Home রৌদ্রময় বালুচর রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৪৭ (২)

রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৪৭ (২)

রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৪৭ (২)
সোহানা ইসলাম

রাত গভীর। ঘড়ি তখন বারোটা বাজতে তিন মিনিট বাকি। গোডাউনের ভিতর চুপচাপ। কেবল নিঃশ্বাসের শব্দ ভেসে আসে দেয়াল ধরে। বাতাস স্থির, কিন্তু অদ্ভুত এক উত্তেজনা ঘরটির কোণে কোণে বিরাজ করছে।
আরমান বারবার ঘড়ি দেখছে। চোখে শান্তি, মুখে অদ্ভুত স্বস্তি। কিন্তু তার মনোভাব, তার পরিকল্পনা, ভয়ংকর। গোডাউনের সব কোণে তার গার্ডগুলো ছড়িয়ে আছে। তারা সবাই শক্ত মানবীর মতো দাঁড়িয়ে আছে, যেন কোনো মুহূর্তে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য তৈরি।
লোকগুলো, যারা এখন গোডাউনে আটকা, তারা আরমানের দিকে তাকিয়ে আছে, কেবল বাঁচার আশায়। চোখে ভয়, কিন্তু মনে একটা ভ্রান্ত আশা – “শুধু কি হবে? হয়তো আর বাচার উপায় নেই।”
আরমান আবার ঘড়ি দেখে।তারপর গলা ছেড়ে বলে__“কেক নিয়ে আয় রে।”

শুনে সবাই চমকে ওঠে। এমন ভয়ংকর পরিস্থিতির মধ্যে কেক? রোহান, যে এখনও কিছু বুঝতে পারছে না, আরমানের দিকে প্রশ্নসূচক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।
আরমান হঠাৎ করে এগিয়ে আসে। তার হাত রোহানের গলার দিকে ওঠে, কিন্তু সে কোনো আঘাত করছে না। ধীরে ধীরে রোহানের ঘাড়ে হাত রেখে বলে, __“হেপি বার্থডে, দোস্ত।”
রোহান যেন স্তম্ভ হয়ে যায়। এতো কিছু ঘটার মাঝেও, তার প্রিয় বন্ধু তার জন্মদিন মনে রেখেছে। চোখে পানি আসে না, কিন্তু হৃদয়ে এক অদ্ভুত উষ্ণতা ভেসে যায়।
কিছুক্ষণের মধ্যে একজন গার্ড কেক নিয়ে আসে। আরমান রোহানকে ইশারা করে কেকটা কাটার জন্য। রোহান প্রথমে কিছু বলতে চায়, কিন্তু আরমানের দৃঢ় দৃষ্টিতে সে চুপ থাকে।
এই সময় সাহিল, আরমানের এক বিশ্বস্ত সহকারী, পাঁচটা বড় বড় বিদেশি চাকু নিয়ে আসে কিছুক্ষন আগে । চাকুগুলো এতই ঝকঝকে যে, হালকা আলো পড়লেই সূর্যের মতো উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। আরমান একটি চাকু তুলে ধরে রোহানের হাতে দিয়ে বলে

,___ “এটা দিয়ে কেক কাট।”
রোহান ধীরে ধীরে কেক কেটে। সে প্রতিটি টুকরোতে বন্ধুর মুখের কথা মনে করছে। আরমানও চোখে অদ্ভুত এক হাসি, কিন্তু চোখে রয়েছে ভয়ঙ্কর সিক্রেট।
বন্দি লোকগুলো ভয় পেয়ে চুপ। তারা বুঝতে পারছে, এই আনন্দ কেবল চোখ ধাঁধানো ছল।
রোহান কেক কাটার সময় সবাই তাকে উইস করছে। হেপি বার্থডে টুইউ গান গাওয়া শুরু করে।
আরমান বন্দীদের দিকে এগিয়ে আসে। তারপরও ঠাস করে চড় দিয়ে বলে __” মা*গী মা*রা চু*দির ভাই তোরা বলছ না কেন? ”
লোকগুলোর ভয়ে চোখ দিয়ে জল চলে আসে। ঠোঁট গুলো কাঁপছে তাদের। এখন শুধু তারা নিজেদের মৃত্যুর কথা চিন্তা করছে।
রোহান কেক কেটে আরমানকে খাওয়ায়, তারপর আরমানও রোহানকে কেক খাইয়ে দেয়। বন্ধুত্বের এই ক্ষণ যেনো ভয়ঙ্কর পরিস্থিতিকে কিছুটা নরম করেছে।
আরমান ইশারা করে সাহিলকে,

__ “সবাইকে কেক খাওয়াও।”
সাহিল একে একে সবাইকে কেক দেয়। কিন্তু বাকি আছে তিনজন লোক, যারা বাদা অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে। সাহিল কিছুটা দ্বিধায় পড়ে। তাদের কি খাওয়াবে নাকি না?
আরমান চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকা সাহিলের দিকে তাকিয়ে বলে,
___ “দাও…দাও! ওদেরও দাও। এটাই তো ওদের শেষ ।”
সাহিল বাধ্য হয়ে তাদের কেক খাওয়াতে থাকে। আরমান ঠোঁটে অদ্ভুত হাসি। তারপর বলে
____“খেয়ে নাও, সোনারা। একটু পর তো আর খাওয়ার সময় পাবে না। কারণ তোমাদের ওই গলায় মাথাটাই আর থাকবে না।”

