রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৬৯
সোহানা ইসলাম
রাতের শেষ প্রহর। বেলকনির আলোর নিচে জড়ানো দু’টি মানুষ ধীরে ধীরে নিঃশব্দে রুমে ফিরে আসে। জারার হাত শক্ত করে ধরে রাখে আরমানকে—যেন রাতে তার বাঁধন আলগা হলে ভোর তাকে কেড়ে নেবে। রুমের ভেতরটা অল্প আলোয় ডুবছে, আরমান জারার কপালে হাত রেখে বলে,
__“একটু ঘুমাও…ভালো লাগবে।”
জারা ক্লান্ত, তবুও তার মুখে ছোট্ট হাসি। বেডে শুইতেই আরমান তার মাথার কাছে হাত রাখে, চুলগুলো আলতো ছুঁয়ে দেয়। জারা চোখ বন্ধ করে। আরমানের নিঃশ্বাস ধীরে ধীরে তার কাছে নেমে আসে… আর রাতটা শান্ত হয়ে যায়।
পাখির ডাক, দূরে আজানের সুর। হালকা নরম আলো পর্দার পাশে জমা হয়। ঠিক সকাল ছরটার একটু আগে জারার চোখ খুলে যায়। মাথায় ব্যথা, চোখ লাল, মুখে ক্লান্তির ছাপ—এমন যেন রাতটা ঘুমের বদলে আবেগে কেটেছে।
আরমান জাগেনি এখনও। কিন্তু জারা নড়তেই সে চোখ খুলে তাকায়, একটু হেসে বলে,
__“মাথা ব্যথা করছে?”
জারা গজগজ করে মাথা নেড়ে ‘হ্যাঁ’ বলে।
আরমান হাত বাড়িয়ে তাকে বুকে টেনে আনে। আঙুল দিয়ে কপালের পাশে ছোট্ট ঘষা দেয়,
__“একটু থাকো… ঠিক হয়ে যাবে।”
জারা ফিসফিস করে বলে,
__“আজ তো আমাদের বিয়ে উঠতে হবে..বেশি সকাল হলে কেউ দেখে ফেলবে।”
আরমান মৃদু হাসে।
__“দেখুক! বউ তার স্বামীজানের সাথে ছিলো। তাই তো আগে তোমাকে ঠিক রাখতে হবে।”
জারা লাজুক হয়ে মাথা নিচু করে।আরমান আবার বলে,
__“গতরাতে বেশি কষ্ট হয়েছে?”
জারা লজ্জায় চাদর টেনে নেয়।আরমান হাসে, কপালে চুমু দিয়ে বলে,
__“যত কষ্ট হয়েছে… তার দ্বিগুণ আদর দেবো। চিন্তা নেই।”
জারা আরমানের বুকে ঠেসে ধরে। কিছুক্ষণ পর দুজনই উঠে পড়ে। ফ্রেশ হয়ে নিলে আরমান জারাকে নিজের কোলে করে নিয়ে যায় জারার রুমের দরজা পর্যন্ত। সেখানে এসে থেমে নরম গলায় বলে,
__“যদি কোনো কিছু লাগে ডাকবে… তোমার স্বামীজান হাজির হয়ে যাবে ।”
জারা লজ্জা লুকিয়ে মাথা নেড়ে রুমের দিকে চলে যায়।
খান ম্যানশনে আজ যেন উৎসবের ঢেউ। সকাল থেকেই পুরো বাড়ি যেন নতুন আলোয় ভরে গেছে।
আজ তিন তিনটি বিয়ে—আরমান-জারা, জাহেদ-ফিহা, রোহান-জিনিয়া।আরিফ খান আর আসিফ খান ভোর থেকেই ব্যস্ত, বাড়ির ভেতর-বাইরে তদারকি চলছে।
জারা নিজের রুমে ঢুকতেই দেখে মেয়েদের হুলস্থুল।
ছায়মা চুলে কার্ল দিচ্ছে। জেরিন মেকআপের ড্রয়ার উল্টো-পাল্টা করছে। ফিহা শান্ত, কিন্তু চোখে নার্ভাস ভাব। মিম তাদের তিনজনকেই সামলাতে সামলাতে নিজের চুল ধরে টানছে।তাদের সামলানোর সব দায়িত্ব তার কাঁধে।ফারিয়া বেগম আর জেসমিন বেগম এসে বলেন যান সবাই গোসল করে নিতে।একটু পর পার্লারের লোক আসবে।
পার্লারের আন্টিরা এসে পুরো রুম জুড়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। তিন কনের বিয়ের পোশাক, গহনা সাজসজ্জার জিনিস—সব সাজানো।
জারা আয়নার সামনে বসতেই মিম দৌড়ে এসে বলে,
__“জানি কিছু খেয়ে নে ? মুখ শুকনায়া আছে।”
জারা লাজুক হাসি দেয়। চোখে ক্লান্তি, কিন্তু ভেতরে আনন্দের ঝিলিক। ফিহা জারার পাশে বসে ছোট্ট করে ফিসফিস করে বলে,
__“জানু,ভয় লাগতেছে…”
জারা তার হাত ধরে আশ্বস্ত করে।
__“আমরা আছি… কিছু হবে না।”
ছোট মেয়েরা—জেরিন আর জোহান—উত্তেজনায় ছুটোছুটি করছে। জোহান বার বার জারা’র হাতে ফুল এনে দিচ্ছে। জেরিনের গালে লিপস্টিক ঠেসে গোল টিপ বানিয়েছে জোহান। দেখে সবাই হেসে লুটোপুটি।
পার্লারের আপারা তিন বউকে একে একে সাজাতে শুরু করে। গোল্ডেন-বেইজ লাল লেহেঙ্গা, গলার ভারী সেট, নাকে নথ, কপালে টিপ—পুরো রুমটি গন্ধে আর আলোয় ভরে যায়। জিনিয়াদের কাজিনরা সবাই সবার মতো করে ব্যস্ত। মেয়েদের রেডি হতে সময় বেশি লাগে।তাই এগারো টা থেকে তৈরি হওয়া শুরু করে।
কিছুক্ষণ পর রুমে ঢোকে ফারিয়া বেগম।জারা দেখে তার চোখে পানি ঝিলমিল করছে।
__“কি হলো আম্মু?” জারা জিজ্ঞেস করলে ফারিয়া বেগম বলেন,
__“তোদের তিনজনকে এভাবে সাজতে দেখে মনে হয় আমার ছোট মেয়েরে বিয়ে দিছি।”
হাসি-আবেগ মিলেমিশে পুরো রুমে এক অদ্ভুত মায়াময় পরিবেশ তৈরি হয়।মারজিয়া বেগম মেয়ের কাছে বসে আছেন। জারা সাজের ফাঁকে ফাঁকে ওর মায়ের দিকে তাকাচ্ছে। মায়ের মুখ দেখে মনে হচ্ছে মনে মনে খুব কষ্ট লুকিয়ে রেখে।একমাএ মেয়ের বিয়ে তাও আবার এতো দূরে। এতো সহজে আর দেখা হবে না।
সময় গড়িয়ে এখন দুপুর বারোটার কাছাকাছি।
আরমান,জাহেদ,রোহান,জাহির আর রাশেদ
এসে বির করে আরমানের রুমে। আরমান শুয়ে আছে। রোহান আর জাহেদ এর সাজগোছ দেখছে শুয়ে। রাশেদ স্যারের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। আরমানের অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে বিয়ে না করলেও চলেবে। জাহির প্রতি বারের মতো মোবাইলে ব্যস্ত।কিছু একটা নিয়ে খুব গবেষণা করছে সে কিছু দিন ধরে। তার মন পরে আছে অন্য দিকে। এসব তৈরি হওয়ার দিকে মন নেই।
জাহেদ নিজের শেরওয়ানি নিয়ে আটবার আয়নায় চেক করছে। রোহান মেকি রাগে বলে,
__“তুই মনে হয় নিজের ছায়াকেও দেখে প্রেমে পড়ে যাবি।”
রোহান চুপচাপ শেরওয়ানি বোতাম লাগাচ্ছিলো, হঠাৎ তার চাঁদ সুন্দরী রুম থেকে বের হওয়া মনে পড়ে গিয়ে বুকটা ধক করে ওঠে। রাশেদ তাকে টিজ করে বলল,
