Home এক দেখায় এক দেখায় পর্ব ২১

এক দেখায় পর্ব ২১

এক দেখায় পর্ব ২১
সুরভী আক্তার

ব্যতিব্যস্ত হয়ে কোচিং থেকে বেরিয়ে বারবার নাদিয়ার ফোনে কল দিয়েই যাচ্ছে সোহেল । কিন্তু প্রত্যেক বার রিং হয়ে কেটে যাচ্ছে ফোনটা । নাদিয়া মেয়েটা জটিল । একে বোঝা যায় না । মিরা, রুহি আর মিহির থেকে ও একটু আলাদা । সবার সাথে সবকিছু শেয়ার করে না । অনেকটা গম্ভীর স্বভাবের । তেমন খোলামেলা নয় ও ‌। তবে পড়াশোনার ব্যাপারে বেশ সিরিয়াস । সবাই কোচিং মিস দিলেও ও দেয় না কখনো । পড়াশোনাতেও মোটামুটি ভালো ।

আজ ও আসে নি । তার মানে নিশ্চয়ই কোনো জটিল কিছু ‌।
সোহেল ফোন করতে করতে ক্লান্ত । তবুও কেউ ফোন রিসিভ করলো না । শেষমেষ বাধ্য হয়ে হাল ছেড়ে দেয় সোহেল । আর ফোন করে না । কোচিং শেষে সবাই যে যার মতো বাড়িতে চলে যায় ।
রুহি বাড়িতে এসেই মেহজাবিনের ঘরে যায় । সেদিন মাহিম মেহজাবিনকে রেখে গেছিলো । কটা দিন থাকবে ও । মাহিম ওকে রেখে পরের দিন বাড়িতে চলে গেছে ।
মেহজাবিনের ঘরে রুহি, জেনি আর মেহজাবিন মিলে খাটের উপর গোল হয়ে বসে লুডু খেলছে । জেনি বয়সে ছোট হলেও এসব বিষয়ে পাকা । ফোনে খেলছে, তাই কেউ কারোর সাথে চিটিং করতেও পারছে না ।
রুহি একে একে জেনির তিনটে গুটি কেটে দিয়েছে । জেনি ঠোঁট উল্টে ছলছল নয়নে তাকিয়ে আছে রুহির দিকে । খেলা শুরু করেছিল জেনি নিজেই । আর ও বাজি ধরেছে যে ও জিতবেই । পরপর জেনির তিনটে গুটি কেটে শব্দ করে বিছানায় গড়াগড়ি খেয়ে হাসছে রুহি । মেহজাবিন নীরব দর্শক । ও একা একাই খেলছে । আসল লড়াই চলছে রুহি আর জেনির মাঝে । রুহির সাথে পাল্লায় উঠতে না পেরে , আর রুহির হাসি দেখে জেনি ঠোঁট উল্টে কেঁদে ওঠে । আচমকা জেনির কান্নায় ভিমড়ি খেয়ে যায় রুহি । সহসা হাসি বন্ধ করে উঠে বসে । দরজার দিকে একবার তাকিয়ে হামলে পড়ে জেনির উপর । জেনির মুখ চেপে ধরে দাঁত পিষে নিচু স্বরে বলে…..

” ওরে দেড় ফুটের বাচ্চা । এমন ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে কান্না জুড়ে দিলি কেনো আবার ? তোর এই নেকি কান্না আম্মু শুনলে বকুনি শুনতে হবে আমাকে । চুপ কর বেয়াদব…
নয়তো আর জীবনেও খেলবো না আমি তোর সাথে ‌।
জেনি অকস্মাৎ চুপ করে । রুহি ওর মুখ ছেড়ে দেয় । জেনির চোখে পানি নেই একটুও । তবুও ছোট ছোট দুহাতে চোখ দুটো মুছে নেয় ‌। নাক টেনে নেকি স্বরে বলে…
” তাহলে আবার নতুন করে খেলা শুরু করো ! এবার যদি আমার একটা গুটিও কাটো , তাহলে কিন্তু বড় আম্মু কে বলে দেবো আমি !
রুহি নাক ফুলিয়ে ঝাঁঝালো কন্ঠে বলে…
” ব্লাকমেইল করছিস আমায় ? খেলবো না আমি তোর সাথে । যা খেল গিয়ে একা একা ।
মেহজাবিন শ্বাস ছেড়ে কোমল কন্ঠে বলে…
” আহহ … রুহি,, বাচ্চা মেয়ে ও , ওর সাথে এভাবে কথা বলিস না । ও কি আর এসব বোঝে বলতো ?
” বোঝেনা মানে ? সব বোঝে ও ,, সব কিছুতেই পাকা ‌ । বয়স তো আট নয় ,যেনো আঠারো ।
জেনি বড়দের মতো ভাবসাব নিয়ে বলে…
” সাইজ আড়াই ফুট আর বয়স আট হতে পারে । কিন্তু তোমার মতো বোকা নোই আমি ।‌ তুমি জানো আমি আড়াই ফুট, তবুও দেড় ফুট কেনো বলো ?
” চুপ কর,,

