রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৬২
সোহানা ইসলাম
নিঃশব্দে রাতটা কেটে গেছে। জানালার বাইরের আলো যখন হালকা হয়ে ঘরে ঢুকছে, তখনও জারা নিঃশব্দে আরমানের বুকে মাথা রেখে ঘুমিয়ে আছে। ঘড়ির কাঁটা সকাল দশটা ছুঁই ছুঁই। নার্স এসে একবার উঁকি দিয়েছিলো, জারার হাতে ব্যান্ডেজ পরিবর্তন করতে হবে বলে। কিন্তু দরজা খুলেই দৃশ্যটা দেখে স্থির হয়ে গিয়েছিলো সে। বিছানায় পাশাপাশি দুটো মানুষ—একজনের চোখে অশ্রু শুকিয়ে গেছে, আরেকজনের মুখে শান্তির রেখা।
“এখন গেলে হয়তো শান্তিটা ভেঙে যাবে,” মনে মনে বলে নার্স চুপিচুপি দরজা টেনে বাইরে চলে যায়।
সে গিয়ে রোহানকে জানায়—
__“আপনার ভাই আর ভাবী ঘুমোচ্ছে… একটু ডেকে দিন, ড্রেসিংটা করে দিতে হবে।”
রোহান মাথা নাড়িয়ে এগিয়ে যায় কেবিনের দিকে। দরজা খুলে ঢুকে দেখে—আরমান জারার মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে, আর মাঝেমাঝে কপালে চুমু খাচ্ছে।
__“দোস্ত, এটা হাসপাতাল—চুম্মাচুম্মি করার জায়গা না!” রোহান গলা পরিষ্কার করে বলে ওঠে।
আরমান ঘুরে তাকিয়ে মুচকি হাসে
___“কেন, তোর হিংসে হচ্ছে নাকি?”
রোহান ঠোঁট বাঁকায়,
___ “হিংসে না হওয়ার কি আছে বল? তোর বউ আছে, আমার নাই। তোর কুটনা চাচা এখনো আমার না হওয়া বউটাকে আমার হাতে তুলে দিতে রাজি না। আমি চুমু খেতেও পারি না।”
আরমান হেসে ফেলে। জারা চোখ বন্ধ করেও বুঝতে পারে ওরা মজা করছে। তবে চোখ খুলে তাকায় না, শুধু বুকের ভেতরটা হালকা গরম হয়ে ওঠে।
ঠিক তখনই দরজার পাশে জোহান এসে দাঁড়ায়। মুখটা শুকনো, চোখে ঘুমের ছাপ। আরমান ওকে দেখে বলে,
___“এই শালাবাবু , আয় এদিকে।”
রোহান জোহানকে দেখে খুঁচা মেরে বলে
__“ এসে পরেছে মীরজাফর! আজ দুদিন হলো, আমাকে আমার চাঁদ সুন্দরীর কাছে ঘেঁষতে দেয় নি। এই মীরজাফর আমার চাঁদ সুন্দরীর সাথে আঠার মতো লেগে ছিলো। ”
জোহানের মন ভালো না, তাই আজ রোহানের কথার কোনো জবাব দেয় না। শুধু একবার তাকায়। এই তাকানো ও’ই বলে দিচ্ছে একবার মুখ খুললে তোমার রক্ষা নেই হিংসুটে ভাইয়া।
আরমান রোহানকে চুপ করতে বলে আবার জোহান কে ডাকে নিজের কাছে। জোহান এগিয়ে আসে, কিছু বলে না। শুধু তাকিয়ে থাকে আরমান আর জারার দিকে।
___“দুলাভাই, বোনু ঠিক আছে?”
আরমান জোহানের গাল টেনে নিয়ে বলে
__“ হুমম! কোথায় ছিলি তুই?”
জোহান নিচু গলায় বলে,
__ “কিউটি গার্ল এর কাছে ছিলাম।”
রোহান মুচকি হেসে বলে,
__“হাসপাতালে থাকলে তো তুইও পেশেন্ট হয়ে যাবি মনে হয়!”
জোহান তাকায় না, শুধু বলে,
__ “সব ঠিক হয়ে যাবে, তাই না ভাইয়া?”
আরমান নিঃশ্বাস ফেলে,
__ “ইনশাআল্লাহ ঠিক হয়ে যাবে।”
এর মাঝেই জারা একটু নড়েচড়ে ওঠে। চোখ ধীরে ধীরে খুলে যায়। সবার মুখটা ঝাপসা দেখায়।রোহান বলে ওঠে,
__“ওয়েলকাম ব্যাক, ভাবি!”
জারা একটু হাসে, তবে মুখে ক্লান্তি।জোহান এসে বোনের পাশে বসে। রোহান বাইরে গিয়ে নার্সকে খবর দেয়। নার্স এসে জারার ড্রেসিং করে, ডাক্তারও একবার দেখে যায়।ডাক্তার হাসি মুখে বলে,
__ “বিকেলে ডিসচার্জ। এখন রেস্ট নিন।”
এক এক করে সবাই জারার কেবিনে ঢোকে।জেসমিন বেগম কে নিয়ে আসিফ খান ময়মনসিংহে চলে যান। জেরিন কে বাড়িতে একা রেখে এসেছে।
ফারিয়া বেগম, মারজিয়া বেগম, আনিছুর রহমান—সবাই একসাথে বসে। রুমটা এক অদ্ভুত নীরবতায় ভরে থাকে। কেউ কিছু বলে না, কিন্তু চোখে চোখে এক অদ্ভুত বোঝাপড়া। আরমান বেড থেকে নেমে রোহানের পাশে দাঁড়ায়।
আরিফ খান ধীরে বলে,
__“ তোমাদের বিয়ে ঠিক করা হয়েছে? আগামী সাত দিন পর তোমার আর জারা আম্মুর বিয়ে হবে। ”
বিয়ের কথা শুনে আরমান মুখে হাত দেয় লজ্জায়।
__“ সত্যি বলছো আব্বু? ”
আরিফ খান ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বলেন
__“ তো তোমার সাথে কী আমি মজা করছি হাসপাতালে দাঁড়িয়ে? ”
__“ হতেও পারে! ” বলল আরমান।
রোহান ওদের কথা মাঝে বলে উঠে
__“ আরে বাহ! আঙ্কেল, আপনি তো রেকর্ড ভেঙে দিয়েছেন! ”
আরিফ খান একটু ভাবুক হয়ে বললেন
__“ যেমন? ”
__“ এই যে আপনি একমাত্র বাবা, যে হাসপাতালে বসে ছেলের বিয়ের ডেট ফিক্স করেছেন! ”বলেই হাসতে হাসতে রোহান জাহেদের উপর ঢলে পড়ে।
রোহানের কথা শুনে ফারিয়া বেগম আর মারজিয়া বেগম ও হাসতে থাকেন। আরিফ খান এর মুখ চুপসে গেলো। ভালো কাজ করতে গিয়েও মজার পাএ হয়ে গেলো সে। আনিছুর রহমান মেয়ের পাশে বসে মাথায় হাত ভুলিয়ে দিচ্ছেন।
রাশেদ, মিম,ছায়মা আর জাহির গেছে সকলের জন্য নাস্তা আনতে। এক পর্যন্ত কেউ সকালের নাস্তা করে নি।
আনিছুর রহমান হালকা গলায় বলেন,
___“মা এখন তো কেমন লাগছে? ”
জারার কেমন যেনো অনু সূচনা হচ্ছে বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে। মিনমিন সুরে বলে