__“আজকে কাউরে কাড়াকাড়ি করে আনবা নাকি?”
রোহান কপাল কুঁচকে বলে,
__“চুপ থাক।”
রাশেদ আরমানকে বলে
__“ স্যার আপনি রেডি হবেন না? ”
আরমান শরীরের ভালো করে চাদর টেনে বলে
__“ রেডি হয়ে কি করব? ”
__“ কেনো স্যার বিয়ে করবেন! ”
__“বিয়ে করে কি করব? ”
রোহান এবার বলে
__“বিয়ে করে ইটিস পিটিস করবি বউয়ের সাথে! ”
আরমান বাঁকা হেসে বলে
__“ অলরেডি তিনবার ইটিস পিটিস করা শেষ! ”
আরমানের কথা কর্নপাত হতেই জাহিরের হাত থেকে মোবাইল ঠাস করে পরে যায়। রাশেদ হা করে তাকিয়ে থাকে আরমানের দিকে। জাহেদের হাত থেকে শেরওয়ানি পরে যায়। রোহানের মাথায় হাত। একি শুনছে সে। এসব আকাম কবে করলো? আর তারা কিছু জানতে পারলো না। জাহির আর বসলো না এখানে, চুপ করে রুম থেকে বের হয়ে যায়। রোহান দৌড়ে এসে আরমানের পর বসে গলা টিপে ধরে বলে
__“শালা এসব কবে করলি? তাও আবার তিনবার? আর আমার এখনো বিয়ে করতে পারলাম না? ”
রাশেদ বলে
__“আমি মনে করতাম আমার স্যার ভালো মানুষ, কিন্তু সেই স্যার বিয়ের আগে তিনবার..? ”
আরমান বিরক্তিকর ভাব নিয়ে রোহান কে নিজের উপর থেকে সরায়। বেডে হেলান দিয়ে বসে। চোখ মুখ কুঁচকে বলে
__“ আমি মেডেল প্রাপ্ত ভালো মানুষ। তাই তিন বার করেছি আর যদি খারাপ হতাম তাহলে…! ,
আরমান আর কিছু বলে না। জাহেদ শেরওয়ানি তুলে আরমানের পাশে বসে। নিচু কন্ঠে বলে
__“ভাইয়া ফিলিং কেম..!”
কথা শেষ করার আগেই আরমান জাহেদ কে ঠাটিয়ে চড় বসিয়ে দেয়। জাহেদ গালে হাত দিয়ে বোকার মতো চেয়ে থাকে।রাশেদ হেসে বিছানায় শুয়ে পরে। রোহানও মুখ টিপে হাসে। রাশেদ হাসতে হাসতে বলে
__“আমি বিয়ের দিন চড় খেয়ে ছিলাম বলে কতো মজা নিলেন, এখন নিজেও..!” বলে আবার হাসতে থাকে। রোহান তো মুখের ভাষা হারিয়ে ফেলেছে। কি করা উচিত তার, কি বলার উচিত? রোহান আরমানের দিকে আঙুল তাক করে বলে
__“এসব কবে করলি?কীভাবে করলি?আমাদের বললি না কেন?”
আরমান রোহানকে একটা চড় বসিয়ে দেয়। অতিরিক্ত বিরক্ত হচ্ছে তাদের প্রশ্নে।
__“আমাদের স্বামী স্ত্রীর প্রাইভেট বিষয় তোদের বলতে হবে?”
__“ না বলে লাইভ টেলিকাস্ট দেখালেও মন্দ
হয় না। ” বলে রাশেদের উপর পরে যায় হাসতে হাসতে। আরমান রোহানের দিকে বালিশ ছুড়ে মারে। তারপর বেড থেকে মেনে ওয়াশরুমে যাওয়ার সময় বলে
__“ তাহলে আমার বোনকে তোর হাতে তুলে না দিলেও মন্দ হয় না? ”
সঙ্গে সঙ্গে রোহানের মুখ চুপসে যায়। তিন জন বেডের উপর বসে আছে। গভীর ভাবে চিন্তা করছে। এসব কবে করলো এই হারামজাদা?
আরমান ফ্রেশ হয়ে নিজর চুল মুছতে মুছতে অন্যদের আচরণ দেখে হালকা মুচকি হাসে। তার চোখে আজ এক অদ্ভুত শান্তি—আজ তার বউয়ের বিয়ে… আবার তার নিজেরও।
রোহান আর জাহেদ আর এসে আয়নার সামনে দাড়িয়ে তৈরি হতে ব্যস্ত হয়। আরমান ভিন্ন। সুন্দর করে একটা কালো পাঞ্জাবি পরে মাথায় টুপি পরে নেয়। রোহান আর জাহেদ দুইজন আরমানের দিকে তাকিয়ে আছে। এই ছেলে এই ভাবে বিয়ে করবে? রাশেদ নিচে গেছে। রোহান আর জাহেদ একেবারে জামাই সেজে রেডি।এখন শুধু ডাক আসলে বিয়ে করতে দৌড়ে চলে যাবে। এমন সময় আরিফ খান এসে রোহান আর জাহেদ কে দেখে রেগেমেগে বলেন,
