Home রোদ্দুর এবং তুমি রোদ্দুর এবং তুমি পর্ব ১০+১১

রোদ্দুর এবং তুমি পর্ব ১০+১১

রোদ্দুর এবং তুমি পর্ব ১০+১১
ফারহানা চৌধুরী

শুভ্র আজ অফিসে যায়নি। মূলত অরুর জন্য। গতরাতের তার আশ্চর্যজনক আচরণে শুভ্র তাকে একা ছাড়তে চায়নি আজ। কোনোদিন অফিস কামাই না দেওয়া লোকটা, আজ অফিস কামাই করেছে; অরু বিশ্বাস করতে পারে না। তাও কি না তার জন্য! এতো উন্নতি এই লোকের কবে হলো? কোন জনমে? অরু ভেবে পায় না? এক রাতে এতো পরিবর্তন কোনো সাধারণ লক্ষণ নয়। গতকাল রাতেও না তাকে বেরিয়ে যেতে বলেছিলো বাড়ি ছেড়ে? আজ হঠাৎ এতো ভালো ব্যবহার কোথা থেকে এলো? মায়ের ঝাড়িতে? মায়ের জন্য চাপে ফেঁসে তার খেয়াল রাখছে? এ ছাড়া কি হবে আর?

শুভ্র অরুর জন্য সকালের নাস্তা করেছে। অবশ্য সে প্রতিদিনই করে। অরুর এইসব রান্না-বান্নার সাথে কোনো কালেই সংযোগ ছিলো না। বলা চলে রান্নার ‘র’ সম্পর্কেও সে অজ্ঞ। শুভ্রর ঘাড়েই যাবতীয় সকল কাজের দায়িত্ব। রান্না করা, ক্লিন করা এভ্রিথিং। অরুর এইসব দেখে কি যে মায়া হয়! এতো মায়ার খাতিরে সে একবার মানবতা উপচে শুভ্রকে রান্নার কাজে সাহায্য করতে গিয়েছিল। শুভ্র মানা করেছিলো বটে, তবে অরু শোনেনি। তার হুট করে মনে হচ্ছিলো, এভাবে কারো বোঝা হয়ে থাকার চেয়ে; অন্তত কিছু কাজ করে দেওয়াও ভালো। আর গিয়েই সব উদ্ভট, অদ্ভুত সব কাজকর্ম করে বসে। শুভ্র তাকে বলেছিলো থালা-বাসন ডিশ ওয়াশারে দিবে, এজন্য সে যেন একটু গ্লাস, প্লেটগুলো তার কাছে নিয়ে আসে। অরু গিয়েছিলো প্লেট আনতে, সব গুছিয়ে আনতে গিয়ে দুটো গ্লাস ভেঙে ফেললো। আতঙ্কিত হয়ে শুভ্রর দিকে তাকালেও, শুভ্র তাকে কিছুই বলে না। বাকি জিনিস ওদিকে নিয়ে রাখতে বলে, নিজে কাঁচগুলো পরিষ্কার করে।

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

এরপর রান্নার সময়, শুভ্রর কাছে আবারও গেলে দেখে সে মশলা কষাচ্ছে। একদম প্রফেশনালি! অরুর কি যে ভালো লাগে! শুভ্র তখন তাকে শেল্ফ থেকে কিছু মশলাপাতি নামিয়ে এনে দিতে বলে। অরু তা এনে কাচের জার খুলতে নিয়ে মশলা ছড়িয়ে ফেলে। শুভ্র তাকায় অরুর দিকে। অরু সেই যাত্রায় এতো লজ্জা পেয়েছিলো! শুভ্র এবারেও বিশেষ কিছুই বলে না। অরু স্বস্তি পেয়েছিলো এতে। খানিক বাদে শুভ্র তাকে বলে কিছু টমেটো আর পেয়াজ কেটে দিতে। অরু মাথা দুলিয়ে ওগুলো কাটতে নেয়। আবারও একটা কাণ্ড ঘটালো। নিজের হাত কেটে বসলো। শুভ্র আর ধৈর্য্যের সামাল দিতে না পেরে ধমকে উঠেছিলো তাকে। এতোক্ষণ এতো কিছু ছড়িয়েছে, ভেঙেছে; সেসব ঠিক আছে। তাই বলে এখন হাতও কেটে ফেলবে? এতোটা বাচ্চামো কেউ করে? শুভ্র তাকে এরপর সাফসাফ বলে দিয়েছে, যেন রান্নাঘরের চৌকাঠও সে না মাড়ায়। এতোসব কাজে সাহায্যের দরকার নেই তার। অরু শুধু শুকনো মুখে মাথা দুলিয়েছে। দেখে মনে হচ্ছিলো তক্ষুনি কেঁদে-কেটে ভাসাবে। লজ্জা পেয়েছিলো নিজের কাজে খু-ব। এরপর আর রান্নাঘরের আশ-পাশেও অরু যায় নি।