যা এখান থেকে ।
জেনি আবারো ফ্যাচ ফ্যাচ করে কেঁদে ওঠে । রুহি ক্রমান্বয়ে চোখ সরু করে ওর দিকে তাকায় ।
রাফি অফিস থেকে ফিরেছে একটু আগে । রোজকার মতো শান্তও এসেছে ওর সাথে । নিজের বাড়ির থেকে এই বাড়িতে অধিকাংশ সময় কাটায় ও । সারাদিন অফিসে থাকে, মাঝে মাঝে দুপুরে আসে চৌধুরী বাড়িতে, দুপুরে না আসলে সন্ধ্যায় আসে । এখানেই ফ্রেশ হয়ে একেবারে ডিনার শেষে নিজ বাড়িতে ফেরে । বাড়িতে মন টেকে না ওর । ছোট বেলা থেকেই এই বাড়িতে সবার সাথে থেকেছে । আফসানা বেগম বহুল সময় নিজের বাবার বাসায় থাকতেন । তাই শান্তর ও অভ্যাস হয়ে গেছে এই বাড়ির মানুষ গুলোর সাথে থাকাটা ।
সন্ধ্যায় এসে থেকে রুহিকে দেখে নি শান্ত । রাফির ঘরে যাওয়ার পথে একবার রুহির ঘরে উঁকি দিয়েছে , তখন রুহি ঘরে ছিল না ।
তাই শান্ত এখন একেবারে ফ্রেশ হয়ে বাইরে বেরিয়েছে । পড়নে একটা সাদা টিশার্ট আর কালো ট্রাওজার । হাতে ফোন নিয়ে গুনগুন করতে করতে হেলেদুলে এসে দাঁড়ায় মেহজাবিনের ঘরের সামনে । ও জানে রুহি এখানেই আছে ‌। রুহিকে যতক্ষণ না দেখতে পারছে ততক্ষন মন স্থির হচ্ছে না ওর । রাফি ঘরেই আছে । শান্ত আসার সময় টিটকারী মেরে ওকে বলে এসেছে…

” থাক ভাই , আমি আমার জান টাকে গিয়ে একবার দেখে আসি । সেই কাল সন্ধ্যায় দেখেছি আমার বউ টাকে, এখন ওকে না দেখতে পেরে আমার পরান পাখি উড়ে যাচ্ছে , দেখ বুকটা কেমন ঢিপ ঢিপ করছে আমার ।
রাফি কিছু বলেনি । শান্তর স্বভাব ওকে সবসময় খোঁচানো । তবে শান্ত ঘর থেকে বেরিয়ে আসতেই ওর যাওয়ার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসে রাফি ।
এদিকে শান্ত দরজার সামনে দাঁড়িয়ে গুনগুন বন্ধ করে গলা খাঁকারি দিয়ে দরজায় কড়া নাড়ে । দরজা একটু চাপানো । তবুও বাইরে থেকে নক করে ভেতরে ঢোকে শান্ত । ভেতরে ঢুকতেই জেনির ফ্যাচফ্যাচে কান্না দেখে ভ্রু কুঁচকে আসে ওর । তড়বড় করে জেনির পাশে এসে বসে শান্ত । শান্ত কে দেখে রুহি খানিক গুটিয়ে বসে । শান্ত জেনিকে নিজের কোলে বসিয়ে বলে….
” কি হয়েছে বাবুই,, কাঁদছো কেনো তুমি ?
জেনি নাক টেনে টেনে বলে….
” রুহি আপি বকেছে আমায় !
শান্ত ঘাড় বাঁকিয়ে কপালে ভাঁজ ফেলে রুহির দিকে তাকায় । রুহি কোমরে হাত গুজে ক্ষিপ্ত দৃষ্টিতে জেনির দিকে তাকিয়ে আছে । মেহজাবিন একবার জেনির দিকে তাকাচ্ছে তো আর একবার রুহির দিকে । রুহি খেঁকিয়ে বলে ওঠে….

” দেখেছো আপু,, কখন বকলাম আমি ওকে ? কেমন ঢং শিখেছে দেখেছো ? কেমন মিথ্যে মিথ্যে নালিশ করছে আমার নামে !
শান্ত জেনির ফড়ে গলা ভারি করে বলে…
” চুপ করো রুহি,, তুমি ওকে সবসময় বকো কেনো ? ও বাচ্চা বলে কি কিছু বোঝে না নাকি ? আর ও তোমার নামে মিথ্যেই বা বলতে যাবে কেনো ?
রুহি শান্তর দিকে পিটপিট তাকিয়ে গাল ফুলিয়ে বলে…
” তাহলে কি আমি মিথ্যে বলছি ? কখনো মিথ্যে বলেছি আমি ?
” না না , তুমি মিথ্যে বলতে যাবে কেনো ? তুমি তো আমার সত্য বাদি যুধিষ্ঠির এর মহিলা ভার্সন । কিন্তু আমার বাবুই পাখিটাও তো কখনো মিথ্যে বলে না !
জেনির গাল টিপে আদুরে কন্ঠে কথাটা বলে শান্ত । জেনি গদগদ হয়ে হাসে । শান্তর কথায় রুহি দাঁত পিষে বলে…
” তাহলে থাকুন আপনি ওকে নিয়ে । আমি গেলাম !
বলেই বিছানা থেকে নেমে গটগট পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যায় রুহি । রুহি বেরোতেই শান্ত জেনি কে কোল থেকে নামিয়ে নিরিহ চোখে চেয়ে বলে….
” বসো বাবুই , আমি আসছি । তোমার আপি ক্ষেপে গেছে , কাজ বাড়লো আমার ‌ । তার রাগ ভাঙাতে হবে তো ।
বলেই কোনো রকমে ছুট লাগায় রুহির পিছু পিছু । মেহজাবিন মিটি মিটি হাসে ওকে দেখে । রুহি ঘরে এসে ধাম করে দরজা লাগিয়ে দিয়েছে । তবে ছিটকিনি লাগায় নি । খাটের উপর ধপ করে বসে । ওর ফোনটা ঘরেই রেখে গেছিলো । খাটের উপর থেকে সেটা হাতড়ে হাতে তুলে নেয় । ফোঁস ফোঁস করতে করতে কারোর নাম্বারে কল লাগায় । আবারো গটগট পায়ে গিয়ে দাঁড়ায় ব্যালকনিতে । ওপাশ থেকে ফোন রিসিভ হতেই রুহি চেঁচিয়ে বলে ওঠে…

