রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৫৩
সোহানা ইসলাম
রাস্তাটা আজ ভারী লাগছিল। প্রতিটি পা যেন টেনে নিতে হচ্ছে। কলেজে পৌঁছে দেখল জারা আর ফিহা ক্যাম্পাসের গাছতলায় বসে আছে। সে প্রায় দেড় ঘন্টা লেট করে এসেছে। বৃহস্পতিবার এই সময় ক্লাস থাকে না। মিমকে দেখে দু’জনেই চমকে উঠল।তারা ভাবে নি মিম আজ কলেজে আসবে?
___“তোর মুখটা এমন হয়ে আছে কেন রে?”
জারা ধীরে জিজ্ঞেস করল।
মিম একটাও কথা বলল না, কেবল হাসির চেষ্টা করল।ফিহা বলল
__ “চোখ এত লাল কেন? রাশেদ ভাইয়া কী বলেছে? ”
___“সব যেনে গেছে।…” সংক্ষিপ্ত উত্তর দিল মিম, তারপর ক্লাসের দিকে হাঁটা দিল।
জারা আর ফিহা একে অপরের দিকে তাকাল। দু’জনেরই মনে প্রশ্ন, কিন্তু মিমের মুখের দুঃখ এমন ছিল, কেউ আর জোর করে কিছু জিজ্ঞেস করতে পারল না। মন হালকা হলে সে নিজে থেকেই বলবে।
ক্লাস চলছিল, কিন্তু মিমের মন কোথাও নেই। বোর্ডে শিক্ষক যা লিখছেন, তার চোখের সামনে সব ঝাপসা হয়ে যাচ্ছিল। হঠাৎ মনে পড়ে গেল রাশেদের মুখ— সেই মুহূর্ত, যখন রাশেদ কেঁদে বলেছিল, “মিম, আমি ভুল করেছি।” সেই চোখ, সেই কণ্ঠস্বর—সব মনে হচ্ছিল সত্যিই অনুতপ্ত, কিন্তু তবুও… অনেক দেরি হয়ে গেছে।
অন্যদিকে, রাশেদ তখন নিজের ঘরে একা। রাতের পর থেকে কিছু খায়নি। চোখ লাল, চেহারায় এক অজানা ক্লান্তি। চারপাশে ছড়িয়ে আছে মিমের স্মৃতি,ওর কান্না, কষ্ট । মোবাইলটা বেডের উপর ছুঁড়ে ফেলল সে।
__“কেন বললে না আগে… তুমি যে আমার মিম, কেন বললে না?”
নিজেকেই প্রশ্ন করছে রাশেদ। কণ্ঠে কান্না মিশে যাচ্ছে।তারপর উঠে গিয়ে আয়নায় নিজের দিকে তাকায়।
__ “তুই মানুষ না, পশু! একটা মেয়েকে ভালোবাসলি, আবার তাকে অপমান করলি?নষ্ট বলেছিলি তুই!”
হঠাৎ রাগে টেবিলের উপর থাকা গ্লাস ছুঁড়ে ফেলে দেয়। কাচের টুকরো মাটিতে ছড়িয়ে যায়। নিজের হাতটা সেগুলোর উপর রাখে—রক্ত গড়িয়ে পড়ে, কিন্তু সে থামে না। একরকম উন্মাদের মতো নিজের মাথায় আঘাত করতে থাকে, দেয়ালে ঘুষি মারে।
ঠিক তখন দরজা খুলে ভেতরে ঢোকে জাহেদ।
___“রাশেদ ভাই! এসব তুমি কী করছেন?”
রাশেদ ঘুরে তাকায় না।
__“সব শেষ… আমি ওকে হারিয়ে ফেলছি জাহেদ স্যার… আমি ওকে হারিয়ে ফেলেছি…”
রক্ত ঝরছে হাত থেকে, কিন্তু তার পরোয়া নেই। হঠাৎ মাটি থেকে একটা কাঁচের টুকরো তুলে নেয়।
___“আমি পারব না এই কষ্ট সহ্য করতে…”
জাহেদ দৌড়ে গিয়ে কাঁচটা কেড়ে নেয়।
___“পাগল হয়ে গেছো নাকি ভাইয়া? মরতে চাও কেন?”
রাশেদ চিৎকার করে কাঁদতে শুরু করে
__ “আমি ওর চোখে খারাপ মানুষ হয়ে গেছি, জাহেদ স্যার! আমি তাকে ভরসা করতে পারিনি! ওকে অপনাম করেছি। চরিএ নিয়ে বাজে কথা বলেছি!”
