Home রৌদ্রময় বালুচর রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৪৬

রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৪৬

রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৪৬
সোহানা ইসলাম

কলেজের ক্যান্টিনে বসে আছে তিন বান্ধবী—ফিহা, মিম আর জারা। দুপুরের ব্রেক টাইম, চারপাশে কোলাহল, হাসি-আড্ডায় ভরে আছে পরিবেশ। কিন্তু মিম আজ চুপচাপ। চোখে একরকম অস্থিরতা। ফিহা আর জারা দুজনেই সেটা খেয়াল করলো। তারা দুজন মিমের দিকে তাকিয়ে রইলো প্রশ্নভরা চোখে।
অবশেষে জারা বলল,

—” কী হয়েছে তোর?কী ভাবছিস এমন করে?”
ফিহা ও বলে,
— “হ্যাঁ, তুই রাশেদ ভাইকে দেখলেই চুপ হয়ে যাস কেন? ওর দিকেই বারবার তাকাস!লক্ষ করছি কিছু দিন ধরে! ”
মিম একটু চমকে উঠলো, তারপর দু’জনের মুখের দিকে তাকাল। বুঝতে পারলো, লুকানো আর সম্ভব নয়। ধীরে ধীরে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
— “তোরা যাকে রাশেদ ভাই বলে ডাকছিস, সেই রাশেদই হচ্ছে আমার অতীতের মানুষ।
জারা আর ফিহা অবাক হয়ে একে অপরের দিকে তাকালো। তারা যেন বিশ্বাসই করতে পারছে না।
আজ সেই রাশেদই হঠাৎ সামনে এসে দাঁড়িয়েছে আরমান ভাইয়ার সেক্রেটারি হিসেবে।
ফিহা বিস্মিত কণ্ঠে বলল,
— মানে, এই রাশেদই… সেই রাশেদ রাজ?
মিম নীরবে মাথা নেড়ে সম্মতি দিলো। মুহূর্তেই তিন বান্ধবীর মাঝে নীরবতা নেমে এলো।মিমকে আর কিছু বলল না তারা। ভালোবাসার মানুষ টা আজ এতো কাছে। কিন্তু মুখ ফুটে বলতে পারছে। এই কষ্ট তাকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে।
মিমও মন খারাপ করে না। তাদের সাথে স্বাভাবিক ভাবে কথা বলে। ক্যান্টিনে আড্ডার পর ঘণ্টা বেজে উঠলো। তিন বান্ধবী—ফিহা, মিম আর জারা—হাসি-তামাশা করতে করতে ক্লাসরুমের দিকে রওনা দিলো। কিন্তু মনের ভেতর মিমের কথাগুলো ঘুরপাক খাচ্ছিল সবার। বিশেষ করে ফিহার।

