Home রুপুর বিয়ে রুপুর বিয়ে পর্ব ১৮

রুপুর বিয়ে পর্ব ১৮

রুপুর বিয়ে পর্ব ১৮
Bobita Ray

অয়ন চাবি এনে অথৈয়ের হাতে দিল। অথৈ চাবি নিয়ে ঘরে যেতে লাগল। অয়ন পিছু ডেকে বলল,
“একটু দাঁড়াও। আমিও যাব।”
অথৈ ভ্রু কুঁচকে সন্দিহান চোখে অয়নের দিকে তাকাল।
অয়ন হেসে ফেলল। বলল,
“তুমি যা ভাবছ তা নয়। আমার কোন খারাপ উদ্দেশ্য নেই গো বেয়াইন সাব। আমি ভাত খেতে যাব। ভাত খাওয়া শেষে কড়া করে এককাপ চা খেয়ে চলে আসব।”
“আপনি এখনো ভাত খাননি?”
“রাতে খাওয়া হয়নি। প্রচুর খিদে লেগেছে। এখন ভাত না খেয়ে ঘুমালে রাতে আর ঘুমই আসবে না।”
“ময়নার মা কোথায়? ওনাকে ডেকে নিন। ভাত-তরকারি গরম করে দেবে।”
“ময়নার মা আজ দেশের বাড়িতে গেছে। গরম লাগবে না। যা আছে। তাই খাব।”

অথৈ পড়ল বিপাকে। এতবড় বাড়িটা নীরব নিস্তব্ধ হয়ে আছে। ওরা দুজন ছাড়া তৃতীয় আর কেউ জেগে নেই। ভদ্রতা করে হলেও অয়নকে ভাত-তরকারি গরম করে খেতে দেওয়া উচিত। আবার একাকি অয়নের সাথে থাকতে একটু ভয় ভয়ও করছে। বাইরে মুষলধারে বৃষ্টি পড়ছে। ভাত খাওয়ার বাহানায় অয়ন যদি অথৈয়ের সাথে উল্টাপাল্টা কিছু করার চেষ্টা করে? তখন কী করবে অথৈ? চিৎকার করেও তো কোন লাভ হবে না। কেউ অথৈকে বাঁচাতে আসবে না। চাবিটা হাতে পাওয়া গেছে। ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিতে পারলে নিশ্চিন্ত হওয়া যেত। অয়ন অথৈয়ের পিছুপিছু আসছে। এখন একদৌড়ে নিজের ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিলে ভালো দেখায় না। খাওয়ার ঘরে গিয়ে অথৈ অয়নের চোখের আড়ালে ফল কাটার ছুরিটা ওড়নার তলায় লুকিয়ে ফেলল। অয়ন যদি অথৈয়ের ভয়কে সত্যি করে দিয়ে উল্টাপাল্টা কিছু করার চেষ্টা করে। তাহলে এই ছুরিটা তখন কাজে লাগবে।
অথৈ বলল,

“আপনি খেতে বসুন। আমি খাবার গরম করে দিচ্ছি।”
“লাগবে না। তুমি ঘুমাতে যাও।”
অথৈ কী বলবে ভেবে পেল না। তখন থেকে অয়নের সম্বন্ধে খারাপ খারাপ কথা ভাবার জন্য ওর নিজের কাছে নিজেকে খুব ছোট মনে হচ্ছে। অয়ন মুখেই যা একটু ইয়ার্কি করে। স্বভাব চরিত্র ততটাও খারাপ না বোধহয়।
অথৈয়ের প্রচণ্ড মাথা ধরেছে। এখন অয়নকে সাধাসাধি করতেও ইচ্ছে করছে না। আবার চলে গেলে খারাপ দেখা যায়। তারজন্য যেতেও পারছে না। অয়ন ঝটপট দুকাপ চা বানিয়ে আনল। অথৈয়ের দিকে এককাপ চা এগিয়ে দিয়ে বলল,
“খেয়ে বলো, মিষ্টি ঠিকঠাক আছে নাকি।”
“ভাত খাবেন না?”
“এখন আর ভাত খেতে ইচ্ছে করছে না।”
অয়ন খুব দ্রুত চা খাওয়া শেষ করল। তারপর চেয়ার টেনে আরাম করে বসল। বলল,
“তুমি এখন ঘুমাতে যাও বেয়াইন সাব। তোমাকে একা রেখে আমি নিচে যেতে পারছি না। আমি গেলে নিশ্চিত ভয় পাবে।”

