Home রুহআবিষ্ট তুমি রুহআবিষ্ট তুমি পর্ব ২

রুহআবিষ্ট তুমি পর্ব ২

রুহআবিষ্ট তুমি পর্ব ২
অধরা মিনহা

দেশের সবগুলো নিউজ চ্যানেলে এখন তোলপাড় অবস্থা। চারদিকে একটাই খবর— বাংলাদেশের নাম্বার ওয়ান অভিনেতা ইফরাদ রিদান চৌধুরীকে এক তরুণীর সঙ্গে হোটেলে দেখা গেছে। শুধু এইটুকুতেই থেমে নেই। খবরের সঙ্গে যোগ হচ্ছে নানা রকম বানানো বিশ্লেষণ আর নেতিবাচক শিরোনাম।
এখনো চ্যানেলের উপস্থাপিক বলছে,
— ইফরাদ রিদান চৌধুরীর এমন কাজে তার মেয়ে ভক্তরা দুঃখ প্রকাশ করছে। আবার অনেকেই বলছে ইফরাদ চৌধুরীর এই কাজ নতুন না। তিনি প্রায়শই এমন মেয়ে নিয়ে হোটেলে যান! নিত্য নতুন মেয়েদের সাথে উনার অবাধ মেলামেশা!
এতক্ষণ ধরে লিভিং রুমের সোফায় বসে বড় টিভির স্ক্রিনে চলতে থাকা এইসব খবর চুপচাপ শুনছিল ইফরাদ। কিন্তু এবার আর নিজেকে সামলে রাখতে পারল না। হাতে থাকা সিগারেটটা ছুড়ে ফেলে ক্ষোভে বলে উঠে,

— এই বাস্টার্ডের বাচ্চার বোন নিয়ে আমি হোটেলে যেতাম তাই জানে আমি প্রায়শই মেয়ে নিয়ে হোটেলে যাই!
ইফরাদের বাঁ পাশে বসে আছেন তার বাবা ইখতিয়ার চৌধুরী, আর ডান পাশে দাঁড়িয়ে আছে সাফিন। ইখতিয়ার চৌধুরীর হাতেও সিগারেট।
ইখতিয়ার চৌধুরী ছেলেকে এত রেগে যেতে দেখে শান্ত গলায় বলেন,
— শান্ত হও রাদ। এভাবে রাগলে হবে না।
ইফরাদ উত্তেজিত কণ্ঠে বলে,
— কিভাবে শান্ত হবো? কিসব ফালতু ব্লেইম লাগাচ্ছে আমার উপর! আর ঐ মেয়ে! যত নষ্টের গোড়া! ওকে পাই একবার, ট্রাস্ট মি জ্যান্ত পুতে দিবো!
ইখতিয়ার চৌধুরী চিন্তিত স্বরে বলেন,
—এখন এই নিউজ ধামাচাপা দিবে কিভাবে? যদি ব্যাপারটা পরিষ্কার না হয়, তাহলে তোমার চরিত্রে দাগ লেগে যাবে!
ইফরাদ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলে,

— ভাবছি সবগুলো নিউজ চ্যানেলকে টাকা খাইয়ে চুপ করাবো!
ইখতিয়ার মাথা নাড়িয়ে বলেন,
— ধরা যাক নিউজ চ্যানেলগুলো চুপ করালে। কিন্তু তোমার ফ্যান আর সাধারণ মানুষের মনে তো বিষয়টা থেকে যাবে। আর এতে তোমার ক্যারিয়ারেও সমস্যা হবে!
ইফরাদ বিরক্ত গলায় বলে,
— সমস্যা কি কি হবে সেসব জানি আমি! এখন উপায় বলো!
ইখতিয়ার একটু ভেবে বলেন,
— একটা উপায় আমার কাছে আছে। এতে সব মিডিয়া আর অন্যদের মুখ বন্ধ হয়ে যাবে। আর এইসব অভিযোগও তোমার ওপর থেকে সরে যাবে।
ইফরাদ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে বাবার দিকে তাকায়। চোখে প্রশ্ন— কী উপায়?
ইখতিয়ার আবার বলেন,