__“ ভালো লাগছে আব্বু! ”
আনিছুর রহমান আলতো হাসলো। তারপর বলেন
__“ এখন তো বাড়ি যেতে হবে তাই মা? ”
বাড়ি যেতে হবে শুনে জারা কি বলবে তার আগেই আরমান এক লাফে জারা’র কাছে এসে বলে
__“ বাড়ি যাবে মানে? কার বাড়ি যাবে? কোন বাড়ি যাবে মানজারা? ”
ছেলের এতো প্রশ্ন শুনে ফারিয়া বেগম বলেন
__“ জারা এখন ওর বাড়ি যাবে মা-বাবার সাথে। কারণ একসপ্তাহ পর তোদের বিয়ে! ”
আরমান কপাল কুঁচকে বলে
__“ বিয়ে?তো বিয়ে হবে, একশো বার হবে।এটা তো খুশির খবর। কিন্তু আমার বউ আমার থেকে কোথাও যাবে না। ”
আনিছুর রহমান আরমান কথা শুনে বলেন
__“ এ কেমন পাগলামি বাবা? ”
__“ আপনার মেয়ের জন্য শশুড় আব্বা ! ”
ছেলের এমন নির্লজ্জ কথাবার্তা শুনে আরিফ খানের রাগ উঠে যায়।
___“ এসব কি ধরনের কথা আরমান। এক সপ্তাহ পর তোমাদের বিয়ে আর তু……!”
আরিফ খান কে মাঝ পথে আটকে দিয়ে জারা বলে উঠে
__“ আমি আমার স্বামীজান কে ছেড়ে কোথাও যাবো না! ”
জারা’র কথা শুনে কেবিনে থাকা প্রতি টা মানুষ হতভম্ব। মারজিয়া বেগম মেয়ের মুখের দিকে হা করে তাকিয়ে আছেন।এই মেয়ে কি বলছে এসব? প্রতিটি মানুষের মুখে অবিশ্বাস্য ভঙ্গি লেগে আছে।
রোহান আর জাহেদ দুইজন অবাক হবে কী হাসতে হাসতে গারা গরি খাচ্ছে। কারণ ওরা দেখেছে আরমান এতোক্ষণ জারাকে খুঁচাচ্ছিলো এই কথা বলার জন্য। জারা বারণ করলে আরমান কড়া নাড়ছে তাকায় জারার দিকে। জারা আরমানের ভয়ে এই কথা বাধ্য হয়ে বলেছে।
আরমান যেনো এখন দিনের বেলা হাতে চাঁদ ধরে ফেলেছে। অতি কনফিডেন্সের সাথে আরমান ওর বাবা আর শশুরের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। এমন ভাব নিয়েছে সে, এখন যদি হাতের কাছে কালো চশমা থাকতো তাহলে লুঙ্গি ডান্স দিতো একটা।
__“ আমিও আমার লক্ষী বউ কে আমার কাছ থেকে এক চুলও দূরে যেতে দিব না। সেখানে এক সপ্তাহ তো বিলাসিতা! ”
আনিছুর রহমান দীর্ঘশ্বাস ফেলে,
___“ ভাই সাহেব! আপনি আপনার ছেলেকে বোঝান এক সপ্তাহের জন্য দুনিয়া উল্টে যাবে না? ”
__“ আমার ছেলেকে একা দোষ দিলে হবে না! আপনার মেয়েও আমার ছেলেকে ছাড়া থাকবে না বলছে!”
আনিছুর রহমান একবার মেয়ের দিকে তাকান তো একবার আরমানের দিকে। আরমান যেনো মুখে কথা সাজিয়ে রেখেছে, তাকে কিছু বললেই ফট করে জবাব দিয়ে দিবে।
__“আপনার ছেলের জন্য আমার মেয়ে এমন করছে! ”
ফারিয়া বেগম আর মারজিয়া বেগম দু’জন নিরব ভূমিকা পালন করছেন। এতো সব কিছু দেখে তারা নিজেদের মুখের ভাষা হারিয়ে ফেলেছে।
আর এদিকে রোহান আর জাহেদ হাসতে হাসতে হাসপাতালের মেজেতে বসে পরে। জিনিয়া মাএ ওর আম্মুর সাথে কথা বলে কেবিনে ঢুকে। কিন্তু কেবিনের গম্ভীর অবস্থা দেখে বোঝতে পারে এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। তাই সেও গিয়ে ফারিয়া বেগম এর পাশে বসে পরে।
আরিফ খান এবার কিছু জোরে বলেন
__“ তো আপনার মেয়ে তো আমার ছেলের জন্য এমন করছে। কেউ কাউকে ছাড়া থাকবে না। ”
আনিছুর রহমান দীর্ঘ শ্বাস ফেলেন। হতাশ হয়ে বলেন
__“ কাকে দোষ দিব? ”
আরিফ খান আরমান আর জারা’র দিকে তাকিয়ে বলেন
__“ যেমন বউ তার তেমন স্বামী! ”
রোহানের হাসতে হাসতে পেট ব্যথা শুরু হয়ে যায়। রোহান পেটে হাত দিয়ে কোন রকম বলে
__“ বাড়ি যেতে হবে না। ওদের হাসপাতালেই সংসার করার ব্যবস্থা করে দাও। দুটোই নির্লজ্জ হয়ে গেছে। ” বলে আবার হাসতে থাকে।
জাহেদ ও বলে
__“ ভালোবাসায় লজ্জা শরম থাকে না, আজ প্রমাণ হয়ে গেলো!”
জারা এবার সত্যি অনেক লজ্জায় পরে যায়। আরমানের পাল্লায় পড়ে তাকে এখন কতো কথা শুনতে হচ্ছে। জারা রাগে গজগজ করে আরমানের কাছ থেকে নিজের হাত সরিয়ে নেয়।
আনিছুর রহমান এবার বেজায় চটে যান। গলায় এক প্রকার জেদ ধরে বলেন
__“ আমার মেয়ে আমার সাথে যাবে! ব্যাস এটাই আমার শেষ কথা।”
কিন্তু আরমান ও দবে যাওয়ার পাএ নয়। সেও আগে থেকে ওর অস্ত্র তৈরি করে রেখেছে। এখন শুধু এপ্লাই করার পালা।
__“ কেন আপনার সাথে যাবে? এই শালাবাবু তুই কিছু বল! ”
এতোক্ষণ আরমান জোহানকে কথা শেখাচ্ছিল। এখন চুপচাপ বসে থাকা জোহান মাঠে বোমা ফেলবে। জোহার ওর বাবার দিকে তাকিয়ে বলে
__“ আব্বু! তুমিও তো আম্মু কে নানু বাড়িতে যেতে দাও না একা, তাহলে দুলাভাই কেন দিবে বোনুকে আমাদের বাড়িতে যাওয়ার । আম্মু তোমার যেমন বউ হয়, তেমন বোনুও তো দুলাভাইয়ের বউ হয়! ”
কথাটা মুখ থেকে বের হতেই ঘরের বাতাস যেন হিম হয়ে গেল। মুহূর্তের মধ্যে হাসি মিলিয়ে গেল সবার মুখ থেকে।
মারজিয়া বেগমের মুখ শক্ত হয়ে যায়। তাঁর চোখে বিস্ময় আর অস্বস্তির ছাপ—যেন কথা শুনে বোঝার চেষ্টা করছেন, ছেলে কি সত্যিই এমন কিছু বলল?
ফারিয়া বেগমের ঠোঁট কেঁপে ওঠে, কিন্তু কোনো কথা বের হয় না। চোখ নামিয়ে বসে থাকেন নিঃশব্দে, যেন নিজের ভিতরে কোনো জটিল হিসাব মেলাতে ব্যস্ত। এই বাচ্চা আসলেই এই কথা বলেছে?
