রাজনীতির রংমহল ৩ পর্ব ৪৬
সিমরান মিমি
আজ উনত্রিশ দিনে পড়লো। পরশ এখন মোটামুটি সুস্থ। শরীরের ক্ষতগুলো শুকিয়েছে প্রায়। নিজে থেকে উঠে দাঁড়ানোও যায়। তবে বেশিক্ষণ হাঁটলে মাথার মধ্যটা চক্কর দেয়। শরীরটা দূর্বল হয়ে পড়ে। ডক্টর বলেছেন আরো পনেরোদিন অবজারভেশনে থাকতে। পিয়াশা শিকদার প্রেমাকে নিয়ে আজ পিরোজপুরে ফিরেছেন। আমজাদ শিকদারও এসেছেন তাদের সাথে। তবে পাভেল এবং আলতাফ শিকদার রয়ে গেছেন। পরশের সম্পুর্ন দেখভাল থেকে শুরু করে ওয়াশরুমে নিয়ে যাওয়া পর্যন্ত প্রত্যেকটা কাজে পাভেলের সাহায্য দরকার। তবে এখন আর ততটা লাগছে না। এইতো খানিকক্ষণ আগেই ছেলেটা দৌঁড়েছে ওষুধ আনতে। ডক্টর মাথা যন্ত্রণার জন্য ওষুধ দিয়েছে। আমজাদ শিকদার হোটেলে গেছেন। খেতে।
নিস্তব্ধ, একাকী কেবিনে হঠাৎ ফোনের রিংটোন বেজে উঠলো। এইতো আজ সকালেই দীর্ঘদিন পর ফোনটা হাতে নিয়েছিলো পরশ। অথচ ফোন পুরো সুইচ অফ। চার্জ নেই মোটেও। সেজন্যই চার্জে রেখেছিলো। রিংটোনের আওয়াজ পেয়ে বেড থেকে নেমে ফোনের কাছে গেলো। অচেনা নাম্বার। এর আগে কখনোই কল আসেনি। কৌতূহল বশত রিসিভড করে কানে তুলে হ্যালো বলতেই একটা মেয়েলি কন্ঠের আওয়াজ পাওয়া গেলো। স্বর টা অত্যন্ত পরিচিত।
– অবশেষে ফোন টা অন করলেন!
দীর্ঘশ্বাসের সাথে আওয়াজটা এসে কানে ধাক্কা খেলো। এক নিমিষেই অপরিচিত নারীকে চিহ্নিত করে ফেললো পরশ। বললো,
অবশেষে মনে পড়লো আমায়?
ফিরতি প্রশ্নে মনঃক্ষুন্ন হলো স্পর্শী। পরক্ষণেই মানিয়ে নিলো নিজেকে। এই অসুস্থ লোক তো আর তার আহাম্মক ভাইয়ের কাজকর্ম জানে না! অভিমান করাটাই স্বাভাবিক। তাই আর কড়াভাবে কিছু বললো না। নমনীয় স্বরে জিজ্ঞেস করলো,
– শরীর কেমন এখন?
– ভালো। তা এটা কি নতুন নম্বর?
– হ্যাঁ, আগেরটাতো ব্লক করে দিয়েছে আপনার ভাই।
পরশ কপাল কুঁচকালো। বুঝে উঠতে না পেরে জিজ্ঞেস করলো,
– ব্লক করেছে মানে?
স্পর্শী লুকালো না। সমস্ত ক্ষোভ উগড়ে দিয়ে একপ্রকার নালিশ করলো। বললো,
– আপনার ছোটোভাই ভেবেছে এই এক্সিডেন্ট আমি করিয়েছি। আমার সাথে থাকলে আপনার প্রাণসংশয় হবে। তাই কোনোভাবে যেনো যোগাযোগ না করি সে জন্য শাসিয়েছে। এমনকি তার এবং আপনার দুজনের ফোন থেকেই আমায় ব্লক করেছে! বুঝেছেন?