-“অরু?”
শুভ্রর ডাকে মুখ তুলে চাইলো অরু। এতক্ষণ মুখ গুঁজে একমনে খাবার খেয়ে চলছিল। রাতের ঘটনায় প্রচন্ড অপ্রস্তুত সে। শুভ্র হয়তো বুঝছে তা। তাই খুব শান্ত-শিষ্ট স্বাভাবিক ভাবেই বলল,
-“গতকালকে আমার করা বিহেভিয়ারের জন্য আ’ম স্যরি। আমি তোমাকে ওভাবে বেরিয়ে যাওয়ার কথা মিন করিনি। আ’ম স্যরি এগেইন।”
অরু চরম আশ্চর্য হলো এবার। শুভ্রর মুখ থেকে ‘স্যরি’ ওয়ার্ড খুবই, খুবই রেয়ার। লোকটা পারে শুধু সবাইকে ধমক, আর চোখ রাঙানোর উপর রাখতে। অফিসের সবাই তার এমন মেজাজে, এমন ঝাড়া-ঝাড়ি, ধমকা-ধমকিতে কতোটা বিরক্ত, সে অরু একদিন গিয়েই বুঝে গিয়েছে। লোকের পিঠ-পিছে ফিসফিসানো, আরো কতো কি! ওখানের কর্মচারী কয়েকজন বাঙালি। তাদের কথা তো রয়েছেই! অরুকে চামচ কামড়ে চেয়ে থাকতে দেখে শুভ্র ভ্রু কুঁচকায়,

-“কি?”
অরু দু’দিকে মাথা নাড়ায়। অর্থাৎ কিচ্ছু না। শুভ্র চেয়ারে আয়েশ করে বসলো। পিঠ এলিয়ে বসে বলল,
-“তোমার বাবা, আঙ্কেল ফোন করেছিলো।”
অরু এই পর্যায়ে কপাল কুঁচকে চাইল,
-“কি?”

-“হ্যাঁ। বললেন, তোমার নাকি এখানে চাচ্চু আছেন। সে আর তার ফ্যামিলি, তোমার কাজিনরা; সবাই তোমার সাথে দেখা করতে চাইছেন। প্রায় বছরের মতো নাকি দেখা-সাক্ষাৎ হয়নি তোমাদের সাথে, ওনারা দেশের বাইরে চলে এসেছিলো বলে। তাই দেখা করতে চাইছেন, এসব আরকি। এড্রেসও দিয়েছে আঙ্কেল। বললেন, আমি যেন তোমাকে নিয়ে যাই।”
সময় নিয়ে পুরো কথাটুকু শেষ করে শুভ্র অরুর দিকে তাকায়। হাতের পেশি শক্ত, চোয়াল কেমন ধারালো লাগছে। তীক্ষ্ণ চোখ জোড়া খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে অরুকে পর্যবেক্ষণে ব্যস্ত। অরুর মস্তিষ্ক তখন বাজে ভাবে থিতিয়ে গিয়েছে। রাগে পা থেকে মাথার রক্ত পর্যন্ত যেন টগবগ করছে। হাত কাঁপতে শুরু হয়েছে। এতো কিছুর পরেও বাবা এতোটা ক্যাজুয়ালি ছোট ভাইয়াকে দিয়ে তাকে ফোন করিয়ে শফিক চাচার সাথে দেখা করতে বলে? শুধু তাকেই না, শুভ্রকেও পর্যন্ত ফোন করেছে। বাবা-মা কবে বুঝবে সে ঐ লোকটা তার জন্য একটা দুঃসপ্নের সমান। সে চায় না ঐ লোকের সামনে যেতে। তন্মধ্যেই তার চামচে ধরে রাখা হাত হলো শক্ত, কঠিন। শিরা স্পষ্ট হলো হাতের বিপরীত পৃষ্ঠের।