__“এইভাবে সং সেজে বসে আছিস কেনো ভরদুপুর বেলা ?”
রোহান বলে
__“ সং কোথায়? জামাই সেজেছি! ”
আসিফ খান আরও রেগে যান।
__“ আজ শুক্রবার, জুম্মার নামাজ না পরে জামাই সেজে বসে আছে গরুর দল কোথাকার।”
রোহান মুখ বাঁকা করে। মনে মনে শশুড়ের গুষ্টি শুদ্ধো করে। এই জন্মে শশুড়ের কাছ থেকে একটু সম্মান সে পাবে বলে মনে হয় না।
আসিফ খান আরমানের দিকে তাকিয়ে বলেন
__“আরমান এই দুই গরুকে তোর সাথে নিয়ে আয়। এদের আল্লাহ মাথায় ব্রেইন দিয়েছে কি না সন্দেহ? ”
জাহেদ মন খারাপ করে বলে
__“আব্বু আজ আমাদের বিয়ে, তুমি এইভাবে বলতে পারো না? ”
আসিফ খান আরও কিছু বলার আগেই আরমান বলে
__“ছোট আব্বু তুমি যাও! আমি ওদের নিয়ে আসচ্ছি!”
তিনি নিচে চলে যান। কিছুক্ষন পর আরমানরাও নিচে নামে। সব পুরুষ রা নামাজের জন্য মসজিদে চলে যায়।
নিচতলায় জেসমিন বেগম, ফারিয়া বেগম, মারজিয়া বেগম—সবাই তুফান তুলেছে ব্যস্ততায়। মিষ্টি এসেছে কিনা। গহনা ঠিকমতো পৌঁছেছে কিনা। ব্রাইডাল দাওয়াতের জিনিস সাজানো হয়েছে কিনা—সব কিছুই তারা নিজ হাতে দেখে।
মাঝে মাঝে এসে মেয়েদের দেখে আবেগে চোখ মুছে।
মাঝে আবার রাগ করে বলে
—“চুপচাপ বসে থাকো! নড়াচড়া করলে চুল নষ্ট হবে!”
ছোটদের চিল্লাচিল্লি,রান্নাঘরের হাঁড়ি-পাতিলের শব্দ
কাজের মেয়েদের আসা-যাওয়াপুরো বাড়ি যেন কেয়ামতের মতো ব্যস্ত।
জারা সমস্ত সাজগোজ করতে করতে মাঝে মাঝে আয়নায় আরমানের কথাগুলো মনে পড়ে।তার গাল লাল হয়ে যায়।চোখে একটা শান্তি—একটা অদ্ভুত পরিপূর্ণতা।
ফিহা নিজের লেহেঙ্গার পাড় ঠিক করতে করতে বারবার জাহেদের কথা ভাবে।আজকের ঝগড়াগুলোর মাঝেও সে জানে—এই ছেলেটাই তার আপন মানুষ।
জিনিয়া গোপনে রোহানের মেসেজ পড়ে লজ্জায় গাল চেপে ধরে।“মিসেস রোহান”—ভাবতেই বুক কেঁপে ওঠে। মিম আর ছায়মা এই তিন কনের সব কিছু দেখবাল করতে করতে নিজেরাই সাজগোছ কমপ্লিট করতে পারেনি। জিনিয়ার মামার বাড়ির কাজিনরা সবাই এই ঘরে জায়গা পাচ্ছে না বলে অন্য রুম চলে গেছে।পাঁচজন বিউটি সিয়ান ও সামলে উটতে পারছে না। ছায়মা মিমকে বলে নিজের রুমে চলে আসে সাজগোছ করতে। মিম এখনো সকালের পোশাকে ওদের সাথে বসে আছে।
জেসমিন বেগম কিছু নাস্তা নিয়ে আসেন বিউটি সিয়ানদের জন্য। এসে দেকেন মিম এখনো রেডি হয় নি। নাক ফুলিয়ে মিমের দিকে তাকান তিনি। কড়া একটা ধমক দেয় বলেন
__“এই মেয়ে বেশি বড় হয়ে গেছিস? ”
মিম ভয় পেয়ে যায়। সাথে রুমের সবাই।
__“ মা মানে ছোট আম্মু? ”
__“কি মানে, কখন বলা হয়েছে রেডি হওয়ার কথা? আর তুই এখনো সকালের পোশাকে বসে আছিস?”
মিম মাথা নিচু করে বলে
__“আসলে ওরা নার্ভাস, তাই আমি বসে আছি!”
__“ বসে থাকতে হবে না। তুই যা গিয়ে সুন্দর করে পীরর মতো সেজেগুজে নে!”
মিম আলতো করে হাসি দিয়ে রুম থেকে বের হয়ে আসে। সোজা নিজের রুমে চলে যায়। আলমারি থেকে রাশেদের আনা পার্পেল কালারের শাড়ি টা বের করে। শাড়ীতে স্টোনের সুন্দর কাজ করা। মিম শাড়ী টা মাথায় দিয়ে আয়নার সামনে দাড়ায়। লজ্জা লাল হয়ে যায় সে। শাড়ী টা বেডে রেখে ওয়াশরুমে চলে যায়।
বিকেল চারটার দিকেই পুরো খান ম্যানশন আলোকিত হয়ে ওঠে। বাইরে ম্যান্ডপ বানানোর কাজ শেষ।ভেতর থেকে সুরভিত ফুলের গন্ধ আসছে সাজানো ডায়াসে মা-বাবা ছবি তুলছেন।বাচ্চারা দৌড়াচ্ছে।সাউন্ড বক্সে বাজছে হালকা বিয়ের গান। মারজিয়া বেগম, ফারিয়া বেগম আর জেসমিন বেগম
হাঁ করে সাজ দেখে বলছে—“আজ যেন রাজকন্যার তিন বিয়ে।” তারা তিনজন তিন মেয়েকে নজর টিপ লাগিয়ে দেন নাকের পিছনে। তিনজনের মুখে এক মায়া বরা হাসি।
জারা ওর মায়ের সাথে বসে কথা বলছে।মুখে হাসি। চোখ ঝলমলে হয়ে আছে তার। এমন সময় টুং করে মোবাইলে মেসেজের শব্দ হয়। শব্দ শুনেই মুখের লাজুক হাসি। সে যানে কে দিয়েছে। তার পাগল স্বামীজান। মেসেজ চেক করে।
_“সকালের পর একবারও দেখা দিলে না পাষাণ বউ আমার, এখনো একটা পিক দিয়ে তোমার এই পাগল স্বামীজানকে শান্ত করতে পারো না? ”
জারা উওর দেয় না। জিনিয়ার একজন কাজিন কে বলে পিক তুলে দিয়ে। জারা সুন্দর করে কিছু পিক তুলে সেন্ট করে দেয় আরমান কে। সাথে লিখে
__“ লাগছি তো আপনার লক্ষী বউয়ের মতো?”
আরমানের উওর আসে
__“রাতে বলবো, এখন বললে মঝা থাকবে না। ”
জারা লজ্জা পায়। চোখ তুলে আশে পাশে দেখে কেউ ওর দিকে তাকিয়ে আছে কি না? কিন্তু অবাক করার বিষয় হলো ওর মা সহ ঘরের প্রতি টা মানুষ ওর দিকে তাকিয়ে আছে। সবার ঠোঁটে দুষ্টু হাসি। জারা যেনো আরও বেশি লজ্জা পেয়ে। তিনজন মা তিন কনে কে নিয়ে নিচে নেমে আসেন।
তিন বউ—জারা, ফিহা, জিনিয়া—তাদের সিঁড়ির মাথায় নিয়ে আসতেই নিচতলা যেন একসাথে নিশ্বাস বন্ধ করে তাকিয়ে থাকে। গোল্ডেন আলোয় তিনজনকে আজ যেন রাজকন্যার মতো লাগছে। সবার চোখে বিস্ময়, প্রশংসা আর ভালোবাসার ঝিলিক।
খালাম্মা, ফুপ্পি, মামি, দাদু, নানু, কাজিন—সবাই একসাথে বলে ওঠে,“বাহ… তিনজনকেই কি চমৎকার লাগছে!”মনে হচ্ছে ছবির মতো বউ!“জারা তো একেবারে রানিমা!”
