রুহআবিষ্ট তুমি পর্ব ৫
অধরা মিনহা
সন্ধ্যা তখন আটটা। আনতারা সদ্য এশারের নামাজ শেষ করেছে। নামাজের পর শান্তভাবে বসে তসবিহ পড়ছে। তার ঠোঁটে ধীরে ধীরে উচ্চারিত হচ্ছে দোয়া— আস্তাগফিরুল্লাহ…. আস্তাগফিরুল্লাহ। মনোযোগ দিয়ে তসবিহ পড়ছে। ঠিক তখনি দরজায় নক হয়।
আনতারা শুনতে পেলেও কোনো জবাব দিতে পারে না। কারণ সে তখনো তসবিহ পড়ার মাঝখানে। কিছুক্ষণ পর দরজাটা নিজেই খুলে ভেতরে ঢুকে একটা মেয়ে। মেয়েটির পরনে সাদা ক্রপ টপ। তার ওপর আকাশী আর সাদা রঙের স্তর করা স্টেপ-স্টাইল শার্ট। নিচে স্কার্ট, পায়ে স্নিকার্স।চুলগুলো গোল্ডেন আর কালোর মিশ্রণে রঙ করা।
দেখতে চোখ ধাঁধানো সুন্দর। আনতারা তাকিয়ে মেয়েটাকে দেখে। মনে মনে আন্দাজ করে, হয়তো মেয়েটা তার সমবয়সী, না হলে একটু বড়। মেয়েটি দরজার কাছে দাঁড়িয়ে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে আনতারার দিকে তাকিয়ে রইল। আনতারা কিছু বলতে পারে না। তসবিহ শেষ হয়নি এখনও। সে সামান্য অস্বস্তি নিয়ে চোখ নামিয়ে রাখল। অবশেষে আনতারার তসবিহ পড়া শেষ হলো। সে মাথা তুলে মেয়েটির দিকে তাকিয়ে শান্ত কণ্ঠে বলে,
— আসসালামু আলাইকুম।
মেয়েটি একই তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রেখেই এগিয়ে এসে আসতে আসতে বলে,
— ওয়ালাইকুম সালাম।
একটু থেমে মেয়েটা আবার জিজ্ঞেস করে,
— চিনো আমি কে?
আনতারা ধীরে দুদিকে মাথা নেড়ে বুঝিয়ে দেয়, সে চিনে না। মেয়েটি ঠান্ডা গলায় বলে,
— তুমি যাকে মাস্টার প্ল্যান করে বিয়ে করেছো, ইফরাদ রিদান চৌধুরীর বোন ইরাইনা ইলান চৌধুরী।
আনতারা আস্তে করে বলে,
— ওহ।
ইরাইনা আবার বলে,
— দেখতে তো একদম ভোলাভালা লাগছে! অবশ্য এটাই তো তোমাদের অস্ত্র, বড়লোক ছেলে ফাঁসানোর!
এবার আনতারা চোখ তুলে তাকায়। ইরাইনার কথাটা তার ভালো লাগে না। কণ্ঠটা একটু দৃঢ় করে আনতারা,
— আমি ফাঁসিয়ে বিয়ে করিনি! ইফরাদ নিজ ইচ্ছে আমায় বিয়ে করেছে!
ইরাইনা ভ্রু সামান্য উঁচু করে। ঠোঁটের একপাশে ব্যঙ্গের হালকা হাসি ফুটিয়ে বলে,
— ওয়াও! গলায় দেখি জোর আছে!
আনতারা আবার চোখ সরিয়ে নেয়। দৃষ্টি নিচু, কিন্তু চোখে আগের মতোই দৃঢ়তা। আনতারা শান্ত কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে বলে,
— আপু, জোরের কিছু না। কিন্তু সত্যিই আমি ওমন মেয়ে না। আপনারা সবাই আমাকে ভুল বুঝছেন।
ইরাইনা কঠিন দৃষ্টিতে আনতারার দিকে তাকিয়ে বলে,
— আমরা তোমাকে তোমার আসলটাই বুঝেছি! আর যদি এতই ভালো হও তাহলে চলে যাও!
আনতারা অবাক হয়ে ইরাইনার দিকে তাকায়। তারপর জিজ্ঞেস করে,
— কোথায় যাবো আমি?