অথৈ আপত্তি করল না। জড়তা নিয়ে উঠে দাঁড়াল। অয়নের সামনে দিয়ে গুটিগুটি পায়ে হেঁটে ঘরে চলে গেল। বাকি রাতটা ছাদে বসেই বৃষ্টি দেখতে দেখতে র্নিঘুম কাটিয়ে দিল অয়ন।
রুপুর ঘুম ভাঙল বেশ বেলা করে। শরীর জুড়ে আরামদায়ক আলস্য। পাশেই বিনয় গভীর ঘুমে মগ্ন। রুপু বিনয়ের দিকে তাকিয়ে আছে। কে বলবে, এই মানুষটা বাড়ি গেলেই সম্পূর্ণ অন্যএক মানুষ হয়ে যাবে। মায়ের ভয়ে বউয়ের কাছে আসা তো দূরের কথা। মায়ের ভয়ে বউয়ের দিকে তাকাতে পর্যন্ত ইতস্ততবোধ করবে। রুপু দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ল। হাত-মুখ ধুয়ে দ্রুত রেডি হয়ে নিল। স্নান করতে পারলে ভালো হতো। জামা-কাপড় আনা হয়নি দেখে স্নান করা গেল না। ততক্ষণে বিনয় উঠে গেছে। বিনয় আজ রুপুর দিকে যতবার তাকাচ্ছে। ততবার বোকার মতো মাথা চুলকে মুচকি মুচকি হাসছে। রুপু হাই তুলে বলল,
“বাড়ি যাওয়ার পথে মনে করে একটা ব্লেড কিনে নিও।”
বিনয় ভ্রু কুঁচকে বলল,

“ব্লেড দিয়ে কী করবে?”
“যেভাবে মাথা চুলকাচ্ছ। মনে তো হচ্ছে। মাথায় উঁকুন পড়েছে। মাথা কামিয়ে দেব।”
বিনয় হতভম্ব হয়ে গেল। কে বলবে রাতে এই মেয়ে লজ্জাবতী পাতার মতো বিনয়ের বুকে লজ্জায় নুইয়ে পড়েছিল। আজকের রাতটাও এখানে থাকতে পারলে বেশ হতো। সকাল হতেই রুপুর কথার টোন পাল্টে গেছে। বাড়ি গেলে তো এই মেয়ে ধরা-ছোঁয়ার বাইরে চলে যাবে।
রুপু হ্যান্ড পার্সে ফোন রেখে পার্সটা হাতে তুলে নিল। যেতে যেতে বলল,
“সকালের খাবারটা কী বাইরে থেকে খেয়ে যাবে? নাকি বাড়িতে গিয়ে খাবে?”
“তোমার ইচ্ছে।”
“আমি বাড়িতে গিয়ে স্নান করব। তারপর খাব।”
“তাহলে এক কাজ করি। সকালের খাবারটা বাইরে থেকে কিনে নিয়ে যাই?”
“তুমি কিনো না। ড্রাইভারকে দিয়ে কেনাও।”
“আচ্ছা।”
রুপু হঠাৎ চিন্তিত ভঙ্গিতে বলল,

“তোমার মা এখনো ফোন দিল না। ঘটনা কী? আমি কিন্তু তোমার মাকে প্রচণ্ড মিস করছি। দ্যাখো.. আবার অসুখ-বিসুখ বেড়ে গেল না-তো।”
রুপু কী কথাটা মন থেকে বলল নাকি রসিকতা করে বলল। বিনয় ঠিক বুঝতে পারল না। রুপু খুশি খুশি মনে একা একাই বিড়বিড় করে বলল,
“বাড়িতে গিয়ে আজ বড়সড় একটা বোম ফাঁটাব। লা লা লা…”
বীথি রানীর মাথাটা ঝিমঝিম করছে। এমনি দিন তো রাতে চার ঘণ্টার বেশি ঘুমই হয় না। মরার ঘুম গতকাল রাতেই কী বীথি রানীর চোখে ভর করেছিল। কত বেলা হয়ে গেল। বিনয়ের আসার এখনো খবর নেই। বীথি রানীর ফোনেও চার্জ নেই। যে ছেলেটার সাথে দুমিনিট কথা বলবে। বীথি রানীর আদরের ছেলেটা ওই ডাইনিটার জন্য সারারাত জেগে কী কষ্টটাই না করেছে। আহারে… বীথি রানী মনে মনে ঠিক করে রাখল। বিনয় বাড়িতে আসলেই বীথি রানী ছেলেকে নিজের ঘরে ডেকে আনবে। বলবে, “বাবা তোর তো রাত জাগার অভ্যাস নেই। কত কষ্টই না হয়েছে সারারাত জাগতে। আয় তো.. আমার কোলে মাথা রেখে ঘুমো একটু। বিনয় এখন বড় হয়ে গেছে। মায়ের কোলে ঘুমাতে নিশ্চয়ই লজ্জা পাবে। সে পাক। তারপরও বীথি রানী বিনয়কে এই-ঘরেই ঘুমাতে বলবে। মায়ের কথা বিনয় ফেলতেই পারবে না।”

