Home রুপুর বিয়ে রুপুর বিয়ে পর্ব ১৯

রুপুর বিয়ে পর্ব ১৯

রুপুর বিয়ে পর্ব ১৯
Bobita Ray

রুপু আর একমুহূর্ত দাঁড়াল না। এখন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শাশুড়ি মায়ের তামাশা দেখার কোন মানে হয় না। অথৈয়ের কাছে যাওয়া যাক। অথৈয়ের সাথে দেখা করে স্নান করবে। তারপর সবাইকে সকালের খাবার খাইয়ে দুপুরের রান্নার ব্যবস্থা করতে হবে। বীথি রানীকে পাশ কাটিয়ে রুপু চলে গেল। বীথি রানী কান্না ভুলে বোকার মতো রুপুর গমন পথের দিকে তাকিয়ে রইল। মেয়েটা শক্ত ধাঁচের বীথি রানী জানে! তাই বলে এতটা? ভদ্রতা করেও তো একবার বলা উচিত ছিল। মা আপনি দয়া করে কাঁদবেন না। আমাদের ভুল হয়ে গেছে। এরকম ভুল আর জীবনেও হবে না। আমাকে ধরে উঠুন প্লিজ… বলল না। ডাইনিটা কিছু না বলেই চলে গেল। বীথি রানী শাড়ির আঁচলে মুখ গুঁজে কাঁদতে কাঁদতে নিজে নিজেই উঠে দাঁড়াল। হন্তদন্ত পায়ে ছুটে গেল বিনয়ের ঘরে।

“অথৈ দরজা খুল?”
“দরজা খোলা আছে। ভেতরে আয় দিদি।”
রুপু ঘরে গিয়ে বেশ অবাক হলো। অথৈ কাঁথা মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছে। রুপুকে দেখেও উঠে বসল না। কাঁথা এমনভাবে মুড়ি দিয়েছে। অথৈয়ের চোখ-মুখ দেখা যাচ্ছে না। রুপু চিন্তিত ভঙ্গিতে বলল,
“কী হয়েছে অথৈ?”
“কিছু না। ঘুমাচ্ছিলাম।”
“তোর কণ্ঠ এমন লাগছে কেন? উঠে বোস।”
“উঠতে ইচ্ছে করছে না।”
রুপু কাঁথার কোণা ধরে একটানে সরিয়ে ফেলল। অথৈয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে চমকে উঠল রুপু। ফর্সা চোখ-মুখের এক রাতেই একি হাল করেছে মেয়েটা। অতিরিক্ত কান্না করলেই অথৈয়ের চোখ-মুখ ফুলে লাল টকটকে হয়ে যায়। রুপু ঘাবড়ে গেল। কেন কেঁদেছে তার আদরের ছোটো বোনটা। কেউ কী কিছু বলেছে অথৈকে?
রুপু নিজেকে সামলে নিয়ে অথৈয়ের মাথায় স্নেহের হাত রাখল। বলল,

“কী হয়েছে, কেন হয়েছে এইসব বিবরণে আমি আপাতত যেতে চাচ্ছি না। শুধু আমাকে বল। তোকে আমার শাশুড়ী কী বলেছে? এবং কতটা নোংরা ভাষায় বলেছে?”
অথৈ প্রাণপনে স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করেও পারল না। রুপুর বুকে ঝাপিয়ে পড়ে ব্যাকুল হয়ে কাঁদতে লাগল। কাঁদতে কাঁদতে গতকাল রাত থেকে আজ সকাল পর্যন্ত কী কী হয়েছে। সব গোটে গোটে বলল। কোনকিছুই বাদ দিল না। অথৈয়ের মুখ থেকে কথাগুলো শুনতে শুনতে রুপু রেগে আগুন হয়ে গেল। অতিরিক্ত রাগে ওর ঠোঁট কাঁপছে। অথৈয়ের একহাত চেপে ধরে উঠে দাঁড়াল। বলল,
“চল আমার সাথে?”
অথৈ ভয় পেল। বলল,
“আমি তোর দুটি পায়ে পড়ি দিদি। আমি এখন কোথাও যাব না। আমার জন্য তোর সংসারে কোনরকম অশান্তি হলে আমি মানতেই পারব না। ওনি গুরুজন। দুটো কথা নাহয় ভুল করে বলেই ফেলেছে। তাতে কী এসে যায়। আগামীকাল পরীক্ষাটা হয়ে গেলেই আমি চলে যাব। বাবাকে ফোন করে দিয়েছি। বাবা আমাকে নিতে আসবে।”
“তুই আগে আমার সাথে চল অথৈ। ওই মহিলার এতবড় সাহস হয় কী করে আমার বোনকে খারাপ খারাপ কথা বলার।”

