Home রুপুর বিয়ে রুপুর বিয়ে পর্ব ৮

রুপুর বিয়ে পর্ব ৮

রুপুর বিয়ে পর্ব ৮
Bobita Ray

রুপু নিঃশব্দে ব্যালকনিতে চলে গেল। আকাশে তারার হাঁট বসেছে। জ্যোস্নায় চারপাশ মাখামাখি। রুপু আনমনা হয়ে আকাশের দিকে তাকিয়েছিল। বিনয় কখন রুপুর পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে ঠিক পায়নি রুপু। রুপুর ঘাড়ে গরম নিঃশ্বাস অনুভব হতেই আবেশে কেঁপে উঠল রুপু। এইমুহূর্তে জায়গাটা থেকে সরে যেতে ইচ্ছে করছে না। আবার বিনয়ের কাছে থাকতেও ইচ্ছে করছে না। কি যে ইচ্ছে করছে রুপু নিজেও জানে না।
বিনয় রুপুর মুখোমুখি দাঁড়াল। চাঁদের আলোতে রুপুর বিষণ্ণ মুখের দিকে তাকিয়ে বলল,
“মা হঠাৎ অসুস্থ নাহলে তোমাকে কিছুতেই আমি মাঝ রাস্তায় ফেলে আসতাম না রুপু।”

রুপুর প্রচণ্ড বিরক্ত লাগছে। মা ছাড়া বিনয় কোন কথা শুরু করতে পারে না বোধহয়। সবসময় মায়ের গল্প শুনতে ভালো লাগে না। তা কে বোঝাবে এই বোকার হদ্দকে। যে চোখের ভাষা বুঝে না। সারাক্ষণ মুখের কথার উপরে চলে। তাকে নিয়ে রুপু সারাজীবন সংসার করবে কীভাবে? কথাটা ভেবেই রুপুর হতাশা বেড়ে গেল হাজারগুন।
“আমার মায়ের সাথে আমি একটানা ৩৭৮ দিন কথা বলিনি।”
বিনয় চমকে উঠে রুপুর মুখের দিকে তাকাল। এ-ও কী সম্ভব? মায়ের সাথে বিনয় সর্বোচ্চ দশমিনিট কথা না বলেই তো থাকতে পারে না। ওর কেমন দম বন্ধ হয়ে আসে। সেখানে রুপু পাক্কা এক বছর কথা বলেনি।”
“তুমি এসব কী বলছ রুপু?”
রুপুর মুখ হাসি হাসি। বলল,
“বিশ্বাস হচ্ছে না তাই না? কেউ বিশ্বাস করে না জানো? আমি কথা না বলায় আমার মা যে কী পরিমাণ কষ্ট পেত। তা আমি ভাষায় প্রকাশ করে তোমাকে বোঝাতে পারব না। মা শুধু আমার পা ধরা বাকি রেখেছিল। তারপরও আমার মন একটুও নরম হয়নি। অতিষ্ঠ হয়ে মামাবাড়ি গিয়ে পাঁচমাস মতো থেকে এসেছি। যেন রোজ রোজ মায়ের এত নাটক সহ্য করা না লাগে।”

“আমি ঠিক বুঝতে পারছি না। কেন তোমার মাকে এত কষ্ট দিতে তুমি? কেন তার সাথে কথা বলতে না।”
“সেই কারণটাই তো তোমাকে এখন বলব আমি। খুব মন দিয়ে শুনবে কিন্তু।”
“আমি আমার ঠাকুমাকে প্রচণ্ড ভালোবাসতাম। একটা সময় পর্যন্ত আমার চোখে দেখা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানুষ ছিল আমার ঠাকুমা। আমার সেই ঠাকুমা যখন বয়সের ভাড়ে নুইয়ে পড়ল। সংসারে কাজকর্ম করার শক্তি হারাল। তখন আমার মা আমার ঠাকুমাকে দুচোখ পেতে দেখতে পারত না। এমন কোন কটুকথা নেই যে আমার মা আমার ঠাকুমাকে মুখের উপরে বলেনি। ভালো ভালো খাবারগুলো সবসময় আমাদের জন্য আলাদা করে তুলে রাখতো মা। কখনো আমার ঠাকুমাকে খেতে দিতো না। আর যে আসতো তার কাছেই মা খুব রসিয়ে রসিয়ে আমার ঠাকুমার নামে বদনাম করতো। খুব বিশ্রী বিশ্রী কথা বলতো। প্রায়ই বলতো বুড়ি মরে না কেন! মরলে বাঁচি। আমার হাড্ডি মাংস তো আগেই জ্বালিয়ে খেয়েছে। বাকিটুকু না খাওয়া পর্যন্ত এই বুড়ির মরণ নেই। শেষের দিকে এমন হলো আমার মা আমার ঠাকুমার সাথে কথা বলতো না।