জাহেদ কিছু বলার আগেই বাইরে থেকে শব্দ আসে। দরজা খুলে ভেতরে ঢোকে রোহান আর জিনিয়া। রোহান মাএই জারাদের বাড়ি থেকে ফিরেছে জিনিয়া’কে নিয়ে। জিনিয়া হাসছিল পথে আসার সময়, কিন্তু ঘরে ঢুকেই তার মুখ থেকে সেই হাসি উধাও।
ঘরের অবস্থা দেখে জিনিয়া স্থির দাঁড়িয়ে থাকে। রক্ত, কাচ, ছেঁড়া ছবি—একটা ঘর নয়, যেন ভাঙা জীবনের প্রতিচ্ছবি।জিনিয়া জাহেদ কে জিজ্ঞেস করে
__“এই কী হইছে ভাইয়া ?”
রোহান দৌড়ে এগিয়ে যায়। রাশেদ মাটিতে বসে পড়েছে তখন, দুই হাত মুখে দিয়ে কাঁদছে।
__” পাগল হয়ে গেছিস তুই রাশেদ? নিজেকে আঘাত করছিস কেন?”বলল রোহান
__“রোহান স্যার… আমি ওকে কষ্ট দিছি… ওকে আমি অপমান করেছিলাম…”
___” কাকে কষ্ট দিয়েছিস?আর কাকে অপমান করেছিস? ”
রাশেদ কান্না করতে করতে বলে
__” মি…মিম! আমার মিউ! ”
চমকে উঠে সবাই। রাশেদ কোন মিমের কথা বলছে? জাহেদ বলে
__” কোন মিমের কথা বলছো তুমি? ভাবির বান্ধবী মিম?”
রাশেদ মাথা উপর নিচে করে বোঝায়। এই মিমের কথাই বলছে সে।
রোহান তাকে জড়িয়ে ধরে
__“ঠিক আছে ভাই, শান্ত হ। যা গেছে তা ফিরবে না, কিন্তু মরতে হবে এজন্য?”
রাশেদ ফুঁপিয়ে কাঁদছে
__“আমি তার চোখে নিজের হার মানা দেখেছি… আমি ওকে হারিয়ে ফেলেছি চিরদিনের জন্য…”
জিনিয়া কাঁপা কণ্ঠে বলে উঠল
__ “রোহান ভাই, ওনাকে ডাক্তারের কাছে নিতে হবে। ক্ষত গভীর। হাতটা রক্তে ভরা।”
রোহান তখন তোয়ালে দিয়ে রক্ত মোছে, চোখে রাগ, কষ্ট, মায়া—সব একসাথে মিশে গেছে।
___“ভালোবাসা মানে নিজেকে শেষ করা না ভাই… যদি ভালোবাসিস, তাহলে প্রমাণ দে, বেঁচে থেকে।”
রাশেদ কোনো উত্তর দেয় না। শুধু বারবার বলে, __“আমি পারব না…”
রোহান তার কাঁধে হাত রাখে।
___“একটা মানুষ ভুল করলে তার শাস্তি মরতে না, রাশেদ । বরং বাঁচা—এইটাই সবচেয়ে বড় শাস্তি। নিজের ভুল নিয়ে বাঁচবি,তবেই বুঝবি কেমন লাগে।”
__” ও আমাকে আর ভালোবাসে না। ক্ষমা করবে না আর আমায়। একটা সুযোগ দিবে না সে? ”
রােহান, জিনিয়া আর জাহেদ ওকে বোঝায়। তারা মিমের সাথে কথা বলবে। ওকে বোঝাবে। ওর সাথে সব ঠিক করে নিতে।
মিনিট দশের মধ্যে সব শান্ত হয়ে আসে। জিনিয়া এক গ্লাস পানি এগিয়ে দেয়। রাশেদ ধীরে তা নেয়, চুপচাপ পান করে।
জাহেদ বলে
__ “চলো রোহান ভাই, রাশেদ ভাইয়া কে হাসপাতালে যাই। হাতটা খারাপ অবস্থায় আছে।”
রাশেদ কোনো কথা বলে না, শুধু মাথা নাড়ে। সে যাবে না।হাত থেকে গলগল করে রক্ত বের হচ্ছে? তার চোখ ও কেমন নিবে আসচ্ছে। রোহান ওকে ধরে বাইরে নিয়ে যায়। জিনিয়া তখনো ভয়ে স্থির, চোখের জল থামাতে পারছে না।
বাইরে হালকা বাতাস বইছে, আকাশে মেঘ জমেছে। গাড়ির জানালা দিয়ে তাকিয়ে থাকে রাশেদ। মনে হয় পৃথিবীর সব রং হারিয়ে গেছে।
ওদিকে কলেজ থেকে ফেরার সময় মিম মাঠের একবার তাকাল। আকাশটা মেঘলা, কিন্তু বাতাসে এক ধরনের অজানা হাহাকার। বুকের ভেতর কেমন একটা অস্থিরতা কাজ করছিল। মনে হচ্ছিল কেউ যেন কষ্টে আছে, ঠিক তার কাছেই কোথাও।