— কিন্তু তুমি রাজি হবে না, আমি জানি!
ইফরাদ বিরক্ত হয়ে বলে,
— এত রহস্য না করে উপায় বলো।
ইখতিয়ার চৌধুরী গম্ভীর কণ্ঠে বলেন,
— মেয়েটাকে বিয়ে করে নাও।
ইফরাদ কিছু বলার আগেই পাশ থেকে ভেসে আসে এক নারীকণ্ঠ,
— ইম্পসিবল! এটা কখনো হবে না। জীবনেও না।
তিনজনেই ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায়। একটু দূরেই দাঁড়িয়ে আছেন ইফরাদের মা, শার্লিন ইমরোজ। কথাটা তিনিই বলেছেন। তিনি এগিয়ে এসে ইখতিয়ার চৌধুরীর পাশে বসে বলেন,
— আমার ছেলেকে আমি ঐসব রাস্তার মেয়ের সাথে বিয়ে করাবো না। রাস্তার সামান্য দুটাকার মেয়েকে বিয়ে করতে বলছো? তুমি জানো এতে রাদের সম্মান কতটা নষ্ট হবে?
ইখতিয়ার চৌধুরী শান্ত গলায় বলেন,

— বিয়ে হলে সম্মান নষ্ট হবে না। উল্টো যে সম্মান নষ্ট হতে যাচ্ছে, তা থেকে বেঁচে যাবো।
শার্লিন ইমরোজ কিছু বলার আগেই ইফরাদ কথা কেটে দিয়ে বলে,
— সম্মান গেলে যাক! কিন্তু ঐ মেয়েকে বিয়ে করবো না জীবনেও! আমি মিডিয়ার মুখ বন্ধ করাচ্ছি।
কথা শেষ করেই ইফরাদ সাফিনের দিকে তাকিয়ে বলে,
— যাও, সব নিউজ চ্যানেলগুলোর ওনারকে টাকা খাইয়ে চুপ করাও!
ইখতিয়ার গম্ভীর কন্ঠে বলেন,
— আফিম, এই কাজটা করলে উল্টো মনে হবে ওদের কথাই ঠিক। বরং তোমার উপর আসা ব্লেইমগুলোই সত্যি প্রমাণ হবে। কিন্তু তুমি যদি বিয়ে করে নাও, তাহলে ব্যাপারটা অন্যভাবে সামলানো যাবে।
ইফরাদ রাগে ফুঁসে উঠে বলে,

— বললাম তো ঐ মেয়েকে বিয়ে করবো না। চরিত্রহীন মেয়ে একটা! সেই মেয়েকে আমি বিয়ে করবো? যে অচেনা ছেলের সাথে রাত কাটায় হোটেলে!
ইখতিয়ার চৌধুরী ইফরাদকে বোঝাতে শুরু করেন,
— তো ডিভোর্স দিয়ে দিও ব্যাপারটা মিটমাট হওয়ার কিছুদিন পর! আমি তো তোমাকে সংসার করতে বলছি না। আমি শুধু বলছি, ঐ মেয়ের জন্যই তো এসব হয়েছে। তাই এখন মেয়েটাকে ব্যবহার করে সব ঝামেলা মিটিয়ে নিতে।
ইখতিয়ার চৌধুরীর কথা শেষ হতেই সাফিন ইফরাদকে বলে,
— স্যার, ইখতিয়ার স্যার কিন্তু কথাটা খারাপ বলেনি। আপনি মেয়েটাকে বিয়ে করে নিলে আমরা সবাইকে বলবো যে আপনি আপনার স্ত্রীকে নিয়েই হোটেলে গিয়েছিলেন। তখন ব্যাপারটা মিটমাট হয়ে যাবে।
ইফরাদ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। মনে মনে ভাবতে থাকে ব্যাপারটা নিয়ে। আপাতত বিয়ে করে সবার মুখ বন্ধ করাই ভালো। পরে যখন পরিস্থিতি শান্ত হবে, তখন ডিভোর্স দিয়ে দেবে। এমন দুশ্চরিত্রা মেয়ের সঙ্গে সে কখনোই সংসার করবে না। সংসার তো দূরের কথা, স্ত্রী হিসেবেও মেনে নেবে না।
অবশেষে ইফরাদ মাথা নেড়ে বলে,

