Home এক দেখায় এক দেখায় পর্ব ৪০

এক দেখায় পর্ব ৪০

এক দেখায় পর্ব ৪০
সুরভী আক্তার

রাফি ওভাবে একই অবস্থায় থেকে শান্তর কথায় হাসলো অল্প । চোখ মেলে একেবারে দৃষ্টির সম্মুখে ভীষণ কাছ থেকে দেখলো তার ব্লোসোমের অবচেতন চেহারা খানা । ঘামের সূক্ষ্ম বিন্দু কণা নাকের ডগায় চিকচিক করছে । রাফি একটু মাথা তুলে বৃদ্ধা আঙ্গুলের আলতো স্পর্শে মাহির নাকের ডগায় জমে থাকা বিন্দু কণা অতি সন্তর্পণে মুছে দিলো । নিজেকে সংযত করতে অক্ষম হলো, না চাইতেও ওষ্ঠাধরের স্পর্শ আকলো সেখানে । শান্ত লাজুক ভঙ্গিতে চোখ সরালো , উঠে দাঁড়িয়ে দরজার দিকে এগোতে এগোতে মেকি স্বরে বললো…

” চালিয়ে যাও শালা বাবু । তোমারই তো সময় । আমার ও আসবে এই সময়টা । আপাতত তোমায় ডিস্টার্ব না করি । কন্টিনিউ করো তুমি ..
আমি আসি । এসব দেখলে আবার আমার লজ্জা লজ্জা লাগে ।
বলতে বলতে বেরিয়ে গেল শান্ত । দরজার সম্মুখে মুখোমুখি হলো লিনার । মুখখানা চুপসানো ওর । এতক্ষণ অংক মেলাতে না পেরে আহম্মক বনে ছিলো । বাইরে ছিলো ও । শান্ত কে দেখে জোর পূর্বক হাসার চেষ্টা করলো । মেকি আন্তরিকতা দেখিয়ে বললো…
” ভালো আছেন ভাইয়া ?
শান্ত চোখ সরু করে লিনা কে আগা গোড়া পরখ করলো । মাথায় দুষ্টু বুদ্ধি খেলতেই ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটলো ওর । শান্ত টিপ্পনি মারলো নিজেই নিজেকে । হেসে হেসে বললো..
” আমি ভালো আছি লিনা । তুমি কেমন আছো ?
” জ্বি ভাইয়া , ভালো । আচ্ছা একটা কথা বললেন ?
” একটা কথা বলি না আমি । বললে অনেক গুলো কথা বলি ! আমার মুখ একটা কথায় থামে না । তাই সরি,, একটা কথা বলতে পারবো না আমি ।
ভ্যাবাচ্যাকা খেলো লিনা । দৃষ্টি সরিয়ে বললো…

” না মানে ,, একটা প্রশ্নের উত্তর দিন । আচ্ছা ঐ মেয়েটা মিহি, নাকি মাহি ? দেখতে তো একই ! রাফি বললো মিহি নয়, আবার ডাকলো মিহি বলে । আমার না সবকিছু কেমন গুলিয়ে যাচ্ছে !
” গুলিয়ে যাচ্ছে ? তো সেই গুলিয়ে যাওয়া চিন্তা ভাবনা ঢোক গিলে – গিলে ফেলো । তোমায় অতো ভাবতে হবে না । আসো আমরা একটু ক্লোজ হোই !
লিনার দিকে এক পা এগিয়ে একটু ঝুঁকে ঠোঁট বাঁকিয়ে কথাটা বললো শান্ত । লিনা ঝট করে চোখ তুলে ছিটকে এক পা সরলো । বড় বড় চোখে চেয়ে অতর্কিত স্বরে বললো…
” মানে ?
শান্ত পেছালো । ভাবভঙ্গি পাল্টে গলা খাঁকারি দিয়ে বললো…
” মানে… ছোট বেলা থেকে ইচ্ছে ছিলো আমার একটা বোন থাকবে । কিন্তু কি আর করার , বোন তো আর হলো না । এখন তোমাকে দেখে ভীষণ বোন বোন ফিলিংস আসছে বিশ্বাস করো । আজ থেকে আমি তোমার ভাই আর তুমি আমার বোইন । আয় বোইন বুকে আয়…
লিনা বৃহৎ নয়নে ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে আছে । শান্ত একটু থামলো । ঢোক গিলে শুধরে নিলো নিজের কথা…
” না না ,, থুক্কু … বুকে আসতে হবে না । আয় বোইন তোর লগে একখান সেলফি তুলি ।
লিনার অবাকের ন্যায় অবিশ্বাস্য বিস্মিত হয়ে চেয়ে থাকার মাঝেই শান্ত ওর একটু কাছাকাছি দাঁড়ালো । পকেট থেকে ফোন বের করে ক্যাচ ক্যাচ করে সেলফি তুললো দুটো ।
অতঃপর দূরত্ব বাড়িয়ে স্বাভাবিক হয়ে বললো…