“আমি ওনার কথায় কিছু মনে করিনি।”
“মনে করিসনি যখন তখন বোকার মতো কেঁদেছিস কেন? আমার এখন এত কথা প্যাঁচাতে ভালো লাগছে না অথৈ। তুই আগে চল।”
“দিদি.. দিদি তুই প্লিজ শান্ত হ। এখন না। পরে যাব।”
রুপু কিছু বলতে গিয়েও বলল না। ওর এখন নিজের উপরই প্রচণ্ড রাগ লাগছে।
বীথি রানী বিনয়ের ঘরে এসে দেখল, বিনয় শো-রুমে যাওয়ার জন্য রেডি হচ্ছে। মাকে দেখে বিনয় হাসার চেষ্টা করল। বীথি রানী ছেলের হাসিমুখের দিকে তাকিয়ে ঝরঝর করে কেঁদে দিল। মাকে কাঁদতে দেখে বিনয় হকচকিয়ে গেল। অস্ফুট স্বরে বলল,
“কাঁদছ কেন মা তুমি?”
বীথি রানী হাত দিয়ে দেখাল। মলিন কণ্ঠে বলল,

“এই এইটুকু ছিলি তুই। সেবার তোর কী এক অসুখ হলো। কিচ্ছু খেতে পারিস না। ঠিকমতো ঘুমাস না। সারাক্ষণ কাঁদিস আর কাঁদিস। আমি সবকিছু ফেলে তোকে নিয়ে পাগলের মতো কোথায় কোথায় ছুটে গেছি। কত দিন-রাত না খেয়ে থেকেছি। কত রাত ঘুমাইনি। কত রাত তোকে বুকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে কেঁদে বালিশ ভিজিয়েছি। তোকে নিয়ে জমে মানুষে টানাটানি লাগল। আমি জমের মুখ থেকে তোকে বাঁচিয়ে আনলাম। তারপর তোর কী এক বিশ্রী স্বভাব হলো। আমাকে বেশিক্ষণ না দেখে থাকতে পারিস না। আমি তোর চোখের আড়াল হলেই তুই অস্থির হয়ে যাস। মা মা বলে ডাকতে ডাকতে সারাবাড়ি মাথায় করে তুলিস। তোর সারাদিনের পেটের খবর আমাকে গোটে গোটে না বললে তোর নাকি রাতে ঘুমই হয় না। তোর এই স্বভাব পুরোপুরি আমাকে গ্রাস করে ফেলল। তুই আমার কাছে কিছু লুকালে আমি অস্থির হয়ে যাই। তুই আমার মুখের দিকে তাকিয়ে বেশিক্ষণ পেটের ভেতর কথা চেপে রাখতে পারিস না। সেই ছোটবেলার মতো সবকথা আমাকে বলিস। আচ্ছা বিনয় তুই যে বউ নিয়ে ঘুরতে গেছিস। ভালো কথা। একটা রাত বউকে নিয়ে বাইরে থেকেছিস। সেটাও ভালো কথা। আমাকে সত্যিটা বলে গেলে খুব কী অসুবিধা হতো? আমি কী তোদের যেতে বাঁধা দিতাম? আমাকে কী ভাবিস তুই? আমি কী খুব বেশি খারাপ। মা হিসাবে আমার ছেলে কোথায় আছে না আছে সেটা কী আমার জানার অধিকার নেই। কেন আমাকে মিথ্যা কথা বললি বাবা? তুই তো আগে এমন ছিলি না।”