ফারিয়া বেগম এগিয়ে এসে নরম হাসিতে বলেন,
__“চলো মা, তিনজন একসাথে এই বড় সোফায় বসো।”
বড় গোলাপি কুশনে সাজানো সোফাটিতে তিন বউ পাশাপাশি বসে। তাদের সামনে আরেকটা খালি সোফা রাখা হয়েছে। মাঝখানে টানানো সাদা পাতলা পর্দা—যেন বউদের আড়াল করে রাখা এক নার্ভাস উত্তেজনার দেয়াল। বউরা বসতেই চারপাশে তাকিয়ে আবার কানাঘুষো শুরু হয়—“আহা, তিনজনের হাসি দেখো!“আজকে আমাদের পুরো খান বাড়িটা আলোকিত।”
উপরে বরদের রুমে অন্য রকম ব্যস্ততা। জাহির সবার সব কিছু ঠিক করছে, রাশেদ জাহেদের শেরওয়ানির বোতাম আটকাচ্ছে। আরমান আয়নায় চুলে হাত বুলাতে বুলাতে নিচের শব্দ শুনে হাসে।
জাহির বলে,
__“চলেন এবার আর সাজতে হবে না!”
রাশেদ মজা করে বলে,
__“আপনাদের জন্য আপনাদের তিন রানীরা অপেক্ষা করছে!”
তিন বর—আরমান, জাহেদ, রোহান—গম্ভীর ভঙ্গিতে দাঁড়িয়েছে, কিন্তু তাদের চোখে উত্তেজনা চাপা নেই।
তিনজনকে এগিয়ে নিয়ে যায় জাহির আর রাশেদ।
সিঁড়ির মুখে পৌঁছাতেই হঠাৎ সবাই থমকে যায়।
মিম, ছায়মা, জেরিন,,রিমন, জোহান আর সানি আরও পাঁচ-ছয়জন কাজিন মিলে সিঁড়ির ওপর গোলাপি ফিতা টেনে দাঁড়িয়ে আছে।দেরাজ থেকে বের করা ফিতা দিয়ে সিঁড়িকে পুরোপুরি আটকে দিয়েছে। জাহেদ চোখ গোল করে বলে,
__“এটা আবার কী হলো?”
মিম হাত কোমরে রেখে বলে,
__“কেন? দেখতে পাচ্ছেন না ভাইয়া? এইটা হলো সিঁড়ি গেট বরণ।”
রোহান কপাল চাপড়ে বলে,
__“মানুষ গেট আটকায়, আর তোমরা সিঁড়ি আটকাইছো?”
ড্রইংরুমে উপস্থিত সবাই হেসে ফেলে।বয়স্কারা আনন্দে মাথা নাড়েন—এমন পাগলামি অনেক দিন দেখা যায় না।জাহির একবার তাকায়, দেখে সানি একেবারে ছায়মার গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে। চোয়াল শক্ত হয়ে যায়। কিন্তু নিজেকে দমিয়ে রাখে। নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ করে। তাকে দূর্বল হলে চলবে না। যে তার আয়ওের বাইরে তার কি হাত বাড়ানো ঠিক না। কাল কতো কষ্ট হয়েছে নিজেকে বোঝাতে। না ঘুমিয়ে রাত পার করেছে সে।
ছায়মা বলে,
__“আমার সরল কথা—তোমরা গেট দিয়ে ঢুকলে গেট আটকাতাম। যেহেতু সিঁড়ি দিয়ে নামতেছো, তাই সিঁড়ি আটকাইছি।”
ছায়মা তাকায় জাহিরের দিকে। জাহিরের দৃষ্টি নিচু। ছায়মা কে নিয়ে বা এখানের কোনো কিছু নিয়ে তার মাথা ব্যথা নেই। ছায়মা সানির এমন ঘেঁষে থাকা ভাবে দেখে মিমের সাথে আরও লেগে দাঁড়ায়।এই ছেলের এমন হাবভাব তার ভালো লাগে না। যদিও সে রিমনকে সানির বিষয়ে বলেছে। রিমন বলেছে অনুষ্ঠানের পর দেখবে।
জোহান পিছন থেকে এসে দুই হাত কোমরে দিয়ে গম্ভীর গলায় বলে,
__“হিংসুটে ভাইয়া, তুমি আমার ভালোবাসা কেড়ে নিলা, এখন টাকা দাও ফটাফট!”
এই পাকা ছেলের কথা শুনে চারদিকে হাহাহা হাসির রোল পড়ে যায়।আরমান এগিয়ে এসে জোহানকে দেখে বলে,
__“আয়, শালাবাবু, এত রাগ?”
সে হাত বাড়াতেই জোহান গলা ফুলিয়ে করে রাখে।
আরমান হেসে তাকে পা থেকে তুলে নিজের কোলে নেয়।
তার গাল চেপে ধরে বলে,
__“এখনো রাগ কমেনি নাকি?”
জোহান রাগী মুখে বলে,
__“কমবে যদি পাঁচ লাখ টাকা দাও।”
আরমান হাসে,
__“তুই পাঁচ লাখ টাকা গুনতে জানিস?”
জোহান ঘাড় উঁচু করে বলে,
__“দিয়া দেখেন, পারি কি না!”
সবাই আবার হেসে ওঠে। রাশেদ meanwhile একা একা মেয়েদের সাথে তর্ক করে যাচ্ছে
—“এই ফিতা খুলো, নিচে সবাই অপেক্ষা করছে!”
কিন্তু মেয়েরা তাকে পাত্তাই দিচ্ছে না। জাহির চুপচাপ দাঁড়িয়ে শুধু হাসছে। আজ সে যেন অন্য কোথাও মন দিয়ে আছে। জেরিন পাশ থেকে বলে ওঠে,
__“রোহান দুলাভাই আজ তোমাকে খুব স্মার্ট লাগছে।”
রোহান লজ্জায় অন্যদিকে তাকায়। তারপর থুতনিতে হাত ঘষে বলে
__“ শালিকা!তিন ঘন্টা ধরে নিজেকে তৈরি করেছি, স্মার্ট না লেগে কই যাবে?”
এদিকে মেয়ের টাকা ছাড়া তাদের সিড়ি থেকে নামতে দিবে না। রাশেদ জাহির কে খুচা দেয়। তাকে সার্পোট করার জন্য। কিন্তু জাহির চুপ। রাশেদ একাই রেগে বলে,__“অরে! আমারে সাহায্য করো!”