” এতোক্ষণ লাগে কেনো তোর ফোন ধরতে ? কি করছিলি শুনি ? ফোন দিলে খোঁজ পাওয়া যায় না কেনো তোর ? কতক্ষন থেকে ফোন দিচ্ছি আমি তোকে ? ফোনের আওয়াজ কানে যায় না তোর ?
হঠাৎ রুহির এমন খেকিয়ে বলে ওঠা কথায় ভড়কে যায় মিহি । অবাকের ন্যায় ফোনের দিকে একবার তাকায় । ক্ষীন স্বরে বলে….
” কেবলই তো ফোন করলি । আর দুবার রিং হতেই ফোন রিসিভ করলাম । হঠাৎ এমন রেগে গেলি কেনো ?
” দুবার রিং হতেই ফোন রিসিভ করেছিস ? তার মানে তুইও বলছিস আমি মিথ্যে বলছি ? হ্যাঁ ?
যাহ , কথা বলতে হবে না তোকে আমার সাথে । আমিও তোদের কারোর সাথেই কথা বলবো না !
” আমি কখন বললাম তুই মিথ্যে বলছিস ? কি সব বলছিস পাখি ? কি হয়েছে বলতো তোর ? এমন করে কথা বলছিস কেনো ?
রুহি কিচ্ছু বলছে না । কানে ফোন রেখেই দাঁতে দাঁত পিষে নিরেট দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সামনের দিকে । ব্যালকনির দরজায় বুকে হাত গুটিয়ে হেলান দিয়ে দাড়িয়ে আছে শান্ত । একটা ভ্রু উঁচু করে ঠোঁট কামড়ে বাঁকা দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ।
রুহি ফুঁসতে ফুঁসতে চেয়ে আছে ওর দিকে । ঝট করে কান থেকে ফোনটা নামিয়ে কেটে দেয় । দু’পা এগিয়ে ঝংকার তুলে বলে….

” আমার ঘরে আসার পারমিশন কে দিলো আপনাকে ? একটা মেয়ের ঘরে আসতে গেলে নক করে আসতে হয় , এইটুকু কমনসেন্স নেই ?
শান্ত একটু লজ্জা পাওয়ার ভঙ্গিতে মাথা নামিয়ে ঠোঁট কামড়ে বলে…
” যাহ্ দুষ্টু,, বউয়ের ঘরে আসতে গেলে পারমিশন লাগে নাকি ? এমনিতেও কদিন পর এই বাড়িতে আসলে এই ঘরেই ঠাই হবে আমার ।
রুহি ভ্রু কুঁচকায় । একই স্বরে বলে….
” কোন কালের বউ হোই আমি আপনার ?
” কেনো, এই কালের !
আমি ছাড়া আর কে বিয়ে করবে তোমায় ?
রুহি অবহেলা পূর্ণ হাসে । মাছি তাড়ানোর মতো হাত নেড়ে বলে…
” এসেছে কোন হরিদাস পাল 🙄 । আপনি ছাড়া আরো কতজন আছে আমার জন্য । আপনি ছাড়াও…’ ময়ূরপঙ্খী ঘোড়ায় চড়ে, আসবে রাজপুত্র স্বর্গ ঘুরে ‘ ।
শেষের কথাটা সুর দিয়ে গানের ছন্দে বলে রুহি । একটু থেমে আবারো ভাবেলাশহীন বলে….
” আমার চিন্তা না করে আপনি বরং নিজের চিন্তা করুন । সেদিন একটু কাছ থেকে লক্ষ্য করে দেখলাম কয়েকটা চুল পেকেছে মাথার । বুড়ো হয়ে যাচ্ছেন, কে বিয়ে করবে আপনাকে ?
শান্ত সরু চোখে রুহির দিকে তাকায় । বাঁকা হেসে রুহির কথার তৎক্ষণাৎ জবাব দেয়…
” কেনো ? লিনা আছে তো ? এমনিতেও আম্মুর ওকে বেশ পছন্দ !

শান্তর খোঁচা মারা কথায় চেঁতে ওঠে রুহি । তবে বাইরে প্রকাশ করে না । বুকে হাত গুজে শ্বাস টেনে বলে…
” দুদিন আগে কোচিংয়ের বাইরে একটা ছেলে প্রপোজ করছিল আমাকে । কি সুন্দর ছেলেটা, কি কিউট, কি ইয়াং ! খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখেছি একটা চুলও পাকা নেই ওর । তবুও ঝুলিয়ে রেখেছি । ভাবছি কাল গিয়ে ‌এক্সেপ্ট করে নেবো ‌।
রুহির কথা শেষ হতেই তৎক্ষণাৎ ওর বাহু ধরে টেনে এক ঝটকায় দেয়ালের সাথে চেপে ধরে শান্ত । আচমকা কান্ডে ভড়কে যায় রুহি । রুহির দুদিকে দেয়ালে হাত ঠেসে রেখে রুহিকে আবদ্ধ করে শান্ত । অনেকটা কাছে এসে হিসহিসিয়ে বলে…
” কেঁটে ফেলবো একদম অন্য ছেলের কথা মুখে আনলে । You are only mine… Okay ? অন্য কোনো ছেলের কথা তোমার মুখে সহ্য করবো না আমি !
রুহিও একই স্বরে বলে….
” তাহলে অন্য কোনো মেয়ের কথা আপনার মুখে কি করে সহ্য করবো আমি ? আর ঐ লিনা আপুর কথা তো একদমই সহ্য করবো না । Okay ? Mind it….
রুহির jealousy দেখে শান্ত হেসে ফেলে । রুহির কপালের পাশে লেগে থাকা ছোট ছোট চুল গুলো আবেশে কানের পাশে গুজে দেয় ।