বিনয় অনুতাপের আগুনে পুড়ে গেল। মায়ের কাছে ক্ষমা চাওয়ারও কোন মুখ নেই। বিনয় হাঁটুমুড়ে মায়ের পায়ের কাছে বসল। বীথি রানী দুপা পিছিয়ে গেল। বিনয় মায়ের পাদু’টো জাপ্টে ধরে মায়ের পায়ে মাথা গুঁজল। বিড়বিড় করে বলল,
“আমার ভুল হয়ে গেছে মা। তুমি আমাকে যা শাস্তি দেবে। আমি মাথা পেতে নেব।”
“ছিঃ ছিঃ বউয়ের সাথে ঘুরতে যাওয়ার জন্য আমি তোকে শাস্তি দেব কেন! উঠ বাবা উঠ। আসলে আমারই ভুল। তুই তো আর এখন আগের বিনয় নেই। আমিই বোকার মতো তোকে বার বার আগের বিনয় ভেবে কষ্ট পাই।”
“মাগো.. এভাবে বলো না। এবারের মতো আমাকে ক্ষমা করে দাও। এই আমি তোমাকে ছুঁইয়ে দিব্যি কাটছি। এমন ভুল আমি আর জীবনেও করব না। ঝোঁকের মাথায় করে ফেলেছি।”
বীথি রানী নিশ্চিন্ত হলো। যাক ছেলেটা তাহলে এখনো পুরোপুরি পর হয়ে যায়নি। বিনয়ের সাথে এখন আর আগের মতো রাগারাগি করা যাবে না। বিনয়কে কন্ট্রোল করতে হবে ইমোশনাল ভাবে।
বীথি রানী ছেলেকে টেনে তুলল। ছেলের গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল,

“চল খেয়ে নিবি। আজ আমি নিজের হাতে তোকে খাইয়ে দেব।”
এইতো মা স্বাভাবিক কণ্ঠে কথা বলছে। বিনয় স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে মায়ের পিছুপিছু গেল।
রুপু মা-ছেলের আদিখ্যেতা খুব ধৈর্য সহকারে সহ্য করল। অথৈয়ের ব্যাপারটা নিয়ে বিনয়ের সামনে মায়ের সাথে কথা বলার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে নেই রুপুর৷ বিনয় মায়ের হাতে খেতে খেতে বলল,
“অথৈ কোথায়? অথৈকে যে দেখছি না।”
“ওর আগামীকাল পরীক্ষা। ও পড়তেছে।”
“ওকে ডাকো। খাবার ঠাণ্ডা হয়ে গেলে ভালো লাগবে না।”
“হোক ঠাণ্ডা। আবার গরম করা যাবে। তোমরা আগে খাওয়া শেষ করো। অথৈ আমার সাথে পরে খাবে।”
অয়ন খাওয়ার গতি ধীরে ধীরে কমিয়ে দিল। বিনয় বলল,
“তুমি পরে খাবে কেন? এখুনি খেয়ে নাও।”
“এখন খেতে ইচ্ছে করছে না।”
বীথি রানী বিনয়কে চাপা কণ্ঠে বলল,

“এত জোর করছিস কেন? তোর বউয়ের হয়তো খিদে নেই। যখন খিদে লাগবে তখন খাবে।”
বিনয় কথা না বাড়িয়ে খাওয়ায় মনোযোগ দিল। রুপু চা করতে রান্নাঘরে গেল।
বিনয় অয়ন দুইভাই খাওয়া শেষ করে যে যার মতো উঠে চলে গেল। বিনয়কে খাইয়ে দিতে গিয়ে বীথি রানী খাওয়ায় পিছে পরে গেল। খাওয়া শেষ করে হাত ধুয়ে উঠতেই রুপু বলল,
“মা আপনি একটু আমার সাথে আসুন তো। আপনার সাথে আমার কিছু কথা আছে।”
“তোমার সাথে আমার কোন কথা নেই।”
“আশ্চর্য তো। আপনাকে কে কথা বলতে বলেছে। কথা আমি বলব। আপনি শুধু শুনবেন।”
বীথি রানীর একটু একটু ভয় করছে। সকালে ঝোঁকের মাথায় রুপুর বোনকে একসাথে এতগুলো কথা বলা উচিত হয়নি। এখন রুপু এর জের উঠাবে না-তো?