” যা বোইন ,, বাড়ি যা..
সাবধানে যাইস , কেমন ?
লিনা তাজ্জব । মুখ গোল করে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ । শান্ত ওকে তুমি বলে সম্বোধন করে নি কোনো দিন । আজ প্রথম,তাও আবার পরবর্তীতে একেবারে তুমি থেকে তুই ? তাও বোন পাতিয়ে ? চোখে পলক পড়ছে না লিনার… মুখখানা হাঁ হয়ে প্রসস্থ ।
শান্ত ওকে ওভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে ফের বললো সিরিয়াস ভঙ্গিতে…
” বড় ভাইয়ের দিকে এমনে তাকায় থাকতে নাই বোইন । শেষে পাতানো বোইন হিসেবে পাতানো ভাইয়ের প্রেমে পড়লে জাত যাবে আমার । এই বয়সে এসে একটা বোইন পাইলাম । আমার দিকে ভাইয়ের নজরে তাকাইবি খালি । কেমন ? যা ,, এখন বাড়ি যা…
লিনার মুখ সংকুচিত হলো । ঢোক গিললো ও । শান্ত এমন বাঁচাল ও জানে । তাই আর কথা বাড়ালো না । মিনমিন করলো…

” রাফি ? ওনার সাথে একবার দেখা করে আসি ?
শান্ত চোখ মুখ কুঁচকে খেকিয়ে উঠলো…
” বেয়াদব ,, বড় ভাইয়ের বন্ধুর নাম ধরে ডাকতে লজ্জা করে না ? পাতানো ভাই পাতানো ভাই হইতে পারে ! কিন্তু পাতানো ভাইয়ের বন্ধু মানে আপন ভাইয়ের সমান , বুঝলি ?
যা বাড়ি যা… আর একবার যদি তোকে বাড়ির বাইরে দেখেছি তাহলে একেবারে শশুর বাড়িতে পাঠিয়ে দেবো, বুঝলি ? যা এখান থেকে….
লিনা চমকে উঠলো । অবাকের চরম সীমানায় ও । না কিছু বলতে পারছে , আর না করতে পারছে । মাথা ভনভন করছে ওর । এখানে আর কিছুক্ষণ থাকলে নিশ্চয়ই মাথার সব পোকা এলোমেলো হয়ে যাবে । লিনা আর দাঁড়ালো না । সিলেটে ও আরো বেশ কদিন থাকবে । পরে না হয় আসা যাবে আবার । আজ এখান থেকে কেটে পড়াই ভালো । লিনা বোকার ন্যায় হাসলো । বললো বোকা বোকা স্বরে…
” আসি ভাইয়া ?
বলেই পা বাড়াতে গেলে ডাকলো শান্ত …
” ঐ , থাম…
থামলো লিনা । ঘাড় ঘোরাতেই শান্ত দশ টাকার একটা নোট বাড়িয়ে দিয়ে বললো…

” বড় ভাইয়ের কাছ থেকে টাকা চাইতে লজ্জা করে বুঝি ?
এই নে দশ টাকা ,, পাঁচ টাকা রিকশা ভাড়া দিবি আর পাঁচ টাকার বাদাম কিনে খাইতে খাইতে বাড়ি যাবি । ওকে ?
যদি এদিক ওদিক কথার হেরফের হয় , তাহলে বাড়ি এসে ঠ্যাং ভেঙ্গে শশুর বাড়িতে পাঠিয়ে দেবো বলে রাখলাম ।
লিনা আহম্মকের ন্যায় ঠোঁট উল্টালো । একবার তাকালো শান্তর হাতের টাকার নোট টার দিকে ‌। অতঃপর খপ করে শান্তর হাত থেকে টাকা টা নিয়ে দ্রুত পা চালিয়ে বেরোলো বাইরে ।
ও বেরোতেই ফিক করে হেসে উঠলো শান্ত । ফোন স্ক্রিনে তোলা সেলফি দুটো চোখের সামনে ধরে দেখলো । ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসলো তা দেখে । এবার এগুলো রুহি কে পাঠিয়ে জ্বালানো যাবে ‌। শান্তর সাথে গত দু’দিন ধরে ঠিকঠাক ভাবে কথা বলে নি রুহি ।
শান্ত ফিচেল হাসলো । এবার রুহিকে তরপাবে একটু ‌।

রাফি সোফায় মাথা এলিয়ে এক ধ্যানে এক দৃষ্টে মগ্ন হয়ে এখনো মাহির মুখশ্রীর পানে চেয়ে আছে আবেশে । চোখে পলক পড়ছে অনেকটা সময় পরপর । এভাবে প্রায় অনেক টা সময় পেরোলো । মাহির শ্বাস ভারী । বন্ধ চোখের পত্র দ্বয় কাঁপছে তিরতির করে । রাফি আজ খুব কাছ থেকে দেখে অবলোকন করতে পারলো — তার ব্লোসোমের ডাগর অক্ষি যুগলের পাপড়ি আসলেই বৃহৎ । ঘন কালো পাপড়ি ডাগর অক্ষি যুগল‌‌‌ ঢেকে নিয়েছে । তবে সেই চোখ জোড়ার জৌলুস কমেছে আঁখি জোড়ার নিচে কালচে দাগ পড়ায় ।
রাফি ওর ডান হাতটা বাড়িয়ে মাহির চোখের কোণায় স্পর্শ করলো দু’আঙুলে । মাহি একটু নড়ে উঠতেই হাত সরালো তৎক্ষণাৎ । আরো বেশি চোখ মুখ কুঁচকাতেই উঠে দাঁড়ালো রাফি ‌। ঢোক গিলে দূরত্ব রেখে দাঁড়ালো । জ্ঞান ফিরেছে মাহির । চোখ পিটপিট করে জোরে একটা শ্বাস টানলো মেয়েটা । রাফি এক মুহুর্তে ফোনে কিছু একটা করে মাহির দিকে দৃষ্টি পাত করলো । মেয়েটা নেতিয়ে পড়া শরীর টা নিয়ে উঠে বসার চেষ্টা করছে । আশপাশ এখনো দৃষ্টিগোচর হয় নি । রাফি পিছন থেকে ধীর পায়ে কেবিন থেকে বেরোলো । দু’চোখে রেহা কে খুঁজে ওকে পাঠালো মাহির নিকট । মাহি উঠে বসতেই রেহা ধড়ফড়িয়ে কেবিনে ঢুকলো । উত্তেজিত কন্ঠে বলল…