ওনার সামনে খাবার নিয়ে যেত না। আমাদেরও দূরে দূরে সরিয়ে রাখতে চাইতো। ঠাকুমার একবার খুব অসুখ করল। মা কিছুতেই বাবাকে টাকা খরচ করে ডাক্তার দেখাতে দেবে না। কিছুতে না মানে কিছুতেই না। আমার নরম সরম মায়ের এই কুৎসিত রূপ আমি কিছুতেই মেনে নিতে পারতাম না। বলতে গেলে এই নিয়ে সারাক্ষণ মায়ের সাথে আমার ঝগড়া লেগে থাকতো। সেই মুহূর্তে পৃথিবীর সবচেয়ে খারাপ মানুষ আমার মাকে মনে হতো। নিজেকে ওনার মেয়ের পরিচয় দিতেও আমার ঘৃণা লাগতো। শেষের দিকে আমার ঠাকুমার খাওয়া-দাওয়া বন্ধ হয়ে গেল। সারা শরীর জুড়ে বড় বড় ঘা। সেই ঘায়ে পচন ধরে গেল। ঠাকুমার গায়ে তীব্র গন্ধে আমরা কেউ ঠাকুমার কাছে যেতে পারতাম না। যেদিন ঠাকুমার মৃত্যু হলো। একটু জল খাওয়ার জন্য পাগলের মতো চিৎকার করেছে। আমার পাষাণ মা কিছুতেই ঠাকুমাকে জল দিল না। আমি যখন স্কুল থেকে এসে জল নিয়ে ঠাকুমার কাছে ছুটে গেলাম। গিয়ে দেখলাম, আমার বৃদ্ধ ঠাকুমা মরে পরে আছে। ইশ, কী কষ্টেই না তার মৃত্যু হয়েছে। আমার ঠাকুমার মৃত্যুতে সবচেয়ে বেশি খুশি ছিল আমার মা। সে বেশ ফুরফুরে মেজাজে ঠাকুমার মৃত্যুর পরের বাকি কাজগুলো খুব নিষ্ঠার সাথে করল।”
“তোমার মাকে দেখে মনেই হয়নি ওনি এত খারাপ।”
রুপু দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,

“আমার মা-তো খারাপ না। তাকে আমার ঠাকুমা পিসিরা মিলে দিনের পর দিন শারীরিক-মানসিক নির্যাতন করে করে খারাপ বানিয়ে দিয়েছে। মা আমার বাবার সংসারে আসার পর থেকে এমন কোন কষ্ট নেই যে ভোগ করেনি। খাবার কষ্ট, কাপড়-চোপড়ের কষ্ট, শোবার কষ্ট। সবরকম কষ্ট তারা খুব আয়োজন করে মাকে দিয়েছে। সারাদিন গাধার খাটুনি খাটিয়ে মাকে ভাত খেতে দিতো না। মা ভাত খেতে চাইলে এমন সব কথা শোনাতো। মায়ের ভাত খাওয়ার রুচিই চলে যেত। বাবা তখন বাড়ি থাকে না। চাকরির জন্য অন্য জায়গায় থাকে। মা বাবার পা পর্যন্ত ধরেছে। তাকে সাথে নিয়ে যাওয়ার জন্য। বাবা প্রথমে রাজিও হতো। পরে আমার ঠাকুমা বাবার সামনে মায়ের সাথে এত ভালো ব্যবহার করতো। বাবা লজ্জায় পড়ে মাকে বাড়িতে রেখে যেতে বাধ্য হতো। পর পর দুটো মেয়ে সন্তান জন্ম দেওয়ার জন্য আমার ঠাকুমা পারে তো আমার মাকে বাড়ি থেকেই বের করে দেয়। কত রকমের চেষ্টা যে করেছে আমার মাকে অপবাদ দিয়ে তাড়ানোর। শুধু আমার বাবা আমার মাকে প্রচণ্ড ভালোবাসতো দেখেই বোধহয় মাকে তাড়াতে পারেনি। তবে আমাদের জন্মের পর বেশকিছু বছর মাকে আমার মামা বাড়ি থাকতে হয়েছে। আমার ঠাকুমার দ্বারা আমার মা জীবনে এতবেশি কষ্ট পেয়েছে। শেষ বয়সে ওনি যখন কোনো ছেলেমেয়ের ঘরে জায়গা না পেয়ে আমার মায়ের কাছে এসে উঠল। তখন আমার মা-ও আমার ঠাকুমাকে দুচোখ পেতে দেখতে পারতো না। প্রচণ্ড ঘৃণা করতো। কিন্তু আমরা তো আর এতকিছু জানতাম না। বরাবরই আমার ঠাকুমা দারুণ অভিনেত্রী ছিলেন। মাকে আমাদের চোখে দজ্জাল বানিয়ে দিয়ে নিজে মহান সেজে থাকতো।

