এক দেখায় পর্ব ২০
সুরভী আক্তার
শহরের রাস্তায় যানজট বেড়েছে । ঢাকা শহরের যানজট পুর্ন রাস্তা,,বিকেলের সময়ে জ্যাম থাকে অনেক । চারটা পেরিয়েছে অনেক আগে । পাঁচটা বেজে গেছে । চারটার আগেই বাড়ি ফেরার কথা ছিল মিহির । আম্মু আব্বুর সাথে ঘুরতে যাওয়ার কথা ছিল আজ । এরমধ্যে আজমাল হোসেন দুবার কল দিয়েছেন মেয়েকে , মিহি আব্বু কে সংক্ষিপ্ত আকারে বুঝিয়ে বলেছে সবটা । আজমাল হোসেন আর কিছু বলেন নি ।
শা শা করে ছুটে চলছে রাফির বাইক । জ্যামের কারণে বারবার আটকে যাচ্ছে । জ্যাম পেরিয়ে গাড়ি ঘুরিয়ে একটা ফাঁকা রাস্তায় নামে, অনেকটা ঘুরে যেতে হবে এদিক দিয়ে যেতে হলে , তবে এদিকে গাড়ি চলাচল কম করে । মেইন রোড দিয়ে যানজট পেরিয়ে বাড়ি পৌঁছাতে যতটা সময় লাগবে, এই ঘোরানো পেঁচানো রাস্তা দিয়ে বাড়ি পৌঁছাতেও একই সময় লাগবে ।
মিহি রাফির কাঁধের লেদার সুটের অংশ খামচে ধরে বসে আছে । চঞ্চল চোখে চারপাশটা দেখছে । কালো পিচের রাস্তা । রাস্তার একপাশে বিশাল বড় ঝিল , ঝিলের দৈর্ঘ্য অনেক দূর অবধি বিস্তৃত, নতুন পানিতে চকচক করছে । অন্যপাশে সারিবদ্ধ জারুল আর কৃষ্ণচূড়া গাছ । ফুলে ফুলে ভরে উঠেছে সব গাছ । লাল,নীল ফুল আর সবুজ পাতার মিশ্রনে চোখ আটকে যাচ্ছে গাছ গুলোর দিকে । পায়ে হেঁটে ঘোরার জন্য সুন্দর একটা রাস্তা ।
মৃদু ঠান্ডা হাওয়া বইছে, বাইকের গতির কারণে হাওয়াটা আরো জোরে লাগছে গায়ে । রাফি ধীর গতিতে বাইক চালাচ্ছে ।
একটু এগোতেই রাস্তার পাশে দেখা যায় অনেক গুলো ফুলের দোকান । ফুসকা আর চায়ের দোকানো আছে । ঝিলের ধারের গাছ গুলোতে শান বাঁধানো । বসার জন্য ব্রেঞ্চ পাতাও আছে । ছোট খাট একটা সুন্দর জায়গা । অনেকে ঘুরতে আসে । বেশিরভাগ আসে কাপল’রা ।
এখানে মানুষের ভিড় একটু বেশি । কেউ কেউ দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে ফুল কিনছে তাদের প্রিয় মানুষের জন্য । মেয়েরা তাদের প্রিয় মানুষের সাথে এসেছে, অনেকের পড়নেই শাড়ি । ফুসকা আর চায়ের দোকানের সামনেও ভির আছে ।
রাফি দোকান গুলো এড়িয়ে শেষ মাথায় বাইক থামায় । আয়নায় মিহিকে দেখে শান্ত স্বরে বলে…
” নামুন….
মিহি নামে । রাফি বাইক থেকে নেমে পড়ে । মাথার হেলমেট খুলতেই চুল গুলো এলোমেলো হয়ে ছড়িয়ে পড়ে কপালে । রাফি হেলমেট রেখে মাথা ঝাঁকিয়ে আয়নায় দেখে আলতো হাতে চুলগুলো সেট করে । মিহির দিকে ঘুরে বলে….
” চা খাবেন ?
মিহি একবার হাতে থাকা ঘড়িতে সময় দেখে নেয় । ছয়টা বাজতে দেরি নেই । বাড়ি ফিরতে হবে । তবে রাফির মুখের দিকে তাকিয়ে না করতে পারে না মিহি । রাফির মন খারাপ লক্ষ্য করেছে সে , আর মন খারাপের কারণটাও অজানা নয় । মিহি চায়ের দোকানের দিকে একবার দেখে নেয়,, তারপর একটু শীতল কন্ঠে বলে…
” হুম, খাবো , তবে আমার একটা শর্ত আছে ।
রাফি ভ্রু কুঁচকে স্বাভাবিক কন্ঠে বলে…
” আমার সাথে এক কাপ চা খেতেও শর্ত থাকে বুঝি ? তা বলুন, কি শর্ত আপনার ?
” এভাবে বলছেন কেনো ? আমি তো শুধু এটাই বলছিলাম, যে চা খাবো , তবে চায়ের বিল আমি দেব ।
” ছেলেরা সাথে থাকলে মেয়েদের বিল দিতে নেই ।
” কে বলেছে এটা ?
আজকের চা আমার পক্ষ থেকে , আমার বার্থডে ট্রিট হিসেবে ।
রাফি শ্বাস টেনে মুচকি হাসে । ঘাড় বাঁকিয়ে মিহিকে জিজ্ঞেস করে….
” হেলমেটটা খুলতে পারবেন ? নাকি খুলে দেবো ?
মিহি কোমল কন্ঠে বলে….
” পারবো….
” তাহলে এখানে দাঁড়ান,, আমি আসছি ।
রাফি চলে যায় সামনের দোকানের দিকে । মিহি চোখ ফিরিয়ে মাথা থেকে হেলমেট খুলে বাইকের উপর রাখে । বাইকে হেলান দিয়ে দাঁড়ায় । প্রকৃতির শীতল হাওয়ায় দুলে ওঠে মিহির মন ।
হঠাৎ একটা অল্প বয়সী মেয়ে হাতে ফুলের তোড়া আর গাজরা নিয়ে এসে দাঁড়ায় মিহির সামনে । মিহি আলতো হেসে কপাল কুঁচকে তাকায় মেয়েটার দিকে । মেয়েটার মাথায় সুন্দর করে ওরনা পেঁচানো । দেখতে বেশ মায়াবী লাগছে । মিহির তাকানো দেখে মেয়েটা কোমল নেত্রে চেয়ে নরম হাসে । হাতের গোলাপের তোড়াটা বাড়িয়ে দিয়ে আধো কন্ঠে বলে ….