” মাহি ,, ঠিক আছিস তুই ? এখন কেমন লাগছে ? মাথা ঘোরাচ্ছে আবার ? শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে ?
মাহি চোখ সরু করে তাকালো । বুকে হাত দিয়ে দীর্ঘ একটা শ্বাস টেনে হালকা ক্ষিণ কন্ঠে উত্তর করলো…
” আমি ঠিক আছি ।
আশপাশ টা ধ্যানে আসতেই ছলকে উঠলো মেয়েটা । পুনরায় শ্বাস টানলো দীর্ঘ হাঁ করে । শ্বাস নিতে যে কষ্ট হচ্ছে এখনো । ও ঢোক গিললো ‌। বললো….
” আমি এখানে কি করে এলাম ? ক..কি হয়েছিল আমার ?
রেহার পাল্টা প্রশ্ন…
” তোর এ্যাজমা আছে ?
” ন..না তো !
” ডিপ্রেশন ? কিসের এতো ডিপ্রেশন তোর ? মানসিক চাপে আছিস খুব ?
মাহি ইতস্ততায় পতিত হলো । জড়ানো গলায় বলল….
” এসব কেনো জিজ্ঞেস করছিস ? কি হয়েছিল আমার ?

” যে অবস্থায় পড়লে একজন ডাক্তার কে ডাকতে হয় , ঠিক সেই অবস্থাই হয়েছিল তোর ! ডাক্তার কি বললো জানিস ..? বললো তুই নাকি ডিপ্রেসড, মানসিক চাপে আছিস প্রচুর , শরীরেও ভিটামিন নেই , এ্যাজামাও আছে শুনলাম । ইনহেলার মাস্ট বি সাথে রাখা প্রয়োজন তোর । এই সব মিলিয়ে তুই তো দারুন সুখে আছিস , তাই না ?
মাহি চোরা চোখ এদিক ওদিক ঘোরাচ্ছে । রেহা এবার সরাসরি প্রশ্ন করলো….
” স্যার তোকে মিহি বলে ডাকে কেনো ? তোর নাম তো মাহি, তাই না ?
মাহি মুখ ফাঁক করে শ্বাস টানলো ফের । বললো নামানো গলায়…
” আমি কি করে জানবো ? সর , প.. পানি খাবো আমি…
মাহি সোফা থেকে নামতে গেলে কেবিনে ঢুকলো রাফি । হাতে মাঝারি সাইজের একটা বক্স । রেহা আর মাহি দু’জনেই চকিতে তাকালো । রাফি এগিয়ে এসে বক্স টা সোফার একপাশে রাখতে রাখতে গম্ভীর স্বরে বলল রেহার উদ্দেশ্যে….

” এসব তোমার বান্ধবী কে সাথে রাখতে বলবে সবসময় ।
রেহা তাকালো বক্স টার দিকে । অতঃপর প্রশ্ন করলো…
” এসব কি স্যার ?
” ইনহেলার !
ছোট্ট উত্তর রাফির । রেহা চকিতে তাকালো বক্স টার দিকে । হাত বাড়িয়ে বক্স টা নিজের কাছে টেনে নেয়ার চেষ্টা করলো । একটু ভারী ঠেকলো বক্স টা । রেহা দুহাতে নিজের দিকে টেনে আনলো বক্স টা । কার্টুনের উপরি পাট সরাতেই চোখ গোল গোল করে চাইলো রেহা । পুরো এক বক্স ইনহেলার । ছোট প্যাকেটে মোড়ানো স্তরে স্তরে । রেহা ঢোক গিললো । বললো…
” এতো গুলো ?
” কোথায় অতগুলো ? মাত্র ২৫০ টা আছে । ওনাকে বলে দিও সবসময় যেন সাথে রাখে এসব । শ্বাস কষ্ট আছে তার , এসব ডাক্তার সাথে রাখতে বলেছে শুনলেই তো ।
” তাই বলে এতো গুলো ?
কথাটা মিনমিন করে বললো রেহা । রাফি আর উত্তর করলো না । বসলো গিয়ে । মাহি বাঁকা দৃষ্টিতে খানিক চেয়ে থেকে উঠে দাঁড়ালো ‌। মাথা চক্কর দিয়ে উঠতেই থমকালো এক মুহুর্ত । খানিক দাঁড়িয়ে জোরে শ্বাস টেনে হনহনিয়ে পা চালানোর চেষ্টা করে বেরোলো কেবিন থেকে । মাহি বেরোতেই রাফি ফের শান্ত কন্ঠে রেহা কে বললো….
” ওসব দিয়ে দিও ওকে ! আর,, ওর ব্যাগেও একটা রেখে দিও আলাদা করে । আসতে পারো তুমি এখন….
রেহা দুদিকে মাথা নাড়িয়ে গুটি গুটি পায়ে বেরিয়ে আসলো ।
মাহি ব্যাগ হাতে বেরিয়ে যাচ্ছে ক্যাফে থেকে । পিছন থেকে ডাকলো রেহা…