গালে হাত রাখতেই কেঁপে ওঠে রুহি । মেয়েলি অনুভূতিতে চোখ বন্ধ করে নেয় । শান্তর গরম ভারি শ্বাস আঁচড়ে পড়ছে রুহির স্নিগ্ধ মুখের উপর । শান্ত পলকহীন এক দৃষ্টিতে চেয়ে দেখছে তার রমনীকে । তার চোখ দুটো স্থির, তবে ধারালো । যা নিষ্পলক চেয়ে আছে রুহির দুধে-আলতা ফর্সা মুখশ্রীর পানে ।
শান্তর নিঃশ্বাস গাঢ় হতেই রুহি আচমকা মৃদু ধাক্কায় সরিয়ে দেয় শান্তকে । রুহির মৃদু ধাক্কাতেই শান্ত রুহির অবস্থা বুঝতে পেরে নিজে থেকেই সরে আসে ।
রাফি ঘরে আছে । রুহি একবার আড়চোখে রাফির ব্যালকনির দিকে তাকায় । চোখ নামিয়ে দ্রুত শান্তর সামনে থেকে সরে আসার জন্য পা বাড়ায় । শান্ত এখনো স্থির দৃষ্টিতে চেয়ে আছে । রুহি পা বাড়াতেই শান্ত বলে ওঠে….
” শোনো মিসেস হবু শাহরিয়ার শান্ত – আমি ছাড়া তোমার এই – হঠাৎ হঠাৎ রাগ, অভিমান, বোকা বোকা কথা-বার্তা , ছেলে মানুষি, পাগলামি , কেউ কিন্তু সহ্য করবে না !
রুহি থেমে ঘাড় ঘুরিয়ে পিছন ফিরে তাকায় । মিষ্টি হেসে বলে….
” শুনুন মি. শাহরিয়ার শান্ত – আমার সব রাগ অভিমান আপনাকেই সহ্য করতে হবে । কারণ আপনি ছাড়া কোনো পুরুষের উপর আমি কখনো এই রকম রাগ, অভিমান, ছেলে মানুষি, করবোই না । আমার যত রাগ অভিমান থাকবে, সব আপনার উপর । এটা শুধু আমার একান্তই অধিকার । আর অন্য মেয়েরা এই অধিকার থেকে সম্পুর্ন বঞ্চিত ।
বলেই ফিক করে হেসে এক দৌড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যায় রুহি । শান্ত রুহির যাওয়ার দিকে তাকিয়ে ঘাড় চুলকে হাসে ।

রাত সাড়ে আটটার দিকে খাবার টেবিলে বসেছে চৌধুরী বাড়ির দুই কর্তা । দুজনের মাঝেই ধীর কন্ঠে টুকটাক বিজনেস নিয়ে আলোচনা হচ্ছে । টেবিলের একদিকে রুহি, মেহজাবিন আর জেনি চুপচাপ বসে আপন মনে খাবার খাচ্ছে । বাড়ির দুই কর্তী খাবার বেড়ে দিচ্ছেন ‌। শান্ত আর রাফি এখনো নিচে নামেনি । ওদের অপেক্ষা করতে করতে সবাই বসে পড়েছে । খানিক বাদে দুজনে একসাথে নিচে নেমে আসে ‌। চেয়ার টেনে পাশাপাশি বসে দুজনে । শান্ত স্বাভাবিক দৃষ্টিতে একবার রুহির দিকে তাকায়,, ও মাথা নিচু করে খাচ্ছে ।‌ রাফি আর শান্ত বসতেই হেনা বেগম খাবার বেড়ে দেন ওদের প্লেটে । সবার মনযোগ খাওয়ার দিকে । রাশেদ রায়হান চৌধুরী প্লেটে হাত চালাতে চালাতে স্বাভাবিক কন্ঠে ছেলেকে ডাকেন….
” রাফি….
রাফি মাথা উঁচু করে আব্বুর দিকে তাকিয়ে উত্তর করে….
” জ্বি আব্বু !
রাশেদ রায়হান চৌধুরী রাশভারী কন্ঠে বলেন….
” ক’দিন আগে ব্যাংক থেকে ২৫ লক্ষ্য টাকা তুলেছিলে ‌। ব্যাংক থেকে জানানো হয়েছে আমাকে । মানছি নিজের অ্যাকাউন্ট থেকে তুলেছো, কি করেছো জিজ্ঞেস করবো না ।

বড় হয়েছো তুমি, আমাদের তোমার সব বিষয়ে নাক গলানো মানায় না । যা করবে ভেবে চিন্তে করবে ।
প্রতি উত্তরে রাফি কিছুই বলে না । মাথা ঝাঁকায় একটু ‌ । হেনা বেগম ভ্রু কুঁচকে তাকান ছেলের দিকে । রুহিও খাওয়া ছেড়ে মাথা তুলে তাকায় । রাশেদ রায়হান চৌধুরীর খাওয়া শেষ, তিনি হাত ধুয়ে সোজা উপরে চলে গেছেন । রোজ রোজ খাবার শেষে সোফায় বসে একটু আরাম করেন, গল্প করেন ভাইয়ের সাথে । তবে আজ হিতে বিপরীত । রাফিও কোনো রকমে একটু খেয়ে উপরে উঠে নিজের ঘরে চলে যায় । শান্ত আজ এখানেই থাকবে ।
পরদিন সকাল ১০ টায় কোচিং ছিল রুহির । রাফি আর শান্ত ৮ টার দিকে ব্রেকফাস্ট করে বাড়ি থেকে বেরিয়েছে ।
রোজকার মতো ড্রাইভার কোচিংয়ে নামিয়ে দিয়েছে রুহিকে । মিহির ক্লাসে পৌঁছাতে পৌঁছাতে দেরি হয়েছে একটু । ক্লাস শুরুর পর ক্লাসে ঢুকেছে । তাই আর ক্লাসের মাঝে রুহির সাথে কথা হয় নি । দুটো ক্লাস হওয়ার কথা থাকলেও একটা ক্লাসের পরেই ছুটি হয়ে যায় কোচিংয়ে ‌। ক্লাস থেকে বেরোতে বেরোতে মিহি চাপা স্বরে রুহিকে শুধায়….