জিনিয়ার মুখের হাসি থেমে যায় হঠাৎ। সে তাকিয়ে থাকে জোহানের দিকে—অবাক, হতবুদ্ধি। রোহান আর জাহেদ এখন আর পায় কে। জিনিয়া ও হতবুদ্ধি না হয়ে তাদের দুইজনের সাথে তাল মিলিয়ে হেঁসে উঠে। আরমান ও মুখ টিপে হাসে। ঠিক অস্ত্র ব্যবহার করছে এখন। এখন আর কারোর মুখে কোন কথা নেই।
জারা মাথা নিচু করে মুখে চাদর টেনে মুখ লুকিয়ে শুয়ে থাকে। সে এসবের কিছু শুনে নি।
আনিছুর রহমান চুপচাপ তাকিয়ে থাকেন ছেলের দিকে । তাঁর চোখে মিশে আছে রাগ, লজ্জা, আর হতাশা। মুখে কোনো কথা নেই—শুধু নীরবতায় সব প্রকাশ পায়।
আরিফ খান দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। মুখে কোনো অভিব্যক্তি নেই, কিন্তু মনে হয় গভীরভাবে চিন্তা করছেন—এই কথার পেছনে লুকিয়ে আছে কি শিশুসুলভ সরলতা, না কি কিছু বেশি।ঘরের পরিবেশ নিস্তব্ধ হয়ে পড়ে। কেউ হাসে না, কেউ কিছু বলে না।
__“ সাব্বাশ ভাই সাহেব! এমন একটা দুনিয়াতে আনার জন্য। ”
এই বলে তিনি আর এখানে দাড়ালেন না। কেবিন থেকে বের হয়ে যান মুখে হাত দিয়ে । ফারিয়া বেগম ও চলে আসে। মারজিয়া বেগম ছেলের দিকে তেড়ে যান। পাকা কথার জন্য দুই একটা দেওয়ার জন্য। কিন্তু আরমান জোহান কে বাচিয়ে নেয়।
আনিছুর রহমান আর কিছু বলেন না। কেবিন থেকে বের হয়ে আসার সময় বলেন
__“ জন্ম দিলাম আমি! আর এই বাঁদর গুলো অন্যের হয়ে উকালতি করে। ”
এই কথা শুনে ফেলে আরমান। শশুড়কে আর একটু রাগানোর জন্য বলে
__“ আপনি কীভাবে জন্ম দিলেন শশুড় আব্বা? জন্ম তো দিলো আমার শাশুড়ী আম্মা। ”
রোহান আর জাহেদ এক সাথে বলে উঠে
__“ঠিকককক! একদম ঠিক কথা ভাই!”
জারা মুখ লুকিয়ে শুয়ে থাকে। তার মুখে কোনো কথা নেই, কিন্তু চোখের ভেতর লুকিয়ে থাকা এক অদ্ভুত লজ্জা, বিষণ্ণতা, আর অস্বস্তি যেন পুরো পরিবেশটা আরও গম্ভীর করে তোলে।কিন্তু আরমানের শেষ কথা শুনে আর সহ্য করতে না পেরে জারা আরমানের হাতে জোরে চিমটি কাটে। একেবারে চিমটি কাটার জায়গা থেকে পশম উঠিয়ে ফেলে জারা।
আরমান ব্যথায় চোখ মুখ খিঁচে বন্ধ করে নেয়। আর মুখ দিয়ে ব্যথাতুল্য আওয়াজ করে
__“আহহহহহহা,ওহহহ, আম্মু গো! ”বলে হাত ঝাঁকাতে থাকে আরমান।
জারা ঠোঁটে হালকা হাসি আনে, তবে তা আরমানের চোখে পড়ে না। তারপর সবাই এক এক করে বাইরে চলে যায়। রোহান, জাহেদ, জিনিয়া আর জােহান।
ঘর নিঃশব্দ।আরমান হাত ডলতে থাকে। ব্যথা করছে খুব। আরমান মাথা নিচু করে বলে,
__ “লক্ষ্মী বউ… ক্ষমা করেছো তো আমায়?”
জারা মুখ ফিরিয়ে নেয়,আরমানের হঠাৎ এই কথায় চোখের কোণে জল জমে উঠে । জারা উত্তর দেয় না। মুখ গুঁজে ফেলে বালিশে। আরমান এগিয়ে গিয়ে ওর মাথার পাশে বসে, আলতো করে ওর চুলে হাত রাখে। জারা কিছুক্ষণ পর মুখ তুলে তাকায়—চোখদুটো ভিজে।আরমানের মুখে অসহায়তা।হঠাৎ জারা বুক ফেটে কেঁদে ওঠে, দুই হাত দিয়ে আরমানকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে।
__“ ক্ষমা না করলে কাল আপনার বুকে মাথা রেখে শান্তিতে ঘুমিয়েছিলাম? ”
দুজনেই ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদতে থাকে। বছরের যত অভিমান, ভুল, কষ্ট সব যেন এই এক মুহূর্তে গলে যায়। আরমান ওর পিঠে হাত রাখে।
__“ এমন টা কেন করতে গেলি বউ? যদি কোনো বিপদ হয়ে যেতো, আমি কি নিয়ে বাঁচতাম?”
__“ আপনিই তো আমাকে রেখে চলে গেছেন! ”
আরমান জারাকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলে
__“ আর যাব না! আমি সারাজীবন আমার রানী সাহেবার গোলাম হয়ে থাকবো!”
ঘরটা আবার নিঃশব্দ হয়ে যায়। শুধু কান্নার আওয়াজ মিলিয়ে যায় দূরের মেশিনের বিপ্ শব্দে।
গরমে ভারি বাতাসে হাসপাতালের সামনের রাস্তা নিস্তব্ধ হয়ে আছে। সকাল গড়িয়ে দুপুর নামছে প্রায়। চারজন — জাহির, ছায়মা, মিম আর রাশেদ — খাবার কিনে ফিরছে। প্লাস্টিক ব্যাগে গরম স্যুপ আর বিরিয়ানির গন্ধ ছড়াচ্ছে। তবুও ছায়মার মুখ ভার, আর জাহিরের চেহারায় সেই পরিচিত গম্ভীর ভাব।
রাশেদ ধীরে বলল,
— “এই জাহির, তুমি একদম পাথর হয়ে গেছো কেন। কিছু বলছো না কেন?”
রাশেদ জাহির ওরা সেম বয়সের তাই ফ্রেন্ডলি হয়েই কথা বলে। জাহিরও ওদের সবার সাথে পাকাপোক্ত ভাবে মিশে গেছে।কিন্তু রাশেদের কথার জবাব না দিয়ে জাহির সোজা তাকিয়ে হাঁটে, একটিও শব্দ করে না।
ছায়মা মুখ বাঁকিয়ে বলল,
— “ওনি এখন সিরিয়াস মোডে আছে। মনে হয় পৃথিবীর সব দুঃখ ওনার ঘাড়ে।”
মিম একটু হেসে বলল,
— “চুপ থাকো ছায়মা আপু! ভাইয়ার এমনিতেই চিন্তায় শেষ ।”
ছায়মা চোখ টিপে বলল,
— “ আমি তাহলে ইচ্ছে করেই রাগাব। দেখি কতটা সহ্যশক্তি আছে হিমালয় ভাইয়ের।”
জাহির হঠাৎ থেমে যায়। মুখের ভেতর শব্দ জমে ওঠে, কিন্তু বলে না। সে শুধু ব্যাগটা শক্ত করে ধরে সামনে হাঁটে।
ছায়মা এবার আরও উসকে দেয়,
— “এই যে মিস্টার সিরিয়াস, রাগ করলে মুখ শুকিয়ে যায় কেন? আমি কি কিছু ভুল বলেছি?”
জাহির গম্ভীর গলায় বলে,
— “তুমি একবারও চুপ থাকতে পারো না? আমার বুড়ি হাসপাতালে আছে, একটু শান্তি চাই, সেটা দিতে পারবে প্লিজ?”
ছায়মা হেসে বলে,
— “আচ্ছা তাইলে আমি চুপ থাকি, কিন্তু আপনার মুখ দেখলে মনে হয় চুপ থাকলে অপরাধ করছি।”
জাহির এবার ঘুরে দাঁড়ায়, চোখে রাগের ছাপ।
— “শুনো মেয়ে! মাএ কয়েক ঘন্টার পরিচয়ে কেউ কারোর সাথে এই ভাবে কথা বলে না। বোঝতে পারেছো? আর আমার সাথে সেধে কথা বলতে আসবে না, এসব আমার পছন্দ না। ”
ছায়মার মুখ থমকে যায়। হাসিটা এক নিমিষে মিলিয়ে যায়। চোখে পানি চিকচিক করে ওঠে। সে কিছু বলে না—শুধু মাথা নিচু করে হাঁটা শুরু করে।