” মাহি , কোথায় যাচ্ছিস ?
মাহি শ্বাস টানলো । হাঁসফাঁস গলায় বলল…
” বাড়িতে !
” এসব নিয়ে যা !
” প্রয়োজন নেই ।
” তুই না বললেও প্রয়োজন আছে । এখনো কেমন করে শ্বাস নিচ্ছিস দেখেছিস ? স্যার বললো এসব নিয়ে যেতে !
” বললাম তো আমার প্রয়োজন নেই এসবের । আমার বাপের টাকা আছে , আমি আমার অসুখের তত্ত্ব কিনে নিতে পারবো । কারোর দয়ার কোনো প্রয়োজন নেই আমার । ওনাকে ফেরত দিয়ে দিস এসব..
বলেই বেরিয়ে গেল সে । বাইরে জারিফ ওকে দেখে ডাকলো বেশ কয়েকবার । শুনলো না মাহি । গটগটিয়ে বেরিয়ে গেল সে ‌। অনেকটা দূরে এসে পায়ের গতি কমালো । আকাশের দিকে মুখ তুলে শ্বাস টানলো ফের । চোখ বুজে দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ । আচমকা ফুঁপিয়ে উঠলো সে । পিছিয়ে রাস্তার পাশে বসলো ধপ করে । শুনশান রাস্তার নীরবতায় ওর ফুঁপিয়ে উঠার শব্দ বাতাসের সাথে পাল্লা দিচ্ছে । কাঁধ থেকে ব্যাগ ফেলে দুহাতে মুখ গুজে ফুঁপিয়ে উঠলো মাহি । মাথার ওরনা পড়ে গেছে । মাহি নিজের মাথার চুল খামচে ধরলো দুহাতে । একটু শব্দ করে গুঙ্গিয়ে উঠলো গলা চিপে…
” কেনো হয় আমার সাথে এমন ? কেনো হয় ? আমি যে আর পারছি না ! আর কতো সহ্য করবো আমি ? আমিও তো মানুষ ! কেনো আসলেন আপনি আবার আমার জীবনে ? কেনো আসলেন ? কেনো এভাবে জ্বালাচ্ছেন আমায় ? কেনো, কেনো, কেনো…?
পাশ থেকে হালকা পুরুষালি কন্ঠ….

” এইটুকু তেই অতিষ্ঠ হয়ে গেলে ? কোথায় আর জ্বালালাম তোমায় ? সবে তো শুরু ? এখন ও তো কিছুই করিনি…
মাহি দুহাত আলগা করে তড়াৎ গতিতে আঁতকে উঠে চাইলো । কয়েক হাত দূরে রাফি দাঁড়িয়ে । মাহি শুষ্ক ঢোক গিলে চোখ মুছলো । শ্বাস টানলো ফের । উঠে দাঁড়িয়ে রাফি কে উপেক্ষা করে পা বাড়ালো । বড় বড় পা ফেলে সামনে এসে পথ রোধ করে দাঁড়ালো রাফি । বাঁধা পেয়ে চোখ তুলে তাকালো মাহি । দৃষ্টি নিরেট করলো । নরম কন্ঠে তিক্ততা টানলো….
” সরুন সামনে থেকে….
” পাশে তো আরো পথ আছে । আমাকে টপকাতে হবে কেনো ? পাশ কাটিয়ে যাও !
মাহি চোখ নামালো । দাঁত চেপে পাশ কাটিয়ে যেতে গেলে রাফি ওর হাত ধরলো খপ করে । তড়িতে ঝট করে চাইলো মাহি । শরীরে এক মুহুর্তে বিদ্যুৎ বয়ে গেছে ওর । শিহরণে কেঁপে উঠলো ও । বক্ষ স্থল সীমা ছাড়িয়ে ছ্যাঁত করে উঠেছে । শুকনো ঢোক গিললো মাহি । কন্ঠ তিক্ত থাকলো না আর । নরম কম্পিত হয়ে আসলো আপনা আপনি…

” হ.. হাত ছাড়ুন !!
” না ছাড়লে কি করবে ?
” দেখুন….
” দেখাও…
রাফির ঝট করে কথা বলায় ভিমড়ি খেলো মাহি । হাত মোচড়া মুচড়ি করে ছাড়ানোর চেষ্টা করলো । পারলো না । ভীত কন্ঠে বললো…
” ছেড়ে দিন আমায়…
” ভয় পাচ্ছো ?
মাহি ঢোক গিললো । শ্বাস টানলো আগের ন্যায় । রাফি আবার বললো মোলায়েম স্বরে…
” কাঁদছিলে কেনো ?
মাহি নিরুত্তর । শ্বাস টেনেই যাচ্ছে ও । ধীরে ধীরে ভারী হয়ে আসছে নিঃশ্বাস । রাফি অবস্থা বেগতিক দেখে ছলকে উঠলো । অন্য হাতের ইনহেলার টা বাড়িয়ে দিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে শুধালো…
” শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে আবার ? নাও , এটা নাও । শ্বাস টানো…
মাহি উত্তেজিত হয়ে ঝটকা মারলো রাফির হাত..
” প্রয়োজন নেই আমার এসবের ! ছাড়ুন আমায় !
ঝটকা খেয়ে রাফি উচ্চস্বরে শীৎকার করে উঠলো…
” মিহি…?