পরশ এতোক্ষণে ধাতস্থ হলো। পাভেলের কাছে এইজন্যই স্পর্শীয়াকে নিয়ে কোনো কথা ছোঁয়ানো যেতো না। তার পূর্বেই সে খ্যাচখ্যাচ করে উঠতো। তবে এসব ভেবে রাগ হলো না পরশের। সে হাসলো। প্রাণখোলা হাসি। বললো,
– এ কদিনে ভীষণ খেটেছে বেচারা। ভয় পেয়ে গেছিলো আমায় নিয়ে। রাগের মাথায় করে ফেলেছে এসব।
– হুম।
– পায়ের ব্যথা সেরেছে?
স্পর্শীয়া চমকে উঠলো। তার ব্যথার কথা স্মরণ আছে পরশের? ভাবতেই ভালো লাগায় ঝিমিয়ে উঠলো শরীর। আনমনেই ঠোঁটে হাঁসি ফুটলো। রয়েসয়ে বললো,
– হুম।
থেমে ভাঙা ভাঙা স্বরে জানতে চাইলো,
ফিরবেন কবে?
পরশ ঠোঁট টিপে হাসলো। বললো,
– বাহ! মিস করছো বুঝি?
ঘোরতরভাবে অসম্মতি জানালো স্পর্শীয়া।
– উহু! একটুও না। আমি তো ব্যস এমনি জানতে চাইছি।
ভাঙবে তবু মচকাবে না। পরশ নিজেও আর জোর করলো না। যে যেভাবে বুঝতে পারবে, তাকে সেভাবেই বুঝাবে। সেজন্যই হঠাৎ মিহি স্বরে বললো,
– খুব তাড়াতাড়ি’ই আসবো। এমনিতেও বাড়ি থেকে ভীষণ প্যারা দিচ্ছে। তাদের ধারণা আমি তোমার সাথে প্রেম করতে বেরিয়েছিলাম। আর সেজন্যই বিপদটা ঘটেছে। এই দূর্ঘটনা যেনো দ্বিতীয়বার না ঘটে তাই বিয়েও দিবে দ্রুত। ওই যে তানিয়া, যে তোমার কাছে গিয়েছিলো। ওকে পছন্দ হয়েছে সবার। সবাই ভাবছে, ও আমার বউ হয়ে আসার একদিনের মধ্যে তোমায় ভুলে যাবো। আমিও ভাবছি তাদের ভাবনা সত্যি করবো। যেহেতু তুমি আমায় পছন্দ করোই না, তাই আর জোরও করবো না। যা পরিস্থিতি তাতে আর না আগানোই বেটার। কি বলো?
স্পর্শীর হাস্যোজ্জ্বল মুখটা ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়ে গম্ভীর হয়ে উঠলো। আচমকা এই সুক্ষ্ম আঘাতটা বেশ মনে লেগেছে। সে আর বাঁধ সাধলো না। ছোট্ট করে বললো,
– হ্যাঁ, এটাই ঠিক হবে। তাছাড়া, মেয়েটাও সুন্দর। ওর সান্নিধ্য পেলে আমায় ভুলতে দু মিনিটও লাগবে না।
পরশ হাসতে ভুলে গেলো। স্পর্শী ইতোমধ্যেই কল কেটে দিয়েছে। কি অদ্ভুত! মেয়েরা কি এমন তাঁরকাটাই হয়? ভেতরে ভেতরে একদম শেষ হয়ে যাবে তবুও মাথা নোয়াবে না।
কল কাটার পর প্রথম কয়েক মিনিট ক্ষোভে ফেটে পড়লো স্পর্শীয়া। কি করে পারলো বিয়ের কথা বলতে! এই তার ভালোবাসা? একটা এক্সিডেন্টেই সব শেষ! যেখানে দূর্ঘটনার পর স্পর্শীয়ার মন নরম হয়েছে, সেখানে বিপরীত প্রান্তের লোক প্রেম-ট্রেম ভুলে বিয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছে। হুদাই এতো নাটক!