” আপু, একটা ফুল নিবা ?
মিহি ভ্রু যুগল নেত্রদ্বয়ের নিকট আরো বেশি কুঁচকে বলে….
” তুমি ফুল বিক্রি করো ?
” আমার আব্বু বিক্রি করে, আব্বুর সাথে আমিও । ঐ যে দেখো ঐ টা আমার আব্বু ।
পিছন ফিরে হাতের ইশারায় একটা লোককে দেখিয়ে দেয় মেয়েটা । মিহি তাকায় সেদিকে । একটা সাইকেলে করে ফুলের ডালা নিয়ে রাস্তার ধারে বসে আছে একজন । মিহি আবারো চোখ ফেরায় মেয়েটার দিকে । মেয়েটার হাতে তাজা গোলাপ । অন্যহাতে গাজরা । মিহি গোলাপের তোড়াটা হাতে নিয়ে জিজ্ঞেস করে…
” দাম কত ফুলের ?
” একটার দাম দশ টাকা !
” তুমি এক কাজ করো, পুরো তোড়াটা আমাকে দাও ! কয়টা ফুল আছে এখানে ?
মিহির কথা শুনে খুশিতে মেয়েটার চোখ মুখ জ্বলজ্বল করে ওঠে । সে গদগদ হয়ে বলে….
” এখানে বিশটা ফুল আছে ,,, মানে,, উমম… দুইশত টাকা ।
মিহি আলতো হেসে ব্যাগ থেকে পাঁচশত টাকার একটা নোট বের করে মেয়েটার হাতে ধরিয়ে দেয় । মেয়েটা নরম কন্ঠে বলে…
” আমার কাছে খুচরো নেই আপু !
” দরকার নেই,, বাকিটা তুমি রেখে দাও ।
মেয়েটা তৎক্ষণাৎ দুদিকে মাথা ঝাঁকিয়ে বলে…
” না , না, আপু , তাহলে তো তোমার লস হয়ে যাবে । আমি এটা নিতে পারবো না । আমার আব্বু বকবে আমাকে । তুমি আমাকে খুচরো টাকা দাও ।
” তুমি তো আমাকে আপু বললে , আর তুমি জানো – তোমার আপুর আজকে জন্মদিন । এটা রেখে দাও, এটা দিয়ে তুমি চকলেট কিনে খাবে , আর আমার পক্ষ থেকে এটা তোমার ট্রিট ।
মেয়েটা হাসে । মিহির দিকে একটা ফুলের গাজরা এগিয়ে দিয়ে বলে….
” তাহলে আমার পক্ষ থেকে এটা আমার আপুর উপহার !
মিহি হেসে ফেলে । ততক্ষণে রাফি এসে দাঁড়ায় ওদের পাশে । দুহাতে মাটির ভাঁড়ে দুটো চায়ের কাপ । মেয়েটা কে দেখে রাফি সরু চোখে তাকায় । রাফির দিকে তাকিয়ে মিহিকে উদ্দেশ্য করে মেয়েটা বলে….
” আপু, এটা ভাইয়া ? ভাইয়া কিন্তু অনেক সুন্দর ! তোমার সাথে খুব মানিয়েছে !
হঠাৎ মেয়েটার এমন কথায় মিহি নড়েচড়ে ওঠে । ভড়কে যায় খানিক । সোজা হয়ে দাঁড়ায় । চোখের পলক ফেলে কোমল চোখে রাফির পানে তাকায় । মিহি কিছু বলার আগে মেয়েটা রাফির দিকে গাজরাটা এগিয়ে দিয়ে বলে…
” ভাইয়া, আপুর হাতে এটা পড়িয়ে দিন । এটা আপুর উপহার । আমি যাই..! ভালো থেকো আপু !
রাফি চায়ের কাপ দুটো বাইকের উপর রাখে । গাজরাটা হাতে নেয় । মিহির হাতে ফুলের তোড়ার দিকে তাকায় । পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করতে করতে মেয়েটাকে শীতল কন্ঠে বলে….
” কতো হয়েছে এগুলো ?
” আপু টাকা দিয়ে দিয়েছে ! এমনিতে দাম দুইশত টাকা, কিন্তু আপু আমাকে পাঁচ শত টাকা দিয়েছে ।
রাফি ভ্রু কুঁচকে তাকায় মিহির দিকে । মিহি মেয়েটার দিকে তাকিয়ে হাসছে । কথাটা বলে মেয়েটা সেখান থেকে চলে যায় । মিহি চোখ ফিরিয়ে রাফির পানে তাকায় । রাফি আগে থেকেই কপাল কুঁচকে তাকিয়ে ছিল । মিহির তাকানোতে সে চোখ ফেরায় । হাতের গাজরার দিকে একবার তাকিয়ে আবারো মিহির চোখে চোখ রাখে । ভ্রু উঁচু করে বোঝায়…
” এটা ?
মিহি কন্ঠে জড়তা নিয়ে বলে….
” দিন, পড়তে হবে না । ব্যাগে রেখে দেই !
রাফি অন্যদিকে তাকিয়ে আবেশিত কন্ঠে বলে…
” অনুমতি পেলে পড়িয়ে দিতে পারি..!
মিহির শরীর খানিকটা ঝাঁকুনি দিয়ে ওঠে । শিহরিত হয়ে ওঠে সে । মিহি মাথা নামিয়ে নেয় । রাফি কিছু বলছে না, মাথা নামিয়ে রাখা মিহির দিকে চেয়ে একটু হাসে । সে মিহির অনুমতির অপেক্ষায় আছে । মিহি কিছু না বলে হাত বাড়িয়ে দেয়…
রাফি বাঁকা হাসে । আলতো করে গাজরাটা পড়িয়ে দেয় । মিহি শ্বাস আটকে রেখে ছিল । পড়ানো হতেই দ্রুত হাত সরিয়ে শ্বাস ফেলে সে ।
রাফি একটা চায়ের ভাঁড় হাতে নেয় । বেশ গরম । কাপটা টিসু দিয়ে পেঁচানো । তবুও হাতে গরম লাগছে । মিহির দিকে কাপটা বাড়িয়ে দেওয়ার আগে ফুঁ দিয়ে একটু ঠান্ডা করে দেয় । এখন গরম থাকলেও হাতে লাগছে না । এবার মিহির দিকে কাপটা বাড়িয়ে দেয় রাফি….
