Home রুহআবিষ্ট তুমি রুহআবিষ্ট তুমি পর্ব ৪

রুহআবিষ্ট তুমি পর্ব ৪

রুহআবিষ্ট তুমি পর্ব ৪
অধরা মিনহা

সারারাত আল্লাহর কাছে হাত তুলে কাঁদতে কাঁদতে কখন যে আনতারা ঘুমিয়ে পড়েছিল, সে নিজেও বুঝতে পারেনি। ফজরের আজানের ধ্বনি কানে আসতেই আনতারার ঘুম হালকা হয়ে আসে। পিটপিট করে চোখ খুলে তাকায়। কিছুটা সময় লাগে বুঝতে যে সে কোথায় আছে। কয়েকটার সেকেন্ড যাওয়ার পর বুঝতে পারে, সে জায়নামাজের উপরই সিজদারত অবস্থায় ঘুমিয়ে পড়েছিল। চারপাশে এখনো ফজরের আজানের ধ্বনি ভেসে আসছে।
আনতারা ধীরে ধীরে উঠে বসে। বেডের দিকে চোখ পড়তেই দেখে, ইফরাদ এখনো গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। সঙ্গে সঙ্গে আনতারার মনে পড়ে যায় রাতের সব কথা। আনতারা ইফরাদের থেকে চোখ সরিয়ে জায়নামাজ থেকে উঠে জায়নামাজ টা ভাজ করে ওয়াশরুমে ঢুকে পড়ে। ফ্রেশ হয়ে নেয়, তারপর যত্ন করে ওযু করে বের হয়। আবার জায়নামাজ বিছিয়ে নীরব, শান্ত রুমে দাঁড়িয়ে ফজরের নামাজ আদায় করে নেয়। নামাজ শেষ হওয়ার পরও কিছুক্ষণ জায়নামাজে বসে থাকে আনতারা। ধীর কণ্ঠে দোয়া, দরুদ পড়তে থাকে।

কিছুক্ষণ পর আনতারা জায়নামাজ থেকে উঠে খুব সাবধানে ইফরাদের পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। প্রথমে একবার সূরা ফাতিহা পড়ে, তারপর তিনবার সূরা ইখলাস পড়ে। এরপর খুবই সাবধানে ইফরাদের উপর সামান্য ঝুঁকে আনতারা। ইফরাদের বুকের আর ঘুমন্ত মুখশ্রীতে আস্তে করে ফুঁ দেয়। ফুঁ দেওয়া শেষ করে চোখ বন্ধ করে মনে মনে আল্লাহর কাছে দোয়া করে বলে,
— আল্লাহ মানুষটার মেজাজ ঠান্ডা করে দিন। মনটা নরম করে দিন। রাগটা একটু কমিয়ে দিন। আর সুস্থ রাখবেন, আপনার নেয়ামতে রাখবেন সবসময়। এইটুকুই চাওয়া।

দোয়া শেষ করে আনতারা আবার তাকায় ইফরাদের দিকে। ঘুমন্ত অবস্থায় মানুষটাকে যেন একেবারে অন্যরকম লাগে। কী ভীষণ নিষ্পাপ আর শান্ত ইফরাদের মুখটা! এই মুখ দেখে বোঝার উপায় নেই, এই মানুষটার এতো রাগ। কত শান্ত মুখশ্রী! আর ততটাই চোখ ধাঁধানো সুদর্শন।
আনতারা কিছুক্ষণ চুপচাপ তাকিয়ে থাকে। এই প্রথম সে এতটা কাছে থেকে, এত মনোযোগ দিয়ে একজন পুরুষকে দেখছে। ইফরাদই তার জীবনের প্রথম পুরুষ। কিন্তু বেশিক্ষণ এভাবে তাকিয়ে থাকা যাবে না। যদি ইফরাদ টের পেয়ে যায়, তাহলে আবার রাগারাগি করবে। এই ভেবে আনতারা তাড়াতাড়ি সরে আসে। কিছুটা দূরে গিয়ে দাঁড়িয়ে ভাবে, সে কুরআন শরীফ পড়বে।
আনতারা কুরআনের হাফেজা। প্রতিদিন কুরআন পড়া তার জীবনের অংশ। প্রতিটি ওয়াক্ত নামাজের পর অন্তত এক পারা করে কুরআন শরীফ পড়ার অভ্যাস আছে আনতারার। নামাজের পর কুরআন পড়লে আনতারার মনটা অদ্ভুত শান্তিতে ভরে উঠে।