” আমি মিহি নোই ? আর কতবার বলবো আপনাকে ? আমি মিহি নোই ? মরে গেছে মিহি ! বেঁচে নেই সে । আমি অন্যকেউ । বারবার কেনো এক গান গেয়ে যান আপনি ? আর কতবার বলবো আমি মিহি নোই ! মিনিমাম কমনসেন্স নেই আপনার ? বোঝার চেষ্টা করেন না কেনো আপনি ? কি চাই আপনার ?
মাহির জেদ দেখানো তীব্র কন্ঠে রাফি চোয়াল শক্ত করে দাঁতে দাঁত পিষলো । দুহাতে মাহির দুই বাহু শক্ত করে চেপে ধরে হিচড়ে নিয়ে আসলো নিজের কাছে । ক্ষিপ্ততা সংবরন করতে পারলো না এই পর্যায়ে ,, চোখ টাটিয়ে ভরাট কন্ঠে বলে উঠলো…
” তোমাকে চাই আমার , বুঝলে ? তোমাকে চাই ! বোঝো না তুমি ? আর কি করলে বুঝবে ? আর কতো বোঝাবো ? পাগল পেয়েছো তুমি আমায় ? তোমার জন্য যত নিচে নামছি, আরো তত নিচে নামাতো চাইছো আমায় ‌? আরো কত নিচে নামবো বলো ? এই মাহির নাটক কবে শেষ করবে তুমি ? কি পেয়েছো আমায় ? ধৈর্যের পরীক্ষা নিচ্ছো আমার ? আর কতো , বলো আর কতো ? রুজান রাফি চৌধুরী প্রথম বার এমন করছে ,, আরে আমি তো ছিলামই না ! তোমার জন্য হয়েছি এমন ! কেনো আসলে আমার জীবনে ? কেনো এমন বানালে আমায় ? আমাকে পাল্টে দিয়ে এখন নিজে পালিয়ে বাঁচতে চাইছো ! কোথায় পালাবে তুমি ? পালাতে দেবো আমি ? কেনো এমন করছো তুমি , বলো ? যখন এমনই করবে, তখন আমার জীবনে এসেছিলে কেনো,বলো ? কেনো এসেছিলে আমার জীবনে ?
মাহি কাঁপলো । গলার রুদ্ধতা গিলে শুকনো গলা ভেজানোর চেষ্টা করলো । শ্বাস টেনে হালকা ক্ষিণ কন্ঠে বলল…

” আমি তো চলেই এসেছিলাম , আবার কেনো আসলেন আপনি ? আমি তো যাইনি আপনার শহরে ! আপনি আসলেন কেনো ?
রাফি হাতের বাঁধন আলগা করলো । কন্ঠ খাদে নামালো….
” এসেছে যখন, তখন রেখে দাও না আমায় । এই তোমার নিজের করে । প্লিজ আর এমন করো না । আমি আর পারছি না, বিশ্বাস করো । গত সাত টা মাস শ্বাস নিতে পারি নি আমি । সত্যি বলছি , আমি এমন ছিলাম না । তোমাকে দেখার পর কেনো এমন হলাম, জানি না । শুধু জানি , তোমাকে আমার লাগবে । আমার নিজের করে লাগবে ! প্লিজ আমার হয়ে যাও ।
” আপনার তো অনেকে আছে , আমায় না হলেও চলবে । কিন্তু আমার ? আমার কেউ নেই । আব্বু ও নেই জানেন ? চলে গেছে , আর আসবে না কোনো দিন । আর যে আছে , তাকে হারাতে চাই না আমি । আপনাকে চাওয়ার মানুষের অভাব নেই , আর আমার সাধ্য নেই আপনাকে চাওয়ার । আমি আমার সাধ্যের বাইরে যাবো না ।
আপনার জন্য অনেকে পাগল.. কিন্তু আমি….
রাফি কথা আটকে দিলো একটু এগিয়ে ঠোঁটে আঙ্গুল চেপে । ফিসফিস করে বলল…
” কিন্তু আমি তোমার জন্য পাগল । আর আমি তোমার সাধ্যের বাইরে কে বললো ? আমি তোমার সাধ্যের অন্তরালে । অন্যদের সাধ্যের বাইরে । আমার জীবনে কেউ আসে নি কখনো , তুমিই প্রথম ছিলে । মরন হলে তো আলাদা ব্যাপার , কিন্তু যতদিন বেঁচে থাকবো তুমিই প্রথম আর তুমিই শেষ থাকবে ।
মাহি এবার ফিকড়ে উঠে অভিমানী স্বরে বাচ্চাদের ন্যায় বললো….

” লিনা আপু ? উনি তো আছে ‌? পার্সোনাল কথা আছে তো ওনার সাথে , ওনার কাছে যান । আমার কাছে কেনো এসেছেন ?
রাফি হাসলো নরম । একটু শান্ত হয়ে বললো…
” হিংসে হচ্ছে তোমার ? কেনো বলোতো ?
মাহি সম্বিতে ফিরলো । এক মুহুর্তের জন্য মস্তিষ্ক বিপরীতে মোড় নিয়েছিল । নিজেকে সংযত করলো মাহি । দুহাতে ঠেলে রাফি কে সরালো । ঢুকি চিপে বললো….
” আর আঠাশ দিন ,, তারপর আর আমার মুখ দেখবেন না আপনি । সত্যি বলছি , আপনার সামনে আর কখনো আসবো না আমি ।
রাফি চড়ে উঠলো । চড়া গলায় বললো…
” আবার শুরু করলে ? তেজ দেখাচ্ছো আমায় ? আরে এইটুকু একটা মেয়ে , সেই শুরু থেকেই মাথায় চড়ে বসে আছো ! কি পেয়েছো তুমি ? তোমার জন্য নিচু হচ্ছি বলে নিচ ভাবছো আমায় ? আরে কি হয়েছে তোমার ? কেনো এমন করছো বলো ? পছন্দ নয় আমায় ?