ফিহা জিজ্ঞেস করল
__ “তুই ঠিক আছিস তো?”
মিম মৃদু হেসে বলল
___ “হ্যাঁ, …”
কিন্তু তার চোখের ভেতর বলছিল অন্য কথা।
জারা’র মন শুধু আরমানের কথা চিন্তা করছে। একবার ভেবেছিলো আরমানের সাথে দেখা করতে যাবে। কিন্তু আবার ভাবে যদি দেখা না হয়। যাওয়া টাই বৃথা। এর থেকে ভালো বাড়ি গিয়ে কল করবে।
রাশেদ হাসপাতালের বেডে। হাত ব্যান্ডেজে মোড়া। পাশে বসে আছে রোহান। জানালার বাইরে ঝিরঝিরে বৃষ্টি পড়ছে। রোহান শান্ত স্বরে বলে
___“ কবে থেকে ওর সাথে পরিচয় তোর?।”
___” ফেসবুকে পরিচয় হয়েছিলো ওর সাথে। কখনো দেখিনি মিম কে। খারাপ উদ্দেশ্য ছিলো না। বিয়ে করে হালাল ভাবে দেখার ইচ্ছে ছিলো আমার। তিনমাসের সম্পর্ক ছিলো….একে একে সব ঘটনা খুলে বলে রোহানকে রাশেদ। রাশেদের কথার মাঝে সেখানে জিনিয়া আর জাহেদ আসে। হাতে তাদের খাবার আর ঔষধ। রাশেদের প্রায় সব কথায় তারা শুনে।
সবাই শুনে চুপ থাকে। কার দোষ দিবে। কিন্তু এটা সত্যি, রাশেদ মিমের কাছে হেড়ে গেছে। একটা মেয়ে তাকে কতোটা লয়াল ভাবে ভালোবাসতে পারে। সম্পর্ক শেষ হওয়ার পরও প্রিয় মানুষের ছবি ওয়ালপেপার, ছবি দিয়ে গ্যালারি বরে রাখা। বিচ্ছেদের পর অন্য কোনো পুরুষের সাথে দ্বিতীয় বার সম্পর্কে না জরানো। মোবাইলের পাসওয়ার্ড ও প্রিয় মানুষের নাম দেওয়া। কিন্তু এতো সুন্দর ভালোবাসা শুধু একটা মজার কারণে শেষ হয়ে গেলো।
সবাই দীর্ঘশ্বাস ফেলে। রাশেদ চোখ বন্ধ করে। মনে পড়ে মিমের সেই শেষ কথা—“ক্ষমা দিতে পারি, কিন্তু ভালোবাসতে পারব না।”
এই কথাটাই এখন রাশেদের বুকের ভেতর প্রতিধ্বনির মতো বাজছে।সে বুঝে গেছে, ভালোবাসা হারিয়ে গেলে মানুষ বেঁচে থাকে ঠিকই, কিন্তু এক টুকরো ভেতরটা চিরদিনের মতো মরে যায়।
সন্ধ্যা নামছে ধীরে ধীরে। হালকা বাতাস বইছে চারপাশে। কিন্তু জাহেদের মনে যেন ঝড় উঠেছে। হাসপাতালে রাশেদের সেই অবস্থাটা চোখে লেগে আছে। হাত কেটে রক্ত ঝরছে, মুখ ফ্যাকাসে। আরমান কে মাএ সব জানানো হয়েছে। কোনো প্রতি উওর না করে কলটা কেটে দিয়েছে।
সে কেবিনে ঢুকে মোবাইলটা হাতে নেয়। কাকে আগে জানাবে বুঝতে পারে না। শেষে ফিহাকে ফোন দেয়।
__“কটকটি, একটা কথা বলবো… ভয় পেয় না।”
ফিহা কৌতূহল নিয়ে বলে
__ “কি হইছে?”
জাহেদ এক নিশ্বাসে সব বলে ফেলে—রাশেদ নিজেরে আঘাত করেছে, হাসপাতালে ভর্তি, আরমান আসচ্ছে।, অবস্থা এখন কিছুটা ভালো।
ফিহার হাত ঠান্ডা হয়ে যায়। বুকের ভেতরটা ধক করে ওঠে।
___“আল্লাহ! ক্যান এমন করলো সে?”
জাহেদ শুধু বলে
__“মনে হয় মিমের কারণে… ও খুব ভেঙে পড়ছে। তুমি একবার তোমার বান্ধবীর সাথে কথা বলে দেখবে?”
ফিহা চুপ করে যায়। মাথায় শুধু ঘুরছে একটা প্রশ্ন—এখন মিমকে জানাবে কি জানাবে না?