“কী হলো আসুন আমার সাথে।”
“আমি যেতে বাধ্য নই।”
রুপু কণ্ঠে বিরক্তি ফুটিয়ে বলল,
“এতক্ষণ ভালোভাবে বলেছি। বেশি ভাব ধরলে এখন হাত ধরে টেনে নিয়ে যাব। পরে কিন্তু আবার বলতে পারবেন না। আমি আপনার গায়ে হাত তুলেছি। আপনাদের তো আবার একটু ছুঁয়ে দিলেই গায়ে হাত তোলার মতো অপরাধ করা হয়ে যায়। ভিকটিম রোল প্লে করতে তো ওস্তাদ আপনেরা।”
“এই মেয়ে তুমি কী ভদ্রভাবে কথা বলতে পারো না?”
“পারব না কেন? ভদ্র মানুষের সাথে অতি অবশ্যই ভদ্রভাবে কথা বলি আমি।”
“তার মানে কী বলতে চাইছ, আমি অভদ্র?”
রুপু দায়সারা ভাবে বলল,
“সে আপনিই ভালো জানেন।”
রুপু একপ্রকার কথার জোরেই শাশুড়ি মাকে অথৈয়ের ঘরে নিয়ে গেল। অথৈ অসময়ে রুপুর শাশুড়ীকে দেখে আতংকিত বোধ করল। রুপু চোখের ইশারায় অথৈকে ভরসা দিল। ভয় পাস না আমি আছি তো। রুপু স্বাভাবিক কণ্ঠে বলল,

“মা আপনার ছোটো ছেলে যে চরিত্রহীন এই কথা আমাদের আগে বলেননি কেন?”
বীথি রানী চমকে উঠে রুপুর দিকে তাকাল। এই মেয়ের মাথা কী ঠিক আছে? কী সব বলছে। রুপুর কথার পিঠে বীথি রানী কড়া করে দুটো কথা বলতেও ভুলে গেল।
“আপনি আমার বোনকে কোন সাহসে নোংরা নোংরা কথা বলেছেন?”
“আমি তোমার বোনকে কিছুই বলিনি।”
“ও তাই নাকি। অয়নকে ডাকব নাকি? আমি কিন্তু এখন অয়নকে ডেকে আপনার সামনেই জিজ্ঞেস করব। অয়ন তুমি কী গতকাল রাতে আমার বোনের বুকে হাত দিয়েছিলে? শুধু কী বুকে হাতই দিয়েছিলে নাকি তোমাদের ভেতরে সবকিছু হয়ে গেছে। সবকিছু হয়ে গেলে তো তোমার মায়ের সামনে মহাবিপদ। আমি তো অথৈকে আর বাড়িতে পাঠাব না। যেভাবেই হোক তোমার সাথে বিয়ে দিয়ে দেব। তারপর আমরা দুইবোন জমিয়ে সংসার করব।”
অথৈ লজ্জায় কুঁকড়ে গেল। বীথি রানী হতভম্ব হয়ে গেল। বুকের ভেতর কাঁপছে। চাপা কণ্ঠে ধমকে উঠল। বলল,
“এই মেয়ে এই এসব কী বলছ তুমি? মাথা কী ঠিক আছে তোমার?”

“আমার মাথা একদম ঠিক আছে মা। বরং আপনার মাথা ঠিক নেই। নাহলে শুধুমাত্র একটা মেয়েকে কঠিনভাবে অপমান করার জন্য নিজের ছেলের সম্বন্ধে কেউ এত নোংরা নোংরা কথা বলতে পারে না। আর আপনি কোন সাহসে আমার বোনকে অপমান করেছেন? কে দিয়েছে আপনাকে এতবড় অধিকার? আপনার মন মানসিকতা অত্যন্ত নিচু দেখেই আপনি সবাইকে আপনার মতো ভাবেন নাকি? অথৈ এই বাড়িতে ঘাঁটি গাড়তে আসেনি মা। আর না ও নিজের ইচ্ছেতে এসেছে। আপনার বোন যেমন আপনার বাড়িতে বেড়াতে আসে। আমার বোনও তেমন আমার শ্বশুরবাড়িতে বেড়াতে এসেছে। বেড়ানোর পাশাপাশি শুধু পরীক্ষা দেবে এতটুকুই তফাত। এই পিচ্চি মেয়েটাকে আপনি নোংরা কথা বলে কী পরিমাণ কষ্ট দিয়েছেন। আপনার কোন ধারণাও নেই মা। এরজন্য আমি আপনাকে কখনোই অথৈয়ের কাছে ক্ষমা চাইতে বলব না। শুধু ভগবানের কাছে হাতজোড় করে বলি, আমার বোনকে বিনাদোষে কষ্ট দেবার শাস্তি যেন ঈশ্বর আপনাকে দেন।”

