Home লাভ বাই দ্যা ভিলেন লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ৩০

লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ৩০

লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ৩০
লিজা মনি

রাত্রির স্তব্ধতা তখন প্রায় নিঃশেষিত।জানালার অপ্রকাশিত অন্ধকারে দূরের আকাশও যেন নিজের রঙ ভুলে থমকে আছে।নগরীর শব্দ অনেক আগেই নির্বাপিত। শুধু দেয়ালের ভেতর জমে থাকা নিস্তব্ধতার ধ্বনি যেন কানে টোকা দিচ্ছিল।ঘরের বাতাসে এক অদৃশ্য দমচাপা ভার ছিল।ফিকে আলোয় ছায়াগুলো দীর্ঘ হয়ে মেঝে জুড়ে
ভীতির কোনো অদেখা মানচিত্র আঁকছিল।দেয়ালের রঙও যেন তখন বিবর্ণ হয়ে গিয়েছিল।মনে হচ্ছিল এই দেয়ালগুলো অনেক কিছু দেখেছে কিন্তু বলতে পারে না।
রাতের শেষ প্রহর মানেই তোচোখের ভেতর ঘুরপাক খাওয়া প্রশ্নের সময়। চোখ খুলে থাকলেও মন যেন বন্ধ দরজার ভিতর বন্দী। রাত তখন শেষ হওয়ার পথে কিন্তু আলো এখনও জন্মায়নি। এই অদ্ভুত মধ্যবর্তী সময়টিই
সবচেয়ে বেশি অস্থির। কারণ আলো আসার আগে
অন্ধকার সব সত্যকে দুইভাগে ভাগ করে দেয়। কি ঘটেছে।
আর কি ঘটতে পারে।

শেষ প্রহরের নিস্তব্ধতা তখন যেন জমাট অন্ধকারের ওপর আরেক স্তর অন্ধকার ছড়িয়ে রেখেছে। ঘরের বাতাসে অনুচ্চারিত আতঙ্কের ধোঁয়া ভেসে ছিল। যেন কেউ শ্বাস নিলেই তা শব্দ হয়ে উঠবে। ঘরটায় কোনো আলো ছিলো না। কেবল দূরের জানালার ফাঁক দিয়ে ঠান্ডা চাঁদের আলো
একটি সরু রেখার মতো মেঝের ওপর পড়ে
দীর্ঘ এবং অস্বস্তিকর ছায়া তৈরি করেছিল। সেই ছায়ার গহীনে একজন ব্যক্তি বসে শান্ত ভাবে। ঝড়ের আগের সেই ভয়াবহ স্থিরতা। লোকটার দৃষ্টি একটুও নড়ছে না।

বর্তমানে মুখের ওপর কোনো অভিব্যক্তি নেই। লোকটার র নিঃশ্বাসের শব্দ পর্যন্ত নেই। দেয়ালের ওপর পুরনো রঙ খসখসে হয়ে উঠে এসেছে। বাইরে দূরে হয়তো কোনো কুকুর ডেকেছিল ভয়ানকভাবে। কিন্তু সেই ডাকও খেয়ে ফেলল দেয়ালের বদ্ধ নীরবতা।ঘরের ঘড়ির কাঁটা টিকটিক শব্দ করছিল সুনিপুণভাবে। মৃত্যুর আগাম গণনার মত।লোকটা আকস্মিক পৈশাচিক হাসিতে ফেটে পড়ে। তার সামনে তিন রকমের মাংসা রাখা আছে। এক বোল মাংস যুবতী মেয়ের। আরেক বোল মাংস বাচ্চার। আরেক বোল মাংস এক অর্ধ -বয়সী মহিলার। তিন জনের রক্ত আলাদা করে রেখেছে জগের মধ্যে। মাংসগুলো সিদ্ধ করে নিয়ে এসেছে। এরপর টেবিলের উপর রেখে দিয়েছে ঠান্ডা হওয়ার জন্য। হাসি থামিয়ে এক গ্লাস রক্ত নিয়ে পৈশাচিকভাবে হাসে ধীরে ধীরে। এরপর রক্তটুকু ঢক – ঢক করে গিলতে থাকে। কুমারী মেয়েদের একটা গোপন জিনিস তার কাছে রেখে দেয়। পুরুষদের রক্ত সে কখনো পান করে নি। কুমারী মেয়ে আর বাচ্চাদের রক্ত তার কাছে অমৃত। একটা মাংসের বোল নিজেত কাছে নিয়ে আসে। এরপর চামচের সাথে লবণ মিশিয়ে মুখের ভিতরে ডুকিয়ে দেয়। জিহ্বা বের করে চেটে নেয় গ্লাসের লাল রক্তটুকু। খাওয়ার মধ্যে আকস্মিক কেউ একজন ভিতরে ডুকে। লোকটা পাত্তা দিলো না। এই রুমে দুইজন ব্যক্তি ডুকতে পারে। একজন হলো গ্যাংস্টার বস নিক জেভরান। আরেকজন ক্রিমিনাল লিডার আরিশ।
লোকটা মাংস চিবিয়ে বলে,

” খাওয়ার মধ্যে ডিস্ট্রাব করলে ভাই। বলো কেনো এসেছো?
নিক ঘৃণায় নাক – মুখ কুচকে ফেলে,
” কুকুরেরটা খাচ্ছিস, নাকি মানুষেরটা খাচ্ছিস?
” কুমারী মেয়ে।
” রে***প করেছিস?
জেড মাংস মুখে নিয়ে বিকৃতভাবে হাসে। জেডের খাওয়া দেখে নিক ধমকে উঠে,
” শুয়রেরর বাচ্চা খাওয়া অফ দে। বমি করাবি নাকি?
জেড অদ্ভুতভাবে হেসে বলে,
” তুমি নিজেও খেয়েছো একসময় ভাই। আমার খাবারগুলোকে এমন নাক – ছিটকালে চলে বলো?
নিক চোয়ল শক্ত করে বলে,
” বিষাক্ত অতীত, বাধ্য হয়ে খেতে হয়েছে। তর মত নরখাদক হয়ে যায় নি। মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে রক্ত না দিয়ে রক্তশূন্যতায় মেরে ফেলি।
” কি জন্য এসেছো সেটা বলো।
নিক ঠোঁট কামড়ে ধরে বলে,