আনতারা রুমের কুরআন শরীফ খুঁজার জন্য একটু দূর গিয়েই পা জোড়া থেমে যায়।
মাথা আসে, যে মানুষের রুমে একটা জায়নামাজ পর্যন্ত নেই, তার রুমে কুরআন শরীফ কিভাবে থাকবে? গতকাল সারাদিনের ঝড়ঝাপটা, অচেনা নতুন বাড়িতে আসা, এতসব ঘটনার ভিড়ে কুরআন শরীফ পড়াই হয়নি। কিন্তু আজ থেকে আবার নিয়মিত কুরআন শরীফ পড়বে। কিন্তু কুরআন শরীফ আনতারা পাবে কোথায়? এই বাসা সম্পর্কে তো সে কিছুই জানে না, কাউকেই ভালো করে চেনে না। হঠাৎ করেই তার মনে পড়ে যায় গতকালের সেই মেইডের কথা। আনতারা রুম থেকে বের হয়ে আসে। তারপর ধীরে ধীরে করিডোর দিয়ে হাঁটতে থাকে।
গতকাল আনতারা মাথা নিচু করে মেইডের পেছন পেছন হেঁটেছিল। তাই চারপাশে কী আছে, সেভাবে খেয়ালই করা হয়নি। কিন্তু আজ সে একটু মনোযোগ দিয়ে সবকিছু দেখছে, যাতে বুঝতে পারে, কোনটা কোথায় আছে। রুম থেকে বের হয়ে কিছুটা সামনে যেতেই দেখে, দ্বিতীয় তলায় আরেকটি লিভিং প্লেস আছে। সেখানে সোফা আর টেবিল দিয়ে সুন্দর করে সাজানো একটি ফ্যামিলি লিভিং এরিয়া। সেই লিভিং প্লেসের পাশেই সিঁড়ি।

আনতারা সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে আসে। নিচে এসে লিভিং রুমের বামদিকে এগোতেই একটা বড় গ্লাসের দরজা দেখতে পায়। আনতারা দরজাটা খুলে বাইরে তাকাতেই অবাক হয়ে যায়। এই জায়গাটায় একটা সুইমিং পুল আছে। পুলের পাশেই তিনটি বেতের চেয়ার আর একটি টেবিল রাখা। আর চারপাশ বেশ সুন্দর। আনতারা কিছুক্ষণ দেখে জায়গাটা তারপর আবার সেখান থেকে ফিরে আসে। তারপর লিভিং রুমের ডানদিকে যায়। সেখানে একটা ডাইনি প্লেস আর তার সাথেই কিচেন।
কিচেনে গিয়েই আনতারা গতকালের সেই মেইডকে দেখতে পায়। মেইডটার নাম শাহানারা। আনতারা এগিয়ে যায় তার কাছে। শাহানারা তখন আরও দুই তিনজন মেইডের সাথে দাঁড়িয়ে কথা ছিলো। হঠাৎ পেছন থেকে আনতারা ডাক দিতেই তিনজনই চমকে ওঠে। ঘুরে তাকিয়ে আনতারাকে দেখে তারা অবাক হয়ে যায়। আসলে তারা আনতারাকে দেখে না বরং এত সকালে আনতারাকে এখানে দেখে অবাক হয়েছে।
শাহানারা বলে,

— মেডাম আপনি এতো সকালে? ক্ষিদে পেয়েছে?
আনতারা মাথা নেড়ে বলে,
— না। আসলে কুরআন শরীফ পড়বো। কোরআন শরীফটা একটু বের করে দিবেন?
বাকি মেইডরা যেন আকাশ থেকে পড়ে। আনতারার কথা শুনে সবাই হতভম্ব হয়ে যায়। একজন মেইড কনুই দিয়ে শাহানারাকে গুতা মেরে আস্তে করে বলে,
— এই উনি কি বললো? ভুল শুনলাম না তো?
শাহানারা ফিসফিস করে বলে,
— না। এই মেডাম অন্যরকম বাড়ির সবার থেকে। নামাজ পড়ে। গতকালকে জায়নামাজ দিলাম তাকে নামাজ পড়ার জন্য।
সেই মেইডটা আরও অবাক হয়ে বলে,
— আসলেই? কিন্তু এই মেয়ে কি এই বাড়িতে এই বাড়ির মানুষদের সাথে নিজের ইমান ঠিক রাখতে পারবে? এই বাড়ির যে অবস্থা!
আনতারা তাদের দিকে তাকিয়ে আছে। তারা ফিসফিস করে কথা বলায়, সে কিছুই বুঝতে পারছে না। তবে এটুকু বুঝতে পেরেছে, তারা আনতারাকে নিয়েই কথা বলছে। আনতারা আবার বলে,
— একটু তাড়াতাড়ি দিন না বের করে।
শাহানারা বলে,