ইরাইনা সরাসরি বলে,
— তোমার বাড়িতে!
আনতারা শান্তভাবে উত্তর দেয়,
— আমাকে বের করে দিয়েছে!
— বাড়িতে রাখার মতো কাজও করোনি!
আনতারা চুপ করে রইল। কিছুক্ষণ পর ইরাইনা আবার বলে,
— চুপ হয়ে গেলে কেন? এখন আর গলায় জোর নেই?
আনতারা এবার চোখ তুলে তাকায়। শান্ত কণ্ঠে বলে,
— যে বুঝতে চায় কিংবা বিশ্বাস করতে চায়, তাকে বুঝানো কিংবা বিশ্বাস করানো যায়। কিন্তু এই বাড়ির কেউই আমাকে বিশ্বাস করতে চায় না, আর আমার কথা বুঝতেও চায় না। তাই গলা ফাটিয়ে চিৎকার করেও কোনো লাভ নেই। সেজন্য চুপ হয়ে গেছি।
ইরাইনা তীক্ষ্ণ স্বরে বলে,
— চিৎকার করে কি বলতে চাও? বলতে চাও সেদিন ব্রো হোটেল রুমে যাওনি? নাকি ব্রোয়ের সম্মতিতে গেছো?
আনতারা ধীর কণ্ঠে বলে,
— যে রাতের কিছুই আমার মনে নেই, সেই রাত নিয়ে কি বলব? কিন্তু আপনারা যেভাবে আমার চরিত্র নিয়ে নোংরা কথা বলছেন, আমি সেরকম না। আমি প্ল্যান করে আপনার ভাইকে ফাঁসিয়ে বিয়ে করিনি। উনাকে তো আমি চিনিই না। আমি কুরআনের হাফেজা। অন্য জগতের মেয়ে। আমি শুধু আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগি নিয়েই থাকতে পছন্দ করি। আপনার ভাইয়ের টাকায় দুনিয়ার ভোগবিলাস করার কোনো লোভ আমার নেই।
ইরাইনা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। সে আনতারার দিকে ভালো করে তাকিয়ে আনতারাকে বোঝার চেষ্টা করে। মনে মনে ভাবে, আনতারা কি সত্যিই এমন? নাকি এসব কথা বলে সবাইকে বোকা বানানোর চেষ্টা করছে? ধর্মের কথা বলে কি নিজেকে ভালো প্রমাণ করতে চাইছে? কিছুক্ষণ পর্যবেক্ষণ করার পর তার মনে হলো, না। আনতারা মিথ্যা বলছে না কিংবা অভিনয়ও করছে না।
ইরাইনা স্বাভাবিক কন্ঠে বলে,
— ভোগবিলাসের লোভ না থাকলে আমার ভাইকে বিয়ে করতে না। কুরআনের হাফেজা মেয়ে অন্তত মিডিয়ার ছেলে কিংবা এক্টরকে বিয়ে করে না। নিজের মতো কুরআনে হাফেজকেই বিয়ে করে।
আনতারা নরম স্বরে বলে,
— এই বিয়েটাকে আমি আল্লাহর পক্ষ থেকে এসেছে বলে মনে করি। আর আল্লাহর পক্ষ থেকে যা আসে, তা অবশ্যই উত্তম হয়। এই বিয়ের ভবিষ্যৎ কি হবে আমি জানি না। তবে যেহেতু এটা আল্লাহর হুকুমে হয়েছে, নিশ্চয়ই এর মধ্যে ভালো কিছু আছে।
— তোমার ভালো হোক কিংবা খারাপ, আই ডোন্ট কেয়ার। কিন্তু আমার ভাইয়ের সাথে খারাপ কিছু হতে আমি দেবো না। যদি খারাপ করার চিন্তা নিয়ে জীবনে এসে থাকো, তাহলে মনে রেখো তোমার সাথে অনেক অনেক খারাপ হবে।
আনতারা শান্তভাবে বলে,