ফ্যাক্টরির কাজ শেষ করে ক্লান্ত শরীরে বাড়ি ফিরছে আরমান। চোখেমুখে ক্লান্তি স্পষ্ট, তবুও ভেতরে যেন অন্যরকম অস্থিরতা। এতো দায়িত্ব সব তার কাধে এখন। কোম্পানির কাজ শেষ হতেও আর মাস এক লাগবে। নতুন ব্রাঞ্চ ওপেনিং এর চাপ পরছে বেশি। কি করবে মাথায় ডুকছে না।
ফ্যাক্টেটি থেকে তাদের বড় মাঠের বাড়িটা বেশি দূর না। হাতে গোনা দুই থেকে তিন মিনিট লাগে। আরমান বাড়র সামনে আসতেই দেখে রোহান বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে। তার চেহারায় অস্থিরতা, চোখে লালচে ছাপ, যেন সারারাত ঘুমের দেখা পায়নি।
আরমান তাকে এক ঝলক দেখে নিঃশব্দে নিজের রুমের দিকে চলে গেল। একটাও কথা বলল না।
রোহানের বুকটা মোচড় দিয়ে উঠলো। ভেতরে ভেতরে সে জানে, কাল রাতের ঘটনাগুলো আরমানকে কষ্ট দিয়েছে। কিন্তু তবুও তার মনে হলো—বন্ধু হয়ে এইভাবে উপেক্ষা করা কি ঠিক হলো? তাই সে চুপচাপ আরমানের পিছন পিছন রুমে ঢুকল।
আরমান ওয়াশরুমে ঢুকে ফ্রেশ হতে লাগলো। রোহান বিছানায় বসে, হাতদুটো একসাথে চেপে ধরে আছে। চোখ-মুখ শুকিয়ে গেছে, গালে দাড়ি গজিয়েছে। মনে হয় সারারাত বারান্দায় বসে শুধু সিগারেট ফুঁকেছে, একটুও ঘুমায় নি।রাতে তার বাবাকে কল করে বিয়ের জন্য না করে দিয়েছে। অবশ্য ওর বাবা অনেক রাগারাগি করছে ওর সাথে এতে রোাহনের কিছু যায় আসে না।
কী করে ঘুমাবে সে। সারারাত জিনিয়ার দরজার সামনে বসে তার কান্নার শব্দ শুনেছে। জিনিয়ার কান্না শুনে কলিজা ছিড়ে আসছিলো রোহানের। ভোরের দিকে তার কান্নার শব্দ বন্ধ হয়। হয়তো কান্না করতে করতে ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পরেছে তার চাঁদ সুন্দরী।
ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে আরমান আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল মুছতে লাগলো। তখনও সে কোনো কথা বলল না। রোহান হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে বলল—

—” তোর সাথে কথা আছে আমার।”
আরমান ভ্রু কুঁচকে আয়নায় তাকাল, কিন্তু কিছু বলল না।
রোহান আবার বলল,
—” তুই শুনছিস তো আমি কী বলছি?”
এইবার আরমান গম্ভীর কণ্ঠে ঠান্ডা স্বরে উত্তর দিল—
—” আমার কারো সাথে কথা নেই। এখন আসতে পারিস ।”
কথাটা শুনে রোহানের বুকটা যেন ভেঙে গেল। তার চোখ ছলছল করে উঠলো। কষ্ট, রাগ আর অপমান মিশে বুকের ভেতর ঝড় তুললো। বন্ধুর কাছ থেকে এই প্রত্যাখ্যান সে কোনোদিন আশা করেনি।
হঠাৎই অতিরিক্ত চাপ আর অস্থিরতায় তার মাথা ঘুরে গেল। মুহূর্তের মধ্যে ধপ করে মাটিতে পড়ে গেল রোহান। শরীরটা কেঁপে উঠছে, ঠোঁট নীলচে হয়ে আসছে।
আরমান আয়নার দিকে তাকিয়ে এই দৃশ্যটা দেখে মুহূর্তেই ভয় পেয়ে গেল। চোখে-মুখে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লো। দৌড়ে এসে মাটিতে বসে রোহানের মাথা নিজের কোলে তুলে নিল।

—” দোস্ত! কী হয়েছে তোর? বল কিছু! ভাই, চোখ খোল! তোকে আর কষ্ট দিব না। কথা বলব তো আমি তোর সাথে। চোখ খোল! “— কণ্ঠটা কাঁপছে, গলায় আতঙ্ক আর অসহায়তা।
আরমান কাঁপা হাতে রোহানের গালে হালকা থাপ্পড় দিতে লাগলো। কিন্তু কোনো সাড়া নেই। রোহান নিস্তেজ হয়ে পরে আছে।
আরমান চিৎকার করে, জাহেদ! রাশেদ কে ডাকতে থাকে। কিন্তু তাদের সাড়াশব্দ পায় নি আরমান।
আরমান এবার রাগে দুঃখে চিৎকার করে বলে
__” কুত্তার বাচ্চারা কই তোরা? তাড়াতাড়ি আমার রুমে আয়। ”
তার গলা ফাটিয়ে ডাকার শব্দে দু’জনেই হুড়মুড় করে দৌড়ে এলো। এসে তারা এই দৃশ্য দেখে স্তব্ধ হয়ে গেল।
জাহেদ তোতলাতে লাগলো—