প্রায় দশ মিনিট পর স্পর্শীর হুশ ফিরলো। বিশ্বাস হলো না পরশের কথা। সে কি স্পর্শীয়াকে ইচ্ছে করে চেক করছিলো? ইশশ! এভাবে হুট করে কল কেটে দিয়ে ভীষণ বাচ্চামো করে ফেলেছে স্পর্শী। কি ভাবলো ওই লোক? এটাই তো যে স্পর্শীয়া জেলাস। ধ্যাত! ভাল্লাগেনা!
পুরো পিরোজপুর জুড়ে আজ আমেজ! ছেলেপেলেরা উৎফুল্ল হয়ে অপেক্ষা করছে নেতাকে বরণ করার জন্য। দূর্ঘটনা ঘটেছে আজ উনপঞ্চাশ দিন। সুস্থ হয়ে একেবারে পায়ে হেঁটে বীরের বেশে ফিরেছে নিজ এরিয়ায়। তবে বেশিক্ষণ সকলের সামনে দাঁড়ালো না। পাঁচ মিনিটের জন্য দেখা দিয়ে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হলো। সূদুর ঢাকা থেকে এসেছে। এতোটা জার্নি করার ফলে শরীর বড্ড ক্লান্ত।
স্পর্শীয়া এখনো স্বাভাবিক ভাবে হাঁটতে পারে না। একটানা পাঁচ মিনিট হাঁটলে অথবা দাঁড়িয়ে থাকলে ভীষণ ব্যথা হয়। হাঁড়গুলো যেনো মড়মড় করে ওঠে। এ কদিনে পরশের সঙ্গে খুব একটা কথা বলা হয়নি। যতটুকুও বা হয়েছে তাও মেসেজে। শুধুমাত্র অসুস্থতার বিষয়ে। স্পর্শীয়া অবশ্য ইচ্ছে করেই অযাচিত কোনো আলাপ করেনি। পরশ নিজেও জোর করেনি।
তবে আজকের মনোভাব ভিন্ন। দীর্ঘ দিন পর ফিরে এসেছে লোকটা। অকারণেই তাকে দেখতে ইচ্ছে করছে ভীষণ। কিন্তু যেতে পারছে না। এই মুহুর্তে সদরে যাওয়া উচিত হবে না। গেলে বাড়িসুদ্ধ সকলে ভীষণ রাগ করবে। অগত্যা বাধ্য হয়ে বেশ কিছু সাংবাদিকদের ফেসবুক পোস্ট দেখলো। যেখানে গাড়ি থেকে বের হওয়া পরশকে দেখা যাচ্ছে। ইশশ! লোকটা কি শুকিয়ে গেছে? মুখে কেমন দাগ। কপালের কাছটাতে সেলাইয়ের স্বচ্ছ দাগটা স্পষ্ট। গায়ের রঙটাও বেশ কালো হয়ে গেছে। তার শ্যামসুন্দর পুরুষটা এখন শ্যামকালো হয়ে গেছে। ভিডিওটা দেখার পর স্পর্শীর সাধ দ্বিগুণ বাড়লো। কিছুতেই ক্ষান্ত হতে পারলো না। নিউজটা এক ঘন্টা আগের। সে তৎক্ষণাৎ পরশের ফোনে কল করলো। দু তিন বার রিং হওয়ার পর রিসিভড হলো। কিছুটা ক্লান্ত এবং ঘুম ঘুম ভাব নিয়ে পরশ বললো,
– ঘুমোচ্ছি তো।
স্পর্শীর মায়া হলো। কিন্তু নিজের চাহিদা টুকুও আটকে রাখতে পারলো না। বললো,
– আমার আপনাকে খুব খুব দেখতে ইচ্ছে করছে।
একমুহূর্তের জন্য পরশের ঘুম উবে গেলো। বললো,
– এখনই আসতে হবে?
