ্জা করবে কেনো? যার খুনের আসামী আমি, তার বেঁচে থাকার খবর নেবো না?
—নির্লজ্জ।

রাজনীতির রংমহল ৩ পর্ব ৩৫

স্পর্শীয়া রেগেমেগে কল কেটে দেয়। এই অভদ্র লোক তার চরিত্র নিয়ে ছিনিমিনি খেলেছে। তারপর আবার তাকেই কল করে টিটকারি মারছে। চরম লেভেলের অসভ্য। ইতোমধ্যে আরো দু-বার কল করে ফেলেছে। কেটে দিলেও থেমে যায় নি। শেষে বাধ্য হয়ে নতুন নাম্বারটাও ব্লক করে দিলো। ইচ্ছে করছে গালি দিতে। সেদিন রাতের ঘটনা এক সিকিও ভোলেনি সে। সামনে পেলে কাঁচা চিবিয়ে খাবে। কিন্তু এই মুহুর্তে উত্তেজিত হওয়া যাবে না। বাবা তার সাথেই। তাই চুপচাপ রইলো।

রাজনীতির রংমহল ৩ পর্ব ৩৭