” নিন…
মিহি অন্যমনস্ক হয়ে হাতের দিকে তাকিয়ে ছিল । রাফির কথায় ধ্যান ভাঙ্গে ওর । স্মিথ হেসে চায়ের কাপ হাতে নেয় । দু’জনেই নীরবে চা খায় । এরমধ্যে ওদের মাঝে আর একটাও কথা হয় না । চায়ের বিল মেটায় মিহি । রাফিও আর বাঁধা দেয় না । দু’জনে মিলে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দেয় আবারো ।
মিহি দের বাড়ির বাইরে বাইক থামে । মিহি বাইক থেকে নেমে পড়ে । রাফির দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে গোলাপের তোড়াটা বাড়িয়ে দেয়…
” এগুলো আপনার জন্য !
রাফি ভ্রু কুঁচকে তাকায় । বসা অবস্থায় সামনের দিকে একটু ঝুঁকে বলে…
” For Why ?
” For my birthday gift !
রাফি তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বলে….
” কিন্তু আমি তো আপনাকে এখনো গিফট দেই নি !
” দিলেন তো !
” কোই ?
” আজকের পুরো দিনটা ! আশ্রমের সময় গুলো, প্রত্যেকটা ঘটনা । সবগুলো আমার কাছে বেস্ট গিফটের থেকে কোন কিছুতে কম নয় । Thank you… For everything .
আর আমার গিফটের পরিবর্তে এটা আপনার রিটার্ন গিফট ।
রাফি ফুলের তোড়া টা হাতে নেয় । প্রান ভরে শ্বাস টেনে গন্ধ নেয় ফুল গুলোর । তার সখের নারীর স্পর্শ লেগে আছে এতে । রাফি প্রতিটা ফুলের মাঝে অনুভব করে মিহি কে । প্রেয়সীর দেওয়া প্রথম কোনো উপহার । ফেরানো যায় কিভাবে ? সে মুচকি হেসে বলে…
” এটার জন্য thanks ..
আর আপনার গিফট খুব শীঘ্রই আপনার কাছে পৌঁছে যাবে । আমাকে কেউ কিছু দিলে আমি তার হাজার গুণ করে তাকে ফিরিয়ে দেই… আপনাকেও দেবো ।
মিহি নরম হেসে বলে…
” তাহলে অপেক্ষায় রইলাম !
এখন আসি ?
” শুনুন..!
” হুম… বলুন….
” আবারো ধন্যবাদ !
” আবার কেনো ?
রাফি খানিক চুপ থেকে বলে…
” এমনি,, আসতে পারেন এখন ।
মিহি বাড়ির ভেতর ঢুকে পড়ে । রাফিও একটু দাঁড়িয়ে থেকে চলে যায় নিজ গন্তব্যে ।
বাড়ির দরজা খুলে দেয় আজমাল হোসেন । মিহি পিটপিট করে বাড়িতে ঢোকে । ঠোঁট উল্টে করুন চোখে তাকায় আব্বুর দিকে । আজমাল কিছু না বলে নিষ্ক্রিয় হেসে দরজা লাগিয়ে দেন । সাবিনা বেগম ড্রইং রুমে কোথাও নেই । মিহি রান্না ঘরে উঁকি দেয় । সেখানেও নেই । আজমাল হোসেন মিহি কে এড়িয়ে উপরে নিজের ঘরে চলে গেছেন । মিহি পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখে আব্বু নেই ।
আব্বু আম্মু দু’জনেই ওর ওপর অভিমান করে আছে । মিহি সেটা বুঝতে পারছে । মিহি ঝটপট উঠে যায় নিজের ঘরে । তাড়াহুড়ো করে ফ্রেশ হয়ে আব্বুর ঘরের দিকে পা বাড়ায় ।
ঘরের বাইরে এসে কড়া নাড়ে । সাবিনা বেগম জায়নামাজে বসে আছেন ।
মাগরিবের নামাজ শেষে আজমাল হোসেন বই হাতে গিয়ে বসেছেন ব্যালকনিতে । তার জন্য বরাদ্দকৃত আরাম কেদারায় ।
মিহির কারোর সাঁড়া না পেয়ে ঘরে ঢোকে । সাবিনা বেগম মেয়েকে দেখে চোখ ফিরিয়ে জায়নামাজ উঠিয়ে গুছিয়ে রাখেন । মিহি গুটি গুটি পায়ে আম্মুর পেছনে গিয়ে জড়িয়ে ধরে । আম্মু কিছু বলে না । তিনি একই ভাবে দাড়িয়ে আছেন । মিহি নিরিহ মুখে বলে….
” সরি আম্মু….
সাবিনা বেগম চুপ । একটুও নড়েন না । মিহি আবারো বলে….
” আম্মু, আমি জানতাম না ওরা আমাকে ওখানে নিয়ে যাবে । আর এতো দেরি হবে জানলে আমি কখনো যেতাম না, বিশ্বাস করো । সরি,, আমি তোমাদের কষ্ট দিয়েছি আম্মু । আর কখনো এমনটা হবে না ।
সাবিনা বেগম আস্তে করে নিজের থেকে মিহি কে সরিয়ে দেয় । নিস্তেজ কন্ঠে বলেন…
” আমার কাজ আছে ,, রান্না বসাতে হবে । আমি নিচে যাচ্ছি ।
মিহি আম্মুর পথ আটকে ধরে । কানে ধরে কাঁদো কাঁদো হয়ে ছলছল নয়নে তাকিয়ে ভেজা কন্ঠে বলে…
” এই দেখো কানে ধরছি । আর কখনো এমনটা হবে না ।
সাবিনা বেগম তাকান । শক্ত কন্ঠে বলেন…
” আজকাল আমাদের থেকে ওরা তোমার কাছে বেশি আপন হয়ে গেছে মিহি । আমাদের থেকে ওদের গুরুত্ব তোমার কাছে বেশি । গত আঠারো বছরে যে দিনটা তুমি আমাদের সাথে কাটিয়েছো , গত এক বছরেই সেই বিশেষ দিনটা তুমি তাদের নামে করে দিলে ? আমাদের কথা একবারও মনে পড়লো না তোমার ? এদিকে কেউ যে তোমার অপেক্ষায় ছিলো , সেটা মনে পড়লো না ?
মিহি ঠোঁট উল্টায় । সাবিনা বেগম বলেন…
” আমি নিচে যাচ্ছি ।
বলেই মিহিকে পাশ কাটিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে আসেন তিনি । মিহি কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে আব্বুর কাছে ব্যালকনিতে যায় । নিঃশব্দ পায়ে আব্বুর পায়ের কাছে মেঝেতে বসে । মাথা এলিয়ে দেয় আব্বুর কোলে । আজমাল হোসেন শ্বাস ছেড়ে বলেন….