” কু**পা – কু*পি কম করবে। তকে কাল পাশের রুমে ট্রান্সফার করাব।সেটা সাউন্ড প্রুফ রুম। সারাদিন কোপালেও কেউ শুনবে না। তবে আজ কোনোরকম আওয়াজ করবি না। একজনে ভয় পাবে।
জেড পৈশাচিক হেসে বলে,
” কার জন্য তোমার যান্ত্রিক হৃদয়ে মায়া হলো গ্যাংস্টার বস?কে আছে এই অন্ধকার মিনারের ভিতরে?
নিক কপাল ঘেষে থেমে থেমে নিশ্বাস নিয়ে বলে,
” যে আছে তার দিকে সামান্য ফিরেও তাকাবি না। যদি কোনোদিন সামান্য তাকিয়েছিস, তাহলে তর দেহ টুকরো টুকরো করে কেটে এইভাবে সিদ্ধ করব, তার কোনো সন্দেহ নাই। তবে তর মাংস মানুষ নয় হান্টার আর শ্যাডো খাবে।
জেড খাওয়ার মধ্যে মনযোগী হয়ে বলে,
” তোমার কথার অমান্য হয় নি কোনোদিন। আজও হবে না। নিশ্চিন্তে থাকো।
নিক কিছুক্ষন নিশ্চুপ থেকে ভারী পায়ে রুম থেকে বেরিয়ে যায়। জেড বাঁকা হেসে নিজের খাওয়াতে মনযোগ দেয়।

ঘুম ঘুম চোখে এনি চোখ খুলে। সারা রাত ভয়ে ঘুমাতে পারে নি। এমন ভয়ানক গা ছমছমে পরিবেশ। তার সাথে আস্ত একটা জানোয়ারের সাথে এক বিছানায় ঘুমানোটা এনির জন্য পসিবল হয়ে উঠে নি। এনি বুঝতে পারছে না এইটা কোন জায়গা? আর এইটা বাড়ি নাকি অন্য কিছু। এনি বহু কষ্টে নিজের শরীরে সাথে যুদ্ধ করে হেডবোর্ডে হেলান দিয়ে বসে। মাথা ব্যাথা ছিঁড়ে যাচ্ছে। তার থেকেও বেশি পুরো সর্বাঙ্গে ব্যাথা করছে। মনে হচ্ছে যেন হাড়ের ভিতর দিয়ে কেউ আগুন ধরিয়ে দিচ্ছে। এনি নিজের শরীরের দিকে তাকায়। তার শরীরে তো কাদা লাগানো ছিলো। এইসব পরিষ্কার হলো কিভাবে? আচমকা মনে আসলো নিক ঘুমিয়ে যাওয়ার পর সে চুপিচুপি বিছানা থেকে নামে। এরপর একটু এদিক- সেদিক চোখ বুলাতেই ওয়াশরুমের দরজা দেখতে পায়। কোনো কিছু না ভেবে শাওয়ার নিতে চলে যায়। সেখানে গিয়েও প্রচুর সাফার করতে হয়েছে। চারদিকে লাল – কালোর মিশ্রণে কেমন ভুতুরে মনে হচ্ছিলো। নিস্তব্দ রাতে এক ফোটা পানির আওয়াজও প্রচুর ভয়ানক শুনা যায়। এনির মনি হচ্ছিলো এই বুঝি কেউ এসে পিছন থেকে ঘাড় মটকে দিচ্ছে। ছাদ দিয়ে কেউ উল্টো হয়ে হাটছে। এনি শাওয়ার নিতেও গিয়ে ও আতঙ্কে জমে যায়। অনেক যুদ্ধ করে পরিশেষে শাওয়ার নিতে সফল হয়। শাওয়ার নেওয়ার পর মনে হলো সে কাপড় আনে নি। বিরক্তি নিয়ে ট্রায়াল রুমে প্রবেশ করে। নিকের কোনো একটা শার্ট নেওয়ার জন্য। কিন্তু অবাক করা বিষয় হলো সেখানে মেয়েদের পোষাক ও ছিলো। এনি কিছুটা চিন্তিত হয়ে যায় পোশাক দেখে। প্রতিটা জামা অতিরিক্ত পুরনো আর ছেঁড়া। নাক ছিটকে বিরক্তির নিশ্বাস ফেলে। বিরবির করে উঠে,

” ট্রিলিয়নার হয়ে লাভ কি, যদি নিজের ট্রায়াল রুমে ছেঁড়া কাপড় রাখতে হয়। শুনলাম নিজে কোনো শার্ট একবার পড়ে ফেললে পরের বার সেটা স্পর্শ করেও দেখে না। গ্যাংস্টার বস নিক জেভরানের ট্রায়াল রুমের এই নমুনা। ছিহহ!
এনি বিরবির করতে করতে অপারক হয়ে সেই পুরনো টপটা পড়ে। এরপর চুপচাপ দুরত্ব বজায় রেখে নিকের পাশে এসে শুয়ে পড়েছিলো। কারন রাতের এই নিস্তব্দতায় সে আর কোনো অশান্তি চাচ্ছিলো না। এমনিতেও প্রচুর দুর্বল সে। পাশে না ঘুমালে যদি আবার রেগে তাকে আঘাত করে বসে। পরবর্তী আঘাত সহ্য করার মত ক্ষমতা এমনিতেও তার কাছে নেই।
এনি কথাগুলো মনে করে নিজের দিকে তাকায়। নিজের ড্রেস – আপের অবস্থা দেখে ঠোঁট উল্টায়। গলার কাছে অনেকটা ছিঁড়া। কেমন বিশ্রি আর পুরাতন দেখতে লাগছে। হঠাৎ এই গ্যাংস্টার বসের আগমন ঘটে। দরজা খুলার শব্দ পেয়ে এনি চমকে উঠে। নিককে কপালে ভাঁজ ফেলে রুমে ডুকতে দেখে দ্রুত গায়ে চাঁদর জড়িয়ে নেয়। নিক গম্ভীর পায়ে রুমের ভিতরে ডুকে। হাতা কাটা কালো গ্যাঞ্জি পরিধান করা।