— হ্যা, দিচ্ছি। মেডাম আপনি একটু কষ্ট করে আমার সাথে আসুন। আসলে আমার ওযু করা নেই।
আনতারা মাথা নেড়ে বলে,
— জি চলেন।
শাহানারা কিচেন থেকে বের হয়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে দ্বিতীয় তলায় যায়। তারপর করিডোর দিয়ে হাঁটতে থাকে। তার পেছন পেছন আনতারাও হাঁটছে। কিছুদূর গিয়ে শাহানারা দ্বিতীয় তলার একেবারে শেষের রুমের সামনে এসে থামে। তারপর সেই রুমের দরজাটা খুলে পকেট থেকে চাবি বের করে। দরজা খুলতেই দেখা যায়, ভেতরটা অন্ধকার। শাহানারা প্রথমে ভেতরে ঢুকে লাইট জ্বালায়। তারপর আনতারাকে ভেতরে আসতে ডাক দেয়।

— এখানে কুরআন শরীফ রাখা?
— জি।
আনতারা ভেতরে ঢুকে চারপাশে তাকিয়ে বলে,
— এটা কার রুম?
— এটা কারোর রুমই না। এক্সট্রা রুম।
— ওহ।
শাহানারা একটি চেয়ার তুলে এনে বড় কাঠের শোকেসের সামনে রেখে বলে,
— মেডাম, এটার উপরে কুরআন শরীফ রাখা।
আনতারা শাহনারার থেকে চোখ সরিয়ে চেয়ারের উপর উঠে দাঁড়ায়। হাত বাড়িয়ে শোকেসের উপরে রাখা কুরআন শরীফটা নামায়। কিন্তু হাতে নিয়েই আনতারা থমকে যায়। কুরআন শরীফের উপরে জমে আছে ধুলোর আস্তর। ময়লা আর ধুলোয় যেন ঢেকে গেছে পবিত্র সেই কিতাবটা। দেখে মনে হচ্ছে বছরের পর বছর হয়ত কুরআন শরীফের যত্ন নেওয়া হয়নি।
এটা দেখে আনতারা নিজেকে সামলাতে পারে না। আনতারার চোখ দিয়ে নিঃশব্দে পানি গড়িয়ে পড়তে থাকে। আনাতারা চেয়ার থেকে নামে। তারপর খুব যত্ন করে দুই হাত দিয়ে কুরআন শরীফের উপর জমে থাকা ধুলো আস্তে আস্তে মুছতে থাকে।

— এসব কি? কুরআন শরীরের এমন অবস্থা কেন?
— কেউ পড়ে না তো কুরআন শরীফ। সেজন্য ধুলো জমে আছে।
আনতারা যেন কিছু বলার ভাষা হারিয়ে ফেলে। রাগ হয় তার। দৃঢ় কন্ঠে বলে,
— না পড়ুক। তাই বলে এমন অযত্নে রাখবে? যে বাড়িতে কুরআন ধুলোয় বন্ধ রুমে পড়ে থাকে, সেই বাড়িতে আল্লাহর রহমত নিয়ামত কিভাবে আসবে? ওদের কারোর কি আল্লাহর ভয় নেই মনে?
আনতারার কণ্ঠে কষ্ট, আক্ষেপ আর হতাশা। ধুলো পরিষ্কার করা শেষ হলে আনতারা কুরআন শরীফটা বুকে জড়িয়ে ধরে। যেন বুকের কাছে টেনে এনে নিজেকে সান্ত্বনা দিচ্ছে।
তারপর শাহনারার দিকে তাকিয়ে বলে,