” কাল ফোন করে কি সব বললি বলতো ? হঠাৎ ঝগড়ার মুডে চলে গেছিলি কেনো ?
” এমনি,, তেমন কিছু না ।
বাই দা ওয়ে ,, ভাবি জান চা খাবে ?
সহসা এদিক ওদিক তাকায় মিহি । রুহির কথা কেউ শুনতে পেলো না তো ? মিহি রুহির হাতে চিমটি কেটে গলা নামিয়ে নিচু স্বরে বলে…
” পাগল তুই ,, কি সব ভাবি জান,টাবি জান বলছিস আমায় । যদি কেউ শুনতে পায় কি ভাববে বলতো ?
” যে যা ভাবার ভাববে । আমার তাতে কি ?
আচ্ছা তোর কি আমার এই ভাবি জান ডাকটা পছন্দ হয়নি ? ওও বুঝেছি, আমার ভাইয়া শুধু তোমাকে জান ডাকতে পারবে তাই তো ? অন্য কেউ জান বললে তোমার গায়ে ফোস্কা পড়ে যাবে । ওকে ওকে বুঝেছি,, তাহলে ভাবি জান ডাকটা বাদ, এখন থেকে তুই আমার রাঙ্গা ভাবি । রাঙ্গা ভাবি বলে ডাকি ?
মিহি করুন চোখে ঠোঁট উল্টে তাকায় । মিরা আর রৌনক এসে দাঁড়িয়েছে ওদের পাশে । সোহেল আসে নি আজ । নাদিয়ার তো সেদিন থেকে খোঁজ নেই কোনো । তিন জনে গলি পেরিয়ে গিয়ে বসে সামনের চায়ের দোকানে ।
মিহি বলে….

” নাদিয়ার খোঁজ পেয়েছিস কোনো ? কালকে আমি ফোন দিয়েছিলাম, তবে পাই নি । ফোন বন্ধ ছিল ।
রৌনক বলে ওঠে…
” একে তো নাদিয়ার কোনো খোঁজ নেই । তার উপর আবার কাল থেকে এই সোহেলের ও কোনো খোঁজ নেই । ফোন দিচ্ছি সেটাও রিসিভ করছে না ।
মিরা বলে…
” সোহেলের তো কাল নাদিয়া দের বাড়িতে যাওয়ার কথা ছিল । ও যায় নি ?
” কি জানি , আর কথা হয় নি ওর সাথে ।
বলেই উঠে দাঁড়ায় রৌনক । সবার দিকে তাকিয়ে বলে..
” তোরা থাক,, আজকে আর চা খাবো না । তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরতে হবে ।
রৌনক চলে যায় । মিহি আর রুহির গাড়ি আসার সময় হয় নি এখনো । একটা ক্লাস হয়নি, তাই ওদের হাতে এখনো এক ঘন্টা সময় আছে ।
এক ঘন্টা পর গাড়ি আসবে । গাড়ি ছাড়া রুহির এক পা বাড়ানোর অনুমতি নেই ।
রুহি, মিরা আর মিহি মিলে টুকটাক গল্প করতে করতে চা শেষ করে ।
মিরাও চলে যায় খানিক বাদে । মিহি আর রুহি বসে আছে চায়ের দোকানের সামনে । মিহির জন্য ভাড়া করা রিকশাও আসবে একই সময়ে । এখনো আধা ঘন্টারও বেশি সময় আছে । দুজনে হাঁটতে হাঁটতে রাস্তায় নামে । দুটো আইসক্রিম কিনে নেয় । খেতে খেতে রুহি বলে…

” কি রে কিছু বললি না তো ?
” কি বলবো ?
” ঐ ,, আমার রাঙ্গা ভাবি ডাকটা পছন্দ হয়েছে তোর ?
মিহি দাঁড়িয়ে যায় । কোমরে হাত রেখে চোখ পাকিয়ে বলে…
” আবার শুরু করলি ?
” শেষ করতে চাইছি তো ! রেগে যাচ্ছিস কেনো ? বল না…
” তোর মুখে পাখি ব্যতীত অন্য কোন ডাক আমার পছন্দ নয় । তুই পাখি বলেই ডাকবি ।
” কিন্তু ভাইয়ার বউকে কেউ পাখি বলে ? এটা কেমন হয়ে গেলো না ?
মিহি কটমট করে তাকাতেই রুহি বোকা হেসে বলে…
” ইটস ওকে বেইবি,, আমি না হয় একটু ইউনিক ভাবে পাখি বলেই ডাকবো । তবে হ্যাঁ, মাঝে মাঝে কিন্তু ভাবী বলেও ডাকবো কিন্তু ।
মিহি তপ্ত শ্বাস ফেলে । এই মেয়েকে কিছু বলে লাভ নেই । দু’জনে আইসক্রিম খেতে খেতে ধীরে ধীরে একটু সামনের দিকে এগোয় । এডমিশনের বিষয়ে টুকটাক কথা বলে । এরমধ্যেই ওদের পেছনে রাস্তার ঠিক পাশে একটা গাড়ি এসে দাঁড়ায় । গাড়িটা অনেকটা কাছাকাছি দাঁড়ানোতে দু’জনে চমকে তাকায় পেছনে । গাড়িটা চিনতে অসুবিধা হয় না কারোরই ।
গাড়ি থেকে নেমে আসে শান্ত । ওদের সামনে এসে দাঁড়ায় । মিহিকে দেখে মুচকি হেসে বলে…
” কেমন আছো পাখি ?
” আমি ভালো আছি ভাইয়া,, আপনি ?
শান্ত দীর্ঘ শ্বাস ফেলে বলে…
” তোমার বান্ধবী আর ভালো থাকতে দিলো কোই !
শুনলাম দুদিন আগে তোমার পাখিকে নাকি একটা ছেলে প্রপোজ করেছে,, কে সে ? কোথায় পাবো তাকে ?
মিহি কপাল কুঁচকে রুহির দিকে তাকায় । রুহি ফ্যাল ফ্যাল করে অবিশ্বাস্য নয়নে তাকিয়ে আছে । মিহি শান্তর দিকে ফিরে বলে…