” আম্মু রাগ করেছে ?
মিহি মাথা ঝাঁকিয়ে হ্যাঁ সূচক সম্মতি দেয় । আজমাল হোসেন বলেন….
” একটু পর রাগ কমে যাবে । মন খারাপ করো না মা ।
” আব্বু, তোমার অফিস শুরু কবে থেকে ?
” শনিবার থেকে !
” কালকে ঘুরতে যাই আমরা ?
আজমাল হোসেন একটু ভেবে উত্তর দেন…
” ঠিক আছে, যাবো । তোমার আম্মু কে রাজি করাও আগে ।
মিহি কিছুক্ষণ আব্বুর কোলে মাথা রেখে বসে থাকে । আজমাল হোসেন মেয়েকে বই পড়ে শোনান । মিহি ব্যালকনির গ্রিল ভেদ করে আসা নরম হাওয়ায় চোখ বন্ধ করে আব্বুর বই পড়া শোনে ।
৮ টার দিকে খাবার টেবিলে বসেছে সবাই । মিহি একটা চেয়ার টেনে কাঁচুমাচু হয়ে বসে আছে । মুখটা চুপসে আছে ওর । সাবিনা বেগম খাবার বেড়ে দিচ্ছেন । খাবার বেড়ে তিনিও একটা চেয়ার টেনে বসে পড়েন । কোনো রকমে একটু খায় মিহি । পেটে খিদে নেই তেমন । আজমাল হোসেন খাওয়া শেষে সোফায় বসেছেন । মিহি টেবিল ছেড়ে এঁটো প্লেটগুলো রান্না ঘরে নিয়ে যায় । নিজেই সেগুলো পরিষ্কার করে রাখে । সাবিনা বেগম বারন করেন না । আজ অবধি মিহি কখনো এসব করে নি । বলা যায় সাবিনা বেগম মেয়েকে এসব করতে দেননি । মিহি রান্না ঘর থেকে বেরিয়ে আব্বুর পাশে বসে । আজমাল হোসেন ইশারায় কিছু বোঝান । মিহি ঠোঁট উল্টে দুদিকে মাথা নাড়ে । সাবিনা বেগম এখনো কথা বলছেন না ।
কিছুক্ষণ বাবা মেয়ে বসে থাকে নীরবে । মিহি বসে বসে দাঁত দিয়ে নখ কাঁটছে । সাবিনা বেগম গম্ভীর মুখে রান্না ঘর থেকে বেরিয়ে এসে একটা বাটি এগিয়ে দেন মেয়ের দিকে । জন্মদিনে পায়েস রান্না করেছেন মেয়ের জন্য । এমনিতেও মিহির পায়েস অনেক পছন্দ । সেটা যদি হয় আম্মুর হাতের, তাহলে তো কোনো কথাই নেই । মিহির আব্বুর দিকে একবার চেয়ে খপ করে পায়েসের বাটিটা হাতে নেয় । আজমাল হোসেনকেও একটা বাটি দিয়ে সাবিনা বেগম সোফায় বসেন । মিহি গিয়ে বসে আম্মুর কাছে,, খুব কাছাকাছি । বাটি থেকে পায়েস তুলে নিজে খাওয়ার আগে চামচটা এগিয়ে দেয় আম্মুর দিকে । সাবিনা বেগম অন্যদিকে মুখ ফেরান । মিহি উঠে অন্যদিকে সাবিনা বেগমের মুখোমুখি বসে , আবারো এগিয়ে দেয় পায়েস সমেত চামচ । সাবিনা বেগম আবারো মুখ ফিরিয়ে নেন । এভাবে নীরবে কয়েকবার একই ঘটনা চলতে থাকে । শেষমেষ বাধ্য হয়ে নাকের পাটা ফুলিয়ে মেয়ের দিকে তাকান সাবিনা বেগম । মিহি বোকার মতো ফিক করে হেসে ওঠে ।
মেয়ের মায়াবী মুখের হাসি দেখে সাবিনা বেগম সব অভিমান ভুলে হেসে ওঠেন । আহ্লাদে জড়িয়ে ধরেন মেয়েকে । মিহিও গদগদ হয়ে মা’কে আবেশে জড়িয়ে ধরে । আজমাল হোসেন পাশ থেকে হেসে ওঠেন মা মেয়ের অভিমানের সমাপ্তি দেখে । মিহি আম্মুর কাঁধে মাথা রেখে তপ্ত শ্বাস টেনে আহ্লাদি স্বরে বলে….
” এই না হলে আমার লক্ষী আম্মু !
আচ্ছা আম্মু, কালকে কিন্তু সব কাজ বাদ । কাল আমরা সবাই ঘুরতে যাবো । কাল কিন্তু আর মিস দেবো না ।
সাবিনা বেগম মুচকি হাসেন । এই মেয়ের উপর আর কতক্ষনই বা অভিমান করে থাকা যায় । ওর ঢাল ঢাল চোখের পান পাতার মতো মুখের মায়াবী হাসি দেখে মুহুর্তেই সব রাগ অভিমান গলে জল হয়ে যায় । সাবিনা বেগম পেছন থেকে মেয়েকে জড়িয়ে ওর মাথায় হাত রাখেন । মিহি আপন মনে পায়েস খাচ্ছে ।
হঠাৎ কলিং বেল বেজে ওঠে । এতো রাতে ওদের বাড়িতে তেমন কেউ আসে না । আসলে মাঝে মাঝে সাফি আসে ।
আজমাল হোসেন উঠে গিয়ে দরজা খুলে দেন । দরজার ওপারে কেও নেই । দরজার ঠিক সামনে বিশাল বড় একটা গোলাপের বুকে । পাশেই একটা গিফট বক্স । মিহি আর সাবিনা বেগম একই সাথে দরজার পানে তাকায় । আজমাল হোসেন দাঁড়িয়ে আছেন । মা মেয়ে দুজনে উঠে যায় তার কাছে । দুজনের নজর যায় দরজার সামনে রাখা বিশাল বড় গোলাপের বুকে’র দিকে । লাল টকটকে বড় বড় গোলাপ । এতো বড় ফুলের বুকে মিহি কোনোদিন দেখেনি ।
মিহি ভেতরটা আচমকা কেমন ছ্যাঁত করে ওঠে । ও চোখ গোল গোল করে তাকায় এদিক ওদিক । আসেপাশে কেউ নেই । আজমাল হোসেন কিছু না বুঝে চোখ কুঁচকে বলেন…
” এতো রাতে,এই ফুল আর গিফট বক্স কে পাঠাতে পারে বলোতো ?