গতকাল রাতে বড় ছেলের চিন্তায় ভরপেট খাওয়া হয়নি। প্রচণ্ড খিদে লেগেছে। ময়নার মা ছুটিতে যাওয়ার আর সময় পেল না। এখন খিদে লাগলে রান্না করেই খেতে হবে। তাছাড়া অয়নটাও তো বাড়িতে। ছেলের সামনেও তো কিছু একটা রান্না করে দিতে হবে।
বীথি রানী রান্নাঘরে গিয়ে অর্ধখাওয়া দুটো চায়ের কাপ দেখে বেশ অবাক হলো। দুটো কাপে কে চা খেয়েছে। ভেবেই পেল না বীথি রানী। রুপুর ছোটোবোন যে ঘরে ঘুমায়। সেই ঘরের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ। বন্ধ দরজার দিকে তাকিয়ে বীথি রানী চমকে উঠল। বুকের ভেতর ধড়ফড় করছে। বীথি রানী দরজা ধাক্কাতে লাগল। বলল,
“কে… কে ঘরের ভেতরে কে?”
অথৈ দরজা খুলে দিল। বীথি রানী বিস্ফোরিত চোখে অথৈয়েক দিকে তাকিয়ে রইল৷ বিড়বিড় করে বলল,
“তুমি কখন এলে?”
“রাতে এসেছি।”
বীথি রানীর মুখটা শুকিয়ে একটুখানি হয়ে গেল। বলল,
“রাতে এসেছ মানে? তোমার বোনের এখন কী অবস্থা? আমার ছেলের একা ঠেকা পড়েছে নাকি তোমার ধুরন্ধর বোনকে রাত জেগে পাহারা দেবার। তোমার বিবেচনা দেখে আমি অবাক না হয়ে পারছি না। এই মেয়ে ভালো কথা। ময়নার মা তো বাড়িতে নেই। আমিও ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। তোমাকে দরজা কে খুলে দিয়েছে?”
অথৈ মাথা নিচু করে ফেলল। অয়নের কথা বলতে ওর কেন যেন লজ্জা করছে। বীথি রানী সন্দিহান কণ্ঠে বলল,
“কথার উত্তর দিচ্ছ না কেন? তোমার বোন হলে তো এতক্ষণে মুখে কথার খৈ ফুটে যেত। রান্নাঘরে অর্ধ খাওয়া দুটো চায়ের কাপ দেখলাম। দুটো কাপে নিশ্চয়ই তুমি চা খাওনি।”

“(নিশ্চুপ।)”
অথৈকে চুপ করে থাকতে দেখে বীথি রানী ধমকে উঠল।
“এই মেয়ে এই। মুখে কুলুপ এঁটে না থেকে কথা বলো। আমার ছেলে গভীর রাতে তোমাকে দরজা খুলে দেবার পরে কী হয়েছে? বলো.. বলো আমাকে? খবরদার কোনকিছু বাদ রাখবে না। গোটে গোটে সব বলবে।”
“(নিশ্চুপ।)”
“ছিঃ ছিঃ ছিঃ তোমার লজ্জা করল না মেয়ে। অতরাতে একটা জোয়ান ছেলের সাথে চা খেতে। শুধু চা খেয়েই কী ক্ষ্যান্ত দিয়েছিলে? নাকি আমার ছেলে তোমার বুকেও হাত দিয়েছিল?”
অতিরিক্ত লজ্জায় কুঁকড়ে গেল অথৈ। কানদুটো সাঁ সাঁ করছে। লজ্জা, ঘৃণা, অপমানে চোখে জল এসে গেল।
অথৈয়ের চুপ থাকা বীথি রানীর সহ্য হচ্ছে না। মাথা ভো ভো করছে। ইচ্ছে করছে বেহায়া মেয়েটাকে ঠাটিয়ে থাপ্পড় মেরে দিতে। বীথি রানী রাগে দাঁত কিড়মিড় করে বলল,