শুভ্র দাঁত পিষে চেয়ে আছে। চাহনি এই পর্যায়ে শান্ত হয়ে আছে। হেলান দিয়ে বসে থাকা ছেড়ে, সোজা হয়ে বসলো। টেবিলের উপর কনুই রেখে হাত মুষ্টিমেয় করে তাতে থুঁতনি রাখলো। অরুর চোখ তখন খাবারের দিকে নিবন্ধ৷ আঁখি জোড়া যেন গ্লু দিয়ে মিশিয়ে রাখা প্লেটে। শুভ্র শান্ত গলায় ডাকে,
-“অরু?”
অরু চোখ তোলে না। তাকিয়ে রয়েছে এখনো প্লেটে। শুভ্র আঙুল বাড়িয়ে টেবিলে ঠকঠক শব্দ করল। উদ্দেশ্য তার অ্যাটেনশন সিক করা। কাজ হলো। অরু তাকাল তার দিকে। চোখ জলে টইটম্বুর। পাপড়ি সিক্ত জলে। চোখের নিচটা লাল। শুভ্র কপাল কুঁচকায়,

-“কি? কাঁদছ কেন?”
অরু চোখ চেপে ধরল। শুভ্র প্রশ্ন করে,
-“তুমি কি যেতে চাও?”
অরু সময় নিলো। শুভ্রও তাড়া দেখায় না বিশেষ। তাকে সময় দেয়। অরু চোখ মুছে আবার তাকায় তার দিকে। কাঁপা কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করে,
-“আপনি যাবেন আমার সাথে?”

গতরাতের পর আচমকা এই অচেনা দেশে শুভ্র নামক লোকটার প্রতি তার কিছুটা বিশ্বাস জন্মেছে। সে ছাড়া আপাতত কেউ নেই যার উপর সে একটু হলেও ভরসা করতে পারবে। তার মনে হচ্ছে না, শুভ্র তাকে জাজ করবে। অন্তত কালকের ওমন একটা ঘটনার পর, অরুর ওমন আচরনের পরেও যে তাকে কোনো প্রশ্ন করেনি, কিচ্ছু জিজ্ঞেস করে অপ্রস্তুতকর পরিবেশ সৃষ্টি করেনি; সেই ছেলেটার প্রতি এতটুকু বিশ্বাস আনা তেমন কোনো অন্যায় নয়। শুভ্র প্রত্যুত্তর করে,

-“তুমি চাইলে যাবো। তোমার ফ্যামিলি ম্যাটারে আমাকে তুমি ইনক্লুড করতে চাইলে আমি হবো। তোমার হেল্প দরকার পড়লে, আ’ম হেয়ার। ইউ ক্যান আস্ক ফর হেল্প টু মি এনিটাইম।”
কথাগুলো সম্ভবত তিন কি চার লাইনেরই হবে। গুটিকয়েক শব্দ দিয়ে তৈরি বাক্যগুলো। অথচ এই গুটিকয়েক শব্দে অরুর মনে হলো কয়েক হাজার ওজনের বোঝা নেমে গিয়েছে তার কাঁধ থেকে। অরু প্রসন্ন হাসে। বলে,
-“বিকালে যাই?”
শান্ত জবাব আসে,
-“এজ ইউর উইশ।”