কিন্তু কেউই পাত্তা দিচ্ছে না।শেষমেশ আরমান নিজের পকেট থেকে একটা বড় বান্ডেল বের করে এগিয়ে দেয়।প্রায় এক লাখ টাকা।
মেয়েরা দেখে খুশি হয় ঠিকই, কিন্তু ছাড়তেই নারাজ।
তর্ক ধরে,
__“আরও লাগবে! তিন বর, তিন বউ, তিন কষ্ট—তাই তিন লাখ চাই।”
রোহান বিরক্ত হয়ে পকেট থেকে আরেকটা বান্ডেল বের করে মিমের হাতে ঠেলে দেয়।
__“এই নাও, নাটক শেষ। এখন নামতে দাও। বউকে দেখব!”
মেয়েরা হাসতে হাসতে অবশেষে ফিতা কাটে।
সিঁড়ি মুক্ত।বররা নিচে নামে। সবাই হাততালি দিয়ে অভ্যর্থনা জানায়।তিন বর এসে তিনজন তিনভাবে সোফায় বসে। মাঝে সাদা পর্দা—অন্য পাশে তিন বউ।
আরমান পর্দার কাছে একটু ঝুঁকে তাকায়।আবছা জারা’র অবয়ব দেখা যায়।দূর থেকেই তার হৃদয় ধক করে ওঠে—আজ জারা তার জীবনের সঙ্গী।
রোহান গম্ভীর ভঙ্গিতে বলে,
__“এই পর্দা কেন? সারাদিন আমার চাঁদ সুন্দরীকে দেখি নাই, এখন আবার পর্দা?”
ড্রইংরুমে আবার হাসির শব্দ।রোহান আবার বলে,
__“শাশুড় আব্বা, আপনি এসব করেছেন তাই না? কুটনামি কমে না! ”
আসিফ খান বিস্মিত চোখে তাকান।
__“এই ছেলে বিয়ের দিনও মাথা ঠিক নাই। ফাজিল ছেলে।”
রোহানের বাবা পাশ থেকে হাসতে হাসতে বলেন,
__“আমার ছেলের পাগলামি গুলো সহ্য করে নিবেন ভাই সাহেব ।”আসিফ খান মুখে কঠিন ভাব আনলেও ভেতরে হাসি চাপেন।
__“ সহ্য করছি বলেই তো মেয়ে দিচ্ছি! ”দুইজনেই হাসেন।
ঘরে নীরবতা নেমে আসে।কাজি সাহেব কলম হাতে নিয়ে বসেন।প্রথমে লেখা হয়—জাহেদ ও ফিহা
তারপর রোহান ও জিনিয়া দুটোরই কাবিননামা দ্রুত শেষ হয়।এবার আসে আরমান ও জারা-র পালা।
কাজি জিজ্ঞেস করে,
__“কাবিননামায় কতো টাকা লিখবো?”
আরিফ খান গর্বিত গলায় বলেন,
__“পাঁচ কোটি লিখবেন।”
পুরো ঘরে ফিসফাস।ঠিক তখনই আরমান উঠে দাঁড়িয়ে বলে,
_“এক মিনিট।”
সবাই তাকায়।আরমান শান্ত গলায় বলে
—“আমি কাবিন নামায় টাকার অঙ্ক বেশি লেখি বউ কিনতে চাই না। যদিও কাবিন নামায় মেয়েদের হোক। কিন্তু বউ হলো সম্মান, ভালোবাসা, ইজ্জতের জায়গা।আমার লক্ষী বউ আমার রানী সাহেবা। তাকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত রানীর মতো রাখব ওয়াদা করছি। ”
ঘর নিস্তব্ধ হয়ে যায়।আরমান আবার বলে,
__“কাবিননামায় কতো টাকা লিখা হবে—তা আমার লক্ষ্মী বউ-ই ঠিক করবে।”
জারা’র চোখ ভিজে ওঠে।সব নারীর চোখেও জল।
ফারিয়া বেগম নরম গলায় জারাকে বলে,
__“বল মা, তুই কতো টাকা চাস?”
জারা চোখের পানি মুছে হেসে বলে,
__“কাবিননামায় শুধু আমার নাম আর আমার স্বামীজানের নাম লিখে দিন… এটাই আমার জন্য যথেষ্ট। আমার আর কোনো অর্থের দরকার নেই।”
আবেগে পুরো ঘর থমকে যায়।আরিফ খান চোখ মুছেন।
__“এমন বউ কে পেয়ে আমার ছেল আসলেই ভাগ্যবান।”
আনিছুর রহমান আরিফ খানের কাঁধের হাত রেখে বলেন
__“ আমার মেয়েও ভাই সাহেব। ” মুখ তার এক আত্নবিশ্বাসীর হাসি।তিনি জয় লাভ করেছেন এমন টা ওনার চোখে মুখে প্রকাশ পাচ্ছে।
কাজি বলে,
__“নিয়ম অনুযায়ী কিছু লেখা লাগবে।”
তখন আরমান বলে,
__“তাহলে লিখুন—আমি নগদ বিশ লাখ টাকা দিচ্ছি। বাকিটা আমার বউয়ের সম্মান।”
এবার সবার মুখে তৃপ্তির হাসি। কাবিননামা সম্পন্ন হয়। ইসলামের শরিয়ত মাফিক তাদের তিনজনের বিয়ে সম্পন্ন করা হয়। ঘড়িতে সন্ধ্যা সাতটা বাজে। সবার মনে শান্তি—আজ তিনটি ঘর বাঁধা পড়ল।
ডিনারের জন্য বিশাল আয়োজন। মুরগি রোস্ট,গরু, কোরমা, বিরিয়ানি, কাবাব, ফিরনি—সব সাজানো।
তিন বর তিনজনের হাত ধরে বসে খাবার জায়গায়।
জারা জড়সড়।ফিহা লাজুক হাসছে।জিনিয়া চোখ নিচু করে আছে। মা-খালারা তাদের সন্তানদের খাবার বেরে দিতে ব্যস্ত,কাজের মেয়েরা পাশে দাঁড়িয়ে সব দেখাশোনা করছে।জোহান এসে আরমানের পাশে বসে
—“দুলাভাই আমাকে না নিয়ে খাওয়া শুরু করে দিলে?”