খানিকক্ষণ ভাবলো স্পর্শী। লোকটা ঘুমাচ্ছে। অসুস্থ শরীর নিয়ে এতোটা জার্নি করে নিশ্চয়ই ক্লান্ত। এক্ষুনি এই জেদটা দেখানো উচিত হবে না। অনেকটা রয়েসয়ে শেষ মেষ বললো,
– নাহ! সন্ধ্যার পর আসুন। অবশ্য আপনার আসতে হবে না। আমিই চলে আসবো।
পরশ মৃদু হাসলো। ঘুম ঘুম কন্ঠে জানতে চাইলো,
– কাজিকে কি এখনই ডেকে রাখবো?
– ধ্যাত! ফাজলামো করবেন না। আমি আপনার বাড়িতে আসছি না। আপনি সন্ধ্যাবেলায় হেঁটে কিছুটা সামনে আসবেন। ঠিক আমবাগানের ওখানটায়। আমি ওখানেই থাকবো। এখন চুপ করে ঘুমান। রাখছি।
মাগরিবের আজান দিচ্ছে। বাইরে এখনো ঘুটঘুটে অন্ধকার নামে নি। আবছা আলো রয়ে গেছে। তবে রাত সবে যে শুরু হয়েছে, তা বোঝা যাচ্ছে না। আজানের সঙ্গে সঙ্গেই আলো জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে সারাবাড়িতে। উঠোনের দুপাশ এবং গেটেও জ্বলছে চড়া আলো। ঠিক আর দশ পনেরো মিনিট পর বাড়ির সকলে ড্রইংরুমে আসবে। একটু চা, স্নাক্স এবং হালকা আলাপ – আলোচনা করার জন্য।
স্পর্শী রিক্স নিলো না। সবাইকে দেখিয়ে দেখিয়ে এই ভর সন্ধ্যায় বাড়ি থেকে বের হয়ে ঝামেলা পোহাতে চায় না। যা হওয়ার তা এসে দেখা যাবে। সেজন্যই সকলের অনুপস্থিতে আস্তেধীরে বেরিয়ে গেলো বাইরে। উঠোনের একপাশে গ্যারেজ। তার পাশেই রয়েছে ছোটো ছোটো তিনটি ঘর। ড্রাইভার, দারোয়ান এবং মালির জন্য তা বরাদ্দ। স্পর্শী সোজা ড্রাইভারের রুমের সামনে গেলো। দরজায় আলতো টোকা দিয়ে ডাকলো,
– চাচা, বের হতে হবে—আসুন।
মোতালেব ঘুমিয়েছিলো। মেয়েলি কন্ঠস্বর পেয়ে চোখ ডলতে ডলতে বেরিয়ে এলো। বললো,
– কোথায় যাইবেন আম্মা?
– দেখিয়ে দিচ্ছি। চলুন।
ড্রাইভার বাধ সাধলেন। বললেন,
– সন্ধ্যার পর তো বড় স্যার পার্টি অফিসে যাবে। আমারে যদি না পায়……
স্পর্শী খানিক ভাবলো। পরক্ষণেই তাড়া দিয়ে বললো,
– তাড়াতাড়ি ফিরবো। চলুন।
অবশেষে বাড়ির গাড়ি নিয়েই শিকদার বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা করলো স্পর্শী। তার যাওয়ার কথা না জানলেও গাড়ির আওয়াজ পেয়েছে শামসুল। তিনি খানিক অবাক হয়ে নিচে নামলেন। বাড়ির গাড়ি নিয়ে কে বেরিয়েছে? — এই প্রশ্নের উত্তর তার কাছে নেই। রুহান, রিহান দুজনেই নিজেদের বাইকে চলাফেরা করে। তবে কি আমজাদ? কিন্তু তাকে না নিয়ে সেই বা এই ভর সন্ধ্যায় কোথায় গেলো?