পেশিবহুল হাত দুইটা টান- টান হয়ে আছে। ফুটা – ফুটা ঘামের বিন্দু চিকচিক করছে। দেখেই বুঝা যাচ্ছে জিম থেকে এসেছে। নিক গ্যাঞ্জিটা এক- টানে খুলে ডিভানে ছুঁড়ে মারে। এনি এক পলক তাকিয়ে চোখ ফিরিয়ে নেয়। এই লোক মারাত্নক এট্রাক্টিভ। এই লোকের সৌন্দর্য ও নিঁখুত। ঠোঁটের নিচে এই তিলটা সব থেকে বেশি ভয়ানক। এনি মাঝে মাঝে প্রচন্ড বিরক্ত হয় নিজের অনুভুতি নিয়ে। যাকে জীবনের সব থেকে বেশি ঘৃনা করে তাকে দেখে এতটা মুগ্ধ কেনো হয়ে যায় সে? এই লোকের বাহ্যিক রুপ তীব্র ভয়ানক। যার সর্বাঙ্গে তাকালে মেয়েরা প্রেমে পড়তে বাধ্য। কিন্তু অভ্যন্তরিন পৈশাচিক রুপ দেখলে মেয়েরা কাঁদতেও বাধ্য। এনি নিশ্বাস টেনে নিকের দিকে তাকালো কিছু বলার জন্য। কিন্তু নিকের দৃষ্টি দেখে গলা শুকিয়ে আসে। কন্ঠস্বর সেখানেই আটকে যায়। গলা দিয়ে আর বের হলো না। নিক নিজের পেশিবহুল হাত দুইটা ডিভানের দুইপাশে ছটিয়ে রেখে, এনির দিক তীর্যক চোখে, বাজ পাখির ন্যায় তাকিয়ে আছে। নিক নিচের ঠোঁট কামড়ে ধরে। নিকের এমন চাহনিতে এনি অস্বস্তীতে পড়ে যায়। শরীর ঢাকার জন্য মরিয়া হয়ে উঠে। কিন্ত সে – তো বর্তমানে শালীন ভাবেই বসে আছে। তাহলে এই লোক এমন গভীরভাবে কি দেখছে। এনি নিচের ঠোঁট ভিজিয়ে মিনমিন করে বলে,

” এইভাবে লুচ্চাদের মত তাকিয়ে আছেন কেনো?
নিক চোখ ছোট ছোট করে ফেলে। গম্ভীরতা টেনে এনির কথাটার অর্থ বুঝার চেষ্টা করে। চোয়াল শক্ত করে ধমকে উঠে এক প্রকার,
” রাবিশ! ভাষা এত জঘন্য কেনো?
নিকের ধমকে এনি কেঁপে উঠলেও নিজেকে সামলে নেয়। কিন্তু নিকের কথাটা হজম হলো না। সমস্ত ভয়কে উপেক্ষা করে বলে,
” কিছু কিছু লোকদের মুখে ভদ্রতার বাণী শুনলে ইচ্ছে করে মাইক ভাড়া করে হাসি। আপনি যে গালিগুলো দেন সেগুলো কি জঘন্য নয়? নাকি মসজিদের ইমামতি করেন আমার সামনে?
নিক ডিভান থেকে গম্ভীর হয়ে উঠে। তার দৃষ্টি এখনও এনির দিকে। ধীর পায়ে সে বিছানার দিকে এগিয়ে আসতে থাকে। নিককে আসতে দেখে এনি শুকনো ঢোক গিলে। নিক বিছানার কাছে এসে বুক টান টান করে দাঁড়ায়। এরপর ভারিক্কি আওয়াজ তুলে বলে,
” আমি খারাপ তাই আমি খারাপ কথা বলি, খারাপ কাজ করি। কিন্তু তুমি কি খারাপ ? তুমি কেনো বাজে শব্দ প্রয়োগ করবে।
এনি নিচের দিকে তাকিয়ে বিরবির করে উঠে,

” যে শরীরে কলঙ্কের কালিমা লেপ্টে আছে সেই সেই শরীরের মালিক তো খারাপ হবেই নিক জেভরান। খারাপ আমি ছিলাম না। কিন্তু এখন পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ খারাপ নারী আমি আনাস্তাসিয়া এনি। কারোর রক্ষিতা , যাকে রাস্তার প্রস্টিটিউড বলা হয়।
এনির কথা কর্ণে প্রবেশ করতেই নিকের চোখ দুইটার মধ্যে হিংস্রতা ফুটে উঠে। উন্মুক্ত বুকটা উঠা- নামা করছে নিশ্বাসের ঘনত্বের কারনে। রাগটাকে সামলাতে পারে নি গ্যাংস্টা বস। ঝড়ের বেগে এনির গলাটা চেপে ধরে। প্রবল ক্ষুব্দতায় মাথাটা নিয়ে হেডবোর্ডের সাথে শক্তভাবে চেপে ধরে হুংকার দিয়ে উঠে,
” শালী মাদার্ফাক! কলঙ্কের কালিমা লাগবে কেনো তর শরীরে বান্দির বাচ্চা। লাগতে দিয়েছি আমি? সামান্য কলঙ্ক তোকে ছুঁতে দিয়েছি? এই শুয়রের বাচ্চা কথা বল! কথা বলছিস না কেনো? উত্তর না পেলে কিন্ত এই মুহূর্তে নিশ্বাসটা বন্ধ করে ফেলব। দরকার নেই আমার কাউকে। নিক জেভরান একা বাঁচতে চিনে। সাত বছর যে ছেলেটা হিংস্র নেকড়ের গুহায় যুদ্ধ করে থেকেছে সেই নিক জেভরান এমন আলিশান বাড়িতে সারাজীবন কাটিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। তর মত ধান্দাবাজের প্রয়োজন নেই আমার।
এনি ছোটফট করে উঠে নিকের শক্ত থাবায়। গলাটা একদম বাজেভাবে চেপে ধরে রেখেছে। যে কোনো সময় নিশ্বাসটা আটকে যাবে। এনিরর চোখ উল্টে আসার উপক্রম। নিকের হাত ধরে শক্তভাবে ছুটার জন্য। অস্ফুর্ত আওয়াজে বলে,

” নিজেকে নিজে প্রশ্ন করুন। কারোর রক্ষিতা হয়ে থাকাটাকে কি বলে?
নিক নিজের হাত আরও শক্ত করলো। ধূসর চোখ দুইটা তীব্র দহনে জ্বলছে। সাদা মনিগুলো লাল হয়ে উঠেছে। নিক দাঁত পিষে হিংস্রতা নিয়ে গর্জে উঠে,
” নিক জেভরানের রক্ষিতার প্রয়োজন থাকলে বিয়ে করেছে কেনো? বান্দির বাচ্চা বল, তর শরীরে কলঙ্কের দাগ লাগাতে চাইলে বিয়ে করেছি কেনো? তকে বিয়ে করা ছাড়া ভোগ করতে পারতাম না? তর শরীর চাইলে কারোর আটকানোর ক্ষমতা আছে আমাকে?বন্ধ রুমে তকে রক্ষিতার মত ট্রিট করলে এতদিনে বেঁচে থাকতি ভেবেছিস? আমাকে সামলানোর ক্ষমতা কোনো রক্ষিতার নেই। আল্লাহর কালাম পাঠ করার পর তর সম্মতিতে তকে বিছানাই নিয়েছি। এর আগে নিয়েছি ? তকে রক্ষিতার মত ট্রিট করে বিছানার অংশ বানিয়েছি? শুয়রের বাচ্চা বল!
নিকের এক একটা কথা আর হুংকার দেয়ালগুলো ও যেন কেঁপে উঠছিলো। এনি নিশ্বাস নিতে পারছে না। চোখ বন্ধ হয়ে আসছে ধীরে – ধীরে। কোনো উত্তর করলো না সে। সত্যি এইতো, বিয়ে করেছে কেনো? এতদিন ট্রমা আর মানসিক চিন্তার কারনে তো সে এইটা ভাবেই নি। নিক জেভরান চাইলে দিনের পর দিন কামনা মিটিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দিতে পারত। কিন্তু সে – তা করে নি। কিন্তু টর্চার তো কম করে না। বিয়ে করেছে কেনো তাহলে? এনি আর ভাবতে পারছে না। কোনোমতে হালকা শ্বাস নিয়ে বলে,