সাবিনা বেগম ঠোঁট উল্টে তাকান, অর্থাৎ তিনিও কিছু বুঝতে পারছেন । মিহি বোধহয় আন্দাজ করতে পারলো এগুলো কে পাঠাতে পারে । তৎক্ষণাৎ কম্পিত কন্ঠে মিহি বলে…
” আ.. আব্বু ,, আমি জানি এগুলো কে পাঠিয়েছে । এ..এগুলো রুহি পাঠিয়েছে । ও আমাকে বলেছিল ও এসব পাঠাবে ,, কিন্তু দেখো আমিই ভুলে গেছিলাম ।
আজমাল হোসেন স্বস্তির শ্বাস ফেলেন । তিনি বলেন…
” আগে বলবে তো আম্মু,, আমি ভাবলাম কে না কে পাঠিয়েছে হয়তো । চলো, এসব নিয়ে ভেতরে চলো ।
মিহি গিফট বক্সটা হাতে তুলে নেয় । গোলাপের বুকে’টা ভারী । আজমাল হোসেন নিজেই সেটা পৌঁছে দেয় মিহির ঘরে ।
আজমাল হোসেন বের হতেই মিহি ঘরের দরজা বন্ধ করে দরজায় পিঠ ঠেকিয়ে জোরে জোরে শ্বাস নেয় । ওর বুকের ভেতরটা কেমন ঢিপ ঢিপ করছে । পায়ের পাতা শিরশির করছে ।
মিহি ঢোক গিলে এগিয়ে যায় খাটের দিকে । খাটের উপর ফুলের বুকে আর গিফট বক্স – দুটোই রাখা ।
মিহি আস্তে করে খাটের পাশে বসে । গোলাপের বুকে’টা কোন রকমে নিজের কোলে নেয় । বেশ ভারী । ফুল গুলোতে আলতো হাত বুলিয়ে চোখ বন্ধ করে ফুলের গন্ধ টেনে নেয় নিজের মাঝে । সহসা শিহরণ খেলে যায় মিহির পুরো শরীরে । মিহি ধারনা করে – কতো গুলো ফুল হতে পারে এখানে ,, শত ? না ,না , হাজার হবে হয়তো । মিহির ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে ওঠে । ফুলগুলোর মাঝে ছোট্ট একটা চিরকুট । মিহি সেটা হাতে নেয় । ধীরে ধীরে খোলে । চিরকুটে স্পষ্ট অক্ষরে সুন্দর করে লেখা….
” বলেছিলাম না – কেউ কিছু দিলে আমি সেটার হাজার গুণ করে তাকে ফিরিয়ে দেই । আপনাকেও দিলাম ম্যাডাম,, তবে ১০০ গুন । বাকি ৯০০ গুন পরে পুষিয়ে দেবো ।
দু’হাজার গোলাপের শুভেচ্ছা আমার পুষ্পের রাণি কে । এই দিনটা শত কোটি বার ফিরে আসুক আপনার জীবনে । এই ফুল গুলোর মতোই রঙিন হয়ে উঠুক আরেক স্নিগ্ধ পুষ্পের জীবন । আবারো জানাই – শুভ জন্মদিন my dear blossom….
মিহি পুরো চিরকুটটা পড়ে কেঁপে ওঠে । রাফির সম্বোধন কৃত ‘আমার পুষ্পের রাণি’ আর ‘my dear blossom’ কথাটা কানে বাজতে থাকে ওর । আবেশে চোখ বন্ধ করে নেয় মিহি । আচমকা হেসে ওঠে । ফুলগুলোকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বুকে । আবার সেগুলো পাশে রেখে খাটের উপর শুয়ে গড়াগড়ি খায় কয়েকবার । উবু হয়ে শুয়ে চিরকুটটা সামনে নিয়ে আবারো পড়ে । এভাবে বেশ কয়েকবার পড়ে । কেনো যেনো ইচ্ছে করছে বারবার পড়তে । অজানা কারণেই মিহির মনে ভালোলাগার সৃষ্টি হয় । ওর আজ ভীষণ ভালো লাগছে । এই ভালোলাগার বর্ননা নেই ওর কাছে । বুকের মাঝে যেনো একসাথে অনেকে নৃত্য করছে । অষ্টাদশীর হৃদয়ে তোলপাড় শুরু হয়ে গেছে । হৃদস্পন্দন বেড়ে গেছে ওর । মিহি শোয়া থেকে উঠে চিরকুটটা হাতে নিয়ে পুরো ঘরে দুহাত মেলে ঘুরে বেড়ায় । একসময় চিরকুটটা হাতে নিয়েই ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়ায় । হৃৎপিণ্ড ওঠা নামা করছে । মিহির স্পষ্ট টের পাচ্ছে ওর বুকের ঢিপ ঢিপ শব্দ । ব্যালকনিতে গিয়ে চোখ বন্ধ করে জোরে জোরে শ্বাস নেয় মিহি । চিরকুট টা সামনে নিয়ে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ । আবারো কিছু একটা ভেবে ছুটে যায় ঘরে । রাফির দেওয়া গিফট বক্সটা হাতে নেয় । নীল raping পেপারে মোড়ানো একটা মাঝারি সাইজের গিফট বক্স । মিহি শ্বাস টেনে কাঁপা কাঁপা হাতে ধীরে ধীরে প্যাকেট খোলে । প্যাকেট খুলতেই সবার প্রথমে নজরে আসে গোলাপি রঙের নিখুঁত কাজের সুন্দর একটা শাড়ি । মিহি শাড়িটা হাতে নিয়ে হাত বুলিয়ে দেয় । শাড়ির সাথে কানের ঝুমকা আর গোলাপি কাঁচের চুড়িও আছে । পাশে আরো একটা চিরকুট । মিহি চিরকুট খোলে । সেখানে লেখা….