মিম আর রাশেদ দুজনেই অবাক হয়ে যায়।
রাশেদ নিচু গলায় বলে,
__ “জাহির, তুমি একটু বেশি বলে ফেললে।”
মিম বলে,
__“ওর মন খারাপ হয়ে গেছে ভাইয়া?”
জাহির কিছুক্ষণ চুপ থাকে। নিঃশ্বাস ফেলে শুধু বলে,
— “আমার ওই মেয়ে টাকে সহ্য হয় না। বেশি গায়ে পরার মেয়ে।”
ছায়মা পেছনে তাকায় না। সে দ্রুত হাসপাতালের ভিতরে ঢুকে যায়। ওর মুখের ভেতর জমে থাকা কান্নাটা কারো সামনে ফেলতে চায় না।
মিম দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,
— “ছায়মা এমন না, ও শুধু কথা বলে একটু বেশি। কিন্তু মনটা খুব ভালো। আর আপনার মন খারাপ দেখে, শুধু একটু ভালো করতে চেয়েছিলো।”
রাশেদ মাথা নাড়ে,
— “হ্যাঁ, ও চায় তুমি যেনো হাসু, তাই তো একটু এমন করছিলো।”
জাহির চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। মনে হয় তার বুকের ভেতরেও কিছু একটা কাঁপছে, হয়তো অনুশোচনা।
শেষে তিনজন ধীরে ধীরে হাসপাতালের ভেতরে ফিরে আসে। করিডরে আলো ম্লান হয়ে গেছে, সবার মুখে ক্লান্তির ছাপ। ছায়মা তখন এক কোণে বসে আছে জিনিয়ার সাথে , নিচু চোখে মোবাইলের দিকে তাকিয়ে। ওর মুখে আর সেই আগের দুষ্টু হাসি নেই—শুধু নীরব একটা কষ্ট।
জাহির দরজার কাছে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে। কিছু বলতে যায়, কিন্তু মুখ খুলে আবার চুপ করে যায়। তারপর ধীরে বলে,
— “ছায়মা…”
ছায়মা মুখ তুলে তাকায়, কিন্তু কিছু বলে না। দুজনের চোখ মিলতেই সময়টা যেন থেমে যায়—অভিমান, কষ্ট আর অনুচ্চারিত যত কথা সব মিলেমিশে এক নিঃশব্দ নরম আবহে ভরে ওঠে পুরো করিডরটা। জাহির ভাবে এই মেয়ের এমন নিরব আচরণ আমাকে এতো কেন পুরাচ্ছে।
ছায়মা কিছু না বলে আবার মোবাইলে চোখ দেয়। জাহির দীর্ঘ শ্বাস ফেলে জিনিয়া কে বলে
__“ বোন এই খাবারের ক্যাকেট টা বুড়ির কেবিনে দিয়ে আসবে কষ্ট করে? ”
জিনিয়া হেসে বলে
__“ আরে ভাইয়া, কষ্ট কেন হবে। দিন আমার কাছে,দিয়ে আসচ্ছি।”
জিনিয়া প্যাকেট টা নিয়ে জারা’র কেবিনে যায়। আর জাহির গিয়ে রোহান দের সাথে বসে। যাওয়ার আগে একবার ছায়মার দিকে তাকায়।
বাইরে পরিবেশ প্রস্তুত। জারাকে বিকেল পাঁচটায় র্ডিসচার্জ দেওয়া হবে। জারাকে হাসপাতালে রক্ত মাখা অবস্থায় আনা হয়েছে তাই সাথে কোনো কাপড় আনে নি। তাই আরমান জাহির কে নিয়ে জারা’র জন্য শপিং করতে আসে। কারণ জারা কে নিয়ে এখান থেকে সোজা ময়মনসিংহে যাবে। তাই পরার জন্য ও জামা কাপড় লাগবে।
আরমান জারা’র জন্য এক একটা জিনিস খুব বেছে বেছে নিচ্ছে। যা পছন্দ হচ্ছে তাই নিচ্ছে।পড়ার জন্য কমফোর্ট পাজামার সেট নিয়ে নেয়। আর জারা’র জন্য একটা বোরকা কিনে নেয়। কারণ আরমান জারাকে পাজামার সেট পড়িয়ে নিবে না। জাহির নিরবে সব দেখছে। এই লোকটা তার বোনের জন্য কতো পাগল। বোনের সুখ দেখে জাহিরের মন ভালো হয়ে যায়।
জারা’র জন্য সব কিনা কটা শেষ করে, ওর শশুড় শাশুড়ীর জন্য আর দুই শালা,সুমোন্ধির জন্যও শপিং করে। জাহির আরমান কে অনেক বার বাদা দেয়, কিন্তু আরমান শুনে না জাহিরের কথা।
হাত ভর্তি শপিং করে আরমান জাহিরের হাতে দিয়ে দেয়। তারপর একটা স্টলে ঢুকে ক্যাডবেরি,মিল্ক চকলেট আর কিনিকি অনেক গুলো চকলেট কিনে নেয় জিনিয়া দের জন্য। জাহির শুধু আরমানে কান্ড দেখছে।
শপিংমল থেকে বের হয়ে জাহির আরমানকে বলে
__“ আমার বুড়ি কে কীভাবে ফাঁসিয়ে বিয়ে করলেন? ”
আরমান ভ্রু কুঁচকে তাকায় জাহিরের দিকে
__“ আমি তোমার হাফ ইঞ্চি বোনকে ফাঁসাই নি! বরং সে আমায় ফাঁসিয়েছে!”
__“ মানে?”
__“ আরে তোমার বুড়ি তো আমার ইজ্জত দেখে ফেলেছিলো, আর আমি ভাই ভালো মানুষ! আমার ইজ্জত যে দেখেছে আমি তাকেই বিয়ে করেছি!”
আরমানের কথা শুনে জাহির তব্দা খেয়ে যায়। বোকার মতো প্রশ্ন করে
__“ ইজ্জত দেখেছে মানে? ”
আরমান জাহিরের কানে কানে ফিসফিস করে বলে
__“ আরে বোকা সুমন্ধি! আমার ইজ্জত, মানে ওই টা..ছেলেদের থাকে না.. ওই টা… দেখে ফেলেছে তোমার বোন। তাই তো বিয়ে করেছি, না হলে তোমার বোনকে বিয়ের করার আমার কোনো শখ নেই ভাই! ”
জাহির বিস্তারিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আরমানের দিকে। তার মানে এই লোকটা ওর বুড়ি কে ভালোবাসে না? জাহির কিছু টা গম্ভীর কণ্ঠে বলে
__“ তার মানে, আপনি আমার বুড়িকে ভালোবাসেন না ?”
আরমান গা ছাড়া ভাব নিয়ে বলে
__“ আরে ভাই আমার নিজের টুকু মুকু একটা পারসোনাল বউ আছে! সেখানে তোমার বুড়িকে কেন ভালোবাসতে যাব?”
জাহির তব্দা খেয়ে যায়। সে বোঝতে পারে আরমান ওর সাথে ইয়ার্কি করছে।
__“ বউ তো সবার পারসোনালই থাকে! আপনার টা ভিন্ন কই? ”
আরমান জাহিরের দিকে তাকিয়ে হেসে বলে
__“ তোমার আছে? ”
জাহিরের বউ নাই, তাই সে মাথা এদিকে সেদিকে ঝাঁকুয়ে বলে
__“ না! ”
আরমান এবার উচ্চ সুরে হেসেই ফেলে। জাহিরের কাঁধে হাত রেখে বলে
__“ ছিঃ কী লজ্জা! তোমার একটা পারসোনাল বউ নাই!”
জাহির বোঝে যায় আরমান ওকে খুঁচা মেরে কথা বলছে।আজ একটা বউ নেই বলে । তাই এতো কথা শুনতে হচ্ছে। কথা না বারিয়ে চলে আসে হাসপাতালে। হাসপাতালে গিয়ে আরমান আর জাহির সোজা জারা’র কেবিনে যায়। দেখে জিনিয়া, মিম আর ছায়মা জারা’র সাথে বসে গল্প করছে। আরমান চকলেটের প্যাকেট টা জিনিয়ার হাতে দিয়ে বলে
__“ সবাই কে দিয়ে খাবি। এখানে অনেক আছে। ”
__“ আচ্ছা ভাইয়া! ” বলে সবাই কেবিন থেকে বের হয়ে আসে। জাহির একবার ছায়মার দিকে তাকায়। মেয়ে টা ওর সাথে সকাল থেকে একটাও কথা বলে নি। আর এখন না একবার ওর দিকে তাকিয়েছে। জাহির ও জারা’র মাথায় হাত ভুলিয়ে দিয়ে বের হয়ে আসে।
জারা দেখে আরমানের হাতে অনেক গুলো প্যাকেট। কিন্তু যানতে চায়নি কি আছে ভিতরে। ওর তো মন পরে আছে চকলেটের দিকে। আরমান সবার জন্য এনেছে কিন্তু ওর জন্য আনে নি কেন। মন খারাপ হয়ে যায়।