লোকগুলো কাঁপতে কাঁপতে কেক খাচ্ছে। তাদের চোখে আতঙ্ক, কিন্তু আরমানের উপস্থিতি তাদের চুপ করিয়ে দিয়েছে। রোহান কেক কাটতে কাটতে ভাবছে, এই বন্ধু তার জন্য কতটা আত্মত্যাগ করতে পারে। আরমানের চোখে অদ্ভুত এক ছায়া, কিন্তু সে জানে, এই মুহূর্তই বন্ধুত্বের শক্তি দেখাচ্ছে।
ঘরটি তখন ভীষণ চাপের মধ্যে। বাতাস স্থির, নিঃশ্বাস ভারী। আরমানের চোখে রহস্য, রোহানের চোখে কৃতজ্ঞতা, আর গার্ডদের চোখে ভীতিকর সতর্কতা।
সাহিল ধীরে ধীরে বাকি কেকও বিতরণ করে। তিনজন বন্দি ভয়ে কেঁপে উঠছে। তারা জানে, এই মুহূর্ত শুধু খেলার মতো নয়। আরমানের চোখের অন্ধকার তাদের কোনো মুহূর্তে ধ্বংস করতে পারে।
রোহান কেক খাচ্ছে, আর তার মনে অদ্ভুত এক শান্তি। সে জানে, এই বন্ধুত্বই তাকে শক্তি দিচ্ছে। আরমানের চোখে অদ্ভুত এক রহস্যময়তা, যা কখনো বন্ধুত্বের উষ্ণতায়, কখনো ভয়ঙ্করের অন্ধকারে পরিবর্তিত হচ্ছে।

____” ওদের প্রথমে কী কাটবি?”তার কন্ঠ একেবারে শান্ত।
ঘরটি এখন নিঃশব্দ। কেবল নিঃশ্বাসের শব্দ আর দূরের বাতাসের ফিসফিস। রাত গভীর, ভয়ংকর, কিন্তু বন্ধুত্বের ক্ষণগুলো কিছুটা আলোকিত।
আরমান ধীরে ধীরে ছুরিটি হাতে নেয়। গার্ডদের দিকে ইশারা করে।
__“সব ঠিক আছে। কিন্তু মনে হচ্ছে দার আরও দেওয়ার দরকার ছিলো।”
রোহান তার হাতে থাকা কেক খেয়ে শেষ করে। সে আরমানের দিকে তাকায়। চোখে ধনু-ধারার এক অদ্ভুত কৃতজ্ঞতা। আরমান কেবল হেসে মৃদু কথা বলে
___ “আরমান ছুরিটা দে তো আমায়, একটু ট্রাই করি।”
আরমান নিঃশব্দে রোহানকে ছুরিটা দিয়ে দেয়।
রোহান ছুরিটা হাতে নিয়ে ওপাশ ওপাশ করতে করতে লোকগুলোর সামনে এসে দ্বারায়। তারপর বলে

___” ওর সাথে কেনো এমন করলি? কী শত্রুতা ছিলো ওর সাথে? ”
লোকগুলো ভয়ের চোটে কান্না করে দেয়। রোহানকে দেখেই মনে হচ্ছে এই বোঝি কারোর গলায় ছুড়ি চালিয়ে দিবে। তারা কাঁপছে বার বার।
রোহান আবার ভয়ংকর ভাবে ঘর কাঁপানো চিৎকার করে বলে ___” খা*নকির পোলারা বলছিস না কেন?”
___” কো..কো..নো মতলব ছিলো না? ”
রোহান পিছন ঘুরে আরমানের দিকে তাকায়। আরমান শান্ত ভাবে আয়েশি ভঙ্গিতে চেয়ারে বসে আছে।
__” তুই ওদের চিনিস আরমান? ”
__” হ্যাঁ চিনি! ও আমাদের কোম্পানির পুরনো ম্যানেজারের ছেলে। আর এ-ও যানি সে কেন এমন করেছে। ”
__” কেন করেছে? ”

আরমান বসা থেকে উঠে এসে দাঁড়ায় রোহানের পাশে। তারপর দুইহাত পকেটে গুঁজে বলতে শুরু করে ___” ওর বাবা আমাদের কোম্পানি থেকে টাকা চুরি করতো। মাসের হিসাবে গরমিল করে টাকা সরাতো। এটা ছোট আব্বু ধরে ফেলে। ওর বাবাকে পুলিশে দেওয়ায় হয়, তারই প্রতিশোধ নিতে এমনটা করে। ”
আরমান বন্দীর দিকে তাকিয়ে বলে __” আই এম রাইট? ”
রোহান আর কিছু শুনলো না। এক কুপে একলোকের ঘাড় থেকে মাথা আলাদা করে দেয়। আর বাকি দু’জন ভয়ে গলা শুকিয়ে কাঠ। তাদের চোখে মুখে রক্ত গুলো ছিটে যায়। আরমানের ও মুখে রক্ত ছিটে আসে। এতে আরমান খুব বিরক্ত।
__” বাল এই ভাবে কেউ মারে! কী সুন্দর পরিকল্পনা ছিলো আমার। সর তুই। “বলেই আর একটা বড় ছুড়ি হাতে নেয় সে।
আরমান রোহানকে বলে