” কোই, তেমন তো কিছুই হয়নি !
শান্ত অবাক হয় । কিছুক্ষণের মধ্যেই রুহির চালাকি বুঝতে পেরে রাগি দৃষ্টিতে তাকায় রুহির দিকে । মিহি অবুঝ নয়নে চেয়ে আছে । রুহি শান্তর পানে চেয়ে দাঁত কেলিয়ে বলে..
” আমি তো এমনি এমনি বলেছিলাম । আপনি সিরিয়াসলি নেবেন, সেটা কে ভেবেছিল ?
মিহি কিছুটা বুঝতে পারে । শান্ত বুকের বাম পাশে হাত রেখে বলে…
” উফফফ…কাল থেকে বুকের উপর পাথর চেপে ছিল । You know.. কতো কি চিন্তা আসছিল আমার মাথায় ।
ভেবেছিলাম ওটাকে যদি একবার পাই, তাহলে ওর একটা হাড়-গোড় ও আস্ত রাখবো না । কিন্তু সেই ওটাই তো নেই । বেঁচে গেলো বেচারা…
রুহি অপ্রস্তুত হাসে । ভাগ্যিস শান্ত আর কিছু বলে নি । রেগেও নেই দেখে মনে হচ্ছে । মিহি রুহিকে বলে…
” ভাইয়া তো আসলো.. তাহলে তুই যা । আমার রিকশা এক্ষুনি এসে যাবে ।
” রিকশা না আসা পর্যন্ত থাকি ?
শান্তও তাল মিলিয়ে বলে..
” হ্যাঁ হ্যাঁ , তোমার রিকশা আসুক । তোমায় রিকশায় তুলে দিয়ে তারপর আমরা যাবো । নয়তো চলো আমি তোমায় পৌঁছে দিচ্ছি ।

” না না ভাইয়া । রিকশা তো রিজার্ভ করা , আসলেই আমি চলে যাবো । আপনারা যান । আমার অসুবিধা হবে না ।
” তোমার অসুবিধা না হলেও এরপর আমার অসুবিধা হবে পাখি । কি করে বোঝাই তোমায়, তোমাকে এখানে একা রেখে গেলে আমার আর একটা হাড়ও আস্ত থাকবে না । সে যে ছাড়বে না আমায় ।
মনে মনে বিড়বিড় করে শান্ত গলা ঝেড়ে বলে…
” সমস্যা নেই, আমরা দাঁড়িয়েই আছি ।‌ আসুক রিকশা.. ততক্ষন গল্প করা যাক ।
ওদের একটু আধটু গল্পের মাঝেই রিকশা এসে দাঁড়ায় ।‌ মিহি রিকশায় উঠে পড়ে ‌। শান্ত আর রুহিও গাড়িতে উঠে বসে ।
রাতে গ্রুপ কলে নাদিয়া এসেছিলো । নাদিয়া,রুহি, মিরা,রৌনক আর মিহি মিলে কথা বলেছে খানিকক্ষণ । সোহেল ছিল না । নাদিয়া কে সবাই বারবার কোচিংয়ে না আসার কারণ জিজ্ঞেস করেছে । কিন্তু ও বলে নি । শুধু বলেছে – কালকে সবাই যেন কোচিংয়ে আসে,ও সবাইকে কিছু বলতে চায় । যা বলবে সামনাসামনি বলবে । নাদিয়ার উত্তরে অসম্মতি দেখে কেউ আর কথা বাড়ায় নি । পরদিন সময়ের আগেই কোচিংয়ে এসেছে সবাই । তবে ক্লাসে যায় নি । রৌনক ধরে বেঁধে নিয়ে এসেছে সোহেল কে । সব দিনের মতোই ওদের আড্ডার আসর ঐ আইসক্রিম পার্লারের সামনে গিয়ে বসেছে । নাদিয়া আসে নি এখনো । ওরা সবাই অপেক্ষা করছে ওর জন্য । সোহেল গম্ভীর মুখে বসে আছে । ইতিমধ্যে ওকে অনেক প্রশ্ন জিজ্ঞেস করা হয়েছে, ও একটারও কোনো উত্তর করে নি ।
ওদের অপেক্ষার মাঝেই নাদিয়া আসে । হাতে একটা শপিং ব্যাগ আর পার্স । মুখে উৎফুল্ল হাসি । ওদের সামনে দাঁড়ায় ও । কেউ আগ বাড়িয়ে আর কোনো প্রশ্ন করে না । অনেক প্রশ্ন করেছে ওরা, কিন্তু উত্তর পায় নি । সবাইকে চুপ থাকতে দেখে নাদিয়া নিজে থেকেই বলে….

” সরি রে, আসতে দেরি হয়ে গেল । তবে বেশিক্ষণ থাকতে পারবো না বাইরে । বাসায় ফিরতে হবে তাড়াতাড়ি । কাজের কথায় আসি ?
সবাই ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন সূচক নয়নে তাকায় ওর‌ দিকে । নাদিয়া এক পলক সোহেল কে দেখে নেয় । আবারো হেসে হাতে থাকা শপিং ব্যাগ থেকে কয়েকটা কার্ড বের করে । সবার হাতে একটা একটা করে দিয়ে বলে….
” আগামী ২৯ জুলাই, শুক্রবার আমার বিয়ে । তোদের সবাই কে ইনভাইট করতে আসলাম ।
সবাই যেন আকাশ থেকে পড়লো । একে অপরের দিকে চাওয়া চাওয়ি করে আবারো তাকালো নাদিয়ার দিকে । সোহেলের ভঙ্গিমার কোন পরিবর্তন নেই । সে একই ভাবে মাথা নিচু করে বসে আছে । রুহি বিস্মিত নয়নে চেয়ে বলে….