—” কী… কী হয়েছে রোহান ভাইয়ার?”
রাশেদও আঁতকে উঠে বলল—
—” ভাইয়া, ওর শরীর তো কাঁপছে!”
আরমান চোখে পানি নিয়ে চিৎকার করল—
— ” কিছু কর! তাড়াতাড়ি কিছু কর!”
তারা মিলে তৎক্ষণাৎ রোহানকে বিছানায় শুইয়ে দিল। জাহেদ পানি নিয়ে এসে তার মুখে ছিটাতে লাগলো। রাশেদ হাত ধরে নাড়ির স্পন্দন বুঝতে চেষ্টা করল।
কিছুক্ষণ পর ধীরে ধীরে রোহানের চোখ কেঁপে উঠলো। নিঃশ্বাস ভারী, শরীর এখনও দুর্বল। কিন্তু জ্ঞান ফিরছে।
আরমান দ্রুত মাথার কাছে বসে পড়লো। কাঁপা হাতে তার কপালে হাত বুলিয়ে দিল। চোখ ভিজে গেছে অশ্রুতে।
— ” দোস্ত, কী হইছিল তোর? আমি তো ভয়ে শেষ হয়ে যাচ্ছিলাম। কিছু বল…”
রোহান চোখ আধখোলা করে তাকাল। ঠোঁটে মৃদু কাঁপুনি, গলা শুকিয়ে এসেছে। ধীরে ধীরে ফিসফিস করে বলল—

— ” আমি… আমি ঠিক আছি…”
আরমান কাঁপা গলায় উত্তর দিল—
— “ঠিক আছিস মানে? তুই হঠাৎ এভাবে মাটিতে পড়ে গেলি কেন? ”
কথা শেষ করতে পারলো না। গলা ভারী হয়ে গেল।
রোহান দুর্বল গলায় বলল—
— ” জিনিয়ার কষ্ট গুলো আমাকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে দোস্ত। আমি এখন কী করে ওর চোখে চোখ রেখে কথা বলব? মরে যেতে ইচ্ছে করছে আমার। ”
এই কথা শুনে আরমানের বুকটা হুহু করে উঠলো। রাগ আর কষ্ট একসাথে মিশে গেল।
— ”জানোয়ারের বাচ্চা তুই মেরে গেলে, আমার বোনের কী হবে? সব জানার পর এখন পালিয়ে যেতে চাইছিস?”
চোখের কোনে জমে থাকা অশ্রু ঝরে পড়লো এবার রোাহনের।

__” পালাব না। আমৃত্যু পর্যন্ত তোর বোনের পাশে থাকবো।সেই সুযোগ টা করে দিবি আমায়? ”
রোহান ভিজে চোখে তাকিয়ে রইলো আরমানের দিকে। ঠোঁটে দুর্বল একটা হাসি ফুটলো।
— “তোকে রাগ দেখাতে চাইনি… কষ্ট দিয়েছি তোকে। প্লিজ ক্ষমা করে ভাই! ”
আরমান কাঁপা কণ্ঠে বলল—
— শা*লার ভাই ! তুই জানিস না, তুই না থাকলে আমি একা হয়ে যাই? আবার এখন ক্ষমা চাইছে।”
জাহেদ আর রাশেদ নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে এই দৃশ্য দেখছিল। তাদের চোখেও পানি জমে গেছে।কিন্তু জিনিয়ার বিষয়ে কী যেনেছে রোহান? যার জন্য এতো ভেঙে পরেছে সে। রোহান চিন্তিত গলায় বলে __” ভাইয়া জিনিয়া কী করেছে? ”
রোহান বহু কষ্টে মিহি কন্ঠে বলে __” তোমার বোন কিছু করেনি শালা বাবু। দোষ তো আমি করেছি। তাকে কষ্ট দিয়েছি।”
আরমান আবার রোহানের হাত শক্ত করে ধরলো।
—” প্রতিজ্ঞা কর, আর কখনো এভাবে নিজেকে শেষ করার মতো কিছু করবি না। আমি তোর সাথে আছি। সব ঝড় আমরা একসাথে সামলাবো।”
রোহান ধীরে ধীরে মাথা নেড়ে সম্মতি দিল। দু’জনের চোখের জল একাকার হয়ে গেলো।

