Home রুপুর বিয়ে রুপুর বিয়ে পর্ব ৭

রুপুর বিয়ে পর্ব ৭

রুপুর বিয়ে পর্ব ৭
Bobita Ray

রুপুকে একা একা বাড়িতে আসতে দেখে রুপুর বাবা-মায়ের মুখ কালো হয়ে গেল। রুপুর মা এগিয়ে এসে ভীতু কণ্ঠে বলল,
“তুই একা কেন? জামাই কোথায়?”
রুপু হাসার চেষ্টা করল। এতে যেন রুপুর বোকাসোকা মায়ের আরও চিন্তা বেড়ে গেল। রুপুর মা চারপাশে সর্তক সৃষ্টি বুলিয়ে খপ করে রুপুর একহাত চেপে ধরল। তারপর ঝড়ের গতিতে রুপুকে টেনে ঘরের ভেতরে নিয়ে গেল। রুপু বিরক্ত হয়ে বলল,

“এত টানাটানি করছ কেন মা? হাত ছাড়ো। ব্যথা লাগছে।”
“লাগুক ব্যথা। তুই আগে বল জামাই কোথায়? তুই একা একা আসতে গেলি কেন? নাকি ওরা তোকে তাড়িয়ে দিয়েছে।”
“বালাইষাট.. ওরা আমাকে তাড়িয়ে দেবে কেন? আমিই এসেছি।”
রুপুর মা কেঁদে ফেলল। বলল,
“তুই কেন একা আসতে গেলি?”
“এককথা এতবার বলো নাতো মা। বিরক্ত লাগে। তোমার কান্না করা শেষ হলে চোখের জল মুছো। তারপর কী কী রান্না করেছ। আমাকে খেতে দাও। আমি ভরপেট ভাত খেয়ে তারপর বিদায় হবো।”
রুপুর মা রুমা হতভম্ব হয়ে গেল। তার মাথা ঘুরছে। মেয়ের কথার আগামাথা কিছুই বুঝতে পারছে না সে। মেয়েটা স্পষ্ট করে কিছু বলছেও না।

“তোর বাবা কিন্তু তোকে একা আসতে দেখে প্রচণ্ড রেগে গেছে।”
“বাবা শুধু শুধু আমার উপরে রাগ করছে। আমি তো আর এই বাড়িতে সারাজীবনের জন্য থাকতে আসিনি। মাত্র দুই তিন ঘণ্টার জন্য এসেছি। এতেই যদি বাবা রেগে ফায়ার হয়ে যায়। তাহলে তো হবে না মা।”
“রুপু শোন এত হেঁয়ালি আমার ভালো লাগছে না। তুই কেন একা আসতে গেলি সেই কথা আগে বল।”
“বলব মা। আগে আমাকে খেতে দাও। তারপর সব বলছি। ভালো কথা অথৈ কোথায়? ওকে তো দেখছি না।”
“অথৈ একটু মার্কেটে গেছে।”
“ওহ।”
রুপু ঘরটার দিকে ভালো করে তাকাল। ঘরটা একটুও চেঞ্জ হয়নি। রুপুর মধ্যবিত্ত বাবা একটা সরকারি স্কুলে শিক্ষকতা করে। যা মাইনে পায় তার প্রায় অর্ধেক টাকা ঘরভাড়া দিতেই চলে যায়। বাকি অর্ধেক টাকা সংসারের পেছনে খরচ হয়ে যায়। রুপুরা মফস্বলে ভাড়া বাড়িতে থাকে। একতলার একটা দুই রুমের ফ্ল্যাটে ওরা থাকে। দুটো মাঝারি সাইজের শোবার ঘর। একটা ঘরে ব্যালকনি আছে।