” কোন এক বিশেষ দিনে এই শাড়িটা পড়ার আবেদন রইলো, আবেদন ময়ীর কাছে । সাথে এই ঝুমকো দুটো, হাতে রিনিঝিনি চুড়ি, ঠোঁটে একটু ঠোঁট রঞ্জন, আপনার ঐ ডাগর ডাগর হরিণি দুটো চোখে গাঢ় কাজল ।
এই মিলিয়ে আপনাকে নতুন রুপে দেখার অপেক্ষায় রইলাম ম্যাডাম ।
মিহি চিরকুট টা পড়ে আবারো মুচকি হাসে । বক্সের এক কোনায় আরো একটা ছোট বক্স । মিহি সেটা হাতে নেয় । সেটার ভেতর সুন্দর একটা ঘড়ি । দেখে দামি মনে হচ্ছে । বেশ ভালো চকচকে একটা ঘড়ি । সেটার পাশে আরো একটা চিরকুট । মিহি ভারী দীর্ঘ শ্বাস ফেলে সেটাও খোলে । সেটাতে লেখা—
” সময় জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জিনিস ম্যাডাম । সময়ের সাথে অনেক কিছুই বদলায় । এই সময়ের চিহ্নটি নিজের কাছেই রাখবেন । যেকোনো মানুষকেই মনে রাখার জন্য একটা চিহ্নের প্রয়োজন, আর এই চিহ্নটা প্রতিটা মুহূর্তে আমার কথা মনে করিয়ে দেবে আপনাকে । সময় বদলাক তবুও যেন সুপ্ত অনূভুতি গুলো না বদলায় ।
মিহি কোমল হাসে । সবগুলো চিরকুট একসাথে করে । সব উপহার সহ সেগুলো যত্ন সহকারে তুলে রাখে আলমারিতে ।
ফুলগুলো আবারো ছুঁইয়ে দেয় নরম স্পর্শে । মুখে লেগে আছে মিষ্টি লাজুক হাসি । কিছু একটা ভাবতে ভাবতে বিছানায় গাঁ এলিয়ে দেয় মিহি । অমনি ঘুমের রাজ্যে তলিয়ে যায় ।
আজ একটু তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়েছে । তাই সকালে উঠতেও দেরি হয় নি । সকাল সকাল উঠে আলমারি থেকে নতুন ড্রেস বের করে রেখেছে মিহি । আজ আব্বু আম্মুর সাথে ঘুরতে যেতেই হবে । আজ কোচিংয়ে ক্লাস ছিল সকাল ১০ টায় । মিহি যায় নি । রুহি গেছিলো, তবে মিহি যায় নি , আর ও যে যাবে না সেটা রুহিকে জানায়নি , এই নিয়ে রুহি আবার ঠোঁট ফুলিয়ে রাগ করে বসে আছে মিহির উপর । মিহি মেসেজ করেছে, রিপ্লাই দেয় নি । ফোনটাও ধরে নি । মিহির উপর একের পর এক একেকজনের রাগ অভিমানের পাল্লা বেড়েই চলেছে । মিহি তপ্ত শ্বাস ফেলে ।
বিকেলে ঘুরতে গেছিলো আব্বু আম্মুর সাথে । একসাথে শহরের অনেক জায়গায় ঘুরেছে । অনেক পার্কেও গিয়েছিল । খাওয়া দাওয়া হয়েছে বাইরেই । বাড়ি ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত নেমেছে । সবাই ক্লান্ত । মিহি ক্লান্ত শরীর নিয়ে নিজের বিছানায় গাঁ এলিয়ে দিতেই চোখ বুজে আসে । নিমিষেই ঘুমিয়ে পড়ে ও । ঘরের লাইট অবধি নেভায় নি ।
এগারোটার দিকে আজমাল হোসেন মেয়ের ঘরে আসেন । ঘরে এসি চলছে,সাথে ফ্যান,মিহি ঠান্ডায় জড়োসড়ো হয়ে শুয়ে আছে । আজমাল হোসেন মুচকি হেসে মেয়ের কাছে আসেন । গায়ে কম্বল জড়িয়ে দেন মেয়ের । কম্বলের উষ্ণতা পেতেই মিহি নড়েচড়ে ওঠে, কম্বলটা জড়িয়ে আবারো স্থির হয় । আজমাল হোসেন মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দেন , উষ্ণ চুমু একে দেন মেয়ের কপালে । এসি অফ করে ঘরের লাইট নিভিয়ে তিনি বেরিয়ে আসেন ।
আজ কোচিং ছিল দুপুর দুটোয় । মিহি তড়িঘড়ি করে রেডি হয়ে রিকশায় চেপে কোচিংয়ে যায় । গিয়ে সবার আগে রাগ ভাঙ্গায় রুহির । আজ ক্লাস নেই, তবে পরীক্ষা আছে । পরীক্ষা শেষে সব বন্ধু বান্ধবীরা মিলে বাইরে আসে । মিহির বার্থডের দিন কারোর সাথে দেখা হয় নি মিহির । তার পরের দিনও মিহি কোচিংয়ে আসে নি । তাই বন্ধুদের সাথে আর দেখা হয় নি । মিহির জন্য আজ সবাই গিফট এনেছে । তবে তাদের শর্ত – মিহিকে আগে ওদের ট্রিট দিতে হবে । মিহি জানতো ওরা আজকে মিহিকে ছাড়বে না । তাই আগে থেকেই প্রস্তুতি নিয়ে এসেছে ও । মিহি সবাইকে বিরিয়ানি ট্রিট দেয় । খাওয়া দাওয়া শেষে রেস্টুরেন্ট থেকে বেরিয়ে সবাই আসে কোচিংয়ের পাশের সেই ফাঁকা রাস্তাটায় । সব ফ্রেন্ডেরা মিলে পাশাপাশি হাঁটছে । মিহির হাতে শপিং ব্যাগের ভিতর অনেক গুলো গিফট বক্স । কিছু বক্স রুহির হাতেও আছে ।
হাঁটতে হাঁটতে সবাই মিলে একটু এগিয়ে রাস্তার পাশে সেই আইসক্রিম পার্লারের সামনে বসে । মিহির হাতের ঘড়িটা কেউ লক্ষ্য করে নি । হঠাৎ নাদিয়ার চোখ যায় মিহির হাতের দিকে ।
অমনি মিহির হাত খপ করে নিজের দিকে টেনে নেয় ও । চোখ বড় বড় করে অবিশ্বাস্য নয়নে তাকিয়ে বলে…..
” মিহি ,, তুই এই ঘড়িটা কোথায় পেলি রে ?
মিহি আলতো হাসে ।
সময় নিয়ে বলে….
” গিফট পেয়েছি !
সবাই হাঁ করে তাকায় মিহির দিকে । রুহি চোখ সরু করে তাকায় । নাদিয়া মুখ গোল করে মুখে হাত চেপে বলে…
” কি বলিস ? কে দিলো রে এটা ?