রাত বাড়ে। ফিহা বসে থাকে বিছানায়। পাশে মোবাইল। মিমকে কল করেও করছে না। এমনিতেই মেয়েটার মনের অবস্থা ভালো না, আবার এসব শুনলে কি হয়ে যায় আল্লাহ যানে। একসময় জারাকে কল দেয়।জারা কল রিসিভ করতেই হালকা গলায় বলে,
__“জানু, একটা কথা বলি?”
___“বল।”
__“রাশেদ ভাই… উনি নাকি নিজেকে আঘাত করেছে। সুইসাইড করতে গেছে ।”
জারা চমকে ওঠে
___“কি বলছিস তুই! কখন হলো সব? আর তুই জানলি কি করে? মিম জানে এসব?”
__“ এতো প্রশ্ন একসাথে করলে কীভবে বলবো বল?”
__” আচ্ছা বল তুই। ”
__”আজ বিকেলে। জাহেদ বললো। এখন হাসপাতালে।”
জারার চোখ ভিজে ওঠে।
__ “আরে আল্লাহ! মানুষটা এমন কেন করলো?”
ফিহা মাথা নিচু করে বলে
__ “কারণটা মনে হয় মিম। মিম নাকি বলেছে, সে আর রাশেদ ভাইয়াকে ভালোবাসে না ।”
জারা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। দুজনেই জানে এখন সবচেয়ে কঠিন কাজটা হচ্ছে মিমকে জানানো।
__“ মিমকে বলবো?” ফিহা প্রশ্ন করে।
___“জানি না। কিন্তু না বললে যদি পরে জেনে যায়, তাও কষ্ট পাবে।”
দু’জনের মধ্যে দ্বিধা দোলা দেয়। অবশেষে ফিহা বলে
___“আমি বলি ওকে… আল্লাহ ভরসা।”
রাত সাড়ে সাতটা। মিম ঘরে একা বসে ছিল, বই সামনে খোলা, কিন্তু চোখ একবারও পৃষ্ঠায় পড়ছে না। হঠাৎ মোবাইল বেজে ওঠে। ফিহার নাম দেখে রিসিভ করে।
___“হ্যালো, ?”
___“জানু, মন খারাপ করিস না… একটা কথা আছে।”
মিমের বুক ধক করে ওঠে
___“কি হইছে?”
ফিহা দ্বিধা করে, তারপর সব বলে ফেলে—
___”রাশেদ ভাই হাসপাতালে, সুইসাইডের চেষ্টা করেছে।”
মিম একদম স্তব্ধ হয়ে যায়। গলা শুকিয়ে আসে। ___“কি বললি তুই? মজা করছিস আমার সাথে তাই না? ”
__” মজা করছি না জানু? ”
__” বিশ্বাস করি না আমি! তুই মিথ্যা বলছিস! ”
__“আমি সত্যি বলছি মিম… ওনি হাত কেটেছে।এখন হাসপাতালে ভর্তি ।”
মিমের চোখে জল এসে যায়। ফোনটা ধরে কাঁপা গলায় বলে,
___“আমার রাজ বাবু… আমার জন্য এমন করলো?”তারপর আর নিজেরে ধরে রাখতে পারে না। বুক ভেঙে কান্না বের হয়ে আসে
___“ওরে আল্লাহ! আমি এমনটা চাইলাম না… আমি তো কেবল দূরে যেতে চেয়েছিলাম।”
ফিহা ফোনের ও পাশে নিস্তব্ধ হয়ে যায়। শুধু মিমের হাউমাউ কান্নার শব্দ শোনা যায়।
মিম মুখ চেপে কাঁদে। চোখের জল পড়ছে বুকের ওপর। তার মনে এখন শুধু একটাই কথা ঘুরছে—
__“যদি আমি ওনি ক্ষমা চাওয়ার পর এসব না বলতাম, হয়তো রাজ বাবু এমন করত না।”
এদিকে জারা বারবার আরমানকে কল করছে।
প্রথমবার রিং বাজে, কেউ ধরে না। দ্বিতীয়বারও না।তৃতীয়বারে জারা বার্তা পাঠায়
—“শুনোন রাশেদ ভাইয়ের কিছু হয়েছে নাকি? আপনি কি ওনার সঙ্গে?”