” তোর বিয়ে মানে ? কি বলছিস তুই ? মজা করছিস ?
” এসব বিষয়ে মজা করার মেয়ে আমি নোই । তোরা সেটা খুব ভালো করেই জানিস ।
” তার মানে সত্যি ? কিন্তু হঠাৎ তোর বিয়ে কেনো ? সামনে আমাদের এডমিশন, এখনো রেজাল্ট দেয় নি । এর মধ্যেই এতো তাড়াতাড়ি বিয়ে ?
মিহির কথায় নাদিয়া বলে…
” সবটা ফ্যামিলি থেকে ঠিক করা হয়েছে । বলতে পারিস হঠাৎই বিয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে । ছেলে ইংল্যান্ডে সেঁটেল, বিয়ের পর আমাকেও নিয়ে যাবে সেখানে ।
রৌনক বলে ওঠে….
” ও তাহলে তো ভালোই ,, কনগ্রাচুলেশন !
” Thank you…
আচ্ছা শোন বেশি সময় নেই হাতে । আমাকে যেতে হবে । অনেক কষ্টে বাইরে বেরিয়েছি তোদের জন্য ।
রুহি, মিহি আর মিরা, তোরা কিন্তু দুদিন আগে আসবি । তোরা ছাড়া তো আমার আর তেমন কোনো ফ্রেন্ড নেই রে । না আসলে কিন্তু খুব খারাপ হয়ে যাবে বলে দিলাম । খুব মিস করবো তোদের ।
মিহি উঠে জড়িয়ে ধরে নাদিয়া কে । নাদিয়া মিহি কে ছেড়ে সোহেলের দিকে ফেরে, জড়ানো গলায় অপ্রস্তুত হেসে ডাকে….

” সোহেল….
সোহেল মাথা তুলে তাকায় না । আর না ডাকে সাড়া দেয় । নাদিয়া শ্বাস ফেলে বলে….
” তুই আমার অনেক আগের একটা ভালো বন্ধু । সবার আগে থেকেই পরিচয় তোর সাথে । বন্ধুত্বের সম্পর্কের চেয়ে ভালো আর কোনো সম্পর্ক হয় না । দাওয়াত রইল,, আসিস আমার বিয়ে তে । তুই না আসলে কষ্ট পাবো ।
কথাগুলো গড়গড় করে বলেই হাঁটা লাগায় নাদিয়া । কিছুদূর এগিয়ে আবারো ভরাট চোখে পিছন ফিরে তাকায় । সোহেলও এবার মাথা তুলে তাকায় । তবে নাদিয়ার সাথে দৃষ্টি মিলে গেলে মাথা নামিয়ে নেয় ও । নাদিয়া চলে যেতেই মিহি শ্বাস টেনে সোহেলের পাশে বসে ভারি কন্ঠে শুধায়…
” তোর কি হয়েছে বলতো ?
সোহেল উঠে দাঁড়ায় তৎক্ষণাৎ । কাঁধে ব্যাগ নিতে নিতে ভ্রু যুগল জড়ো করে বলে….
” কি আবার হবে ? কিছুই না !
মিহিও উঠে দাঁড়ায় একই সাথে । রুহি সোহেলের সামনে গিয়ে বুকে হাত গুটিয়ে বলে…
” তাহলে এমন দেখাচ্ছে কেনো তোকে ? ভেবেছিস আমরা কিছু বুঝি না ?
” সব বুঝিস তোরা ? সব ? তোরা মেয়েরা সব বুঝিস,তাই না ? আচ্ছা তোরা মেয়েরা এমন কেনো রে ? সব বুঝেও কেনো তোরা ছেলেদের অনুভূতি নিয়ে খেলিস বল আমায় , বল ?
শুনেছি, মেয়েরা নাকি ছেলেদের চোখের দিকে তাকালে তার মনে কি আছে সেটা বুঝতে পারে । একটা মেয়ের প্রতি একটা ছেলের অনুভূতি, আবেগ মেয়েরা সহজেই ধরতে পারে । তবুও কেনো তোরা এমন করিস ছেলেদের সাথে ? ছেলেদের অনুভূতির কি কোনো দাম নেই তোদের কাছে ?
বলতে বলতে গলা জড়িয়ে আসে সোহেলের । রাস্তার ধারে বসে পড়ে ও । মিহি, রুহি একে অপরের দিকে তাকায় । মিহি এগিয়ে বলে…

” তুই যে ওকে ভালোবাসিস , বা পছন্দ করিস, সেটা বলেছিস কখনো ?
” স্কুল লাইফ থেকে পরিচয় ওর সাথে । তুই কি ভেবেছিস, ও জানতো না ? ও কিছুই বুঝে না ?
ভালোবাসা কি শুধু স্বীকার করলেই প্রকাশ পায় ?
সোহেলের চোখ ভরে উঠেছে । রৌনক দূরে দাঁড়িয়ে দেখছে । ও জানতো সবটা । কিন্তু ওর কিছুই বলা বা করার নেই । মিহি আরো একটু এগিয়ে সোহেলের পাশে বসে । নিস্ক্রিয় হয়ে শ্বাস ফেলে বলে….
” অপ্রকাশিত ভালোবাসা সুন্দর । তবে প্রকাশিত ভালোবাসার চেয়ে নয় । কাউকে ভালোবাসলে সেটা যথা সময়ের মধ্যেই স্বীকার করতে হয়, প্রকাশ করতে হয়, নয়তো সেটা হারিয়ে যায়, আর নয়তো অন্য কারো হয়ে যায় ।
মেয়েরা নিজেদের অনুভূতির কথা কখনোই প্রকাশ করে না, তারা অপেক্ষায় থাকে ছেলেদের প্রকাশের জন্য ।
তুই তো নাদিয়া কে আমাদের থেকেও বেশি ভালো চিনিস , ওর চোখের ভাষা বুঝতে পারিস নি তুই ? বড্ড দেরি করে ফেলেছিস সোহেল ! নাদিয়া কেমন তুই জানিস,, ও ওর পরিবারের বিরুদ্ধে কখনোই যাবে না । এখন হয়তো আর কিছুই করার নেই । নাদিয়া মেনে নিয়েছে । তুইও মেনে নে ।

” পারবো না আমি…..
আমার জীবনের প্রথম আবেগ ছিল ও । কি করে ভুলবো আমি ওকে..?
বলতে বলতে দুহাতে মুখ ঢেকে কেঁদে ওঠে সোহেল । মিহি শান্তনার লক্ষ্যে সোহেলের কাঁধে হাত রাখে । রুহি, মিরা আর রৌনক পিটপিট করে তাকিয়ে আছে । রৌনক এগোতে এগোতে বলে ওঠে…
” ভুলতে তো হবেই ,, কি আছে তোর ? যা আছে তোর বাবার আছে । বর্তমান তোর কোনো যোগ্যতা নেই ।
শুনলি তো ওর ফিউচার হাসবেন্ড.. ইংল্যান্ডে সেঁটেল,, নিজের বিজনেস আছে । তার কাছে তুই তুচ্ছ । মানবে না তোকে কেউ ।
” কিন্তু আমার ভালোবাসা তো তুচ্ছ ছিল না রে…..