তারা তিনজন ক্লাসে ঢুকতেই স্যার এসে উপস্থিত হলেন। টেবিলের উপর বই-খাতা রেখে গম্ভীর গলায় স্যার বললেন,
—” আগামী সপ্তাহে তোমাদের পরীক্ষা। সবাই ভালো করে প্রস্তুতি নাও।”
এ কথা শুনেই যেন মাথার ওপর আকাশ ভেঙে পড়লো ফিহার। মুখে হাত দিয়ে বিড়বিড় করতে লাগল,
—” হায় আল্লাহ!মাএ কলেজে ভর্তি হলাম এর মাঝে পরীক্ষা? ”
জারা পাশে বসে খুঁচিয়ে বলল,
— ” চুপ কর, স্যার দেখবে! ”
মিমও ধাক্কা দিয়ে ফিসফিস করে বলল,
—” মনোযোগ দে ক্লাসে ফিহুর বাচ্চা! ”
কিন্তু ফিহার যেন কারও কথাই কানে ঢুকছে না। সে নিজের মতো বিরবির করেই যাচ্ছে। স্যার বোর্ডে লিখতে লিখতে হঠাৎ খেয়াল করলেন ফিহার দিকে। থেমে গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,

— ” ফিহা, তুমি কেন ক্লাসে মনোযোগ দিচ্ছো না?”
ফিহা চমকে উঠে থতমত খেয়ে উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করলো, কিন্তু আবারো মনে মনে বিড়বিড় করতে লাগল—” শকুনির চোখ দিয়ে এটাও দেখে ফেলেছে!”
স্যারের ভ্রু কুঁচকে গেল। বিরক্ত স্বরে বললেন,
—” দাঁড়াও! তুমি দাঁড়িয়ে থাকবে ক্লাসের বাকি সময়টা।”
পুরো ক্লাস হাসি চাপতে না পেরে ফিসফিস করতে লাগল। ফিহার মুখ লাল হয়ে গেল রাগে আর লজ্জায়। জারা আর মিম দুজনেই বারবার চোখে ইশারা করছিল চুপ থাকতে, কিন্তু ফিহার মুখ থেকে যেন কিছুতেই কথা থামছিল না।
স্যার এবার গলা উঁচু করে বললেন,
— “পড়াশোনার প্রতি এই ধরনের অবহেলা আমি সহ্য করবো না। যদি সিরিয়াস না হও, তবে বাড়িতে বলো বিয়ে দিয়ে দিতে! ”
ফিহা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মুখ বাঁকিয়ে আবারও ছোট ছোট স্বরে বিরবির করল। এবার পুরো ক্লাস হাসিতে ফেটে পড়লো।
স্যার রেগে গিয়ে ফিহাকে দাঁড় করালেন। ক্লাসে একেবারে চুপচাপ। সবাই অপেক্ষায় আছে—এবার কী হয়!
স্যার গম্ভীর গলায় বললেন,