— আমি সচেতনভাবে কখনো কারও ক্ষতি করিনি। এমন চিন্তা কখনো কল্পনাতেও আনিনি। সেখানে নিজের স্বামীর ক্ষতির কথা কিভাবে ভাববো? ইফরাদ আমাকে স্ত্রী হিসেবে কবুল করুক বা না করুক, আমি ইফরাদকে কবুল করেছি। বিয়ের আজ একদিন। এই একদিনে যতবার আল্লাহর কাছে হাত তুলেছি, ততবার আমার দোয়ায় ইফরাদকে রেখেছি।
আনতারার কথা ইরাইনার ভালো লাগল। তবে সে পুরোপুরি নরম হলো না। আগের তুলনায় একটু শান্ত স্বরে বলে,
— ক্ষতি করবে কি করবে না সেটা জানি না। তবে জানিয়ে রাখলাম।
বলেই ইরাইনা চলে যায়। আনতারা চুপ করে রইল। সে জানে সেই রাতের ঘটনাটা সবার জন্য সহজে মেনে নেওয়া সম্ভব না। আনতারা ভুল করেছে—এটা আনতারা মানে। আর সেই কারণেই সে অনেক কিছু সহ্য করছে। সবার কথা চুপচাপ শুনছে। সবকিছু ঠিক করার চেষ্টা করছে। সে ইফরাদের সাথে সম্পর্ক ঠিক করারও চেষ্টা করছে। ইফরাদের রাগ, খারাপ কথা—সবকিছুই সহ্য করছে, কারণ সে মনে করে ভুলটা তারই ছিল। তবুও সে একটু চায়, সবাই অন্তত সেই রাতের ঘটনাকে নিয়ে তাকে এভাবে কষ্ট না দিক। একটা মেয়ের জন্য তার চরিত্র অনেক মূল্যবান। নিজের জীবনের থেকে বেশি ভালোবাসে।
আর যখন সেই মেয়েকেই তার চরিত্র নিয়ে খারাপ কথা শুনতে হয়, তখন ভেতরটা ভেঙে যায়। এদিকে ইরাইনা ইফরাদের রুম থেকে বের হতেই সামনে ইফরাদের সাথে দেখা হয়।
ইফরাদ ইরাইনাকে দেখে ভ্রু কুচকে বলে,
— তুমি কখন এসেছো? তোমার তো আরও তিনদিন পর আসার কথা ছিল।
ইরাইনা স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলে,
— বড় ভাই বিয়ে করেছে, এই গুড নিউজ শুনে নিজেকে আটকাতে পারিনি। তাই চলে আসলাম।
ইফরাদ অবাক হয়ে বলে,
— হোয়াট দা হেল, ইলান? এই থার্ড ক্লাস বিয়ের খবর শুনে তুমি এত বড় প্রজেক্ট ফেলে চলে এসেছো!
— ফেলে আসিনি। কাজ মোটামুটি শেষ হয়ে এসেছে। আমি না থাকলেও এখান থেকে ডিরেকশন দিলেই হবে। তাই এসেছি।
ইফরাদ রাগে বিরক্তিতে বলে,
— ইলান, তোমাকে আমি রেসপন্সিবল মনে করতাম। কিন্তু তুমি এই সামান্য একটা বিষয়ের জন্য কাজ ফেলে…
ইরাইনা ইফরাদকে থামিয়ে বলে,
— সামান্য এটা, ব্রো? গতকাল থেকে সোশ্যাল মিডিয়ায় যা দেখছি তোমাকে আর মেয়েটাকে নিয়ে! তার উপর আজ দুপুরে আবার দেখলাম তুমি বলছো তোমাদের নাকি এক বছর আগে বিয়ে হয়েছে!
ইফরাদ রাগ আর বিরক্তিতে ফোঁসফোঁস করে ওঠে,
— ওসব মিথ্যে বলেছি। ক্যারিয়ার আর রেপুটেশন বাঁচানোর জন্য। তুমি তো ফোন করে জিজ্ঞেস করতে পারতে। এভাবে আসার কি দরকার ছিল?
ইরাইনা শান্তভাবে পরিস্থিতি সামলানোর ভঙ্গিতে বলে,
— ওকে ব্রো, কুল। রেগে যাচ্ছো কেন?