এড্রেস অনুযায়ী একটা বাড়ির সামনে গাড়ি থামায় শুভ্র। ফোনের দিকে চেয়ে লোকেশন মিলিয়ে পাশে জড়োসড়ো হয়ে বসা অরুর দিকে চাইল। সে তাকাতেই অরু তাকায়। শুভ্র চোখের ইশারায় নামতে বলে। অরু চোখ সরালো। ডোর খুলে নামল৷ শুভ্র আসতেই বাড়ির ভেতরে ঢুকল। এড্রেসের সাথে ফারুক সাহেব বলে দিয়েছিলেন।। শফিকরা চার তলায় থাকেন। শুভ্র এসে লিফটের সামনে দাঁড়ায়। অরু পাশে দাঁড়িয়ে। লিফট ওপেন হতেই অরু ভেতরে গেল। পিছু পিছু শুভ্রও ঢুকল।
লিফট ক্লোজ হলে অরু আরো গুটিয়ে গেল৷ শুভ্র তাকায় তার দিকে৷ পরপর চোখ সরিয়ে সামনে তাকায়।

লিফট গিয়ে থামে চার তলায়। নির্দিষ্ট এপার্টমেন্টের সামনে এসে তারা থামলে অরু খেয়াল করে তার হাত কাঁপছে। নিজেকে খুব সুক্ষ্মভাবে সামলে সে কলিংবেল চাপল। গুণে গুণে মিনিট দুয়েকের মধ্যেই দরজা খুললো একজন ভদ্রমহিলা। তাঁর নাম মুনিয়া জামান৷ দরজা খুলেই অরুকে দেখে কেমন থেমে গেলেন তিনি। পরপর কেমন এগিয়ে এসে স্ব-বেগে জড়িয়ে ধরলেন মেয়েটাকে। অরু হকচকিয়ে গেল। অপ্রস্তুত হয়ে ধীর হাতে মুনিয়াকে সরাতে চাইল। মুনিয়া সরে দাঁড়ালেন। অরুর মাথায় হাত বুলিয়ে কোমল গলায় জিজ্ঞেস করলেন,

-“ভালো আছিস অরু? কতো বড়ো হয়ে গেছিস সোনা।”
অরু পলক ফেলে চায় শুভ্রর দিকে। মুনিয়া বেগমও তখন তাকালেন তার দিকে। শুভ্র নম্র গলায় সালাম দিল। তখন সেখানে এলেন নতুন মুখ। শরিফ খান। তিনি এসে শুভ্রর সাথে কুশল বিনিময় করলেন৷ অরু তার দিকে তাকাতেই দেখলো তিনি চেয়ে আছেন তার দিকে। অরু চোখ নামিয়ে নিলো তৎক্ষনাৎ। ডান হাতের পৃষ্ঠ খামচে ধরলো বাম হাতে নখ দ্বারা। দাগ বসে গিয়ে ব্যথায় টনটন করলেও অরু ছাড়ে না। শুভ্র আড় চোখে তাকালো তার দিকে। নিভৃতে পর্যবেক্ষণ করে চোখ সরাল।
তাদের দুজনকে ড্রয়িংরুমে বসিয়ে আপাতত টুকটাক গল্প-সল্প করছেন শফিক খান আর মুনিয়া। অরুর পাশে তাদের মেয়ে মায়া। মায়া তার সাথে কথা বলতে থাকলেও অরু চুপচাপ রয়েছে। মনে হচ্ছে দড়ি বেঁধে যেন তাকে এখানে নিয়ে আসা হয়েছে। মায়া এবার বিরক্ত হয়ে তার হাত ধরে। অরু চমকে তাকালো। মায়া বলে,
-“কি? তুমি এতক্ষণ আমার কথা শোনোনি, না আপু?”
অরু পলক ফেলে। আসলেই সে শোনেনি। মায়া এবার বলল,

-“আচ্ছা, চলো ভেতরে যাই আমরা।”
অরু আশ্চর্য হয়,
-“কেন?”
-“এখানে বড়রা আছে, আমরা আমাদের মতো যাই চলো। গল্প করতে পারবো একসাথে।”
অরু চোখ সরিয়ে বলে,
-“আমি এখানেই ঠিক আছি। সমস্যা নেই।”
মায়া নাছোড়বান্দার মতো পেছনে লেগে পড়েছে। সে এবার অরুর হাত ধরে তাকে ওঠায়। ঘরের দিকে নিয়ে যেতে যেতে বলে,
-“চলো তো। তোমার এখানে কাজ নেই।”