__”দেখ কী ভাবে মারতে হয়। ”
আরমান যেই না ছুড়িটা চালাতে যাবে তখন রোহান বলে ___” দাঁড়া.. দাঁড়া একমিনিট। ” বলেই দৌড়ে চলে আসে চেয়ার নিতে। চেয়ারটা পেতে সুন্দর করে আরাম করে বসে বলে
___” এখন মার! দেখতে সুবিধা হবে। ”
আরমান একজনের লোকের প্রথম জেন্ত অবস্থায় চোখ খুলে নেয়। লোকটা ব্যথায় হাহাকার করতে থাকে। কিন্তু আরমান থামে না। বার বার জিনিয়ার মুখটা বেসে উঠছে তার চোখের সামনে। কীভাবে ছোয়েছে তার বোনকে জানোয়ার গুলো। তারপর দুইহাত কেটে নেয়। সবশেষে ঘাড় থেকে মাথা টা আলাদা করে দেয়।
আরমান রোহানকে শান্ত ভঙ্গিতে বলে–
__” এই বার পারবি? ”
__” আবব্বার জিগায়! সর তুই, আমি দেখি এবার। ”
গার্ড গুলো শুধু তাদের দিকে শান্ত ভাবে তাকিয়ে আছে। আরমান আর রোহানের পাগলামি দেখছে।তারা যেনো খেলছে লোকগুলোর সাথে। লোক গুলোকে শাস্তি কী ভয়ংকর ভাবে দিচ্ছে। এদের দেখলে মনেই হয় না তারা এমন ভয়ংকর । সালিহের মাথা দিয়ে ঘাম ঝড়ে পরছে। ভয়ে চোখ ঝাপসা হয়ে গেছে।

__” এই টা তো আসল কালপ্রিট তাই না? ”
ম্যানেজারের ছেলেকে দেখি বলে রোহান।
__” হুম এটাই। এটাকে নিয়ে তোর যা ইচ্ছে তাই কর। ”
“__আ…আমাকে মারবে না। আমি ক্ষমা চাইব পায়ে ধরে। আমাকে প্রাণে না মেরে পুলিশে দিয়ে দিন। তার পরও আমাকে মারবেন না। আমার প্রাণটা ভিক্ষা চাইছি। “লোকটা কান্না করতে করতে বলে রোহান আর আরমানকে।
__” তোর কাছেও আমার চাঁদ সুন্দরী এই ভাবে আকুতি মিনতি করছিলো, তাকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য, কিন্তু তোরা পশুর জাত। আমার চাঁদ সুন্দরী কে ছেড়ে দিস নি। বাচ্চা ছিলো সে। কিন্তু… ” বলেই এককুপে লোকটার একহাত ধরে কেটে ফেলে। রাগে শরীর কাপছে রোহানের।
__” রাগ ছিলো ওর বাপের সাথে। কিন্তু তোরা এই নিস্পাপ মেয়েটার জীবন নষ্ট করে দিলি। সে এখন নিজের ভাইয়ের সাথে কথা বলতে ভয় পায়।সবসময় একা থাকে। কারোর সাথে মন খারাপের কথাগুলো শেয়ার করতে পারে না।মন বরে হাসতে পারে না। মন খুলে কান্না করতে পারে না। শুধু মাএ তোদের জন্য। ” এই বলে আবার আর একটা হাত ধরে কেটে ফেলে।
রাত তখন নিস্তব্ধ। চারদিকে অন্ধকারে শুধু ঝিঁঝিঁ পোকার শব্দ। দূরে কোথাও কুকুরের ক্ষীণ ডাকে হঠাৎ স্রোত কেটে গেল।

“আআআআআ—!”
চিৎকারটা এত ভয়ঙ্কর, এত হাহাকারের মতো যে মনে হলো পুরো জঙ্গল কেঁপে উঠল। কিন্তু আশেপাশে কেউ নেই। কোনো মানুষের সাড়া নেই।অন্ধকারে তার কণ্ঠ ছড়িয়ে ছিটিয়ে গেল, তারপর ধীরে ধীরে ক্ষীণ হতে লাগল।
সে হাঁপাচ্ছে, মুখ দিয়ে শুধু ভাঙা শব্দ বের হচ্ছে—
“উহ্… আহ্… আল্লাহ… বাঁচাও…”
রক্তে ভিজে যাচ্ছে মাটি। সে কাঁপতে কাঁপতে হাতটা আঁকড়ে ধরল, কিন্তু আঙুলগুলো আর শক্তি পেল না। নিস্তব্ধ রাত তার আর্তনাদ গিলে নিলো।
আরমান শান্ত চোখে সব কিছু শুধু দেখছে। গার্ডরাও যেনো সর্তক হয়ে গেলো। এই দৃশ্য দেখে। রোহান রাগে দাঁত চেপে ধরে লোকটা চোখ দুটুও তুলে ফেলে। যে চোখ দিয়ে তার চাঁদ সুন্দরীর দিকে খারাপ নজরে তাকিয়ে ছিলো।
শেষে শুধু শোনা গেল ক্ষীণ হাহাকার—