আরমান জোহান কে চা-টা মে’রে বলে
__“ তুই খেয়ে পেট ফুলিয়ে সারা বাড়িতে টহল দিয়েছিস তখন আমি কিছু বলেছি?”
__“ দুলাভাই তুমি আমাকে খাওয়ার খোঁটা দিলে!”
আরমান বিস্তৃত দৃষ্টিতে বলে
__“আমি কখন তোকে..?”
__“ এই তো দিলে..! ” জোহান কাদো কাঁদো মুখ করে বলে। আরমান বোকা বনে যায়। সে কখন এই পটলকে খাওয়ার খোঁটা দিলো? জারা জোহানকে এনে ওর সাথে বসায়। যত্ন সহকারে ভাইয়ের পাতে খাবার তুলে দেয়। আরমান জারা’র কানে কানে ফিসফিস করে বলে
__“পাশে একজন অভাগা স্বামী বসে আছে কারোর চোখে পরে না?”
জারা আস্তে করে বলে
__“ আমার হাত ভর্তি চুড়ি গায়ে ভারি গহনা এটা কি কারোর চোখে পরে না? ” আরমান মাথা কাত করে তার লক্ষী বউয়ের দিকে তাকায়। ভ্রু নাচিয়ে কিছু জিজ্ঞেস করে। জারা হাসে। আরমান একটা প্লেটে খাবার নিয়ে সুন্দর করে মেখে জারার মুখের সামনে এগিয়ে দিয়ে বলে,
__“সারা দিন কিছু খাওনি, এখন খাও।”জারা তাকায় চোখে মায়া, সম্মান আর ভালোবাসা।
__“আপনিও খান! ”
__“খাইয়ে দিবে?”
__“ আজ আমায় খাইয়ে দেন, তারপর থেকে সারাজীবন আপনাকে খাইয়ে দেওয়ার দায়িত্ব নিব!”
আরমান বলে
__“ তাহলে আমার সারাজীবনের জন্য একটা কাজ কমে গেলো,দেখছি!”জারা হাসে। আরমান জারাকে সুন্দর করে খাইয়ে দিচ্ছে।
জাহেদ ফিহার দিকে কখন থেকে খাবার ধরে বসে আছে। আর ফিহা অবাক দৃষ্টিতে তার জাহেদ খানের দিকে তাকিয়ে আছে। আজ কতো দায়িত্ব বান লাগছে লোকটাকে। জাহেদ ফিহাকে হালকা ধমক দেয়,
__“আমার দিকে না তাকিয়ে, খাও!”ফিহা মাথা নত করে হাসে।
রোহান জিনিয়ার কাছে ঝুঁকে ফিসফিস করে বলে,
__“আজ সারাদিন অপেক্ষা করছি তোমার জন্য।”
জিনিয়ার মুখ আরো লাল হয়ে যায়।
__অপেক্ষার পর কী পেলেন?”
__“ আমার হালাল স্ত্রী, আমার জীবনসঙ্গী, আমার চাঁদ সুন্দরী, আমার আব্বুর একমাএ পুএ বধূ,আর আমার বাচ্চার আম্মু। ”বলেই চোখ টিপ দিয়ে রোহান। জিনিয়া আর লজ্জায় লাল হয়ে যায়।
তিন বর তাদের স্ত্রীদের নিজ হাতে খাইয়ে দিচ্ছে। আর এই দৃশ্য দেখে পরিবারের সকলের প্রাণ জুরিয়ে যাচ্ছে। আর মনে মনে আল্লাহর কাছে তাদের নতুন জীবনের জন্য দোয়া করছেন।
সবাই খাওয়া-দাওয়া শেষ করে উঠতেই ঘরের ভেতর হঠাৎ এক অদ্ভুত নীরবতা নেমে আসে। আলো ঝলমলে বাড়ির প্রতিটি কোণে যেন থমথমে আবহ। কারণ—এবার বিদায়ের সময়।
জিনিয়া ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়। লাল ও সোনালি মিশ্রণে সাজানো ওর লেহাঙ্গাটা আলোতে চকচক করছে, কিন্তু সেই উজ্জ্বলতার আড়ালে মুখটা ভিজে আছে। চোখ লাল, ঠোঁট কাঁপছে। ওর সামনে দাঁড়ানো জেসমিন বেগম প্রথমেই চোখ মুছে বলে ওঠেন,
__“মা… তুই চলে যাবি আজ? মাত্র তো এতো হাসি-খুশিতে ছিলি… এখন ঘরটা ফাঁকা হয়ে যাবে।”
ফারিয়া বেগমও এগিয়ে এসে জিনিয়ার মাথায় হাত রাখেন।
__“আম্মু, একটু আগেই তো হাসলাম… এখন মনটা কেমন করে উঠছে।”
জিনিয়া দুই মায়ের বুকের মাঝে মাথা গুঁজে কান্নায় ভেঙে পড়ে। আবহটা এমন যে, চারপাশের সবাই নিঃশব্দে তাকিয়ে থাকে। জেরিন আর স্থির থাকতে পারে না—সে দৌড়ে এসে আপুকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে।
__“আপু, তুমি চলে গেলে আমি কার সাথে রাত জেগে গল্প করবো? কে আমাকে চুল বেঁধে দেবে? কে আমার সঙ্গে ঝগড়া করবে?”কথা শেষ করতে না করতেই ওর গলার স্বর কেঁপে ওঠে।
জিনিয়া জেরিনের চুলে হাত বুলিয়ে দেয়।
__“আহা পাগলি, আমি তো আছি… ফোন দিলেই দৌড়ে চলে আসবো।” কিন্তু এতেও জেরিন আরও বেশি কান্নায় ভেঙে পড়ে।
পরিবারের বড়রাও চোখের পানি আটকাতে পারছেন না। চারদিকের আবহ যেন ভিজে ওঠে। ঠিক তখন রোহান সামনে এগিয়ে আসে। চুপচাপ, শান্ত, কিন্তু চোখে দৃঢ়তা।রোহানের বাবা জিনিয়ার বাবা আর চাচার সঙ্গে কথা বলছে। রোহান আসিফ খান—নিজের শশুরের সামনে দাঁড়িয়ে দুই হাত জোড় করে ধরে।__“ শশুড় আব্বা…”
আসিফ খান মাথা তোলে। তার চোখও লাল।
রোহান নরম গলায় বলে,
__“আপনার মেয়েকে আজ থেকে আমার হাতে দিলেন… আমি কথা দিচ্ছি—জিনিয়াকে কখনো কাঁদতে দেবো না। সে আমার দায়িত্ব, আমার সম্মান, আমার জীবন। আমি ওকে আমার জীবনের সবটা দিয়ে আগলে রাখব… আর আমার বউ হিসেবে ভালোবাসবো সবকিছুর চেয়ে বেশি উপরে রাখব ইনশাআল্লাহ ।”
ঘরে উপস্থিত সবাই স্তব্ধ হয়ে যায়।জেসমিন বেগম মুখ ঢেকে কান্না থামাতে পারেন না।আসিফ খান কাঁপা গলায় বলেন,
__“বাবা, আমার মেয়েকে সুখে রাখিস। ও খুব ভীরু… খুব নরম। ও যদি কখনো কাঁদে, মনে করবে—আমার বুকও একই সাথে ফেটে যাচ্ছে।”
রোহান আসিফ খানের হাত শক্ত করে ধরে।
__“আমি প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি শশুড় আব্বা… আপনাদের মেয়ের হাসিটা কখনো ম্লান হবে না।”
আরমান আর জাহেদ দুইজন গিয়ে বোনকে শন্তু করে জড়িয়ে ধরে। তাদের চোখে পানি। জাহেদ ভাঙ্গা কন্ঠে বলে
_“ আজ থেকে এই খান বাড়ি পেত্নী মুক্ত হলো! কেউ আর জ্বালাবে না আমাদের! ”
জিনিয়া হাউমাউ করে কান্না করে দেয়। আরমান জিনিয়ার মাথায় হাত ভুলিয়ে শান্ত করে না।