শিকদার বাড়ির অনেকটা কাছাকাছি এসে গাড়ি থামাতে বললো। ড্রাইভারকে সেখানে রেখে স্পর্শী ধীর পায়ে এগিয়ে গেলো আরেকটু সামনে। দূর থেকে পরশের অবয়ব দেখা যাচ্ছে। লোকটা বড়সড় একটা আম গাছের গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কিছুক্ষণ পর পর ব্যস্ত হাতে মশাও মারছে। স্পর্শী দ্রুতপায়ে কাছে গেলো। কিছুটা মলিন কন্ঠে বললো,
– ইশশ! অনেকক্ষণ ধরে বুঝি অপেক্ষা করাচ্ছি।
পরশ মৃদু হেসে বললো,
– যেটুকু রক্ত অবশিষ্ট ছিলো, তাও শালার মশারা খেয়ে নিয়েছে।
– আপনি রাস্তায় কেনো দাঁড়াননি!
পুণরায় ঠাস করে পায়ের উপর কামড় দেওয়া মশাটাকে মারলো পরশ। বললো,
– তুমি তো বলেছিলে এখানে দাঁড়াতে।
স্পর্শী বিস্ময়াবিষ্ট হয়ে তাকিয়ে রইলো। লোকটা তার কথা অক্ষরে অক্ষরে মেনে নিচ্ছে। সাদা টিশার্ট পড়েছে পরশ। যার দরুন গায়ের রঙটা একটু বেশিই চাপা লাগছে। অন্ধকারে এতোকিছু বোঝা গেলো না। মেইন রোডে বের হবে এমন সময় হুট করেই ফোনের টর্চ জ্বালালো পরশ। সরাসরি স্পর্শীয়ার মুখের সামনে ধরে তাকে দেখলো। কিছুক্ষণের জন্য থমকে গেলো মেয়েটা। লজ্জা পেয়ে এদিক সেদিক তাকালো।
পায়ে কি খুব লেগেছিলো?
পরশের প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে স্পর্শীর দম বন্ধ হয়ে এলো। কিছুই বলতে পারলো না গুছিয়ে। আচমকা ফোন টেনে আলোটা পরশের মুখের উপর ধরলো। মুহুর্তেই কপালের কোনার কাঁচা সেলাইটা দৃশ্যমান হলো। দাগ গুলো যেনো এখনো তাজা। ঠোঁটের কোনাতেও অবশ্য আরেকটা চোটের দাগ আছে। তবে তা তুলনামূলক ছোটো। স্পর্শী কাঁপা আঙুলে ছুয়ে দিলো সেই ক্ষতর দাগ। আঙুল দুটো যখন পরশের ঠোঁটের কোনায় এসে থামলো। তখন ভীষণ অপ্রত্যাশিত একটা ঘটনা ঘটে গেলো। নির্লজ্জ এমপি আচমকাই স্পর্শীকে শক্ত বাধনে আবদ্ধ করলো। বেহায়ার চুড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে ঠোঁটে চুমু খেয়ে ফেললো। সারা শরীর ঝিমঝিম করে উঠলো স্পর্শীর। ফোন হাত থেকে পড়ে গেলো মাটিতে। মুহুর্তটা অদ্ভুত! যেনো নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছে সে। একটা পুতুলের ন্যায় পরশ যা করছে, চুপ করে তা হজম করছে। ঠোঁট ছেড়ে স্পর্শীয়ার মাথাটা ঠিক বুকের বাঁ পাশটায় চেপে ধরলো। ফিসফিস করে অবিশ্বাস্য কন্ঠে বললো,
– বুঝিনি তোমায় এভাবে ছুঁয়ে দেখতে পারবো। ভেবেছিলাম, এই বুঝি মৃত্যু হলো!
