রোদ্দুর এবং তুমি পর্ব ৯
ফারহানা চৌধুরী
শুভ্র অরুর কাজে বিমূঢ়। হতভম্ব হয়ে চাইলো মেয়েটার দিকে। অরু রাগে ফুঁসছে দাঁড়িয়ে। শুভ্রকে আশ্চর্য হয়ে চেয়ে থাকতে দেখে সে বেড়িয়ে যেতে নিলো। শুভ্র সুযোগ টুকুও দিলো না। স্তম্ভিত ফিরে পেতেই বাঁধা দিলো অরুকে। এক হাতে তার কোমড় পেঁচিয়ে একপ্রকার হাওয়ায় তুলে, তার ঘরের মধ্যিখানে নিয়ে এসে দাঁড় করালো। তার মন এখনো মানতে পারছে না, তাকে চড় মারল? অরুর মতো বাচ্চা একটা মেয়ে? শুভ্রর তীব্র আত্মগরিমায় তা ঘা করে ফেলল ক্ষণিকেই, অসম্ভব বাজেভাবে। রাগ মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে যেন। মেজাজ খিঁচড়ে আসছে। আঁখি জোড়া লাল হলো কি? ঠিক বোঝা গেলো না। তবে ততক্ষণে নাকের ডগা লাল টুকটুকে। দেখে মনে হবে কেউ লাল রঙ ঘষে রেখেছে। ঠোঁট কাঁপছে তিরতির করে। মেয়েটা যদি দেখতো তা। অরু রাগে, বিদ্বেষে, ক্ষোভে এবার চেঁচিয়ে উঠলো,
-“কোন ধরনের অসভ্যতামো এগুলো? সমস্যা কি আপনার সমস্যা কি?”
শুভ্র রাগ সংযত করতে না পেরে হুট করেই ধমকে উঠলো,
-“চুপ!”
আচমকা ধমকে অরু কেঁপে উঠল। শুভ্র ততটুকুতে থামলেও পারতো। তবে না, থামলো না। আঙুল তুলে শাসিয়ে বলল,
-“আর একটা কথাও বললে, ঘরের বেলকনি থেকে ফেলে দেব। বেয়াদব মেয়ে!”
অরু দাঁত পিষে তাকিয়ে থাকে। শুভ্র হনহনিয়ে হেঁটে দরজার কাছে গেল। অরু এই পর্যায়ে ভ্রু কুঁচকায়। কৌতুহলী হয়ে শুধায়,
-“কোথায় যাচ্ছেন?”
-“জাহান্নামে। যাবা?”
তিরিক্ষি মেজাজে কথাগুলো বলে সে দাঁড়ালো পর্যন্ত না। মুখের উপর দরজা আটকে দিলো। বাইরে থেকে দরজা লক করেছে বুঝতেই অরু ভেতরে আঁতকে উঠলো। ছুটে এসে দরজা ধাক্কাতে লাগল। চেঁচিয়ে ডাকল তাকে,
-“শুভ্র! দরজা খুলুন। এই! শুভ্র!”
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
দরজা খুললো না কেউ। সাড়াশব্দও আসছে না। অরু ঘামছে। সমানে দরজা ধাক্কে যাচ্ছে। দরজার নব ঘুরিয়ে যাচ্ছে তস্ত্র হাতে। সে ছাড়া পেতে চাইছে বদ্ধ ঘর থেকে। চোখের সামনে ভাসছে কিছু বিভৎসকর দৃশ্য। অরু সহ্য করতে পারছে না। দম আঁটকে আসছে। পাগলের মতো লাগছে। সে দরজা খুলতে না পেরে এবার আরো বেশি অসুস্থ হতে লাগল।
অরু নিজেকে গুটিয়ে মেঝেতে বসে পড়লো৷ সেঁটে গেল দেয়ালে। শুভ্র আসছে না কেন? এভাবে দরজা আঁটকে কেন গেল? আবার… আবার ওগুলোর পূণরাবৃত্তি হবে? না… না। অরু মরে যাবে। সে হাঁটুতে মুখ গুঁজে রইলো। নিজেকে এড়াতে চাইলো কোনো বিশেষ কিছু থেকে। ঘরের ভেতরটা এমন অন্ধকার কেন? অরুর দম বন্ধ হয়ে আসছে। অরু তটস্থ হয়ে আশেপাশে তাকালো। হঠাৎ সামনে চোখ আঁটকে গেলো।
অরু শঙ্কিত চোখ চেয়ে রইলো। একটা ঝাপসা অবয়ব। তার দিকেই আসছে। চেহারা দূর থেকে অস্পষ্ট লাগলেও, কৃত্রিম চোখের ফাঁক গলিয়ে চাইতেই নজরে এলো পরিচিত মুখ। ভীষণ সুক্ষ্ম ভাবে চেনে এই অবয়বকে সে। ভী-ষ-ণ। অরুর বুক ধরফরিয়ে ওঠে। সে বিচলিত হয়ে পড়লো সেকেন্ডের ব্যবধানে। মুখ গুঁজে নিলো হাঁটুতে। গুটিয়ে ফেললো নিজেকে ক্রমেই। অবয়বটা তার দিকেই আসছে। প্রথমে ধীর গতিতে, আকস্মাৎ হাওয়ার বেগে। অরু এই পর্যায় সইতে পারে না। অসম্ভব ভয়, শঙ্কায় পরিপূর্ণ মস্তিষ্ক নিয়ে চেঁচিয়ে উঠলো কানে হাত চেপে। সরাতে চাইলো অসম্ভব বিশ্রি অবয়বটাকে। তার অবস্থা করুণ, বড্ড সাংঘাতিক। এই সময় তার এরূপ আচরণ দেখলেও বোধহয় ভয় পাবে।
শুভ্র অরুর লাগেজ হাতে সবে ফ্লাটে ঢুকেছে। ফ্ল্যাটের দরজা লক করতেই, অরুর ঘর থেকে চিৎকারের আওয়াজ কানে এলো। শুভ্র ভ্রু কুঁচকায়। দৌড়ে যায় দরজার কাছে। চিৎকারের আওয়াজ বাড়ছে। শুভ্র ভয় পেলো এবার। হঠাৎ এভাবে চিৎকারের কারণ বুঝলো না। তস্ত্র হাতে দরজার লক খুলে হুড়মুড়িয়ে ভেতরে ঢুকল। আশেপাশে চাইতেই চোখ গেল এক কোণে। অরু বসে। তটস্থ হয়ে। নিজেকে গুটিয়ে নেওয়ার সর্বস্ব প্রয়াস চালাচ্ছে মেয়েটা। পারলে বোধহয় দেওয়ালে মিশে যেতো। তখনও কান দুই হাতে চেপে সে সমানে চেঁচিয়ে যাচ্ছে।
শুভ্র ছুটে আসে। অরুর সামনে বসে হাঁটু মুড়ে। অরুর হাত ধরে তাকে শান্ত করার তাগিদে। অরু হাত সরায় ঝটকায়। আরো উদ্ভট আচরণ করতে লাগলো। নিজেকে আরো গুটিয়ে নিলো। শুভ্র আবারও তার দু’হাত মুঠোয় নেয়। শান্ত, কোমল গলায় ডাকে,
-“অরু? অরু, শান্ত হও। প্লিজ, কি হয়েছে বলো? একটু শান্ত হও। অরু?”
অরু তখনও অস্বাভাবিক আচরণ করছে। চোখ বেয়ে গড়াচ্চে নোনা জল। শুভ্র হতবাক হয়ে গেল। কি বলে, কি করে মেয়েটাকে শান্ত করবে সে বুঝে পেলো না। এমন কেন করছে সেটাও জানে না।
দরজা লক করায় কি? সে তো অরুর বেড়িয়ে যাওয়া আটকাতে দরজা লক করেছিলো। এতে এমন ভয় পাওয়ার কিছু তো নেই। নাকি অন্য কিছু? অরু কখনও ঘরের দরজা তেমন একটা আটকায় না, একান্তই প্রয়োজন ব্যতিত। ভেজিয়ে রাখে। শুভ্র এতোদিন বিশেষ পাত্তা না দিলেও, আজ ভাবাচ্ছে তাকে। শুভ্র প্রচণ্ড বিব্রতবোধ করে। এতটা অসহায় লাগছে তার, আগে কখনো এমন হয়নি। সে হাত বাড়িয়ে অরুর গাল ছুঁয়ে দেখে, গাল গরম। অদ্ভুত কাঁপন ছড়িয়ে আছে মেয়েটার শরীর জুড়ে। শুভ্র হতভম্ব হয়ে পড়ে। নিজেকে সামলে বলে,
-“অরু, প্লিজ আর চিৎকার করো না। আমি তো… আমি তো শুধু…”
কথা গুলিয়ে যায়। কী বলবে বুঝতে পারছে না সে। তার অহংকার, তার রাগ, তার ‘পুরুষত্ব’ এই মুহূর্তে কোথাও নেই। কোত্থাও না। আছে শুধু একরাশ নির্মল কোমলতা। এতক্ষণের রাগ, জেদ, ক্ষোভ সব মুছে গিয়েছে। হুট করেই পালিয়ে গিয়েছে।
অরু ততক্ষণে কাঁপছে। নিঃশ্বাস ওঠানামা করছে ভীষণ দ্রুত। চোখে জলের সাথে অদ্ভুত একধরনের আতঙ্ক বাসা বেঁধেছে৷ শুব্র খানিকটা কোল ঘেঁষে বসে। কপোল চাপড়ে ডাকে,
-“অরু? অরু?”
অরু সাড়া দেয় না। অদ্ভুত আচরণ করছে সে। শুভ্রকে সরাতে চাইছে। তার ছোঁয়া সরাতে চাইছে। শুভ্র তার হাত ছাড়ে না। আরো বার কয়েক ডেকেও সাড়া না পেলে শুভ্র এবার চেঁচিয়ে উঠলো তার কাঁধ ঝাঁকিয়ে,
-“অরু!”
অরু চমকে ওঠে। শান্ত হয়ে যায় ক্ষণেই। ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে শুভ্রর দিকে। মস্তিষ্ক থিতিয়ে আছে যেন। শুভ্রর চিৎকার করার কারণ খুঁজলো সে। ভীতিরা ঠায় নিয়েছে তার অক্ষিপুটে। শঙ্কিত হয়ে চেয়ে আছে লোকটার দিকে। শুভ্র নিজের কাজেই অপ্রস্তুত হলো। তার হাত ধরে অনুতপ্ত হয়ে বলল,
-“স্যরি। আমি ওভাবে….”
তার বাক্য সমাপ্তি টানার পূর্বেই অরু আচানক হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো। চার দেয়ালের মাঝে কি করুণ শোনালো তা, একমাত্র শুভ্র জানে। সে স্তব্ধ চোখে চেয়ে। অরুর হুঁশ নেই কিছুতেই। সে কাঁদতে কাঁদতে শুভ্রর বুকের কাছটার শার্টের অংশ খামচে ধরলো। অরু তার কাছ ঘেঁষে বসে। কম্পিত গলায় বলে,
-“আ- আমি মরে যাবো শুভ্র। আমাকে মেরে ফেলবে ঐ লোক। আমার জীবনটা শেষ করে দিয়েছেন উনি। আমি…. আমি মরে যাবো।”
অরু সমানে একই কথা বিরবির করছে। শুভ্র স্তব্ধ, বিমূঢ়। কপালে ভাঁজ পরলো। কিসের কথা বলছে মেয়েটা? শুভ্র খুঁজে পায় না। কোন লোক তাকে মারবে? কেন মারবে? কি করেছে অরু? অরু কাঁদছেও বা কেন? হচ্ছেটা কি এসব? শুভ্র আলগোছে আগলে নিলো তাকে। এখন এতো প্রশ্ন জিজ্ঞেস করা উচিত নয়। তবে কৌতুহল দমাতে পারে না সে,
-“কে মারবে তোমাকে অরু? কার কথা বলছো।”
অরু প্রত্যুত্তর করে না। একই কথা বারবার বিড়বিড় করে,
-“আমি মরে যাবো… মরে যাবো।”
আচমকা নিস্তেজ হয়ে ঢলে পড়লো শুভ্রর গায়ে। শুভ্র পিছে হেলে পড়লো আচানক ভার বইতে না পেরে। ভ্রু কুঁচকে অরুর মুখ চাপড়ে ডাকলো তাকে। সাড়া না পেয়ে বুঝলো জ্ঞান নেই। শুভ্র তপ্ত শ্বাস ফেলল। পাঁজা করে কোলে তুলে ফেলল তাকে। নিয়ে গওয়ে বিছানায় শুইয়ে দিলো যত্ন সহকারে। এসির পাওয়ার কমিয়ে, কম্ফোর্টার বুক অবধি টেনে দিল। কিছুক্ষণ সেখানেই দাঁড়িয়ে চেয়ে রইলো মেয়েটার দিকে। এতো মিষ্টি মুখটা বজ এমন কাঁদলো কেন? কোনো পাস্ট ট্রমা আছে কি? শুভ্র কিছু সময় দাঁড়িয়ে, বেড়িয়ে এলো। দরজা আটকালো না আর, ভেজিয়ে দিলো।
পরদিন অরুর ঘুম ভাঙে দেরি করে। তাও সেটা ফোন কলের শব্দে। অরু মাথা চেপে উঠে বসে। অচেতন মস্তিষ্ক কিছুই মনে করতে পারে না। সময় নিয়ে মনে পড়তেই অরু চমকে গেল। এতোকিছু করেছে কাল। লজ্জায় আইঢাই করে উঠলে অরু। শিট! বাজতে বাজতে কেটে যাওয়া সেলফোনটা আবারও বেজে উঠলো। অরু বিছানা হাতড়ে ফোন নিল। হোয়াটসঅ্যাপ থেকে কল আসছে। ছোট ভাইয়ার কল। অরু ফোন রিসিভ করে কানে ঠেকায়,
-“হ্যালো?”
রায়হানের চিন্তিত গলা শোনা গেল,
-“অরু? কেমন আছিস?”
-“ভালো ভাইয়া। তুমি কেমন আছো?”
-“ভালো। আচ্ছা শোন।”
-“বলো।”
রায়হান বলতে ইতস্তত বোধ করলো। অরু ভ্রু কুঁচকায়,
-“ভাইয়া? বলো?”
রায়হায় অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে কোল ঘষে। বলে,
-“শফিক চাচ্চু আমেরিকায় থাকে, তাই না?”
অরুর চোয়াল শক্ত হয়ে এলো,
-“তো?”
-“আব্বু বলছিলো, চাচ্চুর সাথে যেন তুই একবার দেখা করিস।”
-“কি?”
অরু চমকায়। রায়হান বলে,
রোদ্দুর এবং তুমি পর্ব ৮ (২)
-“আব্বু বলেছে। আম্মুও। উনি নাকি চাচ্ছে তোর সাথে দেখা করতে। ওনার ফ্যামিলিরা সবাই চাচ্ছে তোর সাথে একদিন দেখা করবে, সময় কাটাবে, এসবই। ইউ নো, হোয়াট আই মিন?”
অরু অবিশ্বাস্য গলায় বলে,
-“আব্বু-আম্মু এগুলো বলে কি করে? এতোকিছু হয়ে গেল, স্টিল ওদের পক্ষ নিবেন ওনারা?”
রায়হান চুপ থাকে। অরু আর কথা বাড়ায় না। রুচিতে বাঁধলো খুব তার। ফোন কেটে ছুঁড়ে মারলো বিছানায়। দু’হাতে মুখ গুঁজে বসে রইলো চুপ করে। আচমকা শব্দ করে কেঁদে উঠলো।