আরমান রোহানকে বলে
__“আমার বোনের চোখে কখনো পানি দেখলে খোদার কসম সেদিন তুই কবরে থাকবি! ”
রোহান আঁতকে উঠে।
__“ভাই আমি তোর বন্ধু হই, তোর বোনকে ভালো রাখব এই বিশ্বাস আমার উপর নেই?”
আরমান জবাব দেয় না। এদিকে মা চাচারি কান্না
জিনিয়া এ দৃশ্য দেখে আর থাকতে পারে না। সে এগিয়ে এসে রোহানের বাহু আঁকড়ে ধরে। কান্নার মাঝেই বলে,
_“আমি আমার মা-বাবাকে ভীষণ মিস করবো।”
রোহান ওর মাথা টেনে নিজের কাঁধে রাখে।
__“আমি আছি তো… তোমাকে এমনভাবে রাখবো, তুমি আমার কাছে ঘর ছাড়া অনুভব করবে না।”
মিম, জারা, ফিহা—এমনকি ছায়মাও চোখ মুছতে মুছতে এগিয়ে এসে জিনিয়াকে জড়িয়ে ধরে।
__“তুমি সুখে থাকো জিনিয়া আপু…”
__“আমার মিষ্টি বোনেরা কাঁদে না…”কিন্তু কারো মুখেই শেষ পর্যন্ত শব্দ ঠিকঠাক বের হয় না।
এসবের মাঝে জোহান ছোট্ট কণ্ঠে বলে,
__“কিউটি গার্ল তুমি চলে গেলে আমার সাথে আর কে খেলবে?”শিশুর কথায় আবারও সবার চোখে পানি আসে।
চারদিকে কান্নার শব্দ, আবেগ, বিদায়ের ভারী আবহ।
শেষবারের মতো মা–বাবার হাত ছুঁয়ে, ভাইবোনদের আলিঙ্গন করে জিনিয়া ধীরে ধীরে গাড়ির দিকে এগিয়ে যায়।
শেষমেশ সবাই মিলে জিনিয়াকে গাড়িতে উঠিয়ে দেয়। দরজা বন্ধ হওয়ার ঠিক আগে জিনিয়া শেষবারের মতো জানালা দিয়ে নিজের পরিবারকে দেখে।তার চোখে জল, মুখে কাঁপা হাসি।গাড়ি ধীরে ধীরে গেট পার হয়ে যায়।আর পুরো বাড়িটা নিঃশব্দ হয়ে যায়—যেন কারো বুকের ভেতর থেকে প্রিয় একটা অংশ আলাদা হয়ে গেল।
পেছন ফিরে একবার তাকায়—এই বাড়ি, এই মানুষ গুলো, এই স্মৃতি… সবকিছু যেন বুকের ভেতর মোচড় দিয়ে ওঠে।গাড়ি চলতে শুরু করলে সবাই হাত নেড়ে বিদায় জানায়।জেসমিন বেগম ঠোঁট চেপে ধরে কাঁদছেন, ফারিয়া বেগমের চোখ ছলছল, জেরিনের কান্না থামছেই না।
আর দুই ভাই—জাহেদ ও আরমান—দাঁড়িয়ে থাকে শক্ত হয়ে,কিন্তু চোয়ালের কোণায় জমে থাকা জল ঠিকই বলে দেয়—বোনের বিদায় সামলাতে তাদেরও খুব কষ্ট হচ্ছে।
এসব দেখে এক কোনে দাঁড়িয়ে সব দেখছে জাহির। ওর চোখে পানি। বোনকে বিদায় দেওয়া কতো কষ্ট এটা শুধু বড় ভাইরাই যানে। সেও তো বড় ভাই। তার বুড়িও এখন থেকে অন্যর ঘরের মানুষ। সে কীভাবে বোনকে ছেড়ে থাকবে। ছলছল চোখে দূরে আরমানের সাথে দাড়িয়ে থাকা ছোট্ট পরি টাকে দেখছে। তার বোন, তার বুড়ি। দীর্ঘ শ্বাস ফেলে জাহির। কষ্ট গুলো বুকে চাপা দিয়ে রাখে।
একে একে সবাই বাড়ির ভিতরে চলে যায়। যা না শুধু জাহির। বাগানের পিছনের দিকে হাঁটতে হাঁটতে চলে আসে।
বাগানের পেছনের পথটা সাধারণত ফাঁকা থাকে। সন্ধ্যার আলো নিভু–নিভু হয়ে গেছে, চারদিকে মৃদু বাতাস বইছে। সেখানে জাহির চুপচাপ চলে এসেছিল একা। তার চোখে অদ্ভুত অস্থিরতা—যা শুধু ছায়মাই বোঝে।
দূর থেকে ছায়মা দেখেছিল জাহিরের বড় বড় পা ফেলে একা হেঁটে যাওয়া। মুহূর্তেই তার বুক কেঁপে ওঠে।“…ওর আবার কী হয়েছে ?”এ ভেবে কোনো কিছু না বুঝেই সে জাহিরকে অনুসরণ করল।
জাহির থামতেই বুঝল—তার পেছনে কেউ আছে। ঘুরে না তাকিয়েই বলল,
__“এখানে কেন এসেছো?”
ছায়মা একমুহূর্ত থমকে গেল।
__“আপনাকে দেখলাম… তাই ভাবলাম…” তার গলার স্বর ধরা পড়ার মতো কাঁপছিল।
জাহির আর কিছু বলল না। শুধু নির্লিপ্তভাবে দূরের অন্ধকারে তাকিয়ে রইল। এই উদাসীনতা ছায়মাকে আরও কষ্ট দিচ্ছিল। সে কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে থেকে সাহস সঞ্চয় করল।
__“শুনুন… জাহির…”তার কথা শেষ করার আগেই জাহির অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে নিল—একেবারে ইগনোর করা মতো।
ছায়মার বুক টনটন করে উঠল।আজ এতদিনের অনুভূতি সে আটকাতে পারল না। লাজ–লজ্জা, ভয়—সব পুড়ে ছাই হয়ে গেল।
__“আমি আপনাকে পছন্দ করি… অনেকদিন ধরে,আগেও বলছি এখনো বলছি,”ছায়মা কাঁপা কণ্ঠে বলল।
__“আপনি যখন হাসেন, যখন আমার ওপর রাগ করেন… যখন আমার দিকে তাকান—সবই আমার ভালো লাগে। আমি… আমি চেষ্টা করেছি দূরে থাকতে, কিন্তু পারি না…”
জাহির এবার ঘুরে তাকাল। তার চোখে কোনো কোমলতা নেই, নেই কোনো বিস্ময়ও। শুধু ঠান্ডা, ভয়ংকর অচেনা দৃষ্টি।
__“শেষ?”, জাহির কড়া স্বরে বলল।
ছায়মা ভেঙে পড়ল।
__“দয়া করে এভাবে কথা বলবেন না। আমি সত্যিই আপনাকে—”
__“ছায়মা, থামো। আমার কোনো আগ্রহ নেই তোমার কথা শুনতে,আর না আছে তোমার জন্য আমার মনে কোনো ফিলিংস।”জাহিরের কণ্ঠ এবার আরও শক্ত, আরও তীক্ষ্ণ।
কথাটা শুনেই ছায়মার গলা শুকিয়ে গেল।তবুও সে হাল ছাড়ল না।
__“আপনি কেন আমার সাথে এমন করেন? আমার কি আপনার কাছে একটুও মূল্য নেই? আমি কি এতটাই খারাপ—”
__“হ্যাঁ।”
একটি শব্দে ছায়মা স্তব্ধ হয়ে গেল। কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বলে