অরুর হাজার মানা সে শোনে না। শুভ্র চুপচাপ সবই দেখছিলো। মেয়েটা আতঙ্কিত। এখানে আসার পর আরো থম মেরে গিয়েছে। এমন কিছু না হোক, যাতে পড়ে কোনো সমস্যা হয়। আচ্ছা, সো কেন এতো ভাবছে তাকে নিয়ে? এতেটা ভাবার কি দরকার রয়েছে? যতই স্ত্রী হোক৷ সম্পর্কটা তো কেউই মানছে না তারা। তবে এতো কেন ভাবছে সে? অদ্ভুত!
অরুকে মায়া নিজের ঘরে নিয়ে গেল। সেখানে মায়ার ভাই তামিম ছিল৷ শুয়ে-পড়ে ফোন টিপলেও অরুকে দেখে উঠে বসে। হাত ভাজ করে তাকিয়ে থাকে তার দিকে। অরু তাকে দেখেই মায়াকে বলে,
-“মায়া, এখানে বসার কি দরকার? আমরা বাইরে বসি। চলো প্লিজ।”
-“কেন? আরে, বসো না। আমার ওদের সবার সামনে অকওয়ার্ড লাগছে খুব। তোমাকে কতদিন পর দেখলাম, এখন তোমার সাথে একটু বসতে পারবো না আলাদা?”
অরু মাথা নাড়ায়,

-“তা না। আমরা বাইরেই কথা বলতাম, ভেতরে—”
তার বাক্য সমাপ্তি পাওয়ার পূর্বেই তামিম মুখ খুলল,
-“আমাকে দেখে এমন করছিস সেটা বল।”
অরু অস্বস্তিতে দাঁত চেপে তাকালো মায়ার দিকে। মায়া বিশেষ প্রতিক্রিয়া দেখালো না। অরুকে বলল,
-“তুমি বসো তো আপু। ভাইয়ার কথা শুনো না। আচ্ছা, আমি তেমার জন্য কেক নিয়ে আসি। আমি বানিয়েছি ফার্স্ট টাইম, তোমরা আসবে বলে।”
বলেই তস্ত্র পায়ে বেড়িয়ে গেলো ঘর ছেড়ে। অরু কিছু বলার সুযোগই পেলো না। সে নিজেও মায়ার পিছু পিছু বেরিয়ে যেতে নিলে তামিম ডাকে,

-“অরু, দাঁড়া।”
অরু থামে না। বেরিয়ে যেতে নিলে তামিম ধমকে উঠলো,
-“দাঁড়াতে বললাম না? দাঁড়া!”
অরু থামে। মুখ কুঁচকে নিল দাঁত চেপে। তামিম উঠে এসে তার পিছে দাঁড়িয়েছে ততক্ষণে। অরু কাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে। তামিম বলল,
-“কি রে? একবার জিজ্ঞেসও করলি না; কেমন আছি, কি দে কি? এতো আন-সোশ্যাল কবে হলি?”
অরুর মুখ আপনাতেই চলল এবার,
-“আপনার সাথে কি আমার খুব ক্লোজ সম্পর্ক? যে, আমি আপনাকে ‘কেমন আছেন’ জিজ্ঞেস না করলে আপনি অভিমান করবেন? এসব নাটক কেন করেন?”

-“ইউ সাউন্ড সো রুড।”
-“কজ আই অ্যাম।”
ফট করে বলে বসলো অরু। তামিম হাসে,
-“রাগ কমেনি এখনো? ক’বছর তো হলো। এতো রাগ পুষে কি করবি?”
-“ইউ আর নট দ্যাট ইম্পর্ট্যান্ট যে, আমি আপনার প্রতি রাগ পুষবো।”
-“আচ্ছা! তো বিয়ে করে নিলি যে? বাইরে হাজবেন্ড বসা তো, না? সে জানে সব? নাকি আমি জানাবো?”
অরু এবার ধৈর্য্যের সংযম ভাঙল৷ পিছু ফিরে দাঁড়িয়ে রূঢ় স্বরে বলল,
-“নিজেকে এতো ইম্পর্টেন্ট ভাবা বন্ধ করুন। আপনার সাথে আমার কোনে খাস সম্পর্ক নেই, আর না ছিলো। আপনি আর আপনার বাবা যা করেছিলেন, তারপরেও যে আমার সামনে জীবিত দাঁড়িয়ে আছেন; ইউ স্যুড বি গ্রেটফুল ফর ইট।”
তামিম নাটক করলো। ভয় পাওয়ার ভঙ্গিতে হাত তুলে বলল,