“চুপ করে আছো কেন? আমার ছেলে তোমার সাথে তোমার প্রচারণায় কী কী করেছে, বলো? নাকি সর্বনাশ যা হওয়ার হয়ে গেছে। তাই লজ্জায় কিছু বলতে পারছ না। অকাম করার সময় লজ্জা করে না। বলতে এত লজ্জা করছে কেন? তোমার বড়বোনের শুধু চোপাই জোর। তোমার তো দেখছি শরীরে জোর। দুইবোন জোট বেঁধে আমার সোনার সংসার ধ্বংস করতে এসেছ নাকি? প্রথমেই বুঝেছিলাম। পড়তে আসার বাহানায় আমার ছেলের সাথে ফষ্টিনষ্টি করতে এসেছ। তাই-তো বলি, একা একা কেন ঘুমাতে চাইতে। একা ঘুমালে তো তোমারই সুবিধা। তোমার এই ন্যাকা কান্না দিয়ে আমার ছেলেকে ভোলাতে পারবে। খবরদার আমাকে ভোলানোর বৃথা চেষ্টা করবে না। তোমাদের মতো মেয়েদের আমার বেশ চেনা আছে। পড়াশোনা করতে হলে নিজের বাড়িতে বসে পড়াশোনা করবে। অন্যের বাড়িতে এসে খাঁটি গাড়ার চেষ্টা ভুলেও করবে না। যতসব অশান্তি আমার ঘাড়ে এসেই জুটে।’’
বীথি রানীর মেয়েটাকে আরও কঠিন কঠিন কিছু কথা বলার ইচ্ছে ছিল। সবদিন তো সুযোগ হয় না। আজ হয়েছে। সুযোগে সৎ ব্যবহার বেশ করা যেত।

কলিংবেল বাজছে। নিশ্চয়ই বিনয়রা এসেছে। বীথি রানী আর একমুহূর্ত দাঁড়াল না। যা বলার বলা হয়ে গেছে। বিন্দুমাত্র লজ্জা থাকলে এই মেয়ে আজই বিদায় হবে।
বীথি রানী খুশি মনে দরজা খুলতে চলে গেল।
রুপুকে দেখে বীথি রানী চমকে উঠল। মেয়েটা গেল পেটের ব্যথায় কাতরাতে কাতরাতে। অথচ আজ দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে। অবিকল নতুন বউয়ের মতো আধমাথা ঘোমটা দিয়ে। এটা আবার কোন তামাশা। লোকে বলে, রোগীর সাথে রাত জাগলে রোগী হতে হয়। অথচ বিনয়ের চোখে-মুখে রাত জাগার বিন্দুমাত্র ক্লান্তি নেই। চোখ-মুখ দেখে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। কোন কারণে প্রচণ্ড খুশি বিনয়। বিনয়ের খুশির উৎস কী? বীথি রানী ঠিক ধরতে পারছে না। রুপু ঘোমটা খুলে শাশুড়ী মায়ের পায়ে হাত রেখে প্রণাম করল। বীথি রানী ভয় পেয়ে অল্পের জন্য ছিটকে সরে গেল না। খুব দ্রুত নিজেকে সামলে নিল। এটা আবার কোন নাটক। বীথি রানী বিনয়কে বলল,

“হাসপাতাল থেকে এসেছিস। স্নান করে ঘরে যাবি। আমি গামছা এনে দিচ্ছি।”
রুপু অবাক হবার ভান করে বলল,
“কে হাসপাতালে ছিল মা?”
“আমার সাথে একদম রঙঢঙ করার চেষ্টা করবে না রুপু।”
“আমি মোটেও রঙঢঙ করছি না মা। শুধু কে হাসপাতালে ছিল। তাই জানতে চাচ্ছি।”
“কে ছিল মানে? তুমি.. তুমিই তো ছিলে।”
রুপু বিনয়ের দিকে তাকিয়ে লাজুক লাজুক কণ্ঠে বলল,
“কী-গো মাকে তুমি কিছু বলোনি?”
বিনয় রুপুর দিকে চোখ গরম করে তাকাল। ইশারায় চুপ থাকতে বলল। বীথি রানী বিনয়ের দিকে তাকিয়ে বলল,
“কী লুকাচ্ছিস আমার কাছ থেকে?”
রুপু হাসিমুখে বলল,
“আপনার ছেলে বলতে লজ্জা পাচ্ছে মা। সেই তুলনায় আমার আবার লজ্জা-টজ্জা কম। আপনি অনুমতি দিলে আমি বলতে পারি। তবে কথাগুলো আমি আপনার ছেলের সামনে বলতে পারব না মা।”
“রুপু তুমি চুপ করবে।”
“ইশ, তুমি এত ভয় পাচ্ছ কেন? মায়ের কৌতূহল বেশি। মায়েরও তো আমাদের ব্যাপারে জানার অধিকার আছে।”
বিনয় অধৈর্য হয়ে বলল,