বীথি রানীর রাগে দুঃখে শরীর জ্বলে গেল। তবে রুপুকে কড়া করে দুটো কথা শুনাতে পারল না।
কেউ অয়নকে দেখে ফেলার আগেই অয়ন চট করে অথৈয়ের ঘরের সামনে থেকে সরে গেল। মায়ের উপর অয়নের এখন প্রচণ্ড রাগ লাগছে। মায়ের বাড়াবাড়ি অয়নের কখনো সহ্য হয় না। আজ তো সব সীমা অতিক্রম করে ফেলেছে। ছিঃ ছিঃ ওর নিজেরই এত লজ্জা লাগছে। অথৈয়ের সামনে মুখ দেখাবে কী করে?
বিকালে অয়ন ছাদে এসে দেখল, অথৈ আনমনা হয়ে দোলনায় বসে দোল খাচ্ছে। অয়ন অথৈয়ের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। অসময়ে অয়নকে দেখে অথৈ লাফিয়ে উঠল। হন্তদন্ত পায়ে ঘরে চলে যেতে নিল। অয়ন হকচকিয়ে গেল। নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,
“এক মিনিট দাঁড়াও বেয়াইন সাব?”
অথৈয়ের পা জোড়া থেমে গেল। পেছন ফিরে অয়নের দিকে তাকাল। অয়ন অপরাধী কণ্ঠে বলল,
“আমি খুব দুঃখিত বেয়াইন সাব। আমি স্বপ্নেও ভাবতে পারিনি। আমার মা আমার সাথে তোমাকে জড়িয়ে এত নোংরা নোংরা কথা বলে অপমান করবে।”

“(নিশ্চুপ।)”
“আমি আমার মায়ের হয়ে তোমার কাছে কখনোই সাফাই গাইব না। শুধু বলব পারলে আমাকে ক্ষমা করে দিও।”
অথৈ আর একমুহূর্ত দাঁড়াল না। ঘরে চলে গেল। অয়ন দীর্ঘশ্বাস ফেলে দোলনায় গিয়ে বসল। অথৈকে আরও কিছু বলা দরকার ছিল। আফসোস কোন কথাই গুছিয়ে বলা হলো না।
আজ রুপুর শ্বশুর এসেছে। রুপু শ্বশুরের সব পছন্দের খাবার নিজের হাতে খুব যত্ন করে রান্না করেছে। রাতে সবাই একসাথে খেতে বসল। রুপুর শ্বশুর খাওয়ার ফাঁকে টুকটাক গল্প করতে করতে বিনয়কে বলল,
“তোরা দুজন কক্সবাজার থেকে কয়েকটা দিন ঘুরে আয়।”
কথাটা শুনে রুপুর শাশুড়ীর খাবার মুখে বিশ্রী ভাবে আটকে গেল। কাশতে কাশতে অবস্থা খারাপ হয়ে গেল। জল খেয়ে বলল,

“বিনয়ের সমুদ্রে যাওয়ার কোন দরকার নেই। ও সাঁতার জানে না। শেষে একটা অঘটন ঘটে যাবে।”
বিধান বাবু বলল,
“কোন অঘটন ঘটবে না বীথি। রুপু মা আছে তো। তুমি নিশ্চিন্ত থাকো। ঠিকই বিনয়কে সামলে রাখবে।”
বীথি রানী রুপুর দিকে তাকিয়ে তাচ্ছিল্য করে বলল,
“এই মেয়ে দেখবে আমার বিনয়কে? আর কাউকে পেলে না তুমি। তোমার আদরের বউমার ঘর, সংসার বরের দিকে মনোযোগ আছে নাকি।”
“আহা বীথি এভাবে বলছ কেন?”
“তো আর কীভাবে বলব। বিনয় তুই কী কক্সবাজারে ঘুরতে যেতে চাস?”
বিনয় আমতা আমতা করে বলল,
“না মানে বাবা যেহেতু বলছিল।”
“তোর বাপের কথা ছাড়। তোর মত কী তাই বল।”