” দিয়েছে কেউ একজন । কেনো বলতো ?
” You know ? এই ঘড়িটা কতো expensive ? আমি কয়েক দিন ধরে নিউজ ফিডে শুধু এসবই দেখছি । এই টাইপের এই মডেলের ঘড়িই পরশুদিন দেখেছি আমি, একদম সেম । It’s look like – “Rolex Detejust Ladies watch” । তুই জানিস, এসব বাংলাদেশে পাওয়া যায় না, ইমপোর্ট করতে হয় । আর সবচেয়ে বড় কথা, আমি রিসার্স করে দেখেছি, এই ঘড়িটার বাংলাদেশি প্রাইস – প্রায় ১৩ থেকে ২৬ লাখ টাকা । যা আমাকে বিক্রি করলেও আসবে না বোধ হয় ।
শেষ কথা টা হতাশার শ্বাস ফেলে বলে নাদিয়া । নাদিয়ার কথায় রৌনক, মিরা আর সোহেল শুকনো কাশি দিতে শুরু করে দেয় । মিহি অবাক হয়ে চোখ গোল গোল করে ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে আছে । রৌনক কাশি থামিয়ে বুকে হাত দিয়ে বলে….
” ভাই ,, তুই কি মারবি নাকি ? একটা ঘড়ির দাম কিনা ২৬ লাখ টাকা ? আমাদের পুরো টিমকে বেঁচলেও ২৬ লাখ টাকা আসবে না ।
মিহি কিছু বলছে না । মিরা বলে….
” মিহি,, তোকে কে দিলো রে এই ২৬ লাখ টাকার ঘড়ি ? কার এতো বড় কলিজা ?
সোহেল সবাই কে থামিয়ে বলে…
” আরে ধুর,, এই ঘড়িটা হয়তো ঐ Rolex-Tolex যাইহোক ঐ ঘড়িটার মতো দেখতে । বাংলাদেশে কতো সেকেন্ড হ্যান্ড মাল আছে । তোরা কার কথায় নাচিস বলতো ? এই মাথা মোটার কথায় ?
শেষের কথাগুলো নাদিয়া কে ইশারা করে বলে সোহেল । সোহেলের কথায় বাকিরা দীর্ঘ শ্বাস ফেলে । তবে নাদিয়া রেগে বোম হয়ে যায় । সে ঠোঁট ফুলিয়ে বলে….
” দেখ সোহেল ,, খবরদার আমায় মাথা মোটা বলবি না । আমি দেখেছি বলেই বলেছি । এই ঘড়িটা পুরো ঐ ঘড়িটার মতোই দেখতে , তাই আমি বলেছি ।
” উফফ তোরা সবাই থামবি ? সবকিছু তে তোদের বাড়াবাড়ি ।
রুহি সবাইকে থামিয়ে কথাটা বলে । নিজের ব্যাগ থেকে একটা গিফট বক্স বের করে দেয় মিহির দিকে । মিষ্টি হেসে বলে….
” পাখি,, এটা তোর গিফট ।
দেরি করে দেওয়ার জন্য সরি জান…
মিহি আলতো হেসে গিফট বক্স হাতে নেয় । মুখে বলে…
” Thank you পাখি….
সব বন্ধু বান্ধবীরা মিলে আরো কিছুক্ষণ আড্ডা দেয় । তারপর যে যার বাড়ির দিকে রওনা দেয় । মেইন রোডের দিকে হাঁটছে রুহি আর মিহি । বাড়ি থেকে গাড়ি আসবে রুহিকে নেওয়ার জন্য । মিহির জন্য বরাদ্দ করা রিকশাও অপেক্ষা করছে হয়তো ।
দুই বান্ধবী মিলে হাঁটছে রাস্তায় ।
রুহি গলা খাঁকারি দিয়ে কন্ঠ স্বাভাবিক করার চেষ্টা করে বলে….
” আচ্ছা পাখি , তোমাকে এই Rolex Detejust Ladies watch কে গিফট করলো শুনি ?
মিহি আচমকা দাঁড়িয়ে যায় । রুহি ও দাঁড়ায় । ঠোঁট কামড়ে বুকে হাত গুটিয়ে মিহির দিকে তাকিয়ে ভ্রু নাচায় । মিহি শুকনো ঢোক গিলে নিজেকে স্বাভাবিক করে বলে….
” দি.. দিয়েছে একজন ? কিন্তু এটা যে এতো দামি ঘড়ি কে জানতো বল ? আমি জানলে কখনোই নিতাম না ।
” এটা কেমন কথা ? কেউ ভালোবেসে তার প্রেয়সীকে একটা গিফট করেছে, আর তুই কিনা বলছিস আগে জানলে এটা রিজেক্ট করে দিতিস ।
মিহি সহসা চেঁচিয়ে ওঠে….
” আরে নাহ….
আ.. আমি ওনার প্রেয়সী হতে যাবো কেনো ? আমি ওনার কেউ হোই না, বিশ্বাস কর । উনি তো বোধহয় এমনি এমনি দিয়েছিলেন । আর আমিও কিছু না ভেবেই বোকার মতো নিয়ে নিয়েছি ।
” উঁহুম উঁহুম….
তা এই উনি টা কে .. শুনি ?
মিহি মাথা নামিয়ে চুপ করে আছে । রুহি মিহিকে নিজের বাহু দিয়ে মৃদু ধাক্কা দিয়ে বলে….
” তা উনি টা কি আমার ভাইয়া ?
মিহি তড়িৎ বেগে রুহির দিকে তাকায় । রুহি ঠোঁট চেপে হাসছে । মিহি কি বলবে বুঝতে পারছে না । আমতা আমতা করতে লাগলো সে । রুহি বলে ওঠে….
” থাক জান….
তোমাকে আর আমতা আমতা করতে হবে না । তুমি যে তলে তলে আমার ভাইয়ার সাথে এতো কিছু করছো, আমি কিন্তু সব জানি ।
” কিচ্ছু করি নি আমি । বিশ্বাস কর…
উনি তো তোর ভাইয়া মানে আমারও ভা….
বলতে বলতে থেমে যায় মিহি । বাকি কতগুলো গলায় আটকে গেছে । রুহি অনেক কষ্টে ঠোঁট কামড়ে হাসি আটকে রেখেছে । রুহি বলে…
” বলো বলো পাখি..
আমার ভাইয়া মানে তোমার কি ?