” না ,, পছন্দ করি না আমি আপনাকে । আপনাকে সহ্য হয় না আমার । আপনি কে ,যে পছন্দ হবে আপনাকে ? আপনি ফ্যেমাস, সুপারস্টার, সংগীত শিল্পী , বিজনেস ম্যান , এসব বলে মাথা কিনে নিয়েছেন সবার ? যে সবাই পাগল হবে আপনার জন্য ? সবার তালিকায় যোগ করবেন না আমায় । আপনি কোনো এক সময় শুধু আমার বান্ধবীর বড় ভাই ছিলেন । এখন কিচ্ছু নন । এখন রুহি নেই আমার জীবনে । আপনার থাকার তো কোনো প্রশ্নই ওঠে না । বুঝলেন ? আপনি কেউ নন আমার জীবনের ! চলে যান আমার জীবন থেকে ,, মুক্তি দিন আমায় । আপনাকে চোখের সামনে দেখতে পারি না আমি । সহ্য হয় না আমার । গত সাতটা মাস আপনাকে না দেখে প্রতিনিয়ত কষ্ট পেয়ে এসেছি। আর এখন আপনি আমার চোখের সামনে থেকে প্রতিটা মুহূর্ত কষ্ট দিচ্ছেন আমায় । কেনো এমন করছেন আপনি ? আরে আমার ও তো কষ্ট হয় । খুব কষ্ট হয় জানেন ? কাকে বলবো আমি আমার কষ্টের কথা ? কেউ নেই আমার জীবনে ! রুহিও নেই এখন । আব্বু ও নেই ! আপনিও থাকবেন না আমার জীবনে ,, চলে যান না আমার জীবন থেকে ?
মাহি থামলো । হাঁসফাঁস করতে করতে শেষের কথাটা আরো বেশ কয়েকবার আওড়াতে আওড়াতে পিছুতে লাগলো । অক্ষিপট ভিজে জবজবে । শ্বাস টানছে মুখ ফাঁক করে । রাফি ওর টালমাটাল কথা গুলো সব শুনেছে সূক্ষ্ম নেত্রে তীক্ষ্ণ মস্তিষ্কের সচলতায় । দুহাতে মুখ ঢেকে পর মুহুর্তে নিজের মাথার চুল নিজেই খামচে ধরলো ও । লম্বা শ্বাস টেনে ছিটকে এগিয়ে এসে মাহির হাত ধরে নিজের হাতের ইনহেলার টা গুজে দিলো ওর হাতের মুঠোয় । রাশভারী গলায় ফোঁস করে উঠলো….

” চলে তো যাবোই ,, তবে একদিন । সেদিনের পর হাজার বার ডাকলেও পাবে না আমায় । ফিরবো না আর । তবে যতদিন না সেই দিন আসছে , ততদিন বারবার ফিরে আসবো আমি । আমাকে সহ্য হয় না , তাইতো ? ঠিক আছে ? এই আমি টাকে আর দেখবে না তুমি ! তোমার জন্য পাল্টে ছিলাম , আবারো পাল্টাবো নিজেকে । রুজান রাফি চৌধুরী কে চেনো না তুমি ! যাকে এতো দিন চিনে এসেছো , দেখে এসেছো , সে শুধু তোমার সামনেই এমন ছিল ! তোমার জন্যই এমন বানিয়েছিল নিজেকে ! কিন্তু আর না , এবার তুমি চিনবে আমায় । চিনবে আসল রুজান রাফি চৌধুরী কে…
চোখের রক্তিম শিরাদ্বয় স্পষ্ট রাফির । মাহি শুকনো ঢোক গিললো । কথাটা বলেই আর এক মুহূর্ত দাঁড়ালো না রাফি । পিছু ফিরে এক হাত মাথার চুলের ভাঁজে চেপে ধরে এলোমেলো চুল গুলো সেট করলো সে । চক্ষু আড়াল হলো গটগট পায়ে । মাহি দীর্ঘ একটা শ্বাস টানলো । কুলালো না দম । সে চোখ সরিয়ে দ্রুত ইনহেলার এর ছোট্ট ঢাকনা টা খুললো । সোজা অবস্থায় মাথা একটু হেলিয়ে পাফ করে ধীরে ধীরে শ্বাস টানলো । কয়েক মুহূর্ত দম খিচে রেখে দীর্ঘ একটা শ্বাস টানলো আবার । মুখ থেকে মাউথপিস সরিয়ে পুনরায় তাকালো রাফির যাওয়ার পথের দিকে । যে পথ এখন শূন্য , সাথে সাথে মাহির মস্তিষ্কও । ঠোঁট উল্টালো মাহি । কান্না চেপে এক হাতে মুখ চেপে ধরে ছুটলো বাড়ির পথে ।