— ঠিক আছে, রাজি আমি।
ইখতিয়ার চৌধুরী স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বলেন,
— তাহলে আজকেই বিয়ে করে ফেলা ভালো। আমাদের বনানীর বাসাটায় গোপনে বিয়েটা সেরে ফেলতে হবে। মিডিয়া যেন ভুলেও খবর না পায়।
সাফিন মাথা নেড়ে বলে,
— ঠিক আছে স্যার।
এরপর ইখতিয়ার চৌধুরী ইফরাদের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করেন,
— তুমি জানো মেয়েটার বাসা কোথায়? কিংবা ওর সম্পর্কে কিছু? মেয়েটাকে খোঁজ পাবে কিভাবে?
ইফরাদ বিরক্ত স্বরে বলে,
— বললাম না, এই মেয়েকে আমি জীবনে প্রথম দেখেছি! আমি জানবো কিভাবে ওর বাসা কোথায়? সাফিন জানে হয়ত। ওকে ড্রপ করে দিয়েছিলো।
তারপর সাফিনের দিকে ঘুরে বলে,
— মেয়েটাকে কোথায় ড্রপ করেছিলে?
সাফিন একটু অপ্রস্তুত হয়ে বলে,
— স্যার, মেয়েটাকে আমি ড্রপ করিনি তো! একটা ওভারে দিয়ে দিয়েছিলাম।
ইফরাদ কপাল কুঁচকে বলে,
— তো লোকেশন কি বলেছিলো মেয়েটা?
সাফিন মাথা নিচু করে বলে,
— সেসব তো শুনিনি!
ইফরাদ রাগে সাফিনের দিকে তাকায়। সাফিন ঢোক গিলে চুপ করে রইল। ইফরাদ উঠে দাঁড়িয়ে দৃঢ় স্বরে বলে,

— ঐ মেয়েকে নিয়ে আমি বনানী বাসায় আসছি। সেখানেই কথা হবে।
বলেই ইফরাদ দ্রুত বেরিয়ে গেল। সাফিনও তার পেছন পেছন চলে গেল। ওরা বেরিয়ে যেতেই সিড়ি দিয়ে হুড়মুড় করে লিভিং রুমে ঢুকে একটা ছেলে। সুদর্শন, ফর্সা গায়ের রঙ, জিমে গড়া শক্তপোক্ত শরীর। দেখতে অনেকটাই ইফরাদের মতো। উচ্চতাও ইফরাদের সমান হবে। চেহারা দেখে বোঝা যাচ্ছে, সবেমাত্র ঘুম থেকে উঠেছে। ছেলেটারর নাম ইফতিন রাইদ চৌধুরী।
লিভিং রুমে এসেই ইফতিন উত্তেজিত গলায় ইখতিয়ার চৌধুরীকে বলে,
— নিউজ, সোশাল মিডিয়ায় কিসব হচ্ছে? ব্রোর সাথে একটা মেয়ের হোটেলের ভিডিও ক্লিপ ভাইরাল হয়েছে।
ইখতিয়ার চৌধুরী উঠে দাঁড়িয়ে শান্তভাবে বলেন,
— শান্ত হও। আগে চেঞ্জ করে এসো। তোমাকে নিয়ে বাইরে যাবো। রাস্তায় সব বলছি।
ইফতিন অবাক হয়ে বলে,
— এত কুল হয়ে আছো কিভাবে, ড্যাড? আমি ঘুমিয়ে ছিলাম। আমার ফ্রেন্ড, কলিগরা, ডিরেক্টর রা সবাই ভিডিও শেয়ার করে কল দিচ্ছে, নানা কথা বলছে। জিজ্ঞেস করছে মেয়েটা কে? ব্রোর ব্যাপারে জানতে চাচ্ছে।
ইখতিয়ার চৌধুরী ধীর স্বরে বলেন,