একটা ড্রয়িং রুম। ড্রয়িং রুমের একপাশে পুরোনো সোফা পাতা। সোফার পর্দাগুলো যদিও নতুন পাতা হয়েছে। অন্যপাশে ডাইনিং টেবিল পাতা। তার পাশেই ছোট্ট একটা রান্না ঘর। দুটো বাথরুম।
বাধ্য হয়ে ভদ্রলোক চার/পাঁচটা ব্যাচ প্রাইভেট পড়ায়। সেই টাকা দিয়েই মেয়েদের পড়ার খরচ ও সঞ্চয় করেছে। রুপুর বাবার নাম অনিন্দ্য ঘোষ। ভদ্রলোক খুব বেশি লম্বা না। ছোটখাটো মানুষ। শরীর স্বাস্থ্য ভালো। সেই তুলনায় রুপুর মা দেখতে সুন্দরী। তার যে বড় বড় দুটো মেয়ে আছে। না দেখলে কেউ বিশ্বাসই করবে না। রুপুর ছোটবোন অথৈ মায়ের গায়ের রঙ পেয়েছে। রুপুর মা দেখতে সুন্দরী হলেও বুদ্ধি অনেক কম। এবং প্রচণ্ড আবেগপ্রবণ। অল্পতেই কেঁদে ফেলার অভ্যাস আছে।
রুপু ফ্রেশ হয়ে খাবার টেবিলে এসে বসল। মা খুব যত্ন করে রুপুকে ভাত বেড়ে দিল। রুপু খুব তৃপ্তি নিয়ে খাচ্ছে। খেতে খেতে বলল,

“মা কাতলা মাছের বড় মাথাটা দাও তো। খেয়ে দেখি কেমন স্বাদ হয়েছে।”
রুমা সাথে সাথে মাছের মাথাটা রুপুর পাতে তুলে দিল।
অনিন্দ্য মেয়ের পাশে এসে বসেছে। খুব আগ্রহ নিয়ে মেয়ের খাওয়া দেখছে। রুপুকে কিছু প্রশ্ন করা দরকার। কথাগুলো এখনই বলবে নাকি রুপুর খাওয়া শেষ হলে বলবে ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না। রুপু খেতে খেতে এক পলক বাবার দিকে তাকাল। স্বাভাবিক কণ্ঠে বলল,
“বাবা বসে না থেকে জামা-প্যান্ট পাল্টে নাও। আমাকে এখুনি ওই বাড়িতে দিয়ে আসবে।”
“এখুনি?”
“হ্যাঁ এখুনি।”
“এখুনি যখন যাবি তাহলে একা একা আসতে গেলি কেন?”
“একা আসিনি বাবা। তোমাদের জামাই আমাকে নামিয়ে দিয়ে গেছে। ও আমার সাথে আসতে চেয়েছিল। আমিই বারণ করেছি।”
“বারণ করেছিস কেন?”

“হঠাৎ ওর মায়ের খুব শরীর খারাপ হলো। মাঝরাস্তায় এসে জানতে পারলাম। এদিকে ওর বাবাও বাড়িতে নেই। মায়ের ভালো-মন্দ যদি কিছু হয়ে যায়। ও ওর মাকে প্রচণ্ড ভালোবাসে বাবা। মায়ের অসুখের দিনে সে নিশ্চয়ই শ্বশুরবাড়ি এসে বসে থাকবে না।”
“সে নাহয় বুঝলাম। তুই একা আসতে গেলি কেন?”
“তোমাদের প্রচণ্ড দেখতে ইচ্ছে করছিল বাবা। বাড়ির এত কাছে এসে না দেখে গেলে মনে শান্তি পেতাম না। তাই দেখা করতে এসেছি। এবার চট করে রেডি হয়ে চলোতো আমার সাথে।”
রুপু ভরপেট ভাত খেয়ে হাত-মুখ ধুয়ে উঠে পড়ল। মায়ের পানের বাটা থেকে একটা পান বানিয়ে খেল। তারপর বাবার সাথে শ্বশুরবাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হলো।”
বিনয়কে দেখে প্রশান্তিতে বিথী রানীর চোখে জল এসে গেল। না ছেলেটা বিয়ের পর একটুও পর হয়নি। আগের মতোই আছে। নাহলে মায়ের অসুখের খবর পেয়ে মাঝরাস্তা থেকে এভাবে মায়ের কাছে ছুটে আসতে পারত না। বিনয় মায়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল,