আরমান দেখে ওর লক্ষী বউয়ের মুখ টা বার হয়ে আছে। মন খারাপ মনে হচ্ছে।
__“ কী হয়েছে লক্ষী বউ? মুখ টা এমন বার কেন?”
জারা মুখ ফিরিয়ে নেয় অন্য দিকে। কিন্তু কিছু বলে না। আরমান হয় তো বোঝেছে ওর বউ কেন এই ভাবে রয়েছে। তাই একটা প্যাকেটে জারা’র হাতে দিয়ে বলে
__“ এই নাও বউ এটা তোমার জন্য! ”
জারা আরমানের দিকে তাকিয়ে আছে। বোঝার চেষ্টা করছে এতে কি আছে।
__“ কি আছে এতে?”
__“ আমার লক্ষী বউয়ের জন্য চকলেট আছে এতে। ”
জারা’র চোখ মুখ ঝলমলে হয়ে যায় চকলেটের কথা শুনে।
__“ সত্যি! ”
__“ হ্যাঁ সত্যি! বাচ্চাদের মতো আর গাল ফুলিয়ে থাকতে হবে না আপনাকে। ”
__“ আপনি আমার জন্য এনেছিলেন? ”
__“ না! অন্য কারোর জন্য এনেছি! ”
জারা আরমানের কথায় পাওা দিলো না। একটা ভেঙ্গচি কেটে চকলেট খেতে শুরু করে। যদিও বাম হাতে ভালো জোর পায় না। কাটা জায়গায় টান লাগে তাই আরমান চকলেটের কাগজ ছিঁড়ে দিচ্ছে। আর জারা মনের আনন্দে খাচ্ছে।
বিকেল সাড়ে চারটা বাজে। একটু পর জারা ডিসচার্জ করা হবে। তাই জারাকে মিম, জিনিয়া আর ছায়মা তিনজন মিলে রেডি করিয়ে দেয়। আরমানের আনা বোরকা আর হিজাব সুন্দর করে জারা’কে পরিয়ে দেয়। জারা সকাল থেকে একজনকে খুঁজছে। ফিহা।
__“ মিম ফিহা কই? আমার সাথে একবারও দেখা করতে এলো না।”
মিম হঠাৎ চমকে উঠে। এতো কিছুর মাঝে ফিহার কথা তো ভুলেই গেছে সে। জারা যে এই অবস্থা এটাও তো জানানো হয় নি ফিহাকে।
__“ ফিহা তো এসবের কিছু যানে না? ”
মাএ জাহেদ কেবিনে ঢুকে জিনিয়া’কে ডাকতে। কিন্তু ফিহার নাম শুনে বুক টা কেঁপে ওঠে। আজ চার দিন ধরে মেয়েটার সাথে কথা হয় না তার। নিশ্চয়ই অনেক অভিমান জমেছে ওর মনে।
__“ মিম তোমার মোবাইল টা একটু দেওয়া যাবে?”বললো জাহেদ
__“ অবশ্যই ভাইয়া। নিন..! ”বলে জাহেদ কে মিম ওর মোবাইল টা দিয়ে দেয়।
হাসপাতালের করিডরে তখন জাহেদ ফোনে ব্যস্ত।
চার দিন ধরে ফিহার সাথে কথা হয়নি। ফিহার মোবাইলে মিমের নাম থেকে কল যায়। ফিহা জ্বরের ঘোরে শুয়ে ছিলো, ফোনটা হাতে নিয়ে দেখে নামটা—‘মিম’।রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে জাহেদের গলা।
__“ফিহা… কেমন আছো?”
ফিহা চুপ। ঠোঁট কাঁপে।আজ চার দিন পর মানুষ টার কন্ঠ শুনছে। নিঃশব্দে চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পরে । জাহেদ আবার বলে,
__“এই চারদিনে তোমার সাথে কথা বলতে পারিনি, সরি জান।”
ফিহার চোখে জল জমা হয় আরও। মেয়ে টার জ্বরে গা পুরে যাচ্ছে। কাল সারারাত ঘুমাতে পারেনি। এক জারা’র চিন্তা তো আরেক জাহেদের। তবুও অভিমানি কন্ঠে বলে
__“ কথা বলা আর না বলা একান্তই আপনার ব্যক্তিগত বিষয়। ”
__“ এই ভাবে কথা বলছো কেন ফিহা?রাগ করেছো আমার উপর? ”
ফিহা নিঃশব্দে বলে,
__“যে মানুষটা দূরে গেলেই ভুলে যায় আমায়, তার ভালোবাসার দরকার নেই আমার।”
জাহেদের গলা কেঁপে ওঠে,
__“তুমি এমন কথা বলছো কেন, ফিহা?”
ফিহা এবার দৃঢ়,
__“ এমনি! আর আজ থেকে আমাদের পথ আলাদা। ”
__“ ফিহহহহা!”
__“ ভালো থাকবেন। আল্লাহ হাফেজ।”
ফোনের ওপাশে শুধু নীরবতা। জাহেদ কাঁপা হাতে ফোনটা নামিয়ে নেয়। হাসপাতালের করিডরটা হঠাৎ অন্ধকার মনে হয় ওর কাছে।
রোহান এসে কাঁধে হাত রাখে,
__“কি রে, সব ঠিক তো? এখানে দাড়িয়ে আছিস কেন? ”
জাহেদ ফিসফিস করে বলে,
__“সব ঠিক, শুধু ভেতরটা ফাঁকা লাগছে রোহান ভাইয়া ।”
রোহান চুপ থাকে। জানে, কষ্টের সময় কথার চেয়ে নীরবতাই বেশি কাজ করে।
__“ কি হইছে বল আমায়! ”
__“ ফিহা বলেছে আজ থেকে আমাদের পথ আলাদা! ”
রোহান অবাক হয়।
__“ মানে?”
__“ আমি জানি না! আমি সত্যি জানি না। ফিহা এমন কথা কি ভাবে বলে পারে। ”
রোহান জাহেদ বলে শান্ত হতে। তারপর ফিহার সাথে কথা বলবে সবাই মিলে।
__“ ফিহার সাথে কথা বললো আমরা চিন্তা করিস না! ”
জাহেদ নখ কামড়ে বলে
__“ চিন্তা হচ্ছে একটা বিষয় নিয়ে
রোহান ভাইয়া! ”
__“ কী? ”
__“ ফিহা বলেছে আজ থেকে আমার আর ওর পথ আলাদা। তাহলে তুমিই বলো ওর আর আমার পথ কবে এক ছিলো?”
রোহান ভ্রু কুঁচকে বলে
__“ মানে?”
__“ মানে যানি না! কিন্তু পথ আলাদা এটা বোঝলাম না আমি! ”
__“ আরে বলদা ফিহা তোর সাথে সম্পর্ক রাখবে না বলছে! ”
জাহেদ এবার চিন্তায় পরে যায়।
__“ আরে এই ভাবে সম্পর্ক বিচ্ছেদ হয় না! ”
__“ তাহলে কীভাবে হয়?”
__“ দেখো আমার প্রেম করছি, তাহলে আমাদের বিচ্ছেদ হবে ব্রেকআপ দিয়ে। পথ আলাদা এটা আবার কেমন কথা? ”
রোহান হা করে জাহেদের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। এই ছেলে বলে কী। ব্রেকআপ বললে বিচ্ছেদ হয়, না হলে হয় না?রোহান জাহেদ কে বোঝানোর জন্য বলে
__“ আরে বোকা বিচ্ছেদ অনেক ভাবে হয়! ”
__“ আমি মানি না! ”
__“ কেন?”
__“ জানি না! ”
এই বলে চলে যায় জাহেদ। রোহান রোহান বোকার মতো তাকিয়ে থাকে জাহেদের চলে যাওয়ার দিকে। এই ছেলে বিষয় টা সিরিয়াস ভাবে নিচ্ছে না কেন? সবাই কে জানাতে হবে, তাই জিনিয়া দের কাছে যায় রোহান।
হাসপাতালের কেবিনের বাতাসে এখন একটু স্বস্তির গন্ধ। বিছানার পাশে বসে আছে আরমান, যেন পাহারারত এক প্রহরী। কেউ ছোঁয়ার সাহস পায় না ওর “লক্ষী বউ”কে। যখন শুনেছে জারা ওর সাথে যাবে না তখন থেকে জারা’র গা ঘেঁষে বসে আছে। জারা’কে ওর কাছ থেকে এক চুল দূরেও যেতে দিবে না।
সবাই প্রস্তুতি নেয় হাসপাতাল থেকে রওনা দেওয়ার। রাশেদ গাড়ির ড্রাইভিং সিটে বসে, জাহির পাশে। পেছনের সিটে মিম, জিনিয়া আর বসে হাসাহাসি করছে। ছায়মা চুপ করে বসে আছে।
রোহান আর জাহেদ দুইজন বাইকে করে যাবে।
আনিছুর রহমান মেয়েকে নিয়ে মাএ গাড়িতে উঠে বসতে যাবে তখনই আরমান এসে জারা’কে আটকে নেয়। সবাই আরমানের দিকে তাকিয়ে আছে। এই ছেলের আবার কি হলো হঠাৎ করে?