__“তাহলে ওই তা.. তাকানো, কাল যে অধীকারের সাথে কেয়ার দেখালেন এসব?”
জাহির এগিয়ে এসে দাঁড়াল তার সামনে।
__“শোনো ছায়মা, আমি তোমাকে কোনোদিন পছন্দ করিনি।সেদিনও বলেছি আমি । তোমাকে নিয়ে পথ চলা, হাসাহাসি—এসব তোমার নিজের ভুল বোঝা। আমি কখনোই তোমাকে কোনো অনুভূতি দিইনি। আর যদি কালকের কথা বলো, তাহলে সানির ইনটেনশন খারাপ ছিলো আর আমি তোমাকে আমার বোনের ননদ বলে সেব করেছি। আর কিছু না.!”
ছায়মার চোখ জ্বলে উঠল—কষ্টে, অপমানে, ভাঙা স্বপ্নে।তবুও সে শেষ চেষ্টা করল।
__“জাহির… আমি সত্যিই—আমি—”
হঠাৎ করেই আবেগে ভেসে সে জাহিরকে জড়িয়ে ধরে ফেলল।চোখের পানি জাহিরের শার্ট ভিজিয়ে দিচ্ছিল।
__“আমি আপনাকে হারাতে চাই না… প্লিজ আমাকে এমনভাবে দূরে ঠেলে দেবেন না…”
জাহিরের ধৈর্য এক নিমিষে ভেঙে গেল।এক মুহূর্তে সে ছায়মাকে জোরে ঠেলে আলাদা করে দিল।তারপর—চাপ!জাহিরের থাপ্পড়ের শব্দ যেন পুরো বাগানটাকে মুহূর্তে নিস্তব্ধ করে দিল।
ছায়মা স্তব্ধ হয়ে গেল।তার গাল জ্বলে উঠেছে।
কিন্তু ব্যথার চেয়ে বেশি বুকে জ্বালাপোড়া করছিল,আর অপমান।
জাহির গর্জে উঠল,
__“তোমার কোনো লজ্জা নেই? এতটা সস্তা হয়ে গেলে তুমি? কারো গায়ে এভাবে লাফিয়ে পড়ো?ছিঃ!”
ছায়মা কিছু বলতে পারছিল না। শুধু ভিজে চোখ নিয়ে তাকিয়ে ছিল সেই মানুষটার দিকে—যাকে সে এত ভালোবেসেছিল।
__“শুনে রাখো,”জাহির ঠান্ডাভাবে বলল,
__“আমার চোখের সামনে আর কোনো দিন আসবে না। না হলে আরও খারাপ হবে।যাও এখান থেকে! ”
এক মুহূর্তও দেরি না করে জাহির সেখান থেকে চলে গেল।তার পায়ের শব্দ দূরে মিলিয়ে যেতেই ছায়মা ভেঙে পড়ে মাটিতে বসে কাঁদতে লাগল। তার বুকের ভিতরটা যেন ছিঁড়ে যাচ্ছে।
__“ত তবুও বললো আমি আপনাকে ভালোবাসি, খু খুব ভালোবাসি! ”
জাহির শুনেও না শুনার মতো করে চেলে যেতে তাকে। বুকে আজ তার পাথর বাঁধা।থাকে ভেঙে পরলে চলবে। পিছনে তাকানোর সাহস যে তার নেই।
আজ ছায়মা বুঝল—যে মানুষটাকে সে হৃদয়ে জায়গা দিয়েছিল, সে মানুষ তার ভালোবাসার যোগ্যই না।
কিন্তু ব্যথা কি সহজে বোঝে এসব?আকাশের নিচে, নিঃসঙ্গ বাগানের পেছনে,ছায়মা শুধু একটা কথাই ভাবছিল—“আমি কি সত্যিই এতটাই অমূল্য?”
কান্না করতে করতে ঘাসের উপর বসে পরে। হাউমাউ করে কান্না করে। বুকটা ছিড়ে যাচ্ছে তার। এতো কষ্ট কখনো অনুভব করেনি সে। ভালোবাসা এতো কষ্ট দেয় সে কখনো ভাবতেই পারেনি। মনকে কতো বুঝিয়েছে সে কিন্তু বেহায়া মন সেই দিকে ছুটে যায়। ঘাসে থামছে ধরে। ঠোঁট কামড়ে কান্নার শব্দ কমাতে চায়।
বাগানে বসে কান্না করতে করতে কত সময় পার হয় সে বোঝতে পারে না। একসময় মাথা ব্যথা শুরু হয়ে যায়। কোনো করম চোখের জল মুছে। চোখে একধরনের বিষন্ন। মনে মনে বলে
__“ভালোবাসা যদি অপরাধ হয়,তাহলে শাস্তি টা আপনি দিয়েছেন, থাপ্পড় মেরে নয় মন ভেঙে দিয়ে।”
কান্নারা আজ যেনো তার সঙ্গী হয়ে গেছে। এতো বার চোখের পানি মুছে তারপরও বেহায়া চোক থেকে পানি পরতেই থাকে। ছায়মা মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে
__“ আমি ছায়মা এক বেহায়া নারী আর কখনো আপনার সামনে আসবো না, মরে গেলেও না। দ্বিতীয় বার আপনার কথা আমি মনেও আনবো না। আপনি কতোটা কঠোর তার থেকে বেশি কঠোর আমি হবো! পাপ করেছিলাম মনের বিরুদ্ধে গিয়েও আপনাকে ভালোবেসে ছিলাম! ভালোবাসা আমার মতো সস্তা মেয়েদের জন্য না। ”
নিজের উপর তাচ্ছিল্য হাসি দিয়ে বলে
রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৬৮
__“যদি আপনি কাউকে কখনো সত্যি কারের ভালোবাসেন, সেদিন আমার আজকের ব্যথা, বুক ফাটা কান্না, হাজারো কষ্ট আপনার দু’চোখে ফুটে উঠবে!”
চোখ মুছে বসা থেকে উঠে দাঁড়ায়।মাথা বনবন করে ঘুরছে। কোনো রকম শরীর টা টেনে হিঁচড়ে বাড়ির ভিতরে যায়।