ইফরাদ রাগ চেপে বলে,
— গত দুই দিন ধরে এসব কারণে আমার মেজাজ অনেক খারাপ। তার ওপর এখন এমন একটা ছোট বিষয়ে তুমি এত গুরুত্বপূর্ণ কাজ ফেলে চলে এসেছো, এটা ভেবেই আরও বেশি রাগ হচ্ছে।
ইরাইনা আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গিতে ইফরাদকে আশ্বস্ত করে,
— এই ব্যাপার নিয়ে চিন্তা করার কিছু নেই। ইরাইনা ইলান চৌধুরী নিজের কাজ ঠিকভাবেই করে। তাই চিন্তার কোনো কারণ নেই। পারফিউম ঠিক সময়েই লঞ্চ হবে। আর আই’ম সিওর, আমাদের অন্য প্রোডাক্টগুলোর মতো পারফিউমও টপে থাকবে।
— সেটাই যেন হয়।
ইরাইনা মাথা নেড়ে। তারপর কিছুটা কৌতূহল চোখে প্রশ্ন করে,
— হুম। এখন বলো, বিয়ে তো করেছো। এই বিয়ে নিয়ে এখন কি করবে?
ইফরাদ এই প্রশ্নের উত্তর দেয় না। বিষয়টা এড়িয়ে গিয়ে শুধু শান্ত গলায় বলে,
— যাও, রেস্ট নাও। সেখানে অনেক পরিশ্রম করেছো।
ইরাইনা একটু থেমে, সরাসরি ইফরাদের দিকে তাকিয়ে বলে,
— তুমি কি এই বিষয়টা নিয়ে কথা বলতে চাইছো না?
ইফরাদ বিরক্তির স্বরে বলে,
— আমি শুধু ওই মেয়েটাকে গুরুত্ব দিতে চাই না। তুমিও দিও না।
ইরাইনা আর কথা বাড়ায় না। বলে,
— ওকে।
বলেই ইরাইনা চলে গেল। ইফরাদ রুমে ঢুকে দেখে, রুম খালি। কেউ নেই রুমে। ইফরাদ হাতে থাকা কোটটা সে বিছানার ওপর ছুড়ে। তারপর গলার টাই ঢিলা করে খুলে সেটাও বিছানায় ফেলে দেয়। এরপর সে আলমারির কাছে গিয়ে দরজা খুলে। শাওয়ার নেওয়ার জন্য কাপড় বের করতে লাগল। একটা ব্লু টি-শার্ট আর কালো ট্রাউজার বের করে। আলমারির দরজা বন্ধ করতে যাবে, তখন তার চোখে কিছু পড়ে। সে আলমারি বন্ধ না করে ভেতর থেকে কয়েকটা হ্যাঙ্গার বের করে। নিজের কাপড়ের মাঝখানে দেখতে পায় শালোয়ার কামিজ আর ওড়না।
ইফরাদ বুঝতে পারে, এগুলো আনতারার কাপড়। কারণ তার রুমে অন্য কোনো মেয়ের কাপড় থাকার কথা না। এটা দেখে তার মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। রাগে ইফরাদ চিৎকার করে বলতে লাগল,
— এই মেয়ে! কোথায় তুমি? এই মেয়ে! ডাকছি আমি!
আনতারা বেলকনিতে বসে ছিল। তার মন খুব খারাপ। বাড়ির কথা মনে পড়ছিল। বাবাকে মনে পড়ছিল, বোনকে মনে পড়ছিল, মাকেও মনে পড়ছিল। এই কারণেই সে বেলকনির মাটিতে বসে দূরের আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিল। আনতারার যখন মন খারাপ থাকে, তখন সে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে। এতে তার মন ধীরে ধীরে ভালো হয়ে যায়। তার মনে হয়, আল্লাহ তার চোখের কষ্ট সহ্য করতে পারেন না। তাই যখনই সে কষ্টভরা চোখে আকাশের দিকে তাকায়, কিছুক্ষণ পরই তার মনটা হালকা হয়ে যায়। আনতারা আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিল।
এমন সময় হঠাৎ সে ইফরাদের চিৎকার শুনতে পায়। সে দ্রুত উঠে দাঁড়ায় এবং তাড়াতাড়ি রুমের দিকে গেল। রুমে ঢুকে দেখে, ইফরাদের মুখ রাগে শক্ত হয়ে আছে। সে রাগ চেপে রাখার চেষ্টা করছে, কিন্তু তার মুখভঙ্গি খুব কঠিন লাগছে।
আনতারা এগিয়ে এসে বলে,
— কি হয়েছে ইফরাদ?