— ঐ মেয়েকে রাদও চিনে না। কিভাবে যেন ঐ মেয়ে রাদের হোটেল রুমে ঢুকে পড়ে রাতে। তারপর বাকিটা নিউজ চ্যানেলগুলো বাড়িয়ে ছড়িয়ে ফেলে। এখন যাও, রেডি হয়ে এসো। বনানীর বাড়িতে যাবো।
ইফতিন জিজ্ঞেস করে,
— সেখানে কেন?
ইখতিয়ার বলেন,
— সেখানেই ঐ মেয়ের সাথে রাদের বিয়ে হবে। এখন লেইট করো না। যাও।
ইফতিন মাথা নেড়ে বলে,
— আচ্ছা, আমি রেডি হয়ে আসছি।
বলেই ইফতিন চলে গেল। এবার ইখতিয়ার চৌধুরী শার্লিন ইমরোজের দিকে তাকিয়ে বলেন,
— তুমি যাবে?
শার্লিন ইমরোজ দৃঢ় কন্ঠে বলেন,
— আমি গেলে আমার ছেলের সর্বনাশ হতে দিবো না।
ইখতিয়ার চৌধুরী বলেন,

— তাহলে থাকো এখানে!
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামছে। আকাশে লালচে আভা ছড়িয়ে আছে, অন্ধকার নামতে আর বেশি দেরি নেই। আনতারা এখনও হেঁটে চলেছে। মাঝে অবশ্য একবার একটা পার্কে বসে বিশ্রাম নিয়েছিল, তবে সেটা প্রায় এক ঘণ্টা আগের কথা। এখন তার পা আর চলছে না। কিন্তু থামবে কোথায়? যাবেই বা কোথায়? তার তো যাওয়ার মতো কোনো জায়গা নেই। অন্যমনস্ক হয়ে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎই আনতারা রাস্তার মাঝখানে চলে আসে। ঠিক তখনি তার হুঁশ ফেরে।
পাশ ফিরে তাকাতেই দেখে একটা কালো গাড়ি একদম তার সামনে! মুহূর্তেই তার মনে হয়—সব শেষ! ভয়ে আনতারা চোখ বন্ধ করে ফেলে। কয়েক মুহূর্ত কেটে যায়। কিন্তু কোনো আঘাত লাগে না, কোনো ব্যথাও অনুভব করে না আনতারা। আনতারার মনে প্রশ্ন জাগে,
— তবে কি সে মরে গেছে? তাই কি শরীরে ব্যথা লাগছে না?
আনতারা ধীরে ধীরে চোখ খুলে দেখে, গাড়িটা তার একদম কাছেই এসে থেমে আছে। সে অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। ঠিক তখনি গাড়ির পেছনের সিট থেকে একজন পুরুষ নেমে আসে। তাকে দেখেই আনতারা চিনতে পারে—সকালের সেই হোটেলের ছেলেটা, অভিনেতা ইফরাদ রিদান চৌধুরী। সামনের সিট থেকেও আরেকজন নেমে আসে। সেই ছেলে, যে সকালে আনতারাকে গাড়িতে তুলে দিয়েছিল অর্থাৎ সাফিন।
ইফরাদ এসে আনতারার সামনে দাঁড়িয়ে চোখ মুখ শক্ত করে বলে,

— এই মেয়ে! তোমাকেই তো খুঁজছিলাম। চল আমার সাথে।
বলেই ইফরাদ খপ করে আনতারার হাত ধরে টেনে গাড়িতে বসিয়ে দেয়। তারপর নিজেও গাড়িতে উঠে বসে। আনতারা বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকে, কিছুই বুঝতে পারে না। সাফিনও আবার গাড়িতে উঠে বসে। ড্রাইভার গাড়ি চালাতে শুরু করে। ইফরাদ একবার আনতারার দিকে তাকিয়ে সিটে হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলে। বিস্ময় কাটতেই আনতারা ভয় পেতে শুরু করে। সকালে ইফরাদ তাকে হুমকি দিয়েছিল, আবার সামনে এলে মেরে ফেলবে। সেই কথা মনে পড়তেই তার বুক কেঁপে ওঠে। তবে কি তাকে মেরে ফেলার জন্যই নিয়ে যাওয়া হচ্ছে?
আনতারা কাঁপা গলায় বলে,