” মরে যাচ্ছি। আর কত চেপে রাখবেন? দম বন্ধ হয়ে মরে গেলে কার সাথে এইভাবে রাগ দেখাবেন।
নিক শুনলো কথাটা। তীব্র ক্ষোভের সাথে এনিকে ধ্বাক্কা মেরে সরিয়ে দেয়। এনি পড়ে যেতে নিলে নিজেকে সামলে নেয়। এতক্ষনে যেন নিশ্বাস ফিরে এসেছে। আরেকটু হলে মরেই যেত। ফর্সা মুখটা লাল হয়ে গিয়েছে একদম। এনি গলায় ধরে একাধারে কাঁশতে থাকে। এনি ভেবেছিলো হয়ত নিক পানির বোতলটা এগিয়ে দিব। কিন্তু হার্টল্যাস লোকটা রাগান্বিত চোখে তার দিকে তাকিয়ে আছে। এনি নিরাশ হয়ে নিজেই পানি নিয়ে এক শ্বাসে গিলে ফেলে। এই ব্যক্তির থেকে ভালো কিছু আশা করা বোকামি। শরীরে এমনিতেও শক্তি নেই। যে কোনো সময় জ্বর চলে আসবে তার কোনো সন্দেহ নেই। দুর্বল শরীরটা বিছানায় এলিয়ে দেওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিতেই নিকের গম্ভীর আওয়াজ ভেসে আসে,

” ঘুমানোর টাইম নয় এখন বেবিগার্ল।
এনি অবাক হয়ে বলে,
” মানে?
নিক ঠোঁট কামড়ে বাঁকা হেসে বলে,
” মিনারের ভিতরে রাখা প্রতিটা স্টাফকে বাহিরে পাঠিয়ে দিয়েছি তোমার জন্য।
— আমার জন্য পাঠিয়ে দিয়েছেন মানে? কি করেছি আমি?
নিক রেগেও যেন রাগ করলো না। নিজের রাগটাকে কন্ট্রোল করে বলে,
” ওরা তোমার দিকে তাকালে আমার হাত রক্তাক্ত হবে প্রচুর। রক্তপাত চাচ্ছি না আপাযত।
এনি বিরক্ত হয়ে বলে,
” মানুষের দৃষ্টি একটা দান। আর এইটা দিয়ে একজন আরেকজনে দেখাটাই স্বাভাবিক। তাই বলে কারোর জবান বন্ধ করে ফেলবেন? এইটা কি ধরনের পাগলামো নিক জেভরান! আপনার ডাক্তার দেখানোর প্রয়োজন। এক ধ্বংসাত্বক সাইকোপ্যাথ আপনি।
নিক শব্দ করে হেসে উঠলো। তবে সেই হাসি বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। এনি নিশ্বাস টেনে বলে,

” একটু রেস্ট নিব।
— রান্না করবে কে? কাজ করবে কে বাকিগুলো?
এনি প্রচন্ড অবাক হয়ে যায়। তাকে কাজের কথা বলছে এই লোক? কিন্তু সে – তো রান্না করতে পারে না। এনি ঠোঁট ভিজিয়ে বলে,
” আপনার কি টাকার অভাব দেখা দিয়েছে। সকল স্টাফদের বাহির করে দিয়ে আমাকে কাজে লাগাচ্ছেন।
নিক বাঁকা হেসে বলে,
” প্রচুর অভাব দেখা দিয়েছে। কয়েকদিন পর রাস্তায় থালা দিয়ে বসাব তোমাকে।
নিকের ঠাট্টা এনির বুঝতে বাকি নেই। বিরক্তি নিয়ে বলে,
” আমি রান্না জানি না।
– সেটা বললে তো হবে না বেবিগার্ল। আশি জন গার্ডদের দুপুরের খাবার তুমি তৈরি করবে। রাতে কাজ থেকে ফিরে যাতে পুরো মিনার ক্লিন দেখতে পায়। সামান্য ডাস্ট ও আমি সহ্য করতে পারি না। কাজের এদিক – সেদিক হলে পুরো রাত এর ফল ভোগ করবে। কিছু- মিছু অনেক কিছুই ঘটবে।
এনি লম্বা শ্বাস টেনে বলে,

” পালিয়ে যাওয়ার জন্য বদলা নিচ্ছেন।
নিক গ্রিবাদেশ নাড়িয়ে বলে,
” এর বদলা চাইলে জবানটা বন্ধ করে ফেলতাম। কিন্তু কতদিন আর বসিয়ে বসিয়ে খাওয়াব।বিনা পারিশ্রমিকে তো কেউ কাউকে এক গ্লাস পানিও দেয় না। অথচ তোমাকে তিন – থেকে চার মাস বসিয়ে খাওয়াচ্ছি। কাজ করলে এমনিতে ও পালিয়ে যাওয়ার ভুত মাথা থেকে সরে আসবে। দামী কাপড়, দামী খাবার আর রুমে সারাদিন ঘুমিয়ে থাকলে তো বাজে চিন্তা আসবেই। এখন থেকে সাধারনদের মত কাপড় পড়বে। দিনে কাজ করবে আর রাতে আমাকে সামলাবে।
— খাওয়ার খুটা দিচ্ছে? থাকার খুটা দিচ্ছেন?
নিক কিছুক্ষন চুপ থেকে বলে,
” আমার প্রতিটা রোজগার তর জন্য। পুরো সম্রাজ্য খেয়ে ফেললেও কিছু বলব না।
থেমে…