ইফরাদ আনতারার দিকে তাকায়। ইফরাদের মুখ শক্ত হয়ে আছে। কঠিন গলায় বলে,
— আমার কাভার্ডে কাপড় রাখার সাহস কোথায় পেয়েছো তুমি?
আনতারা শান্তভাবে বলে,
— তাহলে কোথায় রাখবো আমার কাপড়? এই রুমে তো কাপড় রাখার আর কোনো জায়গা নেই।
ইফরাদ তীক্ষ্ণ স্বরে বলে,
— মাটিতে রাখবে! তোমার জায়গা যেমন মাটিতে, তেমনি তোমার কাপড়ের জায়গাও মাটিতেই!
আনতারা আগের ভঙ্গিতেই বলে,
— সবারই শেষ জায়গা মাটিতেই হবে। আপনি ধনী বলে আপনার শেষ জায়গা আসমানে আর আমার মাটিতে হবে, এমন না।
ইফরাদ দাঁতে দাঁত চেপে রাগ নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করতে করতে বলে,
— থাপ্পড় মেরে না তোমার দাঁত সবগুলো ফেলে দেবো। কালকে রাতে কি করেছি ভুলে গেছো?
আনতারা ধীর কণ্ঠে বলে,
— না, ভুলিনি।
ইফরাদ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আবার বলে,
— মনে আছে, তাহলে ভয় হয়নি আমার কাভার্ডে তোমার কাপড় রাখতে?
— কাপড় আমি রাখিনি।
ইফরাদ সঙ্গে সঙ্গে প্রশ্ন করে,
— কে রেখেছে?
— আপনাদের বাসার হেল্পিং হ্যান্ড।
ইফরাদ রাগ নিয়ে বলে,
— নাম বলো। দেখি কার এত সাহস হয়েছে আমার কাভার্ডে তোমার কাপড় রাখার, আমার থেকে পারমিশন না নিয়ে। আজকেই তাকে চাকরি থেকে বের করে দেবো।
আনতারা চুপ করে রইল। সে বুঝতে পারছে ইফরাদ খুব রেগে আছে। সত্যিই হয়তো শাহনারাকে কাজ থেকে বের করে দিতে পারে। কিন্তু সেটা সে চায় না। তার কারণে কারও ক্ষতি হোক, এটা সে চায় না।
তাই আনতারা কথা ঘুরিয়ে শান্ত স্বরে বলে,
— ঠিক আছে, আমি আর আপনার কাভার্ডে কাপড় রাখবো না। শান্ত হন। রাগারাগি করে বাইরে লোকজনকে জানানোর প্রয়োজন নেই।
ইফরাদ ভ্রু কুঁচকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে আনতারার দিকে তাকায় এবং ধীরে ধীরে আনতারার দিকে এগিয়ে এল। তাদের মাঝে এখন প্রায় দুই হাত দূরত্ব।
ইফরাদ কড়া স্বরে বলে,
— এই মেয়ে, তুমি আমাকে বলবে আমি কি করবো আর কি করবো না?