-“তাই? ওপস! আ’ম স্কেয়ার্ড। এবার কি করবো? আমায় জেলে ঢুকিয়ে দিবি? প্লিজ অরু, ডোন্ট ডু দ্যাট। তুই তো আমায় ভালোবাসিস না? এমন করিস না, প্লিইইজ।”
অরু মুখ কুঁচকে ঘৃণিত চোখে চেয়ে আছে। তামিম ফিক করে হেসে ফেলল। পরপর আগুন ঝড়া চোখে চেয়ে বলল,
-“ভালোবাসা? মাই ফুট। তুই আমাকে কখনও ভালোই বাসিসনি।”
অরু তাচ্ছিল্য করে হাসে,
-“এসব নাটক দেখিয়েই তো তখন পার পেয়েছিলে। কতো পার পাবে আর?”
-“যতোবার পাওয়া যায়।”
তামিম হাসে৷ পায়ে পায়ে এগিয়ে আসে অরুর দিকে। অরু দাঁড়ায় না। দৌড়ে বেরিয়ে যেতে নিলে তামিম তার হাত চেপে ধরলো। সুযোগ বুঝে মুখ চেপে ঘরের ভেতরে এনে, কৌশলে দরজা আঁটকে দিল।
অরু আঁতকে উঠল। শঙ্কিত চোখ তাকালো তার দিকে। রুম সাউন্ড প্রুফ। হাজার চেঁচালেও লাভ নেই৷ মায়া কেন আসছে না এখনো? তাকে ফাঁসিয়ে দিয়েছে সে? শিট! কেন দাঁড়িয়েছিলো ও? এবার কি করবে? এতো বছর আগের ঘটনা আবার রিপিট হবে? অরু মরে যাবে।
তামিমের হাত থেকে নিজের হাত ছাড়াতে চাইল অরু৷ ছাড়াতে না পেরে ছটফট করতে লাগলে, তামিম হাত মুষড়ে ধরে। অরু ছলছল চোখে তাকালো। বলল,

-“ছাড়ুন, তামিম ভাইয়া। প্লিজ।”
তামিম ঝুঁকে আসে। অগ্রাহ্য করে তার আকুতি। জিজ্ঞেস করে,
-“আচ্ছা অরু, তুই তো আমায় ভালোবাসতিস। তাই না?”
অরু জবাব দেয় না। ব্যথায় মুখ কুঁচকে আছে। তামিম বলে,
-“আমার তোকে অপছন্দ না। তবুও সেদিনের ব্যাপারে আমি স্যরি। এবার চল বিয়ে করি।”
অরু ফিসফিসিয়ে বলে,
-“পাগল আপনি। মাথায় সমস্যা রয়েছে। নয়তো এসব বলতেন না। আমি ম্যারিড, এটা আপনি ভালো করেই জানেন।”
-“বিয়ে কেন করেছিলি? আমি বলেছিলাম? তুই তো এমনিও এসব বিয়ে মানিস না। দেন, ডিভোর্স হিম। আই লাভ ইয়্যু। ট্রাস্ট মি।”
অরু হাত ছাড়াতে চেয়ে বলে,

-“আপনারা বাপ-ছেলে দুজনেই এক। পশু। তোমাদের শুধু শরীর দরকার। এটা আমার চেয়ে ভালো কে জানে?”
তামিম তাচ্ছিল্য করে হাসল,
-“আমার বাপ, তোর চাচা হয়।”
-“আনফরচুনেটলি।”
অরু থামে। শান্ত হয়ে তামিমের দিকে তাকায়,
-“আপনার ভ্রান্তি ভাঙুক। আমি আপনাকে ভালো-টালো বাসি না। চাইল্ডহুড ক্রাশ টাইপ ছিলেন একসময়। সেটাও এখন ঘৃণায় পরিণত হয়েছে। আর ঐরকম বয়সে তো অনেককেই ভালো লাগে। তো? সবাইকে বিয়ে করবো এখন? কেমন কথা? হাত ছাড়ুন ভালোয় ভালোয়।”
তামিম অরুর হাত আরো জোরালোভাবে ধরলো। কন্ঠ এই পর্যায়ে কাতর শোনাল,
-“বাট আই লাভ ইয়্যু, অরু!”