— আচ্ছা, আপনারা কি করছিলেন? আপনারা মুসলিম না? মাসে কি একবার কুরআন শরীফের ধুলো পরিষ্কার করা যায় না? এইটুকু সময় হয় না? আপনাদের একবার বুক কাপেনি কুরআন শরীফকে এভাবে অযত্নে রাখতে?
শাহানারা লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেলে। তার মুখে কোনো কথা নেই। তার নিজেরও ভেতরে ভেতরে খারাপ লাগছে। আনতারা আর কিছু বলে না। চোখের পানি মুছতে মুছতে রুম থেকে বের হয়ে আসে। আবার নিজের রুমে ফিরে আসে। চোখ দুটো এখনো ভেজা। রুমে ঢুকেই একবার ইফরাদের দিকে তাকায়। ইফরাদ এখনো গভীর ঘুমে।
আনতারা জায়নামাজে গিয়ে বসে পড়ে। কুরআন শরীফটা আবার বুকে জড়িয়ে ধরে। তারপর চোখ বন্ধ করে কাঁপা গলায় দোয়া করে,

— আল্লাহ, সবাইকে ক্ষমা করে দিন আর হেদায়েত দান করুন। আল্লাহ, ওদের ইমান মজবুত করে দিন। আপনার পথে আসার তৌফিক দান করুন।
আনতারা দোয়া শেষে চোখের পানি মুছে নেয়।তারপর কুরআন শরীফ খুলে তিলাওয়াত শুরু করে।
নরম আর মধুর কণ্ঠে কুরআন তিলাওয়াত করতে থাকে। পুরো রুমটা আনতারার কুরআন তিলাওয়াতের সুরে ভরে উঠে। ঘুমের মধ্যেই ইফরাদের কানে সেই সুন্দর হৃদয় শান্তি করা তিলাওয়াত পৌছায়। সে ধীরে ধীরে চোখ খুলে। আধখোলা চোখে তাকিয়ে দেখে, আনতারা জায়নামাজে বসে কুরআন পড়ছে। ইফরাদ একটু বিরক্ত হয় ঘুমে ব্যাঘাত ঘটায়। ভ্রু কুঁচকে তাকায়। কিন্তু কিছু বলে না।

মুখ ঘুরিয়ে আবার ওপাশ ফিরে শুয়ে পড়ে। এভাবেই প্রায় এক ঘণ্টা ধরে আনতারা কুরআন শরীফ পড়ে। তারপর ধীরে ধীরে কুরআন শরীফ বন্ধ করে উঠে দাঁড়ায়। এবার আনতারা ভাবতে থাকে, কুরআন শরীফটা কোথায় রাখা যায়। সে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, কুরআন শরীফ এই রুমেই রাখবে। কিন্তু কোথায় রাখবে? কুরআন শরীফ তো উপরে কোথাও যত্ন করে রাখতে হয়। অথচ ইফরাদের রুমে আনতারা তেমন কোনো জায়গা খুঁজে পাচ্ছে না। ঠিক তখনি আনতারার চোখে পড়ে ড্রেসিং টেবিলটা। আনতারা মনে মনে ভাবে, আপাতত এখানেই রাখি।
পরে কাউকে বলে একটা সুন্দর স্ট্যান্ডের ব্যবস্থা করবে, যাতে কুরআন শরীফ ঠিকভাবে রাখা যায়।
আনতারা কুরআন শরীফটা ড্রেসিং টেবিলের উপর রাখতে এগিয়ে যায়। ঠিক তখনই দরজায় নক হয়। আনতারা কুরআন শরীফ সাবধানে রেখে দরজার দিকে এগিয়ে যায়। আনতারা দরজা খুলতেই শাহনারাকে দেখতে পায়। আনতারাকে দেখেই শাহনারা ভদ্রভাবে জিজ্ঞেস করে,

— মেডাম, ব্রেকফাস্টে কি খাবেন?
আনতারা বাইরে এসে আস্তে করে দরজাটা লাগিয়ে দেয়। তারপর শান্ত স্বরে বলে,
— বাকিরা কি খাবে? তারা যেটা খাবে সেটাই।
শাহনারা একটু অবাক হয়ে বলে,
— বাকিদের পাবেন কোথায় আপনি? ওরা কি ব্রেকফাস্ট করে নাকি?
আনতারা ভ্রু কুচকে বলে,
— মানে? সকালে কিছু খায় না?
শাহনারা হেসে বলে,
— সকালে উঠলে তো কিছু খেতো! তিন ভাই-বোনের কাজ থাকলে সকালে ঘুম থেকে উঠেই চলে যায়, বাসায় ব্রেকফাস্ট করে না। আর যেদিন কাজ থাকে না, সেদিন কেউই সকালে ঘুম থেকে ওঠে না। হয়তো বিকেলে ঘুম থেকে উঠে, নয়তো সন্ধ্যায়।
কথাটা শুনে আনতারা একটু অবাক হয়। জিজ্ঞেস করে,