” কিন্তু এই শাস্তিটা তোমাকে ভোগ করতেই হবে বেবিগার্ল।
— মাটি চাপা দিয়েছেন। থাপ্পর দিয়েছেন। বাকিটা না হয় স্কিপ করলাম। এতটা শাস্তি দিয়েও আপনার হয় নি। এই শাস্থিটা কি শুধু মাত্র গার্ডদের লাড্ডু বানিয়ে খাওয়ানোর জন্য দিচ্ছেন?
নিক ঠোঁট কামড়ে ধরে বলে,
” এইভাবেই প্রতিটা উদ্দেশ্য বুঝে নিবে।
নিক কথাটা বলে ওয়াশরুমের দিকে চলে যায়, শাওয়ার নেওয়ার জন্য। এনি ভয়ে শুকনো ঢোক গিলে। এতজন লোকের রান্না সে কিভাবে করবে? আর এত বড় বাড়ি সে এমন দুর্বল শরীর নিয়ে ক্লিন করবে কিভাবে? আর কাজ না করলে এই লোকটাকে নিয়ে বিশ্বাস নেই। যদি সত্যি তাকে আবার ও কাছে টেনে নেয়। কিন্তু এই স্পর্শ তার কাছে বিষাক্ত লাগে। ঘৃনা করে সে এই ব্যক্তিটাকে।

তানভী মেহেরকে পড়িয়ে যাচ্ছে। কিন্তু মেহেরের ধ্যান – ধারনা আজ অন্যদিকে। বইয়ে তাকিয়ে আছে ঠিক কিন্তু মনযোগ বইয়ে নেই।
তানভী আড়চোখে তাকায় কয়েকবার মেহেরের দিকে। অনেক বার লক্ষ করেছে সে বিষয়টা। পড়ার মধ্যে বসে অন্যমনস্ক হয়ে থাকার মেয়ে মেহের নয়। দুই বছর ধরে তানভী মেহেরকে পড়াচ্ছে। কোনোদিন এমন হয় নি। আজ হয়েছি কি মেয়েটার? তানভী দীর্ঘক্ষন তাকিয়ে থাকে পড়া অফ দিয়ে। এদিকে পড়া অফ হয়ে গিয়েছে সেটা পর্যন্ত ও খেয়াল নেই । তানভী গলা খাকারি দিয়ে উঠে। দুইবার কাঁশি দিতেই মেহেরের ধ্যান ভাঙ্গে। বোকা- বোকা চোখে তানভী-র দিকে তাকায়। তানভী চোখ দিয়ে ইশারা করে বলে,

” মনযোগ কোথায় তর?
মেহের ঠোঁট ভিজায়। দাঁত বের করে হাসার চেষ্টা করে বলে,
” ম…মনযোগ কোথায় যাবে? পড়ার মধ্যে। পড়ছি আমি।
তানভী ভ্রুঁ নাচিয়ে বলে,
” তুই পড়ছিস?
মেহের মাথা নাড়িয়ে বলে,
“হ্যা।
” আসলেই?
” হুম।
— লাস্ট কি নিয়ে আলোচনা করেছি সেটা বল।
মেহের তাকায় তানভীর – দিকে। ঠোঁট উল্টে বাচ্চামো করে তাকায়। তানভী দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বলে,
” কি ভাবছিস এত? দুই দিন ধরে তুই অন্যমনস্ক মেহের। হুয়াট হ্যাপেন্ড?
মেহের চোখ বন্ধ করে এদিক – সেদিক তাকিয়ে বলে,
” কিছু না আপু

— মেহের।
মেহের আবার ও তাকায় তানভী-র দিকে। সামান্য ঢোক গিলে। কিভাবে বলবে সে এই কথা। এই কথাটা যে কাউকে বলার মত নয়। মেহের কে নিশ্চুপ থাকতে দেখে তানভী পুনরায় বলে,
” আমার কাছে লোকায়িত কোনো জিনিস নেই। তর জীবনের সব কিছুই আমার জানা। এই কথা বলতে এমন দ্বিধাগ্রস্ত হচ্ছিস কেনো?
মেহের অসহায় চোখে তাকিয়ে বলে,
” আপু এক সপ্তাহ ধরে আমার বুকে অজান্তেই ভয়ে ধুক ধুক করছে। কোনো ছাড়াই ভয় পাচ্ছি আমি। মনে হচ্ছে কেউ আমাকে চারপাশ দিয়ে ভেঙ্গে দিচ্ছে। শরীরে অসহ্য যন্ত্রনা করছে। এমন মনে হচ্ছে আমি আর বাঁচব না। ও আপু বলো না, এমন কেনো মনে হচ্ছে। আমি তো বাঁচতে চাই বলো। নিকের সাথে সংসার সাজাতে চাই। ওকে বিয়ে করে বউ হতে চাই।কিন্ত আমার এমন অসহ্য অনুভুতি কেনো হচ্ছে আপু।
মেহের কথাটা বলতে বলতে ফুঁপিয়ে উঠে। তানভী বুকের সাথে মিশিয়ে মেয়। কপালে চুমু খেয়ে বলে,
” এইভাবে কাঁদে না বোন। তর কিন্তু মাথায় সমস্যা। কান্না করলে পরে পস্তাবি। এইসব তর মনের ভুল। অনেক সময় আমার ও হয়। তাই বলে কি আমি মরে যাচ্ছি। দেখ, একদম ঠিকঠাক বসে আছি তর সামনে। তাই অযথা চিন্তা করে নিজেকে চিন্তিত কেনো করছিস? তর পাশে আমি আছি, দাদামশাই আছে। আর তর সব থেকে বড় শক্তি আরিশ ভাই আছে। কিসের এত ভয় তর?
মেহের কিছুটা শান্ত হয়। তবে কান্নার রেশ কমে না। তানভী-র বুকে মাথা রেখেই বলে,

” কখনো এমন অবস্থা আমার হয় নি আপু। আঠারো বছর বয়সে এই প্রথম আমার সাথে এমন হচ্ছে। কিসের ভয় আমি নিজেও এর অর্থ খুজছি। আমি শুধু নিকের সাথে সংসার করতে চাই আপু। এই জীবনে নাহলে আর কিছুর চাওয়া নেই।
তানভী- দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,
” সব হবে। নিক স্যার তর। উনি জানে তুই উনাকে পছন্দ করিস। জীবনের থেকেও বেশি ভালোবাসিস। সব পাগলামি করিস উনার জন্য। উনি তো সব জানেন মেহের। উনাকে সবাই যমের মত ভয় পায়। উনার চাহনিতেই লোকে কাঁপে। সেখানে লোকটা তর সাথে কতটা নরম ব্যবহার করে বুঝতে পারছিস। তর সাথেই নিক স্যারের বিয়ে হবে। কান্না অফ করে শান্ত হ।
মেহের বুক থেকে মাথা তুলে। চোখের পানি মুছে নাক টেনে বলে,