— “ফিহা, তুমি এতক্ষণ কী বিড়বিড় করছিলে?”
ফিহা ঠোঁট কামড়ে একটু ভেবে নিয়ে বলল,
— “স্যার… আমি আসলে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করছিলাম, যেন পরীক্ষা পিছিয়ে দেন।”
পুরো ক্লাস হো হো করে হেসে উঠলো। স্যার চোখ কুঁচকে বললেন,
— ” বাহ! পড়াশোনা বাদ দিয়ে পরীক্ষা পিছানোর দোয়া করছো?”
ফিহা সরল মুখে উত্তর দিল,
— ” স্যার, এত কম সময়ে তো প্রস্তুতি নেওয়া অসম্ভব। তাই ভাবলাম আল্লাহ যদি মিরাকল করে দেন!”
স্যার গম্ভীর থাকার চেষ্টা করলেন, কিন্তু ঠোঁটের কোণে হাসি টের পাওয়া গেল। তবু রাগী ভাব নিয়ে বললেন,
—” আচ্ছা, পড়াশোনা না করলে কীভাবে ভালো করবে?”
ফিহা মাটির দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলল,
—’ স্যার, ভালো করার জন্যই তো প্রার্থনা করছিলাম।”
এবার ক্লাসে সবাই আবার হো হো করে হেসে উঠলো।
স্যার একটু নাটকীয় ভঙ্গিতে বললেন,
—” বাহ! তাহলে আমি কাল থেকে ক্লাসে পড়াবো না। শুধু দোয়া -দরুদ পড়াবো। পরীক্ষার খাতায় তাহলে সবাই বেশি নাম্বার পাবে।”
ফিহা হাত তুলে বলল,

—” স্যার, আইডিয়াটা খারাপ না। একবার চেষ্টা করে দেখা যেতে পারে।”
স্যার আর নিজেকে সামলাতে পারলেন না, রেগে হেলেন বিশণ। তারপর হালকা গলায় বললেন,
— ” আচ্ছা, তাহলে এখন গিয়ে কান ধরে ক্লাসের বাহিরে দাড়িয়ে থাকো! ”
মুহূর্তেই ক্লাসে হালকা হাসির ঢেউ বয়ে গেল। ফিহার মুখটা ভোতা হয়ে গেল। ধীর পায়ে বাইরে গিয়ে দরজার পাশে কান ধরে দাঁড়াল।
মিম আর জারা একে অপরের দিকে তাকাল। বন্ধু এভাবে দাঁড়িয়ে আছে, আর তারা নিশ্চুপ বসে থাকে কী করে? দু’জনের মনেই অপরাধবোধ কাজ করলো। জারা সাহস করে দাঁড়িয়ে বলল,
— স্যার, আসলে ফিহা এমন ইচ্ছাকৃত করেনি। ও শুধু একটু ভয় পেয়েছিল পরীক্ষার কথা শুনে।
মিমও দ্রুত যোগ করল,
— হ্যাঁ স্যার, ওর হয়ে আমরা দুঃখিত। দয়া করে ওকে আরেকটা সুযোগ দিন।
স্যার কিছুক্ষণ তাদের দিকে তাকিয়ে রইলেন। চোখেমুখে বিরক্তির ছাপ। তারপর গম্ভীর গলায় বললেন,
— বাহ! এখন তোমরাও তার উকিল হয়ে দাঁড়িয়েছো? আচ্ছা, তাহলে শাস্তি তোমাদেরও প্রাপ্য।
এক মুহূর্তেই ক্লাসরুম নিস্তব্ধ হয়ে গেল। স্যার কড়াভাবে বললেন,
— তোমরা তিনজনেই বের হও। বাইরে গিয়ে কান ধরে দাঁড়িয়ে থাকো।
মিম আর জারার মুখ হা হয়ে গেল। ফিহাকে বাঁচাতে গিয়ে তারাই ফেঁসে গেল। তবু কোনো উপায় নেই, তারা ও মাথা নিচু করে বাইরে বেরিয়ে গেল।