অনেকক্ষণ পরও কোনো রিপ্লাই আসে না।
জারার বুকের ভেতর ধুকপুক শব্দ বাড়তে থাকে।
সে নিজেকে বোঝায়,–“হয়তো এখন হাসপাতালে ব্যস্ত আছে… তাই কল তুলছে না।”
বাইরে আকাশ কালো হয়ে এসেছে। দূরে বজ্রপাতের আলো এক মুহূর্তের জন্য ঘরটা আলোকিত করে আবার অন্ধকারে ঢেকে দেয়।
জারা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ভাবে—
সবাই এখন ভেঙে পড়েছে। একটার পর একটা সম্পর্ক যেন কষ্টে ডুবে যাচ্ছে।
জারা ফোনটা হাতে নিয়ে অপেক্ষা করছে। আরমান কখন তার মেসেজের রিপ্লাই দিবে।
আর এদিকে মিম, নিজের বালিশে মুখ লুকিয়ে, ফিসফিস করে বলছে—“রাজ বাবু,আপনি এমন কেন করলেন…”
রাতটা শেষ হয় না কারও জন্যই। মাএ নয়টা বাজে। রাশেদ হাসপাতালে, স্যালাইন চলছে হাতে।রােহান, জাহেদ আর জিনিয়া তার পাশে বসে চুপচাপ তাকিয়ে আছে জানালার দিকে। বাইরে বৃষ্টি পরছে।
বৃষ্টি থেমে গেছে কিছুক্ষণ আগে। হাসপাতালের করিডরে এক ধরনের ভারী নীরবতা। দেয়ালের ঘড়িটা কেবল টিকটিক শব্দ করছে। রাশেদ বেডে বসে আছে, ডান হাতটা ব্যান্ডেজে মোড়া। চোখ দুটো ফ্যাকাসে—ভেতরে রক্তক্ষরণ নয়, যেন হৃদয়ের ক্ষতই তার মুখে ফুটে উঠেছে।
ঠিক তখনই দরজাটা হঠাৎ জোরে খুলে যায়।
ভেতরে ঢোকে আরমান। চোখ লাল, মুখ গম্ভীর, শরীর কাঁপছে রাগে আর ভয়েও। আরমানকে দেখেই বোঝাচ্ছে অনেক রেগে আছে। শরীর ক্লান্ত। রোহান ভয়ে ভয়ে বলে
___“এই বৃষ্টিতে আসতে গেলি কেন আরমান ?”
কোনো উত্তর না দিয়েই হেটে গিয়ে দাঁড়ায় রাশেদ সামনে, কিন্তু এক মুহূর্তে ঠাসসসস! আরমানের এক চড় পড়ে তার গালে। তারপর বিরতি না দিয়েই আরেকটা। ঘরটা থম মেরে যায়।
রোহান উঠে আসে মাঝখানে
___“ভাই, থাম! পাগল হয়ে গেছিস?!”
কিন্তু আরমানের কণ্ঠটা তখন কাঁপছে ক্রোধে।
__“তুই সর আমার সামনে থেকে।মরতে চেয়েছিলো এই হারামজাদা, তাই না ? আজ আমি নিজে ওকে শেষ করে দিবো? মাথা ও নেই মাথার বিষও নেই ?”
রাশেদ স্থির চোখে তাকিয়ে থাকে। কোনো প্রতিবাদ নেই, কোনো কান্নাও না। শুধু নিচু গলায় বলে