” সত্যি বলছো?
” মিথ্যে বলবো কেনো?
মেহের মুচকি হাসলো। তানভী তাজ্জব বনে যায়। এখন কান্না করে বুক ভাসাচ্ছিলো। এখন আবার আবার হাসছে।
তানভী নিজেও মুচকি হেসে বলে,
” তকে ভালো না বেসে কেউ থাকতেই পারবে না মেহের। তুই মেয়েটাই এমন। যার ভিতরে কোনো অহংকার নেই।
মেহের কপাল কুচকে ফেলে,
” একটু বেশি প্রশংসা করে ফেলছো না আপু?
তানভী নিজেও একই ভঙ্গিতে বলে,
“বাস্তবতা বলছি।
মেহের গলা কেঁশে বলে,
” শুনলাম তুমি প্রেম – ট্রেম করছো? বেডা রাজি হলো কিভাবে?
তানভী লজ্জায় আরষ্ঠ হয়ে যায়। কিভাবে এতকিছু বলবে সে । তাকে এক্সেপ্ট না করাতে পানিতে ঝাপ দিয়েছিলো। এরপর লোকটা বাঁচিয়ে তার ঠো…. তানভী থেমে যায় ভাবনা থেকে। লজ্জা লুকাতে হাঁশ – ফাঁশ করে উঠে। তানভীকে এমন লজ্জা পেতে দেখে মেহের চোখ ছোট – ছোট করে ফেলে। নিচের ঠোঁট কামড়ে ধরে ভ্রুঁ নাচিয়ে বলে,

” কি হলো মিসেস অধিরাজ! এইভাবে লজ্জা পাচ্ছেন কেনো?
‘মিসেস ‘ অধিরাজ সম্মোধনটা শুনে তানভী-র মুখ হা হয়ে যায়। সামান্য রাগ দেখিয়ে বলে,
” মাইর খাবি মেহের।
” হাজার বার খেতে প্রস্তুত। কিন্তু আপনার লজ্জা পাওয়াটা বোধগাম্য হচ্ছে না। আগে সবটা বলো। কিভাবে প্রেম হয়েছে? কিভাবে ভাইয়া রাজি হলো?
তানভী ঠোঁট ভিজিয়ে বলে,
” অন্যদিন বলব কফি খেতে খেতে। আজ থাক প্লিজ।
মেহের হেসে বলে,
” আজ রেখে দিচ্ছি। তবে….
‘ কি ”
” একটা কথা জিজ্ঞাসা করি?
” হুম জিজ্ঞাসা কর”
” প্রমিস করো রাইট আন্সার দিবে? ”
” প্রমিস করার কি আছে?
” আহহ আপু! প্রমিস করো – তো।
” ওকে, করলাম। এইবার বল।
মেহের মিটমিটি হেসে বলে,
” অধিরাজ ভাইয়া কি তোমাকে চুমু খেয়েছে?

তানভী-র চোখ বড় বড় হয়ে যায়। রাগান্বিত চোখে তাকায় মেহেরের দিকে। মেহের মন খারাপ করে বলে,
” তুমি কিন্তু প্রমিস করেছিলে সঠিক আন্সার দিবে।
তানভী নিশ্বাস ছেড়ে বলে,
” হুম।
” কি হুম? সুন্দর ভাবে বলো।
” মানে উনি আমাকে চুমু দিয়েছে।
মেহের কথাটা শুনে খুশিতে লাফিয়ে উঠে। তানভী হতভম্ভ হয়ে যায়। এতক্ষন সে লজ্জায় মাথা নিচু করে রেখেছিলো। এইবার মেহেরের বাচ্চামোতে সব লজ্জা শেষ। মেহের দরজার সামনে গিয়ে বলে,
” কোথায় চুমু দিয়েছে আপু?
তানভী রেগে এগিয়ে যেতেই মেহের ভোঁ দৌঁড়। তানভী অজান্তেই হেসে উঠে,
” তকে কেউ অবহেলা করতেই পারবে না। দেখে নিস খুব সুন্দর একটা সংসার হবে তর আর নিক স্যারের। তর মাইগ্রেনে সমস্যা এই জন্য নিক স্যার তর পাগলামোতে সারা দেয়। তুই ভালোবাসার কথা বললেও কিছু বলে না। ডাক্তার বলেছে মানসিক চাপে পড়লে পুনরায় আবার সেই সমস্যা দেখা দিবে। হয়ত পুনরায় সেটা হলে তকে বাঁচানো ও সম্ভব হবে না। তকে বাঁচাতেই সবার যুদ্ধ মেহের। নিক স্যার নিজেও চাই তুই সুস্থ থাকিস। যে কর্কশ কন্ঠে কথা বলে লোকের আত্না কাঁপিয়ে তুলে। সেই লোকটাও তর সাথে একদম নরম সুরে কথা বলে।

এনি কাজ করতে করতে ক্লান্ত হয়ে উঠেছে। বিকেল হয়ে গিয়েছে হয়ত। দিনের আলো ও বুঝা যাচ্ছে না। একদম চার দেয়ালের ভিতরে সে বন্ধী। পুরো দিন ব্যায় করে রান্না করেছে। চোখ দুইটা লেগে আসছে। কেমন পাষান লোক। এত রান্না সে জীবনেও করে নি। কিচেনে পা – রাখতেই দেখে সব কিছু বাজার করে রেখেছে আগে থেকেই। বর্তমানে সে নিজেকে এই মিনারের কাজের মেয়ে দাবি করছে। পুরাতন কাপড়, ক্লান্ত মুখ। এনি ডিভানে গিয়ে শরীর ছেড়ে দেয়। মাথা ব্যাথা করছে। জ্বরে পুরো শরীর পুড়ে যাচ্ছে। ডিভানে বসা থেকে অজান্তেই শুয়ে যায়। গুঁটিশুঁটি হয়ে শুয়ে পড়ে এখানেই। উপরে যাওয়ার মত সামান্য শক্তিটুকুও নেই। দুপুরে ও কিছু খায় নি সে জেদ ধরে। এখন পেটে মনে হচ্ছে কেউ দৌঁড়া -দৌঁড়ি করছে। এনি জ্বরে কাঁপতে থাকে। জ্বরের ঘোরের মধ্যেই কান্না করে উঠে মেয়েটা। হুট করে একটা শব্দ বার বার কানে আসছে। বাম পাশে কেউ আছে। আর সে কিছু একটা কু*পাচ্ছে। কসাই মাংস কু*পালে যেমন শব্দ হয় ঠিক তেমন। নিস্তব্দ এত বড় মিনারে শব্দটা যেন আরও ভয়ানক হয়ে উঠে। জ্বরে ঘোরে আরও ভয় পেয়ে উঠে। রান্না করার সময় ও মনে হয়েছিলো কেউ তাকে দেখছে বার বার। প্রতিটা মেয়ের একটা অদ্ভুত ক্ষমতা থাকে। কেউ যদি তাকে অনুসরন করে তাহলে সহজে বুঝতে পারে। অনেক বার মনে হয়েছিলো কেউ তার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। প্রথমে ভয় পেলেও পরে নিজেকে মানিয়ে নেয়। বদ্ধ বাড়িতে, এত সিকিউরিটের মধ্যে কেউ আসার চান্স নেই। নিজের মনের ভুল ভেবে ভয়টা নিয়েই রান্না সমাপ্ত করে। কিন্তু এখন এমন শব্দ কেনো হচ্ছে? পাশে কি কোনো রুম আছে? কেউ থাকে সেখানে? মনে হচ্ছে কিছু একটা কু*পাচ্ছে।