— তিন ভাই-বোন মানে? ইফরাদের বোন আছে?
শাহনারা মাথা নেড়ে বলে,
— হ্যাঁ। ইরাইনা মেডাম। সবার ছোট। ইফরাদ আর ইফতিন স্যারের জান বলতে পারেন।
— ওহ। কোথায় উনি? উনাকে তো দেখলাম না।
— উনি ব্যবসার কাজে আমেরিকা গেছেন।
— উনাদের ব্যবসা আছে?
শাহনারা অবাক হয়ে বলে,
— হ্যাঁ। আপনি জানেন না?
আনতারা মাথা নেড়ে না বোঝায়। শাহনারা বিস্মিত হয়ে বলে,
— বলেন কি! পুরো বাংলাদেশের এক নাম্বার ব্র্যান্ড চৌধুরী গ্রুপ। শুধু বাংলাদেশ না, প্রায় সব দেশেই চৌধুরী গ্রুপ পরিচিত, ড্রেস, ব্যাগ, জুতার জন্য। এখন আবার পারফিউম লঞ্চ করবে। সেটার কাজেই ইরাইনা মেডাম আমেরিকায় গেছেন।
আনতারা কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবার বলে,

— ওহ। আচ্ছা, ওরা নাহয় বাসায় থাকে না। ইফরাদের বাবা-মা? উনারা বাসায় ব্রেকফাস্ট করে না?
শাহনারা বলে,
— করে মাঝে মাঝে। ইখতিয়ার স্যার বেশিরভাগ সময় অফিসেই ব্রেকফাস্ট করেন। আর শার্লিন মেডাম? উনি কে বাসায় থাকলো আর কে না, এসবের কোনো খবরই রাখেন না। সন্ধ্যায় ঘুম থেকে ওঠেন, তারপর উনার ফ্রেন্ডদের নিয়ে আড্ডা দেন। এসবই এই বাড়িতে চলে। এটাই এই বাড়ির নিয়ম।
শাহনারার কথা শুনে আনতারার ভেতর থেকে একটা হতাশার দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে। এখন সে বুঝতে পারছে ইফরাদ এমন কেন। যে বাড়িতে মায়ের ধর্ম সম্পর্কে জ্ঞান নেই, যেখানে ধর্ম মেনে জীবনযাপন করা হয় না, সেই বাড়িতে সন্তান কিভাবে ধর্মের পথে চলবে? ইফরাদরা তো ধর্ম সম্পর্কে কোনো শিক্ষাই পায়নি।
শাহনারা আবার বলে,

— মেডাম, আপনার জন্য ব্রেকফাস্ট কি বানাবো? বললেন না তো?
আনতারা একটু ভেবে বলে,
— খিচুড়ি।
শাহনারা মাথা নেড়ে বলে,
— আচ্ছা।
শাহনারা চলে যেতে নিলে আনতারা তাকে ডেকে বলে,
— আমাকে একটা সুই আর সুতো দিবেন, সাথে একটা কাঁচি?
শাহনারা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে,
— এগুলো দিয়ে কি করবেন?
আনতারা শান্তভাবে বলে,
— কাজ আছে। একটু দিন না।
— আচ্ছা, দিচ্ছি।