“মা তুমি ওর কথায় কান দিও না। প্লিজ গামছাটা এনে দাও। আমি স্নান করব।”
“সে তুমি স্নান করতেই পারো। মা আপনার ছেলেকে গামছাটা এনে দিন তো।”
রুপুর হেঁয়ালি বীথি রানীর ভালো লাগছে না। বিনয়টাও স্পষ্ট করে কিছু বলছে না। আবার রুপুকেও কিছু বলতে দিচ্ছে না। বিনয় তো মায়ের কাছে কোনকিছু লুকানোর ছেলে না। হঠাৎ করে এত পাল্টে যাচ্ছে কেন? নিশ্চয়ই এর পেছনে রুপুর হাত আছে। তাবিজ-কবচ করেছে নাকি, কে জানে! বীথি রানী গামছা এনে বিনয়ের হাতে দিল। বিনয় রুপুকে একা রেখে স্নান করতে যাওয়ার সাহস পাচ্ছে না। রুপুও গাঁট হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এক পা-ও নড়ছে না। মায়ের সামনে রুপুকে বার বার ঘরে যাও বলতেও লজ্জা করছে। আবার মায়ের কাছে রেখে যেতেও ভয় লাগছে। ইশ, কী যন্ত্রণায় পড়ল বিনয়।
রুপু বলল,

“অয়ন কোথায়? অয়নকে তো দেখছি না।”
বীথি রানীর বিরক্ত লাগছে। বলল,
“ওকে দিয়ে তোমার কী কাজ।”
“আমার কাছে ওর একটা ধন্যবাদ পাওনা আছে মা। এত অল্প সময়ে কী সুন্দর করেই না সবকিছু ম্যানেজ করল। আপনি দেখলে তো চোখই ফেরাতে পারতেন না। আমিই তো অভিভূত হয়ে গেলাম।”
“তখন থেকে কিসের কথা বলছ তুমি? এত হেঁয়ালি না করে স্পষ্ট করে বলো।”
রুপু শাশুড়ির কাছে সরে এলো। চাপা কণ্ঠে ফিসফিস করে বলল,
“বলতে একটু একটু লজ্জা করছে মা। আপনার ছেলেকে এখান থেকে সরে যেতে বলুন। গড প্রমিস। সব বলব।”
“বিনয় শিগগিরই স্নান করতে যা..।”
“রুপু তুমিও চলো।”
“লজ্জা শরমের মাথা খেয়েছিস নাকি। তুই যাবি স্নান করতে। তোর বউ তোর সাথে গিয়ে কী করবে। তুই এখন যা-তো।”

বিনয় ভয়ে ভয়ে রুপুর দিকে তাকাল। রুপু ভুলেও বিনয়ের দিকে তাকাল না। বিনয় চলে যেতেই রুপু আরাম করে সোফায় গা এলিয়ে দিয়ে বসল। এই মেয়ের ভাব দেখলে বীথি রানীর গা জ্বলে যায়। তারপরও উপায় নেই। সত্যিটা যে করেই হোক বীথি রানীকে জানতে হবে।
“কী বলতে চেয়েছিলে বলো?”
“এত অস্থির হচ্ছেন কেন? বলব তো। তার আগে গলাটা ভিজিয়ে নিলে ভালো হতো।”
“এখন কী তোমাকে জল এনে দিতে হবে নাকি?”
“না না। আপনি কেন জল আনবেন। আপনি হলেন এই বাড়ির মহারাণী। মহারাণীকে জল আনতে বলব। আমার ঘাড়ে কয়টা মাথা।”
“তোমার সাথে কথা বলতেই ইচ্ছে করে না আমার।”
“ইচ্ছে না করলে আর কী করার। আমি তাহলে স্নান করতে যাই।”
“এই এই উঠছ কেন? বসো বসো বলছি।”
রুপু উঠার ভঙ্গি করেও আবারও আরাম করে বসে পড়ল। বলল,