__“ ভাইয়া…?”
আরমান থেমে যায় এক মুহূর্ত। মুখের রাগটা যেন একটু কেঁপে ওঠে।রাশেদ আবার বলে
__“আপনি ভয় পেয়েছেন—আমি মরে যাবো এই ভেবে, তাই রাগ হইছে আমার উপর । জানি।”
আরমান ঘুরে জানালার দিকে তাকায়। বাইরে রাতের আকাশ কালো হয়ে আছে, মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ চমকায়। ধীরে কন্ঠে বলে
___” জিনিয়া কেবিনের এক কোণে গিয়ে দাঁড়া! ”
আরমানের কথা সবাই শুকনো ঢোক গিলে। হঠাৎ মিমকে এক কোণে দাড়াতে বলো কেন। জিনিয়াও বড় ভাইয়ার কথা মতো উঠে গিয়ে কএ পাশে দাঁড়ায়।
আরমান কেবিনের চারপাশে চোখ বুলায়।চোখে পরে ফাইনালের মতো কিছু। ওই টা পেচিয়ে নিয়ে জাহেদ আর রোহানের দিকে এগিয়ে এসে, দাম দুম! ঠাসস! ইচ্ছে মতো দিতে থাকে। আর বলে
___” দুই গাধা মিলে এক গাধাকে বাঁচিয়েছে। কেন বাঁচালি বল? মেরে যেতে দিতি? এতো টেনশন আর ভালো লাগে না। নাটক নিয়ে বসে থাকিস দুই দিন পর পর? ‘
জাহেদ আর রোহান মার খেয়ে লাফালাফি করছে। কেবিনের ভিতরে এদিক সেদিক ছুটছে তারা। আর আরমান তাদের ফাইল দিয়ে পেটাচ্ছে।
রোহান পিঠে হাত দিয়ে ডলতে ডলতে বলে
__’ আরে বা*ল আমাদের মারছিস কেনো? আমরা কী করেছি? ”
___” উপকার করলেও মার খেতে হয়। আজব? ”
বলল জাহেদ।
___” এখানে আর এক মূহুর্তও কেউ থাকবি না। কাল সকাল হলে ময়মনসিংহে বেক করবি সবাই। তোদের এখানে দরকার নেই আমার। তোদের সামলাতে আসিনি আমি? কোম্পানির কাজে এসেছি! ”
আরমান আঙুল তাক করে সবাই কে এক এক করে বলে।
রাশেদ নিঃশব্দে শুনছে। তার চোখে কোনো জল নেই, কিন্তু ভেতরের ব্যথা স্পষ্ট।
আরমান আবার ঘুরে বলে,
__“ভালোবাসা ব্যর্থ হলে মানুষ কষ্ট পায়, ঠিক আছে। কিন্তু এইটা ছাড়াও বাঁচার উপায় আছে। তুই কি ভাবলি, মরে গেলে মিম ফিরে আসবে? নাকি তোর কষ্ট শেষ হয়ে যাবে? মহা প্রেমিক উপাদি নিতে মরতে গিয়ে ছিলো, গাধা কোথাকার?”
আবার ঘুরে রোহান আর জাহেদ কে মা’রে আরমান। আর বলে
__ ” এই গাধার, জন্য আমি নোবেল পুরষ্কার তৈরি করতে দিব। মহা প্রেমিক, হিসেবে তো একটা নোবেল পেতেই পারে। ”
কেবিনের কোণে দাঁড়িয়ে সব দেখছে জিনিয়া। নিজের মধ্যে আর হাসি আটকে রাখতে পারলো না। হু হা করে হেসেই ফেলে। রােহান আর জাহেদ জিনিয়ার দিকে অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।
রাশেদ চুপ। কেবল ধীরে বলে,
__“আমি জানি কিছুই ফেরানো যাবে না,ভাইয়া। কিন্তু আমি যে তাকে কষ্ট দিছি—এইটা সহ্য হয় না।”
আরমান রাশেদের কাছে এসে কাঁধে হাত রাখে।
___“সবাই ভুল করে। কিন্তু মানুষ তার ভুল ঠিক করার সুযোগ পায় তখনই, যখন সে বাঁচে। মরে গেলে কিচ্ছু থাকে না—না ভালোবাসা, না মুক্তি।”