আরমান জারা’র হাত ধরে বলে
__“ মানজারা আমার সাথে করে যাবে! এই রোহান বাইক থেকে নাম, আমি আর মানজারা যাবো বাইকে করে। ”
আনিছুর রহমানের এবার বেশ রাগ হচ্ছে এই ছেলের উপর। তার অসুস্থ মেয়েকে নিয়ে রাতের বেলা বাইকে করে যাবে? তিনি এটা হতে দিবে না।
__“ আমার মেয়েকে এই রাতের অন্ধকারে বাইকে করে নিয়ে যেতে দিব না! ”
নাছোরবান্দা আরমান ও জেদ ধরে বলে
__“ আপনার মেয়ে হলে, আমারও বউ! ”
জোহান ওর মায়ের সাথে গাড়ির ভিতরে বসে আছে। ফারিয়া বেগম ছেলের কান্ড দেখে থ মেরে বসে আছেন। আরিফ খান আর ছেলেকে কিছু বলবেন না বলে পণ করেছে। এই ছেলেকে কিছু বললেও শুনবে না।
আনিছুর রহমানও একরোখা মনোভাব করে বলেন
__“ তো?”
__“ আমার বউকে আমি এই ভাবেই নিয়ে যাবো।পুরো শহর ঘুরে তারপর আমরা যাব, আপনার কোনো সমস্যা শশুর আব্বা? ”
__“ অবশ্যই সমস্যা! ”
__“ তাহলে আমার কিছু করার নেই। টাটা, বায়,বায় আল্লাহ হাফেজ।
এই নিয়ে জামাই আর শশুড়ের মধ্যে আরও কথা কাটাকাটি হয়। জাহির এসব দেখে গাড়ি থেকে বের হয়ে আসে। কিছু টা গম্ভীর কণ্ঠে বলে
__“ কি হইছে আব্বু? ”
আনিছুর রহমান নালিশ দেওয়ার মতো করে বলে
__“ এই রাতের বেলা জারা’কে বাইকে করে নিয়ে যাবে বলছে, এমনিতেই মেয়েটার শরীর দূর্বল।যদি রাস্তায় কোনো বিপদ হয়? ”
জাহির বোনের মুখের দিকে তাকায় আবার আরমানের মুখের দিকে তাকায়। জারা এসব কান্ড দেখে কথা বলা ভুলে গেছে। আরমান জাহিরকে বলে
__“ আমার বউ, আমি নিব না? ”
জাহির ওর বাবার দিকে তাকিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বলে
__“ আব্বু! তুমি তোমার বউ নিয়ে থাকো না, অন্যের বউ নিয়ে কেন টানাটানি করছো? ”
আনিছুর রহমানের মুখ দেখার মতো হয়ে যায়। আরিফ খান গাড়িতে বসে হু’হা করে হেসেই ফেলেন। আনিছুর রহমান ছেলেকে বলেন
__“ পাঁজি গুলোর সাথে মিশে একদিনে এমন হয়ে গেছে! বেয়াদব! ”
আরমান চট করে বলে ফেলে
__“ শশুড় আব্বা, এই কথা টা কি আমায় বললেন?”
__“ হ্যাঁ, তোমাকেই বলেছি মহাশয়! ”
আরমান বএিশ পাটি দাঁত বের করে হেসে বলে
__“ আসলে আমি মাইন্ড করি নি! ”
__“ নির্লজ্জ! ” বলে গাড়িতে উঠে বসেন তিনি। আর কড়া চোখে আরিফ খানের দিকে তাকায়। যেনো রাগে চোখ দিয়ে গিলে খাবে।
__“ আমার দিকে তাকিয়ে লাভ নেই, আপনার মেয়ে আমার ছেলেকে পাগল বানিয়েছে।”
__“ হ্যাঁ এখন সব দোষ আমার মেয়ের!আর আপনার ছেলে ধোঁয়া তুলশী পাতা। ”আর কথা বলেন তিনি। চুপ করে বসে থাকেন।
আরমান জাহির কে জড়িয়ে ধরে বলে
__“ জোহানের মতো একটা শালা আর তোমার মতো একটা সমোন্ধি থাকলে আর কি লাগে। সিঙ্গেল হয়েও যে আমার কষ্ট টা বোঝেছো তার জন্য থাংকু।”
আরমান আবারও জাহির কে খুঁচা মেরে কথা বলে। এই লোকটা বিয়ে করে কি মনে করছে নিজেকে?কিছু বলতে ইচ্ছে করছে খুব। কিন্তু এখানে জারা আছে। দেখে যাবে উল্টা পাল্টা কিছু বলে ফেলেছে।তাই শুধু স্বাভাবিক ভাবে বলে
__“ আমার বুড়িকে সাবধানে নিয়ে আসবেন। ”
এই বলে আবার গিয়ে গাড়িতে বসে পরে। পিছনের দিকে তাকিয়ে দেখে তিন জন মিলে চকলেট খাচ্ছে। আরমানের দেওয়া চকলেট এখনো শেষ করতে পারেনি তারা। জোহানকেও দিয়ে দিয়েছে গাড়িতে বসে খাওয়ার জন্য।
জাহির যেতেই জারা আরমানকে ঠাসস করে কিল মারে।
__“ অসভ্য লোক! লজ্জা শরম কিছু নেই!এখন আবার আমার দুই ভাইকে হাত করে নিয়েছে!”
আরমান জারার হিজাব ঠিক করে দিতে দিতে বলে
__“ আমার বউ তুমি, আমার সাথে আঠাল মতো লেগে থাকা তোমার দায়িত্ব। তা না করে বাপের সাথে ঢেং ঢেং করে চলে যাচ্ছিলে কেন।”
__“ আমি আপনার মতো অসভ্য না, যে সব সময় স্বামীর পিছনে ঘুরবো? ”
__“ স্বামীর পিছনে ঘুরা ইমানদার স্ত্রীদের কাজ বউ । ”
__“ কী জ্ঞানী মানুষ গো আমার? ”
__“ তোমারই তো লক্ষী বউ! চলো এখন! ”
আরমানের দিকে রোহান আর জাহেদ হা করে তাকিয়ে আছে। এই ছেলে সব পারে। কেমন করে শশুড়ের সাথে ঝগড়া করে বউ নিয়ে চলে এসেছে। আরমান এসে রোহানের মাথায় চাটা মে’রে বলে
__“ বাইক থেকে নাম। বাইকে করে আমি আর আমার বউ যাবো!”
__“ কথায় কথায় আমার বউ, আমার বউ বলে কি তুই আমাদের লজ্জা দিচ্ছিস?”
__“ তোরা লজ্জা পাচ্ছিস?”
আর কিছু না বলে রোহান আর জাহেদ দুইজন বাইক থেকে নেমে দাঁড়ায়। আরমান একপ্রকার রোহানকে ঠেলে সরিয়ে দেয় বাইকের সামনে থেকে।
__“ ঠেলছিস কেন? ”
__“ গাড়িতে গিয়ে বস! সময় নষ্ট হচ্ছে! ”
রোহাম মুখ বাঁকা করে বলে
__“ তোকে বলতে হবে না। আমার এমনিতেই গিয়ে গাড়িতে বসব! ”
__“ তো যা!”
রোহান রাগে বোম হয়ে আছে।বউ পেয়ে ওকে আরমান পাওা দিচ্ছে না। জাহেদ হেসে বলে
__“ ভাবি কে নিয়ে কি পালিয়ে যাবে ভাইয়া?”
আরমান চশমা ঠিক করে বলে,
—“না, পালানোর দরকার নাই। বউ এখন বৈধভাবে আমারই।”
রোহান রেগে বলে,
—“আমরাও বিয়ে করে সারাদিন বউয়ের পিছন ঘুরবো দেখে নিস!”