___“হাহ্… উহ্…! দম শেষ!”
রোহান চোখ দুটু তুলে সোজা হয়ে দাড়িয়ে হাত ঝাড়তে থাকে। যেনো ময়লা গেলে আছে।
আরমান এগিয়ে এসে রোহানের কাঁধে হাত দিয়ে বলে __” যা করলি জীবনে, উপরে গেল দিব’নে!”
বলেই চোখ টিপ মারলো আরমান।
রোহান দাঁত বের করে হেসে বলে
__” একে বারে বরে দিবে মাম্মমা!”
দুইজনেই হাসতে থাকে। এখন একটু শান্তি লাগছে মনে তাদের। একটা চাপা রাগ লুকিয়ে ছিলো তাদের মনে। এটা যেনো আজ পুরোপুরি ভাবে শেষ হলো।
___” সাহিল! নিজ দায়িত্বে সব পরিষ্কার করবে। কোনো দাগ থাকলে কিন্তু … থাক আর বললাম না। আসছি! “বলেই রোহান আর আরমান চলে যায় গোডাউন থেকে।
সাহিল শুকনো ঢোক গিলে। মনে মনে আল্লাহ কে ডাকে। তারপর পরিষ্কার করার কাজে লেগে পরে।

রাত তখন চারটা। চারপাশে ঘুটঘুটে অন্ধকার, শহরের সমস্ত শব্দ যেন গভীর নিদ্রায় ডুবে আছে। নিস্তব্ধতাকে কেটে হঠাৎ একটা গাড়ির ইঞ্জিনের শব্দ ভেসে এলো খান বাড়ির গেটের কাছে। কালো রঙের মার্সিডিজ গাড়ি এসে থামল। গাড়ির ভেতর থেকে বের হলো আরমান আর রোহান। সারা রাত তারা গোডাউনের ভেতরে ছিলো। ভোর হওয়ার আগেই সব গুছিয়ে তারা চলে এলো খান বাড়িতে।
গাড়িটা সোজা গ্যারেজে ঢুকিয়ে দিল আরমান। দুইজন নামতেই চারদিকের নিস্তব্ধতা যেন আরও ঘন হয়ে এলো। খান বাড়ি তখনো গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। বাড়ির বিশাল দরজার সামনে এসে দু’জনে একসাথে কলিংবেল চাপতে লাগল।

টিং টং… টিং টং…
কিন্তু ভেতর থেকে কোনো সাড়া নেই। মিনিট পাঁচেক পর অবশেষে দরজার ভেতর দিয়ে এক পায়ের শব্দ ভেসে এলো। ঝিম ধরা চোখে সার্ভেন্ট দরজা খুলে দাঁড়াল। চোখ কচলাতে কচলাতে বিড়বিড় করে বলল—
—“এতো রাতে আবার কে এলো?”
কথা শেষ হওয়ার আগেই আলোয় স্পষ্ট হলো আরমান আর রোহানের চেহারা। দু’জনের মুখে অদ্ভুত ক্লান্তি, কিন্তু ভেতরে যেন ঝড় লুকানো। সার্ভেন্ট কিছু না বুঝে তাড়াতাড়ি দরজা খুলে দিল।
আরমান ভেতরে ঢুকেই হঠাৎ গলা ছেড়ে চিৎকার করে উঠল—
—“আবব্বু! ছোট আব্বু! কই তোমরা? তাড়াতাড়ি নিচে নামো! ”
রাতের নিস্তব্ধতা চিরে তার গলা বাড়ির প্রতিটি কোণে গুঞ্জন তুলল। এমন চিৎকার মাঝ রাতে শোনার অভিজ্ঞতা কারো ছিল না। পুরো বাড়ি যেন কেঁপে উঠল।
ভয় আর আতঙ্কে সকলে বিছানা ছেড়ে ছুটে এল। বাড়ির করিডরে এলোপাথাড়ি আলো জ্বলে উঠতে লাগল। একেকজন ঘুম ঘুম চোখে, বিস্মিত চেহারায় ড্রইংরুমের দিকে এগিয়ে আসছে।
সবচেয়ে আগে বেরিয়ে এলেন আরমানের বাবা। পরনে হালকা নীল রঙের পাতলা গ্যান্ঞ্জি, চোখে ঘুমের ছাপ। তাঁর মুখে স্পষ্ট ভয়

—“আরমান কখন আসলো ইসলাম পুড় থেকে ? আর এই রাতে ছেলে এমন গলা করছে কেন? ”
তার পেছনেই এলেন আরমানের ছোট আব্বু। কণ্ঠে অস্থিরতা
—“আরমান হঠাৎ না বলেই চলে আসলো যে ভাইজান ?আর কেনোই বা এভাবে ডাকছে?”
__” তুই যেখানে, আমিও তো সেখানেই। কীভাবে বলবো বল?”বললেন আরিফ খান।
তারা ছুটলেন ড্রইং রুমের দিকে। তাদের পিছনে ছুটছেন ফারিয়া বেগম আর জেসমিন বেগম।
রোহান কিছুটা চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিল। তার চোখের ভেতরে তখনো লুকানো ঝড়। মুখ শক্ত করে সে একপাশে দাঁড়াল, যেন কিছু বলতে চায় কিন্তু ভাষা খুঁজে পাচ্ছে না।
এদিকে আরমান থেমে গেল না। গলা ফেটে যাওয়ার মতো চিৎকার করে সে আবার ডাকল—
—“আব্বু! ছোট আব্বু! বের হও না কেন? ”
চিৎকারের শব্দ শুনে ওপরে থেকে নেমে এলো জেরিন। ভাইয়ার গলা তার কানে অচেনা আতঙ্ক হয়ে ধাক্কা দিল।বাচ্চা মেয়েটা চোখ ডলতে ডলতে, চুল এলোমেলো অবস্থায় সে দ্রুত সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এলো।জেরিন এতো দিন পর ভাইয়াকে দেখে ছুট্টে চলে আসে। আরমান কে জড়িয়ে ধরে বলে —