কিছুক্ষণ পর শাহনারা এসে আনতারাকে সবকিছু দিয়ে যায়। আনতারা সেগুলো নিয়ে এসে সোফার উপর রাখে। রুমের বাম পাশে একটা বড় বেলকনি আছে। বেলকনির দরজাটা কাঁচের। আনতারা দরজাটা খুলে বেলকনিতে আসে। বেলকনিটা বেশ বড় এবং সুন্দর করে সাজানো। সেখানে একটি দুই সিটের লাক্সারিয়াস সোফা, একটি এক সিটের সোফা আর সামনে একটি কাঁচের টেবিল রাখা। পাশে একটা টবে লাগানো গাছ।
গতকাল যে কাপড়গুলো পড়ে ছিল আনতারা, সেগুলো আনতারা গোসলের সময় ধুয়ে এই বেলকনিতেই শুকাতে দিয়েছিল। সে বেলকনি থেকে কাপড়গুলো নিয়ে এসে সোফায় বসে জামা আর পায়জামা সুন্দর করে ভাঁজ করে রাখে। তারপর ওড়নাটা হাতে নিয়ে কাঁচি দিয়ে চার ভাগের এক ভাগ কেটে নেয়। এরপর কাটা অংশটা নিয়ে সেলাই করতে থাকে। আনতারা ছোটখাটো সেলাইয়ের কাজ জানে, তাই বেশি সময় লাগে না। প্রায় দশ থেকে পনেরো মিনিটের মধ্যেই সেলাই শেষ করে ফেলে।

কাটা কাপড়ের টুকরো দিয়ে আনতারা কুরআন শরীফের জন্য একটা সুন্দর গিলাফ বানায়। নতুন কাপড় ব্যবহার করার সাহস তার হয়নি, কারণ সেটা শার্লিন ইমরোজের। তাই নিজের ওড়নার টুকরো দিয়েই গিলাফটা বানিয়েছে। গিলাফটা বানানো শেষ হলে আনতারা উঠে গিয়ে কুরআন শরীফের উপর সেটা পরিয়ে দেয়। ঠিক তখনি ইফরাদের ঘুম ভাঙে।
চোখ খুলতেই তার দৃষ্টি গিয়ে পড়ে আনতারার মুখে। আনতারার ঠোঁটে তখন একটা স্নিগ্ধ হাসি ফুটে ছিল। ইফরাদ ভ্রু কুঁচকে ভাবে, এই মেয়ে হাসছে কেন?
বিষয়টা বোঝার জন্য ইফরাদ আনতারার হাতের দিকে তাকায়। কাপড়ে মোড়ানো কিছু একটা দেখতে পায়। তবে এটা যে কুরআন শরীফ, সেটা সে বুঝতে পারে না। ইফরাদ আনমনা ভাব ভেঙে উঠে বসে। তার মাথাটা ঝিমঝিম করছল। গত রাতে মদ খাওয়ার কারণেই এমন হচ্ছে। সে আবার আনতারার দিকে তাকায়। এবার ভালো করে দেখে বুঝতে পারে, কুরআন শরীফটা কাপড় দিয়ে ঢাকা। কিন্তু এতে খুশি হওয়ার মতো কি আছ, এটা ভেবে ইফরাদ নিজেই বিরক্ত হয়ে গেল। মনে মনে বলে,

— এই মেয়ে খুশি হোক না কাঁদুক, আমার কি! বিরক্তিকর মেয়ে!
ইফরাদকে উঠে বসতে দেখে আনতারার মুখের হাসি মিলিয়ে যায়। মনে ভয় ঢুকে পড়ে। আবার কি ইফরাদ খারাপ ব্যবহার করবে? কিন্তু আনতারাকে অবাক করে দিয়ে ইফরাদ বেড থেকে নেমে আনতারাকে পাশ কাটিয়ে সরাসরি ওয়াশরুমে ঢুকে পড়ে।কিছুক্ষণ পর ইফরাদ ওয়াশরুম থেকে বের হয়। তোয়ালে স্ট্যান্ড থেকে তোয়ালে নিয়ে মুখ মুছতে মুছতে বেড থেকে নিজের মোবাইলটা তুলে নেয়।
ডায়াল লিস্ট থেকে সাফিনের নাম্বারে কল দেয়।
ওপাশে কল রিসিভ হতেই ইফরাদ বলে উঠে,
— বারোটায় প্রেস-কনফারেন্স চাই। সব রেডি করো।
ওপাশ থেকে উত্তর আসে,
— ওকে স্যার।