আরমান হাসতে হাসতে বাইক স্টার্ট দেয়।
—“তোকে আমার ছোট আব্বু মেয়ে দিবে না । ”
সামনে যাত্রা শুরু হয়—একটা মিষ্টি বিশৃঙ্খলা, হাসি, উল্লাস আর মৃদু প্রেমের গন্ধে ভরা যাত্রা।জাহেদ আর রোহান এসে জিনিয়াদের গাড়িতে বসে। জাহেদ জিনিয়ার কাছ থেকে একটা চকলেট নেয়। রোহান চুপ করে বসে আছে। জিনিয়া রোহানেও একটা চকলেট দেয়।রোহান চকলেট টা নিয়ে জিনিয়া কে ধমকে বলে
__“ তুমি কি বোঝ না, আমার যে একটা বউ দরকার। তোমার বাবাকে তাড়াতাড়ি বলো তুমি আমাকে বিয়ে করতে চাও।”
এক মূহুর্ত গাড়ির ভিতরের সবাই থমকে যায় রোহানের কথায়। কিন্তু পরমূহুর্তেই সবাই উচ্চ সুরে হেসেই ফেলে। জিনিয়া বেচারি লজ্জায় লাল হয়ে যায়। জাহেদ রোহানকে বলে
__“ চিন্তা করো না ভাইয়া,বাড়ি গিয়ে আমি আব্বু কে বলবো তোমার দুঃখের কথা!”
সবাই আবার হেসে উঠে। গাড়ির ভিতর ছায়মা চকলেট খাচ্ছে আর মোবাইলে ভিডিও দেখছে।তার মন অন্য কোথাও নেই। একদম চুপ কারোর সাথে কথা বলে না। মিম হেসে বলে,
—“তুমি তো চুপ কেন ছায়মা আপু? ”
ছায়মা শান্ত কন্ঠে বলে
__“ এমনি! ”
ছায়মার চুপ হয়ে থাকা জাহির বোঝতে পারে। জাহির অনুসুচনা নিয়ে জানালার বাইরে তাকায়।সকালে মেয়ে টাকে ওই ভাবে না বললেও হতো।
গাড়ির জানালা দিয়ে রাতের চাঁদের আলো এসে ডুকে।
জারা বাইকে উঠে আরমানকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বসে আছে। আরমান জারার হাত ধরে থাকে পুরো পথ, যেন ভয়—ও এক মুহূর্তও দূরে না যায়।
জারা চুপচাপ তাকিয়ে হালকা হাসে।বুকে একরাশ প্রশান্তি, চোখে নতুন জীবনের স্বপ্ন।
আরমান ফিসফিস করে বলে,
—“দেখো, আমি বলেছিলাম, এক চুলও দূরে যেতে দেব না।”
জারা হেসে বলে,
—“আমিও আপনার থেকে দূরে যাব না স্বামীজান।”
__“ তখন তো চেলে যাচ্ছিলে!”
__“ যাই নি তো!”
__“ যাবে কি করে? আমি তো তোমাকে নিয়ে চলে এসেছি!”
__“ আই লাভ ইউ স্বামীজান! ”
__“ আই লাভ ইউ টু লক্ষী বউ! ”
আরমানের চোখে হাসি, মুখে এক চিলতে শান্তি।
হাসপাতালের ভয়, অন্ধকার, রক্ত—সব যেন অনেক দূরে ফেলে এসেছে তারা। আরমানরা প্রায় অনেক টা দূর চলে এসেছে। এখন রাত বেশি হয় নি। মাএ সাতটা। রাস্তা এখন পুরো ফাকা। দোকানপাট দেখা যাচ্ছে না আসেপাশে। জারা আরমানকে জড়িয়ে ধরে বলে
__“ স্বামীজান…ও স্বামীজান ! একটা কথা ছিলো!”
__“ বলো লক্ষী বউ! ”
__“ আমাকে বাইক চালাতে দিবে! খুব ইচ্ছে করছে!”
আরমান জারাকে সোজা না করে দেয়।
__“ তোমার হাতে ব্যথা। আগে ঠিক হোক তারপর চালাবে!”
নাছোরবান্দা জারা আরমানকে বিরক্ত করেই যাচ্ছে। জারা’র একরোখামি সহ্য করতে না পেরে রাস্তার এক পাশে বাইক থামায়। রাগ দেখিয়ে বলে
__“ বাচ্চাদের মতো করছো কেন? হাতে টান লাগলেই ব্লাড বের হবে, এখনো শুকাই নি ক্ষত! ”
জারা ঠোঁট উল্টে বলে
__“ আপনি আছেন তো সাথে! আমার কিচ্ছু হবে না। ”
আরমান চোখ কুঁচকে তাকায়,
— “বউ, এইটাকে কি বলে জানো? পাগলামি। আমি তোমাকে বাইক চালাতে দেবো না।”
জারা হেসে বলে,
— “আপনি না, আমি বলছি। আর আপনি না বললেও আমার কিছু যায় আসে না।”
আরমান গম্ভীর গলায় বলে,
— “দেখো মানজারা, তোমার হাতে এখনো ব্যথা,তোমার ব্যথা মানে আমার পুরো শরীরেই ব্যথা। কিন্তু বাইক আমি ছাড়া আর কেউ চালাবে না। বুঝলে?”
জারা চোখ সরু করে তাকায়, ঠোঁটে মুচকি হাসি,
— “তাহলে আপনি আমায় ভালোবাসেন না।”
আরমান হকচকিয়ে যায়,
— “এইটা আবার কোথাকে এলো?”
জারা নাটুকে ভঙ্গিতে বলে,
— “ভালোবাসলে তো আমার কথা রাখতেন। আমি চালাতে চাচ্ছি মানে আমি বিশ্বাস করছি আপনি সাথে আছেন। আপনি থাকলে কিছুই হবে না আমার।”
এই কথায় আরমানের বুকটা কেমন যেনো নরম হয়ে যায়। গলার ভেতর কাঁপন ধরে যায়, কিন্তু বাইরে কঠিন ভান করে বলে,
— “এইসব কথা বলে আমার উপর প্রভাব ফেলার চেষ্টা কোরো না, বুঝছো? আমি চিনি তোমাকে।”
জারা হেসে বলে,
— “চিনলে তো আজ এমন করে রাগ করতে না, স্বামীজান।”
আরমান গম্ভীর মুখে বলে,
— “এই ‘স্বামীজান’ শব্দটা বললেই আমি আর রাগ ধরে রাখতে পারি না।”
জারা এগিয়ে গিয়ে ওর মুখের সামনে মুখ এনে ফিসফিস করে,
— “তাহলে রাগ করবেন না। হেলমেট দিন, আমি চালাচ্ছি।”
আরমান চুপচাপ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে। তারপর গভীর নিঃশ্বাস ফেলে বলে,
— “ঠিক আছে, চালাও। কিন্তু হাতে ব্যথা পেলে আমি তোমায় মাথায় তুলে আছাড় দিবো, বুঝলে?”
জারা হেসে বলে,
— “আপনার মাথায় উঠা তো আমার স্বপ্ন।”
আরমানের মুখের কোণে হাসি ফুটে ওঠে,
— “তোমার এই মুখ দেখে রাগ থাকা যায় না, শয়তান বউ।”
জারা হেলমেট পরে বাইকের সামনে ওঠে। আরমান ওর পেছনে বসে, দুই হাতে জারার কোমরটা আলতো করে ধরে। জারা হালকা গলায় বলে,
— “ধরুন না শয়তাম স্বামীজান, আমি পড়ে গেলে তো আপনিই ধরবেন।”
আরমান মুখে গম্ভীর কিন্তু কণ্ঠে মায়া মেশানো,
— “তুই পড়লে আমি তোকে ধরব, কিন্তু আমি যদি পড়ে যাই?”