—“ভাইয়া… কেমন আছো? আর কখন এলে?”
আরমান বোনের মাথায় হাত বুলিয়ে বলে
__” মাএ আসলাম সিস্টার। আর তুমি এখানে কেন এসেছো? ”
__” তোমার গলা পেয়ে এসেছি। ”
আরমান জেরিনের এলোমেলো চুল গুলো ঠিক করে।
__” তুমি এখন ঘুমাতে যাবে। কাল সকালে আমরা আড্ডা দিবো, কেমন? ”
জেরিন বড় ভাইয়ার কথা মেনে চলে যায় নিজের রুমে ঘুমাতে।
ড্রইংরুম তখন আলোয় ভরে উঠেছে। সকলে চারপাশে জড়ো হয়েছে। একদিকে আতঙ্ক, অন্যদিকে কৌতূহল। কেউ জানে না কী ঘটেছে,আর হঠাৎ করে আরমান ইসলাম পুড় থেকে ময়মনসিংহ কেনোই বা আসলো না জানিয়ে? আর কেন আরমান এমনভাবে মাঝ রাতে চিৎকার করছে।
আরমানের গলা ভারী, নিশ্বাস কাঁপছে। চোখ লাল হয়ে উঠেছে। তার শরীর যেন প্রচণ্ড ক্লান্তি আর রাগে দুলছে। একবার বাবার দিকে তাকাল, তারপর ছোট আব্বুর দিকে। মুহূর্তে তার চোখে জ্বলজ্বল করল একরাশ ক্ষোভ, একরাশ বেদনা।
আরিফ খান ছেলের অস্থিরতা দেখে বলেন

__” কী হয়েছে আরমান? আর তুমি যে আসবে, কই আমাদের তো যানাওনি?”
আসিফ খান রোহানকে দেখে বলেন
__” তুমি এসেছো ভালো কথা! এই হতচ্ছাড়াকে কেন নিয়ে এলে সাথে করে?”
রোহান চমকে উঠে। ভয়ে হাত, পা কাপছে তার। এখন কি বলবে সে। আসিফ খান এর মুখ দেখে তো মনে হচ্ছে তাকে দেখে একটুও খুশি হয়নি।
হঠাৎ আরমান শান্ত ভঙ্গিতে গলা পরিষ্কার করে বলে
__” ছোট আব্বু! এই হতচ্ছাড়া তোমাদের কিছু বলতে চায়। ”
রোহানের যেনো এবার ভয়ের চোটে মাটিতে শুয়ে পরতে ইচ্ছে করছে। কীভাবে তাকে ফাঁসিয়ে দিলো তার প্রাণের বন্ধু। রাস্তায় কতো করে বললো। সে যেনো সবকিছু বলে ঠিক করে দেয়। আর এখন?
সবাই রোহানের দিকে বাজপাখির নজরে তাকিয়ে আছে। শুধু মাএ কিছু বলার জন্য এই রাতের বেলা এতো রাস্তায় অতিক্রম করে আসতে গেলো কেন। কী এমন কথা যা এখনই বলতে হবে।
আরিফ খান রোহানকে জিজ্ঞেস করেন

__” কী বলার জন্য এতো রাতে এই বাড়িতে এসেছো তুমি? ”
রোহানের গলা শুকিয়ে কাঠ। কন্ঠনালী দিয়ে কথা বের হচ্ছে না তার।
ফারিয়া বেগম আর জেসমিন বেগম দাড়িয়ে আছেন ড্রইং রুমের এক কোণে। তাদের মুখও গম্ভীর হয়ে আছে।
আসিফ খান তেজী কন্ঠে বলেন
__” ওর কোনো কথা শুনতে চাই না আমি। ”
আরমান বোঝতে পারে রোহান বিয়েতে না করে দেওয়ায় সবাই তারপর প্রচন্ড পরিমাণে রেগে আছে। আরমান রোহানকে পিছন থেকে ঠেলছে বলার জন্য। কিন্তু রোহান যেনো আরমানের পিছনে আরও লুটিয়ে যাচ্ছে। আরমান রোহানকে থাপ্পড় দিয়ে বলে __” বিয়ে করবি বলে আমার মাথা খাচ্ছিলি সারা রাস্তায়। এখন বলছি না কেনো? ”

রাত গভীর। জিনিয়া শুয়ে আছে জারা’র রুমে। তার চোখে ঘুম নেই। শুধু এপাশ ওপাশ করছে। চাপা কষ্ট আর অস্থিরতা যেনো তাকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে। চোখ জল চিকচিক করছে। বার বার রোহানের কথা মনে পরছে। আজতো রোহানের জন্মদিন। রোহানের সাথে কী আর তার দেখা হবে না কখনো?
রোহান কী তাকে সত্যি ছেড়ে চলে গেছে। অন্য কাউকে বিয়ে করে নিবে? বউ নিয়ে বিদেশে চলে যাবে? এসব ভাবতে ভাবতে শুয়া থেকে উঠে বসে জিনিয়া। জিনিয়া নরা চরায় ঘুম ভেঙে যায় জারা’র। সেও উঠে বসে।
___” কী হয়েছে জিনিয়া আপু? উঠে পরলে যে? ঘুম আসচ্ছে না? ”
আচমকাই জিনিয়া ফুপিয়ে কেঁদে উঠে। জিনিয়াকে কান্না করতে দেখে ভয় পেয়ে যায় জারা।
___’ কী হয়েছে আপু… কান্না করছো কেন? শরীর খারাপ লাগছে? ”
জিনিয়া ফুঁপাতে ফুঁপাতে বলে