রাত হয়ে এসেছে। নাজলী বার বার রুমে পায়চারী করছে। মনটা বড্ড অশান্ত হয়ে আছে। আরিশ তিন দিন ধরে বাড়িতে আসে না। নাজলী অভদ্র লোকটাকে এক নজরের জন্য দেখতে পাচ্ছে না। এনির জন্য মনটা দেওয়ানা হয়ে আছে। নাভিদ ভাই বর্তমানে কোথায় আছে, কি করছে খোদা জানে। এমন এক জায়গায় এসে বন্ধী করে রখেছে যেখানে থেকে পালানোর রাস্তা টুকুও নেই। তাকে কেনো বন্ধী করা হয়েছে সেই রহস্য সে আজও উন্মোচন করতে পারলো না। তাকে কেনো বিয়ে করা হয়েছে সেটাও।
নাজলী রাগে লাল চুলগুলোতে খামছে ধরে। এইভাবে আর কতদিন বন্ধী হয়ে থাকবে সে? বাহিরের সব কিছু হয়ত ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। যে করেই হোক আরিশের সাথে আমার কথা বলতে হবে। সব কিছুর উত্তর চাই আমি। প্রয়োজনে এই লোককে আমি খুন করব। এরপর এই জায়গা থেকে পালাব। এই মুহূর্ত মাথা ঠান্ডা করা প্রয়োজন।
নাজলী কফি খাওয়ার জন্য রুম থেকে বের হয়। রাগে মাথা ফেটে যাচ্ছে। ইছে করছে সব কিছু ধ্বংস করে দিতে। মনে মনে আরিশকে গালি দিতে থাকে। তাকে বন্ধী করে রেখে লুচ্চার বাচ্চা গায়েব হয়ে গিয়েছে। মরে – টরে গেলো নাকি খোদা জানে। আরে মরলে ও অন্তত আমাকে মুক্ত করে দিয়ে মরতে পারত।

নাজলী বকবক করতে করতে কফি বানানো শেষ করে। এরপর লিভিং রুমের মত রুমটার এখানে আসতেই কেউ দরজা খুলে প্রবেশ করে। হঠাৎ কারোর আগমনে নাজলীর অন্তর আত্না কেঁপে উঠে। ভয়ে সেদিকে না তাকিয়ে পায়ে থাকা জুতাটা খুলে হাতে নিয়ে নেয়। ডিম লাইটের আলোতে অবয়বটাকে পুরো – পুরি বুঝা যাচ্ছে না। নাজলী অনেকটা দুরে ছিলো। লোকটা ধীর পায়ে এগিয়ে আসছে। হাটার গতি খুবই স্লো। নাজলীর ভয়ের মধ্যেও কপাল কুচকে ফেলে।

আরিশ নয় এইটা সে কনফার্ম। কারন এই লোক ভাল্লুকের মত বড় বড় পা ফেলে হাটা- চলা করে। তবে কে এসেছে? কোনো চুর! নাকি কোনো ক্রিমিনাল? তাকে কি মারতে পাঠানো হয়েছে এই লোককে? মারতে পাঠিয়েছে ভালো কথা। এমন ল্যাংড়াকে পাঠিয়েছে কোন বলদে। ভালোভাবে হাটতে ও পারছে না । নাজলী বিরক্ত হয়ে উঠে। এই মুহূর্তে ধারালো কোনো অস্ত্রের প্রয়োজন। নাজলী কোনোকিছু না ভেবে কফির মগ শক্ত করে চেপে ধরে। কোনোভাবে কফি ফেলে দেওয়া যাবে না। অনেক কষ্ট করে বানিয়েছে সে এইটা। নাজলী -পা টিপে – টিপে অন্ধকারের মধ্যেই কিচেনের উদ্দেশ্যে এগিয়ে যেতে থাকে। কিচেনের ভিতরে ডুকতে যাবে আচমকা কেউ পিছন থেকে তার চুল ধরে টান দেয় । তীব্র ব্যাথায় নাজলী গুঙ্গিয়ে উঠে। কিন্তু থেমে যাওয়ার পাথী সে নয়। হাতে থাকা জুতাটা দিয়ে নাক বরাবর আঘাত করে বসে। সাথে সাথে কেউ রাগে চেঁচিয়ে উঠে,

” হুয়াট রাবিশ!
এই কন্ঠস্বর তার পরিচিত। কিন্তু পরিচিত কন্ঠস্বর কেমন অপরিচিত শুনাচ্ছে। যার গলা সব সময় কর্কশের মত বাজতে থাকে, তার গলা আজ ধমকের মধ্যেও এমন নরম শুনালো কেনো? নাজলী সামনে তাকিয়েই আঘাত করে বসেছিলো। অনেক সাহস নিয়ে পিছনে তাকায়। দেখে লোকটা ধীরে ধীরে ডিভানে গিয়ে বসছে। নাজলী আরেক দফা অবাক হয়। ক্রিমনাল লিডার পাল্টা আঘাত না করেই এত শান্ত ভাবে বসে গেলো। বিষয়টা নাজলীর হজম হচ্ছে না। নাজলী কিচেনের দিকে এগিয়ে গিয়ে সুইবোর্ডে চাপ দিয়ে লাইট অন করে। সাথে সাথে পুরোটা জায়গা আলোকিত হয়ে যায়। নাজলী এক প্রকার ভয় নিয়ে তাকায় আরিশের দিকে। সে চোখ হাত দিয়ে চোখ বন্ধ করে রেখেছিলো। লাইট জ্বালানোর ফলে চোখ খুলে নাজলীর দিকে তাকায়। আরিশের চোখ দেখে নাজলী আৎকে উঠে। চোখ কেমন ঘোলাটে লাল হয়ে আছে। ফর্সা মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গিয়েছে। ঠোঁট কেমন লাল হয়ে আছে। শার্ট- টা আলো- মেলো হয়ে গিয়েছে। সব সময় গুছিয়ে রাখা চুলগুলো একদম অগুছালো হয়ে আছে। কি হয়েছে উনার? সবসময় রাগান্বিত হয়ে থাকা ব্যক্তিটাকে আজ এমন ফ্যাকাশে লাগছে কেনো?
নাজলী এগিয়ে যায় ধীর পায়ে। মনের অজান্তেই মানবতা দেখিয়ে জিজ্ঞাসা করে,