শুভ্র তীব্র অনীহা স্বত্বেও বসে রয়েছে শফিক আর মুনিয়ার সামনে। এতো কথা বার্তা বলতে ভালো লাগছে। তারউপর সে এনাদের বিশেষভাবে চেনেও না। অপরিচিত ব্যক্তিদের সর্বদা এড়িয়ে চলা শুভ্রর এখন এভাবে সং-এর মতোন বসে থাকা একদমই সহ্য হচ্ছে না। অরুটাও কোথায় গিয়েছে, এখনো আসছে না। মেয়েটার কি বিন্দুমাত্রও কমনসেন্স নেই? তাকে একা ফেলে এভাবে চলে গেল?
মায়া রান্নাঘর ঘুরে কেক হাতে বেরুলো। দেরি করাটা ইচ্ছেকৃত। সে এসে টেবিলে চারটে প্লেট রাখা ট্রে রাখল। বাবা, মা আর শুভ্রর হাতে তিনটে প্লেট তুলে দিয়ে আরেকটা প্লেট নিয়ে ভেতরে যেতে নিল। তখনই শুভ্র ডাকে,

-“এক্সকিউজ মি আপু?”
মায়া ফিরে তাকায়। বাবা-মায়ের দিকে চেয়ে শুভ্রর দিকে নজর ফেরায়,
-“জ্বি ভাইয়া?”
-“অরু কোথায়? একটু ডেকে দিন। আমরা বের হবো এক্ষুনি।”
মুনিয়া জামান আর শফিক খান একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করলেন। এরপর মুনিয়া বললেন,
-“এখনই যাবে কি বাবা? রাতের খাবার খেয়ে যাবে। এখনই যাওয়ার দরকার নেই। বসো তো।”
-“আসলে, আমার কিছু কাজ আছে৷ অরুকেও যেতে হবে সাথে।”
শফিক খান সুযোগ বুঝে বললেন,
-“অরু থাকুক এখানে৷ তুমি কাজ সেরে এসো।”
শুভ্রর মুখ কেমন শক্ত হয়ে আসে৷ তবুও যথাসম্ভব সাবলীল স্বরে বলে,
-“আমি ওকে একা ছাড়তে চাইছি না। আর অফিস রিলেটেড কাজ তো। অরুকে দরকার।”
শফিক খান কপাল কুঁচকে চেয়ে থাকেন। শুভ্র চোখ সরায় না। পরিবেশ থমথমে ঠেকলো এই পর্যায়ে। মুনিয়া পরিস্থিতি সামাল দিতে মায়াকে বললেন,

-“মায়া, অরুকে ডেকে আনো তো।”
মায়া মাথা দুলিয়ে চলে গেল। দরজার সামনে এসে দরজা আটকানো দেখে ভ্রু কুঁচকে এলো। সে দরজা ধাক্কালো। নিজের উপস্থিতি জানান দিয়ে দরজার নব ঘুরিয়ে শব্দ করতে লাগল। দরজা খোলে না কেউ। মায়া এবার কল করল তামিমকে। বারকয়েক ফোন করার পরেও রিসিভ হলো না। সময় গড়াচ্ছে। মায়া শঙ্কিত হলো। আশেপাশে চাইতেই দেখল শুভ্র আসছে এদিকে। পিছু পিছু মা-বাবাও আসছে। শুভ্র এসেই জিজ্ঞেস করে,
-“অরু?”
মায়া দরজা দেখিয়ে বলল,
-“ভেতরে। ধাক্কিয়েছি, কল করেছি; খুলছে না দরজা।”
শফিক খান একপাশে চুপ করে দাঁড়িয়ে রয়েছেন৷ শুভ্র ভ্রু কুঁচকায়,
-“অরু একা ভেতরে।”
মায়া চায় মায়ের দিকে। শুভ্রর আওয়াজ উঁচু হলো,

-“অরু কি একা ভেতরে? জিজ্ঞেস করছি কিছু।”
মুনিয়া ঘাবড়ালেন শুভ্রর কথার ধরনে। কেমন ভাবে কথা বলছে এই ছেলে? মায়া ভীত চোখে তাকালো। শুভ্রর মুখ-মন্ডলে কেমন কঠোরতার ছাপ। মনে হচ্ছে এখনই ঠাস করে চড়-থাপ্পড় বসিয়ে দেবে। মায়া ভয়ে সিঁটিয়ে বলল,
-“না।”
-“কে আছে আর ভেতরে?”
মায়া বলতে সময় নিলো। ইতিউতি করছে দেখে শুভ্র ধমকে ওঠে আবার,
-“কে আছে ভেতরে? একবারে উত্তর দিচ্ছেন না কেন?”
মায়া তোতলালো,
-“ভা-ভাইয়া।”
শুভ্রর গলা থেকে যেন আগুন ঝড়ে পড়লো এবার,
-“কমনসেন্স ভেজে খেয়েছেন? একটা ছেলের সাথে একা রেখে বেরিয়ে গিয়েছেন কি করে?”
শুভ্র দরজা ধাক্কাতে লাগল অনেক জোরে। দরজা খুলছে না দেখে এবার জোর-সোরে লাথি বসালো দরজায়। মুনিয়া বেগম এলেন,

-“বাবা, শান্ত হও। এমন করো না।”
-“করবো না? ওকে একা ভেতরে একজনের সাথে রেখে আমি চুপ থাকবো? আমার এখানে অরুকে নিয়ে আসাই ভুল ছিল। ওর কথায় এসে তো গিয়েছি, বাট ইট ওয়াজ আ গ্রেট মিসটেক!”
পরপর তিন-চারবার ধাক্কানোর পর দরজাটা খুলল। স্ববেগে গিয়ে আঘাত করলো দেওয়ালে। নব খুলে পড়ে গিয়েছে নিচে। শুভ্র ছুটে ভেতরে এলো। অরুর হাত ধরা তামিমকে দেখেই কেনো যেনো ধৈর্য্য ফুঁড়িয়ে গেল। স্ব বেগে ছুটে ঘুষি বসালো তার মুখে। অতর্কিত হামলায় ছিটকে পড়ে তামিম। শুভ্রর কি হলো কে জানে, সে থামল না। একের পর এক আঘাত করতে লাগল তামিমকে। শফিক খান এগিয়ে গেলেন ছেলেকে ছাড়াতে। শুভ্রকে এক ধাক্কায় সরালেন। সে পিছিয়ে যায় ক’কদম। অরু একপাশে দাঁড়িয়ে ছিলো আতঙ্কিত হয়ে। শুভ্র এবার ক্ষিপ্ত হলো খুব। তামিমের দিকে তেড়েমেরে যেতে নিলে অরু আটকালো তাকে। হাত টেনে ধরলো। শুভ্র অপ্রত্যাশিত বাঁধা পেয়ে থামে। অবাক হয়ে তাকায় অরুর দিকে। অরু তার হাত খামচে ধরেছে। ফ্যাসফ্যাসে গলায় বলে,

রোদ্দুর এবং তুমি পর্ব ৯

-“এখানে থেকে চলুন প্লিজ। আমি থাকবো না এখানে।”
শুভ্র সংযত করে নিজেকে। আলগোছে অরুর হাত সরিয়ে, নিজে শক্তপোক্ত ভাবে ধরলো৷ অরু গুটিয়ে গেল তার পিছে। শুভ্র শক্ত গলায় শফিক খান আর তামিমের উদ্দেশ্যে বলল,
-“এখানে আসা আমার ভুল ছিল। আর আমি স্টিল রিগ্রেট করছি তার জন্য। লিসেন, শি ইজ মাই ওয়াইফ! আপনারা দু’জন দূরে থাকুন ওর থেকে। ইভেন কন্ট্যাক্টও বন্ধ রাখবেন। আদার ওয়াইজ, আমি নিজের আসল রূপ দেখাতে বাধ্য হবো, যা আমি চাইছি না।”

রোদ্দুর এবং তুমি পর্ব ১২