জারা হেসে বলে,
— “আপনি তো আমার উপর সব ভর দিয়ে বসে আছেন, আপনি পড়বেন কিভাবে?”
বাইক স্টার্ট হয়। ইঞ্জিনের আওয়াজে চারপাশের বাতাস কাঁপে। জারা ধীরে গতি বাড়ায়। আরমান ওর কানে নিচু গলায় বলে,
— “সাবধানে চালাও, বুঝছো?”
জারা বলে,
— “আপনি থাকলে আমি কখনো সাবধান থাকি না।”
আরমান হেসে বলে,
— “তাই নাকি? তাহলে আমি নামছি।”
জারা তৎক্ষণাৎ বলে,
— “না না, আপনি নামবেন না। আপনি থাকলেই আমি পরে মরে যাব।”
আরমানের বুক কেঁপে ওঠে। হঠাৎ হাতটা জারার কোমর থেকে উঠে এসে ওর কাঁধে থেমে যায়।
জারা টের পেয়ে বলে,
— “হাত রাখলেন কেন?”
আরমান মৃদু স্বরে বলে,
— “কারণ ভয় হয়। এবার তুই যদি হারিয়ে যাস, আমি বাঁচব না, সোনা।”
বাতাসে ওদের কথাগুলো মিলিয়ে যায়। বাইকটা ছুটে চলে ময়মনসিংহের দিকে—একজনের জেদে আর অন্যজনের নিঃশব্দ ভালোবাসায় মিশে থাকা এক যাত্রা শুরু হয়।
রাত তখন সাড়ে নয়টা। ময়মনসিংহে ঢোকার আগেই তারা থামল এক জনপ্রিয় জায়গায় — “চিনিকল মোড়ের ফুড কর্নার”। জায়গাটা যেনো জীবন্ত শহরের স্পন্দন; চারপাশে রঙিন আলো, হালকা ধোঁয়ায় ভাসছে চিকেন গ্রিলের গন্ধ, মানুষজনের হাসি, বাচ্চাদের চিৎকার, মোটরসাইকেলের শব্দ— সব মিলিয়ে এক প্রাণচঞ্চল পরিবেশ।
জারা বাইক থেকে নামতেই চোখ বড় বড় করে চারপাশ দেখতে থাকে। আরমান জারাকে বেশি সময় বাইক চালাতে দেয় নি। মাজ পথে আরমান বাইক চালিয়ে এসেছে।
জারা আশপাশের ভিউ দেখে হা করে তাকিয়ে থাকে
— “এই জায়গাটা তো দারুন! এত মানুষের ভিড়, তবুও কেমন যেনো সুন্দর লাগছে স্বামীজান।”
আরমান হেসে বলে,
— “তুমি তো সব সময় শান্ত জায়গা পছন্দ করো বউ। আজ কোলাহল ভালো লাগছে?”
জারা মুচকি হেসে বলে,
— “শান্তিতে একা থাকতে চাই না, আজ শুধু তোমার সাথে থাকতে চাই।”
এই উত্তর শুনে আরমানের ঠোঁটে অজান্তে হাসি ফোটে।
__“ তুমি বললে?”
জারা লজ্জা পেয়ে যায়। কি বলে ফেলেছে সে।আরমান কিছু বলে না আর জারাকে। আরমান বোঝতে পারে এই শব্দ টা মুখ ফসকে বের হয়ে গেছে ওর। ওরা একটা সুন্দর ছোট্ট রেস্টুরেন্টে ঢোকে — “রিভারভিউ ডাইনার”। কাচের জানালা দিয়ে ব্রহ্মপুত্র নদ দেখা যায়, আলো ঝলমলে টেবিল, সামনে ঝুলছে নরম লাল লাইট। ভেতরে বেশ ভিড়, কিন্তু দুজনের জন্য কোণের একটা টেবিল পেয়ে যায় তারা।
ওয়েটার মেনু এনে দেয়। আরমান বলে,
__ “কী খাবে বউ?”
জারা মেনু দেখে বলে,
__ “চিকেন ফ্রাইড রাইস, আর আপনার জন্য হাফ গ্রিল, কেমন?”
— “তুমি ঠিক যেমন বলবে, তেমনই হবে বউ!” বলে আরমান, চোখ এখনো জারার মুখে।
অল্পক্ষণ পর গরম ধোঁয়া ওঠা খাবার আসে। জারা প্রথম চামচটা তুলে আরমানের মুখের সামনে ধরে,
— “খান, আমি খাইয়ে দিচ্ছি।”
আরমান একটু অবাক, তারপর হেসে বলে,
— “বউ তুমি কি আজ আদর করতে শিখে গেছো নাকি?”
জারা হালকা রাগী মুখে বলে,
— “না, শুধু আজ একটু ভালো লাগছে।”
দু’জনেই হাসে। চারপাশের ভিড়, হৈচৈ, গানের শব্দ—তাদের কারও কিছুই বিরক্ত করছে না।
এই ভিড়ের মাঝেও যেনো এক অদ্ভুত শান্তি নেমে এসেছে ওদের দু’জনের মাঝে।
খাওয়ার পর চা আসে। জারা গ্লাসে চুমুক দিতে দিতে বলে,
— “দেখোন না, এত মানুষ, এত আওয়াজ— তবু আমার মনে হচ্ছে শুধু আমরা আছি।”
আরমান ওর দিকে তাকিয়ে নরম স্বরে বলে,
— “কারণ তুমি থাকলে বাকিদের আমার কাছে তুচ্ছ মনে হয় বউ।”
জারা চোখ নামিয়ে হালকা লজ্জা পায়।
বাইরের রাস্তায় তখনো ভিড়, কিন্তু রেস্টুরেন্টের কোণে বসা দুজন মানুষ যেনো পৃথিবীর সব কোলাহল থেকে আলাদা।একটা উষ্ণ চায়ের ধোঁয়া, একটুখানি ভালোবাসা, আর একসাথে থাকার নিঃশব্দ প্রতিশ্রুতি।
খাওয়া শেষ করে রেস্টুরেন্ট থেকে বেরিয়ে এল তারা। রাত প্রায় দশটা ছুঁইছুঁই — রাস্তার বাতিগুলো হালকা হলুদ আভা ছড়িয়ে দিচ্ছে, আশেপাশে এখনো মানুষের কোলাহল, গাড়ির শব্দ, আর দোকানগুলোর শেষ সময়ের ব্যস্ততা।
আরমান বাইকের পাশে দাঁড়িয়ে জারাকে হেলমেটটা দেয়,
— “চলো, এখনই রওনা হতে হবে।”
জারা হেলমেট হাতে নিয়ে একটু হেসে। আরমান বলে,
— “এক মিনিট, আমি ওদিক থেকে এক বোতল পানি নিয়ে আসি।”
— “ঠিক আছে, তাড়াতাড়ি আসবেন,” বলে জারা বাইকের পাশে দাঁড়িয়ে ফোনে কিছু দেখতে থাকে।
আরমান পাশের দোকানে গিয়ে পানি নিচ্ছে।
তখনই এক অপরিচিত লোক— গায়ের রঙ কালচে, চোখে সস্তা সানগ্লাস ঝুলছে, আর মুখে এক ধরণের বিকৃত হাসি— জারার দিকে তাকিয়ে থাকে। চোখের দৃষ্টি এমন অশোভন, যেনো ওর শরীর ভেদ করে যাচ্ছে।
জারা অস্বস্তিতে পড়ে,কিন্তু বুঝতে পারে লোকটা এখনো তাকিয়ে আছে— এক চিলতে হাসি নিয়ে, যেনো চ্যালেঞ্জ দিচ্ছে।
রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৬১ (২)
ঠিক সেই মুহূর্তে আরমানের দৃষ্টি পড়ে লোকটার দিকে। সে অন্য একটা দোকানে যায়, জারা’র একটা জিনিস কিনতে, তাই একটু লেট হয়ে যায়। কিন্তু এসে এমনটা দেখে মাথায় রক্ত উঠে যায়।
মাত্র কয়েক সেকেন্ডের জন্যও ওর চোখ অন্যদিকে যায় না। চোখের দৃষ্টি মুহূর্তেই কেমন যেনো বদলে যায়— ঠান্ডা, ভয়ংকর, আগুনের মতো তীব্র।