— গাড়িতে তুলেছেন কেন? কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন আমাকে?
ইফরাদ কোনো উত্তর দেয় না। যেন কথাটা শুনতেই পায়নি। আনতারা এবার সামনে বসা সাফিনের দিকে তাকিয়ে বলে,
— ভাইয়া? আপনারা কি আমাকে মেরে ফেলার জন্য নিয়ে যাচ্ছেন? কিন্তু আমি তো উনার সামনে আসিনি! আমি তো আগেই এই রাস্তায় ছিলাম। আপনারা পরে এসেছেন!
আনতারার কথা শুনে ইফরাদ চোখ খুলে ভ্রু কুঁচকে তাকায়। সাফিনও অবাক হয়।
ইফরাদ দাঁতে দাঁত চেপে বলে,
— আই উইশ এখন যদি তোমাকে মেরে ফেলতে পারতাম!
এই কথা শুনে আনতারা ভয়ে সঙ্কুচিত হয়ে যায়। ঠোঁট কামড়ে সাহস জোগাড় করে বলে,
— কি খারাপ মানুষ আপনি! একটা মানুষকে মেরে ফেলার হুমকি দিচ্ছেন!
এবার আর ইফরাদ নিজেকে সামলাতে পারে না। রাগে ফেটে পড়ে। হাত বাড়িয়ে আনতারার গাল শক্ত করে চেপে ধরে আনতারাকে সিটের সাথে চেপে ধরে।
ইফরাদ দাঁতে দাঁত চেপে বলে,

— খারাপের দেখেছিস কি তুই? তুই কি ভেবেছিস তোকে এতো সহজে ছেড়ে দিবো? তোর খুব শখ না ইফরাদ রিদান চৌধুরীর সাথে রাত কাটানোর? রাত তো কাটিয়েছিস, এর ফল ভুগবি না, বাজারের মেয়ে? তোর জীবন নরক করে দিবো! এটা ইফরাদ রিদান চৌধুরীর প্রমিজ! এখন চুপচাপ মুখ বন্ধ করে বস। আর একটা শব্দ বের হলে মুখ থেকে আজীবনের জন্য মুখ বন্ধ করে দিবো।
বলেই ইফরাদ সরে আসে। জোরে জোরে শ্বাস নিয়ে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করে। আনতারা ছলছল চোখে সিটে আগের অবস্থাতেই পড়ে থাকে। নড়ে না। গালটা জ্বালা করছে অনেক জোরে চেপে ধরায়। তার থেকেও বেশি কষ্ট দিচ্ছে ইফরাদের বাজারের মেয়ে বলায়। আনতারা ধীরে ধীরে সোজা হয়ে বসে। তার খুব কান্না পাচ্ছে। একটা রাতেই যেন তার পুরো জীবন অভিশাপে পরিণত হয়েছে। সবকিছু হারিয়ে ফেলেছে সে। চারদিকে শুধু অপমান আর তুচ্ছতা। আর চরিত্রে এমন এক দাগ, যা হয়তো কোনোদিন মুছবে না।
শুধু সমাজের চোখে না, তার নিজের কাছেও সে অপরাধী। মনে হচ্ছে তার আখিরাতও শেষ হয়ে গেল। এত নামাজ, এত ইবাদত, সব কি তবে সেই এক রাতেই নষ্ট হয়ে গেল? অথচ সেই রাতের কিছুই তার মনে নেই। কিভাবে সে ইফরাদের রুমে গেল, কী হয়েছিলো, কিছুই মনে নেই। এই অজান্তে ঘটে যাওয়া পাপের কথা মনে হলেই তার বুক ফেটে যায়। ছলছল চোখে সে ইফরাদের দিকে তাকায়।