রাতে অন্ধকার ঘরে শুয়ে শুয়ে কোন এক দিকে নিশ্চল চেয়ে আছে মিহি ‌। নাদিয়ার করুন ভেজা চাহনি, আর সোহেলের কান্না মাখা মুখটা বারবার ভেসে উঠছে চোখের সামনে ।
বাড়িতে এসেই আব্বু আম্মুকে নাদিয়ার বিয়ের কথাটা বলেছে । শুনে স্বাভাবিকের ন্যায় খুশি হয়েছেন আজমাল হোসেন আর সাবিনা বেগম । নাদিয়ার কথা মতো বিয়ের দু’দিন আগেই ওদের বাড়িতে যাওয়ার কথাটাও বলেছে মিহি ‌। ফ্রেন্ড গ্রুপে প্রথম কারো বিয়ে । এড়িয়ে যাওয়া তো আর যায় না । সাবিনা বেগম আর আজমাল হোসেন ও অনুমতি দিয়েছেন । বাঁধা দেন নি তারা । তবুও মিহির মনটা ভালো নেই । সোহেলের কথা ভাবলেই মনটা খারাপ হয়ে যাচ্ছে ।
উদাস হয়ে ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়ায় মিহি । গরম পড়েছে বেশ । তবে একটু নরম বাতাস বইছে । কিছুক্ষণ ব্যালকনিতে নীরবে দাঁড়িয়ে থেকে আবারো ঘরে আসে ‌।
রুহি ফোন করেছে । মিহি আলতো হেসে ফোন রিসিভ করে…

” হুম পাখি…
বল ,, কি করছিস ?
” কিছু না । এই তো , তোর কথাই মনে পড়ছিলো । তাই ফোন করলাম আমার রাঙ্গা ভাবি কে । তা কি করছে আমার ভাইয়ার বউ ?
” আবার…?
” হুম….
Any problem..?
” হুম, অনেক প্রবলেম । তোকে বলেছি না, তুই আমাকে এসব বলে ডাকবি না । সবকিছু নিয়ে মজা করটা ঠিক না রুহি !!
” আমি মজা করলাম কোথায় ? আই এম সিরিয়াস..
তোকে তো আমার ভাইয়ার বউ বানাবোই ! মিলিয়ে নিস । আমার ভাইয়া যদি কাউকে বিয়ে করে তাহলে সেটা তোকেই করবে !
মিহি খানিক চুপ থেকে নিচু স্বরে বলে…
” বিয়ের জন্য রাজি করিয়েছিস বাড়িতে ?
রুহি লাফিয়ে উঠে গদগদ হয়ে বলে…

” আমার ভাইয়া তো রাজিই আছে । শুধু একবার হ্যাঁ বল বাড়িতে রাজি করাতে সময় লাগবে না ভাইয়ার ।
” আমার বাড়িতেও সবাই রাজি ।
রুহি অবাকের ন্যায় প্রশ্ন ছুড়ে….
” কি বলিস,, আঙ্কেল-আন্টি রাজি ? ওনাদের কেও বলে দিয়েছিস ? আরে বাহ্,, তুই তো দারুন ফাস্ট ।
” হুম,, বাসায় এসেই বলেছি । তাহলে কবে যাচ্ছি ?
” তোরা কেনো আসবি ? যাবো তো আমরা ? মেয়েরা কখনো ছেলেদের বাড়িতে বিয়ের প্রপোজাল নিয়ে আসে গাধা ? ছেলেদের বাড়ি থেকেই যেতে হয় !
লজ্জা সরমের মাথা খেয়েছিস নাকি ‌? জানিস না কিছু ?
মিহি কপাল কুঁচকে বলে…

” কি বলছিস বলতো ? কিসের বিয়ের প্রপোজাল ? আর কি ছেলে মেয়ে, পাগল হয়ে গেছিস ,,এসব কি বলছিস ?
” কেনো,, তুই তো বললি আঙ্কেল আন্টি রাজি ?
” হুম রাজি তো । নাদিয়ার বিয়ের দু’দিন আগে ওদের বাড়িতে যাওয়ার জন্য রাজি করিয়েছি আব্বু আম্মুকে ।
রুহি চুপসে যায় । হাই তুলে নিরিহ কন্ঠে বলে…
” ওও ,, তুই নাদিয়ার বিয়ের কথা বলছিলি ?
” হুম, কেনো ? তুই কি ভেবেছিলি ?
” নাহ, কিছু না !
ভারী শ্বাস ফেলে বলে রুহি । মিহি প্রশ্ন করে..

এক দেখায় পর্ব ২০

” কবে যাচ্ছি ?
” ভাইয়া এখনো বাড়ি ফেরে নি । আগে ভাইয়া কে বলতে হবে । আসুক আগে,, তার পর জানাচ্ছি ।
” আচ্ছা,, তাহলে রাখি এখন ? মনে করে জানিয়ে দিস আমায় !
” আচ্ছা পাখি,, উফস সরি ভাবি । আল্লাহ হাফেজ !
মিহি রাগে না । বরং কপাল কুঁচকে একটু হেসে ফোন রেখে দেয় ।

এক দেখায় পর্ব ২২