রোহান তখন আরমানের রুমে শুয়ে গভীর ঘুমে। সারা রাত ঘুমাইনি, টেনশন, মানসিক চাপ, ক্লান্ত শরীরটা যেন বিছানায় লেপ্টে আছে। আরমান দরজাটা আস্তে টেনে বন্ধ করে বেরিয়ে এল। তার পায়ের শব্দ বারান্দায় ভেসে উঠল, ধীর আর স্থির।
জিনিয়ার রুমের সামনে এসে সে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। ভেতর থেকে হালকা কান্নার শব্দ কানে এলো। বুকের ভেতরটা কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠল। তারপর ধীরে ধীরে দরজায় নক করল।
“জিনিয়া ।”
ভেতর থেকে মুহূর্তের জন্য কোনো সাড়া নেই। কিছুক্ষণ পর কপাট খুলল ধীরে ধীরে। দরজার ফাঁক গলে বেরিয়ে এল জিনিয়ার ফ্যাকাসে মুখ। চোখদুটো কান্নায় লাল, ঠোঁট কাঁপছে।
আরমান এক দৃষ্টিতে তাকাল বোনের দিকে। তার কঠিন চেহারায় মমতার রেখা ফুটে উঠল। সে হাত বাড়িয়ে জিনিয়ার মাথায় রাখল। আঙুলগুলো মমতায় বোনের চুলে বুলিয়ে দিল।
– “কী হয়েছে, বনু?”
মুহূর্তেই জিনিয়া আর স্থির থাকতে পারল না। হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। ছুটে এসে বড় ভাইয়ের বুকে ডলে পড়ল। তার গলা ভিজে গেল কান্নার স্রোতে।

– “ভাইয়া… উ উনি আমাকে ভালোবাসে না।”
আরমান বোনকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। তার গলার স্বর ভারী হয়ে উঠল, কিন্তু স্নেহে ভরা।
– “না বনু, এমনটা ভাবিস না। রোহান শুধু তোকে ভালোবাসে।আর কাউকে না। ”
জিনিয়া আবারও বলে
__” উনি বিয়ে করে নিবেন বলেছে? ”
__” তোকে ছাড়া অন্য কাউকে বিয়ে করবে না রোহান। ভাইয়ার উপর বিশ্বাস রাখ।”
জিনিয়া মাথা নাড়িয়ে হাহাকার করে বলল—
– “না ভাইয়া, উনি সত্যি আামকে আর ভালোবাসে না। কাল সব জানার পর চুপচাপ রুম থেকে বের হয়ে যায়। ”
আরমান ধৈর্য ধরে বোনের মুখটা দু’হাত দিয়ে তুলে ধরল। তার চোখে চোখ রেখে দৃঢ় কণ্ঠে বলল—
– “তোকে ছাড়া রোহানের পৃথিবী অসম্পূর্ণ। তুই বিশ্বাস কর, সময় হলে সব বুঝবি। তুই শুধু ধৈর্য ধর, আর নিজেকে কষ্ট দিবি না।”
জিনিয়া আবার ভেঙে পড়ল। আরমান তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিল, যেন সব যন্ত্রণা দূর হয়ে যায়। কিছুক্ষণ এভাবে বোনকে সান্ত্বনা দিল সে।
– “খাওয়া-দাওয়া ঠিক মতো করবি। নিজের খেয়াল রাখবি।কেমন অগোছালো হয়ে আছিস। দেখতে একদম পেত্নীর মতো লাগছে। ”
জিনিয়া সোবসোব করতে করতে মাথা নাড়ল। বড় ভাইয়ের স্নেহমাখা কথায় তার বুকের ভেতরের ভার যেন কিছুটা হালকা হলো।