“এখন কেমন লাগছে মা?”
“এখন একটু ভালো লাগছে বাবা।”
“কত করে বললাম চলো হাসপাতালে নিয়ে যাই। তুমি তো রাজিই হলে না।”
“আমার তেমন কিছুই হয়নি। বাথরুমে যাওয়ার পর হঠাৎ মাথা ঘুরে পা পিছলে পরে গেলাম। ওমনি প্রেশার গেল বেড়ে। বাড়িতে ময়নার মা আর আমি। ময়নার মা একা আমাকে উঠাতে পারে না। ভয় পেয়ে দিল কেঁদে। কাঁদতে কাঁদতে তোর বাবাকে ফোন দিল। সে ফোন তুলল না। তারপর তোকে কোন ফাঁকে ফোন দিয়েছে
আমি দেখিনি। পরে শুনে খুব রাগ করেছি।”
“ভাগ্যিস ময়নার মা ফোন দিয়েছিল। আমি খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম মা।”
“ভয়ের কিছু নেই বাবা। এই দ্যাখ আমি একদম সুস্থ।”
রুপু শাশুড়ী মায়ের ঘরে এসে বিনয়কে কপোট রাগ দেখিয়ে বলল,
“তুমি এখনো মাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওনি কেন? যদি হার্ট অ্যাটাক ফ্যাটাক করে ফেলে তখন কী হবে? শিগগিরই এম্বুলেন্সে ফোন দাও। যেভাবে ছুটতে ছুটতে এলে আমি তো ভেবেছি কাজ-টাজ হয়ে গেছে।”
রুপুর কথার ধরণে বিথী রানীর গা জ্বলে গেল। রুপু বিথী রানীর কাছে এসে বসল। বিথী রানীর গা মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল,

“মা হঠাৎ করে পা পিছলে বাথরুমে পড়লেন কীভাবে বলুন তো? দিনে একশোবার বাথরুমে যান। কখনো তো পড়ে যান না। বেছে বেছে আজকের দিনেই আপনাকে পড়তে হলো।”
“কী বলতে চাইছো তুমি?”
“কী আর বলব। আপনার করুণ অবস্থার কথা শুনে আপনার ছেলে পারে তো তখনই আমাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলে। আপনি আন্দাজও করতে পারবেন না মা। আপনার ছেলে আপনাকে কী পরিমাণ ভালোবাসে। নাহলে মায়ের সামান্য অসুস্থতার কথা শুনে নতুন বিয়ে
করা বউকে ওভাবে মাঝ রাস্তায় ফেলে আসে কেউ।”
“তুমি তখন বিনয়ের সাথে আসলেই পারতে।”
“আমি তো আসতেই চেয়েছিলাম মা। আপনার ছেলেই তো আমাকে আনল না। বলল, রুপু মায়ের তো তেমন সিরিয়াস কিছু হয়নি। তুমি তোমার বাড়ির এত কাছে এসে বাবা-মায়ের সাথে দেখা না করে গেলে খারাপ দেখায়। তুমি তোমার বাড়িতে কিছুক্ষণ থাকো। আমি বিকালের দিকে গাড়ি পাঠিয়ে দেব। বাবার বাড়িতে গিয়ে আপনার চিন্তায় একদণ্ড শান্তি পেলাম না। তাই আপনার ছেলের গাড়ি পাঠানোর ভরসা না করে বাবাকে নিয়ে চলে এসেছি। ভালো করেছি না মা?”

বিথী রানীর গায়ে জ্বালা ধরে গেল। মেয়েটা কী কোন অবস্থাতেই তাকে দুদণ্ড শান্তি দেবে না।
রুপুর বাবা বিথী রানীর সাথে দেখা করে রাতের দিকে চলে গেল। রুপুর খুব ইচ্ছে করছিল। বাবাকে আজকের রাতটা এই বাড়িতে থেকে যাওয়ার কথা বলতে। বিথী রানী যদি বাবাকে গহনা কম দেবার জন্য অপমান করে সেই ভয়ে সাহস পায়নি। রুপুর বিয়ের পর বাবা প্রথমবার রুপুর শ্বশুরবাড়িতে এসে ভাত না খেয়েই চলে গেল। সকালে কত খাবার দেখে গেল রুপু। অথচ রাতে দেখল, কিছু ভাত আর ডাল ছাড়া কোন তরকারি ফ্রিজে নেই। রান্না করে অবশ্য খাওয়ানো যেত। বাবা রুপুকে কিছুতেই রান্না করতে দিল না। অসুস্থ রোগীকে দেখতে এসে সে কিছুতেই ভাত খাবে না। বাবা তো আর জানে না। রুপুর শাশুড়ীর পুরোটাই ভাণ। উপায় না পেয়ে বাবাকে শুধু চা-বিস্কুট খাইয়ে বিদায় দিতে হলো।
রাতে রুপু শাশুড়ী মায়ের ঘরে এসে বসল। বলল,