সামনের সিটে বসে সাফিন লুকিং গ্লাসে সব দেখছে। তার মনটা খারাপ হয়ে যায় আনতারার জন্য। মেয়েটার মুখটা কত নিষ্পাপ। এত নূরানী চেহারার একটা মেয়ে কি সত্যিই এসব করতে পারে? কিন্তু যা ঘটেছে, সেটাও তো অস্বীকার করা যায় না।
তবুও আনতারার জন্য তার খুব মায়া লাগছে। সে নিঃশব্দে দীর্ঘশ্বাস ফেলে চোখ ফিরিয়ে নেয়।
কিছুক্ষণ পর গাড়ি এসে থামে। সাফিন দ্রুত নেমে ইফরাদের পাশের দরজা খুলে দেয়। ইফরাদ গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়ায়। তারপর গাড়ির ভেতরে ঝুঁকে আনতারার দিকে চোখ সরু করে তাকিয়ে বলে,
— ইনভিটেশন দিতে হবে নামার জন্য?
আনতারা মুখটা মনমরা করে গাড়ি থেকে নামে। নামার সঙ্গে সঙ্গেই ইফরাদ আনতারার হাতটা শক্ত করে ধরে গাড়ির ওপাশে নিয়ে যায়। ইফরাদের স্পর্শে আনতারা অস্বস্তিতে কেঁপে ওঠে। পরপুরুষের হাত ধরা তার জীবনে এই প্রথম। সে হাত ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু ইফরাদ চোখ রাঙিয়ে আরও শক্ত করে হাত চেপে ধরে। হাতটা ছেড়ে দেওয়ার জন্য বলতে চেয়েও বলতে পারে না। দেখা গেলো আরো কিছু নোংরা গালি দিয়ে দিবে ইফরাদ আনতারাকে।

ইফরাদ আনতারাকে নিয়ে বিল্ডিংয়ের ভেতরে ঢোকে। লিফটে উঠে সোজা ১৪ তলায় গিয়ে থামে। আনতারা কিছুই বুঝতে পারছে না। কেন তাকে এখানে আনা হয়েছে। কিছু জিজ্ঞেস করতেও ভয় করছে। বললে হয়তো আবার তার চরিত্র নিয়ে নোংরা কথা শুনতে হবে। লিফট থেকে নেমে ইফরাদ আনতারাকে নিয়ে এপার্টমেন্ট ‘A’ এর সামনে আসে। দরজা খোলা।
ভেতরে ঢুকতেই দেখে লিভিং রুমে বসে আছেন ইফরাদের বাবা ইখতিয়ার চৌধুরী, ছোট ভাই ইফতিন এবং কাজি সাহেবও তার দুজন সহকারী। ইফরাদকে দেখেই ইফতিন এগিয়ে আসে। তারপর আনতারাকে পা থেকে মাথা পর্যন্ত দেখতে থাকে। অবশ্য দেখছে বললে ভুল হবে। ইফতিন যেন রীতিমতো চোখ দিয়ে আনতারাকে স্ক্যান করছে। ইফতিনের এমন তাকানোই আনতারা ভীষণ অস্বস্তি বোধ করে। আনতারা মাথা নিচু করে ফেলে।
ইফতিন কিছুক্ষণ আনতারাকে দেখে নিয়ে বলে,

— আই থিংক ব্রো, এই মেয়ে ইচ্ছে করে তোমাকে ফাঁসিয়েছে তোমাকে বিয়ে করার জন্য। ভোলাভালা ফেইস দেখিয়ে ভিকটিম কার্ড প্লে করে তোমাকে বিয়ে করার জন্য এসব করেছে!
ইফতিনের এসব কথায় আনতারা অপমানিত বোধ করে। তার মনে হয় মাটিতে মিশে যেতে। এতো অপমান, অপদস্ত আর সহ্য হচ্ছে না।
ইফতিনের কথা শুনে ইফরাদ দাঁতে দাঁত চেপে আনতারার দিকে তাকিয়ে বলে,
— শখ যেহেতু হয়েছে, মিটিয়ে দিবো সব শখ!
তখনি ইখতিয়ার চৌধুরী ডেকে উঠেন,
— আচ্ছা, পরে কথা হবে। এখন এসো মেয়েটাকে নিয়ে।
ইফতিন সরে দাঁড়ায়। ইফরাদ আনতারাকে নিয়ে সোফায় বসে পাশাপাশি। কাজি সাহেব বিয়ের রেজিস্ট্রি বই খুলে তথ্য লেখার প্রস্তুতি নেন। তারপর ইফরাদের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করেন,
— মেয়ের নাম কি?
ইফরাদ তো আনতারার নামই জানে না। সে আনতারার দিকে ঘুরে তাকিয়ে বলে,