সেই কবে থেকে শান্ত এক ধ্যানে ফোনের স্ক্রিনের দিকে চেয়ে আছে । একহাতে ফোন আর অন্য হাত মুখে । দাঁত দিয়ে নখ খুঁটে যাচ্ছে জোর খাটিয়ে । স্ক্রিনে রুহির আইডি । দুটো ছবি সেন্ড করেছে সে । সিন হয়েছে । তবে কোনো রিয়াকশন বা রিপ্লাই আসে নি । চিন্তায় পড়েছে শান্ত । এতোক্ষণে তুলকালাম কাণ্ড হয়ে যাওয়ার কথা । ঢাকা টু সিলেট ওয়্যারলেস সিস্টেমে তৃতীয় বিশ্ব যুদ্ধ ঘটে যাওয়ার কথা । কিন্তু সব শান্ত । যুদ্ধের আগমনের কোনো বার্তা নেই । ফোনের ওপাশে কি চলছে কে জানে ? শান্ত ফোঁস করে শ্বাস ফেললো । নিজে থেকে ফের টাইপ করলো….
” মামার বেটি ,, কোনো রিয়াকশন দেখাও না কেন ? ঠিক আছো ?
সেন্ড করলো সেটা । ডেলিভার্ড হয়েছে । মিনিট তিনেক পর সিনও হলো । রিপ্লাই আসলো আরো এক মিনিট পর….
” আমি বিলকুল ঠিক আছি ফুফাতো ভাইয়া । আসলে একটু বিজি আছি তো , তাই কোনো প্রকার রিয়াকশন দেখানোর সময় পাই নি ।

মেসেজের সাথে সাথে একটা ছবিও এসেছে ‌। ফুসকা খেতে গেছে রুহি । সেই ফুসকার প্লেটের একটা ছবি তুলে পাঠিয়েছে । শান্ত কপাল কুঁচকে চাইলো । রুহি বাইরে বেরিয়েছে ? তাও একা ? ছবিটা ভালো করে দেখলো শান্ত । রুহির ড্রেসের এক অংশ দেখা যাচ্ছে । ছবিটার উপরের দিকে তাকাতেই ছলকে উঠলো শান্ত । ধীর স্থির হয়ে হেলান দিয়ে বসা থেকে উঠলো ঝট করে । রুহির ঠিক সামনে কিছু একটা দৃশ্যমান ‌। ঝাঁপসা তা । তবে দেখে বুঝতে সময় লাগলো না বেশি । একটা ছেলের শরীরের এক অংশ দেখা যাচ্ছে ঝাঁপসা । হাতের ঘড়িটা স্পষ্ট । চোখ মুখ শক্ত করে দাঁত পিষলো শান্ত । ঘর থেকে বেরোতে বেরোতে তড়িঘড়ি করে ফোন লাগালো রুহির নাম্বারে । প্রথম বার রিসিভ হলো না । কেটে যেতেই গর্জে উঠে দ্বিতীয় বার ফোন লাগালো । এবার রিসিভ হলো সেকেন্ড কয়েক বাদ । শান্ত কিছু বুঝে ওঠার আগেই রুহির হালকা কন্ঠস্বর ভেসে আসলো….

” আসসালামুয়ালাইকুম,, ফুফাতো ভাইয়া ….
কিছু বলবেন ?
শান্ত কান থেকে ফোন নামিয়ে এক পলক তাকালো স্ক্রিনের দিকে । অতঃপর ঝাঁজালো গলায় খেকিয়ে উঠলো….
” এই … কোথায় তুমি ? বাইরে বেরিয়েছো ? কার সাথে বেরিয়েছো বলো ?
রুহির ধীর স্থির শান্ত জবাব….
” ঢাকা শহরে তো মানুষের অভাব নেই । অনেকেই আছে , এই অনেকের মধ্যেই দু’জনের সাথে বেরিয়েছি । সিলেটে তো মানুষের অভাব , তাই বোধহয় আপনি একজনের সাথে ছবি তুলে পাঠিয়েছিলেন আমায় । যদি বলেন , তাহলে যাদের সাথে বেরিয়েছি তাদের সাথে ছবি তুলে পাঠাতে পারি আপনাকে ! পাঠাবো ?
” রুহি….
কোথায় তুমি ? কার সাথে বেরিয়েছো ?

” কার সাথে নয় ,, কাদের সাথে ,সেটা জিজ্ঞেস করুন ?
শান্ত বাইরে বেরিয়ে গাড়িতে বসেছে । ইন্জিন চালু করে রুষ্ট কন্ঠে বলে উঠলো….
” মাথা গরম করো না ! বাইরে বেরোনোর সাহস কি করে হলো তোমার ? কার পারমিশনে বেরিয়েছো বাইরে ?
” উনি আব্বুর কাছ থেকে পারমিশন নিয়েই আমাকে বাইরে নিয়ে এসেছেন । সাথে আরো একজন আছে ‌। এখন রাখি কেমন ? বাসায় ফিরতে হবে । উনি পৌঁছে দেবে আমায় ! ডাকছেন আমায় উনি…
কথাটা শেষ করেই ঠোঁট চেপে ঝট করে ফোনটা কেটে দিলো রুহি । ফোন কাঁটার শব্দে শান্ত কান থেকে ফোন নামালো । ছুড়ে মারলো সেটা পিছনের সিটে । গাড়ি ছাড়তেই খোলা জানালা দিয়ে উদ্দাম হাওয়া এসে এলোমেলো করে দিলো শান্তর গোছানো চুল গুলো । বিড়বিড় করলো শান্ত….
” উনি, উনি দিচ্ছি দাঁড়াও !