“মা এখন আপনার শরীর কেমন?”
“একটু ভালো।”
“মা আমি আপনাকে একটা কথা জানাতে এলাম।”
“আমার এখন কোন কথা শুনতে ইচ্ছে করছে না।”
“না শুনলেও আমি কথাটা বলে তারপর বিদায় হবো।”
বিথী রানী বিরক্ত হয়ে বলল,
“কী বলবে বলো?”
“আমি ঠিক করেছি আপনি সুস্থ হলে, আমরা আপনার বাবার বাড়ি অষ্টমঙ্গলায় যাব।”
“আশ্চর্য তুমি আমার বাবার বাড়ি অষ্টমঙ্গলায় যাবে কেন?”
“কারণ ওটা আমার মামাশ্বশুর বাড়ি তাই যাব। তাছাড়া আমার মধ্যবিত্ত বাবার এত টাকা নেই যে বার বার আপনার ছেলের জন্য একগাদা টাকা খরচ করে বাজার করে বসে থাকবে। আর বার বার এই একই নাটক দেখতে হবে আমাকে।”
বিথী রানী হতভম্ব হয়ে গেল। অস্ফুট স্বরে বলল,

“আমি নাটক করছি?”
রুপু বিথী রানীর কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“মা আপনিও খুব ভালো করে জানেন আর আমিও খুব ভালো করে জানি। তাই অযথা আমার সাথে অভিনয় করার চেষ্টা করবেন না। সবাই আপনার বড় ছেলের মতো বোকার হদ্দ না। যাইহোক যে কথা বলতে এসেছি। তো আমার মামাশ্বশর বাড়ি গিয়ে জামাই বাজারে আপনার ছেলে কত টাকা দেবে বলুনতো?”
“কত দেবে?”
“কত আবার তিন হাজার টাকা দেবে।”
“এত অল্প টাকায় কী হয় আজকাল?”
“কী হয় সেটা তো আমি জানি না মা। আপনি আমার বাবার বাড়ি যাওয়ার সময় জামাই বাজারের জন্য আপনার ছেলের হাতে মাত্র তিন হাজার টাকা দিয়ে বলেছিলেন, এই টাকাটা যেন জামাই বাজার বাবদ আমার বাবার হাতে তুলে দেয়। তখন আপনার একবারও মনে হয়নি এত অল্প টাকায় কী হয়।”
“তুমি বড্ড বেশি কথা বলো।”

“সে আপনি যাই বলুন না কেন মা। ওই তিনহাজার টাকাই আপনার ছেলেকে আমার মামাশ্বশুরের হাতে তুলে দিতে হবে। তাহলে আমি অষ্টমঙ্গলায় যাব। নাহলে যাব না। পরে আপনার ছেলের অমঙ্গল হলে আমাকে বলতে আসবেন না যেন।”
বিথী রানীকে কোন কথা বলার সুযোগ না দিয়ে রুপু নিজের ঘরে চলে গেল।
বিনয় বলল,

রুপুর বিয়ে পর্ব ৬

“এতক্ষণ কোথায় ছিলে তুমি?”
“মায়ের ঘরে।”
“মায়ের শরীর এখন কেমন?”
“আগের থেকে ভালোই তো দেখলাম। আমার কথা যদি বিশ্বাস নাহয় তুমি গিয়ে দেখে আসতে পারো।”
বিনয় আহত চোখে রুপুর দিকে তাকাল। বলল,
“তুমি আমার সাথে শুধু শুধু রাগ করছ রুপু।”

রুপুর বিয়ে পর্ব ৮