এই পৃথিবীতে এখনো এমনকিছু শাশুড়ী আছেন। যারা গোটা দুনিয়ার কাছে ভালো থাকলেও একমাত্র ঘরের বউকে তাদের আসল রুপ দেখায়। সংসারকে যুদ্ধক্ষেত্র মনে করে। আর ছেলের বউকে বানায় প্রতিদ্বন্দ্বী।
তারা ভুলে যায়। তাদের গরম রক্ত একদিন ঠাণ্ডা হবে। শরীরের শক্তি ফুরাবে। বউয়ের বিয়ের প্রথমদিকের সুখের জীবন নষ্ট করতে করতে তাদের শেষের জীবনও হবে ভয়ংকর।”
এই প্রথম নির্দ্বিধায় বিনয় রুপুর কাঁধে হাত রাখল। রুপুকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিয়ে বলল,
“আমি বুঝতে পারছি বিয়ের প্রথমদিনের ঘটনাটার জন্য তুমি এখনো আপসেট হয়ে আছো। আমার মা এতটাও খারাপ না। বিশ্বাস করো রুপু।”
রুপু বুকচিরে গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলল। বিনয়কে দোষ দিয়ে লাভ নেই। ফ্যামিলি পলিটিক্স সবাই বুঝতে পারে না। চরিত্রগুলো এত নিখুঁত ভাবে একেক জনের সাথে একেক রকম অভিনয় করে। ভুক্তভোগী ছাড়া অন্যকেউ ধরতেই পারে না কার মনে কখন কী চলে।
রুপু বিনয়ের হাতটা সরিয়ে দিল। বলল,

“আমি যখন মায়ের অতীত জেনেছি। প্রতিনিয়ত অনুশোচনায় ভুগেছি। মায়ের কাছে বার বার ক্ষমা চেয়েছি।
মা প্রায়ই একটা কথা বলতো, যখন তোর বিয়ে হবে। তুই অন্য একটা সংসারের বউ হয়ে যাবি। তখন আমাকে পুরোপুরি তুই বুঝবি। যাইহোক অনেক রাত হয়েছে। চলো ঘুমাবে।”
রুপু ঘরে এসে কোন কথা না বলে চট করে ঘরের দরজা খুলে ফেলল। ময়নার মা ভয় পেয়ে পালাতে লাগল। রুপু ময়নার মায়ের শাড়ির আঁচল পেছন থেকে শক্ত করে টেনে ধরল। টানতে টানতে বাথরুমের কোণায় নিয়ে গেল। চাপা কণ্ঠে বলল,