“মা, আপনার ধারণা আপনার বড়ছেলে আপনাকে প্রচণ্ড ভালোবাসে দেখে আপনার সবকথা শুনে, মানে এবং অক্ষরে অক্ষরে পালন করার চেষ্টা করে। তবে আমার কিন্তু তা মনে হয় না। আমার মনে হয় কী জানেন? আপনার বড়ছেলে আপনাকে প্রচণ্ড ভয় পায়। ভয় থেকেই আপনার সবকথা শুনে, মানে এবং অক্ষরে অক্ষরে পালন করার চেষ্টা করে।”
“যতসব আজগুবি কথা তোমার। আমার থেকে আমার ছেলেকে তুমি বেশি চেনো নাকি।”
“এখনো পুরোপুরি চিনে উঠতে পারিনি। তবে অনেকটাই চিনে ফেলেছি।”
বীথি রানী তাচ্ছিল্য করে বলল,
“তোমার কী দেখে মনে হলো, আমার ছেলে আমাকে ভালোবাসে না। ভয় পায়?”
“গতকাল আপনার বড়ছেলে আপনাকে একসাথে অনেকগুলো মিথ্যা কথা বলেছে। আমি অবাক হয়ে দেখলাম, ও যখন আপনাকে মিথ্যা কথাগুলো বলছে। খুব গুছিয়ে বলছে। এবং ওর চোখে-মুখে আনন্দ উপচে পড়ছে।”
“শুধু পেটের ডাক্তার না দেখিয়ে মাথার ডাক্তারও দেখাতে পারতে। পেটের সাথে মাথাটাও পুরোপুরি গেছে তোমার। আমার বিনয় আমাকে বলবে মিথ্যা কথা। আগুন ছুঁইয়ে এইকথা কেউ বললেও তো বিশ্বাস করব না আমি।”

“প্রমাণ দিলে বিশ্বাস করবেন মা?”
“কী এমন প্রমাণ আছে তোমার কাছে। দেখি, দাও?”
বীথি রানীর আত্মবিশ্বাস দেখে রুপুর চোখে-মুখে হাসি খেলে গেল। ফোন বের করে বলল,
“এই ছবিটা দেখুন তো মা। খাটটা সাজানো খুব সুন্দর হয়েছে না?”
বীথি রানীর কৌতূহল বেড়ে গেল। বিড়বিড় করে বলল,
“এই খাটের সাথে আমার ছেলের মিথ্যা বলার কী সম্পর্ক?”
“আপনি আমাদের ঘুরতে যাওয়ার কথাশুনে আপনার ছোটো ছেলেকে আমার সাথে জড়িয়ে খুব কুৎসিত একটা কথা বলেছিলেন মা। কথাটা আমার বদহজম হয়ে গিয়েছিল। তাই আপনার বড়ছেলেকে পেটে ব্যথার মিথ্যা নাটক করে ফোন করে বাড়িতে আনলাম। তারপর হাসপাতালে যাওয়ার নাম করে বাড়ি থেকে বের হয়ে প্রথমে আমরা গেলাম কাচ্চি ডাইন-এ। সেখান থেকে ভরপেট কাচ্চি খেয়ে আমার ইচ্ছে ছিল বাড়ি চলে আসব। কিন্তু আপনার বোকাসোকা ছেলে সাহসী একটা কাণ্ড করে বসল। আমাকে নিয়ে গেল ফাইভ স্টার হোটেলে। গিয়ে দেখলাম, এলাহী কাণ্ড। রীতিমতো বাসর-টাসর সাজিয়ে অস্থির। আপনার ছেলেকে আর নিরাশ করতে ইচ্ছে করল না মা। রাতটা ওখানেই থেকে এলাম। এই দেখুন মা। আমার হাতে হীরের আংটি। আংটিটা গতকাল রাতে আপনার ছেলে আমাকে গিফট করেছে।”

রুপুর বিয়ে পর্ব ১৭

কথাগুলো বীথি রানীর মস্তিষ্ক সহজভাবে নিতে পারল না। মাথা ঘুরে পড়ে গেল। বিড়বিড় করে বলল,
“ডাইনিটা আমার সোনার টুকরো ছেলেকে নিজের বশে রাখতে তাবিজ করেছে। নাহলে ছেলেটা আমাকে একসাথে এতগুলো মিথ্যা কথা বলবে কেন!”

রুপুর বিয়ে পর্ব ১৯