রোহান আর জাহেদ গাল ফুলিয়ে বলে
___” আমাদের মেরে এখন ওর সাথে কি সুন্দর করে কথা বলছে? ”
__” আমি এসেই ওকে দুইটা চড় মেরেছি? গালে দাগ বসে আছে! তোরা কী চাস? ওর মতো দাগ বসিয়ে, সুন্দর করে কথা বলি?’
রোহান কেবলা হাসি দিয়ে বলে
__” যাহ্! আমরা তো মজা করছিলাম! ”
__” তুমি কথা বলো ওর সাথে। আমাদের কোনো সমস্যা নেই! ” বলল জাহেদ।
__” এই গাধাকে কখন ডিসচার্জ করা হবে? ” বলল আরমান।
রোহান পাশ থেকে শান্ত স্বরে বলে
___ “ডাক্তার বলেছেন হাতের গভীর কাঁচ গেছে। ক্ষত গভীর। আজ রাতটায় ভর্তি থাকতে হবে।”
আরমান মাথা নাড়ে, তারপর ধীরে রাশেদের দিকে তাকায়। তার চোখে রাগের জায়গায় এখন ভয় আর মায়া মিশে গেছে।
___“আমি চড় মারছি রাগে না, ভয় পেয়ে। ভাবছিলাম হয়তো তুই… আর নাই। তখন বুকটা ফেটে গেছিলো।”
রাশেদ দুর্বল হাসে
__“আমি এখনও বেঁচে আছি, আরমান ভাইয়া। কিন্তু মনে হয় ভিতরটা মরে গেছে।”
আরমান নিঃশ্বাস ফেলে বলে,
___“তোর ভেতরের সেই মরা অংশটাই এখন তুই নতুন করে জাগাবি। যদি সত্যি ভালোবেসে থাকিস, তবে এখন থেকে নিজেরে বদলাইস। মিম না ফিরলেও তুই ওকে ফিরতে বাদ্য করবি,নিজের ভালোবাসা নিয়ে বার বার ওর সামনে যাবি। এটাই তোর শাস্তি ।”
রাশেদ মাথা নিচু করে। চোখের কোণ ভিজে ওঠে, কিন্তু এবার সেটা আত্মদয়া নয়—একটা নতুন শুরু করার ব্যথা।
ঘরের বাতাসটা ধীরে নরম হয়ে আসে।
জিনিয়া দরজার কাছে দাঁড়িয়ে, নিঃশব্দে কান্না মুছছে। রোহান চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে পাশে।
দরজা বন্ধ হয়ে গেলে ঘরের আলোটা মৃদু কাঁপে। রাশেদ নিঃশব্দে জানালার বাইরে তাকায়।
বৃষ্টির পর আকাশে একটা ম্লান তারা দেখা যাচ্ছে। মনে হয় যেন অন্ধকার ভেদ করে ছোট একটা আলো জ্বলছে।
সকালের আলোটা যেন আজ একটু আলাদা। নরম, কিন্তু ভারী। রাশেদ হাসপাতাল থেকে ফিরছে। গাড়ির জানালায় ঠেস দিয়ে বসে আছে, মুখে কোনো কথা নেই। পাশে আরমান, চুপচাপ। সামনে জাহেদ, ফোন কানে নিয়ে ফিহাকে জানাচ্ছে, “ওরা রওনা দিছে… আর একটু পর পৌঁছাবে।”
ফিহা ফোন কেটে বসে থাকে কিছু ক্ষন। সকাল হতেই ফিহা মিমের বাসায় যায়। মিম দরজা খুলে দাঁড়ায় নিঃশব্দে। চোখ ফুলে গেছে, ঠোঁট শুকনো, মুখে একরাশ নিস্তব্ধতা।
__“চল, একটু বের হই,”। ফিহা বলে।
___“যাবো না। ভালো লাগছে না কিছু।” মিমের গলা কর্কশ।
__“জারা’দের বাড়ি যাবো।”
মিম কিছু বলে না। কিন্তু কিছুক্ষণ পর ফিহার কণ্ঠের কোমল দৃঢ়তায় রাজি হয়ে যায়। ওর মা চায়নি মিম বাইরে যাক — “গ্রামের মেয়ে মানুষ, এত হইচই ভালো লাগে না”— কিন্তু ফিহা অনেক বুঝিয়ে শেষমেশ মিমকে নিয়ে বের হয়।
জারা দরজায় দাঁড়িয়ে ওদের আগেই অপেক্ষা করছিল। মিমকে দেখে ছুটে আসে, বলে
___ “এই কী অবস্থা তোর?ঘুমাস নি মনে হয় ?”
__” কিছু খেয়েছে বলেও মনে হয় না। বললো ফিহা।
জারা মিমের হাত ধরে টানতে টানতে বলে
___” চল কিছু খেয়ে নিবি আগে।”
মিম হালকা মাথা নাড়ে।খাবে না । জারা ওকে টেনে বসায়, জোর করে মুখে এক চামচ খাবার তুলে দেয়। মিম কিছু বলতে যায়, কিন্তু গলা আটকে আসে।