— এই মেয়ে, তোমার নাম কি?
কাজির হাতে থাকা বিয়ের কাগজ দেখে আনতারা বুঝে যায়, তাকে বিয়ে করার জন্যই এখানে আনা হয়েছে। কিন্তু কেন? নিজের সম্মান বাঁচাতে? ফ্যানদের সামনে মুখ রক্ষা করতে? এই ভাবনার মধ্যে আনতারা চুপ করে থাকে।
ইফরাদ বিরক্ত হয়ে আবার বলে,
— কি জিজ্ঞেস করেছি আমি?
আনতারা নিচু স্বরে উত্তর দেয়,
— মারজানা।
কাজি সাহেব প্রশ্ন করেন,
— মা, নামের আগে-পিছে কিছু নেই?
আনতারা শান্তভাবে বলে,
— মারজানা আমার ডাকনাম। আমার মা রেখেছিলো। আসল নাম আনতারা শেখ।
ইফরাদ সঙ্গে সঙ্গে ধমক দিয়ে ওঠে,
— এই মেয়ে, তোমাকে কেউ বলেছে ডাকনাম বলতে? অসহ্য ইরিটেটিং মেয়ে!
ইফরাদের ধমকে আনতারা অপমানিত বোধ করে। মাথা নিচু করে ফেলে। কাজি সাহেব এবার তার বাবার নাম জিজ্ঞেস করেন। আনতারা সোজাসুজি বাবার নাম বলে দেয়। সব লিখে নিয়ে কাজি সাহেব এবার ইফরাদের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করেন,

— দেনমোহর কত নির্ধারণ করবো?
কাজি সাহেবের প্রশ্নের উত্তরে ইফরাদ ঠান্ডা গলায় বলে,
— দেনমোহর তালাক লিখেন। স্পেশাল বিয়ে যেহেতু, দেনমোহরটাও স্পেশাল থাকুক! তালাক দিয়েই নাহয় স্ত্রীর কাছে যাবো। এমনিতেও ওর পরপুরুষদের সাথে মেলামেশা করার অভ্যাস আছে। তাই তালাকের পরও কাছে গেলে কোনো সমস্যা হবে না।
কথাটাগুলো শুনে আনতারা লজ্জায় অপমানে চোখ বন্ধ করে ফেলে। কান্না আসতে নেয় কিন্তু আনতারা আটকে ফেলে চোখের জল। একই সাথে তার মাথায় নানা প্রশ্ন ঘুরতে থাকে। দেনমোহর আবার তালাক হয় নাকি? বিয়ে তো আল্লাহর একটি সুন্দর বিধান! সেটাকে নিয়ে এমন তামাশা কীভাবে করে কেউ? এই মানুষের অন্তরে কি আল্লাহভীতি নেই? সে এক অদ্ভুত মানুষের দেখা পেলো যে তাকে নোংরা কথা এবং আল্লাহ বিধান নিয়ে তামাশা করতে দুবার ভাবে না।
ইখতিয়ার চৌধুরী আনতারার মুখের ভয়ের ছাপ দেখে কিছুটা ধমকের স্বরে বলেন,

— এটা কি ধরনের ফাজলামো, রাদ? দেনমোহর নিয়ে এসব কেউ বলে! কাজি সাহেব, আপনি দেনমোহর ৩০ লাখ লিখেন।
তারপর তিনি আনতারার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করেন,
— তোমার কোনো আপত্তি আছে ৩০ লাখ টাকা দেনমোহরে?
আনতারা চুপ করে থাকে। সে এখনো ইফরাদের কথার ধাক্কা সামলাতে পারেনি। উত্তর না পেয়ে ইখতিয়ার চৌধুরী কাজিকে বলেন,
— চুপ থাকা সম্মতির লক্ষণ! আপনি ৩০ লাখই লিখেন।
সব তথ্য লিখে নিয়ে কাজি সাহেব আনতারার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করেন,
— আপনি কি ইখতিয়ার চৌধুরীর বড় ছেলে ইফরাদ রিদান চৌধুরীর সাথে ৩০ লাখ টাকা দেনমোহরে বিবাহে সম্মতি প্রদান করছেন? রাজি থাকলে মা, কবুল বলেন।
প্রশ্নটা শুনে আনতারা ইফরাদের দিকে তাকায়। ইফরাদ তীক্ষ্ণ, প্রশ্নবিদ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার দিকে। আনতারা মনে মনে ভীষণ দ্বন্দ্বে পড়ে যায়। এই মানুষটি তার সম্পূর্ণ বিপরীত। যার মাঝে ইসলামী চিন্তাধারা নেই, আল্লাহভীতি নেই। কিন্তু বিয়ের আগে তার সঙ্গে রাত কাটানো বিশাল বড় গুনাহ হয়ে গেছে। যদি তাদের মধ্যে হারাম সম্পর্ক হয়ে থাকে, তাহলে বিয়ের মাধ্যমে সেটাকে হালাল করা ভালো। তারপর সে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইবে।

আল্লাহ তো পরম দয়ালু, পরম ক্ষমাশীল। পাহাড়সম গুনাহও তিনি মাফ করেন। হয়তো এই বিয়েটাই আল্লাহর ইচ্ছা— ভুলকে শুদ্ধ করার সুযোগ। এদিকে ইফরাদ বিরক্ত চোখে তাকিয়ে আছে। তার মনে হচ্ছে, এত ভাবার কী আছে? মেয়েটা তো নিজেই তাকে ফাঁসিয়ে বিয়ে করতে চেয়েছিল! হয়তো এখনো নাটক করছে। তার কাছে আনতারা একটা নাটকবাজ মেয়ে ছাড়া কিছু না।
আনতারা চোখ নামিয়ে আনে। ধীরে চোখ বন্ধ করে মনে মনে বলে উঠে,
— আল্লাহ, আমি আমার অজান্তে করা পাপের তওবা চাইছি। আমি জানি, আমার রব আপনি পরম করুণাময়ী, দয়াশীল। আপনি আমার এই ইচ্ছাকে কবুল করে নিন। এই যাত্রা আপনার রহমত আর নেয়ামতে পরিপূর্ণ করে দিন, আল্লাহ রব্বুল আলামীন।
আনতারা চুপ থাকায় কাজি সাহেব আবার জিজ্ঞেস করেন,
— আপনি কি ইখতিয়ার চৌধুরীর বড় ছেলে ইফরাদ রিদানের সাথে বিবাহে সম্মতি প্রদান করছেন? রাজি থাকলে মা, কবুল বলেন।
আনতারা চোখ খুলে দৃঢ় কণ্ঠে বলে,

— আলহামদুলিল্লাহ, কবুল! কবুল! আমি ইফরাদকে স্বামী হিসেবে কবুল করছি।
ঘরে উপস্থিত সবাই ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলে ওঠে, শুধু ইফরাদ ছাড়া। তার কাছে পুরো ঘটনাটা অসহনীয় বিরক্তির। সে বাধ্য হয়ে সব করছে।
কাজি সাহেব এবার ইফরাদের দিকে তাকিয়ে বলেন,
— বাবা, আপনি কি আজাদ শেখের বড় মেয়ে আনতারা শেখকে বিবাহের জন্য রাজি আছেন? রাজি থাকলে বলুন কবুল।
ইফরাদ এক মুহূর্তও সময় নেয় না। সঙ্গে সঙ্গে বলে,

রুহআবিষ্ট তুমি পর্ব ১

— কবুল, কবুল, কবুল!
বিয়ে সম্পন্ন হয়। সবাই তাদের সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য মোনাজাতে হাত তোলে। কিন্তু সত্যিই কি তাদের সামনে কোনো সুন্দর ভবিষ্যৎ আছে? দুজন সম্পূর্ণ আলাদা জগতের মানুষের সংসার কেমন হবে? তা কি সত্যিই সুন্দর হবে? ইফরাদ কি তা হতে দেবে?

রুহআবিষ্ট তুমি পর্ব ৩