আনতারা শান্তভাবে বলে,
— আপনার তো আমার কাপড় রাখা নিয়েই সমস্যা ছিল। আমি কাপড় সরিয়ে নিচ্ছি। তাহলে সমস্যাও শেষ।
ইফরাদ কঠিন স্বরে বলে,
— কাপড় সমস্যা না। সমস্যা তুমি। তোমাকে যদি আমার জীবন থেকে সরিয়ে নিতে পারতাম, তাহলে আমার জীবনে কোনো সমস্যাই থাকত না।
আনতারা চোখমুখ শক্ত করে ফেলে। কন্ঠে দৃঢ়তা নিয়ে বলে,
— আমি যদি সমস্যাই হয়ে থাকি, তাহলে এই সমস্যাকে বিয়ে করে আজীবনের জন্য কেন নিজের জীবনে জড়িয়ে নিলেন? সম্মান রক্ষা করার জন্য অন্য কোনো পথ দেখে নিতেন।
ইফরাদ ফুঁসে ওঠে,
— ছিল না কোনো পথ। যদি থাকত, তাহলে অন্তত তোমার মতো চরিত্রহীন মেয়েকে বিয়ে করতাম না।
আনতারা এবার আগের তুলনায় দ্বিগুণ দৃঢ়তা নিয়ে বলে,
— আমি চরিত্রহীন না, ইফরাদ। আমার আল্লাহ জানেন আমি কেমন। সেই রাতে কি হয়েছিল আমি জানি না। তবুও আমার ভুলের জন্য আমি অনুতপ্ত। আমি আমার আল্লাহর কাছে ক্ষমা চেয়েছি এবং আমার বিশ্বাস, তিনি আমাকে ক্ষমা করে দিয়েছেন। তাই আজকের পর থেকে আমি আর কোনো দিন সেই রাতের জন্য ক্ষমা বা সাফাই কিছুই দেব না।
ইফরাদ বিদ্রুপের হাসি দিয়ে বলে,
— সাফাই করার মুখ তোমার আছে? অবশ্য তুমি নিলজ্জ। আমি তোমার কাছ থেকে এক বিন্দু লজ্জাও আশা করি না।
আনতারা মুখ ঘুরিয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে রইল। আজ তার চোখে জল এল না। সে নিজেকে শক্ত করে রাখল। কিন্তু কথাগুলো তার মনে কষ্ট দিয়েছে। তবুও সে ইফরাদকে বুঝতে দিতে চাইল না যে সে কষ্ট পাচ্ছে। কারণ সে বুঝে গেছে, ইফরাদ ইচ্ছে করেই এমন কথা বলছে যাতে সে কষ্ট পায়।
মুখ অন্যদিকে রেখেই আনতারা বলে,
— সরুন। আমি আমার কাপড়গুলো নিয়ে যাব।
ইফরাদ বিরক্ত মুখে সরে দাঁড়ায়। আনতারা আলমারি থেকে নিজের কাপড়গুলো বের করে নেয়। তারপর আনতারা আলমারি থেকে বের করা কাপড়গুলো এনে চেয়ারের ওপর রাখে। সেটা দেখে ইফরাদ ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করে,
— এখানে কেন রাখছো?
আনতারা জোরে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। তারপর নিজের কাপড়গুলো নিয়ে আবার বেলকনিতে চলে গেল। এদিকে ইফরাদ ওয়াশরুমে ঢুকে পড়ে। কিছুক্ষণ পর শাওয়ার নিয়ে বের হয়। ইফরাদ হেয়ার ড্রায়ার দিয়ে চুল শুকিয়ে নেয়। তারপর বিছানার উপর এসে ধপ করে শুয়ে পড়ে। ইফরাদের শরীরের এখন খুব ঘুম দরকার। সকালে মাথাব্যথা নিয়ে ঘুম থেকে উঠেছিল। এরপর মিডিয়া প্রেস কনফারেন্স, তারপর আরও নানা বিষয় সামলাতে হয়েছে। সব মিলিয়ে সে খুব ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। তার ওপর সকালে খুব তাড়াতাড়ি ঘুম থেকেও উঠেছিল।
মোটকথা, এই মুহূর্তে তার ঘুম খুব প্রয়োজন। ইফরাদ রুমের লাইট নিভিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। কিছুক্ষণ পর আনতারা বেলকনি থেকে ফিরে রুমে আসে। রুম অন্ধকার দেখে সে বুঝতে পারে ইফরাদ ঘুমিয়ে পড়েছে। আনতারারও শরীর ক্লান্ত লাগছে। তারও ঘুম দরকার। কিন্তু সে কিছুক্ষণ দ্বিধায় দাঁড়িয়ে রইল। সে বুঝতে পারছিল না কোথায় ঘুমাবে। বিছানায় ইফরাদের পাশে শুলে যদি ইফরাদ রেগে যায়? আবার এই রুমে কোনো সোফাও নেই যে সেখানে শুয়ে পড়বে।
রুহআবিষ্ট তুমি পর্ব ৪
গতকাল তো কাঁদতে কাঁদতেই জায়নামাজের ওপর ঘুমিয়ে পড়েছিল। কিন্তু আজ কোথায় ঘুমাবে?
কিছুক্ষণ ভেবে আনতারা সিদ্ধান্ত নেয়। সে ঠিক করে, ইফরাদের পাশেই ঘুমাবে। ধীরে ধীরে গিয়ে চুপচাপ ইফরাদের পাশে শুয়ে পড়ে।