রাত্রি তৃতীয় প্রহরের শেষ । শুনশান পুরো ঘরে । মাঝে মাঝে মুহূর্ত কয়েক বাদ বাদ ফুঁপিয়ে ওঠার শব্দ ভেসে আসছে । তাও অতি ক্ষিন । বেডের কাছে শব্দটা আরো অতি ক্ষিন । এই ক্ষিণ শব্দেই ঘুম ছুটে গেছে সাবিনা বেগমের । ঘুমন্ত চোখ দুটো পিটপিট করে খুললেন তিনি । ঘরে হলদে আলো জ্বলছে । সদ্য ঘুম ভাঙ্গা ঝাঁপসা চোখে পুরো ঘরটা ঠাহর করতে সময় লাগলো তার । শোয়া অবস্থায় হাত বাড়িয়ে পাশে রাখলেন । মেয়েকে হাতড়ে পেলেন না নিজের পাশে । অমনি ঝট করে বৃহৎ হলো তার ঘুম জড়ানো অক্ষি যুগল‌‌‌ । আড়মোড়া ভেঙে তড়িঘড়ি করে উঠে বসলেন তিনি । দুহাতে মেয়েকে হাতড়ালেন আবার । পেলেন না । কান খাড়া করে শুনলেন হালকা ফোঁপানোর শব্দ টা । নাক টানছে কেউ । যার উৎস বন্দি বারান্দা । সেখান থেকেই আসছে । সাবিনা বেগম ধীর পায়ে খাট থেকে নামলেন । ঠান্ডা মেঝেতে পা পড়তেই কেঁপে উঠলেন । চপ্পল পায়ে তুলে এগোলেন বারান্দার দিকে । আকাশে চাঁদ উঠেছে রুপোর থালার ন্যায় । রুপোলি আলো বারান্দার গ্রিল ভেদ করে ছড়িয়েছে পুরো বারান্দায় । সাবিনা বেগম ঘর থেকে গলা বাড়িয়ে বারান্দায় এক কোণায় দৃষ্টি পাত করলেন । তার মেয়ে অতি অবহেলায় গুটিয়ে বসে আছে সেখানে ঠান্ডা মেঝেতে । দুহাতে বুকে জড়িয়ে আছে কিছু । মাথা ঠেকানো পিছনের দেয়ালে । সাবিনা বেগম শুকনো ঢোক গিললেন । পা ফেললেন বারান্দায় । সন্তর্পণে দুই পা এগিয়ে ডাকলেন শান্ত কন্ঠে….

” মিহি…?
আচমকা আম্মুর ডাকে ভড়কে চকিতে তাকালো মিহি । ঢোক গিলে দুহাতে চোখ মুছলো ঝট করে । সাবিনা বেগম আহত দৃষ্টিতে মেয়ে কে পরখ করে আস্তে করে বসলেন মেয়ের পাশে । মিহি মাথা দুলিয়ে হাসার চেষ্টা চালিয়ে বললো….
” আম্মু ,, ঘুমাও নি তুমি ?
” কাঁদছিলি তুই ? কি হয়েছে মা ? পানি কেনো তোর চোখে ? কাঁদছিলি কেনো ?
মিহি কান্না চাপলো । গিললো দুঢোক ‌। গলা ভিজিয়ে বৃথা হাসার চেষ্টা করলো আবার । বললো….
” কিছু না আম্মু ! কোই কাঁদছি ? ঘুম আসছিলো না তো , তাই বসে ছিলাম এখানে । তুমি ঘুম থেকে উঠে পড়লে যে ?
সাবিনা বেগম ঘাড় কাত করে তাকালেন মেয়ের দিকে । ভরাট গলায় শুধালেন একই প্রশ্ন…

” আমার কাছে মিথ্যে বলবি ? মা হোই তোর আমি । কাঁদছিলি কেনো বল ? কি হয়েছে ?
মিহি আম্মুর মুখ পানে তাকিয়ে ঠোঁট উল্টালো ফের । কন্ঠ জড়িয়ে আসলো জড়তায় । গুমরে উঠলো ভেতর ভেতর । এক হাতে হুট করে আম্মু কে জড়ালো আচমকা । টাল হারিয়ে পেছনের দিকে হেলে পড়লেন সাবিনা বেগম । মেয়ের মাথায় হাত রাখলেন তৎক্ষণাৎ । মিহি ফিকড়ে উঠে কান্না চাপা ভেজা কন্ঠে বলল….
” আব্বুর কথা খুব মনে পড়ছে আম্মু । খুব মনে পড়ছে আমার ! জানো খুব দেখতে ইচ্ছে করছে আব্বু কে ! ঘুম আসছে না আমার ,, আব্বু থাকলে ঘুম পারিয়ে দিতো । মাথায় হাত বুলিয়ে দিতো আদর করে । আমার খুব কষ্ট হচ্ছে আম্মু ,, আব্বু থাকলে কষ্ট হতো না । এমন হতো না আমার জীবন । আব্বু কেনো চলে গেল আমাদের ছেড়ে বলোতো ? আমাদের কথা ভাবলো না একবারও ?

এক দেখায় পর্ব ৩৯

সাবিনা বেগম ঘন পলক ফেললেন । চোখ ঘোরালেন এদিক ওদিক । তিনি এসব শুনতে চান না । কানে বাঁধে তার । গলায় রুদ্ধতা ঘিরে ধরে । সাবিনা বেগম মিহির হাতের দিকে তাকালেন । মিহির হাতে আজমাল হোসেন সহ তাদের ফ্যামিলি পিকচার ফটো ফ্রেমে বন্দী । সবার হাস্যোজ্জ্বল চেহারা দৃশ্যমান । সাবিনা বেগম ছবিটার দিকে এক পলক তাকিয়েই চোখ সরালেন । ঝট করে প্রসঙ্গ পাল্টানোর চেষ্টা করলেন…
” ঘুম আসছে না , চল আমি ঘুম পাড়িয়ে দিচ্ছি । মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছি আমি । দেখিস ঠিক ঘুম চলে আসবে । চল মা….

এক দেখায় পর্ব ৪১