__” রোহান শুরু তোকে ভালোবাসে। তোকে কষ্ট দিয়েছে বলে নিজেকে শেষ করতে চাইছে। একটু আগে সেন্স লেস হয়ে গেছে। আমার রুমে শুয়ে আছে এখন রোহান। ”
এটা শুনে যেনো জিনিয়ার বুকটা মুচড়ে উঠে। আবারও হাউমাউ করে কান্না করতে করতে বলে
__” আ আমি ওনাকে দেখতে চাই ভাইয়া। ”
__” ঘুম থেকে উঠে সে নিজেই আসবে তোর সাথে দেখা করতে। ”
আরমান ধীরে ধীরে বোনকে শান্ত করল। তারপর দরজার দিকে এগোল। বাইরে বের হতে না হতেই সামনে দাঁড়িয়ে গেল দুই পরিচিত মুখ—রাশেদ আর জাহেদ।
আরমানের চোখ সরু হয়ে এলো। কপালের ভাঁজ যেন আরও গভীর হলো। সে বুঝতে পারল ওরা নিশ্চয়ই কোনো গুরুতর বিষয়ে এসেছে।
আরমান ভ্রু কুঁচকে থেমে গেল। কড়া দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল—
– “এই সময় দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছিস কেন? কী চাই?”
রাশেদ কাশল হালকা গলায়, তারপর সাবধানে বলল—
– “ভাইয়া… কাল দুই তারিখ। রোহানের জন্মদিন।”
জাহেদও বলে

– “ভাবছিলাম তোমাকে জানাই, সবাই মিলে একটা সারপ্রাইজ প্ল্যান করলে কেমন হয়।”
আরমান তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে রইল। ঠোঁট শক্ত করে মুচকাল, গলা ভারী হয়ে উঠল—
– “আমার মনে আছে কাল আমার বেস্ট ফ্রেন্ড এর জন্মদিন ?তোদের মতো গাধা নয় যে ভুলে যাব।”
রাশেদ তাড়াতাড়ি বলল—
– “না ভাইয়া, তেমন কিছু না। আমরা শুধু ভেবেছিলাম জন্মদিন বলে মনে করিয়ে দিই। আর কিছু নয়।”
জাহেদ মাথা নিচু করে গম্ভীর স্বরে বলল—
– “শুধু মনে হয়েছিল… জানানো দরকার। তাই বলে গাধা বলবে তুমি আমাদের?”
আরমান তাদের দু’জনের দিকে আরেকবার কড়া দৃষ্টি দিল।
– “ এতো উপকার করতে বলিনি তোদের। আর এখন তোরা দুইটায় মিলে ফ্যাক্টেটিতে রাউন্ড দিতে যাবি। ”

দু’জন একসাথে মাথা নুইয়ে নীরব হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
আরমান আর কিছু বলল না। ঠান্ডা ভঙ্গিতে পা বাড়াল নিজের রুমের দিকে। ভেতরে গিয়ে দেখল রোহান তখনও বিছানায় নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছে। সেই দৃশ্য দেখে তার বুকের ভেতরে চাপা দীর্ঘশ্বাস জমে উঠল।
ল্যাপটপ খুলে টেবিলে বসে গেল সে। স্ক্রিনের আলোয় মুখটা আরও কঠোর লাগছিল। আঙুল কীবোর্ডে ছুটে চলল, কিন্তু মনের ভেতর ঘুরপাক খাচ্ছিল জিনিয়ার কান্না।

বিকেলের শেষ আলোটা যেন ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছিল। চারদিকের হাওয়ায় শরতের একটা কেমন শূন্যতা ঘুরছিল। এসময়েই জারা কলেজ থেকে বাড়ি ফিরল। ব্যাগ কাঁধ থেকে নামিয়ে সবে উঠোনে ঢুকতেই ভেতর থেকে মায়ের ডাক শোনা গেল।
— “জোহান! কই রে? এখনো বের হলি না?”
মারজিয়া বেগম একরকম তাড়া দিচ্ছিলেন। ছোট ছেলে জোহানের আজ প্রাইভেটে যাবার সময় হয়ে গেছে।
কিন্তু জোহান বইয়ের খাতা গুছিয়ে বসে আছে। কোনোভাবেই বের হবার নাম করছে না।
— “আমি আজ যাব না মা।” গলায় কেমন জেদ।
মারজিয়া বেগম বিস্মিত হয়ে তাকালেন।
— “কেন যাবি না? পড়াশোনার সময় ফাঁকি দিলে হবে?”
জোহান মুখ নিচু করে গম্ভীর গলায় বলল,