” কি হয়েছে আপনার? চোখ – মুখ এমন ফ্যাকাশে লাগছে কেনো?
আরিশ চোখ খুলে রাখতে পারছে না। বহু কষ্টে তাকায় নাজলীর দিকে। আচমকা নাজলীকে টান দিয়ে নিজের উড়ুর উপর বসিয়ে দেয়। আকস্মিক তাল সামলাতে না পেরে নাজলী আরিশের উপর গিয়ে আছড়ে পড়ে। আরিশ নাজলীর টি-শার্ট ভেদ করে উন্মুক্ত কোমর শক্তভাবে চেপে ধরে। নাজলী শিউরে উঠে আরিশের হাতের ঠান্ডা স্পর্শে। প্রতিটা রক্তবিন্দু বরফের ন্যায় জমে যায়। নিজের অবস্থান ভুলে যায় সে। আরিশের শরীরের কড়া পারফিউমের গন্ধে যেন মাতাল হয়ে উঠছে। আরিশ নখ দিয়ে কোমড়ে আচর কেটে বলে,

” প্রতিশোধ।
নাজলী ব্যাথায় মুখ খিঁচে ফেলে। পুনরায় আরিশের দুর্বল স্বর ভেসে আসে,
” আমাকে জুতা দিয়ে আঘাত করেছো। তার প্রতিশোধ তুলে নিলাম
ব্যাথায় জান যায় অবস্থা নাজলীর। গন্ডারের বাচ্চাকে এসেছিলো মানবতা দেখাতে। আর সুযোগ বুঝে সেই বাচ্চা প্রতিশোধ তুলে নিলো। নাজলী রেগে আরিশের উন্মুক্ত ঘাড়ে কামড় বসিয়ে দেয়। নিজের সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে দাঁত দিয়ে চেপে রেখে। আরিশ চোখ – মুখ খিঁচে ফেলে। মুখে নোনতা কিছু অনুভব করে নাজলী ছেড়ে দেয়। রক্ত দেখে বাঁকা হেসে বলে,
” প্রতিশোধ টু।
আরিশ গম্ভীরতা টেনে বলে,
” এখন আমি যদি কামড় বসায়?
নাজলী ছটফটিয়ে উঠে,
” খবরদার।

” কিন্তু আমার প্রতিশোধ তুলবে কে? আমার কামড় সামলাতে পারবে তো? একটা কামড় নয় অনেক গুলো দিব। তুমি দিয়েছো ঘাড়ে আর আমি দিব অন্য জায়গায়।
নাজলী আরিশের কথায় শার্ট শক্ত করে চেপে ধরে। অস্থির লাগছে এখন তার এইসব। নির্লজ্জ এই লোক। এইটার সাথে থাকা উচিত নয়। নাজলী বিরক্তি হয়ে বলে,
” ছাড়ুন আমাকে।
আরিশ সামান্য হেসে বলে,
” উহুম। আমার প্রতিশোধ এখনও বাকি।
নাজলী তাকায় লোকটার দিকে। চোখ চলে যায় আরিশের লাল হয়ে যাওয়া ঠোঁটের কাছে। লোকটা হাসছে! অসম্ভব সুন্দর লাগে হাসলে।।
নাজলী অজান্তেই বলে,
” আপনি হাসতেও পারেন?

আরিশ চোখ বন্ধ করে ফেলে। কোনো উত্তর করলো না সে। নাজলী গরমে অস্থির হয়ে উঠে। আরিশের শরীর নাজলীর কাছে প্রচুর গরম অনুভব হচ্ছে। সে নিজেও যেন সিদ্ধ হয়ে যাচ্ছে। কিছু একটা মনে হতেই আরিশের কপালে হাত রাখে। জ্বরে কপাল পুড়ে যাচ্ছে। নাজলী অবাক হয়ে তাকায় আরিশের দিকে। এই কারনেই লোকটা এত সহজ আর নরম আচরন করছে।
কি সুন্দর এই পুরুষটা। কি মায়াবী আর বাচ্চা লাগছে। অথচ পুরো পাপের চাদরে ঢেকে গিয়েছে।
শেষের বাক্যটা খুব শক্ত ভাবে বিরবিরাল নাজলী।
আরিশের গলায় হাত রেখে বলে,
” আপনার শরীর জ্বড়ে পুড়ে যাচ্ছে। দ্রুত মাথায় জলপট্টি দিয়ে জ্বর নামাতে হবে।
নাজলী কোল থেকে উঠার জন্য ছটফটিয়ে উঠে,

” নড়ে না। শান্ত হয়ে বসে থাকো।
নাজলী শক্ত গলায় বলে,
” আপনি কাকে ভাবছেন জানি না। তবে আমি নাজলী। আপনার শত্রু। এতটা নরম আচরন করবেন না। আমার হজম হয় না।
” শত্রু নয় ঝগড়ার সঙ্গী।
” ঝগড়া আমি নয় আপনি করেন।
” মিথ্যে বলা পাপ।

লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ২৯ (২)

নাজলী থমথমে খেয়ে যায়। ভুতের মুখে আল্লাহর নাম। নাজলী ভ্রুঁ কুচকে বলে,
” পাপ – পুন্য বাছাই করেও কাজ করেন আপনারা? স্মার্গলিং, মাদক, অস্ত্র পাচার, খুন এইসব বুঝি খুব পুন্যের কাজ?
নাজলী কথাটা বলে আরিশের উপর থেকে উঠে আসে। আরিশ জ্বরের ঘোরে বলে,
” তোমাকে প্রচুর শাস্থি পেতে হবে। তুমি ক্রিমিনাল লিডার আরিশের সাথে তর্ক করছো।

লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ৩০ (২)