স্পর্শী চেতনা ফিরে পেলো। আলগোছে পরশকে ছাড়িয়ে মাথা নিচু করলো। দম বন্ধ করা কন্ঠে ভাঙা ভাঙা শব্দে বললো,
– আমি বা ড়ি তে যা ব।
এরপর আর তাদের মধ্যে কথা হলো না। দুজনেই ধীর পায়ে বেরিয়ে এলো চিকন রাস্তা ধরে। একে অন্যের দিকে তাকাতেও পারলো না। ঠোঁট দুটো ঝিম ধরে আছে স্পর্শীর। লজ্জা লাগছে, কান্না পাচ্ছে, আবার খারাপও লাগছে না। পরশ নিজের কার্যের জন্য মোটেও অনুতপ্ত নয়। বরং সে মিটিমিটি হাঁসছে। কিছুক্ষণ পর পর মাথা তুলে স্পর্শীর রিয়াকশন দেখছে। তারা যখন মেইন রোডে পা ফেললো। তখন’ই অন্ধকারের মধ্যে একটা পুরুষালি অবয়ব দেখা গেলো। অবয়ব টা ক্ষিপ্ত পায়ে এগিয়ে এসে স্পর্শীর হাত শক্ত করে চেপে ধরলো। তেজী কন্ঠে বললো,
বার বার বারণ করার পরেও তোর সাহস কি করে হয় এখানে আসার?
যে হাতে ব্যথা ছিলো, সেই হাতটা ধরেই স্বজোরে ঝাকুনি মারলো সোভাম। ফলস্বরূপ আঁতকে উঠলো স্পর্শী। ব্যথায় চেচিয়ে উঠলো। পরশ হতবাক হয়ে গেলো। কিন্তু ভাই বোনের মধ্যে আসা উচিত হবে কিনা বুঝতে পারলো না। তবুও নিজেকে সংযত করে মৃদুস্বরে বললো,
ওর হাতে কিন্তু ব্যথা!
সোভাম চিলের ন্যায় সুচালো দৃষ্টিতে পরশের দিকে চাইলো। আজ অসুস্থ বলে পার পেয়ে গেলো। নাহলে ইতোমধ্যে ন্যুনতম কয়েকটা ধাক্কা হলেও মারতো। মুখের আকৃতি এতোক্ষণে বিকৃ্ত করে দিতো ঘুষি মেরে। কিন্তু তা সে করলো না। বাধ্য হয়ে সম্পুর্ন ক্ষোভ কন্ঠে তুলে ধরলো। শাসিয়ে বলে উঠলো,
– খবরদার পরশ, আমার বোনকে দাবার গুটি বানাতে এসো না। আমি কিন্তু তোমার জীবন ধ্বংস করে দেবো। আমি শামসুল সরদার নই যে শত্রুকে আধমরা বানিয়ে ছেড়ে দেবো। আমি যাকে একবার ধরবো — তার শেষ নিঃশ্বাস নেওয়া পর্যন্ত একচুলও ছাড়বো না।
স্পর্শী হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করলো না। সে তো চলেই যাচ্ছিলো। লাস্ট মোমেন্টে সোভাম এসে পড়লো। অবশ্য তার খারাপ লাগছে না। বরং তৃপ্তি পাচ্ছে। ভাইটাকে জ্বালাতে তার বড্ড ভালো লাগে। সে তীর্যক কন্ঠে বললো,
– এসব কি ধরণের কথা ভাইয়া? একদম এভাবে কথা বলবি না ওর সাথে!
সোভাম স্তব্ধ হয়ে স্পর্শীর দিকে চেয়ে রইলো। চোখের পলক পড়ছে না। তার চড়ুই বাইরের একটা ছেলের জন্য তাকে ধমক মারলো! সে বিধ্বস্ত চোখে একবার পরশ এবং একবার বোনের দিকে তাকিয়ে রইলো। আর দাঁড়ালো না স্পর্শী। দৃঢ় পায়ে এগিয়ে এসে গাড়িতে বসলো। এরপর সোভামের উদ্দেশ্যে বললো,
রাজনীতির রংমহল ৩ পর্ব ৪৫
– তুই কি বাড়িতে যাবি?
স্পর্শীর ইশারা পেয়ে ইতোমধ্যে পরশ এগিয়ে গেলো গেটের দিকে। এখন সোভাম একা দাঁড়িয়ে। খানিকক্ষণ ক্ষোভে ফুসলো। এরপর থমথমে পায়ে গাড়ির ভেতরে এসে বসলো।