ইফরাদ ফোন কেটে কিছুটা ছুড়ে বেডের উপর ফেলে দেয়। তারপর আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে তোয়ালে দিয়ে মুখ মুছতে থাকে। মুখ মুছতে মুছতে আয়নায় একবার আনতারার দিকে তাকায়। আনতারা তখন চুপ করে সোফায় বসে আছে। কিন্তু ইফরাদের চোখে যদিও মনে হচ্ছে আনতারা চুপ করে বসে আছে, আসলে আনতারা মনে মনে দোয়া পড়ছিল।
আনতারা সবসময়ই মনে মনে দোয়া পড়ে। আনতারা তখন আস্তাগফিরুল্লাহ পড়ছিল। ছোট একটা ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’ জিকির করলেই গুনাহ মাফ পাওয়া যায়, সাথে সওয়াবও পাওয়া যায়। আনতারা জিকির করতে করতে মনে মনে ভাবছে, ইফরাদ হয়তো এখন তাকে কিছু উল্টোপাল্টা কথা বলবে।
ইফরাদের এমন স্বাভাবিক দৃষ্টিকেও আনতারা বিশ্বাস করতে পারে না। কারণ ইফরাদ স্বাভাবিকভাবে তাকিয়েও তাকে নোংরা কথা বলে, তার চরিত্র নিয়ে অপমান করে। কিন্তু এবারও ইফরাদ তাকে অবাক করে দিল।

ইফরাদ আনতারার দিকে তাকালেও কিছু বলে না। চোখ সরিয়ে চুপচাপ রুম থেকে বেরিয়ে গেল।
কারণ এমনিতেই ইফরাদের মাথা ব্যথা করছে। আর আনতারাকে দেখলেই যেন তার মাথা আরও বেশি ব্যথা করে। মেজাজ খারাপ হয়ে যায়, রাগ মাথায় উঠে যায়। তাই আপাতত সে মাথা গরম করতে চায় না। একটু পরেই প্রেস-কনফারেন্স আছে, সেখানে শান্ত থাকা দরকার। রুম থেকে বের হয়ে সিঁড়ির কাছে আসতেই ইফরাদ দেখে, ইখতিয়ার চৌধুরী সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠছেন।
ইফরাদকে দেখেই তিনি বলেন,
— তোমার কাছেই যাচ্ছিলাম!
ইফরাদ স্বাভাবিক ভাভেই বলে,
— ১২ টায় প্রেস-কনফারেন্স ডেকেছি।
ইখতিয়ার চৌধুরী বলেন,

— ভালো করেছো! আমিও এই জন্যই তোমার কাছে যাচ্ছিলাম। ব্যাপারটা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব থামানো উচিত। নয়তো আবার কোন কাহিনি বের করে ফেলে তোমার! বাঙালি বলে কথা, মাটির নিচে থাকলেও বের করে আনবে, যদি একটু গন্ধ পায়।
ইফরাদ শান্ত গলায় বলে,
— এমন কিছুই হবে না। রেডি থেকো বারোটার জন্য।
ইখতিয়ার বলেন,
— ঠিক আছে। ইফতিনকে বলছি।
ইফরাদ বলে,
— বলো।

দুপুর ঠিক বারোটা। একটা ছোট সেন্টারে প্রেস কনফারেন্সের আয়োজন করেছে সাফিন। হলরুমে ইতোমধ্যে সব মিডিয়ার সাংবাদিকরা এসে বসে পড়েছে। সবার সামনে মাইক, ক্যামেরা আর রেকর্ডিং ডিভাইস প্রস্তুত। সবাই অপেক্ষা করছে জনপ্রিয় অভিনেতা ইফরাদ রিদান চৌধুরীর জন্য। সাংবাদিকদের চোখে-মুখে স্পষ্ট কৌতূহল, কেন তাদের এখানে ডাকা হয়েছে? তার থেকেও বেশি উত্তেজনা কাজ করছে অন্য একটা কারণে। গতকালের ঘটনা নিয়ে আজ তারা সরাসরি ইফরাদকে প্রশ্ন করতে পারবে। কালকে থেকেই তারা ইফরাদের একটা ইন্টারভিউ পাওয়ার জন্য ছোটাছুটি করছিলো। স্টেজের উপর দাঁড়িয়ে আছে সাফিন। সেও ইফরাদের অপেক্ষা করছে। সাফিন হাতে থাকা ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে, বারোটা বাজতে আর মাত্র এক মিনিট বাকি।
স্টেজের পেছনে সেন্টারের একটা আলাদা দরজা আছে। সেটা মূলত ব্যাকডোর। অবশেষে সবার অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে সেই দরজা দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে ইফরাদ, ইখতিয়ার চৌধুরী এবং ইফতিন। তাদের সাথে ছিল প্রায় দশ থেকে পনেরো জন বডিগার্ড। তাদের দেখামাত্রই সাংবাদিকরা হঠাৎ নড়ে-চড়ে বসে। অনেকেই দ্রুত উঠে দাঁড়িয়ে মাইক এগিয়ে ধরে। প্রশ্ন করতে ঝাঁপিয়ে পড়তে চায়।
ইফরাদ স্টেজের সামনে রাখা পোডিয়ামের কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। মাইকটা হাত দিয়ে ঠিক করে নেয়।
তারপর শান্ত কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে বলে,