— “ওই দিকে গেলে যদি চেয়ারম্যান সাহেবের ছেলের সাথে দেখা হয়ে যায়! উনি আমাকে দেখলেই মারতে আসে। আমি ভয় পাই।”
এই সময় জারা এগিয়ে এল ভাইয়ের পাশে। কলেজের ক্লান্তি থাকলেও ভাইয়ের কথায় তার মন নরম হয়ে গেল। সে নরম গলায় বলল,
— “তোকে কেউ মারবে না। চেয়ারম্যানের ছেলে তোকে দেখলেই সালাম দিবে।”
জোহান কিছুক্ষণ বোনের দিকে তাকিয়ে রইল। বড় বোনের কথায় সবসময়ই তার এক ধরনের ভরসা জাগে। শেষে মাথা নেড়ে সম্মতি দিল।
— “ সত্যি ।”
__”হুমম”
ব্যাগ কাঁধে তুলে প্রাইভেট পড়তে বেরিয়ে গেল জোহান।
কিন্তু এদিকে মারজিয়া বেগম ভ্রু কুঁচকে তাকালেন জারার দিকে। সন্দেহ মাখা গলায় বললেন,
— “চেয়ারম্যানের ছেলে হঠাৎ তোকে বা আমাদের কাউকে সালাম দিতে যাবে কেন? এরকম কথা বললি কেন?”
জারা হকচকিয়ে গেল। ঠোঁট কামড়ে গলা খাঁকারি দিয়ে বলল,

— “আ… আরে, আমি তো এমনিই বললাম। যাতে ওর মন সাহসী হয়, পড়তে যায়।”
মারজিয়া বেগম কিছুক্ষণ মেয়ের দিকে তাকিয়ে রইলেন। মুখে আর কিছু বললেন না। তবে চোখেমুখে কেমন অদৃশ্য এক প্রশ্ন লেগে রইল।
জারা মনে মনে হাফ ছাড়ল। মা আর কিছু খোঁচা দিলেন না বলে ভেতরে ভেতরে স্বস্তি পেল। কিন্তু তার মনের ভেতরেই যেন ঢেউ খেলে গেল—মা কি কিছু বুঝতে পারল?
আবারও যেন কিছু একটা মনে পড়ল মারজিয়া বেগমের। ধীরে ধীরে গম্ভীর স্বরে বললেন,
— “জারা, রাতে তুই কিন্তু একদম ঘরের বাইরে যাবি না। শুনেছি আজ ভোরের দিকে তোর রহিমা কাকি আমাদের বাড়ির আশেপাশে একজন অপরিচিত ছেলেকে ঘোরাফেরা করতে দেখেছে। সময় ভালো না।”
মায়ের কথা শুনে জারার বুক কেঁপে উঠল। আরমানকে দেখে ফেলো না তো আবার? সে শান্ত থাকার চেষ্টা করল।

রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৪৫

— “আচ্ছা আম্মু, বাইরে যাব না।”
বাইরে থেকে তখন অন্ধকার নামছিল। আকাশে চাঁদের আলো উঠতে শুরু করেছে। গ্রামের নির্জন পথগুলো হঠাৎ করে আরও ভৌতিক লাগছিল। মারজিয়া বেগমের কথায় জারার ভেতরেও অকারণে একটা আতঙ্ক জন্ম নিল।
তারপরও জারা ভেতরে নিজেকে সামলে নিল। ভাইয়ের জন্য সাহস জুগিয়েছে, এখন মাকেও নিশ্চিন্ত রাখতে হবে। কিন্তু বুকের গভীরে একটা গোপন রহস্য লুকানো আছে, যেটা কাউকে বলা যাবে না।

রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৪৭

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here