ওয়েট,, আমিই বলছি…. আমার ভাইয়া মানে তোমার সাইয়া,, আই মিন…তোমার সোহাগের জামাই জান !! আয়য়য় হায়য়য়….
মিহি অবিলম্বে চোখ বন্ধ করে দুহাতে নিজের কান চেপে ধরে । এলোমেলো কন্ঠে বলে….
” ছিঃ রুহি,, এসব বলিস না প্লিজ ।
তুই যেমনটা ভাবছিস তেমনটা কিচ্ছু নয় ।
” কেনো ভাবি জান ? আমি বললেই দোষ ? আর তুমি যে আমার ভাইয়ার সাথে…..
বাকি কথা বলার আগেই তৎক্ষণাৎ রুহির মুখ চেপে ধরে মিহি ।
রুহি মুখে ‘ওমম’ সূচক শব্দ করে মিহির হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করে । মিহি ওর মুখ চেপে ধরেই বলে….
” এসব বলিস না প্লিজ,, আমার শুনতে কেমন যেনো লাগে ।
খানিক বাদে রুহির মুখ থেকে হাত সরায় মিহি । রুহি জোরে জোরে শ্বাস নিয়ে কাঁদো কাঁদো ভঙ্গিতে বলে…
” ভাবি জান….
এভাবে বিয়ের আগেই ননদের উপর অত্যাচার শুরু করে দিলে । তোমার কি ননদীনি পছন্দ হয় নি । পছন্দ না হলেও কিন্তু কোনো উপায় নেই,, exchange করার কোনো সুযোগ নেই । আমাকে দিয়েই চালিয়ে নিতে হবে ।
মিহি নিজেই নিজের কপালে চাপর মেরে দুদিকে মাথা নাড়ায় । মেইন রোড আসা অবধি রুহি নানান কথা বলে ক্ষেপিয়েছে মিহিকে । মিহি নাক ফুলিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে সবটা সহ্য করেছে । রাস্তায় উঠেই রুহির গাড়ি আর মিহির রিকশার দেখা মেলে দুজনের । মিহি সাথে সাথে উঠে পড়ে রিকশায় । রুহি ও গাড়িতে উঠতে উঠতে আবারো খোঁচা মেরে বলে….
” বেস্ট অফ লাক.. ভা…বি… জান ।
কথাটা টেনে টেনে বলে রুহি । যাতে কেউ বুঝতে না পারে । এরপর দুজন দুদিকে নিজেদের গন্তব্যে চলে যায় ।
বাড়িতে এসে সবার আগে Rolex Detejust Ladies watch নিয়ে তদন্ত চালায় মিহি । খুঁজে খুঁজে সবটা লক্ষ্য করে । মিহির ঘড়ির সাথে অনেকটা,বলা চলে পুরোটাই মিল আছে ।
মিহি খানিক ভাবে এসব নিয়ে । কিছু একটা ভেবে মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে এসব ।
শনিবার থেকে আজমাল হোসেন আবারো নিজের অফিস শুরু করে দিয়েছেন । মিহির ও কোচিং থাকে রোজ রোজ । কোন দিন সকালে আবার কোন দিন দুপুরে । এই চারদিনে রাফির সাথে আর দেখা হয় নি মিহির । গিফটের পরিবর্তে একটা thank you পর্যন্ত দিতে পারে নি মিহি রাফি কে ।
রাফির নাম্বার আছে মিহির কাছে । রুহি মাঝে মাঝে রাফির ফোন থেকে ওকে ফোন করত । তাই নাম্বারটা কললিস্টে সংগ্রহ করে রেখেছে মিহি । মিহি অনেক বার চেয়েছিল রাফি কে ফোন করে একবার ধন্যবাদ জানাবে । কিন্তু জড়তা কাটিয়ে ফোন করার সাহস করে উঠতে পারে নি মিহি । অনেক বার ফেসবুকে নক করতেও চেয়েছিল , কিন্তু পারে নি অজানা সংকোচ আর দ্বিধায় । রাফির সাথে করা চ্যাট লিস্ট পুরো ফাঁকা । দুজনের মাঝে মেসেজে কোন কথা হয়নি । চ্যাট লিস্টে শুধু আছে রাফির করা একটা ছোট্ট মেসেজ – ‘দুই মিনিটের মধ্যে ব্যালকনিতে আসুন’ – এটা ব্যাতীত আর কিছু নেই । সবটা ড্রাই । মিহি রোজ রোজ রাফির প্রোফাইল স্টক করে , কেনো করে জানে না । রাফির প্রোফাইলে আপডেট কিছু নেই । শেষ পোস্ট ছিল পাঁচ মাস আগে । রাফি হয়তো তেমন এক্টিভ থাকে না । মিহিও থাকতো না, তবে এখন থাকে । রোজ রোজ রাফির প্রোফাইল ঘাটার জন্য হলেও অনলাইনে আসে ।
মিহির এসব পাগলামি নতুন । ও তো এমন ছিল না । মাঝে মাঝে নিজেই নিজেকে কড়া শাসন দেয় মিহি । নিজেকে বোঝায় – এসব করা একদম ঠিক না ।
কিছু সময় শাসন মেনে এসব থেকে দূরে থাকে মিহি , খানিক বাদে আবারো সেই আগের মতো । মিহি নিজেই নিজের অনুভূতি সম্পর্কে অঙ্গাত । ও জানে না ওর মন মস্তিষ্কে কি চলছে । কি হয়েছে ওর ।
কি ঘটছে ওর সাথে ?
গত দু’দিন ধরে কোচিং যায় নি মিহি । শুক্রবার অফ ছিলো, শনিবার আর রবিবার মিহি নিজেই যায় নি । সামনে রেসাল্ট দেওয়ার তারিখ এগিয়ে আসছে । আবার আছে এডমিশন টেস্ট । শুধু শুধু টেনশন হয় । পড়াশোনা ছেড়ে সারাদিন টেনশন করে মিহি ।
এক দেখায় পর্ব ১৯
ওকে যে করেই হোক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চান্স পেতেই হবে । এটা অনেক আগের স্বপ্ন । মিহি দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করেছে, সে আর পড়াশোনায় ফাঁকি দেবে না । আর যাই হোক, কোচিং কিছুতেই মিস দেবে না আর । আজ দৃঢ় বিশ্বাস নিয়ে কোচিংয়ে এসেছে মিহি । নাদিয়া বাদে বাকি সবাই এসেছে ।
ক্লাস শুরুর আগে সোহেল কয়েক বার নাদিয়া কে কল করেছে । তবে পায় নি ।