— হ্যালো এভ্রিঅন। সবাই শান্ত হন। আপনাদের এখানে ডাকার একটা উদ্দেশ্য আছে। আপনারা কালকে আমাকে একটা মেয়ের সাথে হোটেল রুমে দেখে বিভিন্ন নিউজ বানাচ্ছেন! বিভিন্ন নেগেটিভিটি ছড়াচ্ছেন! যা আমার ফ্যান ফলোয়ার দেখে হতাশ হচ্ছে!
তার কথা শেষ হতে না হতেই একজন সাংবাদিক বলে,
— স্যার আমরা নেগেটিভিটি ছড়াচ্ছি না। আমরা যা দেখেছি তাই আপনার ফ্যানদের দেখাচ্ছি। আপনার সাথে তো কালকে একটা মেয়েকে….
সাংবাদিকের কথা শেষ হওয়ার আগেই ইফরাদ তার কথাটা ধরে বলে,
— সে আমার ওয়াইফ হয়!

মুহূর্তের মধ্যেই পুরো সেন্টার যেন বিস্ফোরণের মতো চমকে উঠে। সব সাংবাদিক বিস্ময়ে একে অপরের দিকে তাকাতে শুরু করে। চারদিকে ফিসফাস শুরু হয়ে গেল। ইফরাদ রিদান চৌধুরী বিয়ে করে নিয়েছে অথচ কেউই জানে না।
ইফরাদ আবার মাইক ধরে বলে,
— গতপরশু আমাদের এক বছরের বিবাহবার্ষিকী যায়। বিবাহবার্ষিকী সেলিব্রেট করতে হোটেলে গিয়েছিলাম! কিন্তু আপনারা সেই বিষয়টা নিয়ে কিসব নোংরা হেডলাইন বানাচ্ছেন!
এবার আরেকজন সাংবাদিক বলে,
— কিন্তু স্যার এতে আমাদের দোষ নেই। আমরা তো আপনার জানতে চেয়েছিলাম কিন্তু আপনি কোনো প্রশ্নের উত্তর দেননি!
ইফরাদ শান্তভাবে উত্তর দেয়,
— একচুয়ালি আমার ওয়াইফ পর্দা করে। সে কোনো নন-মাহরাম মানুষের সামনে যায় না। সেজন্যই বিয়েটা হাইড করে রাখা। সেজন্যই আমি এড়িয়ে গেছিলাম বিষয়টা। কিন্তু আপনাদের এসব নোংরা হেডলাইনের কারণে আমি আর হাইড রাখতে পারিনি।
কিছুক্ষণ থেমে ইফরাদ আবার বলে,

— আমি যেহেতু বিষয়টা ক্লিয়ার করেছি আশা করি আপনারাও সেই বিষয়টা নিয়ে সব ধরনের নিউজ ডিলিট করে দিবেন। এবং এই নোংরা গুজবের সমাপ্তি ঘটাবেন।
ইফরাদ থামে। এবার চোখমুখ শক্ত করে শক্ত কন্ঠে বলে,

রুহআবিষ্ট তুমি পর্ব ৩

— যদি কোনো নিউজ চ্যানেল এই বিষয়টা নিয়ে আর কোনো নিউজ কিংবা পুরনো নিউজ পুরো প্লাটফর্ম থেকে না সরায় তাহলে সেই নিউজ চ্যানেল কিভাবে টিকে এটা ইফরাদ রিদান চৌধুরী দেখে নিবে। আমি আমার ওয়াইফকে নিয়ে অনেক সিরিয়াস! তাকে নিয়ে অনলাইনে মিডিয়া প্লাটফর্মে কথা হবে আই ডোন্ট লাইক দেট!

রুহআবিষ্ট তুমি পর্ব ৫