“তুমি আমার ঘরে সামনে এতরাতে কী করছিলে?”
ময়নার মা ভয় পেয়ে শুকনো ঢোক গিলল। প্রাণপনে স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করে বলল,
“কিছু না.. কিছু না। আমি তো বাথরুমে যাইতেছিলাম। তখনই হুট করে দরজা খুললে তুমি। আমিও ভয় পেয়ে গেলাম।”
“একদম মিথ্যা কথা বলবে না আমার সাথে তুমি। সত্যি করে বলো তোমাকে মা পাঠিয়েছে তাই না?”
“কী যে বলো তুমি..”
“এই কাজের জন্য কতটাকা বকশিস দিয়েছে তোমাকে?”
“নতুন বউদি তুমি যা ভাবছো তা না…”
“বলো কত টাকা দিয়েছে।”
এই পর্যায়ে ময়নার মা কেঁদে ফেলল। শাড়ির আঁচল মুখে গুঁজে বলল,
“আমার ভুল হয়ে গেছে নতুন বউদি। তুমি তো জানো তোমার শ্বশুর বাড়িতে নাই। আমি বড়মার ঘরের মেঝেতে বিছানা করে শুয়েছিলাম। তখনই তোমার শাশুড়ী আমাকে ডেকে বলল,

“ আমার জন্য জল নিয়ে আয়।”
আমি বললাম,
“জল তো আছে বড়মা।”
বড়মা কটমট করে আমার দিকে তাকাল। বলল,
“জল থাকলে জল ফেলে দিয়ে আমার জন্য নতুন করে নিয়ে আয়। আর যাওয়ার সময় অবশ্যই দেখবি বিনয়ের ঘরের লাইট জ্বলছে নাকি। ওরা দুজন রাত জেগে ফিসফিস করে কথা বলছে নাকি। এবার যা। বড়মার কথামতো আমিও…
“আচ্ছা জলের বোতল আমার হাতে দিয়ে তুমি এখন তোমার ঘরে শুতে যাও।”
ময়নার মা ভয়ে ভয়ে জলের বোতল রুপুর হাতে দিল। রুপু জলের বোতল হাতে নিয়ে সরাসরি শাশুড়ী মায়ের ঘরে চলে গেল। ভেতর থেকে ঘরের দরজা বন্ধ করে দিতেই অসময়ে রুপুকে দেখে বিথী রানী ভড়কে গেল। শাশুড়ী মায়ের ভয় জড়ানো মুখের দিকে তাকিয়ে রুপু মিষ্টি করে হাসল। জলের বোতল শাশুড়ী মায়ের হাতে তুলে দিয়ে বলল,

“মা আপনার নাকি খুব জল তেষ্টা পেয়েছে। চটজলদি জল খেয়ে নিন।”
“তুমি এতরাতে এখানে কী করছ?”
“অসুস্থ শাশুড়ীমাকে একা চিন্তায় রেখে জামাই নিয়ে ঘুমানো খুব অমানবিক কাজ মা। আমি আপনার একমাত্র বড়ছেলের বউ হয়ে এতবড় অমানবিক কাজ কী করে করি বলুনতো? তাই ময়নার মাকে আপনার বড় ছেলের ঘরে ঢুকিয়ে দিয়ে বাইরে থেকে ছিটকানি তুলে দিয়ে আমি আপনার কাছে ঘুমাতে এসেছি মা। এবার আপনি নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়ুন তো মা।”
বিথী রানীর বুকের রক্ত ছলকে উঠল। হতভম্ব হয়ে বোকার মতো রুপুর দিকে তাকিয়ে রইল। এই মেয়ে ডেঞ্জারাস। বিথী রানী পারে তো এখুনি লাফিয়ে নামে বিছানা থেকে। সর্বনাশ হয়ে যাবার আগে বিনয়কে ঘর থেকে বের করতে হবে। তারপর ময়নার মাকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বাড়ি থেকে বিদায় করতে হবে। একটা কাজও যদি ঠিক করে করতে পারে গাধীটা।
রুপু চট করে শাশুড়ীমাকে ধরে ফেলল। বলল,

রুপুর বিয়ে পর্ব ৭

“মা.. মা এত উত্তেজিত হবেন না আপনি। পরে আপনি আবার অসুস্থ হয়ে গেলে আপনার ছেলে আমাকেই দোষ দেবে।”
বিথী রানী বড় বড় নিঃশ্বাস ফেলে বলল,
“এই তুমি সরো.. সরো বলছি।”
“সরতে টরতে পারব না। আজ আমি আপনার ঘরেই ঘুমাব। আপনি রিলাক্স হয়ে ঘুমান তো মা। মাথা কী ব্যথা করছে? চুলে বিলি কেটে দেব?”

রুপুর বিয়ে পর্ব ৯