__’ ও…ওনি আমাকে ছেড়ে চলে গেছে! ভালোবাসে না আমায় সে। ”
কান্নার কারণে গলায় কথা আটকে আসছে জিনিয়ার। জারা বোঝতে পারলো না জিনিয়া কার কথা বলছে?
___” আপু তুমি কার কথা বলছো? কে তোমায় ভালোবাসে না? ”
জিনিয়া হেঁচকি তুলতে তুলতে বলে
___” রো…রোহান ভাইয়া! ”
এখন সব কিছু পরিষ্কার হয়। জারা’র খুব খারাপ লাগছে ওর জন্য। জিনিয়াকে জড়িয়ে ধরে ওর পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলে __” আমার এই মিষ্টি আপুকে ভালো না বেসে
থাকতেই পারবে না রোহান ভাইয়া। ”
জিনিয়া শুনলো না জারা’র কথা।
___” ওনি অন্য কাউকে বিয়ে করে নিবেন বলেছে।বিদেশে চলে যাবে বলছে বউ নিয়ে । আমার খুব কষ্ট হচ্ছে এই বুক টায়। কেমন যেনো জ্বালা করছে বুকে। ও..ওনার কথাগুলো আমার বুকে ছুরির মতো আঘাত করছে বার বার। শা..শান্তি পাচ্ছি না আমি। ওনি কেন চলে গেলেন। আমি তো ভালোবাসতে চাই নি ওনাকে। ওনিই তো আমার মনে আশা জাগিয়ে ছিলেন। এ..এখন কেন ছেড়ে চলে গেলো? ”

ভোর ছয়টার কাছাকাছি। হঠাৎই নীরবতা ভেঙে রোহান গালে হাত ডলতে ডলতে এগিয়ে এল। তার চেহারায় ভয়ের সাথে একরাশ অস্থিরতা, আবার ভিতরে ভিতরে অন্যরকম এক দৃঢ়তা।
—“আ… আমি জিনিয়াকে বিয়ে করতে চাই।”
কথাটা এমনভাবে আকাশ ফাটিয়ে বের হলো যে সবাই থমকে গেল। ঘরজুড়ে মুহূর্তে যেন ঝড় বয়ে গেল। কারো চোখ কপালে উঠল, কেউ আবার হা করে তাকিয়ে রইল।
সবচেয়ে অবাক হলেন খান পরিবারের ছোট কর্তা আসিফ খান। তাঁর মুখ কঠিন হয়ে গেল, কণ্ঠ দৃঢ়, চোখে কঠোর দৃষ্টি—

—“না। এই বিয়ে হবে না। আমি আমার মেয়ে তোমাকে দেব না।”
ঘরজুড়ে তখন নিস্তব্ধতা। সবার দৃষ্টি একসাথে গিয়ে পড়ল রোহানের ওপর। সে যেন মুহূর্তেই ভেঙে পড়ল। চোখে পানি এসে গেল। কিছু না ভেবে হঠাৎ সে ঝুঁকে পড়ল আসিফ খানের পায়ের কাছে।
—“আঙ্কেল, না করবেন না! আমার বিয়ে জিনিয়ার সাথেই দিয়ে দিন। আমি তাকে ছাড়া বাঁচব না।”
আসিফ খান বিরক্ত হয়ে পা সরিয়ে নিলেন। কণ্ঠে দৃঢ়তা—
—“যা বলেছি তাই। তোমার বাবা প্রস্তাব দিয়ে ছিলেন। আর আমরা কোনো কথা ছাড়াই রাজি ছিলাম। কিন্তু তুমি না করে দিলে। আমার মেয়েকে বিয়ে করতে চাও না বলে।এখনো কেনো এসেছো? নাটক করতে?। ”
রোহান এবার থামল না। সে হেঁটে গিয়ে আরিফ খানের পায়ের কাছে ঝুঁকে পড়ল।
—“আঙ্কেল, আপনি দয়া করে কিছু বলেন। আপনিই বলুন না, জিনিয়া ছাড়া আমি কাউকে বিয়ে করব না। আমার ভুল হয়েছিল, আমি জানতাম না আগেই বিয়ের কথা ঠিক ছিল। আমি তো তখন না বলে দিয়েছিলাম,আমি মনে করেছি অন্য কারোর সাথে বিয়ে ঠিক করেছে বাবা। আমি সত্যিই জানতাম না।”
আরিফ খান প্রথমে থমকে গেলেন। তাঁর চোখে মায়ার ছাপ পড়ল বটে, কিন্তু তিনি কিছু বলার আগেই রোহান আবার ছুটে গেল ফারিয়া বেগমের কাছে।

সে কাঁদো কাঁদো গলায় বলল—
—“আন্টি আপনার কাছে হাতজোড় করি। আপনি বলুন না, বিয়েটা দিয়ে দিতে। আমি জিনিয়াকে বিয়ে করতে চাই ।”
ফারিয়া বেগম একটু অপ্রস্তুত হয়ে পড়লেন।
এরপর রোহান ছুটে গেল জেসমিন বেগমের দিকে। আবার পায়ে হাত রেখে বলল—
—“আন্টি, আপনি অন্তত আমার কথা শুনুন।আপনি তো আমার মা-য়ের মতো। আমি তো জিনিয়াকে ছাড়া বাঁচতে পারব না। আমি যদি তাকে না পাই, তাহলে আমার জীবনের কোনো মানে থাকবে না। মরে যাব আমি। ”
আরমান শুধু দাড়িয়ে দাঁড়িয়ে বন্ধুর পাগলামি দেখছে। এই ছেলে বিয়ের জন্য কি করছে শুধু। হাসিও পাচ্ছে তার। আরমান যানে জিনিয়ার বিয়ে রোহানের সাথেই হবে। কোনো বাদা আসবে না। সবাই এই বিয়েতে রাজি শুরু ছোট আব্বু ছাড়া। এখন রেগে আছে ঠিকই। কিন্তু তিনিও মনে মনে রোহানকে অনেক পছন্দ করেন।
জেসমিন বেগমের মুখে মায়ার হাসি ফুটল। তিনি বললেন—

—“রোহান, তুমি ওঠো, ওঠো। পায়ের কাছে পড়ে থেকো না।তুমি আমার সন্তানের মতো। তুমি কী সত্যিই জিনিয়াকে ভালোবাসো ।”
রোহান নাক টানতে টানতে মাথা উপর নিচে করে।
এক এক করে সবার মন গলতে লাগল। আরিফ খান, ফারিয়া বেগম, জেসমিন বেগম—সবার মুখ নরম হতে শুরু করল। কারো চোখে মায়া, কারো চোখে সহানুভূতি। তারা ধীরে ধীরে মাথা নাড়তে লাগলেন।
কিন্তু একমাত্র আসিফ খান অনড়। তাঁর মুখ কঠিন, চোখ জ্বলজ্বল করছে দৃঢ়তায়।
—“না মানে না। আমি তোমাকে মেয়ে দেব না।”
__” আর একবার না বললে মেয়েকে তুলে নিয়ে বিয়ে করে ফেলবো,শশুর আব্বা।”
__” বেয়াদব ছেলে তুমি আমাকে থ্রেট দিচ্ছো?”ভ্রু কুঁচকে রাগী দৃষ্টিতে বলেন আসিফ খান।
ঘরজুড়ে তখন অদ্ভুত এক পরিবেশ। রোহান মাটিতে বসে পড়েছে, তার চোখ কান্নায় ভিজে গেছে। সবাই তাকে দেখে মায়া পাচ্ছে। কিন্তু আসিফ খানের দৃঢ়তা যেন ভাঙার নয়।
হঠাৎ রোহান হাতজোড় করে আসিফ খান কে বলে উঠল—

—“আঙ্কেল,আমি যদি জানতাম আমার সঙ্গে জিনিয়ার বিয়ে ঠিক হয়েছে, তাহলে তো কখনো না বলতাম না। আমার ভুল হয়েছিল। এখন আমি সেই ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করতে চাই। আমি শুধু জিনিয়াকেই বিয়ে করব।দিয়ে দিন না বিয়ে টা ওর সাথে।”
কথাটা এত দৃঢ়ভাবে বের হলো যে ঘরজুড়ে এক মুহূর্ত নীরবতা নেমে এলো। সবাই তাকিয়ে রইল আসিফ খানের দিকে। তিনি কোনো উত্তর দিলেন না। কেবল মুখ ফিরিয়ে নিলেন।তারও এখন এই ছেলের কান্ড দেখে হাসি পাচ্ছে।
__” ঠিক আছে। তোমার বাবাকে আসতে বলো!”
তার কান্নার শব্দ ড্রইংরুমে প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল।হঠাৎ আসিফ খান এর কথা শুনে সবার প্রাণ ফিরে আসে। কারণ এত বড় ছেলে এভাবে সবাইকে ধরে ধরে পায়ে পড়ছে এটা কেমন দেখায়।আরিফ খান আর ফারিয়া বেগম মুখ ঢেকে হেসে ফেললেন।
রোহান বসা থেকে উঠে চোখের পানি মুছেতে মুছতে বলে __” সত্যি বিয়েটা হচ্ছে আঙ্কেল? কোনো সমস্যা নেই তো আপনার? ”

___” না.. কোনো সমস্যা নেই। “বললেন আসিফ খান।
__” সত্যি? ”
___ “হ্যাঁ.. সত্যি। ”
রোহান সোজা আরমানে কাছে এসে ওর কাঁধে চোখ মুখ এক ডলা দিয়ে মুছে ফেলে।নিজের শার্ট ঠিক করতে করতে বলে
__” বা*ল! ঠিক করা বিয়ে আবার বিয়ে ঠিক করতে, কতো নাটক করতে হলো আমায়!”
আরমান হাসতে হাসতে রোহানের কাঁধে চাপর দিয়ে বাহবা দেওয়ার মতো করে বলে
__”তুই ভালো অভিনয় করতে পারিস কিন্তু। ”
__” ওই সবার দোয়ায় আর কী… পারি একটু একটু। শশুড় আব্বা কেমন লাগলো আমার অভিনয়? ”
রোহান হাসতে হাসতে কথাটা বলে উঠতেই ঘর ভরে গেলো স্তব্ধ নীরবতায়। কথাটা এমনভাবে বললো, যেনো সে একটা যুদ্ধ জিতে গেছে। সবাই একে অপরের মুখের দিকে তাকালো, যেনো কারো মুখে ভাষা খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।তার মানে এতোক্ষণ যা ছিলো তা সব অভিনয়।

প্রথমে চমকে উঠলেন আসিফ খান। তিনি এই কথাটার মধ্যে যেনো লুকানো একধরনের বিদ্রুপ খুঁজে পেলেন। মুখের ভাঁজগুলো আরও শক্ত হয়ে উঠলো, আর চোখ দুটো লাল হয়ে গেলো রাগে।কী বেয়াদব ছেলে তার সাথে ছলনা করে? এত সহজে কি আর তিনি মেয়ে দিয়ে দেবেন? না কখনোই না?
অন্যদিকে, আরমান তো যেনো খুশিতে গদগদ হয়ে গেলো। সে তো রোহানের প্রাণের বন্ধু, এত সাহস করে কথাটা বলায় সবার সামনে বাহবা দিয়ে উঠলো,

— “এই তো আমার বা*লের বন্ধুর সাহস হলো ! বাজিমাত করে দিয়েছিস!”
ঘরে থাকা অন্যরাও নিজেদের প্রতিক্রিয়া সামলাতে পারছিলো না। আরিফ খান হেসে ফেললেন হঠাৎ, যেনো এই মুহূর্তটা তাকে অন্যরকম আনন্দ দিয়ে গেলো। মেয়ের জামাই শশুর কে কেমন নাকে দড়ি দিয়ে ঘুরালো?
ফারিয়া বেগমও মুখ টিপে হাসলেন। যদিও তিনি চাইলেন হাসি চাপতে, কিন্তু পারেননি। তাদের পরিবারের ইতিহাসে এরকম সাহসী উক্তি যে কেউ করছে, তা ভাবতেই তিনি চমকে গিয়েছিলেন।
তখনই জেসমিন বেগম হালকা ব্যঙ্গ মিশ্রিত কণ্ঠে বলে উঠলেন—
— “যেমন শ্বশুর, তেমন মেয়ের জামাই!”
এই কথাটা ছিলো আসল ঝড়। মুহূর্তের মধ্যেই আসিফ খানের মুখ অগ্নিরঙে জ্বলে উঠলো। তিনি যেনো এক নিমিষে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন।
— “আমি মেয়ে দিবো না!এই বেয়াদব ছেলের কাছে তো কিছুতেই দিব না। কোনোভাবেই দিবো না!”
তার কণ্ঠস্বর ঘর কাঁপিয়ে দিলো। যেনো এই ঘরের দেয়ালগুলোও সেই রাগ বুঝে কেঁপে উঠলো।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, রোহানের বিন্দুমাত্র ভ্রূক্ষেপ হলো না। সে শান্তভাবে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে রইলো। ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি খেলে গেলো। যেনো তার কাছে এই অস্বীকৃতি কোনো নতুন ব্যাপারই না। বরং এমন প্রতিক্রিয়া সে আগেই কল্পনা করে রেখেছিলো।

__”হ্যাঁ বলে দিয়েছেন শশুড় আব্বা! তখন দুনিয়া উল্টে গেলোও জিনিয়ার আমার সাথেই বিয়ে হবে!”
__” তুমি আমার মেয়ের আশেপাশে ও ঘেঁষবে না। খুন করে ফেলবো তোমাকে। ”
__” ঘেঁষবো মানে?ইসলাম পুড় গ্রামে গিয়ে আগে বিয়ে করব। তারপর আপনার নাতি-নাতনি নিয়ে ফিরবো ইনশাআল্লাহ ! “বলেই রোহান চোখ টিপ দিয়ে আসিফ খান কে।
__” বেয়াদব ছেলে কোথাকার! ”
__” আমি যানতাম আপনি প্রথম বিয়ের জন্য না করে দিবেন। তাই তো এ-তো নাটক করলাম আমি কষ্ট করে। ”
আসিফ খান ছাড়া সবাই হু হা করে হেসেই ফেলেন। সবাই যখন উত্তেজনায় কথা বলতে গিয়েও থমকে যাচ্ছে, তখনই হঠাৎ জেসমিন বেগম আবার কথা বললেন। এবার তার গলায় এক ধরনের অদ্ভুত দৃঢ়তা।
— “রোহান, তোমার সাথে আমার কিছু কথা আছে।”
সবাই চমকে তাকালো তার দিকে। কথাগুলো বলার ভঙ্গিটাই এমন ছিলো, যেনো তিনি অনেক আগেই প্রস্তুত ছিলেন।
রোহান প্রথমে বুঝতে পারছিলো তিনি কী বলবেন। কিন্তু নিজের স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে বললো,

রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৪৭

— “আমি যানি আন্টি, আপনি কী বলতে চায়।”
আসিফ খান রাগে ফুঁসছিলেন, কিন্তু এই সম্বোধনে যেনো খানিকটা হতবাক হয়ে গেলেন।
তারপর জেসমিন বেগম ধীরপায়ে ড্রইং রুম থেকে ঘরের ভেতরে চলে যেতে থাকেন। রোহানও দ্বিধা না করে তার পেছন পেছন চলে গেলো।

রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৪৮

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here