বিনয়ের খুব ইচ্ছে করছে রুপুকে নিয়ে ঘুরতে যেতে। বাড়িতে তো রুপুকে কাছেই পাওয়া যায় না। একমাত্র ঘুরতে গেলেই রুপুর সাথে বেশি বেশি সময় কাটানো যায়। মাকে একবার কষ্ট দিয়ে ফেলেছে বিনয়। নতুন করে আর কষ্ট দিতে ইচ্ছে করছে না। শুধু বলল,
“তুমি বললে যাব মা।”
“এখন যাওয়ার দরকার নেই। পরে যাবি।”
বিনয় মাথানিচু করে ভাত নাড়াচাড়া করতে করতে বলল,
“আচ্ছা।”
রুপু এতক্ষণ সবার সবকথা খুব মনোযোগ দিয়ে শুনছিল। মা-ছেলের বকবকানি শেষ হতেই শ্বশুরকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“বাবা আপনার আর মায়ের কক্সবাজারে সমুদ্রজলে তোলা ছবিটা কিন্তু দারুণ এসেছে। আমি যতবার আপনাদের ঘরে যাই। ততবারই ছবিটার দিকে তাকিয়ে থাকি। আচ্ছা বাবা আপনারা বুড়ো বয়সে থুক্কু মানে এত দেরিতে কেন হানিমুনে গেলেন? আরও আগেও তো যেতে পারতেন। নিশ্চয়ই আপনাদের সাথে আপনার ছেলে দুটোও পিছু ধরেছিল।”
বিধান বাবু হেসে ফেলল। বলল,

“না ওরা যায়নি। আমি আর বীথি গিয়েছিলাম শুধু।”
রুপু বীথি রানীর দিকে তাকিয়ে স্বাভাবিক কণ্ঠে বলল,
“মা আপনার শাশুড়ীও নিশ্চয়ই আমার শাশুড়ীর মতো আপনাদের দুজনের কোথাও ঘুরতে যাওয়া সহ্য করতে পারত না। তাই না? এরজন্যই বোধহয় দূরে কোথাও বেড়াতে যেতে এত লেট করে ফেলেছেন। শাশুড়ী কালে যতই চালাক হওয়ার ভান করেন না কেন। বউকালে কিন্তু আপনি খুব বোকা ছিলেন মা। নিজের শখ আহ্লাদকে কখনো প্রশ্রয় না দিয়ে গাধার মতো শুধু এই সংসারের পেছনে খেঁটেই গেছেন। তবে আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন মা। আমি আপনার মতো বোকা বউ না। আমি আমার শখ আহ্লাদ সময় থাকতে ঠিকই পূরণ করব।”
কথাগুলো বীথি রানীর খুব গায়ে লাগল। তবে রুপু এমনভাবে কথাগুলো বলেছে। চাইলেও দুটো কড়া কথা শুনিয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

“বেয়াইন সাব দরজা খুলো প্লিজ? আমি খুব বেশি সময় নেব না। জাস্ট কয়েকটা কথা বলেই চলে যাব।”
অয়ন খুব বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। অথৈয়ের প্রচণ্ড ভয় লাগছে। এতরাতে অয়ন অথৈয়ের দরজার পাশে কী করতে এসেছে, কে জানে। কেউ দেখে ফেললে সর্বনাশ হয়ে যাবে। অথৈয়ের সারা শরীরে ঘাম দিচ্ছে। এখন মরে গেলেও দরজা খুলবে না অথৈ। অথৈ ভয় জড়ানো কণ্ঠে ফিসফিস করে বলল,
“যা বলার বলে চলে যান। আমি শুনছি।”
“আমি মুখ না দেখে কথা বলতে পারি না। তুমি আগে দরজা খুলো।”
“অসম্ভব। কেউ দেখে ফেললে সর্বনাশ হয়ে যাবে।”
“সর্বনাশ হলে হবে। তুমি এত চিন্তা করছ কেন?”
“আপনার মাথা ঠিক নেই। আপনি এখন দয়া করে ঘরে যান।”
“তুমি দরজা খুলে বাইরে না এলে আমি এখানেই দাঁড়িয়ে থাকব।”

রুপুর বিয়ে পর্ব ১৮

“আমি এখুনি দিদিকে ফোন করে উপরে আসতে বলছি। আগে দিদি আসুক। তারপর আপনার সবকথা শুনব আমি।”
“তোমাকে আমার দিব্যি অথৈ। তুমি এখন যদি তোমার দিদিকে ফোন দাও। তাহলে আমার মরামুখ দেখবে তুমি।”
অথৈ আঁতকে উঠল। হঠাৎ এত পাগলামি করছে কেন ওনি? কিছুক্ষণ আগেও তো সবকিছু স্বাভাবিক ছিল। মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে কী এমন হয়ে গেল। আগামীকাল পরীক্ষাটা হয়ে গেলেই বাঁচা যায়। মানে মানে বাড়িতে চলে যেতে পারলেই গঙ্গা জলে ডুব দেবে অথৈ। এত অশান্তি আর ভালো লাগছে না।

রুপুর বিয়ে পর্ব ২০