খাওয়া শেষ হতেই তারা তিনজন বের হয় — জারা, ফিহা, মিম। জোহান বায়না ধরে
__ “আমিও যাব!”
ফিহা হাসে
___“তুই আবার যাবি কেন?”
___“আমি কিউটি গার্লকে দেখতে চাই।”
ফিহা মারজিয়া বেগমকে বলেছে ওরা জিনিয়াকে দেখতে যাবে। ওকথাই জোহান শুনে ফেলে। মারজিয়া বেগম শুনে বলেন
___“যেতে দে ওকে, জিনিয়াকে দেখবে বলছে। না নিয়ে গেলে মাথা নষ্ট করে রেখে দিবে আমার। ”
চারজন মিলে বের হয় তারা। রোদটা কেমন যেন মেঘলা, হালকা বাতাস বইছে। রাস্তার ধারে শিউলি ফুল ঝরে আছে। মিনিট দশ একের মধ্যে তারা পৌঁছে যায় বড় মাঠের বাড়িটায়।
প্রথমেই জারা’র চোখ পড়ে আরমানের রুমের দিকে। দরজা বন্ধ। বুকের ভেতরটা কেমন করে ওঠে ওর। নীরবে চোখ সরিয়ে নেয়।
ওরা জিনিয়ার রুমে যায়। দেখে, জিনিয়া ব্যাগ গুছাচ্ছে। চোখে অদ্ভুত এক কষ্টের ছায়া।
___“কোথায় যাচ্ছো জিনিয়া আপু ?” জারা জিজ্ঞেস করে।
___“ভাইয়া বলেছে ময়মনসিংহে ফিরে যেতে।”
ফিহা আবার বলে __” তোমরা সবাই চলে যাবে? ”
__” যানি না! কিন্তু ভাইয়া বলেছে সবাই কে চলে যেতে। ”
এটা শুনে জোহান বেচারার মুখটা কালো হলে যায়।
__” তোমাকে নিশ্চয় ওই হিংসুটে ভাইয়া চলে যেতে বলেছে। আমি তোমার সাথে ভাব জমাচ্ছি বলে, তোমাকে মমিসিং পাঠিয়ে দিবে, কিউটি গার্ল?”
__” মন খারাপ করে না ভাই। আমি আসব তো আবার। আমি পড়াশোনার ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে বলেই চলে যাচ্ছি। ”
__” আমি জানি,তুমি আসবে না আর?আমার সাথে খেলবে না? তুমি থেকে যাও, তোমায় আমের আচার খাওয়াব আমি। ”
জিনিয়ার বুকটা হুহু করে উঠে। কি নিস্পাপ আবদার। ‘তুমি থেকে যাও, আমি তোমায় আমের আচার খাওয়াব! ”
__” আমি আবার এসে আমের আচার খাবো তো। তোমার সাথে অনেক খেলা করব, তোমার কিউটি গার্ল প্রমিজ করছি। ”
জোহান মন খারাপ করে ওর বোনুর কাছে চলে যায়। কথ বলতে ইচ্ছে করছে না ওর।
ফিহা মনে করে এখনই জিনিয়া চলে যাবে। তাই বলে
___“এখন চলে যাবে ?” ফিহা অবাক হয়।
জিনিয়া জোর করে হাসে
___ “ না বিকেলে যাব। মন খারাপ করো না, ভাইয়া বলেছে যেতে,তাই কিছু করার নেই।”
কিন্তু ওর চোখে জল চিকচিক করে। ও একবার তাকায় মিমের দিকে। মেয়েটা চুপচাপ, চোখের নিচে কালি, মুখে একটুও রঙ নেই। তবু আশ্চর্য শান্ত। জিনিয়া কিছু বলতে গিয়ে থেমে যায়।
___“চলো, ওরা রাশেদ ভাইয়ার রুমে আছে,” বলে জিনিয়া।
ওরা গিয়ে দেখে রাশেদ বিছানায় আধশোয়া, পাশে বসে আছে আরমান। রোহান আর জাহেদ বাইরে গেছে সকালের নাস্তা আনতে। আজ শুক্রবার, তাই রান্নার লোক ছুটি নিয়েছে।
রুমে পায়ের শব্দ হতেই আরমান মুখ তুলে তাকায়। চোখে ঘুম নেই, ক্লান্তি আর রাগের ছায়া। জারা’র চোখে চোখ পড়ে — এক সেকেন্ডের জন্য, তারপর সে উঠে যায়। জারা’র পাশ কাটিয়ে চলে যায় বাইরে। একবারও তাকায় না।
জারা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। বুকের ভেতরটা কেঁপে ওঠে। চোখ ঝাপসা হয়ে আসে। ওর ঠোঁট কাঁপে, কিন্তু শব্দ বেরোয় না।
রাশেদ চুপচাপ সব দেখে। মিমকে দেখে দরজার সামনে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। চোখ দুটো লাল। ওকে দেখে কিছু বলতে চায়, কিন্তু গলা শুকিয়ে যায়।
জিনিয়া মিমের কাছে গিয়ে মৃদু গলায় বলে
রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৫২
__ “ভাইয়ার সাথে একটু কথা বলো। বাইরে আমরা আছি।”
জারা, ফিহা, জিনিয়া — তিনজনই বের হয়ে যায় বারান্দায়। জোহানও সাথে যায়, চারপাশ ঘুরে দেখতে থাকে। কিছুক্ষণ পর সে আরমানের রুমের দিকে দৌড়ে যায়
___“ ও… মমিসিং ভাইয়া, আমি আসি তোমার ঘরে? !” বলে দরজার কাছে